Home কিশোরী কন্যা কিশোরী কন্যা পর্ব ২০ (২)

কিশোরী কন্যা পর্ব ২০ (২)

কিশোরী কন্যা পর্ব ২০ (২)
হামিদা আক্তার ইভা

ফাহাদ গাল ফুলিয়ে তাহসিনের ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে চিৎকার করে বলল,
“আমি তুমার শালা না?শালা কুইয়া ডাকু।”
বাচ্চাটার ছোট ছোট দাঁত ঘাড়ে বিঁধতেই সে দাঁত চেপে ধরল ব্যথায়।ময়ূরী দৌঁড়ে এসে ভাইকে নিচে নামিয়ে দিয়ে ধমক দিয়ে বলল,
“কী হচ্ছে ফাহাদ?দুলাভাইকে কামড় দিলি কেন?”
ফাহাদ ছলছল চোখে বোনকে দেখে কেঁদে উঠল শব্দ করে।তাহসিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তুমি আবার ওকে বকছ কেন?ছোট মানুষ বুঝতে পারছো না?”
“ও এখনো ছোট আছে?আপনি ওকে মাথায় তুলছেন কেন?”

ফাহাদ ঘাড় উঁচিয়ে একবার বোনকে দেখে গুটি গুটি পায়ে আবার তাহসিনের নিকটে এগিয়ে গিয়ে আদুরে গলায় ঠোঁট উল্টে বলল,
“ও দুলাবাই,তুমি আপারে মাইর দিবা না?বিশি কুইরা মাইর দিবা।”
তাহসিন বাচ্চাটার আদুরে আদুরে কথা শুনে হেসে ফেলল।আদনান পাশ থেকে আফসোসের স্বরে বলল,
“ভাগ্য করে একটা শালা পেয়েছিস তাহসিন।আমার তো ফা’টা কপাল,এমন একটা বাচ্চা শালা নেই।”
হিমি রেগে সেখান থেকে প্রস্থান করল।ময়ূরী পুতুলকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলে তাহসিন নিঃশব্দে ফাহাদকে পাশে বসিয়ে ধীর গলায় বলে,
“কাজের কী খবর?কাল হাতে বেশ ব্যথা পেয়েছি।”
আদনান বলল,
“গু’লি লেগেছিল ভেবেছিলাম।ভাগ্যিস তেমন কিছু হয়নি।”

তাহসিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে ফোন বের করে আদনানকে কিছু দেখিয়ে কথা বলল।পুরোটা সময় ফাহাদ চুপটি করে বসে ছিল দুলাভাইয়ের পাশে।ওদের কথা শেষ হতেই সন্ধ্যার আযান দিয়ে দিলো।তাহসিন নামাজ পড়বে না আজ,তাই সে ধীরে-সুস্থে উপরে উঠে এলো।ঘরে এসে দেখল বর্ষা,নুপুর,কনক আর কুসুম পুতুলকে ঘিরে বিছানায় বসে আছে।ময়ূরী নীরবে পাশে দাঁড়িয়ে।তাহসিন ঘরে ঢুকতেই কুসুম বলল,
“আপনাকে বড় আব্বা একবার দেখা করে আসতে বলেছিলেন।”
তাহসিন এগিয়ে এসে বলল,
“যাব খানিকক্ষণ পর।তোরা সবাই এই ঘরে কী করছিস?”
“ভাবির সাথে তো আমাদের কথাই হয় না ভাইজান।তাই ভাবলাম একবার ভাবির সাথে দেখা করে আসি।”
“বেশ ভালো।ও তো একা একাই থাকে।তোরা এসে একটু গল্প,আড্ডা দিতে পারিস না?”
“দুঃখিত ভাইজান।আমরা তো আরও ভেবেছি ভাবি বিরক্ত হবে।”

