Home কিশোরী কন্যা কিশোরী কন্যা পর্ব ১৯

কিশোরী কন্যা পর্ব ১৯

কিশোরী কন্যা পর্ব ১৯
হামিদা আক্তার ইভা

“আপনার কত বড় সাহস?আপনি আমাকে ডাইনি বলছেন?”
তাহসিন গাল ফুলিয়ে রেখেছে।বউয়ের ঝাড়ি খেতে আপাতত তার মন চাচ্ছে না।ময়ূরী আজ ভীষণ রেগে আছে।সে দাঁত চেপে বলল,
“আমার ধারের কাছে যদি আপনাকে আরেকবার দেখেছি,তাহলে আপনার অন্য হাত’টাও ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে দিব আমি।”
ময়ূরী রেগে মেগে বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা ফাহাদকে ডেকে উঠল।তাহসিন চোরা চোখে বউয়ের রাগ দেখে শুকনো ঢোক গিলল।হালকা গলা কেঁশে বলল,
“ডাইনির মতো করলে এখন ডাইনিও বলতে পারব না?”
ময়ূরী ফুঁসে উঠল।বিছানার বালিশ নিয়ে ছুড়ে মারল তাহসিনের দিকে।তাহসিন আশ্চর্য হয়ে সোজা হয়ে বসল।বলল,
“তুমি আমায় মারছ?জামাইয়ের গায়ে কেউ কোনোদিন হাত দেয়?”
ময়ূরীর শরীর দাউ দাউ করে জ্বলছে রাগে।ফাহাদ নাক ডেকে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।তাহসিন অভিমানী চোখ ফিরিয়ে নিল।গমগমে কণ্ঠে বলল,

“রাগ করেছি আমি।কোনো বউ টউ আমার লাগবে না।আমি আরেকটা বিয়ে করব।”
ময়ূরী দাঁত চেপে বিছানায় উঠে এলো।তাহসিনের ফিরিয়ে রাখা মুখ নিজের ছোট ছোট হাত দিয়ে চেপে ধরে নিজের দিকে ফেরাল।তাহসিন হতভম্ব বউয়ের এহেন কাণ্ডে।চোখ আঁকারে বড় হয়ে এসেছে তার।ময়ূরী এমন ভাবে চোয়াল চেপে ধরেছে,মনে হচ্ছে সব রাগ এই মুখের উপরেই ঝাড়ছে।
“কী করবেন আপনি?আরেকটা বিয়ে করবেন?”
তাহসিন মাথা নাড়ায়।ময়ূরী বলে,
“তাহলে আমায় আমার বাপের বাড়ি দিয়ে আসুন।আপনার মতো খারাপ লোকের সাথে আমি সংসার করব না।”
তাহসিন কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে রইল।বউয়ের মুখে রাগের লালচে আভা,ঠোঁট দু’টো কাঁপছে,আর চোখে আগুন ঝরছে।এক মুহূর্তে যেন তার সব ধৈর্য ভেঙে গেল।হঠাৎ ময়ূরীর কোমর জড়িয়ে এক টানে নিজের বুকে টেনে আনল।
ময়ূরী বিস্ময়ে হাঁ করে তাকাল,

“কি করছেন আপনি! ছাড়ুন!”
তাহসিন ঠোঁটের কোণে একফোঁটা দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
“তুমি বলো না,আমি খারাপ লোক?তাই ভাবলাম, খারাপ লোকের মতো’ই আচরণ করি।”
এরপর ঝটকা মেরে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিলো।
ময়ূরী ছটফট করছে,রাগে-লজ্জায় গাল দু’টো আরও লাল হয়ে এসেছে।তাহসিন তার মুখের এতটাই কাছে ঝুঁকে পড়ল যে দু’জনের নিঃশ্বাস একে অপরের মুখে মিশে যাচ্ছে।তাহসিন ময়ূরীর বন্ধ আঁখি জড়ায় দৃষ্টি রেখে ফিসফিস করে মৃদু গলায় বলল,
“তুমি রাগ করলে তোমায় আরও সুন্দর লাগে,জানো?মনে হয় এই বুকের মধ্যখানে যতন করে লুকিয়ে রাখি তোমায়।আমায় এত পাগল কী করে বানালে?”
হঠাৎ ময়ূরীর কম্পিত অধর জোড়া ভিজে উঠল প্রেমসুধায়।
এক মুহূর্তে’ই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।গভীর,গরম উষ্ণতায় মেয়েটা ছটফটিয়ে উঠল।তাহসিন ঘনিষ্ঠ হচ্ছে,সেই ঘনিষ্ঠতা আঁটকাবার মতো সাধ্য তার নেই।দু’জনের ঘনিষ্ঠতা আর একটু গভীর হলে ফাহাদ পিটপিট করে চোখ খুলে চোখ কচলে ঠোঁট উল্টে বলল,

