চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৫
আরোবা চৌধুরী আরু
নাফিসার চোখ থেকে অঝোরে পানি । সায়মানের দিকে এক পলক তাকিয়েই হঠাৎ যেন সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে গেল তার চোখ বন্ধ হয়ে আসল, শরীর ঢলে পড়ল ।
সায়মান মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল, কেবল তাকিয়ে থাকল ওর মুখের দিকে। হালকা ঘাম জমেছে কপালে, চোখের পাতাগুলো নিস্তব্ধ হয়ে নেমে এসেছে গালের উপরে, ঠোঁটগুলো শুষ্ক আর ফ্যাকাসেমনে হচ্ছিল ভয়ের অতিরিক্ত চাপ তার শরীর আর সহ্য করতে পারেনি।
পেছন থেকে রুশনার কণ্ঠ শোনা গেল,
“এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ও তো সেন্সলেস হয়ে গেছে অতিরিক্ত প্যানিক হওয়ার কারণে। তাড়াতাড়ি কোলে তুলে পাশের রুমে নিয়ে শুইয়ে দে।”
সায়মান যেন হুঁশ ফিরে পেল। তাড়াতাড়ি নাফিসাকে কোলে তুলে পাশের রুমে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে রুশনাকে বলল,
“আপি, ওর হিজাব খুলে দে।”
রুশনা এগিয়ে এসে হিজাব খুলে দিল। সায়মান তখনে চুপচাপ বাইরে চলে গেল।
রুশনা নাফিসার পাশে বসে আলতো করে ওর গালে হাত রাখল,,
“নাফু… শুনতে পাচ্ছো?”
কোনো সাড়া নেই। রুশনা ওকে হালকা করে মাথা উঁচু করিয়ে মুখে একটি ওষুধ দিল। (যদি এমন অবস্থায় ঘুমের ওষুধ দেওয়া যায়, তবে সেটাই দিয়েছিল যেন অন্তত কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারে।)
ওকে কম্বলে মুড়ে রেখে কিছুক্ষণ পর রুশনা নিচে নেমে এলো।
নিচে এসে দেখল সায়মান সোফায় বসে আছে,, দুই হাত দিয়ে মাথা ঢেকে রেখেছে, কপাল নিচের দিকে ঝুঁকে।
রুশনা ওর পাশে বসে হাত রাখল বাহুতে,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“টেনশন নিস না। কিছুদিন মেডিসিন আর ট্রিটমেন্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। তুই কিন্তু একটা ভালো কাজ করেছিস,,ওকে বাসায় নিয়ে এসেছিস। একটা ভালো পরিবেশ দরকার ছিল ওর জন্য। সময় লাগবে, কিন্তু আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।”
সায়মান শুধু অস্পষ্টভাবে বলল,
“হু…”
ওর দৃষ্টি অন্য কোথাও, মনে হচ্ছিল গভীর কিছু ভাবছে।
রুশনা আবার বলল,,
“তুই নাফিসার প্রতি এত কনসার্ন কেন? ওর ব্যাপারে তুই একটু বেশি ভাবিস, দেখছি।” তারপর কিছু একটা ভেবে বলল, বুঝতে পেরেছি।
সায়মান হঠাৎ চমকে রুশনার দিকে তাকাল।
“কি বুঝতে পেরেছিস আপি?”
রুশনা হেসে বলল,,
“যে নাফিসাকে তুই নিজের ছোট বোন ভেবে নিয়েছিস তাই এত কেয়ার করছিস। মনে আছে, ছোটবেলায় সাইফান হওয়ার সময় তুই বলছিলি তুই ভাই নিবি না, তুই বোন নিবি… হাহাহা।”
সায়মানের রাগ চেপে বসল। একে তো বিনা কারণে নাফিসাকে তার বোন বানিয়ে দিল, তার উপর মনে পড়ছে নাফিসার জীবন,একটা ছোট মেয়ে কত রকম আঘাত আর কষ্ট সহ্য করছে। সব রাগ একসাথে জমে গিয়ে হঠাৎ সে চিল্লিয়ে বলে উঠল,,
“আপি, প্লিজ থামবি তুই।”
রুশনা অবাক,
“কি হল তোর? আমি তো মজা করছিলাম।”
সায়মান কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে বলল,
“সরি… কিছু না। ওকে কখন নিয়ে যেতে পারব?
