ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৫ (২)
মারিয়াম ফুল
আদালতকক্ষ মুহূর্তেই নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। তুষার শেখের জঘন্য স্বীকারোক্তি শুনে উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে রইল। কারও মুখে কোনো কথা নেই। এদিকে মেহেরের চোখ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়তে লাগল স্বস্তির অশ্রু। দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়ানো অপবাদ, অপমান আর মানসিক যন্ত্রণার ভার যেন এক মুহূর্তেই হালকা হয়ে গেল। সত্যের জয় অবশেষে তার নামের সঙ্গে লেগে থাকা সব কলঙ্ক মুছে দিল।
বিচারক মহোদয় অত্যন্ত গম্ভীর মুখে নথিপত্রগুলো ও রুদ্রর জমা দেওয়া মেটালিক পেনড্রাইভের আসল ফুটেজগুলো শেষবারের মতো পরীক্ষা করলেন। এজলাসের দেয়ালঘড়িটির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, রুদ্রর চাওয়া সেই ৩০ মিনিটের ঠিক ২৫ মিনিট পার হয়েছে। নিখুঁত সময়ের হিসাবে আসল অপরাধীর মুখোশ টেনে খুলে দিয়েছে ক্যাপ্টেন সাহেব।
বিচারক মহোদয় তাঁর হাতুড়িটি ডেস্কে পরপর তিনবার জোরালো শব্দে আঘাত করলেন। সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই মামলার চূড়ান্ত রায় পুরো এজলাসে প্রতিধ্বনিত হলো:
ধারা মোতাবেক রিনি শেখকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা এবং অপরাধ আড়াল করতে অন্য একজন নির্দোষ নাগরিককে ফাঁসানোর
“আদালতের কাছে সমস্ত তথ্য-প্রমাণ, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রকাশ্য আদালতে আসামি তুষার শেখের নিজ মুখে দেওয়া স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে এটা সম্পূর্ণ প্রমাণিত যে, রিনি শেখের আসল খুনি তাঁর স্বামী তুষার শেখ নিজে। এই আদালত দণ্ডবিধির ৩০২ দায়ে আসামি তুষার শেখকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করছে।”
বিচারক মহোদয় এবার এনায়েত হাশমীর দিকে তাকিয়ে কঠোর গলায় বললেন,
—— এবং অবৈধভাবে রিনি শেখকে হুমকি দেওয়া, ওনার ওপর চড়াও হওয়া এবং খুনের তথ্য গোপন করার অপরাধে সহ-আসামি প্রডিউসার এনায়েত হাশমীকে ৩ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হলো। একই সাথে, অবহেলা ও ভুল তদন্তের জন্য অফিসার তাবিশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
রায়ের শেষ পাতাটি উলটে বিচারক মহোদয় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মেহেরের দিকে তাকালেন। তাঁর কণ্ঠস্বর এবার অনেকটাই নরম শোনাল,
“যেহেতু মিসেস চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, তাই এই আদালত সাওয়াজ সায়েদ মেহেরকে সমস্ত কলঙ্ক ও খুনের দায় থেকে সসম্মানে খালাস ও সম্পূর্ণ মুক্তি ঘোষণা করছে। ওনাকে এখনই পুলিশি হেফাজত থেকে মুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হলো।”
হাতুড়ির শেষ শব্দটি এজলাসে প্রতিধ্বনিত হতেই মেহেরের বুকের ওপর চেপে থাকা অদৃশ্য ভারটা যেন ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগল। এতক্ষণ কাঠগড়ার লোহার রেলিং শক্ত করে ধরে থাকা তার আঙুলগুলো আলগা হয়ে এলো। অবশ হয়ে থাকা শরীরটায় যেন নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হলো। এক গভীর শ্বাস নিয়ে সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে সামনে তাকাল। তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে থামল সেই মানুষটার ওপর, যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার নির্দোষি প্রমাণের জন্য লড়ে গেছে।
যে মানুষটা গতকাল রাতেও নিজেকে নির্দ্বিধায় ‘নার্সিসিস্ট’ বলে পরিচয় দিয়েছিল, সেই মানুষটাই আজ নিজের ক্যারিয়ার, নিজের ফ্লাইট সবকিছু একপাশে সরিয়ে রেখে ওকে বাঁচানোর জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়েছে। বিষয়টা এখনো মেহেরের কাছে অবিশ্বাস্য লাগছিল।
অজান্তেই ওর ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল। তখন মেহেরের চোখের কোণ গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দুগুলো আর দুর্বলতার চিহ্ন ছিল না। বরং সেগুলো ছিল দীর্ঘ লড়াই শেষে জয়ী হওয়ার স্বস্তির অশ্রু, যেন বহুদিন পর ও স্বস্তি নিয়ে শ্বাস নিতে পারছে।
ঠিক তখনই এজলাসের পুলিশ যখন তুষার শেখের হাতে হাতকড়া পরাচ্ছিল, তখন তুষার রাগে ও চরম আক্রোশে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে হিংস্র গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “রুদ্র! তুই আজ জিতে গেলি ভাবছিস? জেল থেকে আমি যদি কোনোদিন বের হতে পারি, তোকে আমি দেখে নেব ”
রুদ্র ভ্রু নাচিয়ে বলল,
——আউচ! আমার ছেলেদের প্রতি কোনো ইন্টারেস্ট নেই। তাই তোর মনের বাসনা পূরণ করতে পারলাম না। তবে মন খারাপ করিস না, তোর এই অপূর্ণ বাসনা পূরণের জন্য আমি বিকল্প ব্যবস্থা করে দেব!