ময়ূরীর সাথে কনকের তখন চোখে চোখ পড়ল।কনক যে বারে বারে তাহসিনের দিকে তাকাচ্ছিল এবং বরাবরই এভাবে তাকিয়ে থাকে এটা ময়ূরীর জানা কথা।জিনিসটা তার কাছে মোটেও ভালো লাগেনি।ননদ হয় বলে সেইভাবে কিছু বলাও হয়নি।কনক দৃষ্টি সরিয়ে উঠে দাঁড়াল।তাহসিনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনাকে তো বাড়িতে পাওয়াই যায় না।বিয়ের কাজ নাকি পরশু থেকেই শুরু হবে?”
তাহসিন বলল,
“দাদার সাথে কথা বলতে হবে।তোরা এখন সবাই যা পরে গল্প করিস।”
ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে পুতুল হাতের ইশারায় ফাহাদকে কাছে ডাকলে সে দুলাভাইয়ের কোল থেকে নেমে পুতুলের কাছে ছুটে যায়।রাতে আলাপ আলোচনায় সিদ্ধান্ত নেয়া হলো পরশু থেকেই আয়োজন শুরু হবে।আফিয়ার মন ভার।মাহতাবের কোনো খোঁজ খবর নেই।সে আগ বাড়িয়ে কারোর থেকে মাহতাবের খবরও নিতে পারে না।
কাজ শেষে আফিয়া আজ নিঃশব্দে বাড়ির ছাদে উঠে এলো রাত্রি করে।পিছু নিল ময়ূরী।দু’জন মিলে ছাদের পাটিতে বসে ছিল।ছাদে লাল রঙের একটা ছোট লাইট আছে।সেখান থেকেই আপছা আলোয় দুজনের বদন স্পষ্ট।
ময়ূরী আফিয়াকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বলল,

“তোমার কী হয়েছে ভাবি?”
আফিয়া খানিক্ষণ নীরব থেকে বলল,
“আমার বাবা ছিলেন সাধারণ একজন কৃষক।ভাই মারা গেছে আমার বিয়ের পর-পরই।মা নেই।বাবা অনেক কষ্ট করে বড় করেছেন আমাকে জানো?আজ গোটা একটা বছর ধরে বাবার মুখ খানা দেখতে পারি না।”
“কেন?উনি কোথায়?”
“জানি না বোন।বাবা নিখোঁজ হয়েছেন অনেক গুলো মাস কেটে গেছে।মাহতাব খোঁজ খবর করেও কোনো খবর পাননি।”
“আশ্চর্য!একটা মানুষ কিভাবে নিখোঁজ হতে পারে?”
“আমার আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না জানো?জীবনটা কেমন যেন অসহ্য লাগছে।কোথাও যেন একটুও শান্তি নেই।”
ময়ূরী আফিয়ার চোখের পানি মুছে দিয়ে আলতো করে জড়িয়ে ধরল।বলল,

“জীবন তো এমনই ভাবি।সুখ,দুঃখ,ক্লান্তি,আনন্দ সব কিছু মিলিয়েই আমাদের জীবন।তুমি ভেঙে পড়লে তোমার এই ছোট বোনের কী হবে বলো তো?আমার এই বাড়িতে আছেই বা কে?আমার সঙ্গী তুমি আর সখীও তুমি।”
আফিয়া কান্নার মাঝেও হাসল।ময়ূরীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“সোনায় বাঁধা কপাল তোমার।আমার দেবর ভীষণ ভালোবাসে তোমায় জানো?”
“বিশ্বাস তো করে না ভাবি।”
“সে তো মনের ভয়।সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
সে থেমে বলল,
“অনেক রাত হয়েছে ময়ূরী।যাও,গিয়ে ঘুমাও।কাল কিন্তু অনেক কাজ আছে।”
ময়ূরী মাথা নাড়িয়ে ভাবির সাথে নিচে নেমে এলো।ঘরে ঢুকে দেখল পুতুল নেই।তাহসিনের পাশে ফাহাদ ঘুমিয়ে আছে।ময়ূরী দরজা লাগিয়ে পিছু ঘুরে বলল,

