Home ছায়াস্পর্শ ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৪ (২)

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৪ (২)

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৪ (২)
জান্নাত চৌধুরী

“খেয়ে নাও প্রিয়তমা, আপনাকে মারতে আমার বড্ড কষ্ট হয়!”
তীক্ষ্ণ এক চাহনিতে তাকালো ইফরাহ। ভাতের লোকমার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য করে হেসে বললো , “ পাগলের সুখ মনে মনে প্রবাদ নিশ্চয়ই শুনেছেন? আপনার কাজ কর্মের ফল স্বরূপ আপাকে পাগলের উপাধি দেওয়া আমার ভুল বলে মনে হয়না।”

-অনেক তো বললেন, এবার খেয়ে নিন।
-খেতে ইচ্ছুক ন‌ই আমি। ছোট নবাব আসার আগেই এই নাটক বন্ধ করুন। নয়তো …!
ভাতের প্লেট নামিয়ে রাখলো উড়ান। আরো কিছু এগিয়ে এসে বসে বলল , “নয়তো কি প্রিয়তমা ?”
-নয়তো আপনার কলিজা ছিড়ে শেয়াল কুকুর কে খাওয়াবেন উনি।
উড়ান হয়তো কোনো কৌতুক শুনলো। ইফরাহর রাগান্বিত স্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলা কথাগুলোতে বিন্দুমাত্র ভয় কাজ করলো তার ভেতর হাত উঁচিয়ে ইফরাহ গাল স্পর্শ করতে নিলেই। ইফরাহ কড়া গলায় ধমকে উঠলো , “ এ দুঃসাহস করবেন না ছোট খন্দকার। ভুলে যাবেন না আমি অবলা নারী ন‌ই , এর প্রমাণ ইতোমধ্যে আপনি পেয়েছেন।”
উড়ান চট করে হেসে ফেলল, “ আপনি তেজস্বী তা অজনা নয়। তবে আপনি সাহসী নন! ”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-ভুল ধারণা পুষছেন;
-বলছেন ?
ইফরাহ কিছুটা ঝুকে চোখে চোখ রেখে বললো , “চোখের সামনে কারো জান নিয়ে, সেই লোকের তাজা রক্তে পিপাসা নিবারণ করার ক্ষমতা যে নারী রাখে। তাকে অন্তত এতো সহজ ভাববেন না। ”
-“তবে এতো সময় কেনো লাগছে , ওই আপনার প্রতিশোধ সম্পূর্ণ করতে। আপনি জানেন তো না , আপনার আম্মাজানের আত্মার শান্তি দিতে হলে মীর পরিবারের ধ্বংসের প্রয়োজন। আব্বাজান তো আপনাকে বলছে কতটা , ঠিক কতটা নির্মম মৃত্যু দিয়েছে সে পরিবার আপনার আম্মাকে।”
ইফরাহ একটু চুপ থেকে বলল, “প্রতিশোধ আমার অথচ, চিন্তিত আপনি। ফায়দা কী ছোট খন্দকার? শুধুই কি এই রাজনীতি, নাকি ব্যতিক্রম কিছু?
উড়ান একটু দমে গেলো। চুপ থেকে বলল , “ব্যতিক্রম কোনো কারণ নেই। তবে কারণ একটা রয়েছে। বুঝলে সরল সমীকরণের মতো, আর না বুঝলেই কঠিন।