কথাটা বলেই রুদ্র ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে তুষার শেখের দিকে একচোখ টিপে দিল। রুদ্রর এই নির্লিপ্ত ভঙ্গি দেখে তুষার রাগে আরও ফুঁসতে লাগল। তার চোখমুখ লাল হয়ে উঠল, অথচ জবাব দেওয়ার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পেল না। তখনই পুলিশ তুষার আর এনায়েত হাশমীকে টেনে হিঁচড়ে আদালত কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে গেল।
পুরো এজলাসজুড়ে তখন যেন স্বস্তির এক নীরব আবহ ছড়িয়ে পড়েছে। মেঘলা দ্রুত পায়ে মেহেরের দিকে এগিয়ে এল তাকে বুকে জড়িয়ে ধরার জন্য। কিন্তু মেহের যেন কিছুই খেয়াল করল না। ওর দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই লম্বা, ইউনিফর্ম পরা মানুষটার ওপর।
রুদ্র অবশ্য সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। যেন এতক্ষণ আদালতে জীবন-মরণ লড়াই নয়, সামান্য একটা কাজই করেছে। ধীরস্থির ভঙ্গিতে সে নিজের ক্যাপটা মাথায় পরে নিল, তারপর ইউনিফর্মের হাতার ভাঁজটা ঠিক করে নিল। মুখে না ছিল কোনো গর্ব, না ছিল জয়ের উচ্ছ্বাস। যেন সত্যকে সামনে আনা ছাড়া সে বিশেষ কিছুই করেনি।
মেহের ধীরে ধীরে রুদ্ররের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিল। ওর পায়ের নিচে কাঠগড়ার ওই সংকীর্ণ কাঠের ঘেরাটোপটা এতক্ষণ যেন এক অদৃশ্য কারাগার হয়ে ছিল। সে ধীর পায়ে কাঠগড়ার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।
মেহেরের পা মাটিতে ছোঁয়াতেই মেঘলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও সমস্ত বাধা ভুলে প্রায় ছুটে এসে মেহেরকে দুহাতে শক্ত করে জাপটে ধরল। কত দিন, কত দীর্ঘ , যন্ত্রণাদায়ক সময় পর ও ওর এই বোনটাকে এভাবে নিজের বুকের মাঝে ফিরে পেয়েছে!
মেঘলা মেহেরের কাঁধে মুখ গুঁজে কাঁপা গলায় বলে উঠল, “মেহু… মেহু রে আমার! তুই ভালো আছিস তো, বোন?”
বোনের চেনা শরীরের সুবাস আর এই আকুলতা মেহেরের ভেতরের শক্ত পাথরটাকে এক পলকে গলিয়ে দিল। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এতক্ষণ ও নিজেকে যতটা ইস্পাতকঠিন আর অনুভূতিহীন করে রেখেছিল, এই চেনা স্পর্শের সামনে সে বাঁধ আর টিকল না।
মেহের মেঘলাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হালকা হেসে বলল,
“হুম… ভালো ছিলাম না বোধহয়। কিন্তু এখন আমি ঠিক আছি। একদম ঠিক। দেখ, আমি তোকে ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছি।”
মেঘলা ধীরে ধীরে মেহেরের থেকে একটু সরে দাঁড়াল। তারপর দুহাতে ওর মুখটা আগলে ধরে পরম মমতায় চোখের কোণে জমে থাকা জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
—— তুই সুখী হ, মেহু… খুব সুখী হ। আল্লাহর কাছে তোর সুখ ছাড়া আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। সত্যি বলছি, আজ তোকে এভাবে দেখে মনে হচ্ছে আমার সব দোয়া কবুল হয়ে গেছে।
বলতে বলতে মেঘলা একবার একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রর দিকে তাকাল। রুদ্র তখন মেহেরের থেকে বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর আবার মেঘলা মেহেরের দিকে তাকিয়ে বলল,
—— আর যাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছিস, ওনাকে কখনো নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিস না, আগলে রাখিস। যতটুকু বুঝলাম, এই মানুষটা যার পাশে থাকে, তাকে দুনিয়ার কোনো শক্তি হারাতে পারে না। জীবন সবাইকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেয় না রে মেহু, কিন্তু তোকে দিয়েছে। এবার অতীত আর অভিমান ভুলে নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নে।
বোনের কথা শুনে মেহেরের চোখের পাতা সামান্য কেঁপে উঠল। ও ধীর চোখে দূর দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রর দিকে তাকাল। কিন্তু রুদ্রের দিকে তাকাতেই দেখল রুদ্রে পুলিশ অফিসার তাবিশের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তারপর হঠাৎ অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তাবিশের শার্টের কলারটা টেনে সোজা করে দিতে দিতে এ ঠাণ্ডা স্বরে বলল, “তোর কপাল ভালো তাবিশ যে তুই আজ এই আদালতের চার দেয়ালের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছিস। তোর কী মনে হয়, আমি তোর ব্যাকগ্রাউন্ড জানি না?
