Home ছায়াস্পর্শ ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৬

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৬

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৬
জান্নাত চৌধুরী

মাহিলা ফজরের নামজ পরতে উঠেছেন। টিব‌ওয়েলে পানি নাই , রাইসাদের টিউবওয়েলে ওযু দিতে আসছিলো তখনি রেজাকে বের হতে দেখেই ডাকলেন –
-“কেডা তুমি ?”
রেজা দাড়ালো উল্টো ঘুরতেই , মহিলা নাক সিঁটকায়।
-“ত‌ওবা , ত‌ওবা তুমি শামসুলের পোলা না। এই ভোর রইতে এইহানে ..…
মহিলা কথা শেষ করলো না , রেজা এলোমেলো চুল , ঠোঁটে কালো দাগ , সাথে গলার কাছের কামড়ের দাগ দেখে ঘটনা বুজতে তার আর বেশি দেরি হলো না।

তিনি আর কোনো উত্তরের আশা না করেই। দ্রুত গিয়ে খোপ করে রেজা হাত ধরে ফেললেন। তারপর চেঁচিয়ে সব লোক জড়ো করতে লাগনেন। একে একে সব বাড়ি হতে মহিলা-পুরুষ বেড়িয়ে আসলো।
সবার প্রথমেই মাতব্বরের বাড়ি , এতো চেঁচামেচিতে মাতব্বর ও তার ব‌‌উ বের হয়েই রেজাকে দেখলো।
রেজার ঘটনা বুঝতে সময় লাগলো। যতক্ষণে সে নিজেকে বাঁচাতে কিছু বলবে ততক্ষন মহিলা গলা ছেড়ে বলল-

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-“এই দেহো দেহো। ইসমাইলের ছোট মাইয়ার লাং ধরছি , আমি নিজ চোক্কে এই চেংড়ারে ইসমাইলের মাইয়ার ঘর থেইকা বাইর হ‌ইতে দেখছি। দেহো তোমরা?
গেটের সামনে চেঁচামেচি যেহেতু , জহুরা বেগম আর ইসমাইল শেখের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। দরজা খুলে বেড়িয়ে তারাও বাহিরে আসতেই এতো চেঁচামেচি আর মহিলার কথা শুনে পুরোই থমকে গিয়েছে।
মহিলা আবার বলল , “ ও জহুরা , বড় ডারে রূপ দেখাইয়া, তলে তলে বুদ্ধি ক‌ইরা রাজার ঘরে দিয়ে ছোট ডারে দিয়া কি ব্যাশা খানা খুলছো নাকি ? এই যে তোমার মাইয়ার লাং ধরছি। দেহো, দেহো, তোমার মাইয়ারে উদাম কর‌ইরা খাইয়া বাইর হ‌ইছে।”

জহুরা বেগম যেন কোনো স্বপ্ন দেখছেন? তার হাত- পা কাঁপছে , বরফের ন্যায় জমে গিয়েছে যেন।
একজন ছেলে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল , “ আপনে নিজ চোখে ঘর হ‌ইতে বাহির হ‌ইতে দেখছেন চাচী ?”
মহিলা রেজার হাত আরো শক্ত করে চেপে ধরল। একরাশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল , – “ দেখছি ব‌ইলা না ধরছি , আমি ওযু দেওনের লাইগা ইসমাইলের টিউবওয়েল পারে যাবার লাগি গেটে আইছি। দেহি , ইসমাইলের মাইয়া পোলারে ঘর হতে বাইর ক‌ইরা দিতাছে। আমার কথা বিশ্বাস না হয় দেহো পোলার ঘাড়ের দেহো, রাইতে আকামের চিহ্ন। ছেরি কামড়াইয়া দাঁত বসাইছে।
রেজা দ্রুত গলায় হাত রেখে ঢাকতে চাইলো। মহিলা এক দলা থুথু মাটিতে ছুঁড়ে মেরে,

-”ছিঃ ছিঃ জহুরা থুউউ , বাড়ির মধ্যে এ‌ইসব খারাপ কাম চালাও তুমি? তাও নিজের মাইয়া দিয়া”।
এতোক্ষণে মাতব্বর এগিয়ে এলেন , রেজার অবস্থার দিকে দেখে নিয়ে গেটের কাছে এলো। জহুরা বেগম তখনো নিশ্চুপ। মাতব্বর বললেন –
-“এইসব কি জহুরা , তোমার মাইয়া ক‌ই?”
জহুরা কথা বলে না। আবারো মহিলা গলা ছাড়ে , “ এই কেউ এইডারে ধরে আমি ওই নটি রে বাইর ক‌ইরা আনি!”
দু’জন ছেলে এসে চেপে ধরলো রেজাকে , জ্বরে চোখ দুটো লাল রেজার । শরীর টাও টলছে , ছেলে দুটো ধরতেই মহিলা গেটের কাছে এসে বলল –

