Home জোড়া পাতার দিনলিপি জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৫

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৫

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৫
তোনিমা খান

দুপুর দুইটা নাগাদ তন্ময় ঘরে ফিরল‌। পরিবারের সকলে তখন কেবল দুপুরের খাবার খেতে বসেছে। তন্ময় কাঁধের ব্যাগ ছুড়ে ফেলে চেয়ার টেনে বসে পড়ল। রুহান চোখ তুলে তাকালো। গম্ভীর গলায় বলল,
“হাত মুখ ধুয়ে আয়।”
“আরে খিদে পেয়েছে তো।”
তার মা চেঁচিয়ে বলল,
“হাত পা না ধুয়ে আসলে খাবার পাবি না তন্ময়। এটা ভীষণ উশৃঙ্খল হয়েছে রুহান। যা ইচ্ছা তাই করছে। কোন মেয়ে কী যেন বিপদে পড়েছে তাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছে। চার হাজার টাকার ঘর আড়াই হাজার টাকায় ভাড়া দিয়েছে।”

তন্ময় ভ্রুক্ষেপহীন হাত পা ধুতে গেল। রুহান খেতে খেতে বলল,
“মেয়েটা ভালো পরিবারের। হঠাৎ বিপদে পড়েছে তন্ময় সাহায্য করেছে। হয়তো কোনো ভবিষ্যৎ খারাপ ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে একটা মেয়ে। তাতে খারাপ কিছু তো নেই মা।”
“ভালো মেয়ে তুই বুঝলি কী করে?”
“চলাফেরা দেখলেই বোঝা যায় কে ভালো ঘরের ভদ্র মেয়ে, মা।”
“তা এতই যখন ভালো মেয়ে চিনিস তবে একটা ভালো দেখে বিয়ে করছিস না কেন? এখনো কার জন্য সন্ন্যাসী হয়ে ঘুরছিস?”, তন্ময়ের মা খেকিয়ে উঠল। রুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বয়স ত্রিশের কোঠা ছুঁতেই ইদানিং ঘরের সব আলোচনা এখানে এসেই থামে।
তন্ময়ের বাবা ছেলের দিকে তাকালো। বলল,
“জীবনে আগানোর কোনো ইচ্ছা কী নেই?”
“পিছিয়ে আছি কোথা থেকে, বাবা? জব করছি, নিজের কোচিং চালাচ্ছি, তোমাদের দেখাশোনা করছি। আর কী লাগে জীবনে?”
তার বাবা মুচকি হেসে বললেন,

“একজন স্ত্রী, সন্তান—একটা পরিবার। যেটা ছাড়া একজন মানুষ অসম্পূর্ণ!”
“এটা না হলে কেউ পরিপূর্ণ হয় না?”
“নাহ।”
“কী অদ্ভুত!”
রুহান বিরক্তি প্রকাশ করে খাবার মুখে তুললো। তন্ময়ের মা অসন্তোষের সাথে ছেলেকে দেখলেন। বললেন,
“এক মেয়ের জন্য এমন জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবি?”
রুহান এবার রেগে গেল। রাগান্বিত স্বরে বলল,
“সবসময় পেছনকার কথা টানবে না, মা। এক মেয়ের জন্য আমি কেন আমার জীবন নষ্ট করব? যে আমায় ভুলে নিজের লাইফে অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে, সুখে আছে তার জন্য নিজের জীবন নষ্ট করার মতো বোকা আমি নই। আমার ইচ্ছা হচ্ছে না এমন কিছুতে জড়াতে তাই আমি জড়াচ্ছি না। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ নেই।”

“হ্যাঁ বুড়ো বয়সেও মায়ের মাথা চিবিয়ে খাবি।”
“আমি তোমার মাথা চিবিয়ে খাই?”
“তোকে আমার চোখের সামনে দেখতে ইচ্ছে করে না। সর আমার সামনে থেকে। বিয়ে করে যেদিন সুপুরুষ হবি সেদিন সামনে আসবি।”
রুহান হতবাক হয়ে বলল,
“বিয়ে করলে সুপুরুষ হয়, মা?”
তার মা ত্যাড়া কণ্ঠে বলল,
“হুম।”
রুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। তন্ময় টেবিলে বসে আলোচনায় চির চাঁদ লাগিয়ে দিয়ে বলল,
“আম্মু, নিজে তো বিয়ে করবে না আমাকেও সাথে সন্ন্যাসী বানাবে। আমি কিন্তু সুপুরুষ হতে চাই। তুমি বললে এখুনি হয়ে যেতে পারি।”
সহসা ভদ্রমহিলা তেতে উঠলেন।
“দেখো দেখো এক ছেলে বিয়ে করতে চায় না আরেক ছেলে বিয়ের জন্য চার পায়ে রাজি। কেমন সব অভদ্র ছেলেমেয়ে খাইয়ে পড়িয়ে বড় করেছি।”
বলেই সে তন্ময়ের পিঠে দুম করে একটা বসিয়ে দিয়ে বলল,