অপজিশন পার্টির রওশন চৌধুরীর ছেলে তুই! ক্ষমতার লোভে বড্ড বেশি উড়েছিলি। মনে রাখিস, তোর বাবাকে একদিন আমার বাবা রাজনীতিতে ধুলো খাইয়েছিল, আর আজকে এই আইনি লড়াইয়ের ময়দানে আমি তোকে হারালাম।”
কথাটা বলেই রুদ্র তাবিশের কলার থেকে হাতটা সরিয়ে নেওয়ার আগে ওর চোখের দিকে তাকাল।
“নেক্সট টাইম যদি আমার ফ্যামিলি কিংবা মেহেরের দিকে হাত বাড়ানোর সাহস করিস, তবে সেই হাতটা শরীর থেকে আলাদা করে মিউজিয়ামে রাখার ব্যবস্থা আমি নিজে করব। চৌধুরী পরিবারের ক্ষমতা কতখানি, সেটা নিশ্চয়ই তোর বাবাকে নতুন করে জিজ্ঞেস করতে হবে না। গেট দ্যাট?”
তাবিশের কপালে তখন ঘাম চিকচিক করছে। অপমান, ক্ষোভ আর অদ্ভুত এক ভয়ের মিশ্র অনুভূতিতে তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সে তড়িঘড়ি করে নিজের কলার থেকে রুদ্রর হাতটা সরিয়ে নিল। তারপর আর কোনো কথা না বলে দ্রুত পায়ে আদালত কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
ঠিক তখনই হামজা চৌধুরী আবেগপ্রবণ হয়ে নিজের ছেলের দিকে এগিয়ে এলেন। চৌধুরী পরিবারের ওপর আসা এত বড় একটা ঝড় যেভাবে রুদ্র একাই সামাল দিল, তাতে উনার চোখেমুখে স্পষ্ট স্বস্তি আর গর্বের ছাপ ফুটে উঠেছে।
তিনি রুদ্রকে কাছে টেনে নিয়ে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সমাজের বুকে আজ ওনার সম্মান ধুলোয় মিশতে মিশতে বেঁচে গেছে। তিনি রুদ্রর পিঠ চাপড়ে বলেন ,
“মাই বয়! আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি… আমি প্রথম দিকে তুমাকে ভুল ভেবেছিলাম। যাই হোক, তুমি আজ নিজেকে একজন বেস্ট হাজব্যান্ড হিসেবে প্রমাণ করেছ। আই অ্যাম সো প্রাউড অফ ইউ, রুদ্র”
রুদ্র বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু জড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই ওর ক্ষুরধার চোখটা হঠাৎ গিয়ে পড়ল মেহেরের ওপর। ও দেখল, মেহের ঠায় দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে—যেন রুদ্রর এই দুই রূপের ভেতরের আসল মানুষটাকে পড়ার চেষ্টা করছে।
রুদ্র মেহেরের চাহনি দেখে নিজের একপাশের ভ্রু হালকা উঁচিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করল—‘কী হলো? এভাবে দেখছ কেন?’
মেহের আলতো করে মাথা নেড়ে চোখ সরিয়ে নিল, যেন বলতে চাইল—‘কিছু না’
এমন সময় আদালত কক্ষের অন্য কোণ থেকে সায়েদ কামিনী আর ইমরান সাহেব অপরাধবোধ আর মায়া মেশানো মুখ নিয়ে মেহেরের দিকে এগিয়ে এলেন। সায়েদ কামিনী যখন মেহেরকে জড়িয়ে ধরার জন্য দুই হাত বাড়ালেন, মেহের তড়িৎ গতিতে এক কদম পিছিয়ে গেল।
মেহের নিজের গর্ভধারিণী মায়ের দিকে না তাকিয়ে মেঘলার দিকে ঘুরে বলল, “মেঘ, ওনাদের এখান থেকে চলে যেতে বল। ওনাদের আমি আর এক মুহূর্তের জন্যও দেখতে চাই না।
“মেহেরের মুখে এমন কথা শুনে সায়েদ কামিনী অপমানিত বোধ করলেন। ওদিকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সায়েদ মির্জা মেহেরের কথা শুনে ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে শুরু করল।
মেহের আবার ওদের উদ্দেশ্যে বলে উঠল, “আমি তোমাদের ওই সায়েদ বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি অনেক দিন আগেই। হয়তো তোমরা ভুলে যাচ্ছ যে, স্বার্থের জন্য তোমরা যেদিন আমাকে বিক্রি করতে চেয়েছিলে, সেদিনই তোমরা আমার কাছে মরে গেছ! চলে যাও এখান থেকে। আজকে আমার পরিস্থিতির পেছনে কোথাও না কোথাও তোমরাই দায়ী।”
আদালতের করিডোরে দাঁড়িয়ে এই অপমান সহ্য করা সায়েদ কামিনী পক্ষে আর সম্ভব ছিল না। তিনি রাগ ও অপমানে কাঁপতে কাঁপতে নিজের ছেলের দিকে ইশারা করে বললেন, “চলো, এখানে আমাদের আর কোনো জায়গা নেই। ”
ওনারা চলে যাওয়ার জন্য যেই উদ্যত হলেন, মেঘলা আবার মেহেরকে শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরল। মেঘলা শেষবারের মতন মেহের কে বলল “মেঘ, যা বললাম একবার ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখিস, আসি আমি। ”
কথাটা বলতেই মেহেরের মুখটা কেমন যেন একটু বিষণ্ণ আর ক্লান্ত হয়ে গেল। মেঘলারা আদালত কক্ষ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর, মেহের সেই বিশাল ঘরে একাকীত্ব অনুভব করল। ও একটু ধাতস্থ হয়ে ধীর পায়ে হামজা চৌধুরী আর রুদ্রর কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
হামজা চৌধুরী স্নেহভরে মেহেরের মাথায় হাত রেখে মৃদু হেসে বললেন, “মেহের, গত কয়েকটা দিন কী ভীষণ কঠিন গেছে, সেটা ভাষায় বোঝানো যাবে না। আল্লাহর রহমতে আজ সব সত্য সামনে এসেছে। সব সময় হাসি খুশি থাকো মা। ”
তিনি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই একজন পুলিশ অফিসার ওনাদের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, “স্যার, আপনাকে একবার আমাদের সাথে সায়েনিং ডেস্কে আসতে হবে। বেল বন্ড আর রিলিজ অর্ডারের কিছু পেপারওয়ার্কের কাজ এখনো বাকি আছে।”
হামজা চৌধুরী কথাটি শুনে রুদ্রর দিকে তাকালেন। ওনার মুখে একটা আশ্বস্তকারী অভিভাবকসুলভ হাসি ফুটে উঠল। তিনি রুদ্রর কাঁধে হাত রেখে বললেন, “তাহলে রুদ্র, তুমি মেহেরকে নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে যাও । ও অনেক ক্লান্ত। আমি কাজ শেষ করে কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছি।”
—— “আমি… আমি ওকে নিয়ে যাব?”