“আপনার বড় ভাইয়ের খবর কী?মাহতাব ভাই বাড়ি ফিরছেন না কেন?”
তাহসিন খবরের কাগজ পড়ছিল।ময়ূরীর কথা শুনে বলে,
“ভাইয়ার হয়তো কোনো কাজ আছে।”
“খোঁজ নিচ্ছেন না কেন?”
“কী খোঁজ নিব?নেতা মানুষ ব্যস্ত তো থাকবেই।”
“আশ্চর্য মানুষ তো আপনারা।উনি নেতা বলে এতগুলো দিন কেটে যাওয়ার পরও একটু খবর নিবেন না?”
তাহসিন চোখ তুলে ময়ূরীর বদন পানে তাকাল।কিছুটা শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“জামাই রেখে ভাশুরকে নিয়ে টানাটানি করছ কেন?তার জন্য তো তার বউ আছে।”
“যা বলছেন ভাবনা-চিন্তা করে বলুন।”
তাহসিন সোজা হয়ে বসল।কিছুটা ভারী গলায় বলল,
“আশ্চর্য!তোমার সমস্যা কী একটু বলবে?কথায় কথায় এত রেগে যাও কেন?আমি ভাইয়াকে নিয়ে কথা বলতে বারণ করেছি মানে কথা এখানেই শেষ।আমার কথার উপর তুমি কেন এটা নিয়ে কথা বাড়াচ্ছ?”
“আপনাদের চোখ থাকতেও অন্ধ।ভাবির অবস্থা দেখেছেন?আপনার ভাই কল করে না আর কেউ কল করলেও রিসিভ করে না।কাল রাত থেকে ফোন’টাও বন্ধ।”

“সেটা তাদের ব্যাপার।তুমি এসবে ঢুকছো কেন?আমি বলেছি না? এটা তাদের দাম্পত্য ব্যাপার। তুমিও তোমার সীমা জানো ময়ূরী।”
ময়ূরীর নিঃশ্বাস যেন আঘাতে কেঁপে উঠল।
চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে রাগে,দুঃখে, অভিমানে।
“ভাবি আমার আপন।ভাবির চোখের পানি দেখে আমি চুপ থাকব?মানুষের সম্পর্ক শুধু সম্পর্ক নয়,দায়িত্বও।আপনার ভাই যদি সত্যিই ভালো থাকে,তাহলে ফোনটা বন্ধ কেন?
একটা মানুষ ক’দিন ধরে নিখোঁজ— আর আপনারা একটুও বিচলিত নন?”
তাহসিন কাগজটা শক্ত করে ভাঁজ করে রেখে দিলো টেবিলের উপর।তারপর উঠে দাঁড়াল।তার স্বভাবসিদ্ধ শান্ত গলায় বলল,
“ময়ূরী,তোমার নিজের সংসার সামলাতে পারছ না,আর এদিকে ভাইয়া-ভাবির সংসার নিয়ে পড়ে আছো?তুমি কি নিজেকে অনেক বড় কেউ ভাবছ?”
ময়ূরী ঠোঁট চেপে ধরে বলল,

“আপনি আমায় অপমান করছেন?”
তাহসিন কাছে এগিয়ে এলো।চোখে চোখ আঁটকে রেখে শান্ত স্বরে বলল,
“আমি সত্য বলছি।তুমি অতিরিক্ত মাথা গলাচ্ছ, আর সেটা আমার পছন্দ না।ভাইয়া কোথায় আছে, কেন নেই—এগুলো নিয়ে কথা বলতে চাই না আমি।
এখন চুপচাপ শুয়ে পড়ো।”
ময়ূরী মাথা নিচু করলেও তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত রাগে।ধীরে গিয়ে ফাহাদের বিছানার পাশে বসে পড়ল সে।বিছানা ঠিক করতে করতে বলল,
“এমন ধাঁধাময় জীবনে আমাকে না জড়ালেও পারতেন।অন্তত একটু শান্তিতে থাকতে পারতাম।আপনার জীবন,আপনার ইচ্ছে,আপনার নিয়ম অথচ আমি শুধুই নাম মাত্র বউ।সওদাগর বাড়ির ছোট ছেলের বউ।”
তাহসিন থমকে দাঁড়িয়ে গেল।ময়ূরীর শেষ কথাগুলো যেন ঘরের বাতাস চিরে তার বুকে গিয়ে ধাক্কা মারল।সে ধীরে,খুব ধীরে বলল,
“সওদাগর বাড়ির ছোট ছেলের বউ?এই পরিচয় তোমার কাছে এতটাই তুচ্ছ?”
ময়ূরী বিছানার চাদর গুছাতে গুছাতে বলল,

