কিশোরী কন্যা পর্ব ২০
হামিদা আক্তার ইভা
মধু ওয়াহিদের কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে বলে,
“কাঠগোলাপ?”
“আমার ভীষণ প্রিয়।”
“আমায় দিতে চাচ্ছ?”
“চাচ্ছি।”
“কেন?”
ওয়াহিদ বিরক্ত হলো এই পর্যায়।ফাজিল মেয়ের মাথায় গোবর ছাড়া আসলেই কিছু নেই।সে ফোঁস করে চাপা নিঃশ্বাস ফেলে বাড়ির বাইরে হাঁটা ধরল।মধু বোকা মনে বিড়বিড় করে ঘরে ঢুকল।তাহসিন গম্ভীর মুখে বসে ছিল বিছানায়।মধু আসতেই সে সোজা হয়ে বসল।মধু সরবতের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আম্মা বলছিল ফাহাদকে বাড়ি দিয়ে যাওয়ার কথা।আপনি যেহেতু বলেছেন ও আপনাদের বাড়িতে কয়েকদিন থাকবে,তাহলে যাওয়ার সময় ভাইয়ের জন্য কিছু জামা-কাপড় দিয়ে দিব।কষ্ট করে একটু নিয়ে যাবেন।”
তাহসিন সরবত হাতে নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“জামা-কাপড় নিয়ে যাব কেন?আমার একটা মাত্র শালা,তাকে যদি কিছু দিতেই না পারি তাহলে আমি কেমন দুলাভাই হলাম?ফাহাদের জন্য সব কিছু কিনেছি আমি।”
ময়ূরী মাথা নাড়িয়ে বলল,
“যাওয়ার পরের দিনই তো উনি সব কিনে এনেছিলেন।”
মধু লজ্জায় মিনমিন করে বলল,
“আমি তেমন কিছু বুঝাইনি ভাইয়া।”
তাহসিন বলল,
“বুঝেছি।যাকগে,তুমিও তো গিয়ে বোনের সাথে কয়েকদিন থাকতে পারো নাকি?”
“নুপুরের বিয়েতে তো যাওয়া হবেই।তখন নাহয় থেকে আসব!”
ময়ূরীর মনেই ছিল না দু’দিনের মধ্যেই বিয়ের আয়োজন শুরু হবে।দুপুরে সবাই একসাথেই খাওয়া দাওয়া করল।বিকেল নাগাদ তাহসিন ময়ূরীকে সাথে করে বিদায় নিয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো।তাহসিনের হাতের মুঠোয় ছোট ময়ূরীর ছোট ছোট হাত।সরু রাস্তা ধরে দুই নর-নারী হেঁটে যাচ্ছে।ময়ূরী বরাবরের মতোই ভীষণ চুপচাপ।তাহসিন আড়চোখে বউয়ের নীরবতা দেখে বলল,
“একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
ময়ূরী মাথা নাড়ায়।তাহসিন বলে,
“তুমি আমার উপর রেগে ছিলে কেন?”
“আপনি এখনো বুঝতে পারেননি?”
“উহুম!”
“তাহলে থাক।”
রাস্তার মধ্যে তাহসিন কথা বাড়াতে চাইল না।হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির কিছুটা সামনে আসতেই তাহসিনের ছোট বেলার কিছু বন্ধুদের সাথে দেখা হলো।ময়ূরী মাথার কাপড় টেনে নিতেই তাহসিন শক্ত করে তার হাত আঁকড়ে ধরল।তাহসিনের বন্ধুরা কাছে এগিয়ে এলো।ইসমাইল নামের একজন হেসে বলল,
“তাহসিন,তোকে তো খুঁজেই পাওয়া যায় না।গ্রামে এসেছিস কতদিন অথচ একটা দিনও আমাদের কাছে এলি না।”
তাহসিন হেসে বলল,
“কাজে ব্যস্ত থাকি।তা ছাড়া পুতুলও গ্রামে এসেছে।”
ইসমাইল বলল,
“এত ব্যস্ত ব্যস্ত না করে একদিন আসিস।জমিয়ে আড্ডা দিব।”
বলতে বলতে পাশে ময়ূরীর দিকে চোখ গেল।এত বড় ঘোমটা দিয়েছে মেয়েটা।মুখ খানাও স্পষ্ট নয়।সে বলল,
“উনি কী আমাদের ভাবি?”
তাহসিন মাথা নাড়ায়।ওরা সবাই ময়ূরীকে সালাম দেয়।ময়ূরী সালামের উত্তর নিলে বলে,
“ভাবি,ভালো আছেন?”