হামজা চৌধুরী ছেলের এই আচমকা ইতস্তত ভাব আর জড়তা দেখে কিছুটা অবাক হলেন।
“কেন রুদ্র? কোনো সমস্যা? ”
রুদ্র দ্রুত নিজের ভেতরের অস্বস্তিটা সামলে নিল। ও বুঝতে পারল বাবার মনে কোনো সন্দেহ দানা বাঁধতে দেওয়া যাবে না। ও মুখে একটা স্বাভাবিক ও চওড়া হাসি ফুটিয়ে মাথা নাড়ল, “না, না বাবা… কোনো সমস্যা নেই। আমি জাস্ট বলছিলাম আরকি। ঠিক আছে, তুমি কাজ শেষ করে এসো”
হামজা চৌধুরি বিদায় নিয়ে চলে গেলেন, রুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেহের হঠাৎ বুঝতে পারল না রুদ্রকে কী বলবে।মেহের কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। রুদ্রকে কিছু একটা বলতে চেয়েও যেন ঠিক শব্দ খুঁজে পেল না। অস্বস্তি সামলাতে একবার এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে ধীরে গলায় বলে উঠল—
“ধন্যবাদ ভীষণ ছোট একটা শব্দ ক্যাপ্টেন সাহেব… এই একটি শব্দ বললে বড্ড কম হয়ে যাবে। আপনাকে যে কি বলে…”
মেহেরের কথা শেষ হওয়ার আগেই রুদ্র আলতো করে নিজের ডান হাতটা তুলে মেহেরকে মাঝপথেই থামিয়ে দিল। ও মেহেরের মুখের দিকে নিখুঁত দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে বলল, “তাহলে কিছু না বলে অন্য কিছু দাও ”
রুদ্রর এমন আচমকা আর অদ্ভুত জবাবে মেহের মুহূর্তেই পুরো থতমত খেয়ে গেল। মুখ ফিরিয়ে মৃদু হাসল। মেহের বলে উঠল,
” ৬৫% সম্পত্তি “?
মেহেরের সেই স্নিগ্ধ, শুভ্র হাসিটা রুদ্রর তীক্ষ্ণ চোখ এড়াল না। না চাইতে রুদ্রও নিজে হেসে ফেলল।তারপর দুজন হেঁটে গাড়ির কাছে গেল।
রুদ্র পকেট থেকে রিমোট চেপে গাড়ির লকটা আনলক করল। লকের সেই যান্ত্রিক শব্দে মেহেরের ঘোর কাটল। রুদ্র মেহেরের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “ম্যাম, প্লিজ… আমরা গাড়িতে গিয়ে কথা বলি? দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার পায়ে ব্যথা করছে ।”
রুদ্র মেহেরের জন্য গাড়ির সামনের দরজাটা খুলে ধরল। মেহের আর দ্বিধা না করে ধীর পায়ে গিয়ে সিটে বসল। গাড়িটা যখন এক তীব্র গতিতে স্টার্ট নিয়ে আদালতের চত্বর ছেড়ে মূল ব্যস্ত হাইওয়েতে এসে পড়ল, মেহের জানালার কাচটা আলতো করে কিছুটা নামিয়ে দিল। বাইরের মুক্ত বাতাস এসে ওর মুখে-চোখে আছড়ে পড়তেই ও চোখ বুজে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“মনে হচ্ছে কয়েকদিন পর খোলা বাতাস খাচ্ছি… এতদিন যেন একটা দমবন্ধ বন্দি জীবন কাটছিল।”
রুদ্র এক হাত দিয়ে দক্ষতার সাথে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ড্রাইভিং করতে করতে ওদিকের লুকিং গ্লাসে মেহেরের ক্লান্ত মুখটা অবলোকন করল। ও নিজের নিস্পৃহ ও নিস্পন্দ গলায় বলল,
“তারপর…?”
মেহের এবার রুদ্রর দিকে পুরোপুরি ঘুরে বসল। মনের ভেতরের জমাট বাঁধা তীব্র বিস্ময়টা আর চেপে রাখতে পারল না ও। উত্তেজিত গলায় বলল,
“আমি তো ভেবেছিলাম আপনি… আপনি চলে গেছেন ক্যাপ্টেন সাহেব।”
রুদ্র সামনের রাস্তার ট্রাফিকের সিগন্যাল দেখে নিপুণ হাতে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়িটা অন্য একটা নির্জন ও ফাঁকা রাস্তার দিকে ডাইভার্ট করল।
মেহের রুদ্ররের অদ্ভুত শান্ত এবং ভাবলেশহীন মুখাবয়ব দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারল না। ও একটু ইতস্তত করে, নিজের হিজাবের সাথে আঙুলে জড়াতে জড়াতে জিজ্ঞেস করল, “ক্যাপ্টেন সাহেব? যদি একটা প্রশ্ন করি…?”