আমি একটু ঘুমের ওষুধ দিয়েছি, কিছুটা সময় লাগবে। ততক্ষণ আমার সাথে গল্প কর… তুই তো এ বাসায় আসিস না।”
ঘরে তখন এক ধরনের নীরবতা।
এসি’র শীতল বাতাস চারপাশে ধীরে ধীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেন বাতাসও ঘুমিয়ে আছে।
পর্দার ফাঁক দিয়ে এসে পড়ছে দুপুরের গড়িয়ে যাওয়া রোদের নরম, সোনালি আলো,,বিছানার সাদা চাদরের উপর সেই আলো পড়েই যেন মৃদু উষ্ণতা যোগ করছে শীতলতার মাঝে।
বিছানার উপর শুয়ে আছে নাফিসা মুখে ক্লান্তির আভা, শ্বাসপ্রশ্বাস ধীর, চোখের পাতাগুলো ভারী হয়ে বন্ধ।
চুলের কিছু গোছা এলোমেলোভাবে কপালে এসে পড়েছে, ঠোঁটে কোনো কথা নেইশুধু নিস্তব্ধতা।
হঠাৎই, খুব হালকা একটা স্পর্শ অনুভব করল সে… যেন কারো নরম হাত তার গালের উপর আলতো করে বুলিয়ে গেল।
কপাল কুঁচকে গেল নাফিসার, ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট শব্দ কিছু বিড়বিড় করছে, যা বোঝা যাচ্ছে না।
এক মুহূর্তের মধ্যেই যেন শরীরের ভেতরে একটা অজানা আতঙ্কের ঢেউ উঠল হঠাৎই চোখ খুলে ভয়ার্তভাবে সোজা হয়ে বসল।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক ছোট্ট প্রাণ, তিন বছরের বেশি হবে না।
গোল মুখ, বড় বড় কৌতূহলী চোখ, গালে ডিম্পল পড়া দুষ্টু হাসি।
শিশুটি যেন একেবারেই ভয় পায়নি, বরং অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, হাতে এখনও নাফিসার গালের উষ্ণতা রয়ে গেছে।
নাফিসা প্রথমে কেবল তাকিয়ে রইল…
তারপর ধীরে ধীরে চারপাশে চোখ বোলাল এ ঘর কোথায়? এত সুন্দর সাজানো, পরিচ্ছন্ন… জানালার ধারে নরম কুশন, সাদা আলমারি, শীতল বাতাস…
কিছুই চেনা নয়।
মুহূর্তের মধ্যেই আগের কিছু দৃশ্য মনের পর্দায় ভেসে উঠল,
অস্পষ্ট স্মৃতি, কিছু মুখ, কিছু কথোপকথন…
হঠাৎই সেই মিষ্টি কণ্ঠ তার মনোযোগ ভেঙে দিল,
“থালামনি… তমি বয় পায়চো?”
নাফিসা অবাক হয়ে তাকাল।
শিশুটি মাথা কাত করে প্রশ্ন করছে, চোখে একরাশ চিন্তার ছাপ।
তার কণ্ঠের ভঙ্গি এতটাই সরল আর স্নেহভরা যে নাফিসার ঠোঁটে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
সে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল,,
“আমি ভয় পাইনি…”
শিশুটি যেন তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলল, তারপর উজ্জ্বল মুখে আবার বলল,
“তমি অনেত তুন্দর… বিটুটিফুত…”
শব্দটা স্পষ্টভাবে বলার চেষ্টা করল, কিন্তু বারবার “বিউটিফুল” উচ্চারণটা হয়ে গেল “বিটুটিফুত।”
নাফিসা চোখ নামিয়ে হাসল।
আঙুল বাড়িয়ে শিশুটির নরম গাল আলতো করে টেনে বলল,
“তুমি তো অনেক মিষ্টি… বিটুটিফুত।” ওর সেটা বলার চেষ্টা করল।
শিশুটি খুশি হয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।
নাফিসা এবার তাকে কোলে তুলে নিল, ছোট্ট শরীরটায় যেন একধরনের উষ্ণতা আছে যা মনে শান্তি আনে।
“তোমার নাম কী?” নাফিসা প্রশ্ন করল।
শিশুটি যেন গর্ব করে বলল,
“মিস্ত্রি তাবিব এহতান।”
নাফিসা অবাক হয়ে হেসে ফেলল,
“তোমার নাম মিস্ত্রি?”