-“স‌ইরা খাড়ান মাতব্বর সাহেব‌ ,আমারে যাবার দেন।”
মাতব্বর সরে গেলো , মহিলা জহুরা কে পাত্তা না দিয়ে গটগট করে বাড়ির দিকে হেঁটে গেলো। রাইসার ঘরের সামনে এসে জোড়ে জোড়ে কপাটে বাড়ি দিয়ে ডাকল-
-“এই ছেমরি বাইর হো ? বাইর হো ক‌ইতাছি , সারা রাইত লাংগের লগে ফুর্তি ক‌ইরা এখন ঘুমাও নষ্টা চেংড়ি।
দোড় খুল নটি;
রাইসা দরজা খুলছে না। মহিলা আরো জোড়ে জোড়ে দরজা ধাক্কালো। পারে তো দরজা ভেঙে ফেলে , একপর্যায়ে এসে দরজা খুললো রাইসা। ব্যথায় পেটে হাত চাপানো তার , চুল এলোমেলো। ঘাড়ের দিকে পর পর তিন থেকে চার টা দাগ, মহিলা রাইসাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে যায়! রাইসা বুঝলো না কি হচ্ছে , সে ডাকলো –

-”আরেএ চাচি কি করছেন ?
মহিলা চৌকির কাছে এসে দাড়লো , কাথা সরিয়ে চাদর দেখলো। সন্দেহ আরো গাঢ় হলো তার , চাদরে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। মহিলাকে ঠেকায় কে তেড়ে এসে রাইসার চুলের মুঠি ধরে এনে ছুড়ে ফেললো সবার সামনে। রাইসার বুকে ওড়না নেই। পুরো পাড়ার সামনে ইজ্জতে কাঁদা ছোড়াছুড়ি হচ্ছে তার।
-“এই দেহো , দেহো সবাই আমার কথা কতখানি সত্য দেহো। আরো প্রমাণ লাগলে ছেমরির বিছানায় দেইখা আসো। রক্তে দাগ লাইগা র‌ইছে , ছিঃ ছিঃ কি নষ্টামি কি নষ্টামি।”

রাইসার লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে হলো। এতো গুলো মানুষের সামনে এমন বেইজ্জতি কোন পাপের ফলন, বড্ড জানতে ইচ্ছে হলো তার। কলঙ্ক এই একটা জিনিসের বড্ড ভয় ছিলো তার আপার।‌আজ আপারে বড্ড মনে পড়ছে তার। রাইসা মাটি খামচে ধরলো ,আস্তে করে ডাকলো , -“আপা রে”।
ভোর রাতেই যে শোরগোল শুরু হয়েছে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে তা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে – ছেলেপুলেরা এসে রেজা কে চেপে ধরে এক গাছের সাথে বেঁধেছে প্রথমে। একে অসুস্থ শরীর তার উপরে সব কাহিনী। রেজার শরীর আরো নেতিয়ে পড়ছে। জহুরা বেগম এসে মেয়ের গালে পরপর কয়েকটা চড় থাপ্পড় মেড়ে মাটিতে বসে কাঁদছেন। ইসমাইল শেখ নিশ্চুপ এতো বড় অঘটন সামলানোর কোনো উপায় দেখছেন না।
মাতব্বর চেয়ারে বসে পান চিবোতে চিবোতে বললেন ,“ সব সাক্ষী প্রমাণ দেইখা যা আন্দাজ হ‌ইলো পোলা মাইয়া কুকামে লিপ্ত হ‌ইছে এই ঘটনা ১০০ভাগ খাটি। তাই শালিস ডাকা হোক। বাকি ঘটনা শালিসেই জানা জাবাইবো – এই কেউ গিয়া চেয়ারম্যান সাহেবের কানে খবর দে আইজ ৩টার সময় এইডার বিচার বসবো। ততক্ষণে পোলা মাইয়ারে এক দড়িতে বেঁধে রাখ।

খন্দকার বাড়িতে কান্নার রোল পড়েছে। আব্বাস খন্দকারের কাটা মন্ডু আর খন্ড বি’খন্ড দেহের টুকরোগুলো গুলো খন্দকার বাড়ির উঠানে পাটির ওপর বিছিয়ে রাখা হয়েছে। সাবিনা খন্দকারে গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে কাঁদছেন খোলা আকাশের নিচে কান্নার আওয়াজ যেন হ‌ওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে।
স্বামীর নিখোঁজ হবার পর থেকেই নাওয়া খাওয়া ভুলে সারাদিন জায়নামাজে বসে প্রার্থনা করেছে লোকটার জন্য। শেষে লোকটা ফিরলো। তবে এ ফিরা তার শেষ ফেরা, লোকটা আর তাকে ডেকে বলবে না। সাবিনা আমি আইছি ভাত বারো , সাবিনা বসো দেখি এক লগে খাই , সাবিনা আইজ কিন্তু জব্বর ক‌ইরা মাংসা পাকাইবা ভাই, আমি , জামাই জোড়া , উড়ান সবাই মিলে দুপুর জমাইয়া খাওন দিমু।
তাইয়্যেবা লাশের পাশে বসে বার বার ডাকছে “আব্বা ওঠেন, আব্বা।” কান্নার সাথে সাথে বার বার মাটি খামচে ধরছে। আযান ধরে রয়েছে মেয়েটাকে , তবে শান্ত হয় না।

