Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৩১

খান সাহেব পর্ব ৩১

খান সাহেব পর্ব ৩১
সুমাইয়া জাহান

ডাইনিংটেবিলে আজ শুধু বাড়ির ছোটরা উপস্থিত। আনোয়ার সাহেব স্কুলে চলে গেছেন। রিসাত সাহেব কাল সন্ধ্যায় তার কাজে স্থানে ফিরে গেছেন। খুশি বেগম আর ইফতিয়াক সাহেব কোনো একটা কাজে তাদের নিজ বাড়িতে গেছেন। মিনা বেগম, হাসি বেগম আর শামীম সাহেব নিজেদের রুমেই আছেন। আজ সকালের নাস্তা সুমু আর মাইশা বানিয়েছিল। দুপুরের খাবারও ওরা দুজনে বানিয়েছে আজ। আনোয়ার সাহেব বাদে বাড়ির বড় বাকি সবাইকে আজ বসিয়ে খাইয়েছে ওরা দুজন। সকলে খেয়ে যার যার রুমে চলে গেছে। এখন শুধু ছোটোরা বাকি আছে। বাড়ির বাকি পুরুষরা এখন খেতে বসেছে। রাহিনদের সাথে নাজমিন, সামিয়া আর তিশাকেও খেতে বসানো হয়েছে। সুমু, মাইশা, রাইশা আর ইফতিয়া পরিবেশনের কাজ করছে। সামিয়া, তিশা আর রাইফ খাবারের প্লেট নিয়ে সোফায় গিয়ে বসেছে। রাইফ কার্টুন দেখবে আর ভাত খাবে। ওদের সাথে যোগদান করেছে রিসাত, নিহাল, অমিত আর আরবাজ। শেরাজ সুমুকে ছাড়া কিছুতেই খেতে বসতে চাইছিল না। সুমু অনেক বুঝিয়ে জোর করে বসিয়েছে। সে শেরাজকে খাবার পরিবেশন করছে। মাইশা বাকি সকলকে পরিবেশন করছে। ইফতিয়া আর রাইশা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে।

“আহহহহহহহহহহহহহ!”
হকচকিয়ে তাকাল সকলে। নাজমিন হিংস্র বাঘিনীর মতো লুক করে পাশে বসে থাকা আইয়ুবের দিকে তাকিয়ে আছে। আইয়ুব নিজের মতো খেয়েই চলেছে। সকলে যে ওদের দু’জনের দিকে তাকিয়ে আছে সেদিকে ওদের কোনো খেয়াল নেই। একজন খেয়ে যাচ্ছে, তো একজন বাঘিনী রুপ নিয়ে তাকিয়ে আছে। সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কিন্তু, শেরাজ কোনোদিকে না তাকিয়ে চুপচাপ খাচ্ছে। ভাবটা এমন যেন, সে আগে থেকেই জানে নাজমিনের চেঁচানোর কারণ।

“ওই, আপনি আমার প্লেট থেকে শশার স্লাইস চুরি করলেন কেনো?”
খাওয়া থামাল আইয়ুব। নাজমিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখো মেয়ে, একদম মিথ‍্যা অপবাদ দিবেনা। আমি চুরি করিনি। শুধু না বলে নিয়েছি।”
“ওহ আচ্ছা! তাই? তাহলে চুরিটা কাকে বলে শুনি?”
“আজব মেয়ে তো। আমি কীভাবে জানব? আমি কি চোর নাকি?”
“ঠিকই তো! আপনি চোর নাকি, যে আপনি জানবেন চুরি কাকে বলে। আপনি তো ডাকাত। দিনে দুপুরে ডাকাতি করছেন। চোররা গোপনে চুরি করে আর ডাকাতরা ওপেনে ডাকাতি করে।”
“এই, এই ছাম্মাক ছাল্লো! বলেছি না একদম মিথ‍্যা অপবাদ দেবেনা। শশার স্লাইস দু’টো এই প্লেট’টায় রাখা ছিল, তাই আমি নিয়েছি। কারণ শশার স্লাইসের ওপর কারো নাম লেখা ছিল না।”
“হ‍্যালো, মিস্টার বিদেশী সাদা বাদর! আমার নাম নাজমিন। আর স্লাইসের ওপর নাম লেখা ছিল না মানে? স্লাইস দু’টো আমার প্লেট’টে ছিল আপনি চোখে দেখেননি? নাকি খেতে বসলে নিজের চোখ দু’টোও খাবারের সাথে খেয়ে ফেলেন, তাই দেখতে পান না? চুপচাপ আমার শশার টুকরো দু’টো ফিরিয়ে দিন, নয়তো এই কাটাচামচ দেখেছেন? এই কাটাচামচ আপনার পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে আমার শশার টুকরো আমি বের করে আনব।”