শিশুটি মাথা নেড়ে ‘না’ বলল, কিন্তু পরের মুহূর্তেই আবার চেষ্টা করল,
“মিস্ত্রি… মিস্ত্রি…”
তবুও “মিষ্টি” বলার চেষ্টাটা বারবার হয়ে যাচ্ছে “মিস্ত্রি।”
নাফিসা মৃদু হাসি দিয়ে তার নাক আলতো করে টিপে দিল,
“আচ্ছা, আমি সঠিক করে বলে দিচ্ছি… মিষ্টি হাবিব এহসান… এবার ঠিক বলো তো?”
শিশুটি খিলখিলিয়ে হেসে সম্মতি জানাল, ছোট্ট মাথাটা জোরে জোরে নাড়াল যেন এখন সে ঠিক বলছে।
ঠিক তখনই রুমের দরজা খুলে গেল।
ভেতরে ঢুকল রুশনা,মুখে স্বাভাবিক হাসি, হাতে ছোট্ট একটা কাপ।
সে দৃশ্য দেখে বলল,
“কি গো দুজন, কি গল্প করছ?”
নাফিসা রুশনাকে দেখেই লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল, ঠোঁটের কোণের হাসিটুকুও মিলিয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্ত আগের স্বাভাবিক ভঙ্গি হারিয়ে আবার যেন চুপচাপ, সংযত হয়ে গেল সে।
রুশনা নাফিসার দিকে কয়েক মুহূর্ত গভীরভাবে তাকিয়ে রইল। তার চোখেমুখে এখনো ভয় আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট ক্লান্ত চোখের পাতাগুলো আধভাঙা, ঠোঁটের কোণ শুকনো, গাল ফ্যাকাসে। রুশনা তার হাতে থাকা গ্লাসটা আলতো করে সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“নাও, একটু পানি খাও… তারপর রেডি হয়ে নাও। ওইদিকে তো আর একজন বসে আছে, তার তো আবার সময় খুব বেশি দেয় না। তোমার জ্ঞান ফিরেছে কি না, বারবার জিজ্ঞেস করছে।”
নাফিসা কিছু না বলে গ্লাসটা হাতে নিল। পানি ঠোঁটে ছোঁয়ানোর আগে রুশনা এগিয়ে এসে তার মাথায় স্নেহভরে হাত বুলিয়ে দিল। স্বরটা কোমল হয়ে উঠল,
“দেখো, তুমি একা নও। এরকম হ্যারাসমেন্টের শিকার ছোটবেলায় অনেকেই হয়েছে। এগুলো মনে পুষে রাখবে না, আর যদি কখনো এমন কিছু হয়, সবার সাথে শেয়ার করবে। বুঝেছো? আমি তোমাকে কিছু মেডিসিন দেবো… এগুলো খেলে আর স্বপ্নে ওইসব দেখবা না। ঠিক আছে?”
নাফিসার চোখ হঠাৎ ভিজে উঠল, পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল গালে। সে এক মুহূর্তের জন্যও নিজেকে সামলাতে পারল না,ঝট করে রুশনাকে জড়িয়ে ধরল। আচমকা এই আলিঙ্গনে রুশনা খানিকটা চমকে গেলেও, পরের মুহূর্তে স্নেহভরা হাসি ফুটল মুখে। আলতো করে নাফিসাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আরে পাগলি মেয়ে… কান্না করছো কেন?”
