চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৫
আয়াত বিনতে নূর
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। ঢাকা শহর, যে শহর সারাদিন শব্দে, আলোয় আর ব্যস্ততায় দম নিতে ভুলে যায় সেই শহরটাই যেন এই মুহূর্তে একটু থেমে আছে। রাস্তাগুলো ফাঁকা, বাতাসে এক ধরনের নরম নিস্তব্ধতা। দূরে কোথাও হালকা কুয়াশার আস্তরণ, আর মাঝে মাঝে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক নীরবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
ঠিক সেই সময় কালো রঙের মার্সিডিজটা ধীরে এসে থামল চৌধুরী বাড়ির সামনে। গাড়ির হেডলাইট নিভতেই চারপাশটা যেন আরও গভীর অন্ধকারে ঢেকে গেল।
ড্রাইভিং সিটে বসা ফারিসের মুখটা অস্বাভাবিক গম্ভীর। চোয়াল শক্ত, চোখে চাপা চিন্তার ছাপ। স্টিয়ারিং থেকে হাত সরিয়েই নিচু, ভারী কণ্ঠে বলল
“ভিতরে যা । আমি গাড়ি পার্ক করে আসছি।”
কথার ভেতর কোনো কোমলতা নেই, তবু দায়িত্বের দৃঢ়তা স্পষ্ট। সে পকেট থেকে এক্সট্রা চাবিটা বের করে নিশিতার হাতে তুলে দিল।নিশিতা এক মুহূর্ত তার দিকে তাকাল, যেন কিছু বলতে চায় কিন্তু বলল না। নীরবতাকেই বেছে নিল। ধীরে দরজা খুলে গাড়ি থেকে নামল। রাতের ঠান্ডা বাতাস এসে তার ওড়না দোলাল।
ফারিস আর একবারও তাকাল না। গাড়িটা ঘুরিয়ে গ্যারেজের দিকে নিয়ে গেল। নিশিতা ধীর পায়ে বাড়ির প্রধান দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। নিজের বাড়ি, অথচ আজ কেমন অচেনা লাগছে। চাবিটা তালায় ঢুকিয়ে ঘুরাতেই খচ করে শব্দ হলো। দরজা খুলে যেতেই ভেতর থেকে এক দমকা ঠান্ডা হাওয়া এসে তার গায়ে লাগল। সে অজান্তেই একটু কেঁপে উঠল।
পুরো বাড়ি নিঃশব্দ। যেন কেউ নেই, কিছু নেই শুধু নীরবতা দেয়ালে দেয়ালে লেগে আছে। করিডোরের কোণে কোণে হালকা হলুদ আলো জ্বলছে, কিন্তু সেই আলোও আজ কেমন মলিন, কেমন রহস্যময়। নিশিতা ধীরে ভেতরে পা রাখল… যেন এই নীরব বাড়ির বুকের ভেতর কোনো অজানা গল্প অপেক্ষা করছে।নিশিতার বুকের ভেতর কেমন যেন অচেনা এক অনুভূতি দোলা দিয়ে উঠল বাড়িটাকে এমন নিস্তব্ধ দেখে। তবু সে নিজের স্বভাবমতোই সেই অস্বস্তিকে পাত্তা দিল না। ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ড্রয়িংরুমের লাইট জ্বালালো না অন্ধকার আর আধো-আলোর মাঝেই সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
পায়ের শব্দগুলো আজ অদ্ভুতভাবে প্রতিধ্বনি তুলছিল। যেন পুরো বাড়িটাই শুনছে তার একেকটা পদচারণা। সোজা উপরে উঠে করিডোর পার হয়ে নিজের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেই লাইট অন করল। হালকা সাদা আলোয় রুমটা ভেসে উঠল। পরিচিত দেয়াল, পরিচিত পর্দা তবু আজ সবকিছু কেমন অপরিচিত লাগছে।
এসি অন করে ধপ করে বেডে বসে পড়ল নিশিতা। বুকের ভেতর চাপা একটা ভার। চোখ দুটো অন্যমনস্ক হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগের ঘটনা গুলো একে একে ভেসে উঠতে লাগল মনে।
নিজেকেই প্রশ্ন করল নিশিতা,
“আরিশা ফারিস ভাইকে ভালোবাসে? কবে থেকে?