“আরে, ব্রাউন গার্ল! এতো সাহস তোমার? থাক আপাতত কোনোকিছু ঢুকাঢুকির দরকার নাই। একটু ওয়েট করো, কাল সকালে আমি তোমার শশা তোমাকে ফিরিয়ে দিব।”
“কাল সকালে কেনো? এখন দিন।”
“আরে, এখন’তো চাইলেও ওইটা আসবে না।”
ভ্রু কুঁচকালো নাজমিন।
“কোনটা?”
“ওয়াশরুম।”
“ইয়াক!”
“আরে আরে শোনো তো, তুমি চাইলে আমি এখন বমি করে বা জোর করে ওয়াশরুম করে তোমার শশার স্লাইস দু’টো বের করে দিতে পারি। এখনো কিন্তু হজম হয়নি। শশার টুকরো দু’টো আগের মতো আছে। শুধু একটু কুঁচিকুঁচি হয়ে গেছে।”
নাজমিন হাত দিয়ে গন্ধ সরানোর ভাব করে বলল,

“ইয়াক, ছিঃ! নোংরা লোক একটা।”
আইয়ুব গলার স্বর নিচু করল। নাজমিনের দিকে একটু চেপে গিয়ে আস্তে করে বলল,
“নোংরা লোক? নোংরামির কি দেখলে, ব্রাউন গার্ল? এইটাকে নোংরামি বলে না। তুমি তো দেখছি একটা র্নিবোধ মেয়ে। নোংরামি কাকে বলে সেটাই জানো না।”
“আপনি কিন্তু…”
“আহ, নাজমিন! কি সমস‍্যা তোর? দু’টো শশার পিচইতো খেয়েছে। এইখানে আরও আছে। যতোগুলো লাগবে নিয়ে নে।”
কথাগুলো বলে সালাদের বাটিটা এগিয়ে দিল সুমু।
“কিন্তু, সুমু আপু…”
“আর কোনো কথা না। চুপচাপ খেয়েনে।”

কেউ আর কোনো কথা বলল না। চুপচাপ খেয়ে নিল সকলে। সকলের খাওয়া শেষ হতেই সুমু, মাইশা, রাইশা আর ইফতিয়া বসল খেতে। মাইশা সুমুর খাবার পরিবেশন করতে গেলে শেরাজ আটকালো তাকে। মাইশা ইফতিয়‍া আর রাইশার খাবার পরিবেশন করে সবকিছু শেরাজ কাছে এগিয়ে দিল। সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার খান সাহেবের দিকে। সুমুর সাথে সাথে সকলে তাকিয়ে আছে। আইয়ুব চোখ দু’টো ভালো করে কচলে আবারও তাকাল। শেরাজ ভাতের গামলা থেকে ভাত তুলে দিল। সে একে একে বাকি সব আইটেম গুলোর তুলে দিল সুমুর প্লেটে। তারপর সুমুর পাশের চেয়ারটায় বসে বলল,
“সবসময় কেনো বাড়ি বউদেরকেই বাড়ির পুরুষদের রান্না করে খাবার পরিবেশন করে খাওয়াতে হবে? কখনো কখনো বাড়ির পুরুষরাও তো বাড়ির বউদের রান্না করে, নিজ হাতে পরিবেশন করে খাওয়াতে পারে। তাই আজ, আমি আমার বউকে নিজ হাতে পারিবেশন করলাম। শুরু করো বউ।”
সুমু মুচকি হেসে খাবার মুখে তুললো। মাইশা সোফার ওপর বসে থাকা তার স্বামী নয়নের দিকে তাকাল। নয়নও মাইশার দিকে তাকিয়ে আছে। সে হয়তো জানে, তার বউ এখন তাকে ভালোবাসা শিখতে বলবে।