নাফিসা কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু একটার পর একটা হেঁচকি ওঠায় কথা আটকে গেল গলায়।
এমন সময় ছোট্ট পায়ের শব্দ হয়ে ‘মিষ্টি’ দৌড়ে এসে দু’জনের সামনে দাঁড়াল। বড় বড় চোখে নাফিসার দিকে তাকিয়ে বলল,
“খালামণি, তমি আবাত তানছো তেন? খালামণি, খালামণি… তমি তদো না… তমি তাদলে আমিও তেদে দিবো।” ( এখানে লেখার খুব ইচ্ছা ছিল, পাপিতা পাপিতা তুমি পেদ না তুমি পাদলে আমিও পেদে দিব,যদি নাফিসার নাম পাপিতা হত আর মিষ্টি ত উচ্চারণ না করে প করতো 🥴)
ওর ভাঙা-ভাঙা ভাষায় নির্দোষ হুমকি শুনে নাফিসা কাঁদতে কাঁদতেই হেসে ফেলল। রুশনাও হেসে উঠল।
নাফিসা ধীরে ধীরে রুশনার আলিঙ্গন থেকে সরে এসে মিষ্টিকে কোলে তুলে নিল। ছোট্ট গালে একটুখানি চুমু খেল সে, আর মিষ্টিও খিলখিলিয়ে হেসে নাফিসার গালে একটা চুমু দিয়ে পাল্টা ভালোবাসা ফিরিয়ে দিল।
ঠিক তখন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছকিনা খালা বলল,
“নিচে আপনাদের ডাকতেছে… সায়মান স্যারের নাকি দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
নাফিসা কোলে থাকা মিষ্টিকে আলতো করে নামিয়ে দিল। হিজাবটা হাতে তুলে নিল এবং মিষ্টির গালে আরেকটা চুমু খেয়ে মাথায় ওড়নাটা বাঁধতে শুরু করল।
এরপর তিনজন একসাথে নিচে নামল। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পায়ের আওয়াজ শুনে সায়মান এক পলক উপরের দিকে তাকাল। তারপর এগিয়ে এসে কোনো কথা না বলেই মিষ্টিকে কোলে তুলে নিল। সামনে এগোতে এগোতে বলল,
“তাড়াতাড়ি কর, ওকে নিয়ে আপি।”
রুশনা হাঁটতে হাঁটতে চোখ মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“তুই আর ঠিক হলি না… সবসময় তাড়াহুড়ো লেগেই থাকে তোর।”
বাইরে এসে গাড়ির কাছে পৌঁছে সায়মান মিষ্টির গালে একটা চুমু দিয়ে হাসিমুখে বলল,
“মামনি, আজ তাহলে যাই… আবার পরে আসব, ঠিক আছে?”
মিষ্টি চোখ বড় করে সায়মানের দিকে তাকাল, তারপর খিলখিলিয়ে হেসে বলল,
“আতা…”
বলেই তার গালে একদম মিষ্টি একটা চুমু দিয়ে দিল। সায়মান মিষ্টিকে রুশনার কোলে তুলে দিল।
মিষ্টি এবার নাফিসার দিকে তাকিয়ে বলল,
“খালামণি, তমি আবাত আতবে…”
নাফিসা মিষ্টি হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“আচ্ছা।”
তারপর এগিয়ে গিয়ে ছোট্ট মাথাটা নিজের গালে লাগিয়ে দিল,।
ওদের বিদায় জানিয়ে নাফিসা আর সায়মান গাড়িতে উঠে বসল। সায়মান ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট করল,মুখের ভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন নেই, চোখও অন্যদিকে স্থির। নাফিসা একবার তার দিকে তাকাল, কিন্তু কোনো কথা বলল না। তারপর ধীরে ধীরে মুখ ফেরাল বাইরে জানালার ওপারে ব্যস্ত ঢাকা শহর, ভিড় আর শব্দের ভেতরে স্রোতের মতো বয়ে যাচ্ছে সময়।
রুহি তার রুমের কোণে, বেডের ওপর শুয়ে ফোনে মগ্ন। ধূসর বিকেলের আলো জানালা দিয়ে আসছে, হালকা বাতাস জানালার পর্দা দুলিয়ে দিচ্ছে। চারপাশ শান্ত, কেবল ফ্যানের হালকা ঘূর্ণন এবং বাইরে লাফিয়ে উঠা পাখির কিলকারি শোনা যাচ্ছে। রুহি মুগ্ধ চোখে ফোনের স্ক্রিনে কিছু পড়ছে, অজান্তে সময়ের ব্যাপার ভুলে গেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে, দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ রুমে প্রতিধ্বনিত হলো। রুহি হঠাৎই চমকে উঠে, পেছনের দিকে তাকাল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে রায়ান,,রাইহান ভাই, যার অস্তিত্বই রুহির মনকে অচেনা উত্তেজনায় ভরে দেয়। তার চোখের গভীরতায় অদ্ভুত এক শান্তি এবং হালকা শীতল আভা। রুহি তাড়াহুড়ো করে বসে গেল, “রাইহান ভাই, তুমি…” কথার শেষাংশ রোধ হয়ে যায় উত্তেজনা আর বিস্ময়ে।
রায়ান কোনো উত্তর না দিয়ে, নিঃশব্দে রুহির কাছে আসে এবং ধীরে ধীরে তাকে নিজের কাছে জড়িয়ে নেয়। রুহি মুহূর্তের জন্য ফ্রিজ হয়ে যায়। হৃদয় দ্রুত বেগ পেতে থাকে, মনে হয় প্রথমবারের মতো কোন পুরুষ তার এত কাছাকাছি। শরীর অচেতনভাবে স্থির, চোখগুলো বড় হয়ে যায়, আর ফ্যানের হালকা হাওয়া যেন আরও তীব্রভাবে শীতলতা বয়ে আনছে।
কিছুক্ষণ পর, রায়ান ধীরে ধীরে রুহিকে ছেড়ে দিয়ে, সরি বলে মুখে হালকা দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর কোমলভাবে রুহির গালে হাত রেখে বলল, “তুই আমার ফোন রিসিভ করছিলি না কেন? তুই জানিস আমি কত টেনশন এ থাকি।” রুহি হঠাৎ হুশে আসে।
তার অভিমান ও রাগের ভঙ্গিতে রুহি উত্তর দেয়, “কিসের জন্য তোমার ফোন রিসিভ করতে যাব? কে হও তুমি আমার?”