আর ফারিস ভাই কিছুই বলেনি কেন?।”
ঘটনাগুলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মনে ঘুরে যেতে লাগল। আচরণ, দৃষ্টি, কথার ভঙ্গি—সব যেন এখন নতুন করে অর্থ নিচ্ছে।নিশিতা ঠোঁট বাঁকিয়ে নিজের মনকেই ব্যঙ্গ করল,
“এই বদমেজাজি, উগ্র, গম্ভীর লোকটাকে ভালোবাসা যায়?” সবাই ভালোবাসে কারণ লোকটা সবার থেকে আলাদা।”
হালকা একটা তিক্ত হাসি ফুটল তার মুখে।
“একটা সময় তো আমিও বেহায়ার মতো ভালোবেসেছিলাম কত অপমান, কত কঠিন ব্যবহার সহ্য করেছি। তবু ছাড়তে পারিনি। কারণ ভালোবাসলে একটু বেহায়া হতেই হয় নইলে নিজের শখের মানুষটাকে পাওয়া যায় না।”
স্মৃতিরা আজ বড় নির্মম। একটার পর একটা দরজা খুলে দিচ্ছে। ফারিসের কঠিন মুখ, শীতল কণ্ঠ আর সেই কঠিনতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অদ্ভুত কোমল যত্ন। নিশিতা ধীরে চোখ বন্ধ করল।
“মানুষটার মতো তার ভালোবাসাটাও অদ্ভুত বাইরে থেকে কেউ বুঝবেই না এই লোকটা এতো গভীরভাবে ভালোবাসতে পারে। আর সেই ভালোবাসার জন্যই তো একসময় আমি ছটফট করেছি… নিজেকে ভেঙেছি, বদলেছি, সহ্য করেছি।”
বুকটা ভার হয়ে উঠল।
“কিন্তু… সে কি জানে? সে কি জানে ফারিস আমাকে ঠিক কতটা ভালোবাসে?”
ভাবনাগুলো আর থামল না। মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল। এসি চলার পরও শরীর ভিজে উঠছে ঘামে। কপালের পাশে ছোট ছোট ঘামের ফোঁটা জমল। নিশিতা অস্থির হয়ে উঠে বসল মনে হচ্ছে যেন রুমের বাতাসই ভারী হয়ে গেছে।নিশিতা নিজের দিকে তাকিয়ে হালকা বিরক্ত গলায় ফিসফিস করে বলল,
“নাহ… এই অবস্থায় থাকা যাবে না। শাওয়ার না নিলে মাথাটাই ফেটে যাবে।”
কথাটা বলেই আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। মাথার হিজাবটা খুলে চেয়ারেই রাখল। ক্লজেট খুলে তাড়াহুড়ো করে একটা আরামদায়ক জামা বের করল। হাত কাঁপছিল সামান্য অস্থিরতা এখনও পুরো কাটেনি। জামাটা পরে নিয়ে টাওয়ালটা হাতে নিল। তারপর ধীর কিন্তু ভারী পায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করতেই বাইরের নীরবতা থেকে নিজেকে আলাদা লাগল তার। যেন এই ছোট্ট ঘরটাই এখন তার একান্ত জায়গা যেখানে কেউ প্রশ্ন করবে না, কেউ দেখবে না তার দুর্বলতা।
শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে নলটা ঘুরিয়ে দিল। সাথে সাথে ঠান্ডা পানির ধারা ঝরে পড়তে লাগল মাথা থেকে কাঁধ বেয়ে পুরো শরীরে। প্রথম ধাক্কায় শ্বাস আটকে এল, তারপর ধীরে ধীরে শরীর মানিয়ে নিল।
পানির ধারা যেন শুধু ঘামই না দিনভর জমে থাকা চাপ, অস্বস্তি, মানসিক টানাপোড়েন—সব ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে। নিশিতা চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হচ্ছিল, এই কয়েক মিনিটের জন্য হলেও সে সবকিছু ভুলে থাকতে পারছে। ফারিস, আরিশা, কথাগুলো, দৃষ্টি—সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে পানির শব্দে।