“তুচ্ছ বলিনি কিন্তু এ বাড়িতে আমি কে,সেটা এখনও বুঝতে পারিনি।আপনি আমায় বিয়ে করে এই বাড়িতে এনেছেন ঠিকই কিন্তু বউয়ের অধিকার এখন অব্দি দেননি।”
ময়ূরী ঘুরে বসল।তাহসিনের বিস্মিত চোখে চোখ রেখে শান্ত স্বরে বলল,
“আচ্ছা বিয়ের অর্থ কী বলুন তো?আমি আমাদের বিয়ের সঠিক অর্থ’টা এখন অব্দি বুঝতে পারিনি।আপনি কী শুধু ঘর সংসার আর সন্তান সামলানোর জন্য আমাকে বিয়ে করেছেন?”
তাহসিন শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“সংসার সামলাতে তো বলিনি।আমি শুধু চেয়েছি তুমি পুতুলের দেখাশোনা করো আর নিজের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকো।”
“পুতুলের দেখাশোনা?আপনার মেয়ের কথা বলছেন?”
তাহসিন উত্তর দিলো না।ময়ূরী মৃদু হাসল।হেসে পা গুটিয়ে বসল সেখানেই।আড়চোখে ফাহাদের ঘুমন্ত মুখ দেখে বলল,
“সামান্য একটা কথা একটা মানুষের হৃদয়ে কতটা জখম করতে পারে আপনি জানেন?জানেন না বুঝি?”
ময়ূরী চোখ তুলে তাকাল।তাহসিন দেখল সেই দৃষ্টিতে কোনো মায়া নেই,কোমলতা নেই,আছে শুধু একরাশ অবিশ্বাসের ছাঁয়া।তাহসিন এগিয়ে আসতে চাইলে ময়ূরী থামিয়ে দেয় তাকে।দৃঢ় গলায় বলে,

“আমি বাচ্চা মানুষ এটা আপনার বিয়ের আগে ভাবা উচিত ছিল।”
“তোমায় কে কী বলেছে?”
“কে কী বলবে?”
তাহসিন জোরে নিঃশ্বাস ফেলল।
“তাহলে এসব অদ্ভুত কথা বলছো কেন?তোমার মুড এখন ভীষণ খারাপ।এভাবে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।”
“আপনার সাথে কি কখনো কথা বাড়ানো যায়?
আর কত আমাকে চুপ করিয়ে রাখবেন?”
“বাড়িতে কত সমস্যা,কত চাপ।তুমি বুঝতে চাও না।”
“কেন বুঝতে চাইবো না?আমি আপনার স্ত্রী নই? সংসারের অর্ধেকটা আমার নয়?আপনি আমাকে কিসের ভয়ে দূরে ঠেলে রাখছেন?”
তাহসিন এবার কিছুটা উচ্চস্বরে বলল,

