কিশোরী কন্যা পর্ব ১৮
হামিদা আক্তার ইভা
পুতুল আজ ভীষণ রেগে আছে বাবার উপর।সে কিছুতেই বাবার ডাকের উত্তর দিলো না।তাহসিন বিছানার পাশে মেঝতে হাঁটু ভেঙে বসল।পুতুলের পায়ের কাছে বসে আদুরে গলায় বলল,
“আম্মা,কথা বলবেন না?বাবা কিন্তু কষ্ট পাচ্ছি।”
পুতুল গাল ফুলিয়ে দাদির মুখের দিকে ফিরল।ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“তোমার ছেলেকে চলে যেতে বলো।”
পাকা বুড়ির কথা শুনে অরুণিমা বেগম আশ্চর্য হলেন।তাহসিন হায়হায় করে বলল,
“এত রাগ?এতই রাগ?মা-বেটি মিলে আজ আমার সাথে এত রাগ দেখাচ্ছে?”
অরুণিমা বেগম হেসে ফেললেন।বললেন,
“ঠিকই তো আছে।সারাদিন ওদের বকো কেন?”
তাহসিন আকাশ থেকে পড়ল।বউয়ের সাথে জীবনে গলা তুলে কথা বলেছে বলে তার মনে পড়ছে না।আজকেই যা একটু খারাপ ব্যবহার করেছে সে।মায়ের কাছে মুখ ফুটে বেচারা বউয়ের কথা বলতে পারল না।কথা গিলে ফেলে মেয়ের কাছে ক্ষমা চাইল।পুতুল বাবার সঙ্গে যাবে না মানে যাবেই না।শেষে বেচারা হতাশ হয়ে নিজের ঘরে এলো।ঘরটা আজ পুরো ফাঁকা।বউ বাচ্চা কেউ নেই।দু’টোই ধড়িবাজ।মহিলা মানুষ বলে কথা।রাত কোনরকম পার হলো।ময়ূরী ভোর সকালে উঠে নামাজ শেষে আর ঘুমায়নি।দাদি শাশুড়ির কথায় আফিয়ার সাথে মিলে কাজ করেছে।আফিয়ার মুখটা আজ ভীষণ ভার।সে দরকার ছাড়া একটা কথাও বলছে না।ময়ূরীর কাজ শেষ হতে হতে বেশ সকাল হলো।এখন গোসল করা উচিত।সে ভাবল তাহসিন দরজা আঁটকে বোধহয় ঘুমিয়েছে।অথচ লোকটা দরজা চাপিয়ে বিছানায় খালি গায়ে উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে।সে মুখ বাঁকিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো।আলমারি খুলে দেখে দেখে গাঢ় সবুজ রঙের এক খানা শাড়ি বের করল।সে গোসল সেরে ভেজা কাপড় বারান্দায় মেলে দিয়ে আয়নার সামনে এসে মাথার তোয়ালে খুলে ফেলল।ভেজা চুল ঝাড়া দিতেই ঠান্ডা পানির ফোঁটা তাহসিনের চোখে মুখে ছিঁটিকে এলো।তাহসিন পিটপিট করে চোখ মেলে দেখল গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি গায়ে জড়িয়ে এক কিশোরী ভেজা চুল যত্ন করে মুছে যাচ্ছে।তার ঘুম ছুটে গেল এই দৃশ্য দেখে।ড্যাবড্যাব করে সামনে তাকিয়ে রইল সে।
তাহসিন শুকনো ঢোক গিলল।
গলার ভেতর যেন কেউ একটা তুলো গুঁজে রেখেছে।শব্দ বেরোতে চায়, কিন্তু পারছে না।ময়ূরীর চুলের ভেজা পানি গড়িয়ে পড়ছে গলার পাশে,নেমে যাচ্ছে ব্লাউজের গলা বেয়ে।সবুজ শাড়ির আঁচলটা হালকা ভেজা,জানালার রোদ এসে পড়েছে তার কাঁধে।
তাহসিন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল যেন।মাথার ভেতর কেমন টনটন করে উঠল।চোখ ফিরিয়ে নিতে চাইল,কিন্তু পারল না।
ময়ূরী তখনও নিজের চুল মুছছে,আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বে ব্যস্ত।কিন্তু হঠাৎই নজরে পড়ল পেছনের দিকে তাকিয়ে থাকা একজোড়া চোখ গভীর,স্থির, অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।ময়ূরী কিছু বলল না।চুপচাপ নিজের কাজ শেষ করে বড় করে মাথায় কাপড় দিলো।সে দরজার দিকে হাঁটা ধরলে তাহসিন তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে বউয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।ডান হাতের আঙুল ময়ূরীর কপালে চেপে ধরে দাঁত চেপে বলে,
“বড্ড সাহস বেড়েছে তোমার।কোন সাহসে কাল ভাবির ঘরে ঘুমিয়েছ?”
