চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২২
আরোবা চৌধুরী আরু
অতিথিদের জন্য আলাদা করে সাজানো সোফা আর চেয়ারগুলোতে সবাই একে একে বসেছেন। মাহবুব রাশিদ, মঈন রাশিদ, ইমা বেগম, বিলকিস আরা, সাবিহা খালেদ, আফিয়া বেগম—বাড়ির প্রধান সদস্যরা সযত্নে অতিথিদের আপ্যায়ন করছেন।
সামনের এক কোণে বসে আছেন মাহবুব রাশিদ, তার বন্ধু আহসান করিম এর সাথে। বহুদিনের বন্ধুত্ব, তাই দেখা হতেই তাদের মধ্যে গল্প জমে উঠলো। একদিকে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ, অন্যদিকে আজকের দিনটা সফলভাবে শেষ করার প্রত্যাশা। সাথে মঈন রাশিদ ও যোগ দিয়েছেন তিনি আহসান করিমকে অনেক দিন থেকে চেনে আর বড় ভাইয়ের উপর তার অগাধ ভরসা আছে। রুহির জন্য ভালো ডিসিশনি নিবে তিনি।
আহসান করিমের স্ত্রী, শিরিন করিম, ইতিমধ্যেই মহিলাদের দলে মিশে গেছেন। আফিয়া বেগম, বিলকিস আরা আর সাবিহা খালেদের সাথে গল্পে মেতে উঠেছেন তিনি।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
সামনের সোফায় বসে আছে —রাহুল আহসান। রাহুলই সেই ছেলে, যার সাথে রুহির বিয়ের প্রস্তাব ঠিক হয়েছে। পরিপাটি সাজে, শান্ত স্বভাবের রাহুলকে দেখে মনে হচ্ছে —পরিবারের সুনাম রাখার মতোই যোগ্য ছেলে। রাহুল পারিবারিক ব্যবসা সামলায়, অনেক দায়িত্বশীল ছেলে। ছোটবেলা থেকেই মাহবুব রাশিদ তাকে চেনেন। নিজের বন্ধুর ছেলে হওয়ার কারণে এবং দীর্ঘদিন ধরে কাছ থেকে দেখার ফলে রাহুলের প্রতি তার আস্থা আছে । তাই তিনি নিশ্চিন্ত মনে রুহির সাথে রাহুলের বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
পাশে বসে আছে তার ছোট ভাই, রিয়াদ। রিয়াদ বার বার চারিপাশ দেখছে যেন কাউকে খুজছে।
সায়ফান বসে রাহুলের সাথে আলাপ জমাল। দুইজনের মধ্যে টুকিটাকি কথা হচ্ছে। পাশে রাইমা বসে সে ও ওদের সাথে কথা বলছে মাঝে মাঝে।
ঘরে প্রবেশ করলো রিদওয়ান,সবাইকে সালাম দিল, আহসান করিম, শিরিনা করিম ওর রাহুল সালামের উত্তর দিল। হঠাৎ চোখ ঘুরতেই তার দৃষ্টি আটকে গেল রিয়াদের ওপর। মুহূর্তেই কপাল কুঁচকে উঠল—
“এই বেয়াদবটা এখানে কি করছে?” মনে মনে ক্ষোভ জমল ওর।
রিয়াদও যেন অপেক্ষায় ছিল। সাথে সাথেই উঠে দাঁড়িয়ে চমৎকার হাসি দিয়ে এগিয়ে এলো।
—“আরে রিদওয়ান! তুই এখানে?”
সবাই একসাথে ওদের দিকে তাকাল। পরিবেশে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো।
আহসান করিম কৌতূহলী চোখে বললেন,
—“রিয়াদ, তুমি চেনো ওকে?”
রিয়াদ হাসিমুখে উত্তর দিল,
—“ইয়েস পাপা, আমার ক্লাসমেট আর খুব ভালো বন্ধু। আর আজ জানতে পারলাম, এতোদিন পর যে আমাদের পরিবারও ফ্যামিলি ফ্রেন্ড!”
বলতে বলতেই সে রিদওয়ানকে জড়িয়ে ধরল। হঠাৎ এভাবে জড়িয়ে ধরা দেখে রিদওয়ান হতবাক হয়ে গেল। তবে চারপাশের সবার সামনে কিছু না বলে কানে কানে গম্ভীর স্বরে বলল—
—“কি ব্যাপার? তুই এত ভালো হয়ে গেলি কবে থেকে, রিয়াদ?”
