Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯৪

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯৪

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯৪
ইশরাত জাহান জেরিন

চিত্রা গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে মূর্তির মতো বসে আছে। ফারাজ বসে আছে তার পাশে। ফারাজের কপাল কুঁচকে আছে। সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তার সামনে বসে থাকা লোকটিকে দেখছে। এইযে তার সামনে যেই লোকটা বসে আছে নিজের টাক মাথা দিয়ে তার তাম চয়ন কায়সার। সম্পর্কে নাকি ফারাজের শশুর হয়। তবে সন্দেহের ব্যাপার চিত্রার গায়ের রঙ থেকে শুরু করে কোনো কিছু এই লোকের সাথে মিলছে না৷ এখন তো ফারাজ ভালো মুশকিলে পড়ল। ডিএনএ টেস্ট করিয়ে দেখবে নাকি? মানে তার বউ যেই সেয়ানা। দেখা যাবে কাকে আবার বাপ বানিয়ে এনে বলছে, আমি ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানি না। চয়ন কায়সাকে চিত্রা নিজের সাথে করে বাসায় এনেছে। চয়ন কায়সার আবার খুঁটিয়ে বাড়িটা ভালো করে দেখল। চয়ন কায়সার তো কিশোরগঞ্জ ছেড়েছিলেন ছোট বেলায়। দেশে তার আসা হয়নি। তবে তার বড় ভাই, মানে বজ্রের বাবা এসেছে অনেকবার। এলাহী বাড়িতে প্রবেশ করে চয়ন কায়সার বুঝলেন তার জামাইয়ের ভালো টাকা পয়সা আছে। খালি ভালো? একেবারে উত্তম!

জমিদার বংশের ছেলে তার জামাই। তবে তাতে তার কী? ক্রিমিনালদের টাকা থাকবে এটা স্বাভাবিক। মেয়েকে এত ভালোবাসা দিয়ে এই দিন দেখার জন্য বড় করে নিজের আইনের পেশার রানি করেছিল? কত সুন্দর বজ্রর সাথে বিয়ে ঠিক করেছিল, এদিকে দুই ভাই-বোন মিলে দেশে এসে বিয়ের দলিলে সই করে বসে আছে৷ মেয়ে তাকে বলল, “বাবা আমি ক্রিমিনাল ফারাজ এলাহীকে ধরতে বাংলাদেশ যাচ্ছি ” এই তার ধরা? সে ধরেছে নাকি ধরা খেয়েছে? মান ইজ্জত একেবারে রইল না৷ কোন অবস্থায় এসে পড়েছে সে? এখন আবার সে নানা হবে। খুশির সংবাদেও তার মাথায় একটাই কথা আসছে, আইন আর বেআইন একঘরে সারাজীবন থাকতে পারবে তো? আর বাচ্চাটা কার মতো হবে? মানে বাবার মতো ক্রিমিনাল নাকি মায়ের মতো আইনের লোক? টেনশনে মাথায় ওইযে একটা চুল হারবাল তেল লাগানোর ফলে উঠেছিল তাও ঝরে পড়ে গেল। চয়ন কায়সারের এখনও মনে আছে, চিত্রা যখন তার এত বুদ্ধি করে একজন ইতালিয়ান স্মাগলারকে বিয়ে করার কথাটা তাকে জানালো সেদিন ১০৩ ডিগ্রি জ্বর উঠেছিল তার। স্ট্রোক করেনি এটাই তো অনেক। পুরো ৭২ ঘন্টা চিত্রার সাথে যোগাযোগ করেনি রাগ করে সে। মেয়েটাও হয়েছে জিদি৷ সে নিজের কর্মেরই অটুট রইল। একটা কল করল না।

