চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৯
আয়াত বিনতে নূর
পড়ন্ত বিকেলের শেষ আলোটুকুও যেন ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে ক্লান্ত পৃথিবীর বুক থেকে সোনালি আভাগুলো একে একে মুছে যাচ্ছে। পশ্চিম আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা রক্তিম আর কমলা রঙের মায়াবী আভাটুকুও ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে।
সূর্যটা পশ্চিম দিগন্তের দিকে ধীরে ধীরে তার বিচরণ শেষ করে এগিয়ে চলেছে অস্তাচলের পথে। কিছুক্ষণ আগেও যে সূর্যটা আকাশের বিস্তীর্ণ ক্যানভাসে নিজের উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে রেখেছিল, এখন তার আলোয় যেন ক্লান্তির ছাপ। দিগন্তের কাছাকাছি এসে তার সোনালি রশ্মিগুলোও ম্লান হয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে, সারাদিনের পথচলা শেষে সেও বুঝি একটু বিশ্রামের খোঁজে নেমে যাচ্ছে পৃথিবীর ওপারে।
আর ঠিক তখনই ধেয়ে আসছে সন্ধ্যা।
আবছা অন্ধকারের নরম চাদর ধীরে ধীরে ঢেকে দিচ্ছে চারপাশ। গাছের পাতার ফাঁক গলে আসা শেষ আলোটুকু হারিয়ে যাচ্ছে নীরবতায়। দূরের আকাশে দিনের শেষ রঙটুকু আঁকড়ে ধরে আছে ক্ষীণ কিছু মেঘ, আর তার নিচে পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে এক শান্ত, স্নিগ্ধ সন্ধ্যার রাজ্যে।
দিনের কোলাহল পেছনে ফেলে প্রকৃতিও যেন একটু থেমে দাঁড়িয়েছে। বাতাসে সন্ধ্যার শীতল পরশ, চারপাশে নেমে আসা মৃদু নীরবতা—সব মিলিয়ে মুহূর্তটুকুর মাঝে কেমন এক অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে পড়েছে।
পশ্চিম আকাশের শেষ প্রান্তে সূর্যের ক্ষীণ আভাটুকুও যখন হারিয়ে গেল, তখন সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার পুরোপুরি নিজের অস্তিত্ব জানান দিল।
ফারিস নিশিতা কে নিয়ে সাবধানে নামলো বড় একটা রেস্টুরেন্টের সামনে। পুরো বিকাল টায় ফারিস নিশিতাকে নিয়ে ঘুরেছে রিক্সায় করে। ঢাকার বড় বড় রাস্তায়, অলিতে-গলিতে সব জায়গায়ই নিয়ে গেছে নিশিতাকে। আর নিশিতা জানো নতুন রূপে চিনলো ঢাকা শহর টাকে। জন্ম এখানে হওয়া স্বতেও সে এতো বছরেও ঢাকার আলি গলি এতোটা নিখুঁত ভাবে চেনেনি বা দেখেনি। তবে আজ ফারিস ঘুটিয়ে ঘুটিয়ে সব চেনালো নিশিতাকে। রিকশাতে ফারিস যেহেতু স্বাচ্ছন্দ্যে বোধ করে না তাই মাঝে মাঝেই বিরক্ত ফুটে উঠছিলো তার মুখে। তবে নিশিতার সরল হাসিটায় সব বিরক্ত কে ভুলিয়ে দিতে সক্ষম হচ্ছিলো। নিশিতার মুখটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হলো তার সকল কষ্ট স্বার্থক।
ফারিস নিশিতাকে নিয়ে সাবধানে নামলো বড় একটা রেস্টুরেন্টের সামনে।
রিকশা থেকে নামার সময়ও তার সমস্ত মনোযোগ ছিল নিশিতার দিকে। যেন এতক্ষণ ধরে ঘুরে বেড়ানোর পরেও মেয়েটার প্রতি তার সেই অদৃশ্য যত্নটুকু এক মুহূর্তের জন্যও কমেনি। নিশিতা ধীরে ধীরে রিকশা থেকে নামতেই ফারিসও পাশে এসে দাঁড়ালো। বিকেলের শেষ আলো তখন চারপাশে মিশে গিয়ে সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারের আভাস দিচ্ছে। শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলোতে একে একে জ্বলে উঠছে স্ট্রিটলাইট, আর রেস্টুরেন্টের সামনে মানুষের আনাগোনাতেও যেন সন্ধ্যার ব্যস্ততা স্পষ্ট।
পুরো বিকালটাই ফারিস নিশিতাকে নিয়ে ঘুরেছে রিক্সায় করে।
ঢাকার বড় বড় রাস্তায়, অলিতে-গলিতে—সব জায়গাতেই নিয়ে গেছে নিশিতাকে। কখনো ব্যস্ত সড়কের পাশ দিয়ে, কখনো আবার এমন সরু কোনো গলি দিয়ে, যেটা হয়তো নিশিতা নিজের শহর হয়েও আগে কখনো এভাবে দেখেনি। পরিচিত শহরটাই যেন আজ তার চোখে একেবারে অপরিচিত কোনো নতুন শহর হয়ে ধরা দিয়েছে।
আর নিশিতা জানো নতুন রূপে চিনলো ঢাকা শহরটাকে।
জন্ম এখানে হওয়া সত্ত্বেও সে এত বছরেও ঢাকার অলিগলি এতটা নিখুঁতভাবে চেনেনি বা দেখেনি। শহরটাকে সে দেখেছে ঠিকই, কিন্তু এভাবে নয়। এভাবে কোনো ব্যস্ততার তাড়া ছাড়া, কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যের চিন্তা ছাড়া, শুধু শহরটাকে দেখার জন্য শহরের পথে পথে ঘুরে নয়।