-বরফ কঠিনের পদবী বহন করলেও গলে কিন্তু তরলেই রুপান্তরিত হয়। তাহলেই বুঝেন কঠিন জীবনের গঠন কিন্তু নরম থেকেই হয়!
উড়ান থেমে থেকে বলল, “ আমি আপনাকে ভালোবাসি প্রিয়তমা।”
-যেহেতু ভালোবাসা স্বাভাবিক সংকলন। কখন কিভাবে হয়ে যায় ইহার কোনো ব্যাখ্যা নেই।তাই আমি মতামত প্রকাশ করলাম না।
-আপনার মতের যথেষ্ট প্রয়োজনীয়তা রয়েছে প্রিয়তমা। নয়তো আপনাকে পাওয়া আমার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে;
ইফরাহ চমৎকার হাসলো , “ আমার মতামত ছাড়াই যখন আমাকে পাওয়া আপনার জন্য কঠিন। তবে বুঝে নিন , আমি মতামত দিলেই আমাকে পাওয়া অসম্ভব। ”
উড়ান ব্যথাতুর হাসল , “তবে কী বুঝবো আমার প্রিয়তমা ঘর বন্দী হয়েছে, ভালোবেসে ফেলেছে তাকে?

-“আপনি ভাবতেই পারেন , এতে আমি মত প্রকাশ করছি না।”
ইফরাহ উঠে দাড়ালো, ঘরের কোণে রাখা মর্শাল গুলো থেকে একটা হাতে নিলো। হারিকেনের কাছে এসে তাতে আগুন দিয়ে অবশিষ্ট তিন মর্শালে আলো দিলো। অন্ধকার ঘর আলোকিত হয়ে উঠলো। আগুন হলুদ আলোতে চেহারায় এক অদ্ভুত আকর্ষণ করেছে ইফরাহ। উড়ান বসা ছেড়ে একটু একটু এসে দাড়ালো ইফরাহর সামনে ,
-কতখানি মায়া জোড়ানো এই সাদা মণির চোখ?
ইফরাহ তাকাল, “ এ চোখের দৃষ্টিতে কেবল বিষের চাষ হয়! যেই বিষের তীব্রতা মারাত্মক। মৃত্যু হবে ;

-বলছেন ?
ইফরাহ মর্শাল রেখে বলল , “ বলছি। ”
উড়ান হতাশা নিঃশ্বাস ফেললো। ইফরাহ আবারো বলল , “যেতে দিন! বিপদ বাড়াবেন না !”
-তোমার যাওয়া হবে না মেয়ে। এ আশা মন থেকে মুছে ফেলো।
আবারো বদ্ধ দরজা খুলে কেউ প্রবেশ করেছে ঘরে। উড়াল ইফরাহ দুজ‌নই উল্টো ঘুরে আগমনী লোকটিকে দেখলো।‌ উড়ান একটু অবাকের সাথেই বলল‌, ”ভাইজান তুমিইই ?

সকাল ১০ টা‌ নাগাদ থানায় আসলো কাব্য। ঘুম জাগা চোখ দুটো লালচে হয়ে থাকলেও সাজগোজ ফিটফাট।কাব্য এসে বসল , টেবিলের উপর নীলের রঙের দুটো ফাইল রাখা। সেদিকে খেয়াল না দিয়ে কনস্টেবল ডেকে কড়া লিকারের এক খাপ চা দিতে বলল।
চা আসার ফাঁকে জেলের দিকে এগিয়ে যায় কাব্য। রেজা কে দেখা প্রয়োজন । কাব্য এগিয়ে এলো জেলের দিকে , যথা স্থানে এসেই অবাক হয় সে‌। বেধড়ক মারা হয়েছে রেজাকে, দেখেই বোঝা যাচ্ছে কাল সারারাত কঠিনতম নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে ছেলেটি। কাব্য জেলের ভেতরে প্রবেশ করলো। চেয়ারে সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে রেজাকে। ছেলেটা জ্ঞান হারিয়েছে হয়তো? কাব্যের চোখ যেন ঝাপসা সাথে হয়ে আসছে। মেঝেতে রক্ত পড়ে রয়েছে , কাব্য আস্তে করে চোখ বুজে কল্পনা করতে লাগলো। কেউ বারবার আঘাত করছে রেজাকে , রেজা গলগল করে রক্ত বমি করছে;

