Home জোড়া পাতার দিনলিপি জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৩

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৩

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৩
তোনিমা খান

ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তথ্য অফিসে বা জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক নয়। বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পরিচয় ও তথ্য কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়। তালহার মুজাহিদ ও ঠিক এই নীতি অবলম্বনকারী এক কঠোর কর্মকর্তা।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরাটিতে পিনপতন নীরবতা। মেহমেদ চিন্তিত মুখে বলল,
“স্যার, আমার মনে হয় তারা আপনার কাছে খুব দ্রুত পৌঁছে যাবে। তারা তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। আর এটা অবশ্যই প্রাণঘাতী!”
মেহমেদের কথায় অপর একজন কর্মকর্তা একই চিন্তিত স্বরে বলল,

“কিন্তু এই কেসের কোথাও স্যারের নাম উল্লেখ নেই। কেউ কীভাবে স্যারের সন্ধান পাবে? কেউ জানে না এই কেসের প্রধান পরিচালক খিলজি স্যার নয় বরং তালহার স্যার।”
“আমি জানি না কীভাবে। কিন্তু আমার এটা মনে হচ্ছে। তারা তাদের সংযম ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। যেন সমস্যা বড় আকার ধারণ করার আগেই গোড়া থেকে উপরে ফেলা যায়। আর এটা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। ভূতত্ত্ববিদ আনোয়ার ফারুক যে আমাদের হয়ে কাজ করতেন এটা আমাদের ব্যতীত কেউ জানত না।”
মেহমেদ হাতের ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“স্যার, ভূতত্ত্ববিদ আনোয়ার ফারুকের ফরেন্সিক রিপোর্ট।”
অনবরত সিগারেটে সুখটান দিতে থাকা ব্যস্ত উদাসীন তালহার ফাইলটি নিলো না, এমনকি চোখ তুলেও দেখল না। পকেটে এক হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা সিনা আরো চওড়া হয়ে গেল চাপা ক্ষোভে। নাকমুখ থেকে ধোঁয়া বের করতে করতে থমথমে মুখে বলল,

“কোন ফরেন্সিক রিপোর্ট দেখার কথা বলছেন মেহমেদ? চার দিনের নির্মম নির্যাতনের পর সায়ানাইড খাইয়ে মেরে ফেলাকে যেই রিপোর্ট অবলীলায় কার এক্সিডেন্ট বলে চালিয়ে দিয়েছে?
মেহমেদের চোখে কোনো বেদনা কিংবা হতাশা দেখা গেল না। বলল,
“এটাই বছরের পর বছর ধরে হয়ে আসছে, স্যার। আর কেউ কিছু করতে পারছে না।”
“কিন্তু আর বেশিদিন এগুলো চলবে না মেহমেদ। তারা যেই পেনড্রাইভটির কারণে আনোয়ার স্যারকে মেরে ফেলেছেন সেই পেনড্রাইভটির একটি কপি অনেক আগেই আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। শুধু ওটা ডিক্রিপ্ট করতে হবে।”
তালহার একহাতে কপালে আঙুল ঘষতে ঘষতে বলল। উপস্থিত চারজন কর্মকর্তা চমকে উঠল। মেহমেদের চোখেমুখে আশ্চর্য আর খুশির রেশ ফুটে উঠল।
“স্যার, এটা কী সত্যি?”

“আমি আপনার সাথে সত্যি মিথ্যার খেলা নিশ্চয়ই খেলতে বসিনি, মেহমেদ?”
তালহারের রুক্ষ কণ্ঠে মেহমেদ নিজের বোকামি টের পেল। অপ্রস্তুত বলল,
“স্যরি স্যার! আমি আসলে খুশি ধরে রাখতে পারিনি।”
তালহার পকেট থেকে কালো একটি পেনড্রাইভ বের করে নিজের লকারে রাখতে রাখতে বলল,
“আমার হাতে কিছু কাজ আছে মেহমেদ। আপনাকে আমার সাথে যেতে হবে। আর পেনড্রাইভটা আমরা রাতে এসে ডিক্রিপ্ট করব।”
“ওকে স্যার।”
তালহার লকার লক করে চাবিটা নিজের হাতেই রাখল। আদেশের সুরে বলল,
“আপানারা নিজেদের কাজে ফিরে যেতে পারেন।”
তিনজন কর্মকর্তা বের হওয়ার জন্য পা বাড়ালেও মেহমেদ বের হলো না। বরং জড়তা নিয়ে তাকালো তালহারের দিকে। যে কি-না তখনো উন্মত্তের মতো সিগারেটে সুখটান দিয়ে যাচ্ছে। সে ইতস্ততা নিয়ে বলল,