রিয়াদ ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি এনে ফিসফিস করে জবাব দিল,
—“আজও ওইটা নিয়ে পড়ে আছিস ব্রো? জাস্ট একটা ভুল ছিল।”
তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ছেড়ে দিল রিদওয়ানকে।
রিদওয়ান ভেতরে ভেতরে আগুনে পুড়লেও, সবার সামনে নিজেকে সামলে নিল। মুখে জোর করে হাসি এনে ওদের কাছে গিয়ে বসল। কিন্তু মনে মনে বলল,
“এই রিয়াদকে আমি খুব ভালো করেই চিনি। এত ঢং করার কি আছে! আর বড় মামু কিনা শেষ পর্যন্ত ওদের পরিবারকেই বেছে নিল রুহি আপুর বিয়ের জন্য…”
হঠাৎ করেই আহসান করিম চারপাশে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন,
—“মাহবুব, তোর বড় ছেলেকে দেখছি না। কই সে? এখনো কি বাইরে জব করছে, নাকি অবশেষে ব্যবসায় এসেছে?”
এক মুহূর্তেই ঘরে থমথমে পরিবেশ নেমে এলো। সবার মুখের হাসি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন মাহবুব রাশিদ। চোখে-মুখে অস্বস্তি ফুটে উঠল। একটুখানি সময় নিলেন, তারপর কোনোরকমে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
—“আসলে… কাজেই খুব ব্যস্ত থাকে। তাই বাড়িতে আসতে পারে না।”
কথাটা বললেও ভেতরে ভেতরে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল তার। বড় ছেলের নাম উচ্চারণ করতে না পেরে তিনি দীর্ঘশ্বাস চাপা দিলেন।
রিয়াদ সায়মানের নাম শোনার সাথে সাথে, মুখ কালো হয়ে গেল। কিন্তু মাহবুব রাশিদের উত্তরে ও বুঝতে পারল সায়মান বাড়িতে থাকে না আবার হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটের কোনায়।
পাশে বসা আফিয়া বেগম চুপচাপ শুনছিলেন। মুহূর্তেই তার চোখ ভিজে উঠল। বুকের ভেতরে জমে থাকা কষ্ট হঠাৎ যেন আবার নতুন করে মাথা তুলল। মনে মনে ভাবলেন—
“কতগুলো বছর হয়ে গেল ছেলেটাকে চোখে দেখিনি। হাতে গোনা কয়েকবার ফোনে কথা হয় ঠিকই, কিন্তু সেও যেন বাধ্যতামূলক।নিজে থেকে কথা বাড়াতে চাই, কিন্তু ও একেবারেই চায় না। বাড়ি আসতে বললেই গম্ভীর হয়ে যায়, ফোন কেটে দেয়। বিয়ের কথা তুললেই তো একেবারেই রেগে যায়, যেন কোনো দুঃস্বপ্ন শুনছে।”
চোখের কোণে পানি জমে উঠল আফিয়া বেগমের। হাতের আঙুল দিয়ে আঁচল মুচড়ে ধরলেন।
অজান্তেই এক লম্বা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক থেকে। বিলকিস আরা টের পেলেও কেউ কিছু বলল না। নিস্তব্ধতার মধ্যে চাপা এক কষ্ট যেন সবার উপর ছেয়ে গেল।
মঈন রাশিদ পরিবেশ ঠিক করার জন্য, ইমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“ইমা, রুহিকে নিয়ে আসো।”
বিলকিস আরা হেসে যোগ করলেন,
—“হ্যাঁ বৌমা, যাও। রুহিকে নিয়ে এসো। অতিথিদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করিও না।”
শিরিন করিম মিষ্টি হেসে বললেন,
—“আরে ভাবি, এত তাড়াহুড়ো করে লাভ কী? আমরা তো আপনজনই।”
ইমা বেগম হালকা হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন, তারপর রুহিকে নিয়ে আসতে গেলেন।
এদিকে, রুহিকে সাজানোর কাজ প্রায় শেষ। রিশা, নাফিসা আর জারিন মিলে তাকে পরিপাটি করে গুছিয়ে দিয়েছে। নীল শাড়িতে রুহি যেন অন্য রকম দীপ্তিতে ঝলমল করছে। রিশা শাড়ির আঁচলটা কাঁধে ঠিক করে দিয়ে মুচকি হেসে বলল,
—“আপি, তোমাকে তো একেবারে জোস লাগছে! রায়হান ভাইয়া দেখলে তো ফিদা হয়ে যাবে।
যে মানুষটাকে আমরা মন থেকে ভালবাসি, তাকে পেতে গিয়ে এত ঝর ঝাপটা পোড়াতে হয় কেন? মনে মনে ভেবে রুহির মুখ মলিন হয়ে গেল।
জারিন মজা করে যোগ করল,
—“শুধু ফিদা নয় রে, মাথা থেকে সব ভূত নেমে যাবে। এমন জোস লুক দেখে তখন ‘বাপ বাপ’ করতে করতে চলে আসবে!”
