খান সাহেব পর্ব ৩৬
সুমাইয়া জাহান
ঝড় আসার পূর্ব মুহুর্তে প্রকৃতি যেমন থমকে যায়। আজ এই রাতের শেষ প্রহরে খান ম্যানশনের পরিবেশ ঠিক তেমন ভাবেই থমকে গেছে, যেন কিছুক্ষণ পরেই ঝড় উঠবে। পরিবেশটা আপাতত থমথমে হয়ে আছে।
শেরাজ সুমুর হাত ধরে খান ম্যানশনের সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির ভেতরের প্রতিটা মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। শেরাজের মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। অনন্যা খাতুন ছেলের কাছে এসে প্রশ্ন করলেন।
“এই মেয়েটা কে?”
শেরাজ সোজাসুজি জবাব দিল,
“মিসেস শেরাজ খান, তোমার আদরের বড় ছেলের বউ।”
ভ্রু কুঁচকালেন অনন্যা খাতুন।
“বউ মানে? তুমি কি পাগল হয়ে গেছ, বেটা? এই মেয়েটা তোমার বউ কি করে হয়?”
“যেভাবে বাকি সব ছেলেদের হয়। বিয়ে করে।”
“কবে বিয়ে করেছ, তুমি?”
“এখন রাত বারোটা পার হয়ে গেছে। তার মানে আজ থেকে একুশ দিন আগে।”
“এই বিয়ে আমি মানিনা, শেরাজ। এই মেয়েটাকে যেখান থেকে এনেছো, সেখান রেখে আসার ব্যবস্থা করো।”
“সরি মম! তোমার মানা না মানাতে আমার কিছু যায় আসেনা।”
এমন সময় রোজা দৌড়ে এল অনন্যা খাতুনের কাছে। অনন্যা খাতুনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলল,
“তোমার ছেলে এইসব কি বলছে, ফুফুমনি? ও বিয়ে করেছে মানে? এই গাঁয়িয়া, আনকালচার, আনস্মার্ট মেয়েটা তোমার ছেলের বউ কীভাবে হয়? এস.কে’তো আমার ফুফুমনি।”
শেরাজ বিরক্ত হয়ে রোজাকে এক ধমক মেরে সাহাবাজ খানের উদ্দেশ্যে বলল,
“ড্যাড! তোমার না বলেছিলাম, আমি কোনো ঝামেলাকে চোখের সামনে দেখতে চাইনা।”
অনন্যা খাতুন স্বামীর দিকে তাকালেন। সাহাবাজ সাহেব একবার বউয়ের দিকে, তো একবার ছেলের দিকে তাকালেন। যে ছেলের জন্য এতোকিছু করলেন, সেই ছেলেই এখন তাকে বিপাকে ফেলে দিল। অনন্যা খাতুন রোজাকে ছেড়ে সাহাবাজ সাহেবের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। স্বামীর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
“আপনি এই সবকিছু জানতেন?”
রোজা মেঝের ওপর বসে কাঁদতে লাগল। সুমুর খুব খারাপ লাগল। সে হাত দিয়ে রোজাকে তুলতে যেতেই শেরাজ আটকালো সুমুকে।
সাহাবাজ সাহেব চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। অনন্যা খাতুন গর্জে উঠে বললেন,
“আপনারা বাপ ছেলে কান খুলে আমার কথা শুনে রাখুন। আমি মরে গেলেও এই মেয়েকে কোনোদিনও মেনে নিব না। আপনার ছেলেকে বলুন, ওই মেয়েকে তার দেশে ফিরে যাবার ব্যবস্থা করে দিতে। আমি রোজাকেই আমার ছেলের বউ করব।”
“ছেলের বউকে আমার পছন্দ হয়েছে। আমি কেনো বলব বাড়ির বউকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে?”
রিয়াজ বিরক্ত হয়ে বলল,
“ব্রো তো রোজা আপুকে ভালোবাসেনা। ব্রো ভাবিজিকে ভালোবাসে। আর তাই ভাবিজিকে বিয়ে করেছে।”
অনন্যা খাতুন ধমক মারল রিয়াজকে। উচ্চস্বরে বললেন,
“চুপ করো বেয়াদব ছেলে। ছোট ছোটোর মতো থাকো। বড়দের মাঝে করা বলার সাহস কীভাবে হয় তোমার?”
“তোমরা তো আমাকে তোমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বড় বানাও। এখন একটা ভুল করলে বলবে, রিয়াজ এতোবড় হয়েছো তবুও তোমার মাথায় কোনো বুদ্ধি হয়নি। কিন্তু, যখন কোনো উচিত কথা বলি, তখন আমি তোমাদের কাছে ছোটো হয়ে যায়।”
অনন্যা খাতুন আবারও ধমক মারল ছেলেকে। আরবাজ রিয়াজকে চুপ করতে বলল। রিয়াজ মুখ কালো করে চুপ করে রইল।
শেরাজ রাগিস্বরে বলল,
“বন্ধ করো এইসব। আমি আর আমার বউ অনেক টায়ার্ড। প্লিজ, আমাদের রুমে যেতে দাও।”
রোজা উঠে দাঁড়াল। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“তুমি আমাদের সাথে প্রাঙ্ক করছ, তাই না এস.কে? এস.কে আই লাভ ইউ। বিশ্বাস করো, তুমি যেমন মেয়ে পছন্দ করো, আজ এই মুহূর্ত থেকে আমি ঠিক তেমনটা হয়ে যাব। তবুও প্লিজ, একবার বলো এইসব তোমার প্রাঙ্ক।”
কথাগুলো বলে রোজা শেরাজকে ছুঁতে যেতেই সুমু এসে সামনে দাঁড়াল। চোখ রাঙিয়ে বলল,
“আপনার কষ্টটা আমি ফিল করতে পারছি। আমি জানি আপনার কতোটা কষ্ট হচ্ছে। আপনার কান্না দেখে আমারও খারাপ লাগছে। কিন্তু তাই বলে, কান্না করতে করতে আপনি আমার খান সাহেবের দিকে হাত বাড়াবেন। সরি, এইটা আমি কখনোই মেনে নিব না। ভুলেও তাকে টাচ করার চেষ্টা করবেন না। কথা দূর থেকে বলুন। উনি আমার ভালোবাসা। ওনাকে টাচ করার দূর্সাহস দেখালে, আপনার হাত আমি ভেঙে রেখে দিব। আমার খান সাহেবকে ছোঁয়ার চেষ্টা করলে, আমার হাতের স্পেশাল ছোঁয়া আপনার শরীরে পড়তে পারে। কি জানো বললেন? গ্রামে আনকালচার, আনস্মার্ট, গায়িয়া ভুত? হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। তবে কি জানেন? গ্রামের মেয়েদের শরীর আপনাদের মতো শহরের বড়লোক বাবার আদরের দুলালিদের মতো তুলতুলে নরম হয়না। গ্রামের মেয়েদের হাত শক্ত হয়। তাই আমার হাত ও শক্ত। আমার হাতের স্পেশাল ছোঁয়া আপনার এই নরম শরীরে পড়লে, আপনার সহ্য নাও হতে পারে।”
অনন্যা খাতুন তেড়ে এলো সুমুর কাছে। সুমুর হাত ধরে বাড়ি থেকে বের করতে গেলেই শেরাজ অনন্যা বেগমের হাত ধরল। অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সুমুর হাত ছাড়ো মম।”
“শেরাজ?”
“ছাড়ো মম!”
অনন্যা খাতুন তবুও সুমুর হাত ধরে রাখলেন। শেরাজ গর্জে উঠল,
“ছাড়ো!”
সুমুর হাত ছেড়ে দিয়ে দু’পা পিছিয়ে গেলো অনন্যা খাতুন। শেরাজ সুমুর হাত ধরে বলল,
“একটা কথা কান খুলে সকলে শুনে রাখো। আমার বউয়ের দিকে চোখ তুলে, আঙুল তুলে, গায়ে হাত তুলে কথা বলার কোনো রাইট আমি কাউকে দেইনি। নেক্সট টাইম এই কথাগুলো আমাকে যেন রিপিট করতে না হয়। আর মম তোমাকে বলছি, তুমি আমাকে ভালোবাসো। আর আমি সুমুকে ভালোবাসি। আর তাই আমার ভালোবাসার মানুষটা তোমার কাছেও খুব স্পেশাল হওয়া উচিত। কিন্তু, তুমি তার বিপরীত। তুমি সুমুকে মেনে নিতে পারোনি বলে, তোমার ছেলের বউ হিসাবে সম্মানও দিতে পারোনি। তবে মম তোমাকে একটা কথায় বলব, তুমি যদি তোমার ছেলের বউকে সম্মান দিতে না পারো, তবে অসম্মানও কোরোনা।”
সে একটু থেমে আবারও বলল,
“রোজাকে আমি সারাজীবন নিজের বোনের মতো দেখেছি। তাই, ওর সাথে আমাকে জড়িয়ে আজেবাজে স্বপ্ন দেখা আজ এই মুহুর্ত থেকে বন্ধ করো। আমরা সকলে অনেক টায়ার্ড। বাকি সিনক্রিয়েটগুলো কাল সকালে কোরো। চলো সুমু।”
শেরাজ সুমুর হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল। সকলে তাকিয়ে রইল ওদের যাওয়ার পানে। অনন্যা খাতুন রোজাকে নিয়ে আলাদা রুমে চলে গেল। সাহাবাজ সাহেব হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে রুমে চলে গেল।
শেরাজ রুমে এসে দরজা লক করে দিল। সুমু শেরাজের রুমটা একবার পরখ করে দেখল। শেরাজ সুমুর কাছে গিয়ে সুমুকে “সরি” বলল। সুমু জোরপূর্বক মুখে হাসি টেনে বলল,
“আরে চিল, খান সাহেব। আমি কিছু মনে করিনি। বরং আমার ভালোই লেগেছে। একটা সিনেমাটিক ব্যাপার পেয়েছি। যেখানে শাশুড়ি ছেলের বউকে মেনে নেয়না। শাশুড়ি আর ছেলের বউয়ের মধ্যে ফাইটিং ফাইটিং।”
শেরাজ আলতো হাসল সুমুর কথায়। মৃদুস্বরে বলল,
“এক্টিং ভালোই করতে জানো, সুইটহার্ট।”
“মানে?”
