চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৯
আরোবা চৌধুরী আরু
সায়মান নাফিসার কথাগুলো শোনার সাথে সাথে হাত থামিয়ে দিল। কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকল ওর দিকে, তারপর নরমভাবে নাফিসার কপালে নিজের ঠোঁট দাবিয়ে একটা চুমু আঁকলো । দু’হাত দিয়ে ব্ল্যাঙ্কেটটা গলা অবধি টেনে দিয়ে শান্ত স্বরে
বলল————
——— “Sleep… (ঘুমিয়ে পড়ো)।”
কথাটা বলেই সায়মান উঠে যেতে চাইলো।
কিন্তু নাফিসা তাড়াতাড়ি ওর হাত ধরে ফেলল। হঠাৎ টান পড়ায় সায়মান ঘুরে তাকাল নাফিসার দিকে।
————“আমার কথার উত্তর দিলেন না, ডিএসপি সাহেব… আপনি এমন কেন? সবসময় নিজেকে রহস্যের আড়ালে রাখেন। আমি আপনাকে বুঝে উঠতে পারি না।”
সায়মান ভ্রু কুঁচকে নাফিসার দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
————“Idiot! বাজে বকো না, ঘুমাও।”
অসহায় চোখে নাফিসা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ উঠে বসে বলল————
————“না, আমি ঘুমাব না। আজই আপনি আমার কথার উত্তর দেবেন।”
চোখ সরু করে তাকাল সায়মান। কণ্ঠস্বর এবার কিছুটা
গম্ভীর———
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
————“বেশি কথা আমার পছন্দ নয়। চুপচাপ শুয়ে পড়ো। আর একটা শব্দও করবে না।”
নাফিসা থেমে গেল না। বুক ভরে নিশ্বাস নিয়ে বলে উঠল———
———“আপনি যদি আমাকে না মানেন, তাহলে স্পর্শ করেন কেন? তার মানে কী?”
মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হলো সায়মান। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
————“আমি তোমাকে বলতে বাধ্য নই।”
নাফিসার ঠোঁট কেঁপে উঠল।
————“সত্যিই বলতে বাধ্য নন? তাহলে আর কখনও আমায় স্পর্শ করবেন না… যতক্ষণ না নিজের মুখে স্বীকার করছেন।”
————“Shut up, idiot!”———— গর্জে উঠল সায়মান।
তারপর আবার একটু থেমে নরম স্বরে যোগ করল,
————“আর কিছু বলবে না। ঘুমাও।”
সায়মানের ধমকে চমকে উঠল নাফিসা। চোখের কোণে টলমল পানি জমে উঠল। এক ফোঁটা… দুই ফোঁটা… গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।
সায়মান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নাফিসার দুই বাহু ধরে ওকে আবার শুইয়ে দিল। ব্ল্যাঙ্কেট টেনে ঢেকে দিল।
নাফিসার ছলছল চোখে সে কেবল তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ সায়মান ঝুঁকে এসে ঠোঁট চেপে ধরল নাফিসার চোখে। টপটপ করে ঝরে পড়া পানিকে নিজের ঠোঁটে শুষে নিল।
নাফিসা চোখ বুজে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল, গা ভরে টেনে নিচ্ছে সায়মানের শরীরের ঘ্রাণ।
অনেকক্ষণ সময় নিয়ে নাফিসা’র প্রতিটি অশ্রুবিন্দু চুষে নিল নিজের ঠোঁটের সাহায্যে সায়মান।
তারপর ওর দৃষ্টি নামল নাফিসার ঠোঁটের দিকে। এক ঢোক গিলে এগিয়ে এল, ধীরে নাফিসার ঠোঁটে রাখল শুকনো অথচ দৃঢ় এক চুমু। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে ঠোঁট দাবিয়ে রাখল।