“লজ্জা করে না বাবা, ভাইয়ের সামনে এমন কথা বলতে?”
“ছেলেদের লজ্জা একটু কম থাকে মা।”
তন্ময় দাঁত কেলিয়ে বলল। কিন্তু পানির জগে হাত দিতেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল ডাইনিং টেবিলের মাঝ বরাবর ফ্লাওয়ার ভাসে চারটা লিলি ফুল দেখে। সে চকিতে ছোট বোন তুবার দিকে তাকালো। মাথায় চাটি মেরে বলল,
“এই পেত্নি, চারটা লিলিফুল আসল কোত্থেকে? আমি তোকে দুটো বিন্দু আপুকে দিতে বলেছিলাম না?”
তুবা খেতে খেতে বলল,
“আমি কী তাকে চিনি? মাকে বলেছিলাম দিয়ে আসতে কিন্তু সে যায়নি। তুমি গিয়ে দিয়ে আসো।”
তন্ময় অবুঝপানে মাথা চুলকালো।
“তাহলে আপুকে লিলি ফুল দিল কে?”
রুহান তার বিড়বিড় শুনলো। গম্ভীর গলায় শুধাল,
“কী হয়েছে তোর আপুর?”
“কিছুনা।”
“তোর আপুর সাথে কী হয়েছে তা তো বললি না।”
তন্ময় কাঁচুমাচু করে বলল,

“আপু তার ব্যক্তিগত বিষয় সবাইকে বলা পছন্দ করবে না। কিন্তু এতটুকু শুনে রাখো তার সাথেও তোমার মতো একটা বাজে ঘটনা ঘটেছে। বরং তোমার থেকে দ্বিগুণ বাজে ঘটনা ঘটেছে।”
রুহানের বুঝতে বাকি রইল না বিন্দু নামক মেয়েটিও প্রতারণার স্বীকার হয়েছে। ঠিক যেমনটা তার চার বছরের প্রেয়সী তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে অন্য কাউকে বিয়ে করে নিয়েছে।
সে ব্যথিত হলো। চাপা স্বরে বলল,
“প্রতারণা?”
তন্ময় ছোট্ট করে বলল,
“পরকিয়া।”
“বিবাহিত ছিল। মেয়েটিকে ভালো মনে হয়েছে।”
রুহান মিইয়ে গেল। চোখেমুখে বেদনা ফুটে উঠল। তন্ময় মাথা নেড়ে বলল,
“যেমন ভালো তেমনি মেধাবী। এন টি আর সি এ এর প্রিপারেশন নিচ্ছে। তুমি পারলে একটু সাহায্য করো। সে এভাবে পরিবারের সামনে দাঁড়াতে চাইছে না।”
“কিন্তু বেশ শক্তপোক্ত আর রুক্ষ স্বভাবের। কথা বলতে গেলেই ভ্রু কুঁচকে নেয়। এমন ভাব করে যেন আমি তাকে টিজ করছি।”
তন্ময় হেসে বলল,
“আপু খুব রিজার্ভ পার্সন‌। সহজে কারোর সাথে কথা বলে না।”
রুহান কাঁধ ঝাঁকায় এবং খাওয়ায় মনোযোগ হয়।

ভরতি মিটিং রুমের মধ্যমনি খিলজি মাহমুদ থুতনি থেকে হাত নামালেন। বাকি বাইশ জন কর্মকর্তা উদগ্রীব হয়ে বসে আছেন তার পরবর্তী বক্তব্য শোনার জন্য। সে তাদের উদগ্রীবতা বাড়তে না দিয়ে বললেন,
“উপর মহল থেকে বার্তা এসেছে। তারা অসন্তুষ্ট আমাদের উপর। চার মাসেও আমরা একটা কেস সলভ করতে পারিনি। জনগণ ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।”
মেহমেদ সহ বাকি একুশ জন অনতিবিলম্বে নিজেদের বাঁকা দৃষ্টি তাক করলেন মুখে হাত ঠেকিয়ে নত শির বসে থাকা তালহার মুজাহিদের দিকে। চোখেমুখে চাপা বিচলন।
খিলজি মাহমুদ ও তার দিকে মনোযোগ দিলেন।
“তালহার তুমি কী করছ? আর কতদিন সময় নেবে? তারা কৈফিয়ত চাইছে।”
তালহার চোখ তুলে তাকায়। ধিমি কণ্ঠে বলল,
“স্যার, আমায় যদি আমার নিয়মে কাজ করার অনুমতি দেয়া হতো তবে এটা চার মাস নয় চার সপ্তাহেই শেষ হয়ে যেতো। কিন্তু সরকার কর্তৃক আমাদের হাতে পুরো ক্ষমতা আর সুযোগ সুবিধা দেয়নি। তারা নিজেদের বুকে ভয় চেপে ধরে অপরাধীদের সনাক্ত করতে বলছে। কারণ তারা নিজেরাও ধারণা করতে পারছে অপরাধী তাদের কাছের কেউ। আর তাদের কাছের কেউ যদি ধ্বংস হয় তবে তাদের আরো ক’জনকে নিয়ে ধ্বংস হবে।”