ময়ূরী তাহসিনের হাত চেপে ধরে।সে তাদের সাথে কথা বলতে চাচ্ছে না বুঝতে পেরে তাহসিন তাড়া দিয়ে বলে,
“তোরা সবাই একদিন বাড়ি আসিস।আজ বাড়িতে একটু কাজ আছে।যেতে হবেরে।”
ওরা সম্মতি দিলে তাহসিন ময়ূরীকে নিয়ে বাড়ি চলে আসে।সদর দরজায় পা রাখতেই পুতুল আর ফাহাদ খিলখিলিয়ে দৌঁড়ে আসে ওদের নিকটে।পুতুল আর ফাহাদ দু’জনেই ময়ূরীর পা জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হাসছে।ড্রয়িংরুমে আদনান মুখ কালো করে হিমির সাথে বসে আছে।তাহসিন নিচু হয়ে পুতুলকে কোলে নিতে গেলে পুতুল চোখ পাকিয়ে বলে,
“তুমি আমাকে ছুবে না।”
তাহসিন আশ্চর্য হয়ে বলে,
“কেন আম্মা?”
“তুমি আমায় শুধু বোকো বাবা।মা আমায় খুব ভালোবাসে।”
ময়ূরী ঠোঁট টিপে হাসে।পুতুলকে কোলে নিতে গেলে ফাহাদ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে বোনের দিকে।ময়ূরী হাঁটু মুড়ে নিচে বসলে হঠাৎ করেই দু’জন তার গলা জড়িয়ে ধরে দুই গালে চুমু খায়।ময়ূরী চোখ বড় বড় করে বলে,
“আজ হলো কী তোমাদের?আমাকে এত ভালোবাসা হচ্ছে কেন শুনি?”
ফাহাদ বোনের গলা জড়িয়ে ধরেই বলে,
“আমি তু তুমারে অনেক বালোবাসি আপা।”
পুতুল কপাল কুঁচকে বলে,
“আমিও আমার মাকে অনেক ভালোবাসি।”
তাদের কথা শেষ হতেই তাহসিন বলে,
“আমিও আমার বউকে ভীষণ ভালোবাসি।”
লজ্জায় মেয়েটা ঠোঁট টিপে হেসে ফেলল।ড্রয়িংরুম থেকে আদনান নাক কুঁচকে বলল,
“এই,তোদের নাটক বন্ধ কর।তাহসিনের বাচ্চা আমার কাছে আয়।তোকে আজ চিবিয়ে খাব আমি।”
তাহসিন এগিয়ে গেলে হিমি গাল ফুলিয়ে বলে,
“তুই আজই আমায় ঢাকা দিয়ে আসবি।আমি আর এখানে থাকতে পারব না।এই অসভ্য ছেলেটা আমাকে একটুও শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না।”
আদনান দাঁত চাপল।
“তোকে আমি কী বলেছি?তুই ঢাকায় কেন যেতে চাচ্ছিস?”
“তুই আবার কী করবি?”
“সেটাই তো,করেছি কী?”
তাহসিন দুজনের ঝগড়া দেখে বিরক্ত হয়ে সোফায় গিয়ে বসল।ফাহাদ ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে এসে তাহসিনের সামনে এসে দাঁড়ায়।বাচ্চাটা আজ ছোট একটা প্যান্ট আর গেঞ্জি পরেছে।গুলুমুলু শরীরটা হেলে-দুলে এগিয়ে আনতেই তাহসিন বলে,
“কী হয়েছে শালা বাবু?”
ফাহাদ হাত বাড়ায়।তাহসিন কোলে তুলে নেয় তাকে।ফাহাদ ড্যাব-ড্যাব চোখে আদনান আর হিমিকে দেখে তাহসিনের গালে গাল লাগিয়ে বলে,
“ওই ছেলে খুব পাজি।”
আদনান অবাক হয়ে তাকায়।তাহসিন বলে,
“কী করেছে ও?”
“ওই পাজি ছেলে আন্তিরে মারে।”
আদনান অবাক কণ্ঠে বলে,
“এই পুঁচকু,আমি কখন ওকে মেরেছি?”
ফাহাদ কপালে গাঢ় ভাঁজ ফেলে।তারপর বলে,
“আমি তু দিখছি।দুলাবাইও আপারে ইমনে মাইর দেয়।”
তাহসিন ফাহাদের কথার মানে বুঝতে পেরে বাচ্চাটার মুখ চেপে ধরে।ভারী ভয়ংকর একটা শালা পেয়েছে সে।আদনান সন্দিহান চোখে তাহসিনকে দেখে বলে,
কিশোরী কন্যা পর্ব ১৯
“কিরে তাহসিন?তোর ব্রিটিশ শালা কী বলে?”
ফাহাদ তাহসিনের হাত সরিয়ে দিয়ে বলে,
“আমি সুত্যি কুইছি।দুলাবাই আপারে মারে।”
তাহসিন গোল উঁচিয়ে ময়ূরীকে ডেকে বলে,
“এই তোমার ভাইকে তাড়াতাড়ি আমার সামনে থেকে সরাও।কখন যেন সত্যি তুলে ফেলে দিয়ে আসব ওকে।”
ফাহাদ জেদ দেখিয়ে তাহসিনের গলা চেপে ধরে বলে,
“দুলাবাই ইমনে কও কেন?আমি তুমার শালা না?”
“তুমি আমার শালা নও শত্রু হও!”
