Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৯

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৯

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৯
আরোবা চৌধুরী আরু

সকালের নরম আলো ধীরে ধীরে পুরো বাড়িটাকে একটা শান্ত আবহে ঢেকে দিয়েছে। একে একে বাড়ির পুরুষেরা সবাই অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছে। আজ একটু ব্যতিক্রম সায়মান ছুটি নিয়েছে। কারণ একটাই… নাফিসা। বাড়িটা আজ অদ্ভুত রকম ফাঁকা। শুধু সায়মান, সায়ফান আর গভীর ঘুমে ডুবে থাকা নাফিসা… সাথে কয়েকজন গৃহকর্মী। জারিন, আফিয়া বেগম, ইমা বেগম, বিলকিস আরা রাশিদ সবাই গেছে অনাথ আশ্রমে। সেখানে একটা অনুষ্ঠান আছে, আর নতুন বেবিদের জন্য কিছু জিনিসপত্রও কিনবে তারা। আফিয়া বেগম যেতে চাইছিলেন না, কিন্তু পরিস্থিতির জন্যই যেতে হয়েছে।
রুমের ভেতরটা নিস্তব্ধ। নাফিসা বিছানায় শুয়ে আছে, গলা পর্যন্ত সুন্দর করে ব্ল্যাঙ্কেট ঢাকা। পুরো রাত জেগে থাকার ক্লান্তিতে এখন সে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। মুখটা শান্ত… কিন্তু ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
সোফার এক পাশে বসে আছে সায়মান। কোলে ল্যাপটপ, চোখ স্ক্রিনে… কিন্তু মনটা ওখানে নেই। মাঝেমাঝেই তাকিয়ে দেখছে নাফিসার দিকে।
দরজায় নক পড়তেই সায়মান মাথা তুলল। একবার নাফিসার দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো ঘুম ভাঙেনি।

“আস…” নিচু গলায় বলল সে। দরজা খুলে ঢুকলো সায়ফান। থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট, ঢিলা টি-শার্ট, এলোমেলো চুল ঘুম থেকে উঠে আসেছে কেবল দেখেই বোঝা যাচ্ছে। সায়ফান হালকা হেসে বলল,
“ভাই, কি করো? আসতে পারি?”
সায়মান মাথা নেড়ে ইশারা করল। সায়ফান ভেতরে এসে চারপাশে একবার তাকিয়ে আবার বলল, “কফি খাইবা? একটা ইউনিক কফির রেসিপি পাইছি। ট্রাই করবা?”
সায়মান চোখ না তুলে শান্ত গলায় বলল, “না… খালাকে বল, রেগুলার যেটা বানায়, ওইটাই বানাতে।”
সায়ফান ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকাল, “কেন? আমার কফির উপর ভরসা নাই?”
“না। ভরসা নাই।”
“ওকে! আজকে বানাই, তারপর বুঝবা!” বলে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে ঘুরে দাঁড়াল সে। সায়ফান যেতেই সায়মানের ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে চোখ পড়তেই তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে গেল ব্যালকনিতে। সায়মানের বলার মাঝে হঠাৎ রুম থেকে একটা তীব্র, বুক কাঁপানো চিৎকার আসলো। সায়ফান থমকে গেল।

“পিচ্চি পুতুল ?!”
দৌড়ে রুমে ঢুকে সে দেখল, নাফিসা বিছানার উপর কুঁকড়ে আছে। দুই হাত শক্ত করে পেটের উপর চেপে ধরা… শরীরটা কাঁপছে। মুখ দিয়ে স্পষ্ট করে কথা বের হচ্ছে না গংরাচ্ছে অনবরত। ঠিক তখনই সায়মানও ফোন রেখে ছুটে এল ভেতরে। “পিচ্চি পুতুল!” ছুটে গিয়ে পাশে বসে জড়িয়ে ধরল।
“কি হচ্ছে? ব্যথা? পেইন উঠছে?”
নাফিসা কোনো উত্তর দিতে পারল না। শুধু কষ্টে চোখ বন্ধ করে আছে… নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। সায়মানের গলা শুকিয়ে গেল।
“সায়ফান!” হঠাৎ চিৎকার করে উঠল সে।
কিছুক্ষণ পরে সায়ফানের উত্তর এলো “কি হইছে ভাই?!” দৌড়ে কাছে এল রুমে।
“গাড়ি বের কর! এখনই! হসপিটালে নিতে হবে!” এক মুহূর্তও দেরি করল না সায়ফান। দৌড়ে নিচে নেমে গেল।
এদিকে সায়মান কাঁপা হাতে নাফিসার মাথায় হাত রাখল,“আমি আছি… কিছু হবে না… একটু সহ্য করো পিচ্চি পুতুল…” কিন্তু তার নিজের কণ্ঠেই ভয় স্পষ্ট। এদিকে শব্দ শুনে দুইজন স্টাফ দৌড়ে চলে এল। আগে থেকেই রাখা হুইলচেয়ার নিয়ে।