নাফিসা হেসে বলল,
—“তোমরা দু’জন না, একেবারে বাড়িয়ে বলছ। আপি তো সবসময়ই সুন্দর, আজ শুধু একটু বেশি লাগছে।”
ওদের এই হাসি-ঠাট্টার ভেতরে রুহি শুধু একবার হালকা হাসল, তারপর আবার মাথা নিচু করে নিঃশ্বাস ফেলল। বুকের ভেতরে যে কান্নার ঢেউ উঠছে, সেটা সে যেন লুকিয়ে রাখল।
দরজার ফাঁক দিয়ে ইমা বেগম ঢুকলেন। মেয়েকে সাজানো অবস্থায় দেখে তার চোখ হঠাৎ ছলছল করে উঠল। “এই মেয়েটা কয়দিন পরই বা আমার থেকে আলাদা হয়ে যাবে? কেমন হবে তার জীবন?” মায়ের বুকটা হুহু করে উঠল।
তবুও দৃঢ় থাকার চেষ্টা করে ইমা বেগম গলা সামলে বললেন,
—“চল , নিচে সবাই অপেক্ষা করছে।”
রুহি কিছু বলতে পারল না, শুধু মাথা নিচু করে মায়ের হাত ধরে উঠল। রিশা, জারিন সাথে সাথে পেছনে দাঁড়াল। নাফিসা-রাহিলও ওদের সাতে গেল । রাহিল এখন বেশ বড় হয়েছে, এই চার বছরে। বেশিরভাগ সময় নাফিসার সাথে সময় কাটাই ছেলেটা।
ধীরে ধীরে সবাই একসাথে হলঘরের দিকে নামল। রুহি যেন প্রতিটি পদক্ষেপে শূন্যতায় ডুবে যাচ্ছে। তার বুকের ভেতর কান্না জমে উঠলেও মুখে তা ফুটতে দিল না।
ঘরে ঢুকে রুহি মাথা নিচু করে সবাইকে সালাম দিল। মুহূর্তেই পরিবেশে নীরবতা নেমে এলো। সবার চোখ তখন কেবল রুহির দিকে।
আফিয়া বেগম দাঁড়িয়ে উঠে রুহিকে কাছে টেনে নিলেন।
—“আহা, মাশাআল্লাহ! কী সুন্দর লাগছে তোকে।”
শিরিন করিমও এগিয়ে এসে রুহিকে জড়িয়ে ধরলেন, তারপর তার পাশে বসিয়ে দিলেন। স্নেহমাখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
—“মেয়েকে দেখে চোখই সরে না ভাবি।”
তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাসিমুখে বললেন,
—“আচ্ছা রুহি, কী কী করতে ভালো লাগে তোমার? পড়াশোনার বাইরে কিছু শখ আছে তো?”
আহসান করিমও যোগ দিলেন,
— টুকিটাকি দুই একটা কথা বললেন।
ঘরে বসা সবাই তখন নীরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রুহির দিকে। রাহুল নিচু চোখে লাজুকভাবে তাকিয়ে ছিল, মাঝে মাঝে এক ঝলক দেখছে রুহিকে।
আর রিয়াদ, সে যেন ভেতরে ভেতরে হাসি চাপার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে রিদওয়ান পুরো পরিস্থিতি লক্ষ্য করে গভীর চিন্তায় ডুবে আছে।
সবার চোখ যখন রুহি আর রাহুলের দিকে, কথোপকথনে পুরো ঘর ভরে গেছে, তখনই রিদওয়ান নিঃশব্দে উঠে এসে রিশাদের পাশে দাঁড়াল। হালকা ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
—“ঐদিকে দেখ…”
একসাথে রিশা, জারিন আর নাফিসা তাকাল রিদওয়ানের দেখানো দিকে। মুহূর্তেই ওদের মুখের রঙ পাল্টে গেল। নাফিসার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে এলো। অজান্তেই পাশে থাকা জারিনের হাত শক্ত করে চেপে ধরল ও ।
জারিন সাথে সাথেই ওর দিকে তাকিয়ে,বিষয়টা বুঝতে পেরে। আস্তে স্বান্ত্বনার সুরে বলল,
—“নাফু… রিল্যাক্স। আমরা আছি তো, সব দেখছি।”
কিন্তু নাফিসার চোখ-মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, ওর ভেতরে ভেতরে পুরোনো দিনের ভয় আবার নতুন করে জেগে উঠেছে।