নাফিসা নিঃশ্বাস গুনতে লাগল, প্রতিটি মুহূর্তে সায়মানের স্পর্শ অনুভব করছিল।
পরক্ষণেই সায়মান সরে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে কেবল বলল————
“Sleep… (ঘুমিয়ে পড়ো)।”
এই বলে ধীর কদমে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সায়মান, নাফিসা ওর চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
———— “এই মানুষটার মধ্যে এত রহস্য কেন? আমি কখনোই বুঝে উঠতে পারি না…”
ভাবতে ভাবতেই চোখ ভারী হয়ে এলো। অবশেষে ঘুমের দেশে হারিয়ে গেল নাফিসা।
রুহি বিছানার এক কোণে বসে ছিল ফোন হাতে। পর্দায় বারবার একই নাম ভেসে উঠছে———— রায়হান। অনবরত কল করছে, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। আজ আট দিন হতে চলল, তবুও রায়হানের সাথে যোগাযোগ নেই। বুকের ভেতর ভয় আর অভিমানের ঝড় বইছে।
দিনভর অনেক কিছু ঘটেছে, ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়লেও একটা জায়গায় এসে রুহির মন যেন শান্তি পাচ্ছে———— বিয়েটা ভেঙে গেছে। সেই বন্ধনটা না হলে আজ হয়তো সবকিছু আরও জটিল হয়ে যেত।
হঠাৎ দরজায় ঠকঠক আওয়াজ হলো। চমকে উঠল রুহি। ধীর পায়ে উঠে দরজা খুলতেই সামনে সায়মান দাঁড়িয়ে আছে দেখে অবাক হয়ে গেল।
————“দাভাই! তুমি… তুমি এখানে?” বিস্মিত গলায় বলে উঠল রুহি।
গম্ভীর স্বরে শুধু একটি শব্দ উচ্চারণ করল সায়মান————“হুম।”
রুহি সরে গিয়ে পথ করে দিল, —————“ভিতরে আসো দাভাই।”
সায়মান ভেতরে ঢুকে এসে সরাসরি বিছানার ওপর বসে পড়ল। চোখের ইশারায় রুহিকে পাশে বসতে বলল। অকারণ এক অজানা ভয় জেগে উঠল রুহির ভেতরে। হঠাৎ কেন দাভাই তার রুমে এসেছে? কী বলবে ওকে?
তবুও ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সায়মানের পাশে বসলো রুহি।
সায়মান হাত বাড়িয়ে রুহির মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। গম্ভীর অথচ কোমল কণ্ঠে বলল————
————“সরি।”
রুহি থমকে তাকাল।
—————“সরি? তুমি সরি বলছ কেন দাভাই?”
সংক্ষিপ্ত উত্তর এলো,
—————“আজকের জন্য।”
রুহি মাথা নাড়ল।
—————“বাদ দাও এসব। তুমি যা করেছ, একদম ঠিক করেছ। আমি খুশি হয়েছি… এই বিয়েটা ভেঙে গেছে, ভালোই হয়েছে।”
গলায় কাঁপন নিয়ে একটু থেমে আবার বলল রুহি————
———— “দাভাই, একটা কথা বলব?”
সায়মানের গভীর চোখ স্থির হলো ওর ওপর।
————“কি কথা?”
হঠাৎ মাথা নিচু করে রুহি বলল———
————“আমি একজনকে ভালোবাসি।”
সায়মানের ভ্রু কুঁচকে গেল। গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করল————
————“তাহলে এই বিয়ের মানে কি ছিল? বিয়েতে হ্যাঁ বলেছিলি কেন?”
রুহির চোখ ভিজে উঠল। টপটপ করে গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল।
————“আমি রাজি ছিলাম না দাভাই… কিন্তু বড় আব্বুর সামনে কিছু বলতে পারিনি।”
সায়মান আবার প্রশ্ন ছুঁড়ল, এবার কঠিন সুরে———
————“ছেলেটা কে?”