রুদ্র তখনো নিখুঁত মনোযোগে সামনের পিচঢালা রাস্তার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছিল। ও শুধু সংক্ষেপে, বলল “হুম…।”
“আপনি উত্তর দেবেন তো? নাকি প্রশ্ন করার পর বলবেন যে আপনি আমার কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নন?”মেহেরের বলা কথাটা শুনে মনে হচ্ছিল, যেন কোনো ছোট্ট বাচ্চা অভিমান মিশিয়ে কথাটা বলছে।”
রুদ্র মেহেরের অনুসন্ধানী দৃষ্টি দেখেই চট করে বুঝে ফেলল ও আসলে মনে মনে ঠিক কোন জটটা ছাড়াতে চাইছে, কোন উত্তরটার জন্য ওর মন ছটফট করছে। ও গাড়ি চালাতে চালাতেই একবার মেহেরের চোখের দিকে চোখ মেলাল,
“তুমি এটা ভাবছ যে কীভাবে কী হলো, তাই না?
জিসান কীভাবে এলো, প্রমাণ কোথা থেকে এলো… রাইট?”
মেহের রুদ্রর দিকে তাকিয়ে ঠিক ছোট বাচ্চাদের মতো নিষ্পাপ ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে বলল, “হুম। বলুন না প্লিজ।”
“রুদ্রর ঠোঁটের কোণে আবার সেই বাঁকা হাসিটার রেখা ফুটে উঠল।
“মিসেস চৌধুরী… আগে একটা কথা স্পষ্ট করে বলে রাখি, তোমাকে সবার সামনে নিজের স্ত্রীর পরিচয় দেওয়ার কারণ হলো—আমি আমার ব্যক্তিগত জীবন সবার সামনে এনে মিডিয়া বা মানুষের সামনে তামাশা বানাতে চাই না। ইউ নো ভেরি ওয়েল, আই অ্যাম আ প্রাইভেট পারসন।”
মেহেরের বুকের ভেতরটা এই ‘মিসেস চৌধুরী’ সম্বোধনে কেপে উঠল।
“আমি কিছু মনে করিনি ক্যাপ্টেন সাহেব, আমি জানি আপনি আদালতে ওসব বলেছেন যাতে আমাকে সবার সামনে প্রশ্নবিদ্ধ না হতে হয়, তাই না? ”
রুদ্র আর কোনো পাল্টা যুক্তি দিল না।গাড়িটা ধীরে ধীরে শহরের কোলাহল ও জ্যাম পেরিয়ে কিছুটা দূরে একটা ফাঁকা, নির্জন পাহাড়ী রাস্তার দিকে এগিয়ে চলল। চারপাশে সবুজের ঘন সমারোহ, বড় বড় গাছপালা আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর পিচঢালা রাস্তাটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে ওপরের দিকে উঠে গেছে। মেহের জানালার বাইরে তাকিয়ে চারপাশটা দেখে কিছুটা বিভ্রান্ত হলো। ও রুদ্রকে জিজ্ঞেস করল, “আমরা না অ্যাপার্টমেন্টে যাব? তাহলে এখানে কেন? এটা তো শহরের রাস্তা নয় ।”
রুদ্র গাড়িটা একটা ছোট, কাঠের তৈরি ও নান্দনিক ডিজাইনের পাহাড়ী ক্যাফের সামনে কড়া ব্রেক কষে থামাল। টায়ারের ঘর্ষণে একটা শব্দ হলো। ও মেহেরের দিকে তাকিয়ে সিটবেল্টটা আলগা করতে করতে বলল,
“আগে আমাকে এক কাপ কফি খেতে দাও। তোমার এই আইনি আর জেলের চক্করে আমার সকালের কফি খাওয়াটা পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে।”
মেহের আর কিছু বলল না, শুধু বোবা চোখে মাথা নাড়াল। রুদ্র এবার নিজের তীক্ষ্ণ চোখের ইশারায় মেহেরকে জিজ্ঞেস করল ও কী খাবে—চা নাকি কফি? মেহের আলতো করে মাথা নেড়ে না করল, ওর এই মুহূর্তে বুকের ভেতর এত তোলপাড় আর উত্তেজনা চলছে যে কোনো কিছু গলায় ঢুকবে না।
রুদ্র জিন্সের পকেটে হাত দিয়ে ওয়ালেটটা বের করতে করতে বলল, “ওকে, তুমি এখানে গাড়ির এসি ছেড়ে বোসো। আমি আসছি।”
এই বলে রুদ্র গাড়ি থেকে নেমে সেই ছিমছাম পাহাড়ী ক্যাফেটার দিকে চলে গেল। মেহের গাড়ির ভেতরে বসে ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর ও যখন ফিরে এলো, ওর এক হাতে ছিল ধোঁয়া ওঠা কফির মগ আর অন্য হাতে একটা কাগজের কাপে চা ।
মেহের অবাক হয়ে রুদ্রর হাতের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি দুই কাপ খাবেন?”