রিশা ঠোঁট কামড়ে, কপাল কুঁচকে ফিসফিস করে বলল,
—“এই মালটা আবার এখানে টপ কইরা ঢুকলো কেমনে? কিছুই বুঝলাম না।”
রিদওয়ান মাথা নেড়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
—“বড় মামুর বন্ধুর ছোট ছেলে এটা।”
রিশা বিস্মিত হয়ে বলল,
—“কি বললি! আগে তো দেখিনি এই বেয়াদব টাকে আমাদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ডের কারো মধ্যে।”
জারিন দাঁত চেপে বলল,
—“দেখ, কেমন ইনোসেন্ট মুখ বানাইছে। মনে হচ্ছে মুখের উপর গিয়ে দুইটা ঘুষি বসাই।”
“শেষমেশ রুহি আপির কপালে এই বেয়াদব মার্কা ছেলেটার মতো দেবর জুটবে, কে জানতো!”— রিদওয়ান বলে উঠল।
রিশা হাত নাড়ার ভঙ্গিতে ওদের থামিয়ে বলল,
—“শ্শ্, আগে বিয়েটা হয় কি না, সেইটা দেখ।”
“মানে?”—চোখ বড় করে জিজ্ঞেস করল রিদওয়ান।
জারিন দ্রুত বলল,
—“কিছু না, কিছু না।”
রিদওয়ান ভুরু কুঁচকে ওদের দিকে তাকাল। তার ভেতরে সন্দেহ জমতে লাগল। “প্রশ্ন করলাম এক জনকে, উত্তর দিল আরেকজন। নিশ্চয়ই এরা কিছু গোলমাল পাকাচ্ছে।” মনে মনে ভেবে নিল সে।
মুখ ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
—“তোরা কি খিচুড়ি পাকাচ্ছিস বলতো আমার?”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সামনে এসে দাঁড়াল রিয়াদ। ঠোঁটে ভদ্র হাসি, কণ্ঠে মেকি উষ্ণতা।
—“হাই এভরিওয়ান! কেমন আছিস তোরা? সরি সরি, এখন থেকে তো আমরা বেয়ান বেয়াই। ”
ওদের চোখ-মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। নাফিসা তখনও জারিনের হাত শক্ত করে ধরে আছে।
রিয়াদ এবার সরাসরি নাফিসার দিকে তাকাল। ঠোঁটে হাসি রেখে বলল,
—“কেমন আছো নাফিসা? আরে, ভয় পাচ্ছো নাকি? পুরনো কথা বাদ দাও। এখন তো তুমি আমার বেয়ান হও।”
নাফিসা ঠোঁট শুকিয়ে গেল ।
“এই! তোর এতো কথা বলতে হবে না। দূরে থাকবি আমাদের থেকে।”—রিশা কড়া গলায় বলে উঠল।
রিয়াদের মুখে অদ্ভুত হাসি রেখে বলল,আরে তোরা আমাকে এখনো ভুল বুঝছিস, কোন ছোটবেলায় কি কাহিনী সেটা এখনো কেউ মনে রাখে কেউ ?
ওই আর কি আল্লাহ শয়তান মস্তিষ্কে যদি হেদায়েত দিয়ে থাকে তাইলে তো আলহামদুলিল্লাহ।— কিছুটা ব্যঙ্গ করে রিশা বলল।
এই সময় মাহবুব রাশিদ, সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
—“সায়ফান, রুহি আর রাহুলকে নিয়ে যাও। একটু আলাদা করে কথা বলুক ওরা ।”
সায়ফান সাথে সাথেই দাঁড়িয়ে উঠল। রাহুল আর রুহিও আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল।
দাঁড়িয়ে থাকা রিশাদের দিকে সায়ফান তাকিয়ে বলল,
—“কিরে, তোরা এখানে এভাবে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আব্বু যা বলল শুনিস নি? চল, সবাই উপরে যাই।”
“আরে চশমা আপা যে! কখন এলে? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি আসতে আসতে আমরা বুড়ো হয়ে যাবো। আসলে না, তুমি তো আমাকে মিস করার সুযোগই দাও না—চোখের পলকেই হাজির হয়ে যাও।”—সায়ফান হেসে ব্যঙ্গ ভঙ্গিতে বলল জারিনের দিকে তাকিয়ে।
