জাহানারা পর্ব ২০
জান্নাত মুন
সন্ধ্যা সাতটা বাজে। আজ সারাদিন রুমেই ছিলাম।তাই রুমে আর বসে থাকতে পারলাম না। আমি নিচে নামতেই ইমরানের সাথে দেখা। গতকাল রাজনৈতিক ঝামেলায় দুই দলের অনেক মা’রামারি হয়েছে। সেই সব ঝামেলার মধ্যে ইমরানও অনেক আ’ঘাত প্রাপ্ত হয়। তারপর থেকেই সেও আমার মতো অসুস্থ হয়ে যায়। আমাকে নিচে নামতে দেখে হেসে বলে,
–“কি ভাবি জান এখন কেমন আছেন?”
ইমরান অনেক মিশুক প্রকৃতির আর ভালো একটা ছেলে, ব্যবহারও অসাধারণ। এই চৌধুরী বাড়ির প্রতিটি মানুষ ভিষণই ভালো। শুধু ব্যতিক্রম ইফান চৌধুরী। আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয় নাবিলা চৌধুরী অন্য কোনো বেডার সাথে আকাম-কুকাম করে এই চরিত্রহী”নটাকে জন্ম দিয়েছে। না হলে আমার শ্বশুর মশাইয়ের মতো এত ভালো মানুষের সন্তান কুলা*ঙ্গার কিভাবে হয়? কাকাই আর শ্বশুর মশাই ও ড্রয়িং রুমে ছিলেন। ইমরানের কথায় উনারাও সিঁড়ির দিকে তাকালেন।
–“আরে বড় আম্মুজান এখন শরীর কেমন?”
ইকবাল চৌধুরী আমাকে বিয়ের পর থেকেই এই নামেই ডাকেন। উনি এভাবে যখনই ডাকেন তখনই আমার নিজের আব্বুর কথা মনে পড়ে যায়। আমার বাবা আমার উপর ভিষণ অভিমান করে আছেন। কেন এমন খা’রাপ লোককে শাস্তি না দিয়ে বিয়ে করলাম? তাই তো বিয়ের পর থেকে এখনো তার সাথে কথা হয় নি। এদিকে এগিয়ে এসে ইকবাল চৌধুরীর কথায় আমি হাসিমুখে উত্তর দিলাম,
–“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
ইকবাল চৌধুরী হেসে বললেন,
–“ফি আমানিল্লাহ। অসুস্থ শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে না থেকে এখানে এসে বস।”
আমি এগিয়ে গিয়ে ইতি আর ইমরানের পাশে সোফায় বসলাম। ইমরান বলল,
–“আপনাকে দেখে এখনো সিক লাগছে।”
আমি ইমরানের দিকে তাকিয়ে তারপর হেসে উত্তর দিলাম,
–“আমার মতো মেয়েরা কখনো দু”র্বল হয় না দেবরজি। আমাদের নিরবতা প্রলয়ঙ্কারী ঝড় তুলার পূর্বাভাস। কখন যে বিনা বার্তায় হানা দিই তা সকলের কল্পনার বাহিরে।”
–“যা বললেন ভাবি। আপনার উপর অঘাট বিশ্বাস আছে আমার। নাহলে কি আমার ভাইয়ের মতো সাংঘাতিক মানুষ কেও পোষ মানিয়ে ফেলেন।”
–“কি নিয়ে এত কথা হচ্ছে দেবর ভাবির মধ্যে আমিও শুনি।”
আমাদের কথাবার্তার মধ্যে কাকিয়া আর পলিও হাজির। কাকিয়ার হাতে ট্রে তাতে গরম গরম পকরা ভাজা। তিনি সবার সামনে টি-টেবিলে রেখে আমাদের পাশে বসলেন। সকলে একটা একটা পকরা হাতে তুলে নিই। আমি পকরায় একটা কামড় দিয়ে বললাম,
–“কি আর কথা বলবো কাকিয়া। এই ভালো মন্দেরই খোঁজ খবর নিচ্ছিলাম।”
কাকিমার সাথে কথা বলে আবার ইমরানের দিকে তাকালাম।
–“তো ভাই শুনলাম গতকাল নাকি বিরোধি দলের হাতে ধুলাই খেয়ে এসেছেন।”
–“ভাবি আর ল’জ্জা দিবেন না এসব বলে।”
ইমরান লাজুক হেসে উত্তর দিয়ে আমার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পলির দিকে তাকালো,
–“এই বউটাও হয়েছে পেট পাতলা। স্বামী ধুলাই খেয়েছে সেটা আবার ঢোল বাজিয়ে সবাই কে জানিয়ে দিয়েছে। ধুর ধুর প্রেস্টিজ আর কিছু বাকি রইলো না।”