রুহি চুপ করে মাথা নিচু করে রইল। কোনো শব্দ বের হলো না।
সায়মান কণ্ঠ আরও গভীর করল—————
————“ছেলেটা কে জিজ্ঞেস করেছি আমি। নামটা বল।”
কাঁপতে কাঁপতে অবশেষে উত্তর দিল রুহি———
————“রায়হান ভাই…”
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর সায়মানের ঠান্ডা অথচ দৃঢ় কণ্ঠ শোনা গেল————
————“যখন তোরা একে অপরকে ভালোবাসিস, তখন সবার সামনে তোদেরকেই সেটা প্রকাশ করতে হবে।”
রুহি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
————“রায়হান ভাই আমার সাথে কথা বলছে না অনেকদিন… আমি বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি…”
সায়মান এবার বোনকে শক্ত করে জড়িয়ে নিল। হাত দিয়ে কাঁধ আগলে নিয়ে ফিসফিস করে বলল————
————“ডোন’’t ক্রাই। আমি আছি।”
রুহি বুক ভরে হাহাকার তুলল, মাথা নামিয়ে সায়মানের বুকে লেগে রইল।
—————“দাভাই… আমি রায়হান ভাইকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করতে পারব না।”
সায়মান এবার শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল———
————“বিয়ের জন্য তৈরি হও। আমি সব দেখছি। কাল তোদের বিয়ে।”
রুহি বিস্মিত চোখে তাকাল।
————“কিন্তু… রায়হান ভাই তো ফোনই ধরছে না…”
সায়মান মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, চোখে ভরসা ঝরে পড়ছে।
—————“আমি বলেছি তো, আমার ওপর ছেড়ে দে। কাল তোদের বিয়ে হবে।”
এ কথাগুলো বলে সায়মান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে হাঁটতে লাগল। বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও থেমে রুহির দিকে শেষবার তাকাল, তারপর নিঃশব্দে রুম ছেড়ে চলে গেল।
রুহি একা হয়ে গেল। বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল, তারপর নিজের শরীরটা ছেড়ে দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল। দুই হাত জোড় করে বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট বেরিয়ে আসছে স্রোতের মতো।
ও বুঝতে পারছে না কেন চোখে এত জল জমছে————
প্রিয় মানুষটাকে অবশেষে পাবে সেই আশার জন্য, নাকি দীর্ঘদিনের অভিমান আর যন্ত্রণার জন্য?
শুধু জানে, আজ কান্না থামছেই না…
নিজের ঘরে ফিরে এসে সায়মান ফোনটা হাতে তুলে নিল। গম্ভীর চোখে কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর রাইহানের নাম্বার ডায়াল করল।
অন্যদিকে, রাইহান তখন বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ অন্ধকার, চারপাশ নিস্তব্ধ, কিন্তু ওর বুকের ভেতর ঝড় বইছে। আঙুলে ধরা জ্বলন্ত সিগারেট থেকে নিকোটিনের ধোঁয়া ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে বাতাসে। রুহির বিয়ের কথা শোনার পর থেকেই সিগারেট তার সঙ্গী হয়ে গেছে। এর সাথে যোগ হয়েছে মদের নেশা———প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
রুহিকে ভালোবেসেছে প্রাণের চেয়েও বেশি, কিন্তু সেই ভালোবাসা প্রকাশ করার সাহস দেখাতে পারেনি কখনো। বড় মামা———যিনি বাবার মতো স্নেহ দিয়ে ওকে বড় করেছে, যার চোখে নিজের জন্য অগাধ সম্মান, সেই মানুষটার সম্মান নষ্ট হোক———এটা কোনোভাবেই চায়নি রাইহান। তাই রুহির থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। প্রতিদিন নিজেকে কাপুরুষ মনে হয়, কারণ যে নিজের ভালোবাসাকে অন্য কারও হতে দেখার যন্ত্রণা সহ্য করে যাচ্ছে, সে আসলেই কাপুরুষ।
রুহিকে আগেই ব্লক করে রেখেছিল, যাতে তার খোঁজ না পায়। কিন্তু আজ হঠাৎ ফোন অন করতেই অসংখ্য মিসড কল, মেসেজের নোটিফিকেশন এসে ভেসে উঠল স্ক্রিনে। প্রতিটি মেসেজে রুহির আর্তনাদ, প্রতিটি কলে বুক ভেঙে যাওয়া ব্যথা। ছবিগুলো দেখে বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠল———অন্য ছেলের পাশে তার প্রিয় রুহি বসে আছে!
