Home ছায়াস্পর্শ ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৮

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৮

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৮
জান্নাত চৌধুরী

প্রায় সন্ধ্যা নাগাদ , লাল একখান শাড়ি এনে ইফরাহর হাতে ধরিয়ে দিলো আরাধ্য। ইফরাহ অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছে লোকটা কে। আরাধ্য ভাবলেস , সালিসি থেকে এসেও দেখা করে নি ইফরাহ সাথে। রেণুর মা এসে বলে গিয়েছে আজ নাকি তার এ ঘর হতে বেড়োনো নিষেধ। কেনো ? কারণ জিজ্ঞেস করলে রেণুর মাথা নেড়ে জানায় সে জানেনা , তবে ছোট নবাবের হুকুম।
আরাধ্য গায়ের , গেঞ্জি খুলে দুপুরে ইফরাহর বের করা পাঞ্জাবি গায়ে জড়িয়ে নিলো। আরো এ দফা চমকালো ইফরাহ। শাড়িটা হাতে নিয়েই আরাধ্যের কাছে এসে দাড়ালো।

-“কোথায় যাচ্ছেন ?”
আরাধ্য চুপচাপ তাকিয়ে থেকে দেখলো। তারপর পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। ইফরাহর রাগ লাগলো , কেনো লাগলো জানা নেই। আরাধ্য দরজা পেরিয়ে যাবে , বের হবার আগে বেশ গম্ভীর গলায় বলে ,
-“শাড়িটা পড়ে নিচে এসো;”
আরাধ্য চলে গেলো , ইফরাহ তার যাওয়ার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে শাড়িটা দেখলো। লাল রঙের উপর সোনালীর সুতোর কাজ , বেশ সুন্দর। শাড়ি খান গায়ের উপর রেখে আয়নায় নিজেকে দেখলো একবার। ফর্সা গড়নে লাল বরাবরই মানায়।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ইফরাহ শাড়ি পড়ে নিলো। চুলে চিরুনি করে ঢিলে ঢালা একটা হাতখোপা করলো, চোখে কাজল পড়লো। আলমারি হতে , হালকা পালতা কিছু গহনা বের করে পড়ে নিলো।
তারপর আবার নিজেকে দেখলো। আজকাল নিজেকে সাজাতে ভালো লাগে তার। মানুষ টার জন্য সাজাতে ভালো লাগে , ওই যে অগোছালো -এলোমেলো কিছু লোকটার পছন্দ নয়। তাই হয়তো সাজে;
দরজায় কড়া পড়লো , ডাক পড়েছে হয়তো। ইফরাহ শাড়ির আঁচল মাথায় টানলো। দরজা খুলতেই এক বাচ্চা মেয়ে বলল-

-“ ব‌উ লালী , ব‌উ লালী সবাই ডাকছে আপনাকে।”
মেয়েটা আধভাঙ্গা কথাগুলো তে ইফরাহ ফিক করে হেসে দিলো। বেশ সুন্দর মেয়েটা , গায়ের রং উজ্জল শ্যামলা। ইফরাহ মেয়েটার গাল টেনে জিজ্ঞেস করে –
-“কি নাম মামুনি ?”
-“তা ..তানিয়া!”
বাচ্চা মেয়েটা দৌড়ে চলে গেলে। ইফরাহ তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হাঁটা ধরলো।
সিঁড়ি কাছে এলো , অন্দরমহলে শোরগোল বসেছে। গ্রামের মুরব্বিরা বসা। ইফরাহ এক এক করে সিঁড়ি বেয়ে নামছে।

সে একদৃষ্টে তাকিয়ে লোকগুলোকে দেখছে। চেয়ারম্যান বসা , অরুনিমা বসা। ইফরাহ অবাক হয় , তার অবাকের কারণ চেয়ারম্যান অরুনিমা নয়। তার অবাকের কারণ রাইসা! রাইসার সাজ সজ্জা;
লাল টুকটুকে শাড়িতে ব‌উ সেজেছে রাইসা! ভাবনায় মাথায় ইফরাহর কাপড় পড়েছে অনেকক্ষণ , আগলা হয়েছে চুলগুলো। মনোযোগী না হয়েও এক এক করে সিঁড়ি পেরিয়ে শেষ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সে। আরাধ্য কাজি নিয়ে এলো । তাকে নিয়ে বসানো হলো রেজা রাইসার সামনের।
এতক্ষণে অরুনিমা দেখলো ইফরাহকে। বসা ছেড়ে উঠে এসে ইফরাহে ডাকল –
-”ব‌উরানী ;