“কবে কিছু শিখবে বলো তো?”
“বউউউউউউউউউউ…”
“চুপ থাকো।”
আবারও খাওয়ায় মন দিল মাইশা। শেরাজ সুমুকে এতো প‍্যাম্পার করছে দেখে ইফতিয়া রাগে ফুঁসছে। রাইশা সবকিছু দেখেও না দেখার ভ‍ান করে মাথা নিচু করে খাচ্ছে। শেরাজ তরকারির বাটি থেকে সুমুকে মুরগির লেগ পিচ তুলে দিয়ে বলল,
“পাখির আদারের মতো কি খাচ্ছো, বউ? আরও কয়টা রাইস নাও।”
ইফতিয়া হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। মাইশা খাবার মুখে নিতে নিতে বলল,
“কিরে? তুই দাঁড়িয়ে পড়লি কেন? খেয়েনে।”
“আমি আর খাব না, মাইশা আপু। এখানে সকলের এতো ডং দেখে আমার এমনিতেই পেট ভরে গেছে। সেই সাথে রাতের খাবার খাওয়ার রুচিটাও মরে গেছে।”
ইফতিয়ার কথায় শেরাজ বাঁকা হাসল। ঘাড় কাত করে আইয়ুবের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আইয়ুব!”
“বল এস.কে!”
“আমার না দু’টো গান মনে পড়ছে।”
“কি গান?”
“ওয়েট গেয়ে শোনাচ্ছে।”
শেরাজ গলা ছেড়ে গান ধরল,
“বন্ধু যখন বউ লইয়া
আমার চোখের সামনে বইসা
হাসি মুখে তার বউকে খাবার তুইলা দে
ফাইট্টা যায়
ও বুকটা ফাইট্টা যায়”
আইয়ুব বাহবা দিয়ে বলল,
“আহ! ক‍্যায়া বাত, ক‍্যায়া বাত।”
অমিত উৎসাহ কন্ঠে বলল,
“আরেকটা? আরেকটা?”
শেরাজ একটু গলা খাঁকি দিয়ে আবারও গান ধরল,
“ধিন ধিনাক ধিন
পেয়ারকা ইয়ে সিন
জম জমাটি জমে হলো ক্ষীর
আরে জ্বলছে জ্বলুক
বিশ্ব মলুক
আমাদের প্রেম ফেটে চৌচির”
আইয়ুবরা সকলে একসাথে হাত তালি দিয়ে বলল,

“ক‍েয়া বাতহে এস.কে। কেয়া বাতহে।”
শেরাজ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে সকলে প্রশংসা গ্রহন করল। স‍্যান্ডি হাসতে হাসতে বলল,
“স‍্যার! আপনি টপ বিজনেসম‍্যান না হয়ে, ভালো সিংগার হতে পারতেন।”
সকলে স‍্যান্ডির কথায় সহমত পোষণ করল। ইফতিয়া আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। সে রাগে গজগজ করতে করতে ওপরে চলে গেল। ইফতিয়া চলে যেতেই রাইশা বাদে সকলে উচ্চস্বরে হেসে উঠল।