রাইহানের হাত কাঁপতে লাগল, চোখ ভিজে উঠল। সে যেন আর সহ্য করতে পারছে না। তাই আরও এক টান দিল সিগারেটে, ধোঁয়া উড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। এমন সময় হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল। চমকে উঠল রাইহান।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল———“দাভাই”।
কপালে ভাঁজ পড়ল। সায়মান সচরাচর কাউকে ফোন করে না, বিশেষ করে তাকে তো করে না কারণ ছাড়া । হঠাৎ আজ কেন? বুকের ভেতর ধকধক শুরু হলো। মাথায় অদ্ভুত চিন্তা ঘুরতে লাগল———“কিছু কি হয়েছে? ওবাড়িতে কি কোনো বিপদ ঘটেছে? ভাইয়া কি এখন ওবাড়ি এসেছে?”
দ্রুত ফোনটা রিসিভ করল।
———— “আসসালামু আলাইকুম দাভাই। কেমন আছো?”
ওপাশ থেকে ঠাণ্ডা অথচ কড়া গলায় ভেসে এল উত্তর।
———— “ওয়ালাইকুম আসসালাম। কোথায় তুই এখন?”
রাইহান কেঁপে উঠল প্রশ্ন শুনে।
———— “কেন ভাইয়া? কিছু কি হয়েছে?”
সায়মানের কণ্ঠস্বর এবার আরও দৃঢ় হলো।
———— “তুই যেখানেই আছিস, কাল সকালে তোকে এ বাড়িতে দেখতে চাই। আমি ঘুম থেকে ওঠার পর যদি তোকে না দেখি, তাহলে যেখানে আছিস সেখান থেকে টেনে তুলে আনব।”
কথাগুলো বজ্রপাতের মতো কানে বাজল। রাইহানের বুক কেঁপে উঠল। গলা শুকিয়ে এলো।
——— “দাভাই… এত রেগে আছো কেন? কী হয়েছে?”
সায়মান কোনো ব্যাখ্যা দিল না, বরং আবার হুঁশিয়ারি দিল।
——— “তোকে যা বলেছি, তাই করবি। এর বেশি একটা শব্দও শুনব না।”
রাইহানের বুক হাহাকার তুলল। চোখের কোণে জমে উঠল পানি। ধরা গলায় বলল,
——— “আমি ওই বাড়িতে আসতে পারব না দাভাই…”
সায়মান এবার কণ্ঠে তীব্র রাগ মেশাল।
——— “কেন? যাকে ভালোবাসিস, তার কথা যখন সবার সামনে বলার সাহস নেই, তার অনুভূতির কোনো মূল্য নেই———তাহলে তোকে সামনে থেকে ওর বিয়ে দেখতে কি সমস্যা ! তোকে সামনে থেকে ওর বিয়ে দেখতে হবে বুঝছিস?”
