ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪০ (২)
জান্নাত চৌধুরী
সকালে বেড়িয়ে রাতে ফিরল আরাধ্য , ইফরাহ তখন গভীর ঘুমের। গায়ের উপর কাথা ঢাকা নিয়ে শুয়ে আছে। বিছানার পাশের ঔষধের পাতা গুলো রাখা। ইরফাদ কে দিয়ে ঔষধ পাঠিয়েছিলো। খেয়েছে হয়তো ? আরাধ্য এসে মাথার কাছে বসলো ইফরাহর! মেয়েটার মুখটা ফ্যাকাসে লাগছে। কিছু সময় তাকিয়ে থেকে উঠে দাড়ালো। ড্রেসিং টেবিলের কাছে এসে তার অস্ত্রে কারখানা থেকে চাপাতি জাতীয় কিছু একটা বের করে উল্টে পাল্টে দেখলো।
ধারালো অস্ত্র বাতির আলোতে চকচক করেছে। সে এক ধ্যানে তাকিয়ে থেকে দেখলো , চাপাতির উজ্জ্বলতা।
তারপর বেড়িয়ে গেলো ঘর ছেড়ে। যাবার আগে আগে আরো একবার এসেছিল ঘুমন্ত ইফরাহর কাছে। চুমু খেয়ে গিয়েছে কপালে।
চিলেকোঠার ঘরে এলো আরাধ্য , এ ঘরে এক গোপন সুরঙ্গ আছে , আরাধ্য ঘরের পূর্ব কোণের দিকে গিয়ে কার্পেট সরালো.. বড় এক কাঠ চাপা দিয়ে , তার উপর কার্পেট বিছানো রয়েছে। বাহির থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এটা যে কালকুঠুরি পথে যাওয়া আরো এক রাস্তা। আরাধ্য সিঁড়ি বেয়েই নামছে , অন্ধকার আচ্ছন্ন সব কিছু। তবে এ পথে হাঁটতে সমস্যা হয়না তার। ধীরে ধীরে নিচে নেমে , মাটি পথে হেটে কুঠুরিতে এসে থামলো সে।
চাপাতির গায়ে হাতে বুলাতে বুলাতে এসে বসল। শান্ত দৃষ্টিতে চাপাতি টা দেখছে। রেজা বলল , “ আজ স্বীকার কে ছোট নবাব!”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আরাধ্য একবার দেখলো রেজাকে পরক্ষনেই , আবারো চাপাতির দিকে তাকিয়ে বলল , “ক্যাপ্টেন সাহেবের কেচ্ছা টাই নাহয় আজ খতম করা যাক। বেচারা অনেকদিনের অতিথি।”
রেজা লুঙ্গি কাছা দিয়ে বলল , “ বহু দিন বেডারে পালা হলো! শালা শুয়োরের সেবা যত্ন করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছি।”
আরাধ্য বাঁকা হাসল , বেইমানের বেঁচে থাকা বিপদজ্জনক। মুখোশের আড়ালে লুকায়িত শয়তানের বেঁচে থাকা পাপ। আরাধ্যের ভাষ্যমতে তার আদালতের বিচারক সে। এই আদালতে , অন্যায়ের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
রেজা বলল , “ শিকার আনবো নাকি আপনি যাবেন ছোট নবাব”।
আরাধ্য উঠে দাড়ালো , চাপাতি রেজার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে। গটগট করে হেটে গেলো বর্বরতা চালানো সেই ঘর খানায়। আরাধ্য ঘরে প্রবেশ করতেই দরজা লক করে রেজা নিজেও ঢুকে পড়লো। আরাধ্য গিয়ে রাজকীয় এক চেয়ারে আরাম করে বসলো। কালো রঙ্গের শার্টের বুকে বোতাম খানা খুলে দিয়ে কলার আগলা করে দিয়ে ভাব ধরলো।
পুরো ঘরে বন্দি আর তিনজন রয়েছে। এর মধ্যে দুজন হলো-একজন আর্মি ক্যাপ্টেন অপর জন এক পুলিশ কর্মকর্তা। দুজনেই প্রায় যুবক বললেই চলে। তবে বর্তমান অবস্থা তাদের ভীষণ করুণ। অপর একজন ব্যবসায়ীক পার্টনার;
রেজা দুটো লোককে এনে ফেললো আরাধ্যের পায়ের কাছে। নেতিয়ে গিয়েছে শরীর , হাতে আঙ্গুল গুলো কেটে নেওয়া হয়েছে বহু আগে। আঙ্গুল গুলো নেই , শরীর বিভিন্ন অংশে মাংস তুলে তুলে পোষা কুকুরের খাদ্য বানিয়েছে। আজ হাত জোর করে মাফ চাওয়ার কোনো উপায় নেই। ক্যাপ্টেন বসির কাঁদছেন , চোখের পানি স্পষ্ট নজরে এলো আরাধ্যের। আরাধ্য ঝুঁকে গিয়ে ডাকলো ,
-“বসির ভাই , ও বসির ভাই। দোয়া দরুদ পড়েন ভাই , মৃত্যু অতি সন্নিকটে আপনার।”
ক্যাপ্টেন বসির হাসল , “ এতো দিনের সাধনার আজ তবে সমাপ্তি ডেকেছিস। তা কখন কার্যকর হবে এই মৃত্যুদণ্ড।”
-“মরণের লাগি দেখছি বড্ড তারা আপনার। তা খোদার নিকট জবাবের প্রস্তুতি রেখেছেন তো?”