“স্যার, আপনি কী বিরক্ত?”
তালহার মৃদু চমকালো। বলল,
“এমনটা কেন মনে হলো?”
“আসলে আমি তো আপনাকে কখনো সিগারেট খেতে দেখিনি।”
তালহারের দৃষ্টি স্থির হয় হাতে থাকা সিগারেটটির দিকে। বিন্দুর অ্যাজমা রয়েছে। সিগারেটের গন্ধ একদম সহ্য করতে পারে না।
সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
“উমম…হুম একটু।”
“Can I help you in any way, sir?”
তালহার স্মিত হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না। ছিল শুধু অনিশ্চয়তা। বলল,
“No one can help me, Mehmed, until I help me.”
“ওহ, ওকে স্যার। আমি আশা করব আপনি দ্রুতই নিজের সমস্যা সমাধান করে ফেলবেন। আসছি, স্যার।”
তালহার মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু যেতে যেতে সে দরজা লক করতে ভুলে গেল। চার ইঞ্চির মতো খোলা ওই দরজা থেকে আনায়াসে দেখা গেল তালহার ঠিক কোন জায়গায় তার লকারের চাবিটা রেখেছে।

তখন বিকাল সাড়ে পাঁচটা বাজে। কাজের নির্দিষ্ট সময়সীমা শেষ হওয়ায় অফিস দ্রুতই খালি হতে লাগল। আবার হয়তো গভীর রাতে সকলকে দেখা যাবে।
তালহার নিজের কাজ শেষ করে অফিস থেকে বের হয়ে মেহমেদকে নিয়ে বেরিয়ে গেল নিজের কাজের উদ্দেশ্যে। আর ঠিক এই সুযোগটির জন্য কেউ যেন মুখিয়ে ছিল। তালহারের গাড়িটা অফিসের গেট থেকে বেরিয়ে যেতেই একটি ক্ষতিকারক কীট দংশনে নেমে পড়ল। যেই ছোট ছোট ক্ষতিকারক কীটগুলো একটি বড় ক্ষতির কারণ হয়, একটি দেশের পঙ্গুত্বের কারণ হয়।
নিজের অফিসের ঠিক পাশের রেস্তোরাঁয় তালহার পায়ের উপর পা তুলে আরামে বসে সিগারেটে সুখটান দিতে ব্যস্ত। কিন্তু মেহমেদ! সে আরাম, স্থিরতা সব ভুলে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে টেবিলে রাখা ট্যাবটির দিকে। যেখানে তাদের জুনিয়র অফিসার নয়ন অতি সাবধানে তালহারের অফিসের তালা খুলে ঢুকছে।
সে হতভম্ব হয়ে বলল,

“স্যার এটা কী? নয়ন?”
তালহার ম্লান হেসে বলল,
“আপনি ঠিক বলেছিলেন মেহমেদ। তারা আমার অব্দি পৌঁছে গিয়েছে।”
“ইউ আর ইন রিস্ক স্যার। আর নয়ন এখন ওই পেনড্রাইভটাও নিয়ে নেবে। আমি অফিসের সকলকে এলার্ট করছি এখুনি।”
মেহমেদ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল। কিন্তু তালহার নির্বিকার।
“নাহ, এখনি নয়। আরেকটু দেখি তার প্রতারণা। ওই পেনড্রাইভে কিছুই নেই। আর না ভূতত্ত্ববিদ আনোয়ার ফারুক মৃত্যুর আগে আমায় কিছু দিয়ে গিয়েছে।”
এই পর্যায়ে মেহমেদ ভীষণ হতাশা অনুভব করল। সে মিইয়ে গেল। আজ চারমাস যাবৎ তারা এই কেসটির পেছনে লড়ছে। কোনো কেস সলভ করতে তাদের এত সময় লাগেনি।
নয়ন তখন তার লকারের চাবি বের করে লকার খুলতে ব্যস্ত। তালহার স্ক্রিন দেখতে দেখতেই বলল,