ময়ূরী দু’পা পিছিয়ে গেল।বলল,
“মন চেয়েছে তাই ঘুমিয়েছি।”
“ মন তো কত কিছুই চায়,তাই বলে কী সব কিছু করতে হবে?”
“আমার কাজ আছে,পথ ছাড়ুন।”
তাহসিন সরে দাঁড়াল।গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“যাও।চোখের সামনে আর আসবে না আমার।”
ময়ূরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে লোকটার দিকে তাকাল।একে তো অন্যায় করেছে এখন আবার রাগও দেখানো হচ্ছে।লোকটাকে কী করা উচিত?ময়ূরী ভেবে উঠতে পারল না।
গোডাউনের চারপাশ তখন অন্ধকারে তলিয়ে।কোনো ভাবে কী লোকজন আগেই টের পেয়ে গিয়েছিল,কেউ বা কারা আসছে?নওমান গম্ভীর হয়ে ওয়াহিদকে বলল,
“আপনি তাদের সাথে কথায় ব্যস্ত থাকবেন।আমি ঘুরে ঘুরে সব চেক করব।”
ওয়াহিদ বলল,
“ওসব আমি পারব না।যা কথা বলার আপনি বলুন না?”
নওমান বিরক্ত হলো।বলল,
“আপনার ঘটে কী আক্কেল নেই?আমি কিভাবে কথা বলব?”
ওয়াহিদ খানিক্ষণ চুপ থেকে ঠোঁট কামড়ে ধরল।সেই তো!উনি কী করে কথা বলবেন?সে বুক টান টান করে লম্বা শ্বাস টানল।তীক্ষ্ণ চোখে চারপাশে চোখ বুলিয়ে বলল,
“গতকাল এখানে ৩টা গাড়ি এসেছিল।খুব সম্ভবত ঢাকা থেকে ভোলু বড় বাজারের ওই বাজারে যাওয়ার পর সেখান থেকে মাল গুলো এখানে আসে।”
“আপনি বলতে চাইছেন ভাগে?”
“জি।ভাগেই কাজ’টা করা হচ্ছে।”
“কে কে হতে পারে?”
“মেম্বারকে কিছুতেই বাদ দেয়া যায় না।মেম্বারের সাথে আরও অনেকেই জড়িত।”
নওমান ঠোঁট কামড়ে কোমরে ব’ন্দুক গুঁজে গম্ভীর গলায় বলল,
“কাজ শুরু করুন।কোনো ভুল যেন না হয়।”
সতীপাড়ার দক্ষিণ নদীর পাড়ে একটা বড় গোডাউন আছে।এখানে ঝুটের মাল আনা-নেয়া হয়।আশেপাশে ছোট ছোট দোকান আর পাশে একটা ছোট মসজিদ।নওমান ওয়াহিদের সাথে ভেতরে ঢুকল দারোয়ানের সাথে কথা বলে।ওরা ভেতরে ঢুকে দেখল কিছু ঝুটের বস্তা গাড়িতে তোলা হচ্ছে।ওরা অফিসরুমে ঢুকল।সেখানে মহাজন বসে বসে টিভি দেখছিলেন।ওয়াহিদদের দেখে কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন,
“আপনারা কে?”