-”তুই সৃষ্টিকর্তা বিশ্বাস কবে থেকে শুরু করলি ভাই?”
আরাধ্য অলস ভঙ্গিতে গা এলিয়ে বলল , “ নাস্তিক নই আমি। তবে পাপী , আর পাপীর দোয়া সৃষ্টিকর্তা শুনে না। বুঝেছেন ভাই?
-“তোর পাপের খাতা পূর্ণ হবার দিন এসেছে ফারহান! এক চাকরি চূর্ত্য হয়ে কত পাপ করেছিস ভেবেছিস? অমানুষ হয়ে দাঁড়িয়েছিস;
-“অমানুষের কারিগর টা কে ভাই খুইলা বলেন তো। শুনি,শুনি।”
বসিরের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। আরাধ্য উচ্চস্বরে ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠলো। বসির তার দিকে চেয়ে থেকে বলল,
-“ দেখ ফারহান , মানছি তোর সাথে অন্যায় হয়েছি। আমি, নাজির ভুল করেছি। তার জন্য আমরা ক্ষমা প্রার্থী , আজ কতগুলো দিন এই কুঠুরি ঘরে বল তুই। বাহিরের আলো অবদ্ধি নজরে আসে না। মায়া কর ;
কিছু টা দম নিলো বসির। কয়েকবার ঢোক গিলে বললো,
“ ওইযে চেয়ে দেখ , নাজিরের দিকে দেখ। শরীর ভেঙ্গে পড়েছে, হাতের উপরের মাংস কেটে নিয়েছে তোর লোক। আমাদের আর কিছু নেই ফারহান। যেতে দে , আমরা একবার পরিবারের নিকট যেতে চাই। কথা দিচ্ছি এ কুঠুরির কথা কেউ জানবে না। কেউ না !
আরাধ্য চুপ থেকে শুনলো বসিরের সব মূল্যবান বক্তব্য। কিছু টা ভেবে ঝুঁকে গিয়ে হাঁটতে হাতের ভর রেখে শান্ত স্বরে বলল, “ চলেন একটা যুক্তিতে আসি ভাই। মানলে , আপনার মুক্তি সাথে অফিসারের ও।
বসিরের হয়তো কথাটা পছন্দ হলো। সে দ্রুত উত্তর করলো , “কি কাজ কী ফারহান বল, তবুও মুক্তি চাই।”
আরাধ্য আবারো আয়েশ করে বসলো। চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ দুটো বুজে , “ বর্ডারে মাল আটকে আছে বসির ভাই। দের কোটি টাকার মাল। আপনি আর অফিসার যদি সেই মাল আনে দিতে পারেন তবেই , মুক্তি আপনাদের।”
মুক্তির লোভে বসির বললো , “ এই তো সহজ কাজ , আমি যাবো মাল আনতে। কবে যেতে হবে বল , বলনা ?
-”ধীরে ভাই ধীরে। কাম এতো সহজ হলে আমার ছেলেরা কবেই সপাটে মাল এনে ফেলতো। সেই মাল আমি এতো দিনে সাপ্লাই ও মেরে দিতাম।
আরাধ্য থামল! বসির হয়তো কথাটার অর্থ ঠিক বুঝলো না। সে প্রশ্ন করলো , “ মাল কে আটকাইছে?”