“শোনো, তোমার মতো কারও জন্য যদি মিস করার সুযোগ রাখতে যেতাম, তবে তো জীবনটাই মিস হয়ে যেতো।”—জারিন চোখ ছোট ছোট করে সায়ফানের দিকে তাকিয়ে বলল।
সায়ফান কপাল কুঁচকে অবাক হওয়ার ভান করে বলল, —“বাহ!চশমা আফার কি মিষ্টি ব্যবহার! সত্যি আপা, তোমার কেয়ারিংনেস দেখে আমি অভিভূত।”
“ওই ভান করা অবাক চেহারাটা অন্য কারও সামনে দেখিও, আমার কাছে কাজ হবে না। —ভাব নিয়ে জারিন বলল।
“বাহ! কী দারুণ আত্মবিশ্বাস! সত্যি, তোমার মতো মানুষ হলে তো পুরো দুনিয়াই হিংসে করবে।”
—“হ্যাঁ, করবে তো বটেই… বিশেষ করে যারা অহেতুক খোঁচা দেওয়ার লাইসেন্স ধরে বেড়ায়।”—জারিন মুচকি হেসে পাল্টা বলল।
“তাহলে আমি বুঝে গেলাম, তুমি আসলে আমার ভক্ত—তাই এতো খোঁচা খোঁচা কথা জমা রেখেছো।” —সায়ফান ভুরু উঁচু করে বলল।
জারিন সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল,
—“তুমি ভুল বুঝেছো। আমি শুধু প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে নিচ্ছি, তোমার মতো মানুষের জন্য, তুমি তো এক প্রকার ভাইরাস অসুখ। ”
সায়ফান ভান করে অবাক হয়ে তাকাল,
—“ওরে বাবা! আমার অসুখের নামও বের করছো এখন? তুমি না হলে ডাক্তারদের রুটি-রুজি বন্ধ হয়ে যেত।”
জারিন মুচকি হেসে কটাক্ষ করল,
—“তোমার মতো রোগী থাকলে ডাক্তাররা পালিয়ে যেত, রুটি-রুজি বাঁচিয়ে রাখতে।”
ওখানে যে কয়জন দাঁড়িয়ে ছিল ওদের ঝগড়া দেখে বিরক্ত সবাই। ওরা এক সাইডে কথা বলছে বলে বড়টা কেউ শুনতে পাইনি।
রিয়াদ হা করে, ওদের ঝগড়া দেখছে। রিদওয়ান বিরক্তি নিয়ে এবার বলল, ভাইয়া তোমরা চুপ করবা এখানে সবাই আছে। চল উপরে চলো।
সায়ফান চোখ ছোট ছোট করে, একবার জারিনের দিকে তাকিয়ে হাঁটা দিল। জারিন ও ভেংচি কেটলো।
অগত্যা সবাই এবার সিঁড়ির দিকে এগোতে শুরু করল। রিয়াদও ওদের সাথে গেল, সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠার সময় মাঝেমাঝে নাফিসার সাথে সাথে গা ঘেঁষতে লাগল।
নাফিসা অস্বস্তি হওয়ার শর্ত ঝামেলা বাড়াতে চাইনা বলে, একবারও তার চোখ তুললো না, আগে আগে চলে গেল।
তা দেখে রিয়াদ শয়তানি হাসি দিলো একটা।
সবাই উপরে উঠল। এক সাইডে রাহুল আর রুহিকে বসিয়ে দেওয়া হলো যেন তারা একটু নিজেদের মতো করে কথা বলতে পারে। বাকিরা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে রইল।
রিয়াদ সায়ফানের সাথে গল্প শুরু করল। বাইরে থেকে কথোপকথনটা স্বাভাবিক মনে হলেও, তার চোখ কিন্তু বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছিল। এক দৃষ্টিতে সে নাফিসার দিকে তাকিয়ে আছে।
সায়ফান হঠাৎ খেয়াল করল, রিয়াদের দৃষ্টি তার কাঁধের ওপর দিয়ে সরাসরি নাফিসার দিকে। সায়ফান ভুরু কুঁচকে একবার নাফিসার দিকে তাকাল, তারপর মুহূর্তেই রিয়াদের আরো কাছে গিয়ে দাঁড়াল ওর ঘাড়ে হাত রাখল। রিয়াদ আঁতকে উঠল।
হালকা কিন্তু দৃঢ় ভঙ্গিতে সায়ফান হেসে বলল,
—“ছোট ভাই, তোমার চোখটা কিন্তু ভুল দিকে ঘুরছে। নিজের চোখকে একটু সংযত করো।”
রিয়াদ হকচকিয়ে গেল।
—“জি… ভাইয়া, কিছু বলছিলেন?”