তবে আজ ফারিস ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব চেনালো নিশিতাকে।
একটা একটা রাস্তা, একটা একটা মোড়, পরিচিত-অপরিচিত গলির ভেতর দিয়ে যেন ফারিস তার নিজের চেনা শহরটাকেই নিশিতার সামনে নতুন করে তুলে ধরেছে। আর নিশিতা মুগ্ধ চোখে দেখেছে সবকিছু। কখনো চারপাশের দৃশ্য দেখে তার মুখে ফুটে উঠেছে বিস্ময়, কখনো আবার কোনো ছোট্ট বিষয়েও তার সরল হাসি ছড়িয়ে পড়েছে।
রিকশাতে ফারিস যেহেতু স্বাচ্ছন্দ্যে বোধ করে না, তাই মাঝে মাঝেই বিরক্তি ফুটে উঠছিলো তার মুখে।
কখনো অস্বস্তিতে শরীরটা একটু সরিয়ে নিচ্ছিল, কখনো চারপাশে তাকিয়ে বিরক্ত মুখে বসে থাকছিল। দীর্ঘসময় রিকশায় বসে থাকার অভ্যাস তার নেই—তার ওপর ঢাকার ব্যস্ত রাস্তার ঝাঁকুনি, যানজট আর চারপাশের কোলাহল যেন তার বিরক্তিটাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছিল।
তবুও নিশিতার সরল হাসিটায় সব বিরক্তিকে ভুলিয়ে দিতে সক্ষম হচ্ছিল।
মেয়েটার মুখে যখন সেই সহজ-সরল হাসিটা ফুটে উঠছিল, তখন ফারিসের সমস্ত বিরক্তি যেন কোথায় মিলিয়ে যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটার মুখে অস্বস্তি আর বিরক্তির ছাপ ছিল, নিশিতার দিকে তাকালেই সেই মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে আসছিল।
নিশিতার মুখটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হলো—তার সকল কষ্ট সার্থক।
এতক্ষণ রিকশায় বসে থাকা, অস্বস্তি, বিরক্তি, শহরের ব্যস্ত রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর ক্লান্তি—সবকিছুই যেন মুহূর্তের মধ্যে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠল। কারণ তার পাশে বসে থাকা মেয়েটার মুখে সে যে আনন্দটা দেখেছে, সেই আনন্দের কাছে নিজের সমস্ত অস্বস্তি তুচ্ছ মনে হলো।
আর এখন, রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে নিশিতার মুখের দিকে তাকিয়েও ফারিসের মনে হলো—আজকের পুরো বিকেলটা যদি আবারও ফিরে আসত, তবে সে হয়তো একইভাবে নিশিতাকে নিয়ে ঢাকার প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি অলি-গলি ঘুরে বেড়াত।
ফারিস আর কোনো কথা বলল না। শুধু নীরবে নিশিতার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। সেই পরিচিত দৃঢ় অথচ আশ্বস্ত করা স্পর্শটুকুই যেন নিশিতাকে বুঝিয়ে দিল—এখন আর কিছু নিয়ে ভাবতে হবে না। ফারিস আছে, এটাই যথেষ্ট।
কোনো কথা না বাড়িয়ে সে নিশিতাকে সঙ্গে নিয়ে রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করল।
ভেতরে ঢুকতেই নিশিতার চোখ খানিকটা বিস্ময়ে চারপাশে ঘুরে গেল।
চারদিকে নিরিবিলি, কোলাহলমুক্ত এক পরিবেশ। অথচ রেস্টুরেন্টে মানুষের উপস্থিতির কোনো কমতি নেই। প্রচুর মানুষ থাকা সত্ত্বেও জায়গাটা এতটাই প্রশস্ত যে কোথাও একটুও গাদাগাদি কিংবা অস্বস্তিকর ভিড় মনে হলো না। বরং প্রত্যেকটা টেবিলের চারপাশে যেন আলাদা আলাদা একটা ছোট্ট জগৎ তৈরি হয়ে আছে।
কেউ আপনমনে কথা বলছে, কেউ খাবারের অপেক্ষায় বসে আছে, আবার কেউবা প্রিয় মানুষটির সঙ্গে গল্পে মগ্ন। একপাশ দিয়ে ওয়েটাররা দ্রুত অথচ পরিপাটি ভঙ্গিতে খাবার সার্ভ করে যাচ্ছে। কারও হাতে খাবারের ট্রে, কারও হাতে পানীয়ের গ্লাস। সবাই যে যার মতো নিজের কাজে ব্যস্ত।
আর পুরো জায়গাটাকে ঘিরে থাকা আলো-আঁধারির মিশেল পরিবেশটাকে আরও অভিজাত করে তুলেছে।
ফারিস চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে একটা টেবিল পছন্দ করল। তারপর নিশিতাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিল।
নিশিতাও বিনাবাক্যে বসে পড়ল।
তাকে বসিয়ে ফারিস একজন ওয়েটারকে ইশারা করে ডাকল। ওয়েটার কাছে আসতেই ফারিস একবার নিশিতার দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিতে ছিল স্বাভাবিক সেই দৃঢ়তা, যেন যা বলছে সেটা মানা নিশিতার জন্য কোনো প্রশ্নের বিষয়ই নয়।
তারপর বলল—
‘তুই খাবার আর্ডার কর আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি।এখানেই বসে থাকবি নড়বি না ওকে?”