“মানে, এই বাড়িতে তোমাকে কেউ কিছু বললে, চুপচাপ সহ্য করার কোনো দরকার নেই। মনে রেখো, আমি কিন্তু একজন শেরনিকে বিয়ে করেছি। এখন যাও চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে এসো, ঘুমাব।
সুমু ব্যাগ থেকে চেঞ্জ বের করে ওয়াশরুমে চলে গেল। সে ফ্রেশ হয়ে বের হতেই শেরাজ ফ্রেশ হতে ঢুকল। পাঁচমিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে বের হলো শেরাজ। টাওয়েল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে এসে বলল,
“কিছু খাবে, সুইটহার্ট?”
“না!”
শেরাজ সুমুকে নিয়ে রুমের মধ্যে থাকা ফ্রিজের সামনে গেল। ফ্রিজের ডোর খুলে বলল,
“এইখানে অলওয়েজ চকলেট, আইসক্রিম থাকে। ফিরোজা তো এখানেই থাকে, আর বেশিরভাগ সময় আমার কাছেই থাকে। তাই ওর জন্য সবকিছু এনে রাখি আমি। আজ থেকে এগুলো তোমাদের দুজনেই।”
শেরাজ সুমুকে ছেড়ে দিয়ে রুমের লাইট অফ করে এলইডি লাইট অন করে দিল। মুহুর্তেই রুমটা লাল, নীল, আর পার্পেল আলোয় ছেঁয়ে গেল। সুমু গিয়ে শুয়ে পড়ল। শেরাজ সুমুর পাশে শুয়ে সুমুকে বুকের মধ্যে টেনে নিল। সুমুও শেরাজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করল।
ভোরের আলো ফুটেছে। বাড়ির পেছনে থাকা সমুদ্র থেকে পানির টেউয়ের শব্দ ভেসে আসছে। শেরাজের রুমের বেলকনি থেকে সমুদ্রটা পুরোপুরি দেখা যায়। নতুন জায়গায় একটুও ভালো করে ঘুম হয়নি সুমুর। পাশ ফিরে শুতেই শেরাজের উন্মুক্ত বুকের মধ্যে ঢুকে গেল সে। শেরাজের বুকের ওপর গজিয়ে থাকা লোমগুলোতে সুমুর মুখে সুড়সুড়ি লাগতেই ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল সে। শেরাজের বুকের ওপর কালো মিচমিচে অল্প কিছু লোম। ফর্সা চওড়া বুকটার ওপর লোমগুলো অদ্ভুত রকমের সুন্দর দেখায়। সুমুর কাছে এই লোমগুলোকে বড্ড বেশি কিউট লাগে। সে আলতো হাতে লোমগুলো একবার ছুঁয়ে দিল। শেরাজ গভীর ঘুমে তলিয়ে। সুমু উঠে বসল। বেড থেকে নেমে ওয়াশরুমে চলে গেল শাওয়ার নিতে।
শাওয়ার শেষে বেরিয়ে এসে শেরাজের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। শেরাজের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। কি নিঃষ্পাপ আর মায়াবী দেখতে লাগছে ওই মুখটা। সুমুর ইচ্ছা করল না মানুষটাকে ডেকে তুলতে। তবুও মনের বিরুদ্ধে গিয়ে ডেকে তুলল শেরাজকে। শেরাজ দু’বার মুখ দিয়ে “উহুম” শব্দ করে আবারও পাশ ফিরে শুয়ে রইল। সুমুও হাল ছাড়ার পাত্রী নয়। সে চুলের পানি শেরাজের মুখে ছিঁটিয়ে জোর করে টেনে তুলল তাকে। শেরাজ চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসে বলল,
“কি হয়েছে, সুইটহার্ট? একটু ঘুমাতে দাও, প্লিজ।”
“ঘুমাবেন পরে। আগে উঠুন। নামাজ পড়ব একসাথে।”
শেরাজ আবারও শুয়ে পড়তে গেল। সুমু শেরাজের হাত টেনে ধরল। জোর করে পাঠাল ওয়াশরুমে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে শেরাজ ওযু করে বেরিয়ে এলো। সুমু দুইটা জায়নামাজ পাশাপাশি বিছিয়ে রাখল। শেরাজ টাওয়েল ডিভানের ওপর রেখে পাঞ্জাবি পরে সুমুর সাথে একসাথে নামাজে দাঁড়াল। নামাজ শেষ করে দুজন মোনাজাতে একে অপরের জন্য দোয়া করল। সুমু মোনাজাত শেষ করে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ সুমুকে একটু কাছে টেনে এনে সুমুর কপালে ঠোঁটে ছুঁয়ে বলল,
“সৃষ্টিকর্তা আমার অর্ধাঙ্গিনীকে সবসময় সুস্থ রাখুক। তোমার ওপর আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক বেগম। তোমার মুখের এই মিষ্টি হাসি চিরস্থায়ী হোক, আমিন।”
সুমুও “আমিন” বলে একটু সময় নিয়ে আবারও বলল,
“সৃষ্টিকর্তা আপনাকে সবসময় হাসিখুশি রাখুক। সবসময় সুস্থতা দান করুক। আপনার জীবনের সব স্বপ্ন পূরণ হোক। আপনাকে আমার স্বামী হিসাবে পেয়ে আমি ধন্য। পরকালেও যেন আমি আপনার সঙ্গ পাই, খান সাহেব। ক্ষনিকের মৃত্যু আমাদের আলাদা করলেও, পরকালের চিরস্থায়ী জীবনে আমি আমার চিরস্থায়ী সঙ্গী হিসাবে যেন আপনাকেই পাই।”
শেরাজ মুচকি হেসে সুমুকে নিজের বাহুদ্বরে জড়িয়ে নিল। সুমুর মাথায় আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“ইউ আর মাই পিস অফ মাইন্ড।”
সুমু মৃদু হেসে বলল,
“অ্যান্ড ইউ আর মাই কম্ফোর্ট জোন।”
দুজনে কিছুক্ষণ ওভাবে বসে থেকে তারপর উঠে দাঁড়াল। শেরাজ আবারও গিয়ে শুয়ে পড়ল। সুমু জায়নামাজ ভাঁজ করে রেখে বেলকনিতে গেল। বেলকনিতে যেতেই সকালের পবিত্র বাতাস ছুঁয়ে দিল তার ছোট্ট দেহখানা। চোখ বন্ধ করে সুমু প্রকৃতিক সেই শান্তির বাতাস উপভোগ করল। মিনিট খানের বাদে চোখ মেলে সমুদ্রের স্বচ্ছ পানির দিকে তাকাল। কি অপরূপ সুন্দর দৃশ্য। হঠাৎ সুমুর মনে হলো তার খান সাহেবের রুমটা ঘুরে দেখা উচিত। সে রুমে চলে এলো।
শেরাজদের বাড়িটিকে নির্দ্বিধায় লাক্সারিয়াস হাউজ বলা চলে। সুমু শেরাজের পুরো রুমটায় কাল রাতের মতো আরো একবার চোখ বোলালো। শেরাজের পুরো বেডরুমটা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ডেকোরেটিং করা। রুমটির দেওয়ালের কালার হোয়াইট। কিন্তু রুমটির প্রতিটি আসবাপত্র ব্ল্যাক। শেরাজের রুমের পর্দা থেকে শুরু করে বেডশীট সব হোয়াইট। সুমুর শুধু মনে হচ্ছে সে কোনো মাফিয়ার রুমে ঢুকে পড়েছে। একটা মানুষের পছন্দের কালার ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট হতেই পারে। তাই বলে কালারের ওপর মানুষ এতো অবসেস্ট কীভাবে হয় বুঝে পেল না সে। তবে পুরো রুমটা এলইডি লাইট দিয়ে লাইটিং করা। তাতে নীল, লাল আর পার্পেল বর্ণের কৃত্রিম আলো জ্বলে। এই জিনিসটা বেশ ভালোই লেগেছে সুমুর। এলইডি লাইট অন করলে, রুমটার মাফিয়া ভাবটা কেটে গিয়ে একটা কিউট কিউট ভাব আসে। সুমু বেড সাইড টেবিলের ওপর থেকে রিমোট নিয়ে রুমে জ্বলতে থাকা এলইডি লাইটি অফ করে দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে শেরাজের রুমের লেফট সাইডে গেল। সেখানে মাঝারী আকারের একটি সুইমিংপুল রয়েছে। সুইমিংপুলের পানির মধ্যে ওয়াটার লাইট দিয়ে লাইটিং করা। পুলের পানির ওপর কালো কালো কী যেন ভেসে আছে। সেগুলো দেখতে গিয়ে সুমু সেন্টার টেবিলের ওপর ছোট্ট একটা রিমোট পেল। রিমোটির অফ বাটনে চাপ দিতেই, পুরো পুলের পানিতে জ্বলতে থাকা প্রতিটি লাইট অফ হয়ে গেল, যার ফলে পুরো পুল সাইডটা আধারে ডুবে গেল। অন্ধকারে আন্দাজে আবারও রিমোটির কোনো একটা বাটনের চাপ দিল সে। চোখের সামনের দৃশ্য দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। পুলের পানির ওপর ভেসে থাকা কালো বস্তুগুলো আর্টিফিশিয়াল বিভিন্ন রঙের পদ্মফুল। পদ্মফুলগুলো ধীরে ধীরে তাদের পাপড়ি মেলে দিয়ে ফুটে উঠল। ফুলগুলো মাঝে মোমবাতির মতো ডিজাইন করা। তার ওপর জ্বলে আছে আগুনের শিখার মতো হলুদ বর্ণের আলো। পুরো রুমটার মধ্যে এই জিনিসটা সবথেকে বেশি আর্কষণীয় লাগল তার।
সুমু এগিয়ে গিয়ে পুলের পানির মধ্যে পা দুটো চুবিয়ে বসল। কাছে ভেসে থাকা পদ্মফুলগুলো আলতো হাতে ছুঁয়ে দেখল। হঠাৎ কিছু একটা মনে করে আবারও রুমের মধ্যে ফিরে এলো। ফ্রিজ থেকে আইসক্রিমের বাটি বের করে শেরাজের ফোন নিয়ে আবারও পুলের কাছে এলো। পুলের পানির মধ্যে দুপা আবারও চুবিয়ে বসল। শেরাজের ফোন আনলক করে ইউটিউব গিয়ে কোরিয়ান ড্রামা অন করে ফোনটা মেঝের ওপর রাখাল। চামচ দিয়ে অল্প অল্প আইসক্রিম তুলে মুখে নিল, আর ড্রামা দেখাতে মন দিল।