সায়ফান ঠাণ্ডা গলায় উত্তর দিল,
—“ওই আর কি! শুধু বললাম তোমার চোখদুটো ঠিকঠাক জায়গায় রাখো।”
রিয়াদ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। মুহূর্তেই তার ঠোঁট শুকিয়ে গেল, তবে নিজেকে সামলে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আবার সায়ফানের সাথে সাধারণ কথোপকথন চালিয়ে যেতে লাগল।
রিদওয়ান দূর থেকে সবকিছু লক্ষ্য করছিল। সায়ফানের দৃঢ় ভঙ্গি আর রিয়াদের অসহায় মুখ দেখে সে হেসে ফেলল। “
এই সময় রিশা, জারিন আর নাফিসা নিজেদের প্ল্যান অনুযায়ী কাজে নেমে গেল। নাফিসা আর জারিন চারপাশে খেয়াল রাখোল—কেউ যেন টের না পায় তারা কী করছে। আর রিশা সুযোগ বুঝে দ্রুত মোবাইল বের করে কয়েকটা সুন্দর ছবি তুলে নিল রাহুল আর রুহির। ছবিগুলোতে রুহির মাথা নিচু, লাজুক ভঙ্গি, আর রাহুলের শান্ত চাহনি—দেখতেই যেন স্বপ্নময় লাগছে
হাসিমুখে রিশা ছবিগুলো সিলেক্ট করে রাহুলের হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিল। তারপর চোখ টিপে জারিন আর নাফিসাকে ইশারা করল—
—“কাজ শেষ।”
ওরা তিনজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে নিল। চারপাশের সবার কাছে বিষয়টা একেবারেই স্বাভাবিক মনে হলো।
এদিকে, রাহুল আর রুহির মধ্যে টুকিটাকি কথা শেষ হলো। রুহির চোখে এখনো অস্বস্তি আর ভেতরে জমে থাকা দুঃখের ছাপ স্পষ্ট।
সবাই নিচে নামল। একে একে সবাই একত্রিত হলো। তারপর বড়রা বসে সিদ্ধান্ত নিল—
রাহুল আর রুহির বিয়ে নিয়ে কোনো দেরি করা হবে না। প্রথমে ছোট করে আংটি পরানোর অনুষ্ঠান (রিং সেরিমনি) হবে আগামী সপ্তাহেই। আনুষ্ঠানিকতা সাদামাটা রাখা হবে, ঝামেলা না বাড়িয়ে। তবে আসল বিয়েটা হবে জমকালো আয়োজন করে, পুরো পরিবার আর আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতিত।
শিরিন করিম হেসে বললেন।
—“ইনশাআল্লাহ ভাবি, খুব সুন্দর জুটি হবে।
রিয়াদের পরিবার বিদায় নিতে লাগলো সবার কাছ থেকে। একে অপরের সাথে কথা বলাই ব্যস্ত সবাই।
রিয়াদ যেন সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। যাওয়ার আগে হঠাৎ করে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। ঠোঁটে ভদ্রতার আড়ালে মেকি হাসি টেনে নিয়ে,
তারপর একে একে সবার সাথে ভদ্রভাবে কথা বলতে লাগল। রিশা আর জারিন বিরক্ত মুখে কোনোমতে সৌজন্য দেখাল। নাফিসার দিকে এগিয়ে আসতেই, চোখে কেমন এক অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে বলল,
—” এত ভয় ভয় চেহারা কেন করছো? পুরনো দিনের সব ভুল বোঝাবুঝি বাদ দও কেমন?
কথার সুরটা যতই ভদ্র শোনাক না কেন, তার চোখের চাহনি আর ঠোঁটের বাঁকা হাসি বুঝিয়ে দিল, কথাগুলোর ভেতরে লুকিয়ে আছে অন্য মানে। তা নাফিসা ভালোভাবেই টের পাচ্ছে। গলা শুকিয়ে গেলেও কোনো উত্তর দিল না, শুধু মুখ ঘুরিয়ে নিল।
রিশা ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল,
— “এই বাল তোকে এত ভদ্র সাজা লাগবেনা, তুমি যে কি বালের ছিরা বাল আমরা ভালো করেই জানি। এত ভদ্রতা অন্য জায়গায় গিয়ে দেখাবি। ”
রিয়াদ হেসে ফেলল, তারপর ভদ্রতার মুখোশ ধরে বিদায় নিয়ে বাকিদের সাথে বেরিয়ে গেল।
ওরা চলে যেতেই রুহি আর দম আটকে রাখতে পারল না। সারাটা সময় বুকের ভেতর চাপা অস্বস্তি যেন হঠাৎ বিস্ফোরণ হয়ে উঠল। কোনো কথা না বলে তাড়াহুড়ো করে নিজের রুমে চলে গেল। দরজা বন্ধ করে ঘরের ভেতর বসে পড়তেই মনে হলো—শ্বাসরুদ্ধকর এই পরিবেশ থেকে সে সামান্য হলেও মুক্তি পেল।
বাড়ির বড়রা তখনও ড্রয়িংরুমে টুকটাক নিজেদের মধ্যে আলাপ চালাচ্ছেন। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে আলোচনা, রাহুলের পরিবারের সাথে আরও কিছু কথা ঠিক করা—সবকিছু মিলিয়ে তাদের কথোপকথন বেশ গম্ভীর।