নিশিতা বাচ্চাদের মতো মাথা নাড়লো।
কথা বলল না। শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
দেখলে মনে হবে, ফারিসের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার জন্যই যেন সে প্রস্তুত হয়ে বসে আছে। ফারিস কী বলেছে, কোথায় বসতে বলেছে—এসব নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবার প্রয়োজনই বোধ করল না সে।
ফারিস চলে যেতেই নিশিতা ওয়েটারের দিকে তাকাল।
তারপর নিজের পছন্দ মতো খাবার আর্ডার করতে শুরু করল। ওয়েটারও বেশ ভদ্রতার সঙ্গে নিশিতাকে তাদের বেস্ট খাবারগুলো সাজেস্ট করতে লাগল। কোনটা বেশি জনপ্রিয়, কোনটার স্বাদ ভালো—সবকিছুই একে একে বলল।
শেষ পর্যন্ত বেশ অনেক রকমেরই খাবার নিশিতা আর্ডার করল।
অর্ডার নেওয়া শেষ করে ওয়েটার চলে গেল।
আর নিশিতা বসে রইলো একা একা।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে চারপাশে ঘুরতে শুরু করল। কৌতূহলী চোখে জায়গাটার প্রতিটা জিনিস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল সে।
অনেক দিন পর বাড়ি থেকে বের হয়ে কোনো রেস্টুরেন্টে আসা হয়েছে তার।
হয়তো এ কারণেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন হালকা হালকা লাগছিল। দীর্ঘদিন ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে আটকে থাকা মনটা যেন আজ একটু মুক্ত বাতাসের স্বাদ পেয়েছে।
নিশিতা আবার চারপাশে তাকাল।
চারদিকে আলো আর আলো।
তবে সেই আলোও চোখে লাগার মতো তীব্র নয়। বরং নরম, পরিমিত আলোয় পুরো রেস্টুরেন্টটা যেন আরও সুন্দর হয়ে উঠেছে। প্রতিটা চেয়ার, প্রতিটা টেবিল, এমনকি সোফাগুলোও খুব সুন্দর আর নিখুঁতভাবে সাজানো। সবকিছুর মধ্যেই একটা ক্লাসিক, পরিপাটি আর অভিজাত ছোঁয়া।
নিশিতার চোখে মুগ্ধতার আভা ফুটে উঠল।
কিছুক্ষণ আগেও যে মেয়েটার মনটা ভার হয়ে ছিল, এই সুন্দর পরিবেশের মাঝে বসে থাকতে থাকতে তার অজান্তেই সেই ভারটা যেন একটু একটু করে কমে এলো।
তবুও—
খানিক সময় পার হতেই নিশিতার একটু বিরক্ত লাগতে শুরু করল।
ফারিস এখনও ফিরছে না।ঘড়ির কাঁটার দিকে একবার তাকাল সে। তারপর আবার দরজার দিকে।মনে হলো, আর কতক্ষণ?
অবশেষে বিরক্ত হয়ে নিশিতা ঠোঁটটা সামান্য ফুলিয়ে আবার সামনে তাকাল।
ঠিক তখনই—
হঠাৎ করে নিশিতা থমকে গেল।
পাশের টেবিলের দিকে তাকিয়ে তার পুরো শরীর যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।
চোখ দুটো অস্বাভাবিক বড় বড় হয়ে গেল তার।
মনে হলো, ঠিক এই মুহূর্তে যেন সে কোনো ভূত দেখে ফেলেছে।
কিছুক্ষণ সে নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেল।
তার দৃষ্টি আটকে রইল পাশের টেবিলটার দিকে।
সত্যিই কি সে যা দেখছে, সেটা সত্যি?
নাকি নিছক কোনো ভ্রম?
নিজের দুটো চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না নিশিতা।
কিছুক্ষণ পর অবিশ্বাসে নিজের দুটো চোখ কচলালো সে।
কিন্তু—না।চোখ মুছে নেওয়ার পরও দৃশ্যটা বদলে গেল না।
সে স্বপ্ন দেখছে না।সে ঠিকই দেখছে।একদম ঠিকই দেখছে।তবুও যেন মনটা কিছুতেই সেই দৃশ্যটাকে সত্যি বলে মেনে নিতে পারছে না।
আদেও কি এটা সম্ভব
এখানে?এই মুহূর্তে?নিশিতার বুকের ভেতরটা আচমকাই কেমন ধক করে উঠল।চোখের পলক পড়া ভুলে সে শুধু তাকিয়েই রইল।
বুকের ধুপধাপানিটা যেন মুহূর্তের মধ্যেই আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেলো নিশিতার।
ফারিসও যে তার সাথে আছে—এই কথাটা মাথায় আসতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠলো। হঠাৎ করেই মনে হলো, চারপাশের সব শব্দ যেন অনেক দূরে সরে গেছে। অথচ নিজের বুকের ভেতরের দ্রুত ছুটে চলা হৃদস্পন্দনটা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সে।
এভাবে এই অবস্থায় তনয়ার সামনে ফারিস তাকে দেখে ফেললে কেলেঙ্কারি কান্ড বেঁধে যাবে। আর সব থেকে বড় কথা—তনয়া এখানে কি করছে?
তাও আবারও অপরিচিত কোনো ছেলের সাথে?
নিশিতা দূর থেকে ছেলেটার চেহেরাটা খুব একটা বুঝতে পারলো না। রেস্টুরেন্টের আলো-আঁধারির মাঝে দূরত্বটাও কম নয়। তবুও কেমন একটা অদ্ভুত পরিচিতি অনুভব হলো তার।
এই চেহেরাটা খুব পরিচিত লাগছে।
কোথাও যেন দেখেছে এই অচেনা ব্যক্তিটাকে।
কিন্তু কোথায়?