“ও দুলাবাই,তুমি আপারে মারো ক্যান?”
ফাহাদের কণ্ঠস্বর দু’জনের কর্ণদ্বয় হতেই ছিঁটকে দূরে সরে গেল তারা।ময়ূরী লজ্জায় বালিশে মুখ গুঁজল।তাহসিন কটমট করে শালার মুখখানা ভালো করে দেখে বলল,
“আমার সাথে তোমার কিসের শত্রুতা ভাই?”
ফাহাদ ঘুমঘুম গলায় বলল,
“তুমি আপারে মারো কেন?”
“ওটাকে মার নয় আদর বলে।”
“আদুর?”
“হ্যা।”
“তাইলে তুমি আসু,তুমারে আমি আদুর কুরি।”
তাহসিন বিরক্ত গলায় বলে,
“হতচ্ছাড়া,আমি তোমার দুলাভাই হই।”

ফাহাদ গাল ফুলিয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে দেখল আপা বালিশে মুখ গুঁজে রেখেছে।সে ভাবল সত্যি’ই দুলাভাই বোনকে মেরেছে।বাচ্চাটা হঠাৎ শব্দ করে কেঁদে উঠল।তাহসিন হতভম্ব।ময়ূরী আতঙ্কিত হয়ে উঠে বসল।ঘরের মধ্যে রজনী বেগম আর অরুণিমা বেগম ঢুকলেন তাড়াতাড়ি।তারা এইদিক দিয়েই যাচ্ছিলেন।দরজা চাপানো থাকায় আর দরজায় শব্দ করলেন না।ময়ূরী ভাইকে বুকে টেনে নিয়ে মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে বলল,
“কী হলো ভাই?কাঁদছিস কেন?”
রজনী বেগম শাড়ির আঁচলে চাবি শক্ত করে বাঁধতে বাঁধতে মুখে পান নিয়েই বললেন,
“সাতসকালে কী হইল?”
ফাহাদ চিৎকার করে তাহসিনকে দেখিয়ে বলল,
“দুলাবাই কুইছে আপারে আদুর করে।কিন্তু আমি দিখছি,দুলাবাই আপারে মারে।”
তাহসিন শরমে হাত দিয়ে মুখ ঢাকল।ময়ূরী শুকনো ঢোক গিলে ভাইয়ের মুখ চেপে ধরলো।রজনী বেগম ময়ূরীর মুখ পানে তাকিয়ে দেখলেন মেয়েটার ঠোঁট হালকা কেটে গেছে।তিনি ভাবলেন সত্যি তাহসিন বউয়ের গায়ে হাত তুলেছে।তিনি ক্রোধে চওড়া গলায় বললেন,