আজ সাহাবাজ সাহেব বাড়িতে ফিরেছেন। বিশেষ একটা কাজে তিনি কিছুদিনের জন‍্য বাহিরে গিয়েছিলেন। সোফার ওপর বসে চোখ বন্ধ করে মাথা হেলিয়ে বসে আছেন তিনি। অনন‍্যা খাতুন কড়া ব্ল‍্যাক কফি বানিয়ে স্বামীর পাশে বসলেন।
সাহাবাজ সাহেব কফির মগটা হাতে নিয়ে বললেন,
“শেহেজাদরা ফিরেছে?”
“না। ভাইরা কাল ফিরবেন। আফিয়া এতোদিন পরে বাপের বাড়িতে গেল, একটু থাকুক। কতোদিন পর মা-বাবার কাছে গেছে মেয়েটা। এতো তাড়াতাড়ি কি শশুর বাড়ি ফিরতে মন চায় বলো?”
“আর, ইশিতা মামনি! ইশিতা মামনি কোথায়?”
“ইশিতা ওর রুমে আছে। মেয়েটার সদ‍্য বিয়ে হয়েছে। আরবাজ কি করল, বিডি’তে চলে গেল। এই বাড়ির তিনটা ছিলেই বিডি’তে গিয়ে বসে আছে। কবে ফিরবে তার কোনো ঠিক নেই।”
“শাহরুখ আর রিয়াজ কোথায়?”
“শাহরুখ একাডেমিতে গেছে। ওতো সারাদিন থাকে ক্রিকেট নিয়ে। আর রিয়াজ রুমে ঘুমাচ্ছে। আমার ফিরোজা মামনিটাও ওদের বাড়িতে গেছে কিছুদিনের জন‍্য। আমার ভরা সংসারটা ফাঁকা হয়ে আছে।”

“আহ্ বেগম! এভাবে বলছো কেনো? সকলে তো আর সারাজীবনের জন‍্য চলে যায়নি। সকলেই আবারও ফিরে আসবে। তোমার ভরা সংসার আবারও ভরে উঠবে। আর তোমার বড় ছেলেও আর কিছুদিন পরে ফিরে আসছে। তখন সবকিছু আবার আগের মতোই হয়ে যাবে।”
“কবে ফিরবে আমার শেরাজ?”
“আট, নয় দিন পর।”
“তোমাকে ফোন করেছিল?”
“হুম!”
“শুনো!”
সাহাবাজ সাহেব প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন অনন‍্যা খাতুনের দিকে।
“তোমাকে আমি কিছু বলতে চাই। দয়া করে রিয়াক্ট না করে, আমার কথাগুলো আগে শুনবে।”
“বলো!”
“আমি শেরাজের বিয়ে দিতে চাই। দয়া করে এইবার আর তুমি না করো না। রোজা শেরাজকে অনেক পছন্দ করে। শেরাজ ফিরলে আমি সবটা ওকে বুঝিয়ে বলব। তুমি দয়া করে সম্মতি দাও।
“রোজা তোমার ছেলেকে পছন্দ করে। তোমার ছেলে কি রোজাকে পছন্দ করে?”
“তুমি তো জানো আমাদের ছেলে কেমন। ও এসব ব‍্যাপারে কথা বলতে খুব একটা পছন্দ করেনা। রোজাকে ওর পছন্দ হলেও জীবনেও আমাদের সামনে মুখ ফুটে বলবে না।”
“বেগম! আমি এখন এইসব ব‍্যাপার নিয়ে কথা বলতে চাইনা। বাহির থেকে এসেছি। অনেক ক্লান্ত আমি। শাওয়ার নিয়ে আসছি। তুমি খাবার আনো আমার জন‍্য।”
কথাগুলো বলে রুমে চলে গেলেন সাহাবাজ সাহেব। অনন‍্যা খাতুন কিছুক্ষণ স্বামীর যাবার পানে তাকিয়ে থেকে চলে গেলেন কিচেনের দিকে।

ড্রয়িংরুমে সকলে চা কফির আড্ডা জমিয়েছে। গরম চায়ের কাপ দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে আপন মনে মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসের সাথে। মিনা বেগম পাকোড়া বানিয়ে এনে সেন্টার টেবিলের ওপর রাখলেন। পাকোড়ার প্লেট রাখতেই গরম গরম পাকোড়া সকলে হাতে তুলে নিল, তবে সকলে চুপচাপ। কারো মুখে কোনো কথা নেই। শেরাজ হাতে চায়ের কাপ নিয়ে মাথা নিচু করে আনোয়ার সাহেবের কথা শোনার অপেক্ষায় আছে। আনোয়ার সাহেব গম্ভীর মুখ করে অল্প অল্প চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন। সুমু মাইশার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সকলেই আনোয়ার সাহেবের কথা শোনার অপেক্ষায়। সকলের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আনোয়ার সাহেব শেরাজের উদ্দেশ্যে মুখ খুললেন,
“তোমরা ফিরছো কবে?”
শেরাজ ভদ্রতারস্বরে বলল,
“সুমুর ভিসা হয়েছে এসেছে। আর কিছুদিনের মধ্যেই পেয়ে যাব। বলতে পারেন আর আট, নয়দিন মতো আছি আমরা।”
আনোয়ার সাহেব মুখটা গম্ভীর রেখেই হালকা মাথা ঝাকিয়ে আবারও বললেন,