ইফরাহ দৃষ্টি সরিয়ে তাকালো। অরুনিমা হাত বাড়িয়ে ইফরাহর হাত টেনে অন্দরমহলে নিয়ে এলো। কাজি সাহেব বিয়ের কাজ শুরু করেছেন। কাবিন নামা লিখছেন ,
দেনমোহর লেখার সময় আশে পাশে তাকিয়ে নিশ্চুপ থাকলেন। আরাধ্য জিজ্ঞেস করলো , “থামছেন কেন ?”
কাজি সাহেব শুষ্ক ঢোক গিললেন। তারপর আরো একবার আশে পাশে দেখে নিবে বললেন , “দেহ মোহর বাঁধতে হবে ছোট নবাব”

-“তো বাঁধেন , কে আটকাইছে?”
কাজী সাহেব বললেন , “ ইয়ে মানে ছোট নবাব কত বাঁধবো?”
আরাধ্য রেজার দিকে তাকালো , “কি ভাই কত বাঁধার হুকুম দিতে চান বলেন?”
রেজা অপরাধীর চোখে তাকালো। আরাধ্য তার অনুমতির আশা না করেই বললো , “৫০ হাজার বাঁধেন কাজি সাহেব।”

পাশ থেকে কে জানি বলল , “এতো কম দেনমোহর কেন ? আরো বাঁধেন ;
আরাধ্যের ঠান্ডা মাথা চটে যাচ্ছিলো। তখনি এক চিকন কন্ঠের উত্তর এলো।
-“দেনমোহর লাখ লাখ বাঁধলেই তো হবে না। পরিশোধের একটা ব্যাপার আছে। এইখানে ব্যবসা করা হবে না , কাজী সাহেব ২৫ হাজার বাঁধেন।”
উপস্থিত সকলে নিশ্চুপ। আরাধ্য মাথা উঁচু করে একবার ব‌উকে দেখো নিলো। পুরো রানী লাগছে , গলায় এক গাম্ভীর্য।

কাজী সাহেব দেন মোহর লিখলো। বিয়ে পড়নো শুরু হলো,
একপর্যায়ে কাজী সাহেব রেজার দিকে তাকালেন তাকে কবুল বলতে বলা হলো ,
রেজা মাথা নিচু রেখে কবুল বললো। সাথে সাথে সকলে আলহামদুলিল্লাহ পড়লো। এবার রাইসার পালা , তাকে কবুল বলতে বলা হচ্ছে। পর পর কয়েকবার বলা হয়েছ, রাইসা থ মেরে বসা। দৃষ্টি মাটির দিকে তাকানো।
আরাধ্য কপাল কুঁচকে নেয় , “ এই শালি কবুল বলছো না কেনো। বিয়া করবা না করবা কি?”
উপস্থিত সকলের মাঝে আবারো ফিসফাস কানে বাজে , জহুরা বেগম দরজায় দাড়ানো। ইসমাইল শেখ বাড়ি ফিরেছে , তার এসবে কোনো মতবিরোধ নেই। ইফরাহ দৃষ্টি তখনো রাইসার উপর। তীক্ষ্ণ চাহনি রেখেছে তার উপর- আরাধ্য আবার ধমকালো ,

-“ধুর চেংড়ি , কান্দা বাদে কবুল কহেক। একখান ঝাল চকলেট দিম যা।”
কবুল বলার আগ মূহুর্তে রাইসা একবার ইফরাহর দিকে তাকলো। তারপর আরাধ্যের দিকে তাকাতেই আরাধ্য চোখে তাকে আসস্ত করলো। রাইসা মিনমিনিয়ে কবুল বললো। কাজি আলহামদুলিল্লাহ পড়ার আগেই আরাধ্য আলহামদুলিল্লাহ বলবো।
ইফরাহ চোখ বুজে নিঃশ্বাস ছাড়লো। বড্ড ক্লান্তি ঘিরে নিয়েছে তাকে। এক মিনিট আর অপেক্ষা না করে ছুটে চলে যায় অন্দরমহলে থেকে। রাইসার চোখ থেকে পানি ঝড়ছে , কলঙ্কের দড়ি গলায় পেঁচিয়ে নিয়েছে সে।
ইরফাদ জনে জনে খুরমা বিলি করলো। কাজী সাহেব চলে যেতেই , ধীরে ধীরে সবাই চলে গেলো।
রেণুর মা এসে , রাইসা কে নিচ তলার এক ঘরে নিয়ে গেলো।
আপতত অন্দরমহল ফাঁকা।‌ রেজা , ইরফাদ, আরাধ্য তিনজন মুখোমুখি বসা। আরাধ্য শান্ত চোখে পর্যবেক্ষণ করছে রেজাকে। গলার দাগ গুলো স্পষ্ট ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত বহন করছে। আরাধ্য ঝুকে টেবলি থেকে দুটো খুরমা তুলে মুখে পুরে নিলো। চিবতে চিবতে লাগলো। অন্দরমহলের ঘোর নীরবতা , এতো নীরবতার মাঝে হাঁসফাঁস করছে ইরফাদ। বেচারা বেশি সময় চুপচাপ থাকতে পারে না , পেটে মধ্যে কথা ঘোরপাক খাচ্ছিলো তার। একপর্যায় মুখ খুললো –