বেশ কিছুক্ষণ পর শাওয়ার বন্ধ করল। টাওয়াল দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে ধীরে বের হয়ে এল ওয়াশরুম থেকে। ভেজা চুলের ডগা থেকে টুপটাপ করে পানি পড়ছে। তবু আগের চেয়ে অনেকটা হালকা লাগছে নিজেকে।
ক্লজেট খুলে নরম কাপড়ের একটা নাইট ড্রেস বের করল। ধীরে ধীরে পরে নিল। তারপর আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই চোখ আটকে গেল নিজের গলার দিকে। কয়েক জায়গায় হালকা লালচে দাগ চাপ লেগে থাকা চামড়ার রঙ বদলে গেছে। গলাটাও ব্যথা করছে স্পষ্ট। গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ড্রয়ার খুলে ক্রিম বের করল। আঙুলের ডগায় নিয়ে খুব আস্তে আস্তে লাগাতে লাগল গলায়। স্পর্শটা যত্নের হলেও চোখের ভেতরটা কেমন নিস্তেজ। যেন এসব নিয়ে আর ভাবার শক্তি নেই।
“সবকিছু এত জটিল কেন”
খুব আস্তে নিজের প্রতিচ্ছবিকে বলল তারপর বিষয়টা আর না ভেবে হেয়ার ড্রায়ারটা হাতে নিল। ভেজা চুলগুলো ধীরে ধীরে শুকাতে লাগল। ড্রায়ারের শব্দে রুমের নিস্তব্ধতা কেটে গেল, কিন্তু মনটার ভেতরের শব্দ থামল না।
অন্যদিকে, ফারিস সোজা নিজের রুমে ঢুকল। দরজা বন্ধ করার শব্দটা আজ একটু বেশি জোরেই হলো। শরীর থেকে কোর্টটা খুলে এক টানে বিছানার উপর ছুড়ে ফেলল। টাইটা টেনে খুলে ফেলতেই সেটা কোথায় গিয়ে পড়ল সে দেখারও প্রয়োজন মনে করল না। চোখে-মুখে চেপে রাখা রাগ আর অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট। আজকের ঘটনাটা মাথা থেকে কিছুতেই সরাতে পারছে না সে। নিশিতার সামনে নিজেকে স্বাভাবিক রেখেছিল কিন্তু ভিতরে ভিতরে আগুনটা এখনও জ্বলছে।
নিজের চোয়াল শক্ত করে ফিসফিস করে বলল—
“ড্যাম ইট…”
আর এক সেকেন্ডও রুমে দাঁড়িয়ে থাকল না। সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। তার বহুদিনের অভ্যাস মৌসুম যাই হোক, রাতে একবার শাওয়ার না নিলে তার ঘুম আসে না। শাওয়ার ছেড়ে দিল।
ঠান্ডা পানি কাঁধে, পিঠে, মাথায় আছড়ে পড়তে লাগল। সাধারণত এই পানিই তার রাগ ঠান্ডা করে। কিন্তু আজ যেন কাজ হচ্ছে না পুরোপুরি। বুকের ভেতরের চাপা উত্তাপ এখনও রয়ে গেছে।
তবু দাঁড়িয়ে রইল। চোখ বন্ধ করে।
পানির ধারার নিচে নিজের রাগ, নিজের অস্থিরতা, নিজের অজানা ভয় সবকিছুর সাথে নীরব লড়াই করতে লাগল।
চৌধুরী বাড়ির সামনে তখন রাত আরও গভীর। আকাশে চাঁদ আধখানা, চারপাশে হালকা কুয়াশার মতো নরম আলো ছড়িয়ে আছে। ঠিক সেই নীরবতার মাঝেই একসাথে দুটো গাড়ি এসে ধীরে ধীরে গেটের সামনে থামল। ইঞ্জিন বন্ধ হতেই পরিবেশটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল শুধু গাড়ির গরম ধাতব গায়ে ঠান্ডা বাতাসের ছোঁয়া।
প্রথম গাড়ির দরজা খুলে নামলেন আরাফাত চৌধুরী। তার পাশে আলতাফ চৌধুরী, আফিয়া চৌধুরী আর আমেনা চৌধুরী। সবার মুখেই ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু আচরণে সেই অভ্যস্ত স্থিরতা। দীর্ঘ দিনের অনুষ্ঠান, অতিথি, আনুষ্ঠানিকতা সব মিলিয়ে শরীর যেন ভেঙে আসছে।