ইমরানের কথায় সকলে হেসে দিয়েছে। পলি ইমরানের কথায় মুখ ঝামটি মেরে চোখ উল্টায়। এসব খুনসুটির মধ্যে ইকবাল চৌধুরীর গলা কানে আসে,
–“তো আম্মুজান, বিয়ের পর থেকে আমরাও কেউ তোমার পরিবারের সাথে কথা বলে দূরত্ব ঘুচাইনি। আর তোমার পরিবারও আমাদের সাথে যোগাযোগ করেনি। এভাবে আর কতদিন চলবে বল? তাই আমি ভাবছি আমিই না হয় ভাইসাবের সাথে কথা বলে ছেলের হয়ে আবার মাপ চেয়ে নিবো।”
ইকবাল চৌধুরীর কথার পিছে ইরহাম চৌধুরী বলে উঠলো ,
–“তুমি মা আমাদের ভুল বুঝ না। কি করবো বল? ছেলেটা এমন একটা জঘন্য কাজ করবে আমরা ভাবতেও পারি নি। আমরা ভিষণই ল’জ্জিত। তাই তো এখনো তোমার পরিবারের সাথে কথা বলার সাহস করে উঠতে পারি নি। না হলে ভাই এ নিয়ে আমাকে অনেক আগেই বলেছিল কথা বলতে। আমি লজ্জায় আর এগোতে পারি নি।”
আজ হঠাৎ এই বিষয় গুলো নিয়ে কথা উঠবে আমি ভাবতেও পারি নি। এই পরিস্থিতিটা ভিষণ অস্তিত্বকর আর ল’জ্জাজনক। উনারাও অনেক সংকোচ নিয়ে কথাগুলো বলছে। এই যে বারবার বলতে গিয়েও কেমন যেন দ্বিধা বোধ করছে।
–“আমি আর কি বলবো, আপনারা যা ভালো বুঝেন।”
–“ও এম জি আমাকে ছাড়ায় তোমরা ফ্যামেলি পার্টি করছ?”
আমার বাক্যটা শেষ হলো কি হলো না তার মধ্যেই নোহা এসে হাজির। আচমকা এসে ইমরান আর আমার মধ্যে ফাঁকা জায়গাটায় বসে পড়েছে। তরপরই এক হাত দিয়ে আমার আরেক হাত দিয়ে ইমরানের গলা জড়িয়ে ধরেছে। এতে ইমরান ক্ষিপ্ত না হলেও আমি ভীষণ বিরক্ত। এদিকে পলির চেহারাটাও বাংলার পাঁচের মতো হয়ে গেছে। নোহার বড় হওয়াটা লন্ডনে। তাই তার ব্যবহারও ঐ রকম বেহায়া টাইপের। গুরুজন কিছুই মানে না। আসার পর থেকে কিসব পোশাক পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর বেশি না ভেবে আমার উপর থেকে ওর হাতটা সরাতে সরাতে রেগে বললাম,
–“অসভ্য মেয়ে আমার উপর থেকে হাত সরাও।”
আমার রা’গের ধার ধরলো না মেয়েটা। বরং করে বসলো আরেকটা আচানক কান্ড। আমার বাক্য শেষ হতে না হতেই শব্দ করে আমার গালে চুমু খেয়ে বসলো। এতে আমার রাগ আরও বেড়ে গেছে। ঠাস করে আমার উপর থেকে হাতটা সরিয়ে উঠে দাঁড়ালাম।
–“বেয়াদব মেয়ে। আমাকে তুমি পুরুষ মানুষ পেয়েছ– যে ডলাডলি করে বেড়াবে।”
–“হেই প্রিটি গার্ল, What does it mean ডলাডলি।”
আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম _
–“আমার মাথা যত্তসব ফাউল।”
নোহার আগমনে সবাই প্রথমে খুশি হলেও আমার রেগে যাওয়ায় সবার মুখের হাসি নিভে যায়। এদিকে পলি বেশ মজা পেয়েছে তাই তো ঠোঁট টিপে হাসছে। কাকিয়া লতাকে সাহায্য করতে আবার রান্না ঘরে চলে গেলেন। সেখান থেকেও অবশ্য ড্রয়িং রুমে কি হচ্ছে না হচ্ছে সব দেখা যায়। ইকবাল চৌধুরী আর ইরহাম চৌধুরী ও নিজেদের মধ্যে দরকারী আলোচনা শুরু করেছেন। এদিকে নোহা পকরপকর করেই যাচ্ছে। এরই মাঝে ইমরানকে বলে,
–“ব্রো তুমি কি জান ইফান বেইবি কোথায়?”