“তাহসিন,তুই হাছাই বউয়ের গায়ে হাত তুলছস?”
অরুণিমা বেগম কাছে এগিয়ে এলেন।ময়ূরীর চোয়াল ধরে দেখলেন গালে আঙ্গুলের ছাপ বসে গেছে।তিনি যেন বিশ্বাস’ই করতে পারছেন না,তাহসিন মেরেছে বউকে।তিনি অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বললেন,
“তুমি ওকে মেরেছো কেন?এত উগ্র তো তুমি নও।”
তাহসিনের অবস্থা বেহাল! মুখ ঢেকে বসে আছে, ময়ূরীও লজ্জায় মুখ তুলে তাকাতে পারছে না। ফাহাদ নাক টানতে টানতে বোনের কোলে মুখ লুকিয়ে রেখেছে। রজনী বেগমের চোখের ভাঁজে রাগ জমে আছে।তিনি গলা ভারী করে বললেন,
“তুই বউয়ের গায়ে হাত তুলছস? আজ’ই আমি তোর দাদারে কইতাছি।”
তাহসিন তাড়াতাড়ি মুখ তুলে বলল,
“দাদি,বেশি বোঝো তোমরা।ঘর থেকে যাও তো,ওকে আমি মারিনি।ফাহাদ ভুল বুঝেছে।”
ফাহাদ গাল ফুলিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“আমি মিছা কথা কুই না! আমি দিখছি,তুমি আপারে মারো।”
ময়ূরী চট করে ভাইয়ের মুখে হাত চেপে ধরল,
“চুপ কর ফাহাদ! কেউ মারেনি।”
অরুমিনা কিছুক্ষণ ময়ূরীকে পর্যবেক্ষণ করে হালকা কেঁশে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।রজনী বেগম একপা নড়লেন না।তিনি তাহসিনের কান চেপে ধরে বললেন,
“বউরে মারলি কেন হতচ্ছাড়া?”
ময়ূরী ভাইকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে দাদিকে বলল,
“উনি আমায় মারেননি দাদি।আপনি ছাড়ুন উনাকে।”
“তুমি আমারে মিছা কথা কও কেন?তোমার গালে যে থাপ্পড়ের দাগ বইসা গেছে,ওইডা অমি দেখি নাই ভাবছ?”
তাহসিন খুব কষ্টে দাদিকে বুঝিয়ে ঘর থেকে বের করল।ফাহাদ গাল ফুলিয়ে বিছানায় দুই পা মেলে দিয়ে বসে আছে।ময়ূরী লজ্জায় আর কথা’ই বলতে পারল না।কী একটা অবস্থা!তাহসিন এগিয়ে এসে ফাহাদকে কোলে তুলে নিল।ময়ূরী আঁতকে উঠে বলল,
“কী করছেন?আপনার হাতে না ব্যথা?ওকে নামিয়ে দিন!”
তাহসিন দাঁত চেপে বলল,

“এই শালার জন্য একটুও শান্তি পাই না আমি।ওকে এখন ফেলে দিয়ে আসবো।”
ফাহাদ তাহসিনের গলা জড়িয়ে ধরে গালের সাথে গাল লাগিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“আমারে ফলায় দিলে আপা তুমারে মারব।”
তাহসিন বোধহয় বাচ্চাটার এত আদর দেখে একটু গলে গেল।শান্ত হয়ে বিছানায় নামিয়ে দিলো ওকে।তারপর ময়ূরীর মুখ খানা মুঠোয় নিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“ব্যথা পেয়েছ?”
ময়ূরী লাজুক চোখ নামিয়ে মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বলে।তাহসিন বলে,
“তোমাকে বিয়ে করে বড্ড জ্বালায় পড়েছি মেয়ে।”
“আমি কী বিয়ে করতে বলেছিলাম?আপনি’ই তো দেখতে গিয়ে তুলে নিয়ে এলেন।”
বেচারার দুঃখ বলার মতো কেউ নেই।বাচ্চা একটা মেয়েকে বিয়ে করে বিপদে পড়েছে।
পরেরদিন সকালে ময়ূরীকে নিয়ে তাহসিন স্কুলে এলো।টেস্ট পরীক্ষার ব্যপারে কথা বলতে এসেছে সে।সামনে সপ্তায় পরীক্ষা শুরু।স্কুলে প্রিন্সিপালের রুমে তাহসিন বসে বসে কথা বলছে।ময়ূরী রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।দূর থেকে দু’জন মেয়ের সাথে শবনম ছুটে এলো এদিকে।ময়ূরীকে দেখে শবনম জড়িয়ে ধরে বলল,