মাথা খেলল না তার।
ভ্রু দুটো কুঁচকে গেলো নিশিতার। মনে করার আপ্রাণ চেষ্টা করেও কোনোভাবেই মনে করতে পারলো না। একবার তনয়াদের দিকে তাকাচ্ছে, আবার পরক্ষণেই চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখছে।
ফারিস যেকোনো মুহূর্তে চলে আসতে পারে।
এই একটা চিন্তাই বারবার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
আর ফারিস যদি দেখে ফেলে?
সব শেষ।
একেবারে সব শেষ।
আবারও নিশিতা আনমনে ভাবলো, সে কাছে যাবে কি না তনয়ার।
কাছে গিয়ে তনয়াকে সরিয়ে নিয়ে আসবে?
নাকি দূর থেকেই পরিস্থিতিটা সামলানোর চেষ্টা করবে?
কিন্তু কীভাবে?
মাথার মধ্যে সব রকমের চিন্তা একসঙ্গে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। একটা চিন্তার সঙ্গে আরেকটা চিন্তা এসে এমনভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে যে সবকিছুই গুলিয়ে যাচ্ছে নিশিতার।
কী করবে, কীভাবে করবে—কোনোটাই বুঝতে পারছে না সে।
এদিকে তনয়া তখন কিয়াসের সঙ্গে কথা বলছিলো।
মূলত তারা সম্পর্কে আছে।
আর এটা আজ নয়, বরং পার্টির পর থেকেই।
পার্টির দিনই কিয়াস জোরাজুরি করে তনয়ার ফোন নাম্বারটা নিয়েছিলো। তনয়াও না করেনি। কারণ বন্ধু হিসেবে কথা বলতে তো সমস্যা হওয়ার কথা নয়—এমনটাই ভেবেছিলো সে।
কিন্তু সেখান থেকেই যেন শুরু হয়েছিলো কিয়াসের পাগলামো।
বিভিন্ন অজুহাতে রোজ তনয়ার ভার্সিটির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো সে। কখনো তনয়া ভার্সিটি থেকে বের হওয়ার সময় দূর থেকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতো, কখনো আবার সামনে এসে হাজির হতো।
মাঝে মাঝে তনয়ার জন্য ছোট ছোট উপহার, ফুল, চকলেট—এসব তো ছিলোই।
কখনো হঠাৎ হাতে একটা ফুল ধরিয়ে দিয়ে মিষ্টি করে হাসতো কিয়াস, আবার কখনো কোনো কারণ ছাড়াই ছোট্ট কোনো উপহার নিয়ে হাজির হতো।
তনয়াও বেশ খুশি হতো।
কারও জীবনে তার এত বড় একটা ইম্পরট্যান্ট জায়গা হতে পেরে নিজের অজান্তেই ভালো লাগতো তার। কেউ তার জন্য অপেক্ষা করছে, তার একটা হাসির জন্য এতকিছু করছে—এই অনুভূতিটা ধীরে ধীরে তনয়ার হৃদয়ের ভেতরে জায়গা করে নিয়েছিলো।
আর কিয়াস ছিলো যথেষ্ট নম্র ও ভদ্র একটা ছেলে।
তার আচরণে জোরজবরদস্তির চেয়ে যত্নই বেশি ছিলো। তনয়ার ছোট ছোট পছন্দ-অপছন্দও খেয়াল করতো সে।
সব কিছু মিলিয়ে তনয়া যে কখন কিয়াসের উপর এতটা গভীর ভালোবাসা অনুভব করেছে, তা সে নিজেই বুঝতে পারেনি।
শেষে দুজনের মতেই তারা সম্পর্কে জড়ায়।
শুরুতে সব কিছু ঠিকঠাকই চলছিলো।
তবুও তনয়ার বুকের ভেতরে একটা বিষয় প্রতিনিয়ত কাঁটার মতো বিঁধে থাকতো।
কিয়াস তনয়াকে এতোটা বিশ্বাস করে ও ভালোবাসে।
অথচ তার অতীত সম্পর্কে কোনো কথাই হয়নি।
আর ঠিক এই বিষয়টাই এতোদিন ধরে তনয়াকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
কিয়াস তাকে এতোটা ভালোবাসে, ভরসা করে। আর সে কি না সব কিছু এভাবে আড়াল করবে?
এটা ঠিক নয়।
পরে যখন সব কিছু জানাজানি হবে তখন কি হবে?
কিয়াস কি আগের মতো বিশ্বাস করতে পারবে তনয়াকে?
হয়তো না।কখনোই না।
এই একটা ভয়ই তনয়ার মনটাকে প্রতিনিয়ত ভারী করে রাখতো।তাই সে আজ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সব কিছু খুলে বলবে কিয়াসকে।তারপর এই সম্পর্ক এগোবে, নাহলে এখানেই সমাপ্তি ঘটবে।
নাহলে সে এই ধোঁয়া শায় রাখতে চাই না সে কিয়াস কে।
সত্যিটা লুকিয়ে রেখে একটা সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার মধ্যে কোনো শান্তি নেই—এটা তনয়া বুঝে গেছে।
পরিচিত কণ্ঠে টনক নড়ে তনয়ার।
ভাবনায় ছেদ পড়ে কিয়াসের ভাবনার বাহিরে বলা কথায়।
মূলত এতক্ষণ ধরে কিয়াস যা বলছিলো তার ছিটেফোঁটাও শোনেনি তনয়া। নিজের ভাবনায় মত্ত ছিলো সে। চারিপাশে কি হচ্ছে তার ধারণা আপাতত তার নেই।
কিয়াস মিষ্টি হেসে তনয়ার দিকে তাকিয়ে বলল—
“তোমার পরীক্ষা তো শেষ তনয়া?”