নোহার কথা শুনে ইমরান আমার দিকে তাকালো,
–“তাই তো, ভাইয়াকে তো আজ সারাদিন দেখলাম না। বের হওয়ার আগে একবার দেখা করে গিয়েছিল। এর পর কি আর বাসায় আসে নি।”
ইমরান জানে না বুঝতে পেরে নোহা আমার সাথে আরও চেপে বসলো,
–“হেই গার্ল আমার ডার্লিং কে কোথায় লুকিয়ে রেখেছ?”
নোহার নেকামি আর গায়ে পড়া বিষয় টা আমার অসহ্য লাগছে। তাই রাগে দাঁতে দাঁত পিষে ফিসফিস করে বললাম,
–“আমার সা*উ*য়া’র চিপায় ভরে রেখেছি দেখতে পরছ না ?”
আমার বাক্য নোহার কানে যেতেই চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। সেও আশ্চর্য হয়ে আমার কাছে ফিসফিস করে জানতে চাইলো,
–ও এম জি where is সা*উ*য়ার চিপা? তুমি বেইবি কে সেখানে কেন লুকিয়ে রেখেছ? তুমি জান আমি কত মিস করছি ওকে? তাড়াতাড়ি বেবিকে বের করে নিয়ে আস।”
নোহার কথা শুনে রাগে মাথায় আগুন ধরে গেল। এই মেয়ে কি ধরনের আবাল বুঝতে পারছি না। রাগে মুখ দিয়ে “চ” বর্গীয় উচ্চারণ বেরিয়ে আসলো। সকলে আমার আর নোহার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। কারণ নোহা এমন ভাবে ফিসফিস করে বলেছে যা তিন মাইল দূর থেকেও মানুষ শুনতে পাবে। হঠাৎ আমার বায়োব্রেট করা ফোনটা বেজে উঠলো। আমি একবার ফোনের স্কিনে তাকিয়ে আরেকবার সকলকে দেখে কল রিসিভ করলাম।
–“হ্যালো!”