“কীভাবে দেবে? তুমি যদি সলিড কোনো প্রুফ তাদের সামনে পেশ করতে পারতে তাহলেও তারা তোমায় ফুল সাপোর্ট করত।”
খিলজি মাহমুদের রুক্ষ স্বরে তালহার চোয়াল শক্ত করে বলল,
“প্রমাণ আমার কাছে এসেই গিয়েছিল, স্যার। কিন্তু তখুনি নয়নের বিশ্বাসঘাতকতা আর ভূতত্ত্ববিদ আনোয়ার ফারুকের মৃত্যু সবটা এলোমেলো করে দিল।”
“তারা আমাদের হাতে কখনো প্রমাণ লাগতে দেবে না। তার জন্য যা করার তা করবে কিন্তু তোমার তো সচেতন থাকা উচিত ছিল। আজ অনেক বছর তুমি এই কাজ করে আসছ। তুমি এই ভুল কী করে করলে?”
তালহার নিজেই নিজের উপর অসন্তুষ্ট। মেহমেদ ও খেয়াল করেছে স্যার অনেকদিন যাবৎ কেমন অস্থির হয়ে আছে।
তালহার বিচলিত ভঙ্গিতে কপালে আঙুল ঘঁষলো। কিয়ৎকাল বাদ বলল,
“আমায় আর কিছুদিন সময় দিন। আমি সব প্রমাণ জোগাড় করে ফেলব। কিন্তু তারপর সকল কাজ আমার নিয়মে হবে এতটুকু ওয়াদা আমায় করতে হবে। নয়তো আমি এই কেস থেকে ইস্তফা নিয়ে নেবো।”
খিলজি মাহমুদ বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে নিলেন। এই ছেলের কাজের প্রক্রিয়া কতটা উগ্র আর হিংস্র তা সকলে জানে বলেই কেউ এই অনুমতি দেয়নি। পে সংযত কণ্ঠে বলল,
“আচ্ছা, আমি কথা বলব। এখন পরিস্থিতি ভারী পড়ছে তাদের উপর। প্রতিদিন বিক্ষোভ, হরতাল, অরাজকতা বেড়েই চলেছে এই এক ইস্যু নিয়ে। আমার মনে হয় নিজেদের ইমেজ আর গদি ধরে রাখতে তারা এখন যা করতে হয় করবে।”

“ওকে, তাহলে তো হয়েই গেল। একচুয়েলি, সবাই একসাথে মরার থেকে একজনকে মেরে ফেলা আমার কাছে সঠিক মনে হয়।”
তালহার কাঁধ ঝাঁকিয়ে নিজের মতামত রাখল। খিলজি মাহমুদ মিটিং ক্লোজ করতে করতে বললেন,
“এখন সেটাই হবে হয়তো।”
সরকারি খাতে কিংবা ক্ষমতার গদিতে বসা কজনের ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা? প্রত্যেকের ই ব্যাকগ্রাউন্ড মোটামুটি দাগযুক্ত। মেহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে বাবার পিছে গেল। চাপা স্বরে বলল,
“বাবা, আপনার প্রেশারের ওষুধের সময় হয়ে গিয়েছে। নিয়ে নেবেন মনে করে।”
খিলজি মাহমুদ চলতে চলতে মাথা নেড়ে সায় জানালেন।
“তুমি এখন কোথায় যাচ্ছো?”
“তালহার স্যারের সাথে।”
“আচ্ছা। তাকে বলো, যা করার তাড়াতাড়ি করতে।”
“জি বাবা…স্যরি স্যার।”
মেহমেদ তৎক্ষণাৎ জিহ্বায় কামড় দিয়ে সম্বোধন সংশোধন করে নিলো। সে কখনোই বাবাকে অফিসে বাবা ডাকে না। কিন্তু এটা তার করা সবচেয়ে সুন্দর ভুল। ভুল করে বাবাকে বাবা ডেকে ফেলার মতো চমৎকার ভুল আর কিছু আছে নাকি!
রাত নয়টা। নিজের কক্ষে ঢুকতেই তালহার ব্যস্ত ভঙ্গিতে সিগারেট ধারলো। মেহমেদ ত্রস্ত পায়ে কামরায় ঢুকে উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“স্যার, আপনি তো বলেছিলেন আজ কোনো সুরাহা করবেন ওই হারিয়ে যাওয়া প্রমাণ গুলো ফিরে পাওয়ার জন্য।”
সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে তালহার পায়চারী করছে। বিরক্তি নিয়ে বলল,
“মাহির চৌধুরীর দেশে ফিরতে এখনো একমাস দেরি হবে, মেহমেদ। এমনটা হলে আমাদের জন্য বিষয়টা খুব বাজে হবে।”
মেহমেদ ও আশাহত হলো। সতর্ক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“স্যার, এটা কী মিস মেঘ বলেছে?”
“হুম।”
তালহার ছোট্ট করে জবাব দিল। মেহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
মেঘ..ওরফে মেঘ চৌধুরী। মাহির চৌধুরীর একমাত্র ভাতিজি। এমনকি চৌধুরী বংশের একমাত্র মেয়ে এবং সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। পুরো বংশের মধ্যে ছোট ভাইয়ের ওই একটা মেয়ে মাহির চৌধুরীর চোখের মনি। ভাগ্যক্রমে যার দেখা হয়ে যায় তালহারের সাথে। এবং সময়ের পরিক্রমায় মেঘ তালহার আর খিলজি মাহমুদের ও চোখের মনি হয়ে গেল।
কিন্তু এই চোখের মনি হওয়ার পেছনে কী শুধুই ভালোবাসা আছে না-কি অন্যকিছু? তা জানা নেই মেহমেদের। কেননা ওই বিরক্তিকর আলালের ঘরের দুলালীকে তো সে দুই মিনিট সহ্য করতে পারে না। কেউ ভালোবাসে কী করে কে জানে? কথায় কথায় মুখ ফুলিয়ে থাকবে নয়তো বোকার মতো হেসে উঠবে।