“আমি তোমার ভালো চেয়েছি।চেয়েছি পুতুলের দেখাশোনা করো—এটা ভুল?”
ময়ূরীর চোখ দুটো চকচক করছে রাগে,ব্যথায়।
“ভুল তখনই,যখন সেটা স্ত্রীকে দূরে রাখার অজুহাত হয়ে যায়।আপনি আমাকে একটু ‘বিশ্বাস’ করলে করলে কী এমন হত?”
ঘরে হালকা নীরবতা নেমে এলো।তাহসিন বোধহয় ময়ূরীর না বলা কথা হঠাৎ করেই বুঝে ফেলল।শুষ্ক গলা কোনরকম ভিজিয়ে কিছু বলার পূর্বেই ময়ূরী ভেজা গলায় বলে,
“পুতুল তো আপনার সন্তান নয়।আমার আগে আপনার কোনো প্রাক্তন স্ত্রীও ছিল না।তাহলে কেন আপনার পুরো পরিবার আমার সাথে এমন করল?আপনি’ই বা কেন আমায় এতদিন সত্যি কথাটা বলেননি?”
তাহসিন ধমক দিয়ে বলল,
“এসব ফালতু কথা কে বলেছে তোমাকে?আমার মেয়েকে তুমি অস্বীকার করছো?এই সংসার তেতো লাগছে এখনই?”
ময়ূরী কণ্ঠ শক্ত করল।বলল,
“আর কত নাটক করবেন?পুতুল আপনার মেয়ে নয়।”
তাহসিনের চোখ লাল হয়ে উঠল।

“পুতুল আমারই সন্তান।আমি আবার বলছি ময়ূরী পুতুল আমার সন্তান।এই নিয়ে একটাও কথা শুনবো না আমি।”
ময়ূরীর হাসিটা কেমন যেন ব্যঙ্গের মতো শোনাল।ময়ূরী কিছু বললে তাহসিন দাঁত চেপে বলে,
“তোমার কথার ধরনটা খুব বাজে হয়ে যাচ্ছে।
আমি বলেছি পুতুল আমার মেয়ে।”
“আর আমি বলছি—আপনি মিথ্যে বলছেন।”
তাহসিন হঠাৎ সামনে এগিয়ে এসে দাঁড়াল।
তার বুক ওঠানামা করছে রাগে।
“ময়ূরী,আজ তোমার কথা খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে।
তুমি সীমা ভুলে যাচ্ছো।”
“সীমা ভাঙছি আমি?
আপনি যে দিনের পর দিন আমাকে অন্ধকারে রেখেছেন ওটা কী?আপনার মেয়ের জন্মদাতা কে?
কোথা থেকে এলো সে?আপনি আজ পর্যন্ত বললেন না কেন?”
তাহসিন দাঁত চেপে বলল,

“তুমি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছো।”
ময়ূরী ততক্ষণে ফেটে পড়েছে রাগে।সে চওড়া গলায় বলল,
“আমার জানার অধিকার নেই?আপনার স্ত্রী হয়ে,
আপনার বাড়িতে থাকা একজন মেয়ে হয়ে,আপনার সন্তানের মা হয়ে,আমার জানার অধিকার নেই?”
“নেই!শুনেছ?কোনো অধিকার তোমার নেই।আমি বলেছি পুতুল আমার সন্তান তার মানে সে আমারই সন্তান।এসব নিয়ে আর একটা কথা বাড়ালে খুব খারাপ হয়ে যাবে।তুমি আমার ধৈর্যের সীমা পেরিয়ে যাচ্ছো।”
ময়ূরীর চোখ ভিজে উঠেছে দুঃখে,তবুও তার গলায় দৃঢ়তা রেখে কম্পিত স্বরে বলল,
“আমি শুধু সত্যটা জানতে চাই।পুতুলের জন্মদাতা আপনি নন,এটাই সত্য।”
“সে আমার রক্ত! আমার সন্তান! আমার মেয়ে! তুমি কী বুঝতে পারো না?”
“আপনি যদি তাকে নিজের সন্তান বলতেই চান, তাহলে বলুন,তার মা কে?”
তাহসিন নিথর।চোখে রাগ,ব্যথা,অপরাধবোধ সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত ঝড়।না কিছু বলতে পারছে আর না পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে পারছে।ময়ূরীর চোখে পানি টলটল করছে।তবুও সে এক চুলও নড়ল না।