তনয়া যেন আচমকাই বাস্তবে ফিরে এলো।
চোখের দৃষ্টি স্থির হলো কিয়াসের মুখে।
নিজের ভাবনার থেকে বের হয়ে হালকা হাসার চেষ্টা করে মাথা নাড়ায় সে।
কিয়াস আবারও বলল—
“অনেক দিন হয়ে গেছি বেবি। এবার আই থিংক আমাদের বিয়ে করে নেওয়া উচিত। আমি আর তোমাকে ছাড়া থাকতে চাই না তনয়া। ইউ্য নো? ইউ্য আর মাই ফাস্ট এন্ড লাস্ট লাভ। আর আমি দেরি করতে চাই না আমি অলরেডি মম আর ড্যাড কে সব জানিয়ে দিয়েছি।”
একটু থেমে—
“তাদের কোনো আপত্তি নেই। শুধু তোমার মতামত এর অপেক্ষায়।”
কথাটা শেষ করে কিয়াস হাসলো।
সেই হাসিতে ছিলো নিঃসংকোচ ভালোবাসা। ছিলো ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার নিশ্চিন্ততা।
আর তনয়া?
আকাশ থেকে বাজ পড়েছে জানো তার মাথায়।
কিয়াস যা বলল এতোক্ষণে তা তার মাথায় বাজছে জানো প্রতিটা শব্দ।
বিয়ে।কিয়াস তাকে বিয়ে করতে চায়।
তার মম আর ড্যাডও জানে।
তাদের কোনো আপত্তিও নেই।এতে তার খুশি হওয়ার কথা।
ভীষণ খুশি হওয়ার কথা।
কিন্তু সে কিছুতেই খুশি হতে পারছে না।
কীভাবে সে সত্যিটা না বলে কিয়াসের সাথে বিয়ে করবে?
এতে কিয়াস কে ঠকানো হবে।
না।
না, সে কিছুতেই এটা করতে পারে না।
একজনের মন নিয়ে খেলার মতো মেয়ে সে নয়।
তার চোখের সামনে যেন হঠাৎ করেই ভবিষ্যতের একটা ছবি ভেসে উঠলো। সত্যিটা লুকিয়ে বিয়ে করে ফেলেছে সে। তারপর কোনো একদিন কিয়াস সব জেনে গেছে।
সেই দিনটা কেমন হবে?
কিয়াসের চোখে তখন তার জন্য কী থাকবে?
ভালোবাসা?
নাকি ঘৃণা?
নাকি বিশ্বাসভঙ্গের কষ্ট?
ভাবতেই বুকটা কেঁপে উঠলো তনয়ার।
পরপর শুকনো কয়েকটা ঢোক গিলল।
রেস্টুরেন্টে প্রতিটা কোনায় এসি চললেও তনয়া তিরতির করে ঘামছে।
কপালের কাছে জমে থাকা ঘামের বিন্দু হাত দিয়ে মুছে নেওয়ার কথাও যেন মনে পড়ছে না তার। আঙুলগুলো অস্থিরভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে।
কীভাবে শুরু করবে?
কি দিয়ে শুরু করবে?সে বুঝতে পারছে না।
আর শোনার পর কিয়াসই কি রিয়েক্ট করবে, তা কল্পনাতেও আনতে পারলো না।
তনয়া এভাবে বসে থাকতে দেখে কিয়াসের কপালে ভাজ পড়ে।
সে এতো খুশির সংবাদ দেওয়া পরও তনয়াকে এভাবে চিন্তিত লাগছে কেনো?
মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি জন্ম নিলো তার।
নিজের মনে জাগ্রত হওয়া প্রশ্ন দমিয়ে রাখলো না কিয়াস। সরাসরি তনয়ার দিকে তাকিয়ে বলল—
“কি হয়েছে বেবি গার্ল? এতো টেন্স দেখাচ্ছে কেনো তোমাকে?”
তনয়া থতমত খেয়ে যায়।
গলাটা এই মুহূর্তে শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে।
জানো খরা নেমেছে।
কথা বলার শক্তি টুকুও পাঁচ্ছে না সে।
এই মুহূর্তে কান্না করতে চাই না সে, তবুও গলা ভেঙে আসছে তার।
নিজেকে আজ বড্ড অসহায় লাগছে তার কাছে।
যদি আজকের পর সে কিয়াস কে চিরন্তন ভাবে হারিয়ে ফেলে?
সে নিঃস্ব হয়ে যাবে।
এই ভাবনা মনে আসতেই বুকের ভিতরে মোচড় দিয়ে উঠলো তার।
এই ছেলেটা আস্তে আস্তে তাকে যতটা অবসেসড করেছে তার প্রতি, এখন যদি শোনে তার আগের সম্পর্কের কথা—সে কি মেনে নেবে আদেও সব কিছু?
কিয়াস কি তখনও তার হাতটা ধরে রাখবে?
নাকি ছেড়ে দেবে?