সাতটার দিকে সুমু পুল ছেড়ে বেডরুমে এলো। শেরাজ উঁপুর হয়ে ঘুমাচ্ছে। সুমু বুঝতে পারছেনা তার কি করা উচিত। একে তো তার শাশুড়ি তাকে মেনে নেয়নি। মনের মধ্যে হাজারো দ্বিধা সুমুর। তবুও সব দ্বিধাকে সাইডে রেখে মাথায় ঘোমটা দিয়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে এলো। নিচে কিচেনে গিয়ে দেখল দুজন অর্ধবয়সী মহিলা কাজ করছে। পরনে তাদের সার্ভেন্টের পোশাক। সুমুকে দেখে তারা আলতো হাসল। সুমুও তাদের পাল্টা হাসি উপহার দিয়ে বলল,
“সকালে ব্রেকফাস্টে কে কি খায় আমাকে বলুন। আমি করে দিচ্ছি।”
মাহিলা দুজন একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকাল। সুমু উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। তাদের মধ্যে একজন হাত জোর করে বলল,
“মার্জনা করবেন মেজো মেমসাহেবা! এই বাড়ির নতুন বউদের তিন মাসের আগে রান্না করার পারমিশন নেই। আর আপনি হলেন, মেজো সাহেবের বউ। আপনার তো কিচেনে ঢোকাই উচিত হয়নি। মেজো সাহেব জানতে পারলে আমাদের চাকরি থাকবেনা। আপনি বরং আমাদের বলুন, আপনি কি খেতে চান। আমরা আপনার জন্য বানিয়ে দিচ্ছি।”
“না থাক। আমি এখন কিছু খাব না। আপনারা আপনাদের কাজ করেন। আমি আসছি।”
সুমু খুব অস্বস্তিতে পড়ল। এমনিতেই সময় কাটছেনা, তার ওপর যদি সারাদিন এমনি বসে থাকতে হয়, তাহলে তো মনে হয় সময় একেবারের থমকে যাবে। সে আর বেশি জোরাজুরি করল না। এমনিতেই তার সিনেমাটিক মাদার ইন ল তাকে মেনে নেয়নি। তার ওপর এখন যদি সে আবার আগ বাড়িয়ে রান্না করতে যায়, তাহলে হয়তো আবারও ঝামেলা হবে।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ওপরে চলে এলো সুমু। রুমের মধ্যে এসে চুপচাপ বসে রইলো। শেরাজের ফোনটা নিয়ে দেখল ৭:২৯ বাজে। সুমু মেসেঞ্জারে গিয়ে সামিয়াকে কল করল।
আটটা বাজতেই পুরো খান ম্যানশন জেগে উঠল। সুমু ততক্ষণে বাড়ির সকলের সাথে কথা বলে নিয়েছে। শেহরাজ পাশ ফিরে শুতেই চোখ মেলে তাকাল। সুমু ফোনে ড্রামা দেখছে। শেরাজ উঠে বসল। ফোনের দিকে উঁকি মেরে দেখল, ড্রামার মধ্যে কিসিং সিন চলছে। শেরাজ ফোনটা কেঁড়ে নিয়ে সুমুকে কাছে টেনে এনে বলল,
“গুড মনিং সুইটহার্ট!”
“মনিং!”
“আমার বেড কিস কই, সুইটহার্ট?”
সুমু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল তার খান সাহেবের দিকে। ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“বেড টি শুনেছি। বেড কিস শুনিনি।”
“আমার সাথে থাকো, আরও এমন অনেক কিছুই শুনবে। এখন একটা বেড কিস দাও। আর, তুমি এই সকাল বেলার ফোনের মধ্যে কোরিয়ানদের কিসিং সিন দেখছো? আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বললেই পারতে, যে তোমার চুমু চাই। শুধু শুধু অন্যেরটা দেখে ফিল নেওয়ার কি আছে? তোমার হাজব্যান্ড যে এইসব বিষয়ে পিএইচডি করে রেখেছে, তা তুমি জানোনা?”
সুমু লজ্জা পেল। লজ্জা কাটানোর জন্য বলল,
“খান সাহেব! আমার না দাঁতগুলো শিরশির করছে।”
ভ্রু কুঁচকালো শেরাজ।
“মানে?”
“মানে, আমার না কাউকে খুব কামড়াতে ইচ্ছা করছে।”
“হোয়াট? কি আজব ইচ্ছা তোমার।”
সুমু চট করে শেরাজের বাহুতে কামড় বসাল। সুমুর হঠাৎ আক্রমণে ভ্যাবাচ্যাকা খেল শেরাজ। সে সুমুকে ঠেলে সরিয়ে দিল। সুমু আবারও এগিয়ে এল। শেরাজকে বিরক্ত করার জন্য একই জায়গায় আবারও কামড় বসাল। শেরাজ আবারও সরিয়ে দিল তাকে। সুমু বেশ মজাই পাচ্ছে তার খান সাহেবকে জ্বালিয়ে। সে হাত দিয়ে শেরাজের পেটে চিমটি কাটল। শেরাজ সুমুকে সরিয়ে দিয়ে ব্লাঙ্কেট মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। সুমু হালকা অভিমানী মুখ করে গালে হাত দিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল। শেরাজ উঠে বসল। সুমুর কোমর ধরে তাকে কোলের ওপর বসাল। সুমু নেমে যেতে চাইল। শেরাজ শক্ত করে ধরে রাখল সুমুকে। বা’হাত দিয়ে সুমুর কোমর জড়িয়ে রেখে ডান হাত সুমুর সামনে বাড়িয়ে দিলো। চোখের সামনে হাত দেখতে পেয়ে ঠোঁটে কামড়ে হাসল সুমু। ঘুরে তাকাল শেরাজের দিকে। শেরাজের গলা জড়িয়ে ধরে গলায় জোরে কামড় বসাল সে। শেরাজ চোখ বন্ধ করে সহ্য করল। সুমু নিজের ইচ্ছা পূরণ করতে পেরে শব্দ করে হাসল। শেরাজ সুমুকে আরও শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
“হ্যাপি সুইটহার্ট?”
“ইয়েস!”
“তাহলে এখন আমাকে হ্যাপি করো।”
সুমু লজ্জায় মাথা নামিয়ে নিল। ডান হাত দিয়ে শেরাজের চোখ আটকে ধরে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল শেরাজের ঠোঁটে। শেরাজ মুচকি হেসে বলল,
“আমার বেড টি কই, সুইটহার্ট? তুমি জানোনা, তোমার হাতের চা, কফি ছাড়া আমার দিন শুরু এবং শেষ হয়না?
“আমি গিয়েছিলাম কিচেনে।”
“তারপর?”
“তারপর আমাকে বলল যে, এই বাড়িতে নতুন বউদের নাকি তিন মাসের আগে কিছু রান্না করার নিয়ম নেই।”
“হুম! তা ঠিক। তবে তুমি গিয়ে বলো, মেজো সাহেব বলেছে। আর কেউ কিছু বললে, তার পাল্টা জবাব দিয়ে আসবে। বাকিটা আমি দেখে নিব।”
সুমু “আচ্ছা” বলে উঠে চলে গেল। শেরাজ বেড থেকে নেমে শাওয়ার নেওয়ার জন্য ওয়াশরুমে চলে গেল। আজ সে একবার অফিস যাবে।”
সুমু কিচেনে আসতেই ইশিতার সাথে দেখা হলো। ইশিতা মুচকি হেসে বলল,
“আপনি তো নতুন। আজই কিচেনে কেনো এসেছেন? আপনার শাশুড়ি দেখলে আবারও ঝামেলা করবে। আপনি কিচেন থেকে চলে যান। ব্রেকফাস্ট অলরেডি বানানো হয়ে গেছে। আমি তো জানিনা আপনি কি খান। আমাকে বলে দিয়ে যান। আমি এক্ষুনি বানিয়ে দিচ্ছি।”
সুমু এগিয়ে গেল ইশিতার কাছে। মুচকি হেসে বলল,
“আমার মাদার ইন ল কোথায়?”
ইশিতা হাসল সুমুর কথায়। নিজের কাজ করতে করতে বলল,
“এখনো ঘুমাচ্ছে। তবে ঘুম থেকে উঠে পড়ার টাইমও হয়ে গেছে। সবাইকে একসাথে ডাইনিং টেবিলে দেখতে পাবে তুমি।”
সুমু আর কথা বাড়াল না। সে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো চাইতেই ইশিতা বলল,
“আপনি রাখুন। আমি বানিয়ে দিচ্ছি।”
“প্রথমত, আমি আপনার থেকে সম্পর্কে বড় হলেও বয়সে ছোট। তাই, আমি চাই আপনি আমাকে “তুমি” বলে সম্মোধন করুন। আর দ্বিতীয়ত, উনি আমার হাতের চা ছাড়া খাবেন না।”
“ঠিক আছে, বলব। তবে যদি আপনিও আমাকে “তুমি” করে সম্মোধন করেন। আর ভাইয়া যেহেতু আপনার হাতের চা ছাড়া খাবেন না, তাই কেউ কিচেনে আসার আগে আপনি চা-টা বানিয়ে নিয়ে রুমে চলে যান।”
সুমু মুচকি হেসে চুলায় গরম পানি বসাল। এমন সময় বাড়ির কলিং বেল বেজে উঠল। সুমু যেতে নিলেই ইশিতা সুমুর হাত ধরে বলল,
“তোমাকে যেতে হবেনা। এই বাড়িতে অনেক সার্ভেন্ট আছে।”
সুমু দাঁড়িয়ে পড়ল। চিনি, দুধ পরিমাণ মতো দিয়ে দু’কাপ চা বানাল। এক কাপ রেখে, আরেক কাপ নিয়ে বেরিয়ে গেল কিচেন থেকে। ইশিতা কাজ করতে করতে হঠাৎ তার চোখ গেল চায়ের কাপের দিকে। কাপটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে ছোট্ট করে চুমুক বসাল
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সিঁড়ি ওপর পা রাখল সুমু। পেছন থেকে কেউ একজন বাধ সাধতেই দাঁড়িয়ে পড়ল সে। ঘুরে তাকিয়ে দেখল অনন্যা খাতুন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন। সুমু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। অনন্যা খাতূন এগিয়ে এসে বললেন,
“চা-টা কে বানিয়েছে?”
“আমি।”
“তোমার সাহস কীভাবে হলো আমার অনুমতি ছাড়া রান্নাঘর পা রাখার?”