” নয়নের মতো মানুষদের বিবেক বুদ্ধিতে একটু ঘাটতি থাকে বলেই তারা দূর্নীতিবাজদের অতি পছন্দের তালিকায় শীর্ষে থাকে, মেহমেদ। নয়তো তারা কখনোই ওই দূর্নীতিবাজদের সহায়ক হতো না। আর না নয়ন আমার এই ফালতু ট্রিকসে এত সহজে পা দিতো। সে কী করে ভাবল, আমি এত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস চুরি করার জন্য এত সুযোগ তার জন্য ফেলে রেখে আসব?”
“এর জন্যই কী তখন আপনি আমায় আপনার রুমের দরজা খোলা রাখতে বলেছিলেন? যেন নয়ন দেখতে পারে আপনি লকারের চাবিটা ঠিক কোথায় রাখছেন?”
“হুম।”
“কিন্তু স্যার, আপনার রুমে তো কোনো ক্যামেরা ছিল না। তবে এগুলো কী?”
“আমার রুমে সাতটা ক্যামেরা রয়েছে, মেহমেদ। কিন্তু সেটা আমি কেন আপনাকে কিংবা অফিসের সকলকে বলব?”

তালহারের কণ্ঠে বেশ বিরক্তি ছিল। মেহমেদ এবার লজ্জিত হলো না বরং অভিভূত হলো। তারা সবাই এটাই জানত যে স্যারের রুমে কোনো ক্যামেরা নেই। ঠিক এই কারণেই নয়ন স্যারের রুমে ঢোকার দুঃসাহস করেছে।
“তারমানে নয়ন-ই ভূতত্ত্ববিদ আনোয়ার ফারুকের মৃত্যুর অন্যতম কারণ। হয়তো এই পর্যন্ত সে আমাদের ভেতরকার আরো অনেক তথ্য লিক করে দিয়েছে স্যার। এই কারণেই আমরা চারমাস যাবৎ এই কেসের কোনো সুরাহা করতে পারছি না। অথচ গভার্নমেন্ট থেকে আমাদের ছয় মাসের সময় দেয়া হয়েছে এই কেসের জন্য।”
“উঁহু, তারা আগে থেকে জানত না সবটা। বরং দেড়মাস আগে যখন খিলজি স্যার আনোয়ার স্যারকে নিয়ে দক্ষিণ উপকূলীয় অফশোর ব্লক-৭ গ্যাসক্ষেত্রের রিসার্চের জন্য গিয়েছিল তখন থেকে জানে। কিন্তু চিন্তা করবেন না মেহমেদ, আমরা ছয় মাসের ভেতরেই এই কেস সলভ করব।”
“এখন তবে আমাদের কী করা উচিত, স্যার?”
“তারা যেমন তাদের চূড়ান্ত পরিণতি নিশ্চিত করা শুরু করে দিয়েছে, আমরাও আমাদের চূড়ান্ত পরিণতি নিশ্চিত করা শুরু করে দেব। এবং অবশ্যই সেটা প্রাণঘাতী!”

পুরুষটির সরু নেত্রদ্বয় ঠিক শিকারী ধরার আগ মুহূর্তের ন্যায় প্রখর হয়ে উঠল। মেহমেদ মাথা নেড়ে সায় জানায়। এই চাকরিতে যেদিন নিজের নামের সাক্ষর দিয়েছিল সেদিন প্রাণের মায়াও ছেড়ে দিয়েছিল। তাই এই ভয়ঙ্কর শব্দগুলো তাদের মধ্যে কোনো উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে না।
তালহার সিগারেট এশট্রেতে পিষে ট্যাবটা হাতে নিলো। লকারের লক খুলে নয়ন তখন হতবাক হয়ে পড়েছিল। কারণ লকারের ভেতরে ছোট্ট একটা স্ক্রিন রয়েছে। যেখানে পাসওয়ার্ড চাচ্ছে। আরো একটা লকার? সে ভীষণ উদ্বিগ্নতার সাথে এলোমেলো কিছু টাইপ করছিল। তালহার স্মিত হেসে মাইক্রফোন অন করে বলল,
“নয়ন, আপনি তো লকারের পাসওয়ার্ড জানেন না। আমি কী বলে দেব? আপনার উপকার হতো মেবি।”
পাসওয়ার্ড টাইপ করতে থাকা নয়নের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। সে চমকে উঠে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। তালহার বলল,