তনয়ার বুকের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে উঠলো।
কিয়াস এখন উত্তরের অপেক্ষায় তনয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
তনয়া আস্তে আস্তে চোখ উপর করলো।
তার চোখে মুখে ভয় স্পষ্ট।
এক আজানা আতঙ্ক তাকে ঘিরে ধরেছে।
তবুও সে আজকে থামবে না জানো।
পণ করে আছে।
আজ তাকে বলতেই হবে।
জিব্বা দিয়ে শুকনো দুটো ঠোঁট ভেজালো।
কন্ঠ দিয়ে কিছু বের হতে চাইছে না।
শুকিয়ে খর হয়ে আছে।
কয়েক বার শুকনো ঢোক গেলাম।
অবশেষে কাঁপা কণ্ঠে সরাসরি বলল—
“আ…আমি—” তোমার থেকে অনেক কিছু লুকিয়েছি কিয়াস। প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও।
কিয়াস চমকায়।
চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে যায়।
ব্যাপার ঠিক বুঝলো না সে।
হঠাৎ করে তনয়ার এই কথার মানে কী?
না চাইতেও—জানার আগ্রহে বলে ফেলল—
“মানে? কি লুকিয়েছো তুমি আমার থেকে।”
তনয়ার চোখ ভিজে আসে।
কীভাবে বলবে এতো কিছু আজ?
তবুও তাকে বলতেই হবে।
আজ আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সে শুরু করে বলার।
চোখে পানি জানো এর মধ্যে বাঁধ মানছে না।
টপটপ করে চুইয়ে পড়ছে।
প্রতিটা শব্দ যেন তার গলা দিয়ে বের হওয়ার সময় বুকের ভেতরটাকে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে।
এতো কষ্ট হয়তো জীবনে তার খুব কম হয়েছে যা আজকে হচ্ছে।
বলতে শুরু করলো একটা ছেলের সঙ্গে কিভাবে তার জোরাজুরি তে রিলেশন এ যায়।
ছেলেটা প্রথম দিকে ভালো ছিলো।
তনয়া যেহেতু নিজের হাত বা তার গায়ে স্পর্শ করা এগুলো পছন্দ করতো না তাই ছেলেটাও এগুলো এড়িয়ে যেতো।
তবে একটা সময় এমন আসে ছেলেটা তনয়াকে বাজে ভাবে কথা বলতে শুরু করে।
তাকে জোর করতে থাকে তার অসৎ উদ্দেশ্যের জন্য।
ঠিক তখনি তনয়া সেই সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসে।
পরে অবশ্য ছেলেটা চেষ্টার শেষ ছিলো না তনয়াকে ফেরাতে।
তবে তনয়া ততক্ষণাত কিয়াসের রাজত্ব।
তার হৃদয়ের দরজাটা তখন অন্য একজনের জন্য খুলে গেছে।
সব কিছু শেষে তনয়া কান্না করে ফেলল।
কিয়াসের দিকে অপরাধী দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে বলে—
“আমাকে ক্ষমা করে দাও কিয়াস। আই আম রিয়েলি সরি। আমি জানতাম না তোমাকে কিভাবে বলবো। তার পরও অনেক বার সাহস করেছি বলার পারিনি। তুমি যেই শাস্তি দেবে আমি তা মাথা পেতে মেনে নেবো তারপর ও আমাকে..”
কন্ঠ ভেঙে আসে তার।
বাকিটা আর মুখ দিয়ে বের হলো না।
চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো একের পর এক।
মাথাটা সামান্য নিচু হয়ে এলো তার।
মনে হচ্ছিলো, এই মুহূর্তে কিয়াস যদি তাকে ছেড়ে চলে যায়, তবুও তাকে কিছু বলার অধিকার তার থাকবে না।
আর কিয়াস?
অনুভূতি শূন্য হয়ে বসে আছে।
তার দৃষ্টি তনয়ার উপর।
কিছুক্ষণ যেন কোনো শব্দই তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
তনয়া হয়তো ভেবেছিলো কিয়াস চিৎকার চেচামেচি করবে।
তাকে বাজে কথা বলবে।
হয়তো রাগে উঠে চলে যাবে।
কিন্তু কিয়াস করলো তার হীতে বিপরীত।
ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে তনয়ার চোখের পানি গুলো নিজের হাত দিয়ে স্বযত্নে মুছে দিলো।
তারপর একটু হেসে নরম কন্ঠে বলল—
“এখন আমি আছি। আমি তোমাকে সব কিছু থেকে রক্ষা করবো, মন প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসবো। তার বদলে শুধু আমার হয়ে থাকতে পারবে না তুমি বেবি গার্ল?”
তনয়া হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো কিয়াসের দিকে।
চোখের পলক পড়তেও যেন ভুলে গেছে সে।
এই লোকটা সব কিছু শোনার পরও তাকে বিন্দু মাত্র দোষী সাব্যস্ত করলো নয়ই, বরং আরও নিজের করে টেনে নিলো।
মানুষ কি এতোটাও ভালো হয়?
যে ভয়টা এতক্ষণ ধরে তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিলো, সেই ভয়টা যেন মুহূর্তেই গলে যেতে শুরু করলো।
তনয়ার চোখ আবারও ভিজে উঠলো।
তবে এবার সেই চোখের পানিতে আগের মতো আতঙ্ক নেই।
আছে স্বস্তি।
তনয়ার ধ্যান ভাঙে।
কিয়াস মিষ্টি করে হেসে বলল—
“আমি কিন্তু আমি উত্তর পায়নি।”
তনয়া হেঁসে ফেলে।
তার সব দুঃখ কষ্টের সমাপ্তি জানো আজ ঘটলো।
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।
কিয়াসও হাসলো।
দুজনের চোখেই তখন অন্যরকম এক শান্তি।
আসলে কিয়াস আগে থেকেই এই বিষয়ে সব কিছু জানতো।
সে একজন মেয়ে কে ভালোবেসেছে অথচ তার ব্যাপারে কোনো খোঁজ খবর সে রাখবে না—এটা কখনোই সম্ভব না।
সে সব কিছু জানার পরও তনয়ার জন্য তার প্রচুর খারাপ লাগে।
মেয়ে টা তো এখানে একদম নিদোষ ছিলো।
তাহলে সে কেনো তাকে কষ্ট দিবে?