“আমার জানার অধিকার আছে।
আমি আপনার স্ত্রী।”
এই কথাটা শুনে তাহসিন হঠাৎ পেছন ঘুরে এমন চোখে তাকাল।যেখানে উন্মাদ রাগ,হতাশা,ভীষণ ক্লান্তি মিশে ছিল। তাহসিনের মুখের পেশি কেঁপে উঠল।সে কঠিন,ধারালো গলায় বলল,
“তোমার কোনো অধিকার নেই,ময়ূরী।শুনতে পাচ্ছ?পুতুল আমার মেয়ে।”
ময়ূরী ব্যথাতুর কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল
“আমার অধিকার আছে।”
“এই প্রথম,প্রথম তুমি আমাকে এমন আঘাত দিলে যেটা আমি ক্ষমা করতে পারব না।”
“সত্যটা তবু বলছেন না।আপনি…”

তাহসিন থামিয়ে দিলো ময়ূরীকে।পিছু ঘুরে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল গটগট পায়ে।কিন্তু প্রতিটা শব্দে এমন তীব্রতা,যেন বুকে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল দু’জনের।এই নীরবতা ছিন্ন করে হঠাৎ তাহসিনের বিষের মতো একটা বাক্য এসে বারি খেল ময়ূরীর কানে।
“যদি আমার রক্তকে মানতে না পারো,তাহলে এই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাও।এখনই।এই মুহূর্তে!”
ঘরটা মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে এলো।কাঁপছে শুধু ময়ূরীর বুক আর ঠোঁট।পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটা।সামান্য এই একটা কথা বক্ষঃস্থলে ধারালো ছু’রির মতো আঘাত হানল।তাহসিন পেছন ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে সব রাগ,সব ক্ষত,সব যন্ত্রণা চাপা দিয়ে।
ময়ূরীর হাত থেকে পাতলা চাদরটা নিচে পড়ে গেল।
দরজার বাইরে কোথাও দূরে একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শোনা গেল।যেন পুরো বাড়িটাই আতঙ্কে শিউরে উঠল।তাহসিনের সেই শেষ বাক্যটা,“যদি আমার রক্তকে মানতে না পারো,তাহলে এই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাও।এখনই।এই মুহূর্তে।”

ঘরের ভেতর বাজের মতো আঘাত করল।ঘরটা যেন হঠাৎ শীতল হয়ে গেল।লাল নাইট ল্যাম্পের অস্পষ্ট আলোয় ময়ূরীর মুখের ছায়া আরও তীক্ষ্ণ,আরও ভাঙাচোরা দেখাচ্ছিল।সে দাঁড়িয়ে আছে,ঠিক যেন এক মুহূর্তে কেউ তার বুক চিরে হৃদয়ের ভেতরে বিষ ঢেলে দিয়েছে।তার গলা শুকিয়ে আসছে।ঠোঁট দুটো কাঁপছে।চোখের নিচটা হঠাৎ করেই আরও ফোলা হয়ে উঠল,তবু..তবুও সে কাঁদল না।ঠোঁট কামড়ে ধরল যন্ত্রণায়।শুধু ফাহাদের নরম,ছন্দময় ঘুমের শব্দ যেন দু’জনের অসমাপ্ত,ভাঙা সম্পর্কের প্রতি ব্যঙ্গ করছিল তখন।তাহসিন বারান্দার দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে।কথা বলা তো দূর,তার সেই বিষের মতো মূল্যবান বাক্য আওড়ানোর পর ফিরেও তাকায়নি পেছনে।একবারও না।ময়ূরীর বুকটাতে সেই নীরবতাই আরও জোরে চাপ দিচ্ছে।মনে হচ্ছে এই নীরবতাই তাকে মেরে ফেলবে।হঠাৎ খুব ধীরে সে একটা নিঃশ্বাস নিল।চোখ তুলে তাকাল তাহসিনের পেছনের দিকে।সেই মানুষটার দিকে।যার জন্য সংসারের সব ঝড় মেনে নেওয়া,ভালো না লাগা হাজার কিছু সহ্য করা,সব কিছুই সহজ মনে হয়েছিল।আজ…আজ সেই মানুষটাই তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছে।
ময়ূরী নিচু হয়ে চাদরটা তুলতে গেল কিন্তু হাত কাঁপায় সেটা হাত থেকে আবার পড়ে গেল।মেয়েটা স্তব্ধ।মাটিও যেন আজ তার পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে।একটা দীর্ঘ,ভারী নীরবতা যা হতাশা,অভিমান আর অব্যক্ত যন্ত্রণায় মোটা হয়ে উঠছে।কয়েক সেকেন্ডে যেন ঘরটাতে বছরখানেক দাঁড়িয়ে থাকে।বুকের যন্ত্রণা চেপে গিয়ে ময়ূরী ঠোঁট কামড়ে অবশেষে খুব নিচু কিন্তু ছু’রির মতো ধারালো গলায় বলল,