“এখন আমাদের কী করতে হবে স্যার?”
সে কৌতুহলী গলায় শুধাল। তালহার পায়চারী করতে করতে বলল,
“মাহির চৌধুরীকে দেশে আনতে হবে।”
“সেটা কীভাবে স্যার?”
“যত বন্দর আছে সব গোয়েন্দা সংস্থার আয়ত্তে নিয়ে ফেলা হবে আগামী এক সপ্তাহের জন্য। তাদের গলায় যতক্ষণ না কাঁটা বাঁধবে ততক্ষণ তারা গুহা থেকে বের হবে না। অনেক হয়েছে লুকোচুরি। এবার যা হওয়ার খোলামেলা হবে। কিন্তু এই কেস এই মাসের মধ্যে সলভ করতে হবে‌।”
তালহার দৃঢ় কণ্ঠে বলল। কিন্তু তার ললাটে অজস্র বিরক্তির আনাগোনা। মেহমেদ সায় জানিয়ে বলল,
“ওকে স্যার। আমি কী তবে অফিসারদের এলার্ট করে দেব?”
তালহার সায় জানালো। টেবিলে থাকা একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, আমি আগামী সপ্তাহের সকল নির্দেশনা এখানে লিখে রেখেছি। কোথায়, কখন, কী করতে হবে।”
মেহমেদ ফাইল উঠিয়ে নিলো। সতর্ক কণ্ঠে শুধাল,

“স্যার, আপনিও কী তবে সামনাসামনি এখন কেসের প্রধাণ ফেইস হয়ে লড়বেন?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু বাবা…না মানে খিলজি স্যার যে বললেন আপনার জন্য এটা বিপদজনক।”
তালহার ম্লান হাসল। সিগারেট ততক্ষণে শেষ। সে এশট্রেতে সিগারেট পিষতে পিষতে বলল,
“আপনার কী মনে হয় মেহমেদ তারা এখনো আমার ব্যপারে কিছু জানে না? তারা সব জানে। তাহলে শুধু শুধু মুখ লুকিয়ে থাকার কী মানে! যা হবে সামনাসামনি হবে। তারা বুক ফুলিয়ে অপরাধ করতে পারছে। তবে আমরা কেন মুখ লুকিয়ে অপরাধীকে খুঁজব? কী বা ক্ষতি করতে পারবে! বড়জোর প্রাণ নেয়ার হুমকি দেবে। যেই প্রাণের মায়া এই জবে জয়েন করার দিন ছেড়ে দিয়েছিলাম। এটা খুবই তুচ্ছ এক হুমকি। আপনি নিশ্চিন্তে কাজে লেগে পড়ুন।”
মেহমেদ মলিন মুখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। স্যারের কী হারানোর মতো মূল্যবান কিছু নেই? মেহমেদ জানত না তালহার যা হারানোর তা হারিয়ে ফেলেছে। তেমনি তালহার ও জানতো না তার প্রাণ অন্য কারোর মাঝে রয়েছে। সে জানত না, প্রাণ কেড়ে নেয়ার মতো তুচ্ছ হুমকি তার জন্য বহু আগেই ভয়ঙ্কর ধারণ করেছে।
মেহমেদ যেতেই তালহার কাউকে ফোন দিল। রিসিভ হতেই বিক্ষিপ্ত মেজাজে বলল,

“কবির, তোমায় কিছু দিতে বলেছিলাম। তা কোথায়?”
অপরপ্রান্ত থেকে কবির নামক লোকটি হড়বড়িয়ে বলল,
“স্যার, আমি তো আপনাকে মেইল পাঠিয়েছি আর হোয়াটসঅ্যাপ ও করেছি। আপনি বোধহয় দেখেননি।”
তালহার নিরুত্তর ফোন কেটে ইমেইল চেক করল। মেইলে থাকা নাম্বারটি দুইবার আওড়াতেই তা মুখস্থ হয়ে গেল। সেটি ফোনে সেইভ করল এরপর হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকলো। এবং ঢুকতেই তার বিরক্তিরা ধীরস্থির মিলিয়ে যেতে লাগল। স্ক্রিনে ভাসতে থাকা বৃষ্টিভেজা এক ভঙ্গুর অবয়ব একটু একটু করে তার সব বিরক্তি, রাগ, অস্থিরতা শুষে নিয়ে ঠোঁটের কোনে আলতো হাসি এনে দিল।