দুই স্থানে রক্তের দাগ, কাব্য আন্দাজ করলো রেজা বার দুয়েক বমি করেছে। হাতের বাঁধা স্থানে গাঢ় করেই রশির দাগ বসেছে। কাব্য অনুভব করলো ঠিক কতটা কষা করে বেঁধে রাখা হয়েছে তাকে।
ঠোঁটের কাছে রক্ত শুকিয়ে আছে। কাব্য আবারো চোখ বুঝে ভাবলো, কেউ জোড়ে জোড় থাপ্পড় মেরেছে রেজাকে।
গলার কাছে আঁচড়ের দাগ , কেউ কি গলাটা চেপে ধরেছিলো। হবে হয়তো ? হাতের কাছের দাগগুলো এড়িয়ে যেতে পারলো না কাব্যের চোখ। কেউ বেল্ট জাতীয় কিছু একটা দিয়ে পিটিয়েছে, যার ফল স্বরূপ হাতের ভিন্ন অংশের চামড়া কালো হয়েছে‌। রেজার পড়নে এক কালো স্যান্ডো গেঞ্জি পিঠের উন্মুক্ত স্থানের দাগ গুলো দেখেই গাল শুকিয়ে আসে কাব্যের। কাব্য একবার ছুঁয়ে দেখতে চাইলো আঘাতে স্থান গুলো। করলো তাই কাঁপা কাঁপা হাতে ছুঁয়ে দিলো! একটু খানি কেঁপে উঠলো রেজা শরীর টা;

কাব্যে দ্রুত হাত সরিয়ে নিলো। একটু সময় বাদে আবারো অপর এক ক্ষত স্থানে হাত ছুঁয়ে দিলো। রেজা স্বজাগ হলো, ব্যথাতুর কেটে যাওয়া স্থানে শীতল হাতে স্পর্শ জ্বালা ধরিয়েছে। রেজা চোখ কুঁচকে বলল ,
-বড় লেগেছে অফিসার , এবারো কি ক্ষত দেখে নিশ্চিত হয়ে আবারো আঘাতের পরিকল্পনা করছেন?
খানিক দম নিয়ে শুষ্ক ঢোক গিললো রেজা , “ যত‌ই আঘাত করুন দাঁতের ফাঁস গলিয়ে একটিও শব্দ বের হবেনা আমার।”
কাব্য আরেক দফা চমকিত হলো রেজার কথায়। রেজা আবার বলল ,
“ আমার লাশ দাফনের সুযোগ দিয়েন ছোট নবাব কে। উনি ব্যতিত আমার কেউ নেই। ”
কাব্য দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো বেশিক্ষণ। একবার সামনে এসে দৃষ্টি মেলায় না রেজার ভয়হীন আঁখি জোড়ায়। দ্রুত স্থান ত্যাগ করলো।
রেজা কাব্যের পালিয়ে যাওয়া দেখে উচ্চশব্দে হেসে উঠলো। ব্যথাতুর শরীর রসিকতায় গাইলো ,

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৪

নিথুয়া পাথারে নেমেছি বন্ধু রে,
ধরো বন্ধু আমার কেহ নাই। (২)
তোলো বন্ধু আমার কেহ নাই।
চিকন ও থুতি খানি পড়িতে না জানি,
না জানি বান্ধিতে কেশ। (২)
নিথুয়া পাথারে নেমেছি বন্ধুরে,
ধরো বন্ধু আমার কেহ নাই। (২)
তোলো বন্ধু আমার কেহ নাই।
অল্প বয়সে পিরিতি করিয়া ,
হয়ে গেলো জীবনের শেষ। (২)
নিথুয়া পাথারে নেমেছি বন্ধুরে,
ধরো বন্ধু আমার কেহ নাই। (২)
তোলো বন্ধু আমার কেহ নাই।
রেজা থামলো। ক্লান্ত শরীরেই আবারো চেয়ারেই মাথা খান ঠেকিয়ে রাখলো।

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৫

1 COMMENT

  1. ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪৪(২)পর্যন্ত?
    আর পর্ব নাই কেন?

Comments are closed.