শেষে চয়ন কায়সার নিজে বজ্রর মাধ্যমে চিত্রার সাথে কথা বলল। জামাই যেহেতু পাপ ছেড়েই দিয়েছে তাহলে আর কি করার। কিন্তু পাপ তো পাপই। এত বড় মাপের একজন ক্রিমিনালের সাথে চয়ন কায়সারকে সামনে থেকে দেখবে, কথা বলতে হবে অথচ তার পেছনে বন্ধুকের সরু নলটা ঢুকিয়ে দুটো গুলি ছাড়তে পারবে না! চয়ন কায়সারের জন্য রুম তৈরি করা হয়েছে। চিত্রা যখন তাকে জিজ্ঞেস করল, “বাবা তুমি এখানে কেন জানতে পারি? তারচেয়েও বড় কথা তুমি ওই গোডাউনে কেমন করে?” চয়ন তখন সব খুলে বলল। কিছুদিন আগে যে ফারাজের গোডাউনে আগুন, আর তীর লাগার পর চয়ন কায়সারকে বিষয়টি খুঁটিয়ে দেখতে বলেছিল চিত্রা, তখন নাম উঠে আসে জার্মানির গ্যাংস্টার অ্যাপোলোর। তারই কাজ এসব। চয়ন পুরোপুরি কারণ গুলো এখনো উদঘাটন করতে না পারলেও এটা জানতে পেরেছে অ্যাপোলো ফারাজের ক্ষতি করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে। বাংলাদেশ লোক লাগিয়েছে। চয়ন কায়সার তো এসেছিল বড় ধরনের ক্ষতি থেকে উদ্ধার করতে বাংলাদেশ। ওদিকে তার লোকেরা ইতালিতে বসবাস করা অ্যাপোলোকে ধরে ফেলেছে। তবে এখানে এসে পরিকল্পনা অনুযায়ী সে কিছু করার আগেই দেখছে তার এবং তার মেয়ের জামাই একা হাতে সব করে বসে আছে। চমৎকার বিষয়! কিন্তু মানল সে মেয়ের জামাই দুধে ধোঁয়া তুলশি পাতা হয়ে গেছে কিন্তু তবুও ক্রিমিনলারা তার কাছে এলার্জির মতোই। ওই ফারাজের দিকে তাকালেই এলার্জি হয়ে যাচ্ছে। বাবা কি মুশকিল! তার এত বুদ্ধিমান মেয়েটা শেষে একজন ক্রিমিনালকে ভালোবাসে? মনে হয় এই ছেলে তার মেয়েকে তাবিজ করেছে। চয়ন কায়সার রুমে যাওয়ার আগে চিত্রাকে জিজ্ঞেস করল, “ইতালি ফিরবে কবে?”

“ফারাজ যখন নিয়ে যাবে তখন।”
“স্বামীভক্ত হয়ে গেছো।”
ফারাজ পাশ থেকে বলল, “স্বামী ভক্তের কি আছে? বউয়ের বেশি ভালোবাসলে তারাও স্বামীকে এতখানিই ভালোবাসা ব্যাক দেয়। মনে হয় শাশুড়ীকে আপনিও ভালোবাসেন না, আর আপনাকেও ভালোবাসা ব্যাক দেয়নি। টু মাচ ছোটলোকি কারবার।”
চয়ন কায়সার ক্ষেপা পাগলাটে কণ্ঠে বলল, “এই…..এই মুখ সামলে, চিত্রার মা আর আমার প্রেমের বিয়ে। তুমি কি বুঝবে? চিত্রার মাও আমাকে অনেক ভালোবাসে।”
“তাই তো দেখছি, নইলে টাকলা, কাইল্লা বেডারে কেন বিয়ে করবে। মনে হয় আপনিও তাবিজ করেছেন?”
চয়ন কায়সার দাঁত চেপে বললেন, “এই ফারাজ, তোমার সাহস তো কম না! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে টাকলা বলছো?”
ফারাজ কাঁধ ঝাঁকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “টাকলা বলিনি, বলেছি ‘ন্যাচারালি এয়ার কন্ডিশন্ড হেড’। গরমে তো আপনারই আরাম লাগে তাই না।”