মা হতে না পারার বেদনা, নিজেকে খুঁতযুক্ত মনে হওয়ার হীনমন্যতা, স্বামীর থেকে প্রতারণা পাওয়ার পর ঘর ছাড়া একটা নারীর মানসিক স্থিতিশীলতা ঠিক কতটা বিভৎস হতে পারে তার ধারণা কোনো সাধারণ মানুষ করতে পারবে না। কিন্তু বিন্দু? সে ছিল পুরো আলাদা এক নারী। সে নিজেকে সেই জায়গা থেকে সরিয়ে নেয়ার আশ্চর্যজনক ক্ষমতা রাখতো যেই জায়গায় তার মূল্য নেই।
“তুমি সেই ঘর কী করে এত সহজে ছেড়ে দিলে যেই ঘরের প্রতিটা কোনা তোমার নিজের যত্নে সাজানো?”
নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধুর অবাক কণ্ঠে বিন্দু ম্লান হাসল। চুলায় থাকা তরকারি নাড়তে নাড়তে হাতটিতে উদাসীনতা ছুঁয়ে যায়। ক্ষীণ স্বরে বলল,
“সেই ঘর ছাড়তে কিসের কষ্ট, যেই ঘরে আমার কোনো অধিকার নেই।”
“ওই ঘরের সবকিছুর উপর তোমার অধিকার আছে, বিন্দু।”
“যেখানে ওই ঘরের মালিক বহু আগেই অন্যের হয়ে গিয়েছে। সেখানে ঘর দিয়ে আমি কী করব, নিশি?”
নিশি অসন্তোষের সাথে বলল,

“তুমি তালহারকে এত সহজে কী করে ছেড়ে দিতে পারো বিন্দু? ও প্রতারণা করেছে তোমার সাথে। তোমার উচিত ওর বিরুদ্ধে স্টেপ নেয়া। ও তো ঠিকই সব পেয়ে গেল। কিন্তু তোমার কী?”
মেয়েটির চোখ অনতিবিলম্বে টলটল করে উঠল। ভালোবাসা কখনো বিনিময় খোঁজে না। সে ধিমি কণ্ঠে বলল,
“তার থেকে ডিভোর্স চেয়ে ওই যন্ত্রণাদায়ক সংসারজীবন থেকে বেরিয়ে আসাটাই তার বিরুদ্ধে নেয়া সবচেয়ে বড় স্টেপ ছিল, নিশি। তালহারের আত্মসম্মানবোধ অনেক প্রখর। আমি তো সেটাই ভেঙে দিয়ে এসেছি।”
“হ্যাঁ, তোমার উচিত ছিল ওই নাক উঁচু ইন্টেলিজেন্স অফিসারের মুখের উপর ডিভোর্স পেপার ছুঁড়ে মেরে আসা। কিন্তু আফসোস ওই ধূর্ত তালহার তোমায় তালাক দেয়ার অধিকার দেয়নি।”
বিন্দু স্মিত হেসে বলল,
“চিন্তা করো না। সে নিজেই দিয়ে দেবে। শুনলাম মেঘকে বাড়িতে এনেছে। হয়তো এতদিনে বিয়ে করে ফেলেছে।”

ঠিক এতটুকু উচ্চারণ করতে গিয়ে বিন্দুর মনে হলো কেউ বোধহয় শক্ত করে তার গলা চেপে ধরেছে। ঝাঁপসা চোখ দিয়ে এখনি পানি গড়িয়ে পড়বে‌। ভেসে উঠল নিজের বৈবাহিক জীবনের এক একটা মুহুর্ত। আজ সেই জায়গায় মেঘকে কল্পনা করতেই তার দম বন্ধ হয়ে আসল। সে দ্রুত স্টোভ বন্ধ করে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
নিশি চকিতে উঠে বসল। সেও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে এখন চট্টগ্রামে একটা কলেজে জব করে। সে হতভম্ব হয়ে বলল,
“তালহার বিয়ে করে নিয়েছে? সে কী তোমায় ডিভোর্স পেপার পাঠিয়েছে?”
বিন্দু চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিয়ে বেরিয়ে আসে।নিজেকে সামলে বলল,
” নাহ, এখনো তো পাঠায়নি। কিন্তু তাদের একে অপরের প্রতি যেই ভালোবাসা দেখেছি তাতে আমার মনে হয় এতদিনে তারা বিয়ে করে নিয়েছে। আজ নয়দিন আমি ওই বাড়ি ছেড়ে এসেছি।”
নিশি তেতে উঠে বলল,