-“ভাই ভাবিরে ঘরে নিয়ে গেছে , আপনি যাবেন না?”
আরাধ্য একদম নিশ্চিন্তে খুরমা খাচ্ছে। আশেপাশের কিছুতেই তার খেয়াল নেই। তার ভাবটা এমন যেন কিছুই হয়নি।এটাই তো রেজার ভয় ! আরাধ্য কথা বললে , বোকা দিলে , রাগ দেখালে , রেজার শান্তি লাগে, বড্ড তৃপ্তি লাগে। অথচ আরাধ্য কথা বলেছে না। রেজার সহ্য হচ্ছে না , দ্রুত উঠে গিয়ে পা জোড়া আঁকড়ে ধরে আরাধ্যের। আরাধ্য একটুও অবাক হলো না। একটু নড়লো না অবদ্ধি , রেজার চোখের পানি আরাধ্যের পায়ে পড়ছে , তবুও পাষাণ লোকটা বিনা বাক্যে খুরমা খাচ্ছে এটাই তার এক মাত্র কাজ। রেজা বলল –
-“মাফ করেন ছোট নবাব ভুল করেছি; আল্লাহর দোহাই লাগে কথা বলেন। আপনার নিশ্চুপ থাকা আমাকে পুড়াচ্ছে।”
-জ্বলে , পুড়ে মরে যাহ!

আবারো মুখে একটা খুরমা পুরে নিলো আরাধ্য। রেজা আরো শক্ত করে পা দুটো চেপে ধরল! আরাধ্য বিরক্ত হলো,
-“ এই শালা পা ছাড়! ছাড় বলছি , নয়তো তোর পশ্চাৎ আগুনের ছ্যাকা দিয়ে জ্বালিয়ে ছাড়বো শালা। মাইয়া লোকের মতো ঢং মারাতে এসেছো তুমি।
রেজা নিশ্চুপে পা আঁকড়ে বসে থাকে। আরাধ্য কিছুটা কাত হয়ে আধশোয়া হয়। ইরফাদ একবার রেজা তো আরেকবার আরাধ্য দেখে। গলা খাঁকারি মারে , এরপর একপর্যায়ে বলে,
-“ব.. বলছিলাম কি ছোট নবাব ; এইবাবের মতো মাফ করে দেন রেজা ভাই রে। ভাই হুসে কিছু করে নাই , কাল‌ এক পেক মারছিলাম। তার প্রভাবেই উত্তেজিত হয় কামড়াকামড়ি ডা করছে।”
আরাধ্য ক্ষিপ্ত সিংহের মতো থাবা দিয়ে টেনে ধরে ইরফাদের কলার। বেচারা এক থাবায় হুস জ্ঞান হারিয়ে ফেলার উপক্রম। আরাধ্য তাকে টেনে এনে রেজার পাশে বসিয়ে সটান করে এক থাপ্পর লাগিয়ে দিলো। তারপর জিজ্ঞেস করল –

-“কহেক চেংড়া; কি জানি কবার লাগছিলো”
ইরফাদ ডানে বামে মাথা নাড়ায়। যার অর্থ কিছু না,
আরাধ্য বিজয়ের হাসি হাসলো। এ থাপ্পড় রেজার গালে মারলে একটু শান্তি পেতো। তবে মারবে না , ছেলেটা তার বড্ড আদরের। আরাধ্য চোখ বুজে নিশ্চুপ থাকলো অনেক্ষণ। তারপর গান ধরলো –

“জীবন দিলা কানচা বাঁশের খাচারির মতো;
যত্ন নেওয়া আগেই তাহা ভাঙ্গে অবিরত দয়াল
ভাঙ্গে অবিরত।
আমার ভাঙ্গা তরী ছেড়া পাল।
চলবে আর কত কাল।
ভাবি শুধু এক বসিয়া রে দয়াল ,
এভাবে আর চলবে কত কাল।”
আরাধ্য গান থামালো। শান্ত কন্ঠে ডাকলো , “ রুদ্রনীল”
রেজা দ্রুত উত্তর দিলো- “ জ্বি ছোট নবাব”