“স্যার—”
“দ্রুত!” কঠিন গলায় বলল সায়মান।সাবধানে নাফিসাকে কোলে তুলে হুইলচেয়ারে বসাল সে। এই অবস্থাতেও নাফিসার হাত শক্ত করে ধরে আছে তার শার্ট… দ্রুত নিচে নামানো হলো তাকে। বাইরে গাড়ি রেডি। সায়ফান ইতিমধ্যেই ড্রাইভিং সিটে বসে আছে।
সায়মান নিজে নাফিসাকে তুলে গাড়িতে বসাল, পাশে বসে তাকে শক্ত করে ধরে রাখল। ” দূরত গাড়ি ড্রাইভ কর।” চিৎকার করে উঠল সে। গাড়ি ছুটে চলল দ্রুতগতিতে…
গাড়িটা যেন আজ সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটছে। সায়মানের পুরো দৃষ্টি শুধু নাফিসার দিকে। নাফিসা তার হাত শক্ত করে ধরে আছে, নখ গেঁথে গেছে সায়মানের হাতে… কিন্তু সে কিছুই অনুভব করছে না। শুধু বারবার বলছে, “আমি আছি… আমি আছি পিচ্চি পুতুল… একটু সহ্য করো… প্লিজ…”
নাফিসার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে শরীরটা কেঁপে উঠছে ব্যথায়। হঠাৎ সে কষ্টে ফিসফিস করে বলল “DSP সাহেব … আমি পারছি না…” এই কথাটা যেন সায়মানের বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধল। “পারবা! তোমাকে পারতেই হবে! আমাদের বেবিদের জন্য… আমার জন্য…” তার গলা ভেঙে যাচ্ছে, চোখ লাল হয়ে উঠেছে।
সামনে বসে থাকা সায়ফান একবার রিয়ার ভিউ মিররে তাকাল। তারও হাত কাঁপছে।“আর পাঁচ মিনিট ভাই… পৌঁছে যাইতেছি!”
হাসপাতালের সামনে গাড়ি থামতেই সবকিছু যেন একসাথে দ্রুত হয়ে গেল। দুইজন ওয়ার্ডবয় দৌড়ে এসে দরজা খুলল।

“লেবার পেইন পেশেন্ট ! কুইক!” চিৎকার করে উঠল সায়মান।
স্ট্রেচারে তোলা হলো নাফিসাকে। সে এখনও কষ্টে কুঁকড়ে আছে, চোখ বন্ধ… ঠোঁট কাঁপছে।সায়মান তার হাত ছাড়ছে চাইছিল না, কিন্তু দরজার সামনে এসে নার্স থামিয়ে দিল “স্যার, আপনি এখানে পর্যন্ত… প্লিজ!”
“না! আমি সাথে যাব!”
“স্যার প্লিজ, আমাদের কাজ করতে দিন!” দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
করিডোরটা নিস্তব্ধ… সায়মানের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, দুই হাত মুঠো করে। বুকটা ওঠানামা করছে দ্রুত। সায়ফান পাশে এসে দাঁড়াল। “ভাই…” সায়মান হঠাৎ দেয়ালে মুঠো মেরে আঘাত করল।
“আমি কেন আগে বুঝলাম না? ও এত কষ্ট পাচ্ছিল…”
“ভাই, এইসব নরমাল… তুমি নিজেকে দোষ দিও না…” কিন্তু সায়মান শুনছে না। তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে “ তার পিচ্চি পুতুল ঠিক থাকবে তো?” সময় যেন থেমে গেছে। প্রতিটা সেকেন্ড মিনিটের মতো লাগছে। সায়ফান বাকি সবাইকে ফোন করে সব জানিয়ে দিলো ইতিমধ্যে সবাই রওনা দিয়েছে হসপিটাল এর উদ্দেশ্যে।
হঠাৎ ভেতর থেকে একটা চিৎকার ভেসে এলো, নাফিসার। সায়মান স্থির থাকতে পারল না। “পিচ্চি পুতুল !”সে দরজার দিকে এগোতেই সায়ফান তাকে ধরে ফেলল। “ভাই! প্লিজ!”

কিছুক্ষণ পর………
করিডোরে হঠাৎ নরম, ছোট্ট একটা কান্নার শব্দ ভেসে এলো।একটা… তারপর আরেকটা।সায়মান স্থির হয়ে গেল। তার চোখ বড় হয়ে গেছে।“সায়ফান…?” সায়ফানের ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটল। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে এক নার্স বের হলো। মুখে হালকা হাসি।
“কনগ্র্যাচুলেশনস মিস্টার মিস্টার সায়মান তাহের রাশিদ … যমজ বেবি।” সায়মান কিছু বলতে পারল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
“আমার পিচ্চি পুতুল ঠিক আছে ?” কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল সে। “জি, আলহামদুলিল্লাহ, মা আর বেবি দুজনই ভালো আছে।”
আবার কিছুক্ষণ পর………