ওয়াহিদ বলল,
“আপনি আজাদ মিয়া?”
“জি।”
“কাল রাতে আমার সাথেই আপনার কথা হয়েছিল নতুন ডিল নিয়ে।”
আজাদ মিয়া ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন।চেয়ার টেনে তাদের বসতে দিলেন।তিনি পাশে বসে বললেন,
“আপনারা এত রাতে এলেন যে?কথা ছিল সকালে আসবেন।”
ওয়াহিদ বলল,
“একটু ব্যস্ত ছিলাম।কাজের কথায় আসি।আমি আগে আপনার মাল গুলো দেখতে চাচ্ছিলাম।এখান থেকে ঢাকা পাঠানো হবে এসব।”
আজাদ মিয়া আমতা আমতা করে বললেন,
“মালিক তো গোডাউনে নেই।উনি না আসলে আমি মাল দেখাব কী করে?”
“মাল দেখাতে উনাকে লাগবে কেন?”
লোকটা রাজী হচ্ছিল না প্রথমে।তারপর বলে কয়ে রাজী করানো হলো।নওমান অফিস রুম থেকে বেরিয়ে পুরো গোডাউনে চক্কর কাটল।বিশাল বড় জায়গা জুড়ে এই গোডাউন বানানো হয়েছে।সে কপাল কুঁচকে বাইরে গাড়িতে মাল নেয়া দেখছিল।ছোট একটা গাড়িতে দু’জন লোক ছোট ছোট বস্তা উঠিয়ে দিচ্ছে।নওমান খুব সাবধানে পুরো গোডাউন চেক করল।সন্দেহ করার মতো কিছুই পেল না।
নওমানের মুখের গাম্ভীর্য আরও ঘন হয়ে উঠল।
বাইরে থেকে দেখা ঝুটের বস্তাগুলো তার চোখে ঠিক ঝুটের মতো লাগছে না। বস্তার সেলাই,ওজন,এমনকি তুলতে থাকা লোকগুলোর আচরণ—সব কিছুতেই অদ্ভুত একটা গোপন ভাব। যেন কেউ কোনো নিষিদ্ধ জিনিস আড়াল করছে।
সে নিঃশব্দে ওয়াহিদের দিকে তাকাল।ওয়াহিদ একটু দূরে আজাদ মিয়ার সাথে কথা বলছে।নওমান ঠান্ডা গলায় বলল,
“আমি ভেতরটা আরেকবার দেখি।”
ওয়াহিদ মাথা নাড়ল।আজাদ মিয়া জোর করে হাসি ফুটিয়ে বললেন,
“দেখুন না,যা আছে সব সোজা-সাপটা।এখানে কোনো বেআইনি জিনিস নেই।ঝুটের ব্যবসা তো আপনারও করেন।”
নওমান গাড়ির কাছে একটা বস্তার কাছে গিয়ে থামল।তার তীক্ষ্ণ চোখ প্রতিটা সেলাই,প্রতিটা দাগ খুঁটিয়ে দেখছে।তারপর হঠাৎ একটার উপর আঙুল রাখল।সেখানে হালকা একটা চিহ্ন—লাল মার্কার দিয়ে টানা ছোট তির্যক দাগ।
সে নিচু হয়ে হাত দিয়ে বস্তা চাপল।ওজনটা ঝুটের চেয়ে অনেক ভারী।
চোখ সরু করে সে নিচু গলায় বলল,
“এই বস্তাটা খুলে দেখুন।”
আজাদ মিয়া তড়াক করে উঠলেন,
“না না,এগুলো কাল ঢাকায় যাবে।খুললে আবার সেলাই করতে সময় লাগবে।আপনারা মাল দেখতে এসেছেন ভেতরে গিয়ে দেখুন না?এখানে সময় নষ্ট করছেন কেন?”