“কতদিন ধরে তোকে দেখি না।আজ স্কুলে এলি যে?”
ময়ূরী বলল,
“উনি স্কুলে এসে কথা বলতে চাইছিলেন।”
সাথে থাকা একটা মেয়ে ময়ূরীকে ভালো করে দেখল।শুনেছিল চেয়ারম্যান বাড়ির ছেলের সাথে তার বিয়ে হয়েছে।শরীরে জড়ানো শাড়ি,গয়না দেখে সেটাই মনে হচ্ছে।সে বলল,
“উনি আবার কে?”
শবনম বলে,
“ওর জামাই।”
“উনি এসেছেন নাকি?”
ময়ূরী মাথা নাড়িয়ে প্রিন্সিপালের রুমের দিকে ইশারা করে বলে,
“ওইযে কালো শার্ট পড়ে বসে আছেন।”
পাশের মেয়েটা ঠোঁট টিপে বলল,
“শ্যামলা লোকটা?উনি তোর জামাই?”
ময়ূরী মাথা নাড়ায়।মেয়েটা বলে,
“তোর সাথে মানায়নি একটুও।লোকটার সাথে তোকে মানাচ্ছে না।”
ময়ূরীর হাসি-খুশি মুখটা গম্ভীর হলো।বলল,
“কেন মানাচ্ছে না?”
“তুই কত সুন্দর,ফরসা আর উনি?”

তখন প্রিন্সিপালের রুম থেকে তাহসিন বেরিয়ে আসতে আসতে ময়ূরীর পাশে এসে ওর হাত মুঠোয় নিয়ে বলে,
“বামুন হয়ে চাঁদে হাত দিয়েছি শালী সাহেবা।চাঁদ যে আমার বুকে এসে বাসস্থান গেড়েছে।আপনাদের বুঝি হিংসা হচ্ছে?”
মেয়েটা থমথমে খেয়ে গেল।ময়ূরী মাথা উঁচিয়ে মাথার ঘোমটা ঠিক করে বলল,
“আল্লাহর সৃষ্টিকে এভাবে ব্যঙ্গ করতে নেই।আমার স্বামী আমার কাছে দুনিয়ার সব চেয়ে সু-দর্শন পুরুষ।সেটা তোদের চোখে কালো লোক হোক কিংবা অসুন্দর।”
তাহসিন ঠোঁট টিপে হাসল।ময়ূরী তাহসিনকে নিয়ে স্কুল গেট দিয়ে বেরিয়ে এলো হাত ধরে।ময়ূরীকে নিয়ে তাহসিন অটোতে উঠেছে।ময়ূরী চোখ তুলে একবার শ্যাম বর্ণ পুরুষটার দিকে চোখ রাখল।লোকটা শ্যামলা কিন্তু ভীষণ সুন্দর।চোখ গুলো ময়ূরীকে খু’ন করার জন্য যথেষ্ট।ছাই রঙা ঠোঁটের ভাঁজেও এক অদ্ভুত আকর্ষণ আছে।লোকটা কিছুটা সাহেব বাবুদের মতো দেখতে।সব সময় সাহেবদের মতো পরিপাটি হয়ে থাকে।
ময়ূরীকে নিজের দিকে অমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে তাহসিন হাত বাড়িয়ে বউয়ের নরম হাত মুঠোয় নিয়ে বলে,
“কী হয়েছে বেগম সাহেবা?”
“কিছু হয়নি।”

তাহসিন উল্টো পাশ থেকে ময়ূরীর পাশে এসে বসে।রাস্তার দুইদিকে ক্ষেতের বাহার।বাতাসে ময়ূরীর চুল গুলো দোল খাচ্ছে মুখের সামনে এসে।তাহসিন বউয়ের কাঁধ জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে বলে,
“শোনো মেয়ে,অন্যের কথায় কখনো কান দিবে না।আমার দিকে তাকাও?”
ময়ূরী তাকায়।তাহসিন চোখে চোখ রেখে বলে,
“আল্লাহর সৃষ্টি সব কিছুই সুন্দর।সবাইকে যে সবার ভালো লাগবে তেমন কোনো কথা নেই।ওদের কথায় খারাপ লেগেছে তোমার?”
ময়ূরী মৃদু গলায় বলে,
“মানুষের ভাবনা-চিন্তা কত বিশ্রী।”
তাহসিন হেসে ফেলল।ময়ূরী সেই হাসির দিকে তাকিয়ে বলল,
“কিন্তু ওদের কথা আমার মোটেও খারাপ লাগেনি।পুরো দুনিয়ার কাছে আপনি জঘন্য হলেও আমার কাছে শ্রেষ্ঠ ও সু-দর্শন পুরুষ।আমার একান্ত হালাল পুরুষ,‘মিসবাহ তাহসিন সওদাগর।’”
এমন সুখময় মিষ্টি স্বরের কথা যেন তাহসিন এর আগে কখনো শোনেনি।বউয়ের কথা শুনে বুক ফুলে উঠল আনন্দে।এই তো একটুখানি প্রাপ্তি।