“হুম।”
মেহের নাক-মুখ কুঁচকে বাইরের চড়া দুপুরের রোদের দিকে তাকিয়ে বলল, “এখন ভর দুপুরবেলা, আর আপনি এই অসময়ে একসাথে দু কাপ ক্যাফেইন খাচ্ছেন? শরীর খারাপ করবে তো।”
রুদ্র মেহেরের এই অযাচিত উদ্বেগের কোনো উত্তর দিল না। ও সোজা মেহেরের দিকের গাড়ির দরজাটা টেনে এক ঝটকায় খুলে বলল, “গাড়ি থেকে বের হয়ে এসো।”
মেহের কোনো প্রশ্ন না করেই ধীর পায়ে গাড়ি থেকে নেমে বাইরে এসে দাঁড়াল। পাহাড়ের ওপরের এই নির্জন জায়গাটাতে খুব সুন্দর, হালকা একটা ঠাণ্ডা বাতাস বইছিল, মেহের বুক ভরে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিল, মনে হলো বুক থেকে অনেক বছর ধরে চেপে থাকা একটা ভারী পাথর এক ঝটকায় নেমে গেছে। আকাশের এক কোণে কিছুটা কালো মেঘ জমেছে, রোদের তেজ কমে এসেছে, সব মিলিয়ে চারপাশের পরিবেশটা ভীষণ সুন্দর লাগছিল তার কাছে ।
রুদ্র হঠাৎ মেহেরের দিকে চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “এটা ধরো তো একটু।” কথাটা বলে নিচু হয়ে রুদ্র নিজের জুতোর ফিতা বাঁধতে লাগল।
মেহের কিছু না ভেবেই চায়ের কাপটা নিজের হাত দিয়ে নিল। ও ভাবল, রুদ্র হয়তো ওর জুতোর লেস বাঁধার জন্য সাময়িকভাবে কাপটা ওকে দিয়েছে, কাজ শেষ হলে আবার নিয়ে নেবে। কিন্তু রুদ্র সোজা হয়ে দাঁড়িয়েই মেহেরের দিকে তাকিয়ে একদম নির্লিপ্ত স্বরে বলল, “খাচ্ছ না কেন? এটা তোমার জন্য ছিল, আর এই কফিটা আমার।”
মেহের পুরো অবাক হয়ে বলে উঠল, “আরে! বললাম তো আমি কিছু খাব না! আমার খিদে বা তেষ্টা কিছুই নেই।”
রুদ্র নিজের ব্ল্যাক কফির মগে একটা দীর্ঘ চুমুক দিল। তারপর চোখ সরু করে বলল, “গাড়িতে বসে ঘুমে চোখ বুজে আসছিল তোমার, এটা খেয়ে নাও, কড়া লিকার চা খেলে ঘুম কেটে যাবে আর মাথাটাও হালকা হবে।”
মেহের রুদ্রর দিকে একদম হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইল।রুদ্র মেহেরের এই হাঁ করে বোকার মতো তাকিয়ে থাকাটা খেয়াল করল। ও কফির কাপটা ঠোঁট থেকে নামিয়ে বলল, “হাঁ হয়ে ওভাবে না তাকিয়ে ওটা চটপট খেয়ে নাও, তারপর নাহয় সময় করে মন ভরে তাকাবে। চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে ।”
রুদ্রের কথা শুনে মেহের লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল। নিজের লজ্জা লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টায় চায়ের কাপে আলতো করে চুমুক দিল।
রুদ্র দূর দিগন্তে বিস্তৃত সবুজ পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলতে শুরু করল।“আমি যেখানে নিয়মিত বক্সিং প্র্যাকটিস করতে যাই, সেখানে ওই জিসানও যেত। সেদিন আমি প্র্যাকটিস শেষ করে ফিরে আসার সময় জিসানকে দেখছিলাম ও জিমের এক কোণে দাঁড়িয়ে কারোর সাথে ফোনে কথা বলছিল। রিনি শেখের সাথে প্রডিউসারের একটা বড় ঝামেলা আর হাতাহাতি হয়েছিল শুটিং সেটে—এ তথ্যটাও ওখান থেকেই আমার কানে আসে। ব্যাস, সেখান থেকেই আমি দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে শুরু করলাম ”
মেহের চায়ের কাপটা শক্ত করে দু হাত দিয়ে ধরে চরম উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, “তার মানে… তার মানে আপনি সত্যি সত্যিই জিসানকে মেরেছেন? ওই রক্তারক্তি অবস্থা আপনি করেছেন?”
রুদ্র মেহেরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মৃদু হাসল।
“হুম, মারিনি… উদুম কেলানি দিয়েছি ওকে। হাড্ডিগোড় আলগা করে দিয়েছি।”
মেহের চোখ বড় বড় করে আতঙ্কের সুরে বলল, “তাই বলে এভাবে মারবেন আপনি ওকে?”
রুদ্র মেহেরের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে চরম কৌতুকের সুরে বলল, “হুম, এসেছেন আমার মাদার তেরেসা! যদি আমি ওকে কাল রাতে ওই কেলানিটা না দিতাম না, তাহলে ও আজ আদালতে বিচারকের সামনে এসে এভাবে তোতাপাখির মতো মুখ খুলত না।আর আপনাকে তখন ? এগারো বছর ধরে শ্বশুরবাড়িতে খুব আপ্যায়ন করা হতো?