নওমান কোনো কথা না বলে কোমর থেকে ব’ন্দুকটা টেনে হাতে রাখল।গলাটা ঠান্ডা,কিন্তু কণ্ঠে ইস্পাতের মতো দৃঢ়তা,
“খুলুন।”
ওয়াহিদ তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলো।গোডাউনে তখন দুজন শ্রমিকই ছিলেন।তারা থমকে দাঁড়াল।এক জন কাঁপা হাতে ছুরি এনে বস্তার মুখ কেটে দিলো।
এক চিলতে গন্ধ বেরিয়ে এলো।ঝুটের নয়,বরং কাঁচা পাউডারের মতো কিছু একটা।নওমান ঝুঁকে ভেতরটায় উঁকি দিলো।এক ঝটকায় চোখ কেমন বিস্ফারিত হয়ে গেল তার।
সাদা গুঁড়া ভর্তি ছোট ছোট প্যাকেট, চকচকে সিল করা।ওয়াহিদ বলল,
“এটা তো ড্রা’গস!”
নওমান ঠোঁট চেপে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“কোকেন।বিদেশি চালান।ঢাকা পাঠানোর আগে এখানে আড়াল করে রাখা হয়েছে।”
আজাদ মিয়ার মুখ শুকিয়ে গেল।কপালে ঘাম।সে তোতলাতে লাগল,
“আমি… আমি কিছু জানতাম না স্যার।আমি তো…”
“চুপ।”
নওমানের কণ্ঠ যেন বজ্রের মতো পড়ল।
“সব জানেন।এখন শুধু মুখ খোলার সাহসটা দেখান।”
তার হাতের বন্দুক নিচু হয়ে আজাদের বুকে ঠেকল।
“কে? কারা মেম্বারের পেছনে আছে? কে চালায় এই গোডাউন?”
আজাদ মিয়া বুঝতে পারলেন পরিস্থিতি কতটা গুরুতর।ব’ন্দুক বুকে জোরে ঠেসে ধরে বলল,
“তুমি যা জানো,সব বলো।একটা মিথ্যা বললে এই হাত তোমাকে মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে দু’বার ভাববে না।”
আজাদ মিয়া থরথর করে কেপে উঠলেন।
“স্যার,আমি শুধু এক মধ্যস্বত্বভোগী।উনারা..উনারা সরবরাহ দেয়,আমি শুধু পরিবহন আর জমা করি।আমি বড়দের নাম জানি না।”
নওমান হাত বাড়াল।ওয়াহিদ দু’ধাপ এগিয়ে এসে আজাদের দুই কাঁধ ধরে দাঁড় করাল।
“বড়দের নাম বলো।”
আজাদ মিয়ার মুখে ঘাম। গোডাউনের স্টোররুমের গরম বাতাসে হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো।
সে ভোঁকা কণ্ঠে বলল,
“মেম্বার,ওই মেম্বার‘ই নির্দেশ দেয়।আরেকটা নাম সাদ্দাম ভাই।”
নওমানের চোখে আগুন জ্বলল।সে চাচ্ছিল একেবারেই চুরমার করে ফেলে সত্য বের করাতে, কিন্তু প্রথমে উপায় সৎভাবে নিতে চাইল—তাই বুকে বন্দুক ঠেকিয়েও মেজাজ ঠান্ডা রাখলো।কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে ওয়াহিদকে বলল,
“আপনারা তিন’জন আজাদদের নিয়ে গাড়িতে বসান।ওকে থানায় নিয়ে গিয়ে বর্তমান পল্টন অফিসে রিপোর্ট করব না।আমি নিজে টেন্ডারটা নিয়ে বিচার করব।কিন্তু ও যদি পালায় বা মিথ্যা বলে..”