সে ময়ূরীর মুখে এইটুকু ছোট একটা কথাই তো শুনতে চেয়েছিল এতদিন।একটু ভরসা,একটু ভালোবাসা আর একটু যত্ন।
অটোটা তখন গ্রামের সরু পথ ধরে এগিয়ে চলেছে। চারপাশে গাছের পাতা দুলছে বাতাসে,দূরের খালে সূর্যের সোনালি আলো পড়ে চকচক করছে।ময়ূরীর আঁচল হাওয়ায় উড়ে এসে তাহসিনের গালে ছুঁয়ে যাচ্ছে।মুহূর্তটুকু যেন থেমে রইল দুজনের মাঝখানে।
ময়ূরী আলতো করে তাহসিনের কাঁধে মাথা রাখল। ময়ূরী নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করল,মুখের কোণে হাসির রেখা ফুটে উঠল। দু’জনের দেহে,মনে,নিঃশ্বাসে তখন এক মিষ্টি শান্তি ছেয়ে গেছে।বাইরের পৃথিবী যেন থেমে গেছে কেবল তাদের দুজনকে জায়গা দিতে।অটো ধীরে ধীরে বাজার পেরিয়ে গেল।লালচে আকাশে পাখির সারি উড়ে যাচ্ছে বাড়ির পথে।সেই মুহূর্তে দু’জনের হাত মুঠোয় বন্দি রইল শব্দহীন, অথচ হাজার কথার চেয়ে গভীর এক ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি নিয়ে।ময়ূরীর চোখে তাহসিন,আর তাহসিনের বুকের ভেতর শুধু তার কিশোরী বধূ,ময়ূরী।
ওরা ময়ূরীর বাবার বাড়ির রাস্তায় গাড়ি থামাল।তাহসিন ভাড়া মিটিয়ে মিষ্টি আর ফলের প্যাকেট ধরে ময়ূরীর আশ্চর্য বদন দেখে মুচকি হেসে বলল,

“আব্বা কাল রাতে কল করেছিলেন।আম্মা তোমায় দেখতে চাইছে।”
ময়ূরী অবাক হয়ে বলল,
“আমাকে যে কিছু বললেন না?”
“আগে বাড়ি চলো তারপর কথা হবে।”
ওরা ফরাজী বাড়ি ঢুকতেই বারান্দা থেকে মধু দৌঁড়ে এলো চিৎকার করে।ময়ূরীকে ঝাঁপটে জড়িয়ে ধরে বলল,
“সেই সকাল থেকে অপেক্ষা করছি তোর জন্য।এখন সময় হলো আসার?”
ঘরের ভেতর থেকে ফিরোজা বেগম বেরিয়ে এলেন মাথায় কাপড় দিতে দিতে।তাহসিন সালাম দিলো তাকে।তিনি ব্যস্ত হয়ে তাহসিনকে ঘরে নিয়ে এলেন।ময়ূরী আস্তে-ধীরে ঘরে প্রবেশ করল।ফিরোজা বেগম মধুকে বললেন ঠান্ডার ব্যবস্থা করতে।তাহসিন হাত-মুখ ধুইয়ে এলো কলপাড় থেকে।ফিরোজা বেগম গামছা এগিয়ে দিলেন।বললেন,
“ফাহাদকে কেন নিয়ে এলে বাবা?ছেলেটা তো অনেকদিন থাকল।”
ময়ূরী বলল,

“ওকে আমার কাছেই রেখে দেই?”
ফিরোজা বেগম হাসলেন।
“জামাই বাড়ি ভাইকে নিয়ে রাখবি?লোকে কী বলবে?”
ময়ূরী প্রতিবাদ করে বলল,
“লোকের ধার ধারী না আমি।লোকে এসে আমায় এক বেলার ভাত জুটিয়ে দিয়ে যাবে না।”
“আরে বাবা,রেগে যাচ্ছিস কেন?এমনটা হয় না।কয়েকদিন পর পর গিয়ে নাহয় থেকে আসবে।ওকে বাড়ি দিয়ে যাস।”
তাহসিন বলল,
“আম্মা,ওই বাড়িতে ময়ূরীর পরিচিত কেউ নেই।আপনি তো জানেন আপনার মেয়ে কেমন একঘেয়ে।কারোর সাথে সেইভাবে কথাও বলে না,তাই ফাহাদ থাকলে ওর ভালো হয়।তা ছাড়া পুতুলও খেলার একজন সঙ্গী পেয়েছে।ও কিছুদিন থাকুক,কয়েকদিন পর তো আমরা ঢাকায় চলেই যাচ্ছি।”
ফিরোজা বেগম বললেন,