“আজ যদি আমি এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই,
তাহলে কোনোদিন…কোনোদিনও আর আপনার এই বাড়িতে পা রাখব না।”
তার গলা ভেঙে যাচ্ছিল,তবু সে কাঁদলো না।ঝড়ের আগে যেমন আকাশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়,ময়ূরীও ঠিক সেরকম নিস্তব্ধ।ময়ূরী ভাবল তাহসিন তাকে আঁটকাবে।এবার সব অভিমান ছেড়ে ছুটে এসে বুকের ভেতর চেপে ধরে মাথায় চুমু এঁকে বলবে,”যেও না।মাথায় হাত রেখে বলবে মাফ করে দাও। বেগম সাহেবা,আমায় রেখে কোথায় যেতে চাইছো তুমি?এই তাহসিন সওদাগরকে ছেড়ে থাকতে তোমার কষ্ট হবে না মেয়ে?”
তেমন তো কিছুই হলো না।তাহসিন একটাবারের জন্যেও ফিরে তাকাল না তার দিকে।যদি একটাবার পেছন ফিরে তাকাতো,তাহলে দেখতে পেত এক কিশোরীর চোখের বুক ভা’ঙা সেই হাহাকার।যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা ঠোঁট জোড়া।কিন্তু..কিন্তু লোকটা একটাবার ফিরেও তাকাল না।তাহসিনের মুখ শক্ত হয়ে এলো।ঘরের বাতাস জমে বরফ হোক কিংবা ময়ূরীর বুক ভেঙে যাক,তার গলায় কোনো কম্পন নেই।সে বলল,

“যাও।”
ময়ূরীর বুকটা যেন হঠাৎ থেমে গেল।
“যাও।”
একটা মাত্র শব্দ,অথচ সেই শব্দটাই তাকে ভিতর থেকে ভে’ঙে চুরমার করে দিলো।ঘরের ভেতর নিঃশব্দে যেন ঝড় বইছিল।তাহসিনের পেছনে দাঁড়ানো অবয়বটা একটুও নড়ল না।সে পিছন দিকেই তাকিয়ে রইল,যেন ময়ূরী নামের কোনো মানুষই নেই তার জীবনে।ময়ূরীর পা কাঁপছে।
হাঁটু দুটো যেন নিজের ভার সামলাতে পারছে না আর।চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে সব।
তবুও সে কাঁদল না।কাঁদলে আজ সত্যিই ভে’ঙে পড়ে যাবে সে।লাল বাতির আলো তার চোখের নিচে পড়ে যেন নীলচে ছায়া ফুটে উঠল।শব্দহীন পায়ে ছোট ভাইয়ের নিকটে এগিয়ে এলো।ছোট ভাইকে আঁকড়ে ধরা তার হাত দুটো কাঁপছে।
গলার ভেতর পুরোনো কান্নাটা যেন কাঁটাতারের মতো আঁটকে আছে।
চুপ,নিঃশব্দে সে নিজের গায়ের সকল স্বর্ণের গয়না খুলে ফেলল একটা একটা করে।সব গুলো গয়না বিছানার এক কোনায় রেখে দিলো।এই গয়না দিয়ে এখন আর কীই বা করবে সে?
ছোট ভাই ফাহাদ ঘুমের মধ্যে একটু নড়ে উঠল।
ময়ূরী নিজের মাথায় শাড়ির আঁচল টেনে নিল।
মনে হলো আজ থেকে সে কোনো ঘরের বউ নয়,কেবল একটা পথহারা মেয়ে।ছোট ভাইকে কোলে তুলে নিল মেয়েটা।এক কাপড়ে দরজার দিকে হাঁটা ধরল।