নওমান থেমে গেল,এক নিঃশ্বাস টেনে বলল,
“বুকে নয় সোজা মাথায় শু’ট করব।”
আজাদ মিয়া কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“প্লিজ… প্লিজ আমি বলছি সব সাদ্দাম ভাই, মেম্বার তারা রাজনীতির জায়গা থেকে এসব কন্ট্রোল করে।”
ইতিমধ্যে বাইরে দু’জন কর্মচারী পালানোর চেষ্টা করতেই ওয়াহিদ চট করে ধরে ফেলল।বাইরে আরও দুজন অফিসার ভেতরে ঢুকলেন।তাদের মধ্যে একজনের পকেটে ফোনটা চট করে ধরে নওমান বের করে আনে।ফোনটা ফ্লিপ করতেই স্ক্রিনে একটা নাম উঠেই আসে “সাদ্দাম খান (সভাপতি)কল রেকর্ড। নওমানের ঠোঁট বাঁকাল,
“ভালো,এটাই দরকার ছিল।”
হঠাৎ দূর থেকে একটা ভ্যান হর্ন মন্দভাবে গর্জে উঠল।বাইরে চার-পাঁচটি ছায়ামাখা মানুষ দ্রুত ভ্যান থেকে নেমে আসে।হাতে আছে তীক্ষ্ণ কাঠের লাঠি আর একটা ছোট পি’স্তল।তারা কারো সঙ্গে কথা না বলে সরাসরি অফিসরুমের দিকে ঝাঁপ দেয়।নওমান এক ঝটকায় ব’ন্দুক গুঁজে এগিয়ে গেল।
ঘোড়াগাড়ির মতো হঠাৎ পরিস্থিতি তীব্রতা নিল। নওমান বুঝল এই গোডাউনের পেছনে কেবল ছোট একটা চক্র নেই; বড় কোনো সুরেলা শক্তি আছে।রাজনীতি,সাথে সাধারণ মানুষের নামও জড়িত। সে জানত এখনই হাত সরালে সব উবে যাবে। তাই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল প্রাথমিক কাগজপত্র জব্দ করাও জরুরি।ওয়াহিদকে পাশে ডেকে বলল,
“আজাদ মিয়াদের কাছ থেকে ফোন আর লিস্ট নিন। যারা পালাতে চাইছে তাদের আঁটকে রাখুন।আমি বাইরে দেখছি।আর ভেতরে কেও আছে নাকি সেটাও দেখুন।”
ভোরের আলো ফুটেছে তখন।মাহতাব দু’দিন ধরে বাড়িতে নেই।আফিয়ার হাজার’টা প্রশ্নের উত্তর শুধু মাহতাবের কাছেই আছে।কী করে জানবে সে?আফিয়া অস্থির হয়ে কাল সারাদিন কাজ করেছে।আজ ভোর সকালে নামাজ শেষে বারান্দায় গিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েও থেকেছে।অপেক্ষা করেছে লোকটার জন্য।সে আসেনি,আসেনি!
হঠাৎ চোখে পড়ল তাহসিন এই সাতসকালে বাড়ি ফিরছে হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে।সে আতঙ্কিত হয়ে ঘর থেকে দৌঁড়ে বের হলো।তাহসিন সদর দরজার কাছে আসার আগেই আফিয়া দরজা খুলে দিলো।সে চিন্তিত হয়ে ডান হাতের বড় ব্যান্ডেজ দেখে বলল,
“কী হয়েছে তোমার?হাতে লাগল কী করে?”
তাহসিন শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে বাড়ির ভেতর পা রাখলো।ক্লান্ত শরীরটা সোফায় ছেড়ে দিয়ে বলল,
“একটু পানি খাব।”
আফিয়া শিগগির গিয়ে পানি নিয়ে এলো।তাহসিন পানি খেয়ে লম্বা শ্বাস টানল।আফিয়া পাশে এসে বসে মাথার কাপড় ঠিক করে চিন্তিত হয়ে বলল,
“বলো দেখি ভাই,কী আকাম করে এলে?হাতে লাগল কেমন করে?”