“তোমার শ্বশুর আব্বা তো চাইছেন না ফাহাদ ওখানে বেশিদিন থাকুক।তুমি বরং ওকে দিয়ে যেও বাবা।”
ময়ূরী মুখ কালো করে বসে রইল।ফাহাদ ছোট ছেলে সব থেকে বেশি ময়ূরীর কাছেই থেকেছে।ছোট ভাইটা বোন বলতে পাগল।ময়ূরী চেয়েছিল ফাহাদকে সে নিজের কাছেই রাখবে।কিন্তু মা বাবার কাছ থেকে তো এভাবে রাখা যায় না।
তাহসিন বলল,
“আর কয়েকটা দিন থাকুক আম্মা।”
ফিরোজা বেগম আর কথা বাড়ালেন না।তিনি দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে বের হলেন ঘর থেকে।মধুর ঘরের দরজার সামনে ওয়াহিদ বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে দরজায় হ্যালান দিয়ে।ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি।ময়ূরী ওয়াহিদকে দেখে বলল,
“ভালো আছো?”
ওয়াহিদ এগিয়ে আসতে আসতে ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
“তুই নেই,ভালো থাকি কিভাবে?তোর বজ্জাত বোন তো আমার যত্ন নেয় না।”
তাহসিন তেলে বেগুন জ্বলে উঠল।ঠোঁট চেপে গম্ভীর চোখে ওয়াহিদকে দেখে বলল,
“আপনাকে ভালো থাকতে কে বলেছে ভাই?”
“আরে দুলাভাই,আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন?”
“আপনি কথা কম বলুন।”
ওয়াহিদ মাথা নাড়িয়ে ময়ূরীকে বলল,

“ময়ূরী,তোর জামাইয়ের বোধহয় মাথা ব্যথা করছে।চল আমরা বাইরে গিয়ে কথা বলি।”
তাহসিন খোঁপ করে ময়ূরীর হাত চেপে ধরে চোখ পাকিয়ে বলল,
“আমার বউয়ের সাথে কাজ আছে।আপনি এখন এখান থেকে যান।”
“আপনি যে রাগে আগুন হয়ে আছেন দুলাভাই, দেখি না কবে পুরো আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যান।”
তাহসিন ঠান্ডা গলায় বলল,
“আমি ছাই হলে সমস্যা নেই,তবে কেউ যদি আমার আগুনে পা দিতে চায়,তার অবস্থা কেমন হয় সেটা আপনি ঠিকই টের পাবেন।”
ওয়াহিদ কটমট করে বলল,
“অত ভয় দেখানোর দরকার নেই।আপনি কি আমার বোনকে বন্দি করে রাখতে চাচ্ছেন?”
তাহসিন মৃদু হেসে বলল,