রাইহান স্থবির হয়ে গেল। মনে হলো বুকের ভেতর ঢেউ আছড়ে পড়ছে। দাভাই সব জেনে গেছে! রুহি নিশ্চয়ই বলে দিয়েছে…
গলাটা কেঁপে উঠল,কাঁপা কাঁপা গলায় বলল রাইহান———
———“আমি পারব না দাভাই… আমি পারব না…”
ওপাশ থেকে এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর সায়মানের দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল, গম্ভীর অথচ অনড় কণ্ঠস্বর কানে এলো।
———— “লাস্ট বার বলছি, কাল সকালে তোকে আমি এখানে দেখতে চাই।”
এ কথার সাথে সাথেই কল কেটে দিল সায়মান।
———— “হ্যালো? হ্যালো দাভাই?” রাইহান মরিয়া হয়ে ডাকল। কিন্তু ওপাশ থেকে আর কোনো উত্তর এলো না।
হাত ফোনটা মুঠো করে,, দপ করে মেঝেতে বসে পড়ল । আকাশের দিকে তাকাল, বুক ফেটে কান্না এলেও চোখে জল এলো না———যন্ত্রণা এতটাই গভীর যে অশ্রুও শুকিয়ে গেছে।
দু’হাত তুলে প্রার্থনা করল—
————“হে আল্লাহ… আমি আর পারছি না। আমাকে ধৈর্য ধরার ক্ষমতা দাও।”
ভোরের আকাশে মৃদু আলো ছড়িয়ে পড়েছে। চারপাশে পাখির কিচিরমিচির, দূরে কোথাও মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসছে আজানের সুমধুর ধ্বনি। সেই ধ্বনি নাফিসার কানে পৌঁছাতেই চোখ খুলে গেল। চারপাশে একবার তাকিয়ে দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠল।
রুমের জানালা খুলতেই ঠাণ্ডা সকালের হাওয়া ভেতরে ঢুকে এলো। নাফিসার বুক ভরে উঠল শান্তি আর প্রশান্তিতে। হাওয়ায় যেন নতুন দিনের বার্তা লুকিয়ে আছে।
তাড়াহুড়ো করে ওয়াশরুমে গিয়ে অজু সেরে এল, তারপর নামাজে দাঁড়াল। প্রতিটি রাকাতে মন ভরে দোয়া করল, সিজদায় কেঁদে ফেলল। নিজের মনের সব চাওয়া-পাওয়া, সব ভয়-অভিমান, সব স্বপ্ন আল্লাহর কাছে সঁপে দিল।
মোনাজাত শেষে ধীরে ধীরে হাত মুখে বুলিয়ে নিল। তার কাছে এই মুহূর্তটা একেবারেই বিশেষ———যেন মনের ডায়েরি আল্লাহর কাছে খোলা হলো। ভরসা আছে, তিনি শুনবেন, এবং একদিন তার ফিডব্যাকে সব দিয়ে দেবেন।
নামাজ শেষ করে কিছুক্ষণ তসবিহ পড়ল, কোরআনের আয়াত পাঠ করল। মনটা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল। তারপর পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে বসল। আলমারির ওপর রাখা নিজের ডায়েরিটা বের করে নিল।
ডায়েরির পাতায় কলম ছোঁয়ানো মাত্রই যেন মনের সব কথারা উথলে উঠল। নাফিসা লেখা শুরু করল———নিজের ভেতরের দোটানা, ভালোবাসা, ভয়, কৃতজ্ঞতা…….
প্রিয়…
(নাম তো বলি না, কারণ জানোই তো———তোমার নাম একা ডাকলেই বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত আলোড়ন ওঠে। নামহীনই ভালো!)
“চিঠি” শব্দটা খুব অদ্ভুত না?
কাগজে লেখা কিছু অক্ষর, অথচ কখনও কখনও একটা গোটা জীবন আটকে থাকে তার ভিতর।
আমার জীবনেও একটা চিঠি এসেছিল।
জানো, আমার চৌদ্দ বছর বয়সে একটা চিঠি এসেছিল।
কোন ডাকপিয়ন দিয়ে নয়————আসলে সেটা ছিলো এক অদৃশ্য ডাক পিয়ন , যাকে পাঠিয়েছিল আসমানের একাকীত্ব।
হ্যাঁ, চৌদ্দের চিঠি।
তুমি এসেছিলে আমার জীবনে এক চিঠির মতো———— ধীরে ধীরে খুলে পড়ার মতো, শব্দে শব্দে রহস্যময়, লাইন-লাইন জুড়ে কাঁপন জাগানো।
আমি বুঝিনি তখন,
এই আগমনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমার পৃথিবী বদলে দেওয়ার বার্তা।