দরজার কাছে পৌঁছে শেষবারের মতো সে ঘুরে তাকাল।তাহসিনের দিকে।পেছন ফিরে থাকা সেই মানুষের দিকে।যাকে সে নিজের মনে কতবার “স্বামী” বলে ডেকেছে,অথচ উচ্চারণ করেনি কখনো।ময়ূরীর চোখে এই প্রথম জল এলো।
একটুকু,একচিলতে!কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তা শুকিয়ে গেল।গভীর যন্ত্রণায় জলও শুকিয়ে যায়।ফাহাদকে আঁকড়ে ধরল সে।দরজাটা আস্তে টেনে খুলল।হাওয়া এসে তার শাড়ির আঁচল উড়িয়ে দিলো।
তাহসিন এবারও ফিরে তাকাল না।দাঁড়িয়ে রইল।
কঠিন,বরফের মতো।
ময়ূরী শেষবার বলল,
“আজ আপনার জেদের কাছে আমাদের এই সম্পর্কটা বড়ই তুচ্ছ মনে হলো।আমি শুধু সত্যিটা জানতে চেয়েছিলাম আপনার কাছে।যাকগে,যাচ্ছি আমি।আমার সকল ভুল গুলোকে মাফ করে দিবেন দয়া করে।বাড়ির কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলবেন…বলবেন..”
ময়ূরীর ঠোঁট ভেঙে এলো।গলা ভেঙে কান্না ছিঁটকে বাইরে বেরিয়ে এলো।সে ভাইকে নিয়ে দৌঁড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।তারপর দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।এতটাই ভারী যে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।তাহসিনের পেছনে থাকা জানালার কাঁচে তার নিজের প্রতিচ্ছবি ভাঙা’চোরা দেখা গেল।
একবার,শুধু একবার যদি সে ফিরে তাকাত দেখতে পেত ময়ূরীর চোখের সেই চূর্ণস্বপ্ন।দেখতে পেত তার যাওয়ার পথের উপর পড়ে থাকা দুইফোঁটা লুকানো অশ্রু।কিন্তু লোকটা দাঁড়িয়েই রইল কঠিন,ভাঙা পুরুষের মতো।হঠাৎ তার বুকের ভেতর ধুক করে উঠল কিছু একটা।
সে মাথা তুলল,কিন্তু তখন দোরগোড়ায় আর কেউ নেই।শুধুই নিস্তব্ধতা।আর একটা অদ্ভুত শূন্যতা,
যেন ঘর থেকে আলোটা বেরিয়ে গেছে।

কিশোরী কন্যা পর্ব ২০

তাহসিন ধীরে পিছন ফিরল।ময়ূরীর খালি জায়গা।
তার দাঁড়িয়ে থাকা জায়গাটা আলোহীন দেখাচ্ছে।
আর বিছানার উপরে থাকা সোনার গয়নাগুলো
তাহসিনের মনে হলো সেগুলো স্বর্ণ নয়,সেগুলো আগুন।তার রক্ত পোড়াচ্ছে।তার বুক ছাই করে দিচ্ছে।

কিশোরী কন্যা পর্ব ২১