জারিন বিদায় নিয়ে নিজের বাড়ির দিকে রওনা হলো। এরপর ধীরে ধীরে সবাই যে যার রুমে চলে গেল।
নাফিসাও ক্লান্ত শরীর নিয়ে রুমে ঢুকল। ফ্রেশ হয়ে নামাজের জন্য দাঁড়াল। এতক্ষণে বেশ রাত হয়ে গেছে, এই সব এর ভিতর তার নামাজ পড়তে দেরি হয়ে গেছে, তবুও কোনো রকমে নিজের নামাজটা আদায় করল।
নামাজ শেষে মাদুর গুটিয়ে রেখে বই, খাতা আর কলম হাতে নিল। কয়েকদিন পরই এইচএসসি পরীক্ষা—পড়াশোনার চাপ এখন অনেক। আকাশ ভাইয়ার কাছে টিউশন পড়লেও মাঝে মাঝে কিছু জায়গায় জটলা বাঁধে। তখন সে আফিয়া বেগমের কাছেই বসে পড়ে। আফিয়া বেগমের পড়ানোর হাত সবসময়ই স্পষ্ট ও সুন্দর, তাই নাফিসা নির্দ্বিধায় ওর কাছে সাহায্য চাইতে পারে। আর আফিয়া বেগম নিজেই মাঝে মাঝে ওকে পড়াই। নাফিসাকে ডাক্তার ডক্টর বানাবে বলে ঠিক করেছে। নাফিসা ও মামনি ইচ্ছে পূরণ করতে পড়াশোনায় মন দিয়েছে অনেক আগের থেকেও।
সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে সে হাঁটতে হাঁটতে আফিয়া বেগমের রুমের দিকে এগোল। দরজার কাছাকাছি আসতেই ভেতর থেকে ভেসে এলো এক অচেনা কণ্ঠস্বরের সাথে মিশে থাকা মায়ের কণ্ঠ।
আফিয়া বেগম ভেজা গলায় কথা বলছেন —
—“তেহু, আর কতদিন বাইরে বাইরে থাকবি? এবারের তো তোর বোনের বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। তুই কি এসে একবারও আমাদের দেখবি না? আমার কি মন চায় না তোকে একবার বুক ভরে দেখতে? কবে যে আসবি… এই ভাবনায় বুকটাই হুহু করে ওঠে।”
অপর পাশ থেকে কী জবাব এলো, সেটা নাফিসার কানে পৌঁছালো না। কিন্তু মায়ের কথার ভঙ্গি শুনেই তার বুক কেঁপে উঠল। কোনো সন্দেহ রইল না—আফিয়া বেগম কথা বলছেন সায়মানের সাথে!
সায়মানের নাম শুনতেই নাফিসার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। নিশ্বাস যেন গলা আটকে গেল। মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল, তারপর বই-খাতা বুকে শক্ত করে চেপে ধরল। আর কোনো শব্দ না শুনেই দৌড়ে চলে গেল নিজের রুমে।
ঘরে ঢুকেই দরজা ভেজিয়ে দিল নাফিসা। ভেতরে প্রবল নীরবতা, যেন পৃথিবীর সমস্ত শব্দ থেমে গেছে এই ছোট্ট চার দেয়ালের ভেতর। ধীরে ধীরে পা টেনে এসে বিছানার পাশে বসলো সে। মাথাটা বিছানার প্রান্তে ঠেকিয়ে হঠাৎ করেই কান্নায় ভেঙে পড়ল। বুকের ভেতরের সমস্ত জমাট বাঁধা কষ্ট, অভিমান, শূন্যতা মিলেমিশে গলায় কাঁটার মতো আটকে ছিল এতক্ষণ—এবার আর তা আটকে রাখা গেল না। ভেতরের বাঁধভাঙা কান্না হুহু করে বেরিয়ে এলো। শব্দ করে হাহাকার তুলে কাঁদতে লাগল।
চোখের পানির সাথে যেন জমে থাকা কষ্টগুলোও বেরিয়ে আসছিল। প্রথমে সায়মানের প্রতি তার অনুভূতিগুলো ঠিক বুঝতে পারেনি ও। কিশোরী মন কি আর সবকিছু বুঝতে পারে? সম্পর্কটা কেবল অদ্ভুত এক টান মনে হতো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সে উপলব্ধি করল—এই মানুষটার জন্যই তার বুকের ভেতরে অস্থিরতা, প্রতিদিনের অপেক্ষা আর প্রতিটি নিঃশ্বাসে তৃষ্ণা জেগে ওঠে। আজ সে নিশ্চিত—সায়মানকে সে ভালোবেসে ফেলেছে। এই উপলব্ধি তার বুকের ভেতরকে আরও ভারী করে তুলল। চোখ বুজলেই মনে পড়তে লাগল চার বছর আগের সেই রাতের কথা।
সেই রাতে, সায়মান ছাদ থেকে হঠাৎ করেই চলে যাওয়ার পর। চারিদিকে অঝোর বর্ষণ শুরু হয় আরো । ভিজতে ভিজতে ছাদের এক কোণে বসে বলল ও । ঠান্ডা বৃষ্টির ফোঁটা তার শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে, কাঁপছে ঠান্ডায়, তবুও বুকের হাহাকার থামছে না। কাঁদতে কাঁদতে একসময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলল । রাতভর ঝড়ো বৃষ্টি আর ভেজা অন্ধকারের সাথে কেটেছে সারা রাত।