আর তনয়া এমন একটা মেয়ে যাকে না ভালোবেসে থাকায় যায় না।
তারপরও তনয়ার মুখ থেকে এগুলো শুনে তার বিশ্বাস হলো—সে ভুল মানুষ কে ভালোবাসেনি।
সে সঠিক মানুষ বাছাই করেছে তার জন্য।
এতক্ষণ ধরে দূর থেকে বসে বসে নিশিতা সব কিছু পর্যবেক্ষণ করছিলো।
তবে আগা মাথা কিছুই বুঝলো না সে।
কি হচ্ছে বা কি বলছে তারা—কিছুই বুঝতে পারছে না।
টেবিলটা অনেক দূরে থাকার কারণে কোনো কিছুই তার কান অব্দি এলো না।
তবুও এই মুহূর্তে এখানে থাকাটা তনয়ার জন্য সেভ নয়।
ফারিস দেখলে বড় ঝামেলা হতে পারে।
সেজন্যই নিশিতা সিদ্ধান্ত নিলো এখনি উঠে যাবে সে।
তনয়ার সঙ্গে বাড়ি গিয়ে কথা হবে।
এখন বরং আগে ফারিসকে থামাতে হবে।
যেই ভাবা সেই কাজ।
চট করে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ালো সে।
এক পা যাওয়ার জন্য যেই এগোবে, তখনি ফারিস চলে আসলো।
নিশিতার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো ফারিসকে দেখে।
মনে হলো বুকের ভেতরটা আচমকা থেমে গেছে।
কি করবে এখন সে?
ফারিস কে কি বলে বের করবে এখান থেকে?
ফারিস নিশিতার কাছে দাড়িয়ে থাকতে দেখে প্রশ্ন করলো—
“এভাবে দাড়িয়ে আছিস কেনো? চল গিয়ে বসবি।”
বলেই নিশিতার হাত ধরে নেয়।
কিছু বলতে পারলো না নিশিতা।
মুখ খুলে কোনো একটা অজুহাত দেওয়ার চেষ্টা করেও যেন শব্দ খুঁজে পেলো না সে।
চোখ দুটো না চাইতেও বার বার তনয়াদের টেবিলের দিকেই পড়ছে।
নিশিতার দৃষ্টি অনুযায়ী দৃষ্টি পাত হতেই ফারিস থমকে গেলো।
চোখ সরু হয়ে এলো তার।
তনয়া?
তনয়া এখানে কি করছে?
আর কিয়াস কে দূর থেকে দেখেও চিনতে অসুবিধা হলো না ফারিসের।
ডিলের কাজে প্রায় সময়ই দেখা হয় তাদের।
তাই পরিচিত মুখ হয়ে গেছে।
ফারিসের মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেলো।
যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগেও স্বাভাবিক ছিলো, তার চোখে এখন জমতে শুরু করেছে কঠিন প্রশ্ন।
এদিকে তনয়া আর কিয়াস কথায় এতোটয় মগ্ন ছিলো যে তাদের দিকে দু’জন দৃষ্টি পাত করে আছে তা বুঝলোই না।
কথার মাঝেই তনয়ার চোখ পড়লো ফারিস আর নিশিতার উপর।
তার চেহেরা থেকে হাসিটা হুট করে উধাও হয়ে গেলো।
এক মুহূর্ত আগেও যে মুখে স্বস্তির হাসি ছিলো, সেখানে মুহূর্তেই জন্ম নিলো এক রাশ বিষ্ময়।
নিশিতা আর ফারিস এখানে কি করছে—তা তনয়া মাথায় ঢুকলো না।
চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেলো তার।
ঢোক গিলল পর পর কয়েকটা।
ফারিস আজকে তার কি করবে—তা নিয়ে ভাবতেই পুরো শরীর শিউরে উঠলো।
এভাবে আজকে ধরা পড়ে যাবে—তার ধারণা তার বিন্দু মাত্র ছিলো না।
এদিকে কিয়াস কথা না শুনে তনয়াকে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কিয়াস বিরক্ত হয়ে সেদিকে তাকাতেই তার শরীর দিয়ে হিমশীতল শ্রোত বয়ে গেলো জানো।
ফারিস এখানে?
আর এভাবে?
সে বুঝতে পারলো না এই মুহূর্তে তার করণীয় কি।
নিজের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি পড়তে হলো।
কিয়াসের মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো।
দৃষ্টি স্থির হয়ে রইলো ফারিসের ওপর।
আর এদিকে জানো ফারিসের চোখ দিয়ে দাবালনের আগুন ঝলসে পড়ছে।
তার চোখের দৃষ্টি এতটাই কঠিন যে দূর থেকেও সেটা বোঝা যাচ্ছে।
কেউ কোনো কথা বলছে না।
কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই যেন এক ভয়ংকর ঝড়ের আগাম বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে।
এর মাঝেই চেনা পরিচিত মেয়েলি কন্ঠ স্বর শোনা গেলো।
অহনা।
অহনা এদিকেই আসছে কিছু বলতে বলতে।
দেখে মনে হলো রেগে আছে প্রচুর।
বিড়বিড় করে বলছে—
“খারাপ লোক একটা। সবসময় আমাকে নিয়ে মজা করে। থাকবোই না আমি।”
বলতে বলতে এগিয়ে আসছে।
কিন্তু হুট করে সামনে ফারিস আর নিশিতাকে দেখে থমকে যায় সেও।
চোর ধরা পড়েছে জানো।
বড় বড় চোখ করে তাকায় নিশিতা ফারিসের দিকে।
তার মুখের রাগ মুহূর্তেই উধাও।
চোখেমুখে এখন একটাই আতঙ্ক—এই মুহূর্তে সে কী করবে?