চিত্রা মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে। চয়ন কায়সার চোখ কুঁচকে বললেন, “চিত্রা! তুমি হাসছো?”
চিত্রা গম্ভীর হওয়ার অভিনয় করে বলল, “না না, আমি তো কাঁদছি। আবেগে… এত ভালোবাসা দেখে!”
ফারাজ সাথে সাথে যোগ করল, “হ্যাঁ, শাশুরজি, আর শাশুমার লাভ স্টোরি তো সিনেমা হওয়া উচিত ‘টাকলা প্রেমিকের তাবিজ কাহিনী’!”
চিত্রা এবার হেসে ফেটে পড়ল, “স্টপ! প্লিজ!”
চয়ন গজগজ করতে করতে বলল, “এই ছেলে একদম অসভ্য…”
ফারাজ মুচকি হেসে বলল, “অসভ্য না শাশুরজি, আপগ্রেডেড ভার্সন। বুড়োদের একটু শকই লাগে।”
চয়ন কায়সার গজগজ করতে করতে রুমে ঢুকতে যাবে, হঠাৎ আবার ঘুরে দাঁড়ালেন, “এই ছেলে! আমার সামনে এত কথা বলো কীভাবে?”

ফারাজ একদম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে, “অনুশীলন শাশুরজি। ছোটবেলা থেকেই বড়দের সাথে কথা বলার ট্রেনিং নিয়েছি।”
চয়ন চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করলেন,”কোন বড়রা?”
ফারাজ মুচকি হেসে, “যারা রাগলে যুক্তি ভুলে যায়… ঠিক আপনার মতো।”
চিত্রা এবার সত্যি সত্যি দেয়ালে হেলান দিয়ে হাসতে লাগল। চয়ন ক্ষেপে গিয়ে বলল, “চিত্রা! তুমি কিছু বলছ না কেন তোমার ক্রিমিনাল স্বামীকে?”
চিত্রা হেসেই বলল, ” আমি বাবা নিরপেক্ষ!”
ফারাজ সাথে সাথে বলল, “দেখলেন শাশুরজি? বউও সেফ প্লে করছে। আমি একাই লড়ছি আপনার সাথে!”
চয়ন তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন, “তুমি লড়ছ? তুমি তো শুধু মুখ চালাচ্ছো!”
ফারাজ ভ্রু তুলে বলল, “মুখ চালাই ঠিকই, কিন্তু হারি না এটাই তো সমস্যা!”
চয়ন কায়সার মাথা নেড়ে বললেন, “এই ছেলেকে সামলানো আমার কাজ না…”
ফারাজ দ্রুত বলল,

“ঠিকই বলেছেন, এটা আপনার কাজ কেন হবে? আমাকে সামলানো তো আমার বউ, চিত্রার ফুল-টাইম জব!”
চিত্রা চোখ রাঙিয়ে, ” ইশ কি যে বলেন না।”
“ওলে আমার বউটা দেখি লজ্জা পেয়েছে।”
চয়ন দূর থেকে দেখে বলল, “এইসবই হচ্ছে! আমার সামনে রোমান্স!”
ফারাজ হেসে বলল, “শাশুরজি, আপনি চাইলে চোখ বন্ধ করে নিতে পারেন। ফ্রি অপশন!”
চয়ন রাগে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “আমি একদিন এই ছেলেকে…!”
ফারাজ পিছন থেকে চিৎকার করে বলল, “ভালোবাসবেন! জানি গো জানি, শেষে সবাই আমাকে ভালোবাসে!”
চিত্রা হেসে বলল, “নিজের উপর কনফিডেন্স দেখো!”
ফারাজ চোখ টিপে বলল, “কারণ আমি স্পেশাল এডিশন! দুনিয়ায় একপিস।”

হলুদ ফিতা টেনে ঘিরে ফেলা হয়েছে চারপাশ।
“কেউ সামনে আসবেন না!” একজন কনস্টেবল বারবার চিৎকার করছে। নদীর পাড়ে ভিড় জমেছে। গ্রামের মানুষজন সব দূরে দাঁড়িয়ে আছে। লাশ দেখার চেষ্টা করছে , কিন্তু পুলিশ কাউকেই কাছে যেতে দিচ্ছে না। নদীর ধারে কাদা ভেজা জায়গাটায় পড়ে আছে লাশটা। একজন সাব-ইন্সপেক্টর নিচু হয়ে দেখে উঠে বলল, “ এটা সুইসাইডও হতে পারে… পানিতে পড়ে গেছে হয়তো।”
আরেকজন মাথা নাড়িয়ে বলল, “কিন্তু গলার দাগটা…”
“ডাউটফুল… নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না এখনই।”

তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে, কিন্তু সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। ঠিক তখনই দূর থেকে একটা কালো গাড়ি ধীরে ধীরে এসে থামল। চারপাশে হালকা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল, “বড় অফিসার আইছে…” গাড়ির দরজা খুলে নামল ইন্সপেক্টর অনুলিপি। মেইন ইনভেস্টিগেশন অফিসার সে। গাঢ় কালো রঙের সানগ্লাস তার চোখে।
সে ধীরে ধীরে সামনে এগোল। একজন কনস্টেবল তাড়াতাড়ি ফিতা সরিয়ে দিল। “ম্যাম।”
অনু কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ সরাসরি গিয়ে পড়ল লাশটার ওপর। একটু দূরে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
নিচু হয়ে বসস। লাশটার মুখটা কাদার ভেতর থেকে একটু তুলে ধরতেই হঠাৎই তাঁর হাত থেমে গেল।
চোখের পেছনে লুকানো দৃষ্টি যেন জমে গেল এক জায়গায়। সানগ্লাসটা ধীরে খুলল সে। এবার পরিষ্কার দেখা গেল। তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময়। “সোহান পালোয়ান?”

আজ তিন দিন দিন গেছে। রমজান মাসও শুরু হয়েছে।
ফারাজ যে নাকি জীবনে কোনোদিন রোজা রাখেনি এই প্রথম রোজা রাখছে। আর সেটা ঠিকমতোই রাখছে।
কিন্তু সমস্যা একটাই খালি পেটে থাকলে তার মেজাজ ভয়ংকর হয়ে যায়। তবুও আজ সে নিজেকে সামলে রেখেছে। অস্বাভাবিকভাবে শান্ত থাকার চেষ্টা করে।
বিকেলের দিকে তারা দু’জন গেল মার্জিয়ার বাড়িতে। বাজিপুরে থাকতে থাকতে কেমন যেন একটা মায়া হয়ে গেছে এই জায়গার প্রতি। তবে ফারাজের এখানে আসলে হয়তো তেমন একটা ভালো লাগে না। না লাগারই কথা। তার মায়ের মৃত্যু এখানে হয়েছে! মার্জিয়া দরজা খুলতেই মৃদু হাসল।

“ভিতরে আসো।” তারা বসলো। তিনদিন আগে সোহান পালোয়ানের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যু বলার থেকে ভালো আত্মহত্যা বলা। নিজেকে নিজে আত্মহত্যার মাধ্যমে শাস্তি দিয়েছে সে। মরার আগে তার ভাই সুমনকে দিয়ে একটা নথিপত্র লেখায়। কিংবা ওটাতে যা হিসেবে ধরা যায়। এই যাবত কালীন সোহান যাদের হত্যা করেছে। যার সাথে যা করেছে সব তাতে আত্মহত্যার আগে লিখে রেখে গিয়েছিল। মরার আগে নাকি সুমনকে বলেছিল এটা যেন সকালে থানার অফিসার অনুলিপির হাতে দেওয়া হয়। এমনকি নিজের সব জায়গা জমিও সুমনকে বলে গিয়েছে যেন দান করে দেওয়া হয়। সুমন তো তখনও বুঝতে পারেনি এতকিছু যে হয়ে যাবে। তবে চিত্রা এইটুকু ভেবে খুশি হয়েছে এখন আর দুনিয়ার চোখে মিতালি, নিলুফা খারাপ হবে না। আর তাদের গায়ে বদনাম থাকবে না। সবাই এখন জানবে, ওরা ভালো ছিল। কেউ নোংরা ছিল না। মার্জিয়াও এখন তার ছেলে-বউয়ের খুনি কে তা জানে। বাকিরাও জানবে। তবে সোহাগের বউ জান্নাতের মৃত্যু কি তবে রহস্য হয়েই থাকবে? ওই নথিপত্রে জান্নাতের সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। চিত্রার সময় কিশোরগঞ্জে শেষ। জলদি সে ফিরে যাবে ইতালি। এখনই সবাইকে কেমন যেন মনে পড়ছে। তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত এই কিশোরগঞ্জ, এই হাওর, এই মানুষগুলোর থেকেই পেয়েছে। হঠাৎ দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল সোহাগ দাঁড়িয়ে আছে।