“তোমার পরিবারের কেউ এখনো তোমাদের বিয়ের কথাটা জানেনা। তোমার কি মনে হয়না, তোমরা ওমানে ফিরে যাবার আগেই তোমার পরিবারকে এই খবরটা জানানো উচিত?”
“এই ব‍্যাপারে আমার আপাতত কিছুই মনে হয়না। আমি আগেই বলেছি আঙ্কেল! এই ব‍্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দিন। আমি যখন ঠিক করেছি, এই বিয়ের ব‍্যাপারটা আমি ওমানে ফিরে গিয়েই আমার পরিবারকে জানাব। তখন তাই হবে। যা ফেস করার একবারে সামনাসামনি একদিনেই হবে।”
“কাল তুমি হসপিটালে যাচ্ছো তো মাথার সেলাই কাটতে?”
“জি!
“আচ্ছা! তাহলে আর আট, নয়দিন পরেই ফিরে যাচ্ছো?”
“জি, আঙ্কেল! আমার বিজনেসের অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। কোম্পানির সব প্রোডাক্ট রেডি হয়ে গেছে। আমি ফিরে না যাওয়া পযর্ন্ত প্রোডাক্টগুলো মার্কেটে ছাড়া সম্ভবনা।”
হাসি বেগম মুখে শাড়ির আঁচল গুঁজে হু হু করে কেঁদে উঠলেন। সুমুর মনটাও হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। চোখ ভিজে উঠল নোনা পানিতে। মাইশা গিয়ে হাসি বেগমকে ধরে সান্ত্বনা দিতে দিতে ঘরে নিয়ে গেলেন।
শামীম সাহেব বললেন,

“ভাইজান আমার একটা কথা বলার ছিল।”
“হুম, শামীম বলো।”
“আসলে ভাইজান অনেকদিন হলো এখানে রইলাম। এইবার আমরা আমাদের বাড়িতে ফিরতে চাই। মেয়ে জামাই তো আর কিছুদিন পরে চলে যাবে। আমার নিজেরও তো কিছু আত্মীয়স্বজন আছে। ওখানে আমি একটা ছোট্ট অনুষ্ঠানের ব‍্যবস্থা করতে চাই। তাই আমি ভাবছি পরশু আমরা ফিরে যাব, সাথে আপনারাও যাবেন।”
“আমি তোমার কথা বুঝতে পেরেছি, শামীম। কিন্তু, আমার হয়তো যাওয়া হবেনা। কারন, তুমি তো জানোই আমার স্কুল আছে। এখন আর ছুটি নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। আর তাছাড়া মায়ের শরীরটাও ভালো নেই। সারাদিন রুমের মধ্যেই পড়ে থাকে। মা তো আর এতোদূর জার্নি করে যেতে পারবে না। মাকে বাসায় একা রেখে আমার আর মিনার যাওয়া সম্ভবনা। মিনা যেতে পারতো, তবে আমি স্কুলে চলে গেলে মা তো বাসায় একা হয়ে যাবেন। তার থেকে বরং বাচ্চার সকলে যাক। ওদের সাথে খুশি আর ইফতিয়াক যাক।”
ইফতিয়াক সাহেব বললেন,