আরাধ্য উঠে বসলো। রেজা কে টেনে নিজের পাশে বসিয়ে কাঁধে হাতে রাখল। রেজা অবাক হলো , আরাধ্য এমন নয়। এমন শান্ত সে কবে হয়েছে জানা নেই। আরাধ্য বলল –
-“দায়িত্ব বেড়েছে তোর , এক পেট হতে দুই পেট হয়েছে।” এই দেখ , আমরা শালা পুরুষ লোক। পুরুষ মালের দায়িত্ব অনেক , আমরা আপন মানুষ মরলে কাঁদলে মানুষ বলে এইডা কেমন বেডা ছেলে। আবার না কাঁদলেও বলে , পাষাণ লোক। আমরা যেদিকে যাই থাপ খাই । ছ্যাহ জিন্দেগি শালার , কপালে থাপের উপরে সব শূন্য।
আর শূন্যের কখনো বিয়োগের ভয় নেই, আছে অশান্তি।

তবে, তবে- এতো অশান্তির মাঝের শান্তি কিন্তু ব‌উ। ব‌উ অর্থ সহধর্মিণী , ওই মাইয়াটাই জীবনের সব শান্তি। বেডা লোকের ব‌উয়ের যে তৃপ্তি তা কোথাও নাই! পুরো দুনিয়ায় নাই। ব‌উ রাগলেও শান্তি , না রাগলেও শান্তি , ব‌উ ত্যাড়া কথা ক‌ইলেও শান্তি , না ক‌ইলেই অশান্তি। আর ব‌উয়ের শান্তি হলাম আমরা পুরুষেরা।
আরাধ্য থামলো , রেজার হাত নিজের মুঠোতে নিয়ে বলল,
– “যেই জিনিসটা আইজ তোরে দেওয়া হ‌ইছে , ওইটা আমার ব‌উয়ের কলিজা। আমার ব‌উয়ের আদরের ননির পুতুল , ও জিনিসের অযত্নে আমার ব‌উয়ের চোখে পানি আসবে। আর আমার সহধর্মিণীর চোখের পানি আমি সহ্য করবো না। তাই আমার বোনের দায়িত্ব আজ থেকে তোর , তোর আমানত। জীবন গেলেও ওই শালির চোখে পানি আসতে দেওয়া যাবে না।

রেজা তপ্ত শ্বাস ফেলে আরাধ্যের চোখে তাকায়। আরাধ্য হাত জোড়া শক্ত করে চেপে ধরে চুমু খায়;
-”আল্লাহ এক আর সর্বশক্তিমান ভাই; উপরে আল্লাহ আর নিচে আপনি এই দুই আমার মালিক। আপনার জন্যে আমার জান কুরবান। তবুও ব‌উ রানীর আমানত আমি এই গায়ের এক বিন্দু রক্ত থাকতে নষ্ট করবো না ছোট নবাব।”
ভরসা রাখেন।
আরাধ্য শান্তি পেলো বোধ হয়। রেজা কে হাত ইশারায় চলে যেতে বললো। ইরফাদ খানিকের জন্য ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিল। রেজা যেতেই আরাধ্যের পায়ের কাছে আবার এসে বসলো। আরাধ্য ছেলেটাকে দেখে নিয়ে ডাকল-

-”ইয়াদ ;
-“জ্বি ছোট নবাব!”
আরাধ্য হাসলো। ছেলেটা একবার ভাই , একবার ছোট নবাব ডাকে। হাসি থামিয়ে বলল , “ বিয়ে করতে ইচ্ছে করলে বলবি। বিয়ে দিবো , এই শামসির পুতের মতো কামড়াকামড়ি দেখলে কেটে করতোয়ায় মাছের আহারে দিবো”।
-“জ্বি ছোট নবাব।”
আরাধ্য বলল “ বন্দিদের আহার করানো হয়েছে , ইয়াদ”
-“জ্বি ছোট নবাব , লগে আরেকটা খবর আছে।”
-”হুম!

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৭

-খন্দকারে দুই পোলা কিন্তু আপতত আমাগো পিছনে পড়বো ছোট নবাব। নির্বাচন সামনে , বড্ড একটা প্লান করতে হ‌ইবো। পুলিশের তীর কিন্তু আমাগো উপ্রে ফালাইবো।
আরাধ্য শুনলো সব। মনোযোগ দিয়ে সব শুনে ইরফাদ কে বিদায় দিলো। ইরফাদ চলে গেলো , আরাধ্য একাকী কিছুটা সময় কাটাতে চোখ বুঝে শুয়ে থাকলো।

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৯