তাহসিনের শরীরে জ্বর জ্বর ভাব।ওর লাল চোখ দেখে সেটা অনুমান করতে পারল আফিয়া।হাত বাড়িয়ে কপালে স্পর্শ করে দেখল সত্যি শরীরটা ভীষণ গরম।তাহসিন বলল,
“তেমন কিছু হয়নি।”
সিঁড়ি বেয়ে তখন শান্তা নামছিল।ওদের এভাবে বসে থাকতে দেখে বলল,
“শেষে জামাই রেখে দেবরের পেছনে পড়লে নাকি বড় বউ?”
আফিয়া তড়াক করে সামনে তাকাল।তাহসিন চোখে কাঠিন্য এনে চুপ করে রইল।শান্তা এগিয়ে এলো।বলল,
“দেবরের ঘর ভাঙতে চাইছো নাকি বড় বউ?”
আফিয়া দাঁত চেপে বলল,
“মুখ সামলে কথা বলো।”
“কেন মুখ সামলে কথা বলব?দেবরজির ঘরে কী বউ নেই?সে থাকতে তোমার এত দরদ কেন?”
তাহসিন চোখ নামিয়ে শক্ত গলায় বলল,
“নেহাত আপনি আমার বড় ভাইয়ের বউ।নাহলে আমার থেকে খারাপ কেউ হতো না বিশ্বাস করুন?”
শান্তা তেতে উঠে গলা চওড়া করে বলল,
“তলে তলে তো ঠিকই আকাম করে বেড়াও দেবরজি।তখন তো কিছু হয় না,আর আমি বলেছি বলেই দোষ হয়ে গেল?”
তাহসিন এবার চোখ তুলে তাকাল।দাঁত চেপে বলল,
“আপনি কাকে নিয়ে কী বলছেন আদৌ জানেন?পাশে যাকে দেখছেন সে আমার বোনের মতো।এমন নোংরা কথা বলতে মুখে বাঝে না?”
আফিয়া শান্তাকে পাত্তা না দিয়ে বলল,
“ভাই,তুমি চিৎকার করো না।”
শান্তা মেজাজ দেখিয়ে বলল,
“লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে এখন নাটক করছো তোমরা?”
ময়ূরী নামাজ শেষে ঘরে পড়তে বসেছিল।বাইরে থেকে হালকা শব্দ পেয়ে সে ঘর থেকে বের হলো।সিঁড়ির মাথায় এসে তিনজনের কথা কাটাকাটি শুনে নিচে নেমে এলো।তাহসিনের হাতের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল মেয়েটা।তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে তাহসিনের হাত মুঠোয় নিয়ে বলল,
“কী হয়েছে আপনার?হাতে আঘাত পেলেন কী করে?”
তাহসিন কিছুই বলল না।চুপচাপ বসে রইল,ময়ূরীর হাতে ধরা ব্যান্ডেজ-পরা হাতটা কেমন ভার হয়ে আছে যেন।চোখে রক্তিম রেখা,মুখে গাম্ভীর্য।রাগে গলা শুকিয়ে গেছে,তবু সে একটা কথাও বলল না।
ময়ূরী নিচু গলায় বলল,
“আপনি রাগ করছেন?আমি তো চিন্তায়…”
তাহসিন হঠাৎ হাতটা টেনে নিল।চোখ তুলে তাকাল না।
“আমি ঠিক আছি।”
কণ্ঠটা ছিল ঠান্ডা,তবু ভেতরে কেমন ইস্পাতের কাঠিন্যতা লুকিয়ে ছিল।আফিয়া হালকা কাঁপা গলায় বলল,
“ভাই,তুমি এমন করছো কেন?”
তাহসিন এবার হালকা কাঁশি দিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিলো।ওর চোখে ছিল গভীর ক্লান্তি।পেছন থেকে শান্তার কণ্ঠ বাজল।কটাক্ষে ভরা,বিষ মেশানো শব্দ।
“জামাইকে যখন আঁচলে বেঁধেই রাখতে পারবে না, তখন বিয়ে করেছিলে কেন ময়ূরী?”