“আমারও যাওয়া হবেনা, ভাইজান। আপনি তো জানেন, কিছুদিন আগেই ব‍্যবসায় অনেক টাকা ইনভেস্ট করেছি। এখন কীভাবে যাই বলুন?”
খুশি বেগম স্বামীর সাথে সাথে তাল মিলিয়ে বললেন,
“হ‍্যাঁ, ভাইজান! আর উনি না গেলে আমি কীভাবে যাই বলুন?”
শামীম সাহেব আর কিছু বললেন না। আনোয়ার সাহেব বললেন,
“ঠিক আছে! তাহলে ছোটরা সকলে যাক।”
শামীম সাহেব মাথা দোলালেন। কিছুটা সময় নিয়ে আবারও বললেন,
“ঠিক আছে, ভাইজান। তাহলে পরশুদিন সকালেই বেরিয়ে পরব।”
আনোয়ার সাহেব সম্মতি জানালেন। সুমু মন খারাপ করে চুপচাপ রুমে চলে গেল। শেরাজ সুমুর যাওয়ার পানে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

পাতালপুরীর লাক্সারিয়াস হাউজের সেই অন্ধকার রুমটায় আজ আবার জায়গা হয়েছে একজন মানুষের। তবে আজ এক কোনো ছেলে নয়। একটা মেয়েকে হাত-পা চেয়ারের সাথে বেঁধে বসিয়ে রাখা হয়েছে। মেয়েটার পরনে ওয়েস্টার্ন ড্রেস। রোজকারের মতো আজও সেই আগন্তক এসে তার নির্ধারিত চেয়ারটায় বসল। পেছন পেছন এসো লোকটির দু’পাশে দুজন পালোয়ানের মতো লোক দাঁড়াল।
“রুদ্র!”
“ইয়েস বস।”
“এই মেয়ে নামক অসভ‍্য, ব্লাডি বিচ লেডিসটির মরণ ঘুম ভাঙাও।”

রুদ্র এক বালতি টগবগে গরম পানি এনে মেয়েটির মুখে ঢেলে দিল। মুহুর্তেই মেয়েটির জ্ঞান ফিরল। শরীরে জ্বালা অনুভব করতেই গনগন ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল মেয়েটি। চেয়ারে বসে থাকা পুরুষটি বিরক্তিরসূর তুলে বলল,
“আহ! পাপা কা পারি। এভাবে চেঁচায় না বেবি। বড্ড কানে লাগে। আমি আবার বেশি জোরে সাউন্ড সহ‍্য করতে পারিনা।”
মেয়েটা আরও জোরে চেঁচিয়ে বলল,
“কে তুই? আমাকে এভাবে বেঁধে রেখেছিস কেনো?”
“আহ! বললাম না চেঁচায় না। এই রুদ্র! বেবির মুখটা আটকে দাও তো।”
রুদ্র গিয়ে মেয়েটার মুখ বেঁধে দিল। চেয়ারের বসে থাকা আগন্তক আবারও বলল,
“ওর হাত এবং পায়ের প্রতিটা নখ তুলে নাও।”
ছেলেটি গিয়ে মেয়েটির হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মেয়েটির হাত এবং পায়ের সবগুলো নখ তুলে নিল। মুখ বেঁধে রাখার ফলে মেয়েটির গোঙানির শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা গেল না। চেয়ারের বসে থাকা আগন্তক শরীর দুলিয়ে হাসল। হঠাৎ হাসি থামিয়ে বলল,

“আমি জানি বেবি, তুমি এখন জানতে চাইছো আমি কে? আর কেনো তোমাকে এখানে বেঁধে রেখে এইভাবে টর্চার করছি। আচ্ছা, চলো! আমি তোমাকে তোমার মনের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেই।”
কথাগুলো বলে উঠে দাঁড়াল লোকটি। হাসতে হাসতে মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মেয়েটি তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে দেখে চোখ বড় করে ফেললো যেন তার সামনে এমন কাউকে দেখবে সে আশায় করেনি সে। লোকটি আবারও হাসল। মেয়েটার একহাত খুলে কাছে টেনে নিল। পকেট থেকে নতুন ব্লেড বের করে মেয়েটির তর্জনী আঙুলের আগা থেকে পাতলা পাতলা করে পিচ করতে লাগল। মেয়েটি গলা কাটা মুরগির মতো ছটফট করতে লাগল। লোকটি একে একে মেয়েটির সবগুলো আঙুল পিচ পিচ করে কেটে করুণস্বরে বলল,
“ব‍্যথা লাগে, বেবি?”
মেয়েটি অসহায় চোখে লোকটির দিকে তাকাল। লোকটি হেসে আবারও বলল,