দ্বিতীয় গাড়ি থেকে নামল রিয়া, তনয়া, রাজীব আর অহনা। গেটের আলোয় তাদের ছায়াগুলো লম্বা হয়ে পড়েছে মাটিতে। গাড়ি থেকে নামতেই অহনা ওড়নাটা ঠিক করে নিয়ে রিয়ার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
“আমি আজ আসি রিয়া… অনেক রাত হয়ে গেছে।”
রিয়া সাথে সাথে কপাল কুঁচকে বলল,
“কোথায় যাবি এখন এতো রাতে?”
অহনা একটু ইতস্তত করে বলল,
“বাড়িতে না গেলে আম্মু-আব্বু চিন্তা করবে।”
রাজীব চাবিটা হাতে ঘুরাতে ঘুরাতে এগিয়ে এলো। কণ্ঠে শান্ত দৃঢ়তা,
“কোথাও যেতে হবে না। কাল সকালে আমি নিজে ড্রপ করে দেবো। আজকের রাতটা এখানেই থাকো।”
অহনা মাথা নাড়ল,
“না এটা ঠিক হবে না।”
ঠিক তখনই আমেনা চৌধুরী সামনে এসে দাঁড়ালেন। মুখে মায়া মাখা হাসি,
“এতো করে বলছে যখন, থেকে যাও আম্মু। এটা তো তোমার নিজের বাড়ির মতোই। লজ্জা কিসের?”
রিয়া সাথে সাথে অহনার হাত ধরে টান দিল,
“চল। আমার রুমে ঘুমাবি আমার সাথে। অনেক গল্পও করব।”
তনয়া হেসে,
“আর শাড়ি পরে ঘুমাতে হবে না। আমার ড্রেস নিস। আমাদের ফিটনেস তো প্রায় একই—তোকে একদম ঠিক ফিট করবে। কমফোর্টেবলও লাগবে।”
সবাই এত আপন করে বলায় অহনা আর না করতে পারল না। মুখে ছোট্ট হাসি এনে চুপচাপ মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।রাজীব চারদিকে তাকিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল,
“তোমরা সবাই ভেতরে যাও, রেস্ট নাও। আমি গাড়ি পার্ক করে আসছি।”
সবাই সম্মতিতে মাথা নাড়ল। ধীরে ধীরে একে একে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। বাড়ির ভেতরের পরিবেশ অদ্ভুত শান্ত। বড় ঝাড়বাতির আলো জ্বলছে, কিন্তু কথা নেই, কোলাহল নেই। আজ যেন কেউ আর কথা বাড়াতে চাইছে না। সবার শরীর-মনে ক্লান্তির ভার। যে যার মতো নিজ নিজ রুমের দিকে চলে গেল। করিডোরে শুধু পায়ের মৃদু শব্দ—তারপর সেটাও মিলিয়ে গেল। রিয়া আর অহনা একসাথে রুমে ঢুকল। ঢোকার আগে তনয়ার কাছ থেকে নেওয়া ড্রেসটা অহনার হাতে ছিল। রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে সে ধীরে শাড়িটা খুলে রাখল। তারপর নরম, ঢিলেঢালা ড্রেসটা পরে নিল।
ভারী সাজ খুলে ফেলতেই যেন বুকটা একটু হালকা হলো তার। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ক্লান্ত মুখটা দেখে খুব আস্তে বলল,
“আজকের রাতটা… সত্যিই অন্যরকম তাই না?।”
রিয়া ফ্রেশ হয়ে এসে চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে বেডের কিনারায় বসলো। রুমে নরম আলো জ্বলছে, এসির হালকা শব্দে একটা ঘুমঘুম পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সারাদিনের ক্লান্তি তার চোখে-মুখে স্পষ্ট, তবু মনে হচ্ছে মাথার ভেতর এখনও অনেক কথার ভিড়। অহনা আলমারির পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ রিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ। যেন ভেবে নিচ্ছিল—কথাটা করবে কি করবে না। তারপর হঠাৎই নরম গলায় বলল,
“আচ্ছা… একটা কথা বলবি রিয়া?”