“চিত্রা…”
চিত্রা মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। দেখতে পেল সোহাগকে।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। “আমি… তোমার সাথে একটু কথা বলতে পারি?”
মার্জিয়া চুপ। ফারাজও চুপ। চিত্রা কিছু বলার আগে স্বাভাবিকভাবেই একবার তাকাল ফারাজের দিকে।
তাদের চোখে চোখ পড়ল। ফারাজ ধীরে, খুব সামান্য মাথা নাড়ল। চিত্রা আবার সোহাগের দিকে তাকাল।
“আচ্ছা… চলো।” দু’জন ছাদে গেল।
ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে দু’জনে। সোহাগ রেলিংয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। নিচের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। চিত্রা ধীরে ধীরে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল, কিন্তু কিছু বলল না। সোহাগ নিজেই প্রথম কথা বলল।
“তুমি খুশি তো, চিত্রা?”
চিত্রা একটু থামল। “হ্যাঁ… আমি খুশি।”
সোহাগ হালকা হেসে মাথা নাড়ল।
“জানতাম… তুমি এমনই বলবে।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,

“আমি চেষ্টা করেছিলাম, জানো? নিজের মতো করে… তোমাকে ভালো রাখার। কিন্তু মনে হয়, আমার চেষ্টাটা তোমার জন্য না… আমার নিজের জন্য ছিল।”
চিত্রা এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল। “না, সোহাগ। তুমি সত্যি ভালোবেসেছিলে। সেটা আমি জানি। কিন্তু সব ভালোবাসা… একসাথে পূর্ণতা পায় না।”
সোহাগ এবার হেসে বলল, “একতরফা ভালোবাসা… সিনেমায় সুন্দর লাগে। বাস্তবে না।”
চিত্রা একটু এগিয়ে এসে শান্ত গলায় বলল, “তবুও এটা খারাপ না। কারণ তুমি কাউকে সত্যি করে ভালোবেসেছো। সবাই পারে না।”
সোহাগ চুপ। চিত্রা ধীরে ধীরে বলল, “জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না, সোহাগ। তুমি আমার জন্য থেমে থেকো না। তোমার নিজের একটা জীবন আছে… নিজের গল্প আছে।”
সোহাগ মৃদু গলায় বলল, “সহজ না, চিত্রা।”

“জানি,” চিত্রা মাথা নাড়ল, “কিন্তু অসম্ভবও না। আজ না পারলে কাল… কাল না পারলে তার পরের দিন। কিন্তু একদিন তুমি পারবেই।” সে একটু থেমে আবার বলল, “আর একটা কথা মনে রাখো… আল্লাহ আমাদের জন্য যা ঠিক করে রাখেন, সেটাই শেষ পর্যন্ত হয়। হয়তো আমার আর তোমার গল্পটা এমনই হওয়ার ছিল। আর তারচেয়ে বড় কথা, তুমি জানতে আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি তবুও আমায় ভালোবেসেছ এটাই তো ভুল।”
সোহাগ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আর ফারাজ?”
চিত্রার ঠোঁটে হাসি ফুটল। “ও আমার তকদির।” এই প্রথম সোহাগ সরাসরি তার চোখে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। “তাহলে… আমি দোয়া করি, তোমরা সুখে থাকো।”
“তুমিও সুখী হবে, সোহাগ। শুধু নিজেকে একটা সুযোগ দাও।”
সোহাগ আকাশের দিকে তাকাল। সন্ধ্যার আলো ফিকে হয়ে আসছে।
“তুমি যেটা বললে… মুভ অন, নতুন জীবন সব ঠিক। সবাই পারে। কিন্তু আমি না, চিত্রা।”
চিত্রা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “কেন পারবে না?”
“কারণ সবাই এক রকম না। কিছু মানুষ থাকে… যারা একবার ভালোবাসে, তারপর আর পারে না।”
চিত্রা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সোহাগ থামাল,
“না, তুমি বোঝাতে চাও আমি বুঝি। জীবন থেমে থাকে না, এই ডায়লগগুলোও জানি। কিন্তু অন্তর তো মানে না চিত্রা।”