-“বিজিবি ;
বসির চমকালো , যে মাল বিজিবির হাতে ধরা পড়েছে সে জিনিস ফেরত আনা কেমনে সম্ভব। তবুও বলল , “ তোর কি মনে হয়, তোর মাল এখনো বর্ডারে আছে ?”
-“আছে!”
বসির হতাশার নিঃশ্বাস ছাড়লো , “ দেশদ্রোহী বানাতে চাইছিস?”
আরাধ্য দু’দিকে মাথা নাড়ালো, “ উহু”!
-“তবে ? ”
-আপনে ভাব এমন ধরছেন যেন আপনি দুধে ধোঁয়া তুলসি গাছ
বসির মলিন হাসলো। আরাধ্য বলল- “ মনে পড়ে ভাই? সেদিনের কথা , বেশি না এই যে মাত্র বছর তিন আগের কথা। কতটা চতুরতা খাঁটিয়ে আমার বদনাম করিয়ে ছাড়লেন!
বসির চেঁচিয়ে উঠল , “পাপ করেছি স্বীকার করেছি।আরে আল্লাহর কাছে হাজার বার মাফ চাইলেও তো আল্লাহ একবার না একবার মাফ করে।” তবে আমি তোর কাছে মাফ চাই ছি। ”
-“রাখেন তো আপনার এইসব ইমোশনের কথা। মালিকের কাছে নালিশ রাখেন আমার নামে। আমি পাপী , বলেন মালিক রে।”
পুলিশ অফিসার নাজির কথা বলেনা। জিহ্বা কেটে নেওয়া হয়েছে তার। আরাধ্য অফিসার কে দেখে বলল , “ কী অফিসার স্বীকারোক্তি দেন , দেন না। সেদিনের মতো মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেন। কি হইলো দেন!
নাজির কাঁদছে। আরাধ্য আবার বলল , “ মিথ্যাচার করেছেন আপনারা। দেশদ্রোহী আপনারা , দেশের সম্পদ আপনারা বিদেশে পাচার করতেন। বহিরাগত দেশের কাছে নিজেদের বিক্রয় করেছেন ছ্যাহ। অথচ , পুরো দুনিয়ায় জানলো দেশদ্রোহী আমি।
বসির কথা বলছে না। আরাধ্য হাত বাড়িয়ে চাপাতি টাহ হাতে নিলো। রেজার দিকে ইশারা করতেই , সে এসে চেপে ধরলো বসিরের হাত। আরাধ্য বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো , বসে খুন করে মজা নেই। ঠিক মতো এক কোপে মন্ডুটা ফালানো যাবে না। বসির ছটপট করে বলছে ,
-“ফারহান দেখ , এসব ধর্মে সইবে না। তুই পাপ করছিস , দিনের পর দিন মানুষ খুন করছিস। এসব আল্লাহ সহ্য করবে না। ছেড়ে দে আমাকে।
তুই পিশাচ তো না।
আরাধ্য আঙ্গুলে কান চুলকে নিলো , ধারালো চাপাতির উপর এক দোলা থুতু দিয়ে আঙ্গুলে ধারের জায়গায় মালিশ করলো। এরপর বসিরের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল ,
-“ওপারে ভালো থাকবেন ভাই।”
বসির শুষ্ক ঢোক গিলে নেবার আগেই আরাধ্য এক কোপ বসালো বসিরের মন্ডু সই। ছিটকে কিছুটা রক্ত গিয়ে পড়লো রেজার মুখে। বসির জবাই দেওয়া মুরগির মতো ছটফট করছে। এতেই ক্ষান্ত হলো না আরাধ্য পরপর কয়েকবার কোপ দিলো একই স্থানে। মন্ডুটা ঘাড় ছেড়ে পড়েই যাচ্ছিলো তবুও যেন একটু খানি ঝুলন্ত রয়েছে। এবার শেষ কোপটা দিয়ে ধর থেকে মন্ডু আলাদা করলো। এই বর্বরতায় অনেক আগেই চেতনা হারিয়েছে নাজির। রেজা বসিরের দেহটাকে বেশ যত্নে শুইয়ে দিলো। আরাধ্য চাপাতি টা রেজার দিকে এগিয়ে দিলো। রেজা ওটাকে রেখে ছোট এক মাল্টি কুরাল এনে দিলো।