অপর প্রান্ত থেকে কি বললো তা আমি ছাড়া আর কেউ শুনতে পেলো না। তবে আমার বিরক্ত চেহারা টা হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আমি হাসিমুখে ফোনকলের অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে উত্তর করলাম,
–“ওয়াও ভেরি গুড নিউজ। শুনে অনেক খুশি হলাম।”
সবাই আমার হাস্যোজ্জ্বল চেহারার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি কাউকে খুশির কারণ শেয়ার করার প্রয়োজন মনে করলাম না। বরং উঠে দাড়িয়ে পড়লাম ,
–“স্কিউজ মি,আমি একটু আসছি।”
আমি সবাই কে বলে উপরে চলে যেতে লাগলাম। পেছন থেকে নোহা এখনো বলে যাচ্ছে তার বেবির খোঁজ দিয়ে যেতে। এই মেয়েটাকে দেখে আমার এখন যা মনে হচ্ছে ষাঁড়ের মতো খালি বড়ই হয়েছে বুদ্ধিশুদ্ধি বলতে কিছুই নেই মাথায়। যা আছে সবটাতে গোবর ভরা। আমি কয়েকটি সিঁড়ি ডিঙ্গাতেই কারো ফোন কলের শব্দ কানে আসে। আমি পেছনে ফিরতেই দেখি ইমরান ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরেছে। কে বা কেন ফোন করেছে সে সব কিছু জানি না। তবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ইমরানের মুখটা অন্ধকারে ছেয়ে গেছে ।
–“কি বললে? এটা কিভাবে হলো, আমি এক্ষুনি আসছি।”
ইমরান উচ্চ স্বরে কথা বলায় সকলে তার দিকে দৃষ্টি ঘুরায়। আমি এসবে নাক না গলিয়ে গটগট করে নিজের রুমে চলে গেলাম। এদিকে ইকবাল চৌধুরী আর ইরহাম চৌধুরী উৎসুক হয়ে ইমরানের উত্তেজিত হওয়ার কারণ জানতে চাইলো। ইমরান নিজের রুমের দিকে ছুটতে ছুটতে এটুকু বলে গেল,
–“আব্বু এখন কিছু বলার সময় নেই তাড়াতাড়ি বের হতে হবে। এসে সব বলবো,,”
গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার একটি এলাকা মাওনা। মাওনা চৌরাস্তা খুব বিখ্যাত, কারণ এটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক এবং শ্রীপুর-কালিয়াকৈর রোডের মিলনবিন্দু। এর আসে পাশে তৈরি হয়েছে অনেক নামি দামি টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস কোম্পানি। মাওনা চৌরাস্তা থেকে ভিতরে বাম দিকে পয়তাল্লিশ মিনিট গেলেই দেখা যায় পুরাতন একটা ফ্যাক্টরি। এই লোকেশনটা লোকালয় থেকে বেশ কিছুটা দূরে। এই ফ্যাক্টরিটা বর্তমানে বন্ধ হয়ে আছে। চারপাশ বাউন্ডারি করা, ফলে ভেতরে প্রবেশ করা সহজ ব্যপার নয়।এটা চৌধুরী বাড়ির পুরাতন একটা ফ্যাক্টরি। মেইন চৌরাস্তার পাশে নতুন করে নির্মাণ করায় এটাকে নতুন ফ্যাক্টরির গোডাউন ঘর হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে গত কয়েক বছর ধরে। এখনো এই গোডাউনে বেশ সিকিউরিটি প্লাস কিছু কর্মী মালামাল সাপ্লাইয়ে কর্মরত।
অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে এখানে আ’গুন ধরে যায় সন্ধ্যা সাতটার দিকে। আজ ইফান আর পঙ্কজ এসেছে এই ফ্যাক্টরিতে। তবে তারা ভেতরে প্রবেশের আগেই ধাও ধাও করে আগুন জ্বলে উঠে। কোনো মতে ভেতরের শ্রমিক রা বেরিয়ে এসেছে। পুরো ফ্যাক্টরিতে আগুন ছড়ানোর আগেই আগুন নিভাতে সক্ষম হয়। তবে যে অংশটা পুরেছে তাতেই যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। পঙ্কজ রাগে সকল শ্রমিকদের সাথে চেঁচামেচি করছে।অনেকের উপর হাতও তুলেছে। এদিকে ইফান নিষ্পলক ভাবে পুড়ে যাওয়া অংশের দিকে চেয়ে। ইফানের চুপচাপ থাকা পঙ্কজের রাগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
–“ব্রো 78 কোটি টাকার মাল আমাদের চোখের সামনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। আর তুমি স্টিল চুপ করে আছ। How,,!!”
–“তোর কি মনে হচ্ছে পঙ্কি? এমনি এমনি আগুন লেগে গেছে?”
–“I don’t understand anything. তোমার কি মনে হয়?”
–“মনে তো হচ্ছে কেউ ইচ্ছাকৃত লাগিয়েছে। নাহলে এত বড় গোডাউন, যেকোনো সাইডে লাগতে পারতো ঐ জায়গার মতো খালি রুমে কিভাবে লাগলো? I’m sure কেউ খবর পেয়ে গিয়েছিলো মালগুলো এখানে রেখেছি।”
–“যদি কেউ আগুন লাগিয়েও থাকে তাহলে বাইরের মানুষ হওয়া ইম্পসিবল। এই জায়গার আসে পাশে আসারও সাহস করে না কেউ। করলেও আমাদের লোকদের নজরে থাকে। তাহলে কিভাবে কি?”