এই একটা মাইয়া খন্দকার বংশের সকলের বেশ আদুরে। আব্বাস খন্দকারের জান প্রাণ এই মাইয়া। ঘরের মাইয়া পর করবে না তাই আযান সাথেই বিবাহ দিয়েছে পুরো পরিবার।
আযান শক্ত করে ধরে রাখলো তাইয়্যেবাকে। তাইয়্যেবা রক্তে ভয় পায় , বরাবরই আযান খুন খারাপি থেকে দূরে রেখেছে তাকে। বাসায় একটা মুরগি জবাই হলেও এটা তাইয়্যেবার চোখের সামনে হয়না। অথচ আজ কিনা চোখে সামনে বাপের খন্ড খন্ড লাশের পিস থেকেও ভয় নেই তার। কাঁটা মন্ডুর উপড়ানো চোখের গড়িয়ে পড়া রক্ত দেখেও বলছে না , “আযান ভাই রক্ত , আমি ভয় পাচ্ছি সরাও!”
তাইয়্যেবা খামচে ধরে আযানের বুকের কাপর –

-“ওরা আব্বা মেরে ফেলছে আযান ভাই , আমার আব্বারে টুকরা টুকরা করছে। আমার আব্বাজানের কষ্ট লাগছে-
ম্যালা ব্যথা পাইছে আযান ভাই।
আযান আরো শক্ত করে নিজের বুকে জড়িয়ে নিলো তাইয়্যেবাকে। উড়ান এলো –
প্রবেশদ্বার পেরিয়ে এসে প্রথমেই আজমাইন খন্দকারের পায়ের কাছে বসল। আজমাইন খন্দকারের চোখে পানি , লোকটা চেয়ারে বসে এক দৃষ্টে লাশের দিকে তাকিয়ে।
উড়ান তার দিকে তাকিয়ে ডাকল –

-“আব্বা !”
আজমাইন খন্দকার এক চুল নড়লো না। উড়ান আবারো ডাকল –
-”আব্বা।”
উড়ান আজ প্রথম এক ভঙ্গুর লোককে দেখছে। শক্ত ধাঁচের আজমাইন খন্দকার কে আজ কাঁদতে দেখছে। উড়ানের চোখ লাল হয়ে ওঠে , চাচাজানের মৃত্যুর থেকেও বেশি পোড়াচ্ছে তাকে তার আব্বার নিশ্চুপ থাকা।
উড়ান উঠলো , হেঁটে এসে দাঁড়ালো লাশের পাশে। সাবিনার কান্না , তাইয়্যেবার আত্মচিৎকার , সব কিছু নিশ্চুপে তাকিয়ে দেখলো। খন্ডাংশ মাংস গুলো দিকে তাকিয়ে থেকে উজান আস্তে করে হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে। অনেকক্ষণ সময় তাকিয়ে থেকে। খন্ড গুলো চোখের ইশারায় গুনে নিলো।আট খন্ড করেছে দেহ। ফুসফুস , কলিজা , হার্ট সব বের করে নেওয়া হয়েছে বাদ যায়নি মাথার মগজটাও।
উজান ঝুঁকে গেলো , পাটিতে লেগে থাকা রক্তে হাতে ছুঁয়ে তারপর গালে মেখে নিলো। উড়ানের চোখ কোণ গড়িয়ে নোনা পানি গালে এসে স্থান নিলো। রক্ত ধুয়ে যাবার আগেই
সে বলল-

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৫

-“আপনার মৃত্যুর থেকে ভয়ংকর ভাবে খন্ডিত করার মীর বাড়ির প্রতিটি মানুষের দেহ। ভীষণ পরিমাণ কষ্ট দিয়ে কেড়ে নেওয়া হবে তাদের জান। মিলায় নিয়েন চাচাজান, আজ যেমন খন্দকার বাড়ির কবরস্থানে আপনার লাশে মাটি পাবে । ঠিক তেমনি মীর বাড়ির গোরস্থানেও একের পর এক খন্ডিত লাশের দাফন হবে। আমরা প্রতিশোধ নিবো চাচাজান , আপনার ভাজিতা মরে নাই।
উজান উঠে দাড়ালো। আশপাশে আর কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা হেঁটে বাড়ির দিকে গেলো। সাবিনা বেগম হুস হাড়িয়েছে , আযান বাড়ির দুজন মহিলাকে আদেশ দিলো নিয়ে যেতে। তাইয়্যেবাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলো সে।

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৭