“আমায় খুঁজে লাভ নেই নয়ন। কারণ আমি আপনার চারিপাশের প্রতিটা জায়গায় আছি। দরজার বাইরে অফিসাররা দাঁড়িয়ে আছে। চুপচাপ গিয়ে তাদের কাছে স্যারেন্ডার করে দিন নিজেকে।”
নয়ন জীবনের শেষ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক সর্বহারা গলা কাঁটা মুরগির মতো ছটফট করতে লাগলো ভয়ে। পালানোর কোনো পথ নেই কারণ দরজার সামনে চারজন কর্মকর্তা সরু নলাকার ধাতব অস্ত্র তাঅ করে দাঁড়িয়ে আছে তার দিকে।
তালহারের চোখেমুখে ফুটে উঠল ভয়ঙ্কর ক্রুরতা। কাউকে ফোন করে আদেশের সুরে বলল,
“গায়ে কোনো আঘাতের চিহ্ন যেন না বসে।”
ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা সাতটা। একটা প্যাকেট হাতে মেঘ ছুটতে ছুটতে রেস্তোরাঁয় ঢুকতেই দেখল তালহার মেহমেদ বসে আছে। তার মুখে প্রগাঢ় হাসির সাথে সাথে অনুতাপ ফুটে উঠল।
সে ছুটে গিয়ে বলল,
“তালহার, তুমি কতক্ষণ যাবৎ এখানে বসে আছো? আ’ম রিয়্যালি স্যরি। আসলে কেকটা পিক করতে গিয়ে দেরি হয়ে গিয়েছিল। হোমমেইড কেক তো। তুমি তো হোমমেইড খাবার ছাড়া খাওনা।”
মেঘ ভীষণ প্রফুল্লতার সাথে বলল। সে তখনো বুঝতে পারেনি হোমমেইড আর ওয়াইফ-মেইড এর মধ্যে থাকা সূক্ষ্ম দেখতে বৃহৎ পার্থক্যটি। আর না তালহারের বোঝানোর ক্ষমতা ছিল হোমমেইড আর ওয়াইফ-মেইড এর মধ্যে পার্থক্যটা।
তালহার থুতনিতে হাত ঠেকিয়ে সেদিকে চেয়ে রইল। তার চোখমুখ দেখে ধারণা করা যাচ্ছিল সম্মুখের দৃশ্যটি তার জন্য খুব একটা সুখকর নয়। যেটা মেহমেদ অনায়াসে বুঝে গেলেও মেঘ নাম চঞ্চল প্রাণবন্ত মেয়েটি বুঝতে পারল না।
তালহার কেকটি কেটেই ক্ষান্ত, এক চিমটিও মুখে তুলল না। মেঘ হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

“এটা তো হোমমেইড কেক তালহার।”
তালহার তখনো ঝিমানোর ভঙ্গিতে সোফার এক কিনারায় বসেছিল। থমথমে মুখে বলল,
“বারবার এক কথা বলতে ভালোলাগে না মেঘ। তোমার ট্রিট চাই, হিয়ার ইজ ইয়োর ট্রিট। তাড়াতাড়ি খাও, আমাদের কাজ আছে।”
তালহার টেবিল ভরতি খাবার দেখিয়ে বলল। যা মেহমেদ অতি সাগ্রহে খেয়ে চলেছে। কিন্তু মেঘ তো কখনোই খাওয়ার জন্য মুখিয়ে ছিল না। সে শুধুই তালহারের থেকে তার সময় চাইতো। সে মুখ ফুলিয়ে ফোন বের করে বলল,
“আচ্ছা, তবে আসো একটা ছবি তুলি।”
মেঘ ফোন নিয়ে তার গা ঘেঁষে বসতে গেলেই তালহার কঠিন স্বরে ধমকে উঠল,
“কতবার বলেছি গা ঘেঁষাঘেঁষি করবে না, মেঘ?”
“আমার গায়ে কোনো ছোঁয়াচে রোগ নেই তালহার। তুমি তো সেদিন ই আমার সাথে সুন্দর করে ছবি তুলেছো।”
“জোরপূর্বক। বাক্যটি সংশোধন করো মেঘ। তুমি হুট করে জোরপূর্বক ওই ছবিটি তুলেছিলে।‌ আর সেটা বোধহয় আমার সবচেয়ে বড় বেখেয়ালি এক কাজ ছিল।”
তালহারের কঠোরতায় চাপা আফসোসের আভাস ছিল। মেঘ থমকানো চিত্তে বলল,