“ওর সাহস কী করে হয় ও তোকে ডিভোর্স না দিয়ে আরেকজনকে বিয়ে করে? ওর উপর কয়েকটা কেস ঠুকে দেয়া যায় বিন্দু। একে তো পরকিয়া করেছে তার উপর বউ থাকাকালীন বিয়েও করেছে। ওর ক্যারিয়ার সব ধূলোয় মিশে যাবে বিন্দু। তুই হাত গুটিয়ে বসে থাকিস না। বাসার সবাইকে জানা। নয়তো আমি গিয়ে ওটার নামে কয়টা মামলা ঠুকে দিয়ে আসি। শালা চরিত্রহীন, লম্পট ওটাকে ইঁদুরের বিষ খাইয়ে মেরে ঘর থেকে বের হয়ে আসা উচিত ছিল তোর!”
বিন্দুর মুখশ্রী গম্ভীর হয়ে উঠল।
“নিশি!”
নিশি বিরক্তি নিয়ে বলল,
“আরে আমায় ধমকিও না তো! ওই শালাকে ধমকাও।”

“সামনের জন খারাপ বলে কী আমরাও খারাপ কাজ করব, নিশি? তাহলে তাদের মধ্যে আর আমাদের মধ্যে পার্থক্য কী রইল? তার থেকে ভালো, হিসাব নিকাশ সবটা আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও। আমি আমার সংসারের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার প্রতি দায়িত্ব ভালোবাসা সবটা পালন করে এসেছি। এটাই আমার শক্তি।”
“হ্যাঁ।”, নিশি মুখ ছোট করে বলল। তার কান্না পাচ্ছে। সে কখনোই বিন্দুর এমন পরিণতি আশা করেনি। আর না মানতে পারছে। ইচ্ছে করছে তালহারকে মেরে ফেলতে।
বিন্দু তরকারি নামিয়ে নিলো। ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
“আচ্ছা, এখন রাখছি। আমায় খেয়ে কোচিং এ যেতে হবে। আজ তিনটা ক্লাস আছে।”
“আচ্ছা যাও। আর কোনো সাহায্য প্রয়োজন হলে সাথে সাথে আমায় জানাবে।”
“ঠিক আছে।”
“জানাবে তো?”
বিন্দু হেসে ফেলল। বলল,
“আরে বাবা জানাবো।”
নিশির মুখেও হাসি ফুটে উঠল।
“আচ্ছা আচ্ছা, যাও।”

বিন্দু ফোন রেখে তাড়াতাড়ি করে ডিম ভুনা আর গরম ভাত খেতে লাগল। শরীরের দূর্বলতা ক্রমেই বাড়ছে। গত দু’দিন যাবৎ তার হালকা জ্বর। আজ মনে হচ্ছে জ্বর আরো বেড়ে যাচ্ছে। মাথা ব্যথায় উঠে দাঁড়ানো মুশকিল।
সে বহু কষ্টে অর্ধেক ভাত খেতে পারল কিন্তু পরমুহূর্তেই বমি হয়ে গেল। একদফা বমি করে সে আর ভাত খাওয়ার শক্তি পেল না। ওদিকে কোচিং এর সময় হয়ে গিয়েছে। আসার পথে ওষুধ ও কিনে আনতে হবে।
পাঁচ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে সে উঠল। সুতির একটা শাড়ি জড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল। এটা মা গত ঈদে দিয়েছিল। তারা তিন ভাই বোন। তারা দুই বোন বড় আর এক ভাই ছোট। বাবা একজন প্রাক্তন হাই স্কুল টিচার। মা গৃহিণী। বোন নিজের সংসারে স্বামী সন্তান আর দুই সন্তান নিয়ে সুখী। এইতো তাদের ছোট্ট সংসার। যাতে সুখের অভাব নেই। কিন্তু সেই সুখের সংসারে এখন সে একফালি দুঃখ। ঘরভাঙা ডিভোর্সী মেয়ে!
এই মুখ নিয়ে যাবে কী করে পরিবারের সামনে? বিন্দু এখনো সেটা ভাবতেই পারছে না। কিন্তু যেতে তো হবেই। কতদিন এটা লুকিয়ে রাখতে পারবে?

আকাশ পাতাল চিন্তা নিয়ে সে দরজা আঁটকে সিড়িতে নামতেই তার মনে হলো দুনিয়া ঘুরছে। তবুও নিজের উপর জোর করে সে দশ মিনিট দূরে কোচিং এ পৌঁছাল। কিন্তু তিনটা ক্লাস করাতে তার শোচনীয় অবস্থা হয়ে গেল। ততক্ষণে জ্বর আকাশচুম্বী বেড়ে গেল। দোদুল্যমান দেহ নিয়ে সে কোনোমতে কোচিং থেকে বেরিয়ে আসল। গেটের কাছে আসতেই দেখল কোচিংয়ের মালিক ব্যস্ত কদমে ভেতরে ঢুকছে। তাকে দেখেই পথ আঁটকে দাঁড়িয়ে গেল।
বিন্দু নিভু নিভু চোখে বিরক্তি নিয়ে তাকালো। এই লোক সবসময় এমন পথ আঁটকে দাঁড়াবে। সে থমথমে মুখে বলল,
“আসসালামুয়ালাইকুম, কিছু বলবেন?”
রুহান চশমা ঠিক করে বলল,
“কিছু বলব বলেই তো দাঁড়ালাম।”
“জলদি বলুন।”
“কেন তাড়া আছে?”
“আপনার কী বলার তা বলুন।”