তাদের কথার মাঝেই ইফানের গাড়ি এসে থামে। ইমরান এখানে আসায় পঙ্কজ আর ইফান দুজনেই একে অপরের দিকে চোখাচোখি করে। এই গোডাউন ঘর যে ইফান আর পঙ্কজ তাদের ইল্লিগাল কাজে ব্যবহার করে তা চৌধুরী বাড়ির আর কেউ জানে না। কিন্তু পারমিশন ছাড়া কে ইমরানকে জানালো? ইফান রাগে একবার সকল শ্রমিকদের দিকে তাকায়। শ্রমিকরা ভয়ে কেউ মুখ খুলে নি। এখানে ইফানের লোক আলাদা। তারা শুধু ড্রা*গস সহ নে’শার জিনিসগুলোকেই সাপ্লাই আর দেখাশোনা করে। তবে এখানে অনেক সাধারণ শ্রমিকও আছে। যারা সাধারণ কাজ করে। এসব বিষয়ে কিছুই জানে না। ওদের মধ্যেই হয়তো কেউ খবর দিয়েছে।
–“ভাইয়া তোমরা ঠিক আছ। গোডাউনের ভেতরের কেমন অবস্থা?”
সন্ধ্যায় খবর পেয়ে ইমরান ছুটে এসেছে উত্তরা থেকে। তাকে খবর দেওয়া হয়েছে ইফান আর পঙ্কজ ভেতরে আছে। তখনই আগুন লেগে গেছে। ইফান ইমরানের কাঁধে হাত রেখে বলে,
–“চিন্তার কিছু নেই সবকিছুই ঠিক আছে। তুই এই রাতে ছুটে আসতে গেলি কেন?”
–“আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম। যখন কল করে বললো তোমরা ভেতরে আর তখনই আগুন লেগে গেছে।”
ইমরানের কথা শুনে ইফান চেঁচিয়ে উঠলো,
–“এই কোন মাদার*বোর্ড ইমরানকে এই বাল ফালানির খবর দিয়েছে?”
ইফানের কথায় যে লোকটা খবর পাঠিয়েছে সে ঘামতে থাকে। ভয়ে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে সবার পিছন দিয়ে কেটে পরে। বেশ কিছু সময় পর ইফান আর পঙ্কজ স্থান ত্যাগ করে। তবে ইমরান থেকে যায়। কারণ এখানে কোম্পানির পুরনো অনেক দরকারী জিনিস আছে। সব ঠিকঠাক করে আগামীকাল আবার উত্তরা ফিরবে।
রাত বারোটা বাজে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ইফানের গাড়ি উত্তরার চৌরাস্তায় ঢুকে যাবে। ইফানের পারসোনাল ড্রাইভার ফারুক ড্রাইভিং করছে। ব্যাক সিটে বসে আছে ইফান আর পঙ্কজ। ইফান খুব মনযোগ দিয়ে ল্যাপটপ ঘাটছে। আর পঙ্কজ বসে বসে ড্রিংক করছে।
–“কিরে পঙ্কি লন্ডন কবে বেক করছিস?”
খুব মনযোগ দিয়ে আয়েশ করে ড্রিংকস করছিলো পঙ্কজ। ইফানের কথায় এদিকে তাকালো,
–“এখন আপাতত ফিরছিনা।”
–“কেন বিডিতে কি নতুন মধুর সন্ধান পেয়েছিস?”