“তুমি কী তার জন্য আক্ষেপ করছ?”
“হ্যাঁ।”
“সেটা একটামাত্র ছবি ছিল, তালহার।”
“একটা ছবি কারোর গোটা একটা দুনিয়ায় ফাটল ধরাতে পারে, মেঘ।”
“কিন্তু তুমি সেদিন তো কিছু বলোনি। তবে আজ কেন এত রাগ দেখাচ্ছো? কিছু কী হয়েছে তালহার? তুমি কী কোনো কারণে আমার উপর রেগে আছো?”
মেঘ নরম স্বরে শুধালো। তখন একই সোফায় থাকলেও তাদের মাঝে দুই হাতের দূরত্ব ছিল। তালহার ছোট্ট করে বলল,
“সেদিন তোমার জন্মদিন ছিল।”
“আর তুমি আমায় কষ্ট দিতে চাওনি তাই তো?”
“হ্যাঁ।”
“আর তুমি কী জানো, এটাই ভালোবাসা?”
মেঘ একফালি হাসি নিয়ে বলল। তার মন খারাপ এক নিমিষেই উধাও গিয়েছিল। তালহার ক্রোধ নিয়ন্ত্রন করতে গিয়ে হেসে ফেলল।

“ভালোবাসি” এতটুকু কাউকে হাজার উপায়েও বোঝাতে পারে না। আর কেউ অযথাই বুঝে বসে।
মেহমেদ খেতে খেতে কেকটির দিকে তাকালো। বলল,
“মিস মেঘ, কেকটা বোধহয় অপচয় হচ্ছে। আমি খেয়ে নেব নাকি?”
মেঘ রাগান্বিত চোখে গপগপ করে খেতে থাকা ভুক্কার লোকটির দিকে তাকালো। রাগে গজগজ করতে করতে তালহারের দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“এই জলহস্তীকে সবসময় কেন সাথে করে নিয়ে আসো, তালহার? দেখে মনে হচ্ছে একাই পুরো রেস্টুরেন্ট আর আমার মাথা খেয়ে নিতে পারবে।”
সোফায় কনুই ঠেকিয়ে বসা তালহার মৃদু হাসল তার কথায়। বলল,
“এই জলহস্তীটার জন্য আমি অনেক বিপদ থেকে বেঁচে যাই।”
“ওহ্ আচ্ছা। কিন্তু উপকারী হলেও উনি খুবই বিরক্তিকর, তালহার।”
“মেবি ফর ইউ।”
মেঘ ঘুরে তাকালো মেহমেদের দিকে যে কি-না এখনো জবাবের আশায় তাকিয়ে আছে তার দিকে। মেঘ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“আপনি এমন ভাব করছেন যেন আমি ‘না’ বললে আপনি খাবেন না।”
মেহমেদ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কেকের এক পিস কাটতে কাটতে বলল,
“আপনি বললেও আমি খাবো, না বললেও খাবো। কিন্তু ভদ্রতা বলে তো একটা ব্যাপার আছে।”
“আপনার ভদ্রতা দেখে আমি সত্যিই অভিভূত মিস্টার মাথা ছাড়া মেহমেদ।”
“থ্যাংক ইউ, মিস মঞ্জুলিকা।”
মেহমেদ হাসল। তার বুঝে আসে না স্যার এই মেয়েটিকে কী করে সহ্য করে। পাথর আর পানি কখনো এক হতে পারে?