আরাধ্য কুড়াল হাতে লাশের পাশে বসলো। এরপর ঠিক বুকের মাঝে কুড়ালের কয়েক কোপ ঠুকলো। রেজা শান্ত চোখে এক বদ্ধ উন্মাদের কাজ দেখছে। আরাধ্য উন্মাদ; রক্তের ঘ্রাণ নাকে আসা মাত্রই এক পৈশাচিক সত্ত্বা জেগে ওঠে তার। রেজা নিষ্পল চাহনিতে দেখেছে , তার চোখে ভয় নেই। আরাধ্য বুক ফেরে কলিজা বের করে আনতেই রেজা ওয়েট মেশিন এগিয়ে দিলো। আরাধ্য বসিরের কলিজা ওজন করে এক পাশে রাখলো। এর শরীরের সব দরকারি বস্তু যেমন হার্ট, কিডনি , প্রতিটি জিনিস স্ব যত্নে দেহ থেকে আলাদা করে নিলো।
রেজা এক এক করে প্রতিটি জিনিস ছোট ছোট প্যাকেটে তুলছে। এদিকে আরাধ্য দক্ষ কসাইয়ের মতো দেহের মাংস টুকরো টুকরো করছে। বসিরের দেহের মাংসের কতশত টুকরো হয়েছে এসবের হিসাব আরাধ্যের নেই। রেজার প্যাকেজিং হতেই ঘরের কোণ থেকে বড় এক বালতি নিয়ে এলো। আজ আবারো কুঠুরি ঘরে স্বাদের রান্না হবে খিচুড়ি রান্না হবে। এরপর এই খিচুড়ি বিলানো হবে পড়ার অভুক্ত কুকুরদের মাঝে। ভোজন হবে আজ ;
রেজা টুকরো মাংসের অর্ধেক বালতিতে ভরলো। বাকি যা অবশিষ্ট রইলো আরাধ্য তাতে এসিড তরল ঢেলে দিতেই গলতে শুরু করলো সাথে বিকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো ঘরের সর্বত্র। বড় বড় নিঃশ্বাসে নেশা গ্রস্থের মতো গন্ধ শুঁকতে লাগলো আরাধ্য। মাংস ঝলসানোর গন্ধ তার ভীষণ প্রিয়। এই ঘরে কোনো স্বাভাবিক মানুষ হলে হয়তো গন্ধে উগলি আসতো , বমি করে ভাসিয়ে ফেলতো। তবে এই মানব দুজন যেন তাদের নেশা দ্রব্য হিসেবে এই গন্ধটা শুকছে। মাতাল যেমন মদের ঘ্রাণে তৃপ্ত হয়। তারা দুজনেই ঝলসানো মাংসের গন্ধে তৃপ্ত।
আরাধ্য উঠে দাড়ালো , পুরো শরীর জুড়ে তখন শুধু রক্তের মাখামাখি। চোখে মুখে রক্তের ফোঁটা ফোঁটা দাগ;সে বেড়িয়ে গেলো ঘরে থেকে। রেজাও মাংসের বালতি হাত করে ঘর ছেড়ে বের হলো। আরাধ্যের চেহারা গম্ভীর লাগছে , রেজা এই জিনিসটা বারবার খেয়াল করে প্রতিবার যখন আরাধ্য কাউকে খুন করে তার চেহারা গম্ভীর হয়ে ওঠে। কারণ টা রেজার অজানা নয় , নরম ভদ্র এক ছেলের আজ কসাইয়ের মতো মানুষ কাটছে। রেজার আফসোসে মুখ ছোট হয়ে আসে , কী দিয়েছে এই সমাজ আমাদের।
ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪০
আরাধ্য কুঠুরি ঘরের বড় ঘরখানায় এসে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়লো। হাপাচ্ছে সে , চোখ বুজে কয়েকবার বড় বড় নিঃশ্বাস টানলো। রেজা এক বালতি পানি এনে বিছানার কাছে রাখলো।
সে হাতমুখ ধুয়েছে। মুখে লেগে থাকা রক্ত তরল গুলো এখন আর নেই। পানি রেখে সাবান আর এক তোয়ালে এনে সে ডাকলো , “ ছোট নবাব’
আরাধ্য উঠে বসলো। রেজার হাতে থেকে সাবান নিয়ে রক্তাক্ত হাতে মাখল , মুখে মাখল। এরপর হালকা কুসুম গরম পানিতে হাত মুখ ধুয়ে নিলো।