চিত্রা এবার ধীরে বলল, “তুমি নিজের ওপর জোর করছো, সোহাগ।”
“না,” সোহাগ মাথা নাড়ল, “আমি নিজের সাথে সৎ থাকছি।” কিছুক্ষণ চুপ। দূরে একটা পাখি উড়ে গেল।
সোহাগ আবার বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি। এটা কোনো শখ না, না কোনো ফেজ। এটা আমার জন্য… শেষ সত্যি। তুমি থাকো বা না থাকো এই ভালোবাসাটা থাকবে।”
চিত্রার চোখে একরাশ অসহায়তা, “কিন্তু এতে তুমি কষ্ট পাবে…”
“পাচ্ছি তো,” সোহাগ শান্ত গলায় বলল, “কিন্তু এটাও আমারই পছন্দ। সব ভালোবাসার শেষ সুখ না, চিত্রা। কিছু ভালোবাসা শুধু… থাকে, মানুষটা নয়।”
চিত্রা এবার একটু এগিয়ে এসে বলল, “তুমি কি সত্যি চাও তোমার পুরো জীবনটা একটা অসমাপ্ত গল্প হয়ে থাকুক?”
সোহাগ মৃদু হেসে তাকাল, “অসমাপ্ত না। আমার কাছে এটা সম্পূর্ণ। আমি তোমাকে ভালোবেসেছি এটাই আমার গল্পের শেষ।”

চিত্রা চুপ হয়ে গেল। সে বুঝছে এই জায়গায় যুক্তি চলে না। সোহাগ ধীরে ধীরে বলল,
“তুমি ফারাজের সাথে সুখে থাকো। সত্যি বলছি, আমি খুশি হই এটা ভেবে তুমি সুখী আছো। তবে আমাকে বদলাতে বলো না।”
চিত্রার গলা একটু কেঁপে উঠল, “তুমি কি কখনোই… চেষ্টা করবে না?”
সোহাগ একটু ভেবে মাথা নাড়ল, “চেষ্টা করব না, এটা না। কিন্তু আমি জানি, পারব না। কারণ আমি পারতেও চাই না।”
চিত্রা চোখ নামিয়ে ফেলল। সোহাগ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিছু মানুষ থাকে, যারা এক তরফা ভালোবাসাকেই নিজের জীবন বানিয়ে নেয়। আমি তাদের একজন।”
চিত্রা ধীরে বলল, “এটা কি তোমার জন্য ঠিক?”
“ঠিক-ভুল জানি না। কিন্তু এটা আমার সত্যি।”
দু’জনেই চুপ হয়ে গেল। নিচে থেকে ফারাজের ডাক এলো, “চিত্রা!”

“আসছি ভালো থেকো। এতগুলো দিন তো চলেই গেছে। আশা করছি বাকিটা জীবনও এভাবেই কেটে যাবে।”
সোহাগ জবাব দিলো না। চিত্রা চলে গেল। সে কেবল তাকিয়ে রইল। হঠাৎ আকাশের মেঘের গর্জনের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভালো থাকব? তুমি ওপরটা দেখলে ভেতরটা না। সময় চলে গেল, তবে আমি ভিরু তোমায় কোনোদিন বলতেই পারলাম না থাকতে চাইলে এখনই থাকো বিকেলের রোদ ঢলে গেলে,
অভিমানের ছায়া লম্বা হয়ে যাবে।”
বিজলী চমকে উঠল। সোহাগ পুনরায় চিত্রার কথা ভেবে এবার অভিমানের ভারি পাল্লা দিয়ে গুনগুনিয়ে উঠল,

~এই সন্ধ্যায়, দুচোখ সাগরে, বুকের পাঁজড়ে
ভেসে যায়
অবাক জোছনায় লুকিয়ে রেখেছি
ভেজা চোখ দেখাইনি তোমায়
এই অবেলায়, তোমারই আকাশে,
নিরব আপোষে ভেসে যায়
সেই ভীষন শীতল ভেজা চোখ
কখনো দেখাইনি তোমায়
কেউ কোথাও ভালো নেই যেন সেই
কতকাল আর হাতে হাত অবেলায়?
কতকাল আর ভুল অবসন্ন বিকেলে
ভেজা চোখ দেখাইনি তোমায়~