বিন্দু রুক্ষ স্বরে বলল। রুহান সরু চোখে চেয়ে বলল,
“আপনি কোচিং এ শাড়ি পরবেন না।”
বিন্দু কপাল কুঁচকে নিয়ে বলল,
“কী মানে শাড়ি পরব না? এরকম কোনো বাধ্যবাধকতা তো কোথাও লেখা নেই।”
“বাচ্চা কাচ্চাদের সামনে সেইসব পোশাক পরতে নেই যা আকর্ষণ করে। পুরো কোচিং এ আপনি একা শাড়ি পরেন। যেটা ভীষণ আই ক্যাচিং।”
রুহান গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল। বিন্দু চোয়াল শক্ত করে একজন কলেজের প্রেফেসর আর কোচিংয়ের মালিকের বেহুদা কথা শুনলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“দোষ আসলে আমার শাড়ি পরার না, আপনার চোখের। আপনি বরং আপনার চোখদুটো উপরে ফেলুন।”
পরপরই তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলল,

“আর কারোর চোখে আমার শাড়ি পরা আকর্ষণীয় লাগছে না কিন্তু আপনার চোখে আকর্ষণীয় লাগছে। মজা করছেন আমার সাথে? আপনি একটু প্রফেশনালিজম শিখুন। এটার বড্ডো অভাব আপনার।”
রুহান কপালে বড়সড় একটা ভাঁজ নিয়ে বলল,
“কার সাথে প্রফেশনালি কথা বলতে হবে সেটা আমি ভালো করেই জানি। কিন্তু আপনাকে আমি ভাইয়ের কারণে সহানুভূতির চোখে দেখি। সাহায্য করতে চাই। কিন্তু আপনি মেয়ে ভীষণ অহংকারী।”
বিন্দু কৃত্রিম হাসল তার কথায়। কণ্ঠে দম্ভ নিয়ে বলল,
“তন্ময় কী এমন বলেছে যে আপনার আমার প্রতি সহানুভূতি জাগছে তা আমি জানি না। কিন্তু ও কাজটা ঠিক করেনি। আমি কোনো সহানুভূতির পাত্র নই। আর যতক্ষণ না প্রয়োজন হবে ততক্ষণ আমি কারোর সাহায্য নেবো না। এটা আপনি অহংকার ভাবতেই পারেন। সেটা আপনার ব্যাপার।”
“আমি আবারো বলছি, তন্ময় আমায় অনুরোধ করে এখানে এনেছে কারণ সে আমার কাছে পড়া ছাড়তে নারাজ ছিল। নয়তো আমি আমার ব্যবস্থা অন্যত্র করেছিলাম। তাই দয়াকরে আগ বাড়িয়ে সাহায্য করতে আসবেন না।”

রুহানের চোখেমুখে ক্ষোভ ফুটে উঠল। থমথমে মুখে বলল,
“সব সাহায্য আর্থিক হয় না। আমি শুনেছি আপনি এন টি আর সি এ এর প্রিপারেশন নিচ্ছেন। আমি সেখানে আপনাকে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম। কারণ আমার ভালো একটা অভিজ্ঞতা আছে।”
শরীর ক্রমশই তার ভারসাম্য হারাচ্ছে। বিন্দু দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“সাহায্য লাগলে আমিই যোগাযোগ করব। আপনাকে এত কনসার্ন দেখাতে হবে না। ধন্যবাদ।”
বলেই সে দ্রুত বেরিয়ে গেল। রুহান দাঁতে দাঁত চেপে সেই গমনের পানে চেয়ে রইল। নারীটি সবদিক থেকে ভিন্ন। চলাফেরা, ব্যক্তিত্ব সবদিক থেকে। আর না চাইতেও হাজার ভীড়ের মাঝে এটা আকর্ষণ করে। কিন্তু নারীটি বেজায় অহংকারী!
সে মাথা নেড়ে চলে গেল উপরে।