সকালবেলা যখন অচেতনতা কেটে ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরল, তখনও নিজেকে ছাদের ভিজে মেঝেতে শুয়ে থাকতে দেখে। মাথা ভারী, শরীর অসাড়। কষ্ট করে উঠে বসল, মাথায় হাত বুলিয়ে চোখের পাতা মেলতেই আগের রাতের স্মৃতি ঝড়ের মতো এসে আছড়ে পড়ল।মুহূর্তেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সায়মানের কণ্ঠ, কাছে আসা, শরীলের ভিতর শিরশির করে উঠলো, মনে হচ্ছে এখনো লেগে আছে স্পর্শগুলো। তারপর নিজের হাত রাখল সায়মানের দেওয়া লাভ বাইট এর উপর। শরীরের ভিতর শিউরিত তো জেগে উঠলো। তারপর সায়ানের —সবকিছু একসাথে ভেসে উঠল মনে।
আর সাথেই মনে পড়ল তার হাতের রক্তের দাগ চোখের সামনে ভেসে উঠতেই গা শিউরে উঠল।অসুস্থ, ভারী শরীরটা কোনোমতে টেনে ছাদ থেকে নামতে লাগল। সিঁড়ি ধরে নিচে নামতে নামতে শরীরটা যেন আরও কাহিল হয়ে বুকের ভেতরটা হঠাৎ ছিঁড়ে যাওয়ার মতো ব্যথা করল। অজানা আতঙ্ক আর অস্থিরতা নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে নামতে লাগল।
নিচে নেমে চারদিকে তাকালো। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ। সকালের আলো ফুটেছে, কিন্তু এখনো কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি। একমাত্র পাশের মসজিদ থেকে ভেসে আসছিল আযানের সুমধুর ধ্বনি। সেই ধ্বনির ভেতরেও যেন নাফিসার বুকের শূন্যতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো আরো। অস্থির পায়ে হেঁটে সায়মানের ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। কিন্তু রুমটা ফাঁকা। বিছানা খালি, আলমারি বন্ধ। কোথাও সায়মান নেই। তখনই তার মনে হলো—সায়মান চলে গেছে।
দেয়ালে হাত রেখে কোনোমতে নিজের রুমের দিকে ফিরল । বৃষ্টিতে ভেজা কাপড় শরীরে লেপ্টে আছে। সারারাত ভিজে থাকার পর শুকিয়ে কেমন অদ্ভুত একটা গন্ধ বেরোচ্ছে ভিজে জামা থেকে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। শূন্য চোখে বিছানার দিকে তাকিয়ে রুহি আর রাহিল এখনো বিভোর হয়ে ঘুমাচ্ছে, কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই নিজেকে বিছানায় ফেলে দিল। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে , আর শরীর জ্বরে কাঁপছে।
পরে যখন চোখ মেলল, তখন সে নিজেকে হাসপাতালের সাদা দেয়ালের ভেতর দেখতে পেল। মাথার পাশে স্যালাইন ঝুলছে। মনে পড়ল, সেদিন জ্বর এসে শরীরকে কাহিল বানিয়ে ফেলেছিল। মাঝেমধ্যেই সায়মানকে খোঁজার চেষ্টা করেছে, চারপাশে জিজ্ঞেস করেছে ছলে বলে , রিশাকে বলেছে। কিন্তু রিশার ঠাণ্ডা উত্তর—“সায়মান ঢাকায় চলে গেছে জরুরি কাজে”—তার বুকের ভেতরে আরও অস্থিরতা ছড়িয়ে দিয়েছিল।
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২১
এরপর বহুবার কথায় কথায় আফিয়া বেগমকে জিজ্ঞেস করেছে। কিন্তু প্রতিবারই ভদ্রমহিলার চোখ ভিজে উঠেছে ছেলের জন্য। মামনির কান্না দেখতে দেখতে নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত অপরাধবোধ জন্ম নিত ওর ভিতর । মনে হতো—হয়তো তার জন্যই সায়মান দূরে চলে গেছে, হয়তো তার কারণেই সে আর বাড়িতে ফিরতে চায় না। এই ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খেতে খেতে কতবার যে অশ্রু ঝরেছে, সে নিজেও জানে না।
আজও সেই স্মৃতিগুলোই বুকের ভেতর হাহাকার তুলছে। বিছানায় মাথা গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লো ও, নিজেও টের পায়নি। বাইরে হাওয়ার শব্দ, জানালার কাঁচে ঠেকা পাতার খসখসানি, —সব মিলিয়ে যেনো এক নিস্তব্ধ রাত আবার তাকে চার বছর আগের অশ্রুসিক্ত সেই সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে গেল।