আবাক হয় নিশিতাও জানো।
তারা সবাই বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে।
কিছু বলতে পারলো না মুখ দিয়ে।
সঙ্গে তনয়া আর কিয়াসও দেখে তাদের।
বর্তমানে কি চলছে এখানে তা বুঝতে পারছে না কেউ।
হুট করে চেনা পরিচিত সব মুখ এক জায়গায়।
তনয়া আর কিয়াস উঠো দাড়তেই রাজীব কে চিন্তিত হয়ে অহনার পিছনে পিছনে আসতে দেখা গেলো।
নিশিতার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো।
কি হচ্ছে এগুলো?
যা দেখছে তা কি আদেও সত্যি?
নিজের চোখ দুটোকে বিশ্বাস করতে পারলো না সে।
মুহূর্তের মধ্যেই যেন পুরো রেস্টুরেন্টের পরিবেশ বদলে গেলো।
এই মুহূর্তে এখানে যে বড় একটা ঝড় হবে তা আর বুঝতে বাকি নেই কারও।
রাজীব সবাই কে এভাবে একসাথে দেখে চোর ধরা পড়লে যেমন মুখ করে থাকে ঠিক সেভাবেই ছিলো।
চোখ বড় বড়।
মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি।
আর অহনার লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যেতে মন চাইলো।
এভাবে সবার সামনে পড়বে—তা তার অজানা ছিলো।
বেশ কিছুদিন যাবৎ রাজীব ব্যস্ত থাকায় সময় দিতে না পারায় অহনা বেশ রেগে ছিলো তার উপর।
ফোন করলেও ফোন ধরেনি, কথা বলেনি।
এদিকে রাজীব বেচারা পড়ছিলো মজা বিপদে।
তাই আজকে ফারিস অফিস থেকে বের হতেই সঙ্গে সঙ্গে রাজীবও বের হয়।
অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে অহনা নিয়ে রেস্টুরেন্টে আসে।
রাগ ভাঙালেও রাজীবের মজা করায় আবারও রেগে যায় অহনা।
তাই তো এভাবে রেগে চলে আসলো বলে সবার সামনে ধরা পড়লো।
মাথা নিচু করে রইলো সে।
অহনার কান পর্যন্ত লাল হয়ে উঠেছে লজ্জায়।
ফারিসের এগুলো দেখে বিরক্তি চরম পর্যায়ে গিয়ে ঠেকলো।
রাগে তার হাত দুটো মুঠি বন্ধ হয়ে আছে।
চোয়াল শক্ত।
চোখেমুখে বিরক্তি স্পষ্ট।
সে চাইছে না এভাবে কারও সামনে সিং ক্রিয়েট করতে।
কিন্তু চারপাশের পরিস্থিতি যেন তাকে বাধ্য করছে।
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বেশ জোরে বলল—
“সালার জিন্দেগী তে শুধু মারায় খেলাম। জীবনে প্রেম করতে পারলাম না আর এদিকে বাড়ির একটাও সিঙ্গেল নেই।”
কথাটা শুনে এমন একটা পরিস্থিতির মাঝেও সবার হাসি পেলো।
তনয়া মুখ টিপ মেরে হাসলো।
চোখের কোণে তখনও ভয় আর অস্বস্তি থাকলেও ফারিসের কথাটা শুনে হাসিটা আটকে রাখতে পারলো না সে।
নিশিতা হতবাক হয়ে গেলো।
তার এই মুহুর্তে বলার মতো কোনো ভাষা তার জানা নেই।
এদিকে ফারিসের কথায় রাজীব ফটর ফটর করে বলল—
“এ্যাহ্। মারা খাওনি মারা দিয়েছো। প্রেম না করে সরাসরি বি…..”
কথা শেষ করতে পারলো না।
তার আগেই রাজীবের দিকে কটমট করে তাকালো সবাই।
একসঙ্গে এতগুলো চোখের রাগী দৃষ্টি নিজের দিকে পড়তেই রাজীবের মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো।
রাজীব ভয়ে চুপ হয়ে গেলো।
অহনা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল—
“চুপ করুণ বেয়াদব লোক। আপনার জন্য আজ ধরা খেলাম।”
রাজীব স্বাভাবিক কন্ঠে বলল—
“ভালোই হবে। কট খেয়ে সোজা পূর্ণতা কি বলো? হে হে।”
রাজীবের দিকে চোখ গরম করে তাকালে রাজীব চুপসে গেলো।
মুহূর্তেই তার মুখের ভাব পাল্টে গেলো।
আর চারপাশে?
আবারও সেই অদ্ভুত নীরবতা।
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৮
একসঙ্গে এতগুলো গোপন সম্পর্ক, লুকানো সত্য আর হঠাৎ ধরা পড়ে যাওয়া মানুষগুলো যেন একই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।কারও মুখে কথা নেই।কেউ জানে না পরের মুহূর্তে কী হবে।
শুধু ফারিসের চোখের দৃষ্টি আর তনয়া-কিয়াসের অস্বস্তি দেখে মনে হচ্ছে—এই রাতটা এখানেই শেষ হওয়ার নয়।