মাত্রারিক্ত ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক শকের কারণে নয়নের দেহ তখন ছেড়ে দিয়েছে। কথা বলার শক্তিটুকুও নিঃশেষ হয়ে আসছে। তালহার তার থুতনি চেপে ধরল।
“শেষ বারের মতো জিজ্ঞাসা করছি নয়ন, কার আদেশে এগুলো করেছেন?”
নয়ন আধো আধো চোখ মেলে পিছলে যাওয়া কণ্ঠে বলল,
“আ…আমি…আমি জানি না এর পেছনে কে আছে স্যার। আমায় মাহির সরকার এই কাজ করার জন্য বলেছে। এটা ছাড়া আমি আর কিছুই জানি না স্যার।”
তালহার স্মিত হাসল। চোয়াল ছেড়ে চোখে চোখ রেখে বলল,
“একজন প্রভাবশালী জ্বালানি ও খনিজ শিল্পপতির আদেশে আপনি সরকার বিরোধী কাজে নেমে পড়বেন, তালহার মুজাহিদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন এটা আমায় বিশ্বাস করতে বলছেন নয়ন?”
নয়ন চমকায়। তালহার তার এডামস অ্যাপলের নড়াচড়া দেখল। বলল,
“আপনার দু’টো সন্তান আছে। ছয় বছরের একটি মেয়ে আর দুই বছরের একটি ছেলে। আপনি ঠিক কতটা স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ তা আপনার থেকে ভালো কে জানে, নয়ন। তাদের সুখ আপনি। আমায় বাধ্য করবেন না তাদের থেকে তাদের বাবাকে কেড়ে নিতে। সে কে?”

নয়নের চোখ ছলছল করে উঠল। চোখের পর্দায় ভেসে উঠল নিজের নিষ্পাপ শিশুদের মুখদুটো। অসহায়ত্ব অনুভব হলো। অন্য সব কর্মকর্তাদের মতো তার পরিবার নিয়েও কেউ কিছু জানত না। কিন্তু স্যার যদি মাত্র চার ঘন্টায় তার সন্তানদের বয়স ও বের করে ফেলে তবে সে সবকিছু করতে পারে।
তার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়ালো। দূর্বল কণ্ঠে বলল,
“আপনি ছেড়ে দিলেও তারা আমায় মেরে ফেলবে, স্যার।”
তালহারের চোখেমুখে উদ্বেগ ফুটে উঠল।
“আমি আপনাকে আর আপনার পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়াবো। কেউ কিছু করতে পারবে না আপনাদের। আমায় বলুন, সে কে?”
নয়ন শুকনো ঢোক গিলে মুখ খুললো,
“ড. মাহির চৌধুরী।”
তালহারের উদ্বেগ মিলিয়ে এলো। মেহমেদ ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,
“নৌপরিবহনমন্ত্রী ড.মাহির চৌধুরী?”
নয়ন হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। মেহমেদ ধিক্কার জানিয়ে বলল,

“মরার আগেও মিথ্যা বলছ? সন্তানদের মায়া নেই না-কি? ড. মাহির চৌধুরী অলরেডি আমাদের তালিকার সবচেয়ে শীর্ষে রয়েছে। কিন্তু সে এই দূর্নীতির প্রধান নয়। অন্য কেউ।
“অন্য কেউ আছে হয়তো। কিন্তু আমি আর কাউকে চিনি না। ড.মাহির চৌধুরী ই আমায় কাজ আদেশ দিয়েছিল বিপুল অর্থের বিনিময়ে। আমি যতদূর জানি, আমাদের দেশের তেল, খনিজ সম্পদ, কয়লা সকল কিছুর সিন্ডিকেট আর পাচারের কার্যক্রম ড. মাহির চৌধুরী পরিচালনা করে।”
“সেটা আমরাও জানি। কিন্তু তার ব্যাকবোন অন্যকেউ। আমরা তাকে খুঁজছি। সত্যি করে বলো।”
তালহার বিক্ষিপ্ত মেজাজে সরে আসল। গমগমে স্বরে বলল,
“উনি আর কিছু জানেন না। সাতদিন টর্চার সেলে রাখার পরে ওনাকে ছেড়ে দেবে। আর ওনার পরিবারের সকল সুরক্ষার ব্যবস্থা করো। ওনার কিংবা ওনার সন্তানের কিছু না হয় যেন।”
বাকি তিনজন কর্মকর্তা মাথা নেড়ে বলল,