“বন্দি না ভাই,নিরাপদে রাখব।আমি আমার বউকে যথেষ্ট পরিমাণ স্বাধীনতা দিয়েছি।”
ময়ূরী দু’জনের কথা কাটা-কাটি দেখে বলল,
“দুই’জনই থামো! মা বাইরে আছেন,কেউ শুনলে কী বলবে?”
ওয়াহিদ মুখ বাঁকিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেল।তাহসিন বলল,
“খবরদার ওই লোকের ধারের কাছে যাবে না তুমি।”
ময়ূরী বিরক্ত হলো।তাহসিন যে কেন ওয়াহিদকে সহ্য করতে পারে না,সেটা সে আজ অব্দি বুঝতে পারল না।
ওয়াহিদ ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল রান্নাঘরে মধু আঁচল কোমরে গুঁজে ঠান্ডা সরবত বানাচ্ছে।কোমর সমান চুল গুলো আলগা করে মাথায় খোঁপা করা।অবাধ্য নারীর অবাধ্য চুল গুলো প্রায় মুখের সামনে এসে তাকে বিরক্ত করছে।
রান্নাঘরের দরজার পাশে ওয়াহিদ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।মধুর দিকে তাকিয়ে থাকাটা যেন তার নিজেরই অজান্তে ঘটে যাচ্ছে।
চুলের খোঁপা থেকে দু’একটা অবাধ্য গোছা বের হয়ে গাল ছুঁয়ে নেমে এসেছে,মুখের কোণে একফোঁটা ঘাম টলমল করছে।আঁচল কোমরে গুঁজে,চোখ নামিয়ে ঠান্ডা সরবত নাড়ছে সে।আলগা আলোয় মেয়েটার মুখটায় অদ্ভুত শান্তি—যেন দুপুরের গরমেও একফোঁটা শীতল হাওয়া বয়ে যায়।ওয়াহিদের বুকের ভেতর কেমন একটা অচেনা দোলা দুলে উঠল।
এই মেয়েটাকে তো সে প্রতিদিন দেখে,তবু আজ কেন এত নতুন লাগছে? কেন মনে হচ্ছে,রান্নাঘরের ধোঁয়া নয় বরং চোখের সামনে যেন কোনো রূপকথার দৃশ্য নেচে বেড়াচ্ছে?মধু চামচটা ঠান্ডা সরবতের গ্লাসে রেখে মুখে হালকা বাতাস দিচ্ছে,ঠোঁটের কোণে একফোঁটা চিনি আটকে আছে।

ওয়াহিদ অবচেতনে নিজের আঙুল মুঠো করল। কেমন অদ্ভুত শান্ত কিন্তু গভীর এক সৌন্দর্য ওর ভেতরে ঢেউ তুলছে।
তার চোখ থেমে গেল মধুর চোখে।চোখ দুটি বড়,কাঁচের মতো স্বচ্ছ।মেয়েটা মাথা তুলে তাকাতেই ওয়াহিদের বুক ধক করে উঠল।সে তাড়াতাড়ি দৃষ্টি সরিয়ে নিল।দৃষ্টি সরিয়ে নিলেও মনে হলো,সেই চোখের ভেতরেই হয়তো তার কিছু একটা রেখে এসেছে,যা আর ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়।
মধু হাসল মৃদু গলায়,
“কি হয়েছে ভাইয়া?এমন করে তাকিয়ে আছেন কেন?”
ওয়াহিদ ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি টেনে বলল,
“তোর হাসিটা দেখেই হয়তো ভুলে গেছি,আমি কিসের জন্য এসেছিলাম।”
মধু বুঝতে না পেরে কপাল কুঁচকে বলল,
“কী বলছেন?”
ওয়াহিদ গ্লাস হাতে নিতে নিতে বলল,
“বিয়ে করব আমি।”
“করুণ না!মানা কে করেছে?”

কিশোরী কন্যা পর্ব ১৮

রান্নাঘরের বাতাসে তখন এলাচ-লেবুর গন্ধ মিশে আছে,আর তার সঙ্গে মিশে আছে ওয়াহিদের একদম নরম,নিরব মুগ্ধতা!
যেটা সে মুখে বলতে পারে না,কিন্তু মধু যদি একবার ভালো করে তাকায়,চোখের ভেতরেই পড়ে ফেলবে সেই গোপন ভালোবাসার প্রথম অক্ষর।মধু আঁচল ঠিক করে গ্লাস হাতে নিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ালে ওয়াহিদ গলা উঁচিয়ে বলে,
“মধুমিতা,তোমার খোঁপায় একটা কাঠগোলাপের কমতি আছে।আমি এনে দিলে খোঁপায় গাঁথবে তো?”
মধু চমকিত হয়ে পিছু ফিরল।ওয়াহিদ ট্রাউজারের পকেটে দু’হাত গুঁজে বুক টানটান করে দাঁড়াল।খানিকটু চোখ নাচিয়ে বলল,
“কাঠগোলাপ আমার বড্ড প্রিয়।প্রিয় ফুলখানা তোমার খোঁপায় বেশ মানাবে।”

কিশোরী কন্যা পর্ব ২০