সবাই স্তব্ধ। কথাটা যেন ছুরি হয়ে বাতাস চিরে গেল।
ময়ূরীর মুখ কঠিন হলো।তাহসিন পা থামিয়ে ঘুরে দাঁড়াল।চোখ লালচে,গলাটা ভারি হয়ে উঠল।
“আপনি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন,ভাবি।”
শান্তা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আমি যা সত্য তাই বলছি।এ বাড়িতে এখন কে কাকে আঁচলে বাঁধছে সেটা তো চোখেই দেখা যায়!”
তাহসিনের মুঠি শক্ত হয়ে উঠল।আফিয়া তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বলল,
“ভাই,থামো! ওর কথায় কান দিও না।”
তাহসিন কিছু বলার আগে ময়ূরী শক্ত গলায় বলল,
“আপনি কী বলতে চাইছেন স্পষ্ট করে বলুন।”
শান্তা দাঁত চেপে বলল,
“জামাই কোথায় যায়,কী করে সেসবের খেয়াল রাখো?ঘরে শেয়ালের কাছে মুরগি দিয়ে রেখেছ কেন?”
“আমার স্বামী কোন শেয়ালের কাছে গিয়েছিল ভাবি?আপনার কাছে গিয়েছিল কী?আমার জানা মতে এই বাড়িতে আপনি ছাড়া আর কোনো শেয়াল থাকে না।”
শান্তা গলা উঁচিয়ে বলল,
“মুখ সামলে কথা বলো মেয়ে।”
“আপনি নিজের সীমায় থেকে কথা বলুন।কোন অধিকারে আজে-বাজে কথা রটাচ্ছেন?আমার থেকে আপনি ভালো চেনেন আমার স্বামীকে?গিয়েছিল কী আপনার কাছে?এবার’ই শেষ।আরেকবার এমন ধরনের মন্তব্য করলে আমি ভুলে যাব আপনি সম্পর্কে আমার জা হন।”
আফিয়ার ঠোঁট জুড়ে হাসি।ময়ূরী তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল তাহসিনের কাছে।তাহসিন আশ্চর্য হয়ে বউয়ের কথা শুনছিল।এই মেয়ে যে এত পাকা পাকা কথা বলতে পারে তার জানা ছিল না।ময়ূরী তাহসিনের হাত ধরে ঘরে এলো।দরজা চাপিয়ে দিয়ে তাহসিনকে বলল বিছানায় গিয়ে বসতে।তাহসিন তাই করল।ময়ূরী বলল,
“ছোট ভাবিকে কোত্থেকে তুলে এনে বিয়ে করেছিলেন আপনার ভাই?এত নোংরা মনের মানুষও হয়?”
তাহসিন চুপ করে রইল।ময়ূরী উত্তর না পেয়ে রাগ দেখিয়ে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“কথা না বললে আপনাকে বাড়ি ছাড়া করব আমি।অসভ্য লোক কথা বলছেন না কেন?কোথায় গিয়েছিলেন আপনি?ঘরে যে বউ আছে সে খেয়াল আছে আপনার?বাইরে যাওয়ার আগে একটাবার আমাকে বলে যাওয়া যায় না?”
তাহসিন হঠাৎ মৃদু স্বরে বলল,
কিশোরী কন্যা পর্ব ১৭
“কীসের বউ?আমার বউ আমাকে ত্যাজ্য করেছে।”
“তামাশা করছেন আমার সাথে?সাতসকালে কোত্থেকে ফিরেছেন আপনি?আর এই হাতে আঘাত’ই বা পেলেন কী করে?”
তাহসিন নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“অমন ডাইনির মতো চিৎকার করছো কেন?জামাই অসুস্থ,কই একটু সেবা যত্ন করবে—তা না করে আমার উপর রাগ ঝাড়ছ?”
“আমি ডাইনি?”
“হু!”
“আমি কী?”
“ডাইনি।”