রিয়া চোখ তুলে তাকাল। স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“হুম, বল না।”
অহনা ধীরে ধীরে বেডের দিকে এগিয়ে এসে বসলো। তারপর একটু ইতস্তত করে বলল,
“নিশি ফারিস ভাইকে ভালোবাসে তাই না?”
একটু থেমে আবার বল,
“কিন্তু ফারিস ভাই সেটা জানার পরেও এতো শান্ত, এতো স্বাভাবিক থাকে কীভাবে?”
প্রশ্নটা শুনে রিয়ার ঠোঁটে হালকা বাকা হাসি ফুটল। যেন উত্তরটা তার খুব পরিচিত। সে বালিশটা কোলে টেনে নিয়ে হেলান দিয়ে বসে বলল,
“আসলে কী জানিস আমার ভাইয়া এমনই। ছোটবেলা থেকেই প্রচণ্ড গম্ভীর। কম কথা বলে, কম রিঅ্যাক্ট করে। বাইরে থেকে দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না ভেতরে কী চলছে।”
কণ্ঠে মিশে গেল গর্ব আর অভ্যাসের মিশ্র সুর,
“আর একটা জিনিস ভাইয়া খুব বদমেজাজি। ভয়ানক রাগ। এজন্য আব্বু, ছোট আব্বু—সবাই একটু ভয় পায়। ভাইয়ার মুখের উপর কথা বলার সাহস খুব কম মানুষের আছে।”
অহনা চুপচাপ শুনছিল।রিয়া আবার বলতে লাগল,
“তুই জানিস? একটা সময় ভাইয়া শখ করে বাইক রেসিং করতো। রিস্কি, ডেঞ্জারাস সবাই জানত। কিন্তু কেউ তাকে থামাতে পারেনি। কেউ সাহস পায়নি কিছু বলার। আবার একদিন হঠাৎ করেই নিজে থেকে ছেড়ে দিলো। তখনও কেউ জিজ্ঞেস করতে পারেনি কেন ছেড়েছে।”
রিয়া কাঁধ ঝাঁকালো,
“ওর সিদ্ধান্ত, ওর মতো। ও নিজের ভেতরের কথা কাউকে সহজে বুঝতে দেয় না।”
কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো। কথাগুলো রুমের ভেতর ভার হয়ে ঝুলে রইল।তারপর রিয়া হালকা ক্লান্ত গলায় বলল,
“যা, বাদ দে এসব। মাথা ধরছে। চল ঘুমাই আজকে সত্যি খুব ক্লান্ত লাগছে।”
অহনা ধীরে মাথা নাড়ল। লাইট একটু ডিম করে দিল। দুজনই নিজ নিজ পাশে শুয়ে পড়ল।
বাড়ির অন্য রুমগুলোতেও একই অবস্থা
সবাই নিজের মতো বিশ্রামে। সবাই সবার মতো
ঘুমিয়ে পরে।
রাত তখন প্রায় ১১টা পনেরো। পুরো বাড়িটা গভীর নীরবতায় ঢেকে গেছে। দূরে কোথাও ঘড়ির টিকটিক শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে। জানালার বাইরে রাতের বাতাসে গাছের পাতা নড়ছে আস্তে আস্তে—একটা ধীর, নিঃশব্দ সুরে।
নিশিতা বেডে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকালো। কাঁটা দেখে কী যেন ভাবল। মুখে অদ্ভুত এক স্থিরতা এল। যেন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।
ধীরে উঠে দাঁড়াল।
রুম থেকে বের হয়ে দরজাটা খুব আস্তে টেনে লাগালো যাতে শব্দ না হয়। করিডোরে হালকা আলো। পা টিপে টিপে হাঁটতে লাগল সে। বুকের ভেতর কেমন হালকা ধুকপুকানি নিজেও বুঝতে পারছে না কেন।