মার্জিয়া বেগমের বাড়ির বারান্দা পেরিয়ে বের হতেই হঠাৎ করে আকাশটা যেন ফেটে গেল। অঝোরে বৃষ্টি নামল চারদিকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চারপাশ ঝাপসা হয়ে গেল বৃষ্টির পর্দায়। চিত্রা থমকে দাঁড়াল। সে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ছুঁতে চাইল, কিন্তু পরক্ষণেই হাতটা নামিয়ে নিল। নিজেকে শক্ত করে ফেলল। ফারাজ পাশেই দাঁড়িয়ে, ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ফারাজ ধীরে বলল,
“ কী হলো? থেমে গেলে কেন?”
চিত্রা হেসে বলল, “কিছু না… গাড়িতে যাই চল।”
ফারাজ একটু এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল।
“ তুমি বৃষ্টি ভালোবাসো, তাই না?”
চিত্রা চোখ নামিয়ে বলল, “ ভালোবাসি… কিন্তু”
“কিন্তু আমি বকা দেবো, তাই না?”
চিত্রা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল, “ হ্যাঁ… একটু তো দেবেনই।”
হঠাৎ ফারাজের কণ্ঠটা নরম হয়ে গেল। “ বৃষ্টিতে ভিজবে?” একটু থেমে, তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “চলো ভিজি।”

চিত্রা অবাক হয়ে তাকাল। “ আপনি… বকবেন না?”
ফারাজ হেসে মাথা নেড়ে বলল, “ আজকে না। আজকে আমি তোমাকে থামাবো না।”
চিত্রার চোখে এবার আর বাঁধ মানল না উচ্ছ্বাস। সে আস্তে করে বৃষ্টির মধ্যে পা রাখল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার চুল, শাড়ি, সব ভিজে গেল। সে দু’হাত মেলে ঘুরে দাঁড়াল, মুখ তুলে বৃষ্টিকে ছুঁল।
“ এতদিন পরে…!”
ফারাজ দাঁড়িয়ে দেখছে। তারপর ধীরে ধীরে সেও এগিয়ে এল। বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে চিত্রার কাছে গিয়ে থামল। চিত্রা হেসে বলল, “ দেখছেন? আমি আবার বাচ্চাদের মতো হয়ে গেছি।”
ফারাজ মৃদু স্বরে বলল, “ তুমি এমনই… আর এইটাই আমি ভালোবাসি।”
চিত্রা একটু থেমে তাকাল তার দিকে, “আপনি দেখি বদলে গেছেন।”

“ কেমন?”
“ আগে আপনি আমাকে বৃষ্টিতে দাঁড়াতেই দিতেন না।”
ফারাজ হেসে বলল, “ আগে ভয় পেতাম… এখনো পাই।” একটু কাছে এসে বলল, “ কিন্তু আজকে মনে হলো, তোমার এই হাসিটা কোনো কিছুর জন্য থামানো উচিত না।
বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে চিত্রার গাল বেয়ে। ফারাজ ধীরে হাত বাড়িয়ে চিত্রার কপালের ভেজা চুলগুলো সরিয়ে দিল। তারপর খুব যত্ন করে তার কপালে একটা চুমু খেল। চিত্রা চোখ বন্ধ করে ফেলল। ফারাজ ফিসফিস করে বলল,

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯৩

“ আমায় আবারও বিয়ে করবে?”
চিত্রা ধীরে চোখ খুলল।
ফারাজ আবার বলল, “ তুমি… আরেকবার মিসেস এলাহী হতে প্রস্তুত?”
চিত্রার ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটল।
সে ফিসফিস করে বলল, “যদি আপনি আমাকে কখন না ছেড়ে যান। বলুন যাবেন?”
ফারাজ সাথে সাথে বলল, “ কখনো না।”
ফারাজ চিত্রাকে জড়িয়ে ধরল। বৃষ্টি ভালোবাসার আবেসে তাদের ভিজিয়ে দিলো।

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯৫

2 COMMENTS

Comments are closed.