“সাহসটা আপনার ছেলে দিয়েছে, তাই পেয়েছি।”
অনন্যা খাতুন গর্জে উঠলেন।
“চুপ করো বেয়াদব মেয়ে। বড়দের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় জানোনা? মা- বাবা এই শিক্ষা দিয়েছে তোমাকে? এই সংসারটা আমার। আর এই সংসারে আমার পারমিশন ছাড়া একটা সামান্য কাজ হয়না। আর সেখানে তুমি? আমার রান্নাঘরে ঢুকে এই বাড়ির এতোদিনের নিয়ম ভেঙে চা বানিয়ে নিয়ে আসো?”
“আপনি আমাকে যা খুশি বলেন। আমি কিছু মনে করব না। তবে আমার মা-বাবার দেওয়া শিক্ষা নিয়ে কোনো কথা বলবেন না।”
“তোমাদের মতো মেয়েদের শিক্ষা সম্পর্কে আমার জানা আছে। তোমাদের পরিবারের মানুষরা, বড়লোক বাড়ির ছেলে দেখলেই নিজেদের বাড়ির মেয়েদের লেলিয়ে দেয়। তুমি আমার ছেলেকে ফাঁসিয়েছো তাইনা?”
“এইটা আপনার ভুল ধারনা মাদার ইন ল। আপনার ছেলে কোনো ছোট বাচ্চা নয় যে, তাকে আমি ফাঁসাতে যাবো।”
“অসভ্য, অভদ্র, বেয়াদব মেয়ে। বড়দের মুখে মুখে তর্ক করো।”
সুমু তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“আপনার প্রতিটা কথার উত্তর আমি দিতে পারতাম, আম্মাজান। তবে এখন আমার হাতে সময় নেই। আমার স্বামীর আমার হাতের চা, কফি ছাড়া দিন শুরু হয়না। আজ আবার সে অফিস যাবে। আপনার সাথে ঝগড়াটা বহাল রইল। পরে এসে বাকিটা কন্টিনিউ করব।”
সুমু অনন্যা খাতুনকে চোখ মেরে ওপরে উঠে এল। অনন্যা খাতুন তার ছেলের বউয়ের সাহস দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
করিডর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সুমু। এতোক্ষণ শক্ত থাকলেও এখন আর শক্ত থাকতে পারল না সে। নিজের মায়ের কথা বড্ড মনে পড়ছে তার। হাসি বেগমের কথা ভাবতে ভাবতে রুমের সামনে এসে পৌঁছাল সুমু। ভেতরটা মায়ের শূন্যতায় ভেঙেচুরে যাচ্ছে তার। রুমের মধ্যে এসে চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রাখল। সামনে তাকিয়ে দেখল তার খান সাহেব ফুল রেডি হয়ে দু’হাত পকেটে গুঁজে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। সুমু নিজেকে কন্ট্রোল না করতে পেরে পেছনে থেকে জড়িয়ে ধরলো তার খান সাহেবকে। যতোটা না দ্রুত গতিতে জড়িয়ে ধরল তার থেকেও দ্রুত গতিতে সরে এল সুমু। রাগিস্বরে বলল,
“কে আপনি?”
তখনই ওয়াশরুমের দরজার কাছে আওয়াজ হলো। সুমু ঘাড় বাঁকা করে তাকিয়ে দেখল শেরাজ তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সুমু শেরাজের দিক থেকে চোখ সরিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানবটির দিকে তাকাল। আরিয়ান ঘুরে দাঁড়াল সুমুর দিকে। সুমু পিছিয়ে গেল। মাথায় ওড়নাটা ঠিক করে শেরাজের দিকে তাকাল। আরিয়ান সুমুর পা থেকে মাথা পযর্ন্ত পরক্ষ করে মৃদুস্বরে বলল,
“ওয়াহ. জাস্ট বিউটিফুল!”
আরিয়ান ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সুমুর দিকে। শেরাজ এগিয়ে এল সুমুর কাছে। সুমুর কাঁধের ওপর হাত রাখতেই কেঁদে ফেলল সুমু। শেরাজের পায়ের সামনে বসে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আই এম সরি খান সাহেব। আমি ভেবেছিলাম ওইটা আপনি। আ…আমি…”
কান্নার ফলে সুমু কথা বলার অবস্থাতে নেই। শেরাজ সুমুকে দাঁড় করালো। সুমুর চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
“ইশিতার রুমে যাও।”
“কিন্তু খান সাহেব…”
“যাও!”
সুমু আর দাঁড়াল না। চোখের পানি মুছে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে কোনোমতে “সরি” বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
সুমু যেতেই শেরাজ আরিয়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আরিয়ানের ঠোঁটে বাঁকা হাসি। শেরাজ রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে বলল,
“কারো বেডরুমে ঢোকার আগে তার পারমিশন নিয়ে ঢুকতে হয়, এইটা কমনসেন্সটা কী তোর মধ্যে নেই?”
“আসলে কি জানিস তো এস.কে? তোর কোনো কিছুতেই আমার পারমিশন লাগে না। আর সরিয়ে দিলি কেনো? দারুন লাগছিল দেখতে।”
“তুই কি চাইছিস, আরিয়ান? আমি তোর জন্য একটা আলাদা জাহান্নাম তৈরি করি?”
“নাহ! তুই আমার জন্য একটা জান্নাত তৈরি কর। যেখানে আমি তোর…”
“এখানেই থেমে যা আরিয়ান। বাড়ির মধ্যে আমি রক্তারক্তি চাইনা।”
“কিন্তু তোর বউ যে, আমাকে ডিস্টার্ব করে দিয়ে গেল?”
“ও তোকে ইচ্ছে করে টাচ করেনি। ও ভেবেছিল ওটা আমি।”
“উফ! সে যেটা ভেবেই করুক। তোর বউয়ের জাদুকি ঝাপ্পি, মেরা দিলকে আন্দার টান, টানা, টান, টান কার দিয়া। ও ভুল করে ছুঁয়েছে আর আমি ইচ্ছেকৃত ছুঁতে চাই।”
শেরাজ দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলল,
“আরিয়ান স্টপ যা।”
আরিয়ান কোনো কথা শুনল না। সে আবারও বলল,
“আগে তোর সব জিনিসে আমি ফিফটি পার্সেন্ট শেয়ার চাইতাম। তবে আজ যে জিনিস দেখলাম, এই জিনিসের হান্ড্রেড পার্সেন্ট শেয়ারি আমার চাই। তোর বউয়ের পুরোটাই…”
কথাটা শেষ করতে পারল না আরিয়ান। শেরাজ গর্জে উঠে “বাস্টার্ট” বলে গালি দিয়ে আরিয়ানের নাক বরাবর পাঞ্চ মারল। মেঝের ওপর ছিঁটকে পড়ল আরিয়ান। মুহুর্তের মধ্যেই আরিয়ানের নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হতে শুরু করল। দু’মিনিটের মধ্যে সকলে এসে শেরাজের রুমে হাজির হলো। সুমু দৌঁড়ে এলো রুমের মধ্যে। আরিয়ান মেঝেতে পড়ে আছে। ঠোঁটে লেগে আছে এখনো সেই হাসি। অনন্যা খাতুন আর রোজা দৌড়ে গিয়ে আরিয়ানকে মেঝে থেকে টেনে তুললো। শেরাজ দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে আবারও এগিয়ে গেল আরিয়ানের দিকে। সারবাজ, আরবাজ আর শাহরুখ মিলে শেরাজকে আটকালো।
অনন্যা খাতুন আরিয়ানকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে বললেন,
“কি হয়েছে তোদের? এইসব কি শুধু করেছিস তোরা? কি হয়েছে এখানে?”
শেরাজ চোখ বন্ধ করে রাগ কন্ট্রোল করার বৃথা চেষ্টা করে গর্জে উঠে বলল,
“এই ব্লাডি বীচটাকে এই রুম থেকে নিয়ে বেরিয়ে যাও। ও যদি আমার চোখের সামনে আসে তাহলে, আই সুয়ার ওকে আমি খুন করে ফেলব।”
অনন্যা খাতুন ছুটে এলো শেরাজের কাছে। শেরাজকে ধরে বললেন,
“কি হয়েছে বেটা? এমন করছিস কেনো? কি করেছে আমার আরিয়ান?”
শেরাছ চোখ মেলে তাকাল। অনন্যা খাতুন আবারও কিছু বলতে নিলেই শেরাজ “আউট” বলে জোরে চেঁচিয়ে উঠল। কেঁপে উঠল রুমে উপস্থিত সকলে। আরিয়ান হাসতে হাসতে রোজার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“ওহ হো ফুফুমনি! এতো হাইপার কেনো হচ্ছ? আমি আর এস.কে ছোট বেলার মতো বক্সিং বক্সিং খেলছিলাম। জাস্ট চিল।”
অনন্যা খাতুন আরিয়ানের কাছে এসে বললেন,
“থাম তুই। চল এই রুম থেকে।”
অনন্যা খাতুন আরিয়ানের হাত ধরে রুম থেকে বেরোতে গিয়ে সুমুকে দেখে থেমে গেল। আরিয়ান তাকাল সুমুর দিকে। অনন্যা খাতুন এগিয়ে গেল সুমুর কাছে। সুমু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। অনন্যা খাতুন সুমুর সামনে গিয়ে হাত তালি দিয়ে বললেন,
“আজ সবকিছু এই মেয়েটার জন্য হয়েছে। এই মেয়ে আমার সংসারে কাল এলো। আর আজ আমার সোনার সংসারে ফাঁটল ধরতে শুরু করল। আজ পযর্ন্ত যা ঘটেনি, তা আজ ঘটল। সব এই মেয়ের…”
“এনাফ ইজ এনাফ, মম!”
থেমে গেল অনন্যা খাতুন। শেরাজ এসে সুমুর পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“ও এই মেয়েটা নয়। ও তোমার বড় ছেলে শেরাজ খানের ওয়াইফ মিসেস শেরাজ খান। কাল আমি কি বলেছিলাম, ভুলে গেছ মনে হয়। আমার অর্ধাঙ্গিনীর দিকে আঙুল তুলে কথা বলার বা উঁচু গলায় কথা বলার কোনো রাইট আমি কাউকে দেইনি। এই ভুলটা যেন আর নেক্সট টাইম না হয়, মম। আর কেউ না হোক অন্তত তুমি তোমার ছেলেকে চিনো। আমি ভালোর ভালো, আর খারাপের আজরাইল।”
অনন্যা খাতুন ছেলের কথায় কেঁদে ফেললেন। তিনি তার স্বামীর সামনে গিয়ে বললেন,
“দেখেছো? তোমার ছেলে আজ তার মমকে থ্রেট দিচ্ছে। ওই মেয়ের কেনা হয়ে গেছে তোমার ছেলে। সে বিয়ে করে বউয়ের কাছে সেল হয়ে গেছে। তার বউ কি এমন জাদু করেছে তাকে, যার জন্য তার মমের সাথে উঁচু গলায় কথা বলতে তার একটুও বাঁধছেনা?”