রুদ্রর কথা বলার ভঙ্গিমা দেখে মেহের আর নিজের ভেতরের চেপে রাখা হাসিটা আটকে রাখতে পারল না। ও খিলখিল করে হেসে উঠল। মেহেরকে এভাবে এতদিন পর প্রাণখুলে হাসতে দেখে রুদ্রর চোখের ধারালো চাউনিটা এক পলকের জন্য নরম হয়ে উঠল , কিন্তু ও তক্ষুণাৎ নিজের চোখের পলক সরিয়ে নিল, নিজের ভেতরের নরম ভাবটা প্রকাশ করল না।
মেহের অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে তীব্র কৌতূহল নিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজ কীভাবে পেলেন? ওটা তো তুষার ভ্যানিশ করে দিয়েছিল।”
রুদ্র কফির শেষ চুমুকটা দিয়ে মগটা পাশে রেখে বলল, “চা খাওয়া শেষ?”
মেহের কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে চোখের পলক ফেলে বলল, “হুমমম? হ্যাঁ, শেষ।”
“তাহলে আর কথা না বাড়িয়ে সোজা গাড়িতে ওঠো।”
মেহের আর বাড়াবাড়ি বা পাল্টা প্রশ্ন না করে বাধ্য মেয়ের মতো চট করে গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসল। রুদ্র আবার দুর্দান্ত গতিতে গাড়ি স্টার্ট দিল। গাড়িটা আরও নির্জন, ফাঁকা এবং গভীর পাহাড়ী রাস্তার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। রুদ্র উইন্ডোস্ক্রিনের দিকে সোজা তাকিয়ে বলতে লাগল,
“আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে আমার একটা নিজস্ব পার্সোনাল হিডেন ক্যামেরা লাগানো ছিল। অ্যাপার্টমেন্টে তো আমার নিয়মিত থাকা হয় না, ফ্লাইটের চক্করে বাইরেই কাটে, তাই প্রায় মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল ওটার কথা। কিন্তু কাল রাতে হুট করে যখন আমি ছাদে যাই, তখন মনে হলো যে আমি কিছু একটা মিস করছি। তারপরই আমি মাঝরাতে ওটার ব্যাকআপ ফুটেজ ল্যাপটপে উদ্ধার করি। সেখানে তুষারের মুখ স্পষ্ট দেখা না গেলেও, আমি ক এনায়েত হাশমীকে স্পষ্ট দেখতে পাই।”
মেহের নিজের মনের ভেতরের জট ছাড়ানোর মতো করে বিড়বিড় করল, এনায়েত হাশমীর ব্যাপারটা তো বুঝলাম… কিন্তু তুষার শেখকে কীভাবে সন্দেহ করলেন?
“ভাইয়াকে দেখতাম, যখনই কোনো জটিল কেস বা মার্ডার মিস্ট্রি সামনে আসত, ও সেটার আদ্যোপান্ত সুতো ধরে ঘাঁটাঘাঁটি করত। আমিও কাল রাতে সেটাই করেছি।”
“মানে? ভাইয়ার মতো?” মেহের ওর সুগঠিত মুখাবয়বের পাশের রেখার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। এদিকে পাহাড়ের খাড়া ও বিপজ্জনক বাঁক পেরিয়ে গাড়িটা ধীরে ধীরে আরও ওপরে উঠছে।
রুদ্র জানালার বাইরে একপলক তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভাইয়া ইউএসএ-তে ল ইয়ার ছিল, তখন দেখতাম ও কীভাবে নিখুঁতভাবে থার্ড আই দিয়ে ইনভেস্টিগেশন করত। সেখান থেকেই কিছু নলেজ আর আইডিয়া আমি নিজের মাথায় গেঁথে নিয়েছিলাম। তুষার শেখ শুরু থেকেই আমার সন্দেহের তালিকায় এক নম্বরে ছিল। আমার এয়ারলাইন্স ব্যাকগ্রাউন্ড আর সোর্স ব্যবহার করে ওর ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল হিস্ট্রি আর ইমিগ্রেশনের ইনফরমেশন বের করা আমার জন্য খুব একটা কঠিন কিছু ছিল না। যখন দেখতে পেলাম ও ২৩ তারিখে গোপনে দেশে এসেছে, যেখানে মডেল রিনি শেখ মারা গেছে ২৬ তারিখে… আমার ভেতরের সন্দেহ তখন পুরোপুরি একশভাগ নিশ্চিত বিশ্বাসে রূপ নিল যে এই শিয়ালটাই আসল খুনি।”
মেহের রুদ্রর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা দেখে মনে মনে ভীষণ অবাক হচ্ছিল । ও আবার প্রশ্ন করল, “কিন্তু পুলিশ যে বলল অ্যাপার্টমেন্টের নিচের মেইন সিসিটিভি ফুটেজটা এডিট করে পুরো নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, সেটার কী করলেন?”
” বোকা নারী , ওটা আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের সিসিটিভি ফুটেজ ছিলই না। ওটা ছিল আমাদের সামনের ডমিনো বিল্ডিংয়ের সিকিউরিটি ক্যামেরা থেকে নেওয়া ।”
রুদ্রর এই দূরদর্শিতা, ঠাণ্ডা মাথার প্ল্যান আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি দেখে মেহের পুরো বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল “ক্যাপ্টেন সাহেব, আপনি কিন্তু সিআইডির অফিসার হতে পারতেন।”
মেহেরের কথা শুনে রুদ্র হুট করেই স্টিয়ারিং থেকে চোখ সরিয়ে ওর দিকে তাকাল। চোখে চোখ পড়তেই দুজনেই অজান্তে হেসে ফেলল।তারপর রুদ্র আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে সামনে তাকাল ….