“ওকে স্যার।”
নয়ন আর্তনাদ করে বলল,
“আমি যা জানতাম তা তো বলে দিয়েছি। তবৈ আমায় কেন সাতদিন টর্চার সেলে রাখছেন স্যার?”
তালহার পা থামায়। ফিরে তাকিয়ে বলল,
“এই জবের প্রথম শর্ত কী ছিল, নয়ন? সততা আর বিশ্বস্ততা। তাই এটা আপনার প্রতারণার ছোট্ট শাস্তি। চিন্তা করবেন না সাতদিন পর আপনার সন্তানরা যখন আপনাকে দেখবে তখন একটুও ভয় পাবে না।”
শূষ বাক্যটিতে ভয়ঙ্কর এক হুমকি ছিল। তালহার বেরিয়ে যায় অফিস থেকে। রাত বারোটা নাগাদ বাড়ি ফিরলো।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অভ্যাস অনুযায়ী কলিং বেল বাজালো। একবার, দুইবার ঠিক তৃতীয়বারের মতো তালহারের মনে পড়ল আজ আর কেউ তার অপেক্ষায় থাকবে না। কেউ ছুটে এসে দরজা খুলবে না আর সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করবে না এত দেরি হলো কেন?

তালহার চমকে কলিং বেলের উপর থেকে হাত নামালো। আর পকেট থেকে চাবি বের করল। মাথা ঝেড়ে তালা খুলে ভেতরে ঢুকলো। চারিদিকে চোখ বুলালো। অন্ধকারাচ্ছন্ন নির্জীবন একটি ঘর। সে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে ওয়াশরুমে গিয়ে ঢুকলো। গোসল করে এসে পুনরায় কাজের স্বার্থে পি.সি তে বসল। কিন্তু আজ বারংবার কাজ আর অনুভূতি অদ্ভুত সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এবং প্রতিবার ই অনুভূতি জিতে যাচ্ছে।
কাজের বদলে সে বারংবার আজকের সকাল থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত তার ঘরের সিসিটিভি ফুটেজ প্লেব্যাক করছে। সকাল সাতটায় সে কাজে যাওয়ার পর থেকে বিন্দু কাজ করা শুরু করেছে। ছোটাছুটি করে ঘরের সকল কাজ, রান্না সব করেছে। রিভার্স করে করে বারংবার সেগুলোই দেখে যাচ্ছে তালহার।
মেয়েটির কী ক্লান্তি নেই? এমন প্রশ্ন জাগতেই সাথে সাথে জবাব মিললো।
দুপুর একটা নাগাদ ছোটাছুটি করতে করতে ক্লান্ত বিন্দু তখন তার বিড়ালটিকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। তালহার পজ করল‌ এবং জুম করল। মেয়েটি হাঁফাচ্ছে। হাঁফাতে হাঁফাতে তার‌ বিড়ালকে চুমু খাচ্ছে। তালহার স্মিত হাসল।
ফিসফিসিয়ে আওড়ালো,

“ছেঁড়ে যাওয়ার জন্য ও এত পরিশ্রম?”
তার চোখের সামনে তখনো জীবন্ত বিশদিন আগের সকালবেলার ক্ষুদ্র একটি মুহুর্ত।
যখন তালহারের গভীরঘুমে বিঘ্ন ঘটিয়ে ভেজা চুল নিয়ে একটি মেয়ে তার বুকে থুতনি ঠেকিয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু বিরক্তির বদলে দুটি হাত মেয়েটিকে আষ্টেপৃষ্ঠে পুরুষালী বুকে জড়িয়ে নিলো। বিন্দু ঘুমন্ত মুখটিকে দেখতে দেখতে মৃদু হেসে বলল,
“তালহার, আমাদের যদি আল্লাহ একটা মেয়ে আর একটা ছেলে দেন তবে আমরা তাদের নাম তুষার আর শুভ্রা রাখব ঠিক আছে?”
“ওকে।” তালহার বদ্ধ নেত্রেই জবাব দিল।
“আপনার কী পছন্দ হয়েছে নাম দু’টো?”
প্রেক্ষিতে তালহার ভীষণ উদাসীনতার সাথে বলল,
“যেমন তোমার পছন্দ সেটাই হবে।”
কিন্তু বিন্দুর পছন্দ হয়নি জবাবটা। তালহার বরাবরই উদাসীন সন্তান এবং সন্তান জড়িত সবকিছু নিয়ে। কখনো তার মতো এমন আগ্রহ, আনন্দ প্রকাশ করে না।
সে আর কথা বাড়ালো না। বলল,