ইফানের কথায় ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো পঙ্কজ। অতঃপর হেয়ালি করে জবাব দিলো,
–“শুধু মধু না পুরো মৌচাকেরই সন্ধান পেয়েছি। তাই মধু না খেয়ে বিডি ছাড়ছি না।”
পঙ্কির কথায় ল্যাপটপের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ওর দিকে তাকালো ইফান। জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলে ঠোঁট বাকিয়ে পঙ্কির কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
–“যাই কর বাপজান, আমার মৌচাকের মধু খেতে আসিস না। জিহ্বা কে”টে কু”ত্তা দিয়ে খাওয়াবো।”
এরপর দুজনেই হেসে দিলো। ফারুক মনযোগ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। ওদের গাড়িটা যখন চৌরাস্তায় উঠবে ঠিক তখনই একটা ট্রাক তাদের গাড়ির সামনে দিয়ে তেড়ে আসলো। ইফানের গাড়ি আর ট্রাকের দূরত্ব মাত্র এক মিটার তখনই কোনো মতে স্টিয়ারিং ঘুরালো ফারুক। তবুও ট্রাকের সাথে সংঘর্ষ থেকে নিজেদের গাড়িকে রক্ষা করতে পারলো না। ফলস্বরূপ গাড়িটার সকল কাচ ভেঙে আরেকটি দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের সাথে ধাক্কা খেলো। সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ জনগণ ভাংচুর মার্সিডিজ টাকে ঘিরে ধরলো। প্রথম ট্রাকের সাথে যখন ধাক্কা লাগে তখনই রক্তাক্ত হয়ে ফারুকের চোখ বুজে যায়। দ্বিতীয় ধাক্কায় পেছন সাইটটা ভালো ভাবেই ভেতরের দিকে ডেবে যায়।
রাস্তায় বড়সড় হাঙ্গামা বেঁধে গেছে। সকলে দাড়িয়ে থেকে চেচামেচি করে যাচ্ছে। কেউই এদিকে আসতে পারছে না। গাড়ির আসেপাশে ভাঙা কাচ পড়ে ফুল ফুটে আছে। এদিকে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের দুটো গাড়ি দুর্ঘটনার স্থানে অবস্থান নেয়। সাধারণ জনতাকে সরিয়ে বেরিকেড দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেয়। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর ভাঙচুর হওয়া গাড়ি থেকে এক এক করে দুটো র”ক্তাক্ত নিথর দেহকে বের করে সাথে সাথে এম্বুলেন্সে তুলে দেওয়া হয়। আরও কিছুক্ষণ চেষ্টার পর বের করে আনা হয় ইফানকে। এতক্ষণে সাংবাদিক রা নিউজ দিচ্ছিলো সাধারণভাবে। তবে জানতো না এটা ইফানের গাড়ি আর ভেতরে ইফান চৌধুরী আছে। মাথা ফেটে সারা দেহ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তবে তাকে চিনতে কারো দেরি হলো না।নিউজের সুর বদলে নতুন করে প্রচার করা হয়,
❝ব্রেকিং নিউজ। মন্ত্রী ইকবাল চৌধুরীর বড় ছেলে ইফান চৌধুরী সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত।অনেকক্ষণ চেষ্টার পর উনার নিথর দেহ বিধ্বস্ত গাড়ি থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। তবে অবস্থা শংকাজনক।❞
ইফানকে স্ট্রেচারে তুলা হয়। এখনো তার জ্ঞান কিছুটা আছে। আসেপাশে কোলাহল হচ্ছে তা শুনতে পারছে। একটা হাত স্ট্রেচার থেকে ঝুলে আছে। সেই হাতের ঘড়িটা ভেঙে কাচ হাতে ঢুকে গেছে। এই তো হালকা চোখগুলো খুলা। সে কি কাউকে খুঁজছে? কি জানি তার কানে আর কোনো শব্দ পৌঁছাতে পারছে না। চোখগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখনই তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো একটি তেজস্বী মুখ। হ্যা, এই তেজস্বী মুখটাকেই গতরাতে ভীষণ স্নিগ্ধ লাগছিলো। অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা হাসিটা ফুটে উঠলো। অ্যাম্বুলেন্সে উঠানোর আগ মূহুর্ত পর্যন্ত নিভু নিভু চোখগুলো নিয়ে অস্পষ্ট ভাবে বিরবির করলো,
জাহানারা পর্ব ১৯
–“Now I’m gonna be destroyed. Be happy.”
একটু থামলো। অতঃপর চোখগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে তখনই আবার মৃদু হাসার চেষ্টা করে, শেষ বারের মতো অস্পষ্ট ভাবে বিরবির করে আওড়ালো,
–“Goodbye.My Dear ফা*কিং বুলবুলি।”