রায়ান হেসে ওঠে, চোখে হালকা ঝিলিক, মুখে ফোফাতো ভাই আর প্রেমিক,দুইয়ের মিশ্রণ,কোন “অধিকারটা চাপাবো তোর ওপর? না হুঁ, ফুফাতো ভাই আর প্রেমিক দুইটাই এখন, বল তো কোনটা চাপাবো?”
রুহি ভেঞ্চি কেটে ঘুরিয়ে দেয়, রায়ানের দিকে আর চোখ রাখে না।
রায়ান মুখে হালকা অসহায় ভঙ্গি নিয়ে বলল, “এত রাগ বাবারে… তাহলে ম্যাডামের , আপনার রাগ ভাঙানোর জন্য এখন আমার কি করতে হবে?”
রুহি চোখে খেলার উজ্জ্বলতা নিয়ে বলে উঠল, “আমার সামনে নাচ দেখাও।”
রায়ান চোখ বড় করে অবাক হয়ে বলল, “কি?
না, হ্যাঁ, যা বলছি তাই করো, না হলে আমি এমন রেগে থাকবো।” তার ভঙ্গি অসহায়, আর হাসি লুকিয়ে থাকে চোখের কোণে।
তাহলে তুই গান গা?
রুহি শয়তানি হাসি দিয়ে হালকা কণ্ঠে বলে, “আচ্ছা।”
রায়ান মৃদু হেসে মাথা নাড়ে, তারপর ফোনে প্লে করে মানিকের একটি হাস্যকর গান, যেটাতে রাইহান কোনো পেশাদার নাচ করতে পারবে না। হালকা রিদমে পা ও হাত নাড়াচাড়া করা শুরু করে, হাসির সংমিশ্রণে পুরো রুম যেন জীবন্ত হয়ে উঠল।
রুহি হেসে ফুঁপিয়ে উঠে, চোখে চকচকে আনন্দ, মুখে হাসির ঝিলিক। রায়ানও নাচ থামিয়ে তাকিয়ে থাকে, চোখে অদ্ভুত প্রশান্তি এবং তার মুখে নিঃশব্দে হাসি ফুটে ওঠে। প্রিয়তমার হাসি দেখে রায়ানের মন হালকা হয়ে যায়, হৃদয়টা এক অন্যরকম উচ্ছ্বাসে ভরে যায়। চারপাশের ধূসর আলো, হালকা বাতাস, ফ্যানের ঘূর্ণন সবকিছু যেন মুহূর্তের এই আনন্দের সঙ্গে মিশে যায়।
রুহির হেসে পড়া আর রায়ানের চোখে হাসি এই ক্ষুদ্র মুহূর্তটিই যেন রুমকে জাদুর আভায় ভরে দিল।
সায়মান গাড়ি ধীরে ধীরে থামাল। সে নাফিসার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি ভিতরে যাও, আমি গাড়ি পার্ক করে আসছি।”
নাফিসা কিছু না বলে সায়মানের কথা মেনে গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভিতরে চলে গেল। ভিতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়ল,
সোফার ওপর বসে আছে কিছু নতুন মুখ, যারা ঠিক এই মুহূর্তে অবাক হয়ে তাকিয়ে। নাফিসা কোনো কথা না বলেই নিজের একপাশে এগোলো, শান্তভাবে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে নিজেকে স্থিত রাখল।
সাবিহা খালেদা রাশিদ, সায়মানের ফুপি হঠাৎ নাফিসার দিকে তাকাল। চোখ-মুখ কুঁচকে গেল, কণ্ঠে একটা স্বরটা উঁচু করে উঠল,
“এই মেয়ে কে? তুমি তোমাকে ভেতরে আসতে দিলে কে? বাড়ির গার্ডরা কোথায়? হঠাৎ কাকে ঢুকতে দিচ্ছ?”