সাহাবাজ সাহেব বউয়ের কথায় পাত্তা না দিয়ে তার ছোট ভাই শেহেজাদ আর তার ছোট ভাইয়ের বউ আফিয়াকে নিয়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। যাবার আগে রিয়াজকেও বেরিয়ে আসতে বললেন রুম থেকে। অনন্যা বেগম স্বামীর কাছে পাত্তা না পেয়ে রুষ্ট হলেন। আরিয়ানকে বেরিয়ে আসতে বলে তিনি কাঁদতে কাঁদতে রুম ত্যাগ করলেন।
আরিয়ান নাকে রুমাল চেপে ধরে রেখেছে। সে যাবার আগে একবার সুমুর দিকে তাকাল। সুমু এখনো একইভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শেরাজ আবারও গর্জে উঠে বলল,
“চোখ দুটো তুলে নেওয়ার আগে বেরিয়ে যা রুম থেকে।”
আরিয়ান বাঁকা হেসে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। রোজা শেরাজের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
“তুমি আমার বিগ ব্রোকে কেনো মেরেছো এস.কে?”
শেরাজ তাকাতেই রোজা ভয়ে রুম ত্যাগ করল। সারবাজ আর আরবাজ এগিয়ে আসতেই শেরাজ বলল,
“আই নিড প্রাইভেসি!”
সারবাজ বেরিয়ে গেল রুম থেকে। আরবাজ ইশিতাকে বেরিয়ে আসতে বলে চলে গেল। ইশিতা সুমুর কাছে গিয়ে আস্তে করে বলল,
“ভাইয়াকে সামলাও।”
কথাটা বলে ইশিতা বেরিয়ে গেল রুম থেকে। শেরাজ রুমের দরজা লক করে দিয়ে বেডে গিয়ে চোখ বন্ধ করে বসল। সুমু ধীর পায়ে এগিয়ে গেল শেরাজের কাছে। মেঝের ওপর বসে শেরাজের উঁরুর ওপর হাত রেখে বলল,
“আমি জানিনা উনি কী এমন করেছে যার জন্য আপনি ওনার গায়ে হাত তুলেছেন। তবে, আমি সত্যি বুঝতে পারিনি খান সাহেব। আমি ভুল করে ফেলেছি। আপনি আমাকে যা শাস্তি দেবেন আমি মাথা পেতে নিব। তবুও আপনি একটু ঠান্ডা হন, আর আমাকে ক্ষমা করে দিন।”
শেরাজ সুমুর হাত ধরে টেনে তুলল তাকে। বেডের ওপর ফেলে সুমুর দু’হাত বেডের সাথে চেপে ধরল। একসেকেন্ডও সময় না দিয়ে সুমুর ওষ্ঠ নিজের ওষ্ঠের দখলে নিল। পনেরো মিনিট সময় ব্যয় হয়ে গেল, তবুও সুমুকে ছাড়াল না সে। একসেকেন্ড মতো নিঃশ্বাস নিতে দিয়ে বারবার সুমুর ওষ্ঠ নিজের দখলে নিচ্ছে সে। শেরাজের প্রতিটা কামড়ে নিজের কলিজা একটান দিয়ে ছিঁড়ে বের করে আনার সমান ব্যথা অনুভব করছে সুমু। ওষ্ঠ কেঁটে ব্ল্যাড বেরিয়ে এসেছে অনেকক্ষণ আগেই। আজ শেরাজ মুখের মধ্যে নোনতা স্বাদ অনুভব করেও ছাড়ল না তাকে। সুমু চোখ বন্ধ করে সব সহ্য করে যাচ্ছে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে নোনা জল। তবে এই কান্না তার খান সাহেবের তাকে দেওয়া ব্যথা থেকে না। এই কান্না তার খান সাহেবকে তার দেওয়া ব্যথা থেকে। একুশ মিনিট ত্রিশ সেকেন্ড হতেই শেরাজ সুমুকে ছেড়ে উঠে বসল। সুমু এখনো চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। শেরাজ উঠে গিয়ে আলমারি থেকে শার্ট, প্যান্ট বের করল। অফিসের জন্য রেডি হয়ে “আসছি” বলে বেরিয়ে গেল।
চোখ মেলে তাকাল সুমু। ধপাস করে উঠে বসল। দরজার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। শেরাজ নিচে এসে ইশিতাকে বলল, “সুমুর রুমে ব্রেকফাস্ট দিয়ে আসতে।”
ইশিতা সম্মতি জানিয়ে বলল,
“আপনি ব্রেকফাস্ট করবেন না, ভাইয়া?”
শেরাজ ইশিতার প্রশ্নটাকে উপেক্ষা করে বলল,
“বাড়ির সকলে কোথায়?”
“বড়মামনি আর রোজা আপু আরিয়ান ভাইয়াকে নিয়ে হসপিটালে গেছেন। বড়বাবা আর আব্বু ফ্যাক্টরিতে গেছেন। আম্মু রুমে আছে। শাহরুখ একাডেমিতে আর রিয়াজ টিউশনিতে গেছে। আর আপনার বাকি দুই ভাই রুমেই আছে।”
শেরাজ সবটা শুনে আবারও জিঙ্গাসা করল,
“সকলে খেয়েছে?”
“বড়মামনি আর রোজা আপু না খেয়ে বেরিয়ে গেছে। আর তাছাড়া সকলে হালকা নাস্তা করে যার যার মতো উঠে চলে গেছে।”
“তুমি খেয়েছ?”
“এখনো না।”
“তাহলে তুমি একটা কাজ করো। একজন সার্ভেন্টকে দিয়ে সুমুর রুমে খাবার পাঠাও। আর, তুমি খেয়ে নাও। আর শোনো!”
“জি ভাইয়া!”
“সুমুর জন্য ঝাল খাবার পাঠিওনা। পরোটা, অমলেট আর কিছু ফ্রুটস নিয়ে যাও।”
“উনি কি ঝাল খেতে পারেন না?”
“পারে। তবে, আপাতত পারবেন না।”
কথাগুলো বলে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল শেরাজ। ইশিতা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে শেরাজের কথাটা বোঝার চেষ্টা করল। কিছুই বুঝতে না পেরে একজন সার্ভেন্টকে পরোটা বানাতে বলে নিজে খেতে বসল।
শেরাজ কেবিনে বসে ল্যাপটপে কিছু একটা করছে। স্যান্ডি রোবটের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আজ অফিসে ঢুকে যারই কাজে ভুল পেয়েছে তাকেই ঝেড়েছে শেরাজ। স্যান্ডির ওপর দিয়েও কয়েক দফা সুনামি গিয়েছে। তাই এখন সে চুপচাপ রোবটের মতো দাঁড়িয়ে আছে। শেরাজ কাজ করতে করতে স্যান্ডির উদ্দেশ্যে বলল,
“আজ শুট আছে। আমার ফুল টিমকে অফিসে আসতে বলো। যে যেখানেই থাকুক না কেনো, বারোটার মধ্যে সবাই যেন আমার চোখের সামনে হাজির হয়। আর অফিসে এসে তোমাকে কি বলেছি মনে আছে তো?”
“জি স্যার!”
“ওকে, তাহলে কাজে লেগে পড়ো।”
স্যান্ডি সম্মতি জানিয়ে কেবিনের বাহিরে চলে গেল আইয়ুবদের কল করতে। হঠাৎ শেরাজের ফোনে টুং করে শব্দ হলো। পাশ থেকে ফোন নিয়ে টেক্সটটা চেক করল। ফোনটা রেখে দুই আঙুলের সাহায্যে কপালে স্লাইড করে উঠে দাঁড়াল। কেবিন থেকে বেরিয়ে স্যান্ডিকে সবটা সামলাতে বলে অফিস ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
সুমু কম্বল দিয়ে নাক পযর্ন্ত ডেকে শুয়ে আছে। ইশিতার সাথে একজন সার্ভেন্ট দাঁড়িয়ে আছে। হাতে তার খাবারের প্লেট। ইশিতা সুমুকে বারবার খাওয়ার জন্য বলছে। কিন্তু সুমুর একটাই কথা “তার খান সাহেব খেয়ে যায়নি মানে, সেও খাবেনা।”
ইশিতা আবারও ডাক দিল,
“ভাবিজি!”
সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“কি ভাবিজি, ভাবিজি করছো তখন থেকে। এই বাড়ির মধ্যে তোমাকে আমার সবথেকে বেশি ফ্রেন্ডলি লেগেছে। তাই তুমি আমাকে “সুমু” বলে ডাকো।”
“আচ্ছা ঠিক আছে! সুমু প্লিজ খেয়ে নাও। নয়তো ভাইয়া রাগারাগি করবে। দেখো এই বাড়ির ছেলেরা যেমন হাসিখুশি, ঠিক তেমনি রাগ সবসময় ওদের নাকের ডগায় রাগ লেগে থাকে। কিন্তু বাকিদের রাগ ওতোটা ভয়ংকর না, যতোটা ভয়ংকর শেরাজ ভাইয়ার রাগ। উনি রেগে গেলে সকলে ভয় পায়। কেউ ওনার সামনে কথা বলার সাহস পায়না। তুমিতো ম্যাচিউর। কেনো জেদ করে আগুনে ঘি ঢালছ সুমু?”
“আমি ওনাকে ভয় পায়না। আর বারবার আমাকে খাওয়ার কথা বলে, অযথা তোমার মুখটাই ব্যথা হবে, কিন্তু আমার মতের কোনো পরিবর্তন আসবে না। তোমার বারবার বলাটা আমি জেদ কমাতে অক্ষম হবে, কিন্তু আমার জেদ বাড়াতে সক্ষম হবে।”
“কে কাকে ভয় পাইনা?”