কিছুক্ষণ পর রুদ্র হঠাৎ একটা বিশাল ফাঁকা পাহাড়ের চূড়ার মতো জায়গায় এসে গাড়িটার কড়া ব্রেক কষল। ও স্টিয়ারিংয়ের ওপর দুই হাত রেখে সোজা হয়ে বসে বলল, “হুম, ইচ্ছে তো ছিল… কিন্তু তার চেয়ে আকাশে ওড়ার, ইচ্ছেটা একটু বেশি ছিল। ইউ নো মি ভেরি ওয়েল মেহের, আমি জীবনে যা চাই, তা-ই করি। কেউ আমাকে আটকে রাখতে পারে না।” “সবই বুঝলাম, কিন্তু…কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর আপনি এখনো এড়িয়ে যাচ্ছেন, ক্যাপ্টেন সাহেব।”
রুদ্র ওর দিকে না তাকিয়েই সোজা সামনের কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ের দিকে চোখ রেখে বলল, “আমি তোমার জন্য নিজের ক্যারিয়ার রিস্কে ফেলে এত কিছু কেন করলাম, এটাই তো জানতে চাও?”
মেহের আলতো করে নিজের মাথা নাড়াল। “মেহের রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, প্লিজ, এটা বলবেন না যে……আপনি’ ৬৫ পার্সেন্ট সম্পত্তির জন্য করেছেন। এতদিনে আমি যতটুকু তোমাকে চিনেছি, টাকার জন্য আমি এমন করব না…”
“ তাহলে আপনি ভুল জানেন, মিস অ্যারোফোবিয়া ,আমি ওই ৬৫ পার্সেন্ট প্রপার্টির লোভেই এত কিছু করেছি। আমি লোভী মানুষ।”
মেহেরের কপালটা আবার কুঁচকে গেল। আসলেই কি তাই? কেন যেন এই বিষয়টা মেহেরের মন মানতে চাইছে না। “না, আমার মনে হচ্ছে আপনি মিথ্যা বলছেন। আপনি সত্যিটা বলুন, কারণটা কী?”
রুদ্র এবার সিট বেল্ট খুলে পুরোপুরি মেহেরের দিকে ঘুরে বসল। ওর চোখের মণি দুটো আবার সেই ধারালো, হিংস্র রূপ নিল ।
“স্টুপিড গার্ল! বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি বলছ তুমি আজকাল। তোমার প্রশ্ন করার সময় আর আমার ধৈর্যের সীমা দুটোই ফুরিয়ে এসেছে। ধরে নাও… এটাও আমার এক ধরণের ফ্যান্টাসি ছিল।”
মেহের রুদ্রর চোখের সেই কৃত্রিম কঠোরতা দেখে বুক ভাঙা অভিমানে মুখ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকাল। ও নিজের মনেই বিড়বিড় করে নিচু স্বরে বলল, “ফ্যান্টাসি… সবটাই আপনার কাছে একটা ফ্যান্টাসি ”
রুদ্র গাড়ি থেকে নামার জন্য নিজের দিকের দরজা খুলে মেহেরকে উদ্দেশ্য করে বলল, “এখানে পাঁচ মিনিট শান্ত হয়ে বোসো, আমি আসছি।” এই বলে ও গাড়ি থেকে নেমে আবার বাইরের সেই ঘন পাহাড়ী বনের ভেতরের দিকে চলে গেল।
মেহের গাড়ির সিটে নিজের মাথাটা পেছন দিকে হেলিয়ে দিয়ে ক্লান্তিতে চোখ দুটো বন্ধ করল। ও কিছুতেই নিজের মনকে বুঝিয়ে পায় না, কেন ও বারবার এই অদ্ভুত মানুষটাকে বুঝতে এত বড় ভুল করে ?
মেহের শান্ত হয়ে নিস্পন্দ বসে রইল বটে, কিন্তু ও জানতেও পারল না যে গত রাতে এই রুদ্রর মনের ভেতর দিয়ে ঠিক কী তীব্র ঝড় বয়ে গেছে।
গত রাতে যখন রুদ্র অ্যাপার্টমেন্টে ফিরেছিল, তখন মেহের আর হামজা চৌধুরীর মধ্যকার সব কথাই রুদ্র শুনতে পেয়েছিল …..বড়জোর জেল হবে বা ফাঁসি হবে —মেহেরের মুখের সেই অসহায় আত্মসমর্পণ, সেই চোখের জল রুদ্র কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। মেহেরের এমন পরিণতি দেখে রুদ্রের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছিল। বিষয়টা সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না।
মেহেরকে অ্যাপার্টমেন্টে রেখে রুদ্র কাল সারা রাত ছাদের ওপর গিয়ে একা কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসে বসে ছটফট করেছিল। ওর বিবেক কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না যে ও মেহেরকে এভাবে জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে পচে মরতে দেবে। মেহেরের যা হওয়ার হবে, তাতে ওর কী—এই যুক্তি দিয়ে ও নিজের অবাধ্য মনকে বারবার বোঝাতে চেয়েছিল, সিগারেট ফুঁকেছিল একের পর এক,কিন্তু ও নিজের ভেতরের সেই টানটাকে উপেক্ষা করতে পারেনি, ওর মাথায় তখন ভাইয়ের পুরোনো ইনভেস্টিগেশনের কৌশলগুলো একের পর এক ভেসে উঠছিল।
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৫
রাত ঠিক যখন দুটো বাজে, রুদ্রের নিজের ভেতরের অস্বস্তির কারণেই সে আর অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে পারছিল না। ও অ্যাপার্টমেন্ট থেকে দ্রুত নিচে নেমে নিজের গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সোজা জিসানের ফ্ল্যাটে হানা দিয়েছিল…