তুমি ছিলে একটুকরো সূর্যালোক————
আমার মেঘঢাকা জীবনের কোনো এক কোণায় আলোর মতো নেমে এসেছিলে।
তোমাকে দেখে প্রথম যে অনুভবটা হয়েছিল সেটা কোনো প্রেমিক কবি লিখে বোঝাতে পারবে না।
তুমি তখন ছিলে শুধু “চিঠি”———— আদ্যোপান্ত অপরিচিত, অথচ অন্তরের কোথাও যেন চেনা চেনা।
আজ যখন মনে করি,
চৌদ্দ বছর বয়সের আমি কোনো প্রাপ্তির অপেক্ষায় ছিলাম না।
তবুও তুমি এলে।
কোনো কারণ ছাড়াই, কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই।
তবুও আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে উঠলে।
ঠিক যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো কোনো বিশেষ চিঠি,
যার উত্তর আমৃত্যু দিয়ে যেতেও দ্বিধা করবো না।
তুমি আসার পর আমি শুধু মানুষ হইনি, আমি পূর্ণ হয়েছি।
ভুলগুলো শিখেছি, অপেক্ষাগুলো বুঝেছি,
ভালবাসা কাকে বলে————সেটা অনুভব করেছি।
তুমি এখনো জানো না,
তোমার চোখে চোখ পড়লে আমার ভেতরের সব শব্দ কাঁপতে থাকে।
তোমার চুপ থাকা যেন কোনো চতুর্দশ পাতার অদেখা অংশ,
যেটা না পড়লে চিঠিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তুমি জানো না,
তোমাকে দেখলেই কেন মনে হয়,
আমার সব প্রার্থনার উত্তর বুঝি তোমার বুকের ভেতর কোথাও গোপনে লেখা আছে।
তোমাকে আমি ভালোবাসি নি———
তোমাকে আমি বিশ্বাস করেছি,
তোমাকে আমি জপেছি,
তোমাকে আমি আল্লাহর দেওয়া এক বিশেষ চিঠি মনে করেছি——
যেটা কাঁদায়ও, হাসায়ও,
কিন্তু ফেলে রাখা যায় না।
তুমি চৌদ্দের চিঠি।
আমার জীবনের একমাত্র মঞ্জুর চিঠি।
ভালো থেকো—
যতদিন তুমি আমার চিঠির মতো পড়তে পারো নিজেকে,
ততদিন আমার সমস্ত গল্পে তোমার নাম লুকিয়ে থাকবে।
—তোমার “পিচ্চি নাফিসা”
লেখা শেষ করে নাফিসা কলমটা ডায়েরির ওপর রাখল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুক হালকা করার চেষ্টা করল। তারপর নিজের পড়ার বই বের করে নিল। পড়ার টেবিলে বসে মনোযোগ দিল অধ্যায়ে। কিছুক্ষণ পর পড়া শেষ হলে স্বাভাবিক নিয়মেই উঠে দাঁড়াল।
প্রতিদিনের মতো আজও ভোরবেলার রুটিনটা এক———পড়াশোনা শেষ করে আফিয়া বেগমের রুমে যাওয়া, ওনার সঙ্গে চা খাওয়া আর কিছু গল্পগুজব করা। তারপর নাস্তা সেরে কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া।
আজও সেই ভঙ্গিতেই নাফিসা নিজের রুম থেকে বের হয়ে করিডর দিয়ে হাঁটছে।
ঠিক সেই সময় পাশের রুমে এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল।
সায়মানের রুমের দরজা আধখোলা। ভেতরে রাইহান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে সায়মান—জিম সেরে মাত্রই বেরিয়েছে। গায়ে ঘাম ঝরছে, হাতে সাদা টাওয়েল দিয়ে মুখ মুছছে। বুকভরা দৃঢ়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন পাহাড়।
ঘাম মুছে নিয়ে আলমারির থেকে একটা কালো জ্যাকেট বের করল, ধীরে ধীরে গায়ে চাপাল। তারপর রাইহানের দিকে চোখ মেলে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল————
———“নিচে চল আমার সাথে। আব্বু আর ছোট চাচ্চু স্টাডি রুমে ওয়েট করছে আমাদের জন্য।”
রাইহান চমকে মাথা তুলল। তার চোখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।
— “ভাইয়া… মামুদের কাছে যাব মানে? কেন?”