সকলে তাকাল রুমের দরজার দিকে। শেরাজ দু’হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। ইশিতা মাথায় ওড়না টেনে দাঁড়াল। সার্ভেন্টটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সুমু বড় করে ঢোক গিলে নাক পযর্ন্ত টেনে রাখা কম্বলটাকে মাথায় ওপর পযর্ন্ত তুলে দিল। ইশিতা সুমুর অবস্থা দেখে নিঃশব্দে হেসে ফেলল।
শেরাজ এগিয়ে এলো। ইশিতা খাবারের প্লেটটা নিয়ে টেবিলের ওপর রেখে সার্ভেন্টকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে গেল। সুমু কম্বলটা সরিয়ে একবার উঁকি মেরে দেখল। শেরাজ গিয়ে সুমুর পাশে বসল। সুমু পুরো মুখ ডেকে রেখেছে। শেরাজ টান মেরে কম্বলটা সরিয়ে দিয়ে বলল,
“অফিসের সব কাজ ফেলে শুধুমাত্র আপনার জন্য আবারও বাড়িতে ছুটে এলাম, খান সাহেবা। আর আপনি আমাকে দেখে মুখ লুকাচ্ছেনা? তার ওপর নাকি কিছু খাচ্ছেন না। উহুম, দিজ ইজ ভেরি ব্যাড। উঠে পড়ুন খান সাহেবা। আপনাকে এখন খেতে হবে।”
“আপনি খেয়েছেন? যে আমাকে খেতে বলছেন?”
“না খায়নি। তবে এখন আপনার সাথে খাবো।”
সুমু উঠে বসল। শেরাজ পরোটা ছিঁড়ে সুমুর মুখে দিল। সুমু খাবার চিঁবুতে চিঁবুতে বলল,
“আপনিও খান!”
শেরাজ ফলের প্লেট থেকে একপিচ আপেল তুলে মুখে নিল। সুমু সাথে সাথে সেও ব্রেকফাস্ট করে নিয়ে বলল,
“আমার অনেক কাজ আছে, সুইটহার্ট। আজ কম্পানির পোডাক্টের পাবলিসিটির জন্য কিছু ভিডিও শুট আছে। চারটার আগে বাসার ফিরতে পারব না। তোমার জন্য ফোন অর্ডার দেয়া হয়েছে। তোমায় নিচে যেতে হবেনা। ইশিতা ফোনটা রিসিভ করে নিবে। আর দুপুরের খাবারও সময়মতো রুমে দিয়ে যাবে। লক্ষী মেয়ের মতো খেয়ে নিও। আমি আজ ছোট মামানিকে ফোন করে ফিরোজাকে এই বাসাতে পাঠিয়ে দিতে বলব। আর ইশিতা তো আছেই। ভালো না লাগলে ওদের সাথে সময় কাটিও। আর নয়তো নেটফ্লিক্স দেখো। আমি তাড়াতাড়ি ফিরে আসার চেষ্টা করব। এখন আসি সুইটহার্ট।”
সুমু শেরাজের হাত ধরে বলল,
“আমার খুব খারাপ লাগছে, খান সাহেব। সকালে যা…”
“চুপ! আমি ভুলে গেছি ওইসব। তুমিও ভুলে যাও। যেখানে তোমার কোনো ভুল নেই, সেটা মনে করে কষ্ট পাওয়ার কোনো মানে হয়না। ভুলে যাও।”
সুমু আলতো হাসল। শেরাজ সুমুর কপালে একটা গাঢ় চুমু এঁকে দিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল।
পাতালপুরীর সেই বদ্ধ রুমটা থেকে আজ আবারও কারো চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসছে। নিজের রুমের মধ্যে বসে একেরপর এক ওয়াইনের গ্লাস খালি করছে সেই মানবটি। মেয়েটির চিৎকারের আওয়াজ তার কানে খুব মধুর শোনাচ্ছে, তাই সে এই অসময়ে ওয়াইনের সাথে ব্যাপারটা সেলিব্রেট করছে। হঠাৎ মাহিন নামে একটি ছেলে পারমিশন নিয়ে রুমে এলো।
“বস!”
মানবটি অনুমতি দিলো মাহিন নামক ছেলেটিকে বলার জন্য। ছেলেটি মাথা নামিয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,
“আপনার সব শত্রু এখন একই শহরে। সে কাল ফিরে এসেছে।”
ওয়াইন খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল মানবটির। উন্মাদের মতো হেসে বলল,
“নিউজ পাক্কা?”
“একদম পাক্কা নিউজ, বস। সে সাথে আরও একটি নিউজ আছে।”
“বল!”
“শুনলাম, সে নাকি বিয়ে করেছে একটা বাংলাদেশী মেয়েকে।”
“কি বলিস? সত্যি নাকি?”
“জি বস!”
“তাহলে তো একদিন ভাবিজির সাথে মিট করতে হয়। এই এস.কে’টাও না, বিয়ে করল আর আমাদের একটাবার ইনভাইট করল না। দিজ ইজ নট ফেয়ার। আমাদের তো একটাবার বলা উচিত ছিল। আফটার অল, আমরা একই ধরনের। আমাকে তো অন্তত বলতে পারত। শত্রু মনে করে বলেনি নাকি?”
“বস আর একটা কথা।”
“বল, বল!”
“অলবার্ট সিং কেসটা তুলে নিয়েছেন, কিন্তু সিআইডির এসিপি প্রশান্ত ঘোষ আদাজল খেয়ে কেসটার পেছনে লেগেছে। কেসটা তুলে নেওয়ার পরেও তিনি গোপনে ইনভেস্টিগেশন চালিয়ে যাচ্ছে।”
“আচ্ছা আমার এই ফাদার ইন ল’য়ের বাড়িতে আমার কোনো শালি বা শালা নেই?”
“আছে বস! প্রশান্ত ঘোষের দুই ছেলে আর এক মেয়ে।”
“একটা কাজ কর মাহিন। আমার এই ফাদার ইন ল’য়ের জন্য একটা লাভ লেটার লিখে ফেল। আর সে লাভ লেটার সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে আজ গভীর রাতে আমার ফাদার ইন ল’য়ের কাজে পৌঁছে দিয়ে আয়।”
“ওকে বস! আর বস এই মেয়েটাকে কি করব?”
“ওর বডির প্রতিটা পার্টস আলাদা কর। একদম মাটানের মতো করে কেঁটে জমিয়ে ভালো করে তেল মশলা দিয়ে রাতে জন্য মেয়ে মানুষের কালাভুনা রান্না কর। আর তারপর বাহিরের জঙ্গলে যতো হিংস্র পশু আছে, সবাইকে ভালো করে রাতের ডিনার করা।”
“ওকে বস!”
ছেলেটি একটু থেমে বলল,
“বস আপনি কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করি?”
মানবটি মাথা ঝাঁকাল। মাহিন বলল,
“থানাকে আপনি শশুর বাড়ি মাননে, থানার সমস্ত অফিসারদের আপনি শশুর মানেন, তাদের বউদের আপনি শাশুড়ি মানেন, তাদের ছেলেমেয়েদেরকে আপনি শালা, শালি মানেন, তাহলে বস আপনি বউটা কাকে মানেন?”
মাহিনের প্রশ্নে মানবটি চোখ তুলে তাকাল। মাহিন ভয়ে পেয়ে দু’হাত জড়ো করে বলল,
“স…সরি বস! ভুল প্রশ্ন করে থাকলে মাফ করে দিবেন। আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।”
মানবটি গা কাঁপিয়ে হেসে বলল,
“আমার যেহেতু নারীতে এর্লাজি আছে, তাই দুনিয়াতে যতো বিবাহযোগ্য মেয়ে আছে সবাই আমার বউ। আমি আবার আমার বউদের ব্যাপারে বড্ড লয়াল না দয়াল। নিজের বউ ছাড়া অন্য কোনো নারীর দিকে চোখ তুলে তাকাইনা।”
মাহিন মাথা চুলকে বলল,
“বস! দুনিয়ার সব বিবাহযোগ্য নারী যদি আপনার বউ হয়, তাহলে আর বাকি থাকে নানি- দাদি, আন্টি আর ছোট বাচ্চার বয়সি মেয়েরা। আর আপনি তাকালে তো অবশ্যই কোনো বিবাহযোগ্য মেয়ের দিকেই তাকাবেন। তাহলে, যদি দুনিয়ার বিবাহযোগ্য সব মেয়েরা আপনার বউ হয়, তাহলে দুনিয়াতে আপনার তাকানোর মতো আর কোনো মেয়েই তো বাকি রইল না। কারণ আপনার তাকানোর মতো সব মেয়েরা অলরেডি আপনার বউ।”
মানবটি ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে গা দুলিয়ে হেসে বলল,
“ইন্টেলিজেন্স! যা গিয়ে কাজে লেগে পড়।”
“ওকে বস!”
চলে গেল ছেলেটি। মানবটি ওয়াইনের মধ্যে আইস কিউব আর পুদিনাপাতা দিয়ে একেরপর এক গ্লাস খালি করার নেশায় মেতে উঠল।
বিকাল চারটায় শেরাজ বাসায় ফিরে এলো। সাথে অনেকগুলো ছেলেমেয়ে আর তিন চারটা গাড়ি ভর্তি পার্সেল এলো। আইয়ুবরাও এলো শেরাজের সাথে। শেরাজ সবাইকে নিয়ে ওপর এলো। বাহির থেকে আসা সবাইকে তাদের কাজ বুঝিয়ে দিল। ইশিতা মাথায় ওড়না দিয়ে এসে দাঁড়াল শেরাজের সামনে। মাথা নিচু করে বলল,
“ভাইয়া, সুমু দুপুরের খাবার খায়নি। আমি খাবার নিয়ে আর ওর জন্য আসা নতুন ফোনটা নিয়ে রুমে গিয়ে দেখি, ও ঘুমাচ্ছে। তাই আর ওকে বিরক্ত করিনি।”
“ও ঘুমিয়ে একদিকে ভালোই হয়েছে। বাড়ির সবাই কোথায়? মম ফিরেছে?”