ফারিসের রুমের সামনে এসে থামল। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দরজার হ্যান্ডেলে হাত রাখল। দরজাটা পুরো বন্ধ ছিল না হালকা ঠেলতেই খুলে গেল। নিশিতা বাচ্চাদের মতো আগে শুধু মাথাটা ঢুকিয়ে ভেতরে উঁকি দিল। একবার চোখ বুলালো পুরো রুমে। কেউ নেই।
সে এবার পুরো দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
রুমে ঢুকেই চারপাশে তাকালো। আগের মতোই গোছানো, ঠান্ডা, সংযত। দেয়াল, পর্দা, ফার্নিচার সবকিছুতেই কালো আর ডার্ক শেডের আধিপত্য। কোথাও বাড়তি সাজসজ্জা নেই। প্রয়োজন ছাড়া কিছু নেই। যেন রুমটা না একটা শৃঙ্খলিত মানসিকতার প্রতিচ্ছবি।
নিশিতা ঠোঁট বাঁকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“একটা লোকের কালো রঙ এতটা কীভাবে পছন্দ হয়! পুরো রুমটাই কালো আর কালো আমার এত বড় রুম থাকলে কত সুন্দর করে সাজাতাম! আর উনার রুমে প্রয়োজন ছাড়া একটা জিনিসও নেই!”
কথাগুলো বললেও কণ্ঠে বিরক্তির সাথে মিশে ছিল এক চেনা মায়া। এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতেই তার চোখ আটকে গেল বিছানার উপর। বালিশের পাশে একটা ফোন পড়ে আছে অযত্নে, যেন তাড়াহুড়ো করে ফেলে রাখা। নিশিতার দৃষ্টি নরম হলো। ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিল। স্ক্রিনটা অফ। আঙুল দিয়ে টাচ করতেই স্ক্রিন জ্বলে উঠল আর সঙ্গে সঙ্গে তার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে তারই একটা ছবি।
নীল শাড়ি পরা, চুল খোলা, হালকা হাসি চোখে মুগ্ধতা মেশানো লাজুক দৃষ্টি। নিশিতা স্থির হয়ে বসে রইল বিছানার কিনারায়।চোখে বিস্ময়, ঠোঁটে কাঁপা নীরবতা।নিশিতা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে। নীল শাড়ি পরা নিজের ছবিটা যেন তাকে তাকিয়েই আছে—অচেনা, অথচ গভীরভাবে চেনা এক দৃষ্টিতে। মুহূর্তটা এতটাই অপ্রস্তুত করে দিল যে কয়েক সেকেন্ড সে নড়তেই পারল না।
মাথার ভেতর একসাথে অনেক প্রশ্ন ঘুরতে লাগল,
“আমার ছবি ফারিস ভাইয়ের ফোনে? কবে? কীভাবে?”
তার মনে হঠাৎ করেই ঝলকে উঠল সেই দিনের দৃশ্য। নীল শাড়ি, খোলা চুল, সিঁড়ির ধারে দাঁড়িয়ে থাকা আর দূরে ফারিসের স্থির দৃষ্টি।
সে তাকিয়েছিল ঠিকই কিন্তু মুখে তো কোনো অনুভূতি ছিল না! বরাবরের মতোই কঠিন, নিরাবেগ, দূরত্ব রাখা।নিশিতা ধীরে ফিসফিস করল
“আপনি তাহলে অভিনয় করতে খুব ভালো পারেন।”
কৌতূহল এবার অস্থিরতায় বদলে গেল। সে জানতেই চায় এই ফোনের ভেতরে কী লুকানো আছে। কতটা লুকানো আছে। আঙুল দিয়ে স্ক্রিনে সোয়াইপ করতেই লক অপশন ভেসে উঠল।
পাসকোড চাইছে। নিশিতা ঠোঁট কামড়ালো।
“কি হতে পারে?”