সায়মান ঠাণ্ডা অথচ দৃঢ় স্বরে জবাব দিল————
———— “বেশি কথা আমার পছন্দ না জানিস। নিচে চল, গেলেই বুঝবি।”
এ কথা বলে সায়মান ধীর পদক্ষেপে দরজার বাইরে বের হলো। বাধ্য ছেলের মতো মাথা নিচু করে রাইহানও ওর পেছনে হাঁটা ধরল।
রুম থেকে বের হতেই সামনে এসে পড়ল নাফিসা। মুখোমুখি হয়ে পড়তেই অস্বস্তি জমল। নাফিসার চোখ অনিচ্ছা সত্ত্বেও সায়মানের দিকে গেল, সঙ্গে সঙ্গে গত রাতের অভিমান আবার বুক ভরল। ঠোঁট চেপে কিছু না বলে উল্টো দিকে হাঁটতে লাগল।
———— “এই পিচ্চি, দাঁড়াও।”
সায়মানের গম্ভীর গলা শুনে থেমে গেল নাফিসার কদম।
সায়মান রাইহানের দিকে তাকিয়ে বলল————
———— “তুই আগে নিচে যা। আমি আসছি।”
রাইহান মাথা নেড়ে নিচে নামতে শুরু করল। যাওয়ার সময় হালকা মুচকি হাসি দিল নাফিসার দিকে। জবাবে নাফিসাও একফোঁটা মিষ্টি হাসি ফিরিয়ে দিল।
সায়মানের নাফিসাকে ডাকলো,
———— “এদিকে এসো।”
নাফিসা সায়মানের দিকে এগোল না, বরং উল্টো পাশে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল। অভিমানী মনের জেদ মাথা নাড়তে দিল না।
সায়মান ওর দিকে তাকিয়ে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকাল। তারপর দ্রুত পা বাড়িয়ে গিয়ে ওর হাত ধরে টেনে নিজের কাছে টেনে নিল। নাফিসার শরীর একেবারে ধাক্কা খেয়ে মিশে গেল ওর বুকের সাথে।
সায়মান ফিসফিস করে বলল———
———— “দিন দিন তুমি ? জেদি… একদম জেদি হচ্ছ।”
অপ্রস্তুত নাফিসা চমকে উঠল। তারপর ছটফট শুরু করল ছাড়া পাওয়ার জন্য।
———— “ছাড়েন! কেউ চলে আসবে… খারাপ ভাববে।”
সায়মান চোখ সরু করে তাকাল, গলায় ধমক নামল———
——— ” এমন ছোট ছুটি করছে কেন? কী হলো?”
নাফিসা ভয়ে গলা নামিয়ে বলল————
——— “ছাড়েন বলছি…”
সায়মানের দৃষ্টি আরও গভীর হলো।
——— “বেশি কথা বলো তুমি। চুপচাপ স্থির হয়ে দাঁড়াও।”
শব্দগুলো কানে বাজতেই নাফিসা থেমে গেল। তবুও ওর চোখে অভিমানের স্রোত জমে উঠল সায়মান বকা শুনে।
সায়মান এক হাত বাড়িয়ে নাফিসার কপালে হাত রাখল, তাপমাত্রা মাপল । তারপর মনোযোগ দিয়ে মুখের দিকে তাকাল। সকালের আলোয় ওর মুখটা অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল——— ঘুম ভাঙার পর একটু ফোলা ফোলা চোখ, ঠোঁটে ভেজা আভা, যেন নিষ্পাপ একটা ফুল।
সায়মান কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে হাত ছেড়ে দিল। ছাড়াপেয়ে নাফিসা জোরে শ্বাস নিল।
সায়মান একদম শান্ত স্বরে বলল————
———— “আমার জন্য এক কাপ কফি বানিয়ে স্টাডি রুমে নিয়ে এসো।”
কথাটা শুনেই ফট করে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল নাফিসার———
———— “পারব না।”
সায়মান ভ্রু তুলল।
———— “কি বললে?”
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৮
নাফিসা হকচকিয়ে গেল, কিছু না বলে ছুট দিল সিঁড়ির দিকে।
সায়মান ওর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য এক মৃদু হাসি খেলে গেল, চোখে একরাশ রহস্য।
তারপর ও নিজেও গম্ভীর মুখে স্টাডি রুমের দিকে হাঁটা দিল।