“না! বড়মামনি হসপিটাল থেকে রোজা আপু আর আরিয়ান ভাইয়াকে নিয়ে ডিরেক্ট আপনার মামার বাড়িতে গিয়েছে। বড়মামনি ফোন করে বলেছেন, আজ ওখানেই থাকবে। আরিয়ান ভাইয়া রাতে ফিরে আসবে। শাহরুখ এখনো একাডেমি থেকে ফিরেনি। রিয়াজ, বড়বাবা, আব্বু আর আম্মু যার যার রুমে ঘুমাচ্ছে।”
“ওকে, তুমি যাও। এই বাড়ির সকলের থেকে বেশি আরবাজের তোমাকে প্রয়োজন। তুমি সবাইকে সময় দাও। শুধু আমাকে ভাইকে ছাড়া। এখন ওর কাছে যাও। ভুলে যেওনা ইশিতা, তোমরা একে অপরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছ। বাড়ির বউয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে, স্ত্রীর দায়িত্বতে গাফিলতি হয়ে যাচ্ছে তোমার। এই বাড়িতে অনেকগুলো কাজের মানুষ রাখা হয়েছে। তুমি এই খান বাড়ির বউ। তোমাকে এতো কাজ করতে হবেনা। সুমু এই বাড়িতে নতুন। তাই পারলে ওকে একটু গাইড কোরো। দু’বোনের মতো থেকো তোমরা। আর সবথেকে বেশি আমার ভাইটাকে সময় দিও।”
ইশিতা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,
“ভাইয়া ফিরোজা এসেছে। সুমুর রুমে সুমুর সাথে ঘুমিয়ে আছে।”
খুশিতে শেরাজের চোখমুখ চিকচিক করে উঠল। সে আর দাঁড়াল না। লোকগুলোকে কোনো সাউন্ড ছাড়া ঠিকমতো কাজ করতে বলে চলে গেল রুমে।
রুমে এসে দেখল তার খুব কাছের আর সবথেকে প্রিয় মানুষ দুজন একে অপরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। এইটুকু সময়ের মধ্যে দুজনের মধ্যে এতো ভাব জমে গেছে দেখে শেরাজ মুচকি হাসল। কিন্তু সে অবাক হলো না, কারণ তার বউয়ের মধ্যে খুব অল্প সময়ে মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পারাব মতো অসম্ভব সুন্দর প্রতিভা আছে।
শেরাজ এগিয়ে গেল বেডের কাছে। কিছুক্ষণ দুজনের দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল। আলতো করে দুজনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে দুজনের গালে ঠোঁট ছোঁয়াল। ড্রেস চেঞ্জ করে শাওয়ার নিতে চলে গেল। মিনিট পনেরোর মধ্যে শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এসে অফ হোয়াইট টি-শার্ট আর ব্ল্যাক ট্রাউজার পরে টাওয়েল গলায় ঝুলিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে পাশের রুমে চলে গেল।
রুমের মধ্যে কাজ করতে থাকা প্রতিটা মেয়ে কাজ বাদ দিয়ে শেরাজের দিকে তাকিয়ে রইল। শেরাজ গলা খাঁকি দিয়ে বলল,
“কাজ কতোদূর?”
একটা মেয়ে আল্লাদীকন্ঠে বলল,
“প্রায় হয়ে এসেছে, স্যার।”
শেরাজ তাড়া দিয়ে বলল,
“একটু ফাস্ট করুন। আমার বেগম উঠে পড়লে সারপ্রাইজটা নষ্ট হয়ে যাবে।”
মেয়েগুলো মাথা নাড়িয়ে কাজে লেগে পড়ল। শেরাজ রুম থেকে বেরিয়ে এলো। নিচে এসে ছেলেগুলোকে তাদের পেমেন্ট দিয়ে বিদায় জানালো। তারপর সারবাজের রুমে গিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় ব্যস্ত হলো। সারবাজ আজকে সকলের ভিডিও শুট নেওয়া এস.কে ফ্যাশান প্রডাক্টের ট্রেইলার এডিটিংয়ে কাজে ব্যস্ত। আইয়ুব আর রাহিন এসে থেকে ফোনে কথা বলা নিয়ে ব্যস্ত। শেরাজ দুজনের ফোন কেড়ে নিল। সে রাহিনের ফোন মিউট করে আইয়ুবের ফোন স্পিকারে দিয়ে বলল,
“এই যে আমার শালিকা প্রেমটা রাতে করিয়েন।”
অপরপাশ থেকে নাজমিন লজ্জায় আর কোনো কথা বলল না। সে লজ্জায় “শেরাজ ভাইয়া” বলে কল কেটে দিল। শেরাজ এবার রাহিনের ফোন অনমিউট করে সামিয়াকে বলল,
“আপনার পড়াশোনা নেই, শালিকা? মামাতো ভাইয়ের সাথে এতো কিসের কথা?”
অপরপাশ থেকে সামিয়া বলল,
“ভাইয়া! আমাকে রাহিন ভাইয়া কল করেছে। আমিতো পড়ছিলাম। ভাইয়া আপু কোথায়?”
“তোমার আপু ঘুমাচ্ছে। তুমি নাজমিনকে নিয়ে চুপচাপ পড়তে বসো। রিজাল্ট খারাপ হলে দুজনকেই একসাথে দুটো রিকশাওয়ালার সাথে বিয়ে দিয়ে দিবো।”
সামিয়া সেন্টি খাওয়া মুখ করে বলল,
“ভাইয়া শেষমেশ আপনিও?”
“জি, আমিও! আপনি গিয়ে পড়তে বসুন।”
শেরাজ কলটা কেটে দিয়ে দুই বন্ধুর দিকে তাকিয়ে ডেভিলমার্কা হাসি দিল। আইয়ুব আর রাহিন খেয়ে ফেলব, খেয়ে ফেলব লুক নিয়ে শেরাজের দিকে তাকিয়ে আছে। শেরাজ দুটো ফোন দুজনের দিকে এগিয়ে দিতেই দুজনে মিলে ধাওয়া করল তাকে। শেরাজ দৌড় মারল। ড্রয়িংরুমে তিন বন্ধু মিলে দুষ্টুমিতে মেতে উঠল। ওদের কাণ্ড দেখে বাকিরা হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল।
পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে ওপর থেকে মেয়েগুলো নিচে নেমে এলো। শেরাজ প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে মেয়েগুলোর দিকে তাকাল। মেয়েগুলো মধ্যে একজন বলল, “কাজ কম্পিলিট।” শেরাজ মেয়েগুলোর পেমেন্ট দিয়ে দিল। মেয়েগুলো যাওয়ার সময় শেরাজের দিকে তাকাতে তাকাতে চলে গেল। আইয়ুবরাও বিদায় নিল। সকলে চলে যেতেই শেরাজ রুমে চলে এলো। আস্তে করে সুমুকে ডেকে ঘুম থেকে তুলল। সুমু ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এলো। শেরাজ সুমুকে নিয়ে নিচে এলো। ড্রাইনিং টেবিলে নিয়ে সুমুকে বসিয়ে দিল। একজন সার্ভেন্ট এসে টেবিলে খাবার রেখে গেল। শেরাজ খাবার তুলে সুমুর মুখের সামনে ধরল। সুমু মুচকি হেসে খাবার মুখে নিল। শেরাজ নিজেও খেতে খেতে বলল,
“ফিরোজা কখন এসেছে?”
“দুপুরের দিকে।”
“ভালোই তো ভাব জমিয়ে নিয়েছ।”
“অনেক বেশি কিউট ও। আগে যখন ওকে ভিডিওতে আপনার সাথে দেখতাম, তখন ইচ্ছে করতো বাচ্চাটার গাল দুটো চটকে দেই। এতোটাই মিষ্টি লাগে ওকে দেখতে।”
কথা বলতে বলতে দুজনে খাওয়া শেষ করল। হঠাৎ শেরাজ সুমুর চোখ দু”হাত দিয়ে আটকে ধরল।
“খান সাহেব, কি করছেন?”
“চুপ! আমার সাথে চলো। একটা সারপ্রাইজ আছে তোমার জন্য।”
“সারপ্রাইজ?”
“জি ম্যাডাম! সারপ্রাইজ। এখন কথা না বলে, চলুন।”
শেরাজ সুমুকে সাবধানে ধরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে নিয়ে এলো। নিজের বেডরুমের পাশের রুমটায় সুমুকে নিয়ে ঢুকল। রুমের মধ্যে এসে সুমুর চোখ ছেড়ে দিয়ে বলল,
“জাস্ট ফর ইউ, খান সাহেবা।”
সুমু ধিরে ধিরে চোখ মেলে তাকাল। এতোক্ষণ চোখ ধরে রাখাতে সে চোখে ঝাপসা দেখল। দুহাত দিয়ে দুচোখ কচলে আবারও তাকাল। কাল যেই রুমটা একটা অফিস রুম ছিল, আজ সেই রুমটার পুরো অন্যরূপ। রুমটা একটা ছোটখাটো শপিংমলে পরিণত হয়েছে। সুমু এগিয়ে গেল। একে একে প্রতিটা জিনিস ছুঁয়ে দেখতে লাগল। একটা মেয়ের পা থেকে মাথা পযর্ন্ত যা যা প্রয়োজনীয় জিনিস লাগে, সব এনে সাজিয়ে রাখা হয়েছে রুমটাতে। বিভিন্ন রকমের শাড়ি, ড্রেস, বোরকা, হিজাব, থ্রী-পিস, অর্নামেন্টস, মেকাপ কিট, সুজ, হ্যান্ড ব্যাগ এভরিথিং। সুমু ঘুরে ঘুরে রুমটা দেখল। শেরাজ এসে তার পেছনে দাঁড়িয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“আমার সুইটহার্টের জন্য ছোট্ট একটা সারপ্রাইজ।”
“কিন্তু এতকিছু…”
“শেরাজ খানের বউ হয়ে সামান্য কিছু ড্রেসের জন্য তোমার মন খারাপ হবে, এইটা কীভাবে মেনে নেই বলো তো?”
“তাই বলে এতকিছু? আপনি কি পাগল হয়েছেন?”
‘সেটা তো তোমার প্রেমে পড়ে কবেই হয়েছি। আর এগুলো তো তোমার নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় জিনিস।”
সুমু পেছন ফিরে জড়িয়ে ধরল শেরাজকে। এমন সময় দৌড়ে রুমে এলো ফিরোজা। কোমরে দুহাত বেঁধে বলল,
“এই ভাইয়া এই, তুমি আমাল নিউ ফ্রেন্ডকে হাগ করেত তেনো?”
সুমু সরে দাঁড়াল। শেরাজ কোলে তুলে নিল ফিরোজাকে। সে ফিরোজার গালে টুপ করে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“এইটা তো আমার বউ, লাভ। তুমি যেমন বাচ্চা, আমার বউটাও বাচ্চা। আর বাচ্চাদের কি করতে হয় লাভ?”