একজন নার্স দুইটা ছোট্ট, নরম কাপড়ে মোড়া বেবি এনে সায়মানের হাতে তুলে দিল। সায়ফান পাশ থেকে উঠে চোখ বড় বড় করে সায়মানের দুই থাইয়ের মাঝ বরাবর ওখানে তাকিয়েবলল,
“ভাই একেবারে ডবল। তুমি তো দেখি একসাথে দুই গোল দিয়ে দিলে। ” সায়ফানের কথা শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নাচটা শক্ত করে হেসে দিল। সায়মান বেশ বিরক্ত নিয়ে চোখ গরম করে সায়ফানের দিকে তাকালো সায়ফান সাথে সাথে চুপ হয়ে গেলো।সায়মান কাঁপা হাতে বেবি দুটো কোলে নিল। এত ছোট… এত নরম… তার চোখ ভিজে উঠল।সে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল
“এই যে… শুনছো তোমরা…আমি তোমাদের আব্বু…”“তোমাদের আম্মু… অনেক কষ্ট করেছে তোমাদের জন্য…তোমরা যখন বড় হবে… আগে তাকে ভালোবাসবা, ঠিক আছে?”আর একটা কথা…আমি হয়তো পারফেক্ট না…কিন্তু তোমাদের জন্য… পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো বাবা হওয়ার চেষ্টা করব… প্রমিস…”তারপর হালকা করে তাদের কপালে চুমু দিয়ে বলল,

“কিন্তু ধন্যবাদ… তোমরা আমার পৃথিবীটা পূর্ণ করে দিলে…”
কিছুক্ষণের ভিতরেই…….
আস্তে আস্তে হাসপাতালের করিডোরটা ভরে উঠতে লাগল আপনজনদের উপস্থিতিতে। একে একে সবাই এসে পৌঁছাল আফিয়া বেগম, ইমা বেগম, জারিন, রিশা, আকাশ… সবাই উপস্থিত হয়ে গেছে। এখনো মাহবুব রাশিদ আর মঈন রাশিদ আসেনি শুধু ।
দুইটা ছোট্ট প্রাণ দুইটা নতুন আলো সবাইকে টেনে নিয়েছে নিজের দিকে।
আফিয়া বেগম এগিয়ে এসে এক বাবুকে কোলে তুলে নিলেন।
পাশ থেকে ইমা বেগম আরেকটা বাবুকে কোলে নিতেই দুজনের মাঝেই নীরব প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল৷ কে বেশি আদর করবে!এরই মাঝে জারিন, রিশা আর আকাশ এসে দাঁড়াতেই পরিস্থিতি পাল্টে গেল । “আমাকে দাও!না আগে আমি! একটু ধরতে দাও না!” এই বলে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে শুরু হয়ে গেল হালকা কাড়াকাড়ি, ঠিক তখনই হঠাৎ জোরে চিৎকার দিয়ে উঠল সায়ফান
“এইই! সবার আগে আমার হক আছে! আমার টুনু-মনু বেবি দুইটা আমি আগে কোলে নিব, তারপর তোরা! ” সায়ফানের কথা বলার পরের মুহূর্তেই রিশা নিজের জুতা দিয়ে সোজা সায়ফানের পায়ের উপর একটা বাড়ি বসিয়ে দিল। “আহহ!” চিৎকার করে উঠল সায়ফান। সে এখনও ব্যথায় মুখ কুঁচকে আছে, ঠিক তখনই,
আরেকটা ধাপ! এইবার জারিন এসে আরেক পায়েও জুতা দিয়ে বাড়ি দিল।
“আল্লাহ!” বলে দুই পা ধরে মাটিতে বসে পড়ল সে। “এই তোরা দুই বান্ধবী মিলে আমার সাথে কি শুরু করলি?! আল্লাহ আমাকে বাঁচাও! নির্যাতন শুরু করছে আমার উপর এরা!”

অন্যদিকে…….
নাফিসার কেবিনে সায়মান ধীরে ধীরে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।
বিছানায় শুয়ে আছে নাফিসা। দুইটা বাচ্চার নরমাল ডেলিভারির পর সে ভীষণ ক্লান্ত। মুখটা ফ্যাকাসে, চোখ বন্ধ… কিন্তু তবুও সেই মুখে এক অদ্ভুত শান্তি লেগে আছে। সায়মান কিছুক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল। এই সময়টা নিজের ভেতরে ধরে রাখতে চাইছে। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসল।
নরম করে হাত বাড়িয়ে নাফিসার কপালের চুলগুলো সরিয়ে দিল।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৮

“অনেক কষ্ট হইছে না…?” খুব আস্তে বলল সে।নাফিসা চোখ খুলল ধীরে… ক্লান্ত হাসি ফুটল ঠোঁটে।
“ না, আপনাকে বাবা ডাক শোনাতে পেয়ে আমি অনেক খুশি হয়েছি এই খুশির কাছে এই ভালোলাগার কাছে এই কষ্টটা কিছু না।”এই এক কথাতেই যেন সায়মানের বুকটা ভরে গেল। সে নাফিসার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে আলতো করে চাপ দিয়ে নাফিসার অধরে নিজের অধর মিশিয়ে দিলো।

চৌদ্দের চিঠি শেষ পর্ব