প্রথমে লিখল FARIS
ভুল। আবার চেষ্টা করল তার জন্মতারিখের সম্ভাব্য নম্বর। ভুল। কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ করেই বুকের ভেতর ধক করে উঠল কিছু একটা ভেবে। খুব ধীরে নিজের নামটাই টাইপ করল,
NISHITA
এন্টার চাপতেই,
ক্লিক। ফোন আনলক হয়ে গেল।
নিশিতার চোখ বড় হয়ে গেল বিস্ময়ে। আঙুল থেমে রইল স্ক্রিনের উপর। বুকের ভেতর ধুপধুপ শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে যেন।
মৃদু কাঁপা গলায় বলল,
“আমার নামে ভাইয়ার নিজের ফোনের
পাসওয়ার্র ?”
রুমের কালো দেয়ালগুলো নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে রইলএকটা লুকানো ভালোবাসার দরজা খুলে যাওয়ার।ফোন আনলক হতেই স্ক্রিন বদলে গেল—আর নিশিতা আবারও স্তব্ধ হয়ে গেল। আজ সে যে শাড়িটা পরে ছিল, ঠিক সেই শাড়িতে তার একটা ছবি ওয়ালপেপারে সেট করা। ছবিটা স্পষ্টতই ক্যান্ডিড সে জানেও না কখন তোলা হয়েছে। চোখে দূরে তাকানো ভাব, ঠোঁটে অচেতন নরম রেখা।
নিশিতা নিঃশব্দে ফিসফিস করল,
“আমার ছবি উনি কখন তুললেন?”
মনে করার চেষ্টা করল আজ সারাদিনের প্রতিটা মুহূর্ত। কোথাও কি সে টের পেয়েছিল? না। একবারও না। উত্তর মিলল না। কৌতূহল এবার টানতে লাগল আরও গভীরে। সে সরাসরি গ্যালারিতে ঢুকল। সেখানে ফারিসের নিজের খুব কম ছবি অফিস, ফরমাল, কয়েকটা পুরোনো ইভেন্ট, কিছু ডকুমেন্ট শট। সবই সংক্ষিপ্ত, প্রয়োজনীয়। ঠিক তার রুমের মতো অতিরিক্ত কিছু নেই। কিন্তু নিচে স্ক্রল করতেই চোখ আটকে গেল একটা অ্যালবামে।
“Album name: — my black rose”
নিশিতার বুক ধক করে উঠল।
ধীরে ট্যাপ করল। অ্যালবাম খুলতেই যেন স্মৃতির দরজা ভেঙে গেল। শত শত ছবি।
সব তার। ছোটবেলার হাসি, স্কুল ড্রেস, বৃষ্টিতে ভেজা বারান্দা, পরিবারের অনুষ্ঠানে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা, রাগী মুখ, কাঁদো কাঁদো চোখ, লুকিয়ে হাসা, দূরে তাকানো, অগোছালো চুলে সকাল এমনকি এমন কিছু মুহূর্ত যেখানে সে নিজেই জানে না কেউ তাকে দেখছিল। নিশিতা একের পর এক ছবি জুম করে দেখতে লাগল। আঙুল কাঁপছে।
চোখ ভিজে উঠছে অজান্তে।মনে মনে বলল,
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৪
“আমার নিজের কাছেও… এতো ছবি নেই…”
এটা আর সাধারণ পছন্দ না। এটা পর্যবেক্ষণ।
এটা সংরক্ষণ।এটা নীরব, একগুঁয়ে, গভীর ভালোবাসা। নিশিতার এই ভাবনার মাঝে এর মাঝে হঠাৎ করে ফারিস…