“আদল করতে হয়, অনেত অনেত চকনেত এনে দিতে হয়।”
“হুম! তাহলে আমিও সেটাই করছিলাম লাভ। আর এমনিতেও বউ আদর করার জিনিস।”
শেরাজ একহাতে সুমুকে টেনে কাছের এনে সুমুর গালে একটা টুপ করে চুমু খেয়ে বলল,
“বউকে এইভাব চুমু খেতে হয়। আদর করতে হয়, বুঝেছ লাভ?”
ফিরোজা খুশিতে হাত তালি দিল। সুমু বড় চোখ করে তাকিয়ে বলল,
“কি করছেন আপনি? তাও এই বাচ্চা মেয়েটার সামনে?”
শেরাজ সুমুর কথা পাত্তা না দিয়ে ফিরোজাকে বলল,
“আমি কি করেছি লাভ?”
“বাততা বউকে আদল।”
শেরাজ আর সুমু একসাথে হেসে ফেলল ফিরোজার কথায়। তিনজনে দাঁড়িয়ে খুনশুটিতে মেতে উঠল।
রাতের ড্রাইনিং টেবিলে সকলে একত্রিত হলো। অনন্যা খাতুন বাড়িতে ফিরে আসেনি বলে সুমু সাহস করে ইশিতার সাহায্য নিয়ে সকলের জন্য রাতের ডিনার বানিয়েছে।
সাহাবাজ সাহেব ড্রাইনিংরুমে এলেন। সুমুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চেয়ারে বসলেন। ইশিতা আর সুমু সকলকে খাবার সার্ভ করছে। সাহাবাজ সাহেব খাবার মুখে তুলে বললেন,
“আজকের রান্নার বিভিন্ন রকমের অসাধারন টেস্ট। আজকের রান্না কে করেছে?”
ইশিতা আরবাজকে তরকারি দিতে দিতে বলল,
“আমাদের বাড়ির নতুন বউ।”
আফিয়া খাতুন বললেন,
“ভাবিজি জানতে পারলে খবর করে ছাড়বে। নতুন বউয়ের প্রথম প্রথম রান্নাঘরে ঢোকাটা পছন্দ করেন না তিনি। আর সেখানে তুমি রান্না করেছ। এই ভুল আর করোনা মামানি।”
সুমু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। সাহাবাজ সাহেব বললেন,
“সে ঠিক আছে। তবে রান্নাটা তুমি অসাধারণ করেছ মামনি।”
সুমু আলতো হেসে বলল,
“আমি একা কিছুই করিনি বাবা। ইশিতা আমাকে হেল্প না করলে, আমি কিছুই পারতাম না।”
সাহাবাজ সাহেব কিছুটা সময় নিয়ে বললেন,
“তোমার শাশুড়ির কথায় তুমি কিছু মনে করোনা, মামনি। ও একটু রাগি টাইপ। কিন্তু ওর মনটা অনেক ভালো। প্রথম প্রথমতো, তাই তোমাকে মেনে নিতে পারছেনা। ইনশাআল্লাহ! আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। আর তোমরা দাঁড়িয়ে আছো কেনো? তুমি আর ইশিতাও বসে যাও।”
“না বাবা। আপনারা আগে খেয়ে নিন। আমি আর ইশিতা পরে খাবো।”
শেহেজাদ সাহেব খাবার মুখে নিয়ে বললেন,
“তুমি এই বাড়ির বউ। তোমার থেকে লুকানোর কিছুই নেই। শেরাজ ভাবিজির খুব আদরের। ভাবিজি তার ভাইয়ের মেয়ে রোজার সাথে আমাদের শেরাজের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তাই হঠাৎ করেই তোমাকে মেনে নিতে পারছেনা। তবে তুমি কোনো চিন্তা করোনা, সব ঠিক হয়ে যাবে। আর রান্নাটা সত্যি তুমি অসাধারন করেছ।”
আফিয়া খাতুন বললেন,
“আমরা আছি তো তোমার সাথে। ভাবিজি বেশিদিন তোমার ওপর রাগ করে থাকতে পারবেনা। সে সব ভুলে ঠিক তোমাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসবে।”
সারবাজ বলল,
“সুমুর মধ্যে মানুষের মন জয় করে নেবার মতো অসাধারণ ক্ষমতা আছে। সুমু অবশ্যই পারবে বড়মামনির মন জয় করে নিতে।”
রিয়াজ দুষ্টুমি করে বললো,
“তোমাদের এতো কথা কিসের? সব সমস্যার সমাধান আমি দিচ্ছি। মম যখন ভাবিজিকে ব্রোর বউ হিসাবে মেনে নিতে পারছেনা, তখন ব্রোর আর ভাবিজির ডিভোর্স করিয়ে দাও। আর তারপর, রোজা আপুর সাথে ব্রোর আর ভাবিজির সাথে আমার বিয়ে করিয়ে দাও।”
সকলে হেসে উঠল রিয়াজের কথায়। শেরাজ কোনোদিকে পাত্তা না দিয়ে চুপচাপ খাচ্ছে। আরবাজ রিয়াজের মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলল,
“বয়স কতো তোর? এই বয়সে বিয়ের কথা বলছিস?”
“তুমিওতো বড় ভাইদের আগে বিয়ে করেছ। আমি কি তোমাকে কিছু বলেছি?”
“আমার তো তাও বিয়ের বয়স হয়েছে। তোর তো তা হয়নি।”
দুই ভাইয়ের খুনশুটির দেখতে দেখতে সুমু ভাবনায় পড়ল। এতোগুলো মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছে সে। এতোগুলো মানুষ তার পাশে আছে। এই ভালোবাসাগুলো তার সব কষ্ট দূর করে দিতে সক্ষম। আর সবথেকে বড় কথা তার খান সাহেব তার পাশে আছে। এতোগুলো মানুষের ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে সে অবশ্যই তার শাশুড়ির মন জিতে নিতে পারবে। তারপর সে এই প্রতিটি ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে একটা সুখের সংসার গড়ে তুলবে। তার একটা সংসার হবে। একান্তই তার।
সুমুর ভাবনার মাঝে ফিরোজা দৌড়ে এসে সুমুর হাত ধরে বলল,
“এই নিউ ফ্রেন্ড! আমাতে থায়িয়ে দাও।”
ইশিতা হেসে বলল,
“বাহ! নিউ ফ্রেন্ড পেয়ে আমাকে ভুলে গেছ তুমি?”
“তোমাল হাতে তো রোজ থাই। আজ আমি আমাল নিউ ফ্রেন্ডের হাতে থাবো।”
সুমু হালকা গোলাপী লিপস্টিক রাঙা ঠোঁটে মৃদু হাসল। সে নিজের জন্য আর ফিরোজার জন্য ঝাল ছাড়া মাংস রান্না করেছে। একটা প্লেটে ফিরোজার জন্য খাবার তুলে নিয়ে সোফায় গিয়ে বসল।
রাত এগারোটার দিকে সুমুরা রুমে এলো। শেরাজের সাথে সাথে ফিরোজাও এলো। ফিরোজা আজ সুমুদের সাথে ঘুমাবে। শেরাজ বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ল। ফিরোজ শেরাজের বুকের ওপর বসল। সুমু রুমের দরজা লক করে রুমের লাইট অফ করে দিয়ে এলইডি লাইট অন করে দিল। মুহুর্তেই রুমটা লাল, নীল, পার্পেল বর্ণের আলোতে আলোকিত হয়ে গেল। সুমু এসে শেরাজের পাশে শুয়ে পড়ল। শেরাজ ফিরোজাকে বলল,
“লাভ চলো তোমার একটা স্নাপ ভিডিও শুট করি।”
ফিরোজা রাজি হলো। সুমু আলতো হাতে ফিরোজার গাল টেনে দিল। শেরাজ সুমুর ফোন থেকে “ডানকি” মুভির “লুট পুট গেয়া” গানটা প্লে করল, আর নিজের ফোনে স্নাপে গিয়ে ক্যামেরা অন করল। গান শুরু হতেই ফিরোজা হাত তালি দিল। শেরাজ “ছাবার” বলে ফিরোজার হাত ধরল। সুমু শুয়ে শুয়ে দুজনের কান্ড দেখছে। ফিরোজা গানের সাথে ঠোঁট মেলাল। মেয়েটার পরনে স্কাই ব্লু কালারের টি-শার্ট আর লেডিস জিন্স প্যান্ট। বাচ্চা মেয়েটা চোখ বন্ধ করে ঘাড় পেছনের দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়ে “লুট পুট গেয়া” সুর টেনে টেনে গান গাইছে। শেরাজ ফ্রন্ট ক্যামেরা দিল। ফিরোজা শেরাজের মুখের ওপর ঝুঁকে ক্যামেরার দিকে তাকাল। শেরাজ ফিরোজাকে একহাতে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেয়ে নিজেও তাল মেলাল ফিরোজার সাথে। ফিরোজা উঠে শেরাজের বুকের ওপর দু’হাত রেখে, কে কত জোরে গান গাইতে পারে এমনভাবে তাল মেলাল। একে অপরের মুখের কাছে গিয়ে “লুট পুট গেয়া” বলতে লাগল। দুজনে গাল ফুলিয়ে গানের তালে তালে দুষ্টুমি শুরু করল। শেরাজ গা ঝাঁকিয়ে ড্যান্স শুরু করল। সুমু পাশে শুয়ে দুজনের কাণ্ড দেখে হাসতে হাসতে শেষ। দুষ্টুমি করতে করতে ফিরোজা শেরাজের বুকের ওপর ঘুমিয়ে পড়ল। সুমু গান অফ করে দিল। শেরাজ আলগোছে ফিরোজাকে পাশে শুইয়ে দিয়ে সুমুকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিল। সুমুও পরম আবেশে চোখ বন্ধ করল।
খান সাহেব পর্ব ৩৫
রাত দুটোর দিকে বাড়ির কলিংবেল বেজে উঠল। ঘুম জড়ানো চোখে একজন সার্ভেন্ট এসে বাড়ির দরজা খুলে দিল। আরিয়ান বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। নাকে তার ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ। নাকটার ভালোই ড্যামেজ হয়েছে। সার্ভেন্ট’টি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে বলল,
“স্যার! আপনি ডিনার করবেন?”
আরিয়ান কোনো কথা না বলে উপরে চলে গেল। নিজের রুমে যেতে গিয়ে শেরাজের রুমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। রুমের দরজার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটে বাঁকা হাসি টেনে নিজের রুমে চলে গেল।