নাফিসা জড়োসড়ো হয়ে থমকে দাঁড়াল। মাথা কুঁচকে নিল, অল্প অচেতন ভাব ধরে রাখল।
রাইমা খালেদ,সাবিহার মেয়ে এতক্ষণ ফোনে মগ্ন, হালকা হোয়াইট কালারের হাটুর একটু উপরে ওঠা জামা আর জিন্স পরে বসে আছে,চুলগুলো স্ট্রেট করা পেট পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে দেখতে মোটামুটি । সাবিহার কথাগুলো শুনে সে অল্প চোখ ছোট করে নাফিসার দিকে তাকাল, কিন্তু বিশেষ কোনো ভাব প্রকাশ পেল না, আবারও ফোনে মগ্ন হলো।
সাবিহা ধীরে ধীরে নাফিসার দিকে এগিয়ে এল। চোখে নজর, একেবারে ছেদ করে দেখছে। মনে মনে যাচাই করছে জামা কাপড় থেকে শুরু করে পুরো শরীরের ভঙ্গি, সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে এক সুন্দর ঘরের মেয়ে। কণ্ঠে রোস্টভরা সুর,
“দেখে তো ভালোই সুন্দর, জামা-কাপড়ও ঠিক আছে। এই বাড়িতে হঠাৎ কি?”
নাফিসা কিছু বলতে পারল না। সে জানে না সাবিহা কে, তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
সাবিহা ক্ষিপ্ত হয়ে আবার বলল,
“কি শুনতে পাচ্ছ না? কি জিজ্ঞেস করছি তোমাকে!”
ঠিক সেই মুহূর্তে, তড়িঘড়ি করে আফিয়া বেগম হাজির হলেন। ধীর ও দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“সাবিহা, এটা আমার মেয়ে।”
সাবিহার চোখ-ভঙ্গি অল্প বিস্মিত, মুখে প্রশ্নের ছাপ,
“কোথা থেকে পেলে, ভাবী? তোমার মেয়ে আবার?”
রাইমা অবাক চোখে তাকাল, ফোন হাতে সামান্য থামল। তারপর নীরবভাবে এগিয়ে এসে নাফিসার পাশে দাঁড়ালো।
“ও, সায়মানের বন্ধুর বোন। ও কিছু ঘটনা খুলে বলল, এখন থেকে আমাদের বাড়িতেই থাকবে,” মৃদু কণ্ঠে বলল, শান্ত ও দৃঢ় ভঙ্গিতে।
নাফিসা মাথা থেকে পায় পর্যন্ত ধীরে ধীরে ঝাকঝাক করে তাকাল আবার , সাবিহা দিয়ে বললো,
“তো তাকে আবার স্কুলে ভর্তি করার কি দরকার ছিল? বাড়িতে কোনো কাজের জন্যে লাগিয়ে দিলে হতো। তোমাদের এত ভালো মানসিকতা আমার পছন্দ নয় বাবা। আজকাল কাউকে বিশ্বাস নেই।”
মাথা আরও নিচু করে নাফিসা চুপ করে থাকল। আফিয়া বেগম সাবিহার কথার দিকে বিরক্তি প্রকাশ করল।
আফিয়া বেগম হালকা গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“সেটা তোমার না বুঝলেও চলবে। আমি নিজেই দেখব।
সাবিহা রুষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠলো, এই মেয়ের জন্য তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বলতে পারলে?”
রাইমা নাফিসার দিকে ভালো করে তাকাচ্ছিল, মনে মনে ভাবছিল, সায়মান ভাই একে নিয়ে এসেছে। এতক্ষণ ড্রয়িং রুমে তেমন কেউ ছিল না, ধীরে ধীরে সবাই উপস্থিত হয়ে গেল।
হঠাৎ এক গম্ভীর স্বরের আওয়াজ,
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৪
“কি হয়েছে এখানে?”
সকলের দৃষ্টি ঐ দিকে। চারপাশের নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে গেল। ঘরের বাতাসে অল্পটা উত্তেজনা, নীরব দৃষ্টি, প্রত্যেকের ভেতরের কৌতূহল, সব মিলিয়ে মুহূর্তটি এক অনিশ্চিত ও তীব্র আবহ সৃষ্টি করল।