“এখন তোমার ব‍্যথা লাগছে, বেবি? তাহলে রোজ রাতে মদ খেয়ে যখন নতুন নতুন ছেলের সাথে রুম ডেট করো, তখন ব‍্যথা লাগেনা? উফস সরি! এগুলো তো তোমার সয়ে গেছে, তাই এখন আর ব‍্যথা লাগেনা। তুমি কোনো চিন্তা করোনা। এগুলোও তোমার সয়ে যাবে। তার প্রমাণ দেখবে? দাঁড়াও দেখাচ্ছি।”
কথাগুলো বলে লোকটি মেয়েটা অন‍্য হাতের আঙুলগুলো পিচ পিচ করে কেটে দিয়ে লবণ আর মরিচের গুড়ো মাখিয়ে দিল। সে রুদ্র নামক ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওর শরীরের প্রতিটা ভাঁজে ভাঁজে ব্লেড দিয়ে স্কেচ করে মরিচের গুড়ো আর লবণ মাখিয়ে দিবে। ওর শরীরে প্রচুর চুলকানি। ওর সব চুলকানি মিটিয়ে ছাড়বে আজ।”
কথাগুলো বলে লোকটি চলে যেতে নিয়ে আবারও ফিরে এল। মেয়েটির কাছে গিয়ে বলল,
“তুমি যেইভাবে পুরুষ দিয়ে শরীরের চুলকানি মেটাও, আমিও আজ সেইভাবেই মেটাবো, তবে পদ্ধতিটা উল্টো। আসলে কি জানো তো, আমার এই দুই পালোয়ানের একটা ক্লাস আছে। অন‍্যের এঁটো জিনিসে মুখ দেয়না ওরা। তাই আমাকে তোমার শরীরের চুলকানি কমানো জন‍্য অন‍্য পদ্ধতি ব‍্যবহার করতে হলো। তোমাদের মতো ওভার লোড চুলকানি মার্কা মেয়েদের ওভার লোড চুলকানি এভাবেই মেটাতে হয়।”
কথাগুলো বলে চলে গেল লোকটি। তার পালোয়ান দু’টো তার কথামতো কাজ করতে শুরু করল।

পুরো সিকদার বাড়ি অন্ধকারে তলিয়ে আছে। সকলে ঘুমের রাজ‍্যে পাড়ি জমিয়েছে। সুমু পাশ ফিরে শুতেই বিছানা খালি পেল। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল, তার খান সাহেব রুমে নেই। শোয়া থেকে উঠল না সুমু। কিছু একটা ভেবে আবারও পাশ ফিরে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। মিনিট পাঁচেক বাদে রুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। সুমু ওভাবেই শুয়ে রইল। শেরাজ রুমের দরজা লাগিয়ে বেডে এসে সুমুকে জড়িয়ে শুয়ে পড়ল। সুমু চোখ বন্ধ রাখা অবস্থায় বলল,
“কোথায় গিয়েছিলেন খান সাহেব?”
শেরাজ তাকাল। সুমু পাশ ফিরে শুয়ে বলল,
“বলুন!”
শেরাজ আলতো হাসলো। সে উঠে বসল। একহাত সুমুর দিকে বাড়িয়ে দিল। সুমু তার হাত ধরে উঠে বসল। শেরাজ মুচকি হেসে বলল,

খান সাহেব পর্ব ৩০

“দেখবে চলো।”
সুমু শেরাজের সাথে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। দুজনেই ধীরে ছাদের দিকে গেল। সুমু ছাদে পা রাখতেই দেখল, সকলে ছাদে উপস্থিত। সুমু আলতো হেসে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ চোখ দিয়ে সামনে যাবার জন‍্য ইশারা করল তাকে। সুমুর মন খারাপ হলেও, সে জোরপূর্বক হেসে সকলের সাথে আড্ডায় জয়েন করল।

খান সাহেব পর্ব ৩১ (২)