“উঠবেন না? আটটা বাজে? অফিস তো নয়টায়।”
পুরুষটির মুখে এবার বিরক্তির আনাগোনা দেখাগেল। সে নড়েচড়ে উঠল। বুকে জড়িয়ে রাখা মেয়েটি ততক্ষণে এক ঝটকায় বুকের নিচে পিষ্ট হলো। বিন্দু হকচকায় গদলেশে রুক্ষ মুখশ্রী দেবে যেতেই। ভেসে আসে জড়ানো কণ্ঠ।
“দ্যাটস নান অফ ইয়োর বিজনেস। জাস্ট স্টে উইথ মি।”
তালহার যেমন তার কোনো কাজের কৈফিয়ত দিতো না, বিন্দুও তেমনি তার কোনো কাজের কৈফিয়ত চাইতো না। সে পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে তার সাথে রইল। কিন্তু কখন যে সে নিজেও ঘুমিয়ে পড়ল তার খেয়াল হলো না। যখন দু’জনের ঘুম ভাঙলো তখন দু’জনেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। দু’জনে হতবাক হয়ে ঘড়ির দিকে তাকালো। দুপুর বারোটা বেজে বিশ মিনিট। তালহারের ফোনে পঁচিশটা মিসড কল।
দু’জনে কিয়ৎকাল হতবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। অতঃপর ফিক করে হেসে ফেললো।
সেই একই হাসি আজ এখনো লেপ্টে আছে তালহারের ঠোঁটে। শুধু অর্থ ভিন্ন। রিভার্স করতে করতেই আবারো আওড়ালো,
“জাস্ট স্টে উইথ মি।”

তিন বছরের সংসার মাত্র পনেরো দিনের সিদ্ধান্তে ত্যাগ খুব কঠিন কিংবা খুব সহজ ছিল না। হিসাবটা ছিল শুধু যন্ত্রণার। কারণ তিন বছরের সুখকে পনেরো দিনের প্রতারণা অবলীলায় হারিয়ে দিয়েছিল।
শীতল পাটির উপর বিছিয়ে রাখা সিঙ্গেল তোশকে নির্জীব, নিস্তেজ শুয়ে থাকা নারীটি একদৃষ্টিতে সাফেদ দেয়াল দেখছিল। কিন্তু দেখতে দেখতে কখন যে সকাল হয়ে গেল তা টের পেল না। রোদের ঝলকানি চোখে পড়তেই বিন্দু সচকিত হলো। রক্তাভ হয়ে থাকা চোখদুটোতে ভীষণ জ্বলন অনুভব হলো। উঠে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে আসল।
ব্যথায় ফেটে যাওয়া মাথার প্রদাহ কমাতে এক কাপ কফির তীব্র প্রয়োজনীয়তা অনুভব হলেও কফি ছিল না। তার কাছে খুব পরিমিত টাকা ছিল। সে তালহারের কিছু আনেনি। সে চা খেতো না। রোজ সকালে এক কাপ কফি পুরো দিনের জন্য তাকে সতেজ রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল।
নিরুপায় হয়ে সে দুই গ্লাস পানি খেয়ে নিলো আর চোখে বেশি করে পানি দিল। কিছুক্ষণ বাদ কলিং বেল বেজে উঠল। তার পরনে ছিল ব্লক প্রিন্টের থ্রি পিস। দরজা খুলতেই ভেসে উঠল একটি চৌদ্দ পনেরো বছরের ছেলের প্রতিচ্ছবি।

“জি?”
ছেলেটি মৃদু হেসে হাতের শপিং ব্যাগটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আপু, এটা আপনার জন্য।”
বিন্দু তাকায় বাড়িয়ে দেয়া ব্যাগটির দিকে। তাকাতেই চমকে উঠল ব্যাগ থেকে বেরিয়ে থাকা সাদা লিলি ফুলগুলো দেখে। সে চমকে উঠে তাকায় ছেলেটির পানে।
“এগুলো কী? আমায় দিচ্ছো কেন?”

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ২

“এগুলো ভাইয়া দিয়েছে। নিন, আমায় যেতে হবে।”
ছেলেটি তার হাতে ব্যাগটি ধরিয়ে দিয়ে ছুটে নিচে নেমে গেল।
বিন্দু নিজের ভাবনাকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে দ্রুত ব্যাগটি পুরোটা খুলল। খুলতেই তার দেহ সর্বশান্ত হয়ে আসে একটা কফি জার আর একগুচ্ছ সাদা লিলি সেথায়। জিহ্বায় শুধু একটি নামই উচ্চারিত হয়,
“তালহার!”

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here