কেটে যায় আরো দু’টো দিন। তখন বিকাল তিনটা বাজে। চট্টগ্রাম বন্দর পুরোটা তখন গোয়েন্দা সংস্থার আয়ত্তে। গোয়েন্দা সংস্থার অনুমতি আর পর্যবেক্ষণ ব্যতীত কোনো শিপ যেতেও পারছে না, ঢুকতেও পারছে না। এমনকি পুরো দেশের সব কয়টা বন্দরের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে গোয়েন্দা সংস্থা।
বিশেষ করে তেল জাতীয় শিপমেন্ট পুরোপুরি বন্ধ।
তালহার আর তার টিমের তিনজন স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থার সিনিয়র অফিসারের সাথে বিশদ আলোচনায় মগ্ন ছিল। স্থানীয় অফিসার পর্যবেক্ষণের এক পর্যায়ে বললেন,
“এভাবে সব আঁটকে রাখলে আর্থিকভাবে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হবে পুরো দেশ।”
“কিন্তু তারা যতক্ষণ পর্যন্ত নিজে থেকে নড়াচড়া না করছে ততক্ষণ এই কার্যক্রম চালু হবে না। আমি অনুমতি নিয়ে এসেছি। আমি তাদের পেছনে আর ছুটব না তারা ছুটবে।”
সিনিয়র অফিসার মৃদু হেসে বললেন,
“উভয়পক্ষের পরিস্থিতি শোচনীয় এখন। আশাকরি আপনার পরিকল্পনা দ্রুতই বাস্তবায়ন হয়ে যাবে। এখানে তিনটা কন্টেইনারে আমি ঝামেলা পেয়েছি। তারা কোনোভাবেই কন্টেইনার দেখাতে রাজি না। আর না তারা লিগ্যাল কাগজপত্র দেখাতে পারছে।”
তালহার মৃদু হেসে বলল,

” শুধু তিনটা? প্রতিটা বন্দরে এমন তিনটা চারটা পাঁচটা কন্টেইনার থাকে যার কাছে কোনো সরকারি লিগ্যাল নোটিশ থাকে না।”
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“আমি জানি স্যার। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো এর পেছনে দেখবেন কোনো বড় ক্ষমতার আসনে বসা সরকারি লোক ই জড়িত।”
“আমি তেমনটাই আশা করছি।”
“আপনার কারোর উপর সন্দেহ আছে?”
“একজনের উপর বিশ্বাস আছে।”
তালহার ঘাড় মর্দন করতে করতে বলল। সিনিয়র অফিসার চকিতে তাকে দেখল।
“কার উপর?”
তালহার মৃদু হেসে বলল,

“আপাতত নামটা না উচ্চারণ করাই বেটার।”
“কোনো সলিড প্রুফ পেয়েছেন?”
“নাহ, তবে আশাকরি শিঘ্রই পেয়ে যাব।”
“আচ্ছা ঠিক আছে।”
তাদের কথার মাঝেই তালহারের বাম পকেটের ব্যক্তিগত ফোনটা বেজে উঠল। তালহার ফোন বের করতে করতে একটু দূরে চলে গেল। শাশুড়ির ফোন দেখে ললাটে ভাঁজ পড়ল। আজ দীর্ঘ এগারো দিন তার সংসারজীবনের ভাঙনের কথা বরিশালের কেউ জানে না।
সে কিছুটা সংশয় নিয়ে ফোনটা রিসিভ করে সালাম দিল।
“মা, আসসালামুয়ালাইকুম।”
অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসল সালামের জবাব আর আদুরে কণ্ঠ।
“তালহার, তুই কি অফিসে?”
তালহার সতর্ক কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ, মা।”
“বাড়িতে কখন ফিরবি?”
“কেন?”

“বিন্দুর যে জ্বর বেড়েছে তা কী তোকে বলেছে? একটু আগে কথা হলো জ্বরের কারণে কথা বলতে পারছিল না। আমি বুঝেছিলাম তুই অফিসে। আর ওই বেয়াদব তো যতক্ষণ না বিছানায় পড়বে ততক্ষণ কাউকে কিছু বলবে না। তুই একটু বাড়িতে যা আব্বু, দেখ ওর কী অবস্থা!”
পুরুষটির ললাটে ভাঁজ পড়ল। শাশুড়ির কথা খুব একটা মিথ্যা না। বিন্দু যতক্ষণে বিছানায় না পড়ে ততক্ষণে কাউকে বলে না যে তার শরীর খারাপ। সে বলল,
“আচ্ছা মা, আমি যাচ্ছি। তুমি চিন্তা করো না। আব্বুর আর সুপ্তর কী অবস্থা?”
“তোর আব্বুর প্রেশার বেড়েছে আর সুপ্ত তো ওই কলেজ আর ক্রিকেট নিয়েই পড়ে থাকে।”
“আচ্ছা, আব্বুকে কিছুদিন পর ঢাকায় এনে ভালো ডাক্তার দেখাবো।”
“তার প্রয়োজন নেই। বয়স হলে এমন একটু আধটু শরীর খারাপ লেগেই থাকে। তুই একটু তাড়াতাড়ি যা বাড়িতে। বিন্দু কথা বলতে পারছিল না।”

“আচ্ছা যাচ্ছি।”
ফোন রাখতেই তালহারের চোখেমুখে ক্রোধ ফুটে উঠল। তৎক্ষণাৎ কাউকে ফোন লাগালো। রিসিভ হতেই দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কবির, তুমি এই মাসে বেতনের জন্য আমার দুয়ারে আসলে তোমার হাত পা ভেঙে আমি নর্দমায় ফেলে আসব।”
অপরপ্রান্তে থাকা কবিরের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে হড়বড়িয়ে বলল,
“স্যার, আমি কী করেছি? ম্যাডাম আজ সকাল থেকে বাইরে বের হয়নি স্যার। এর বাইরে আর কোনো আপডেট নেই স্যার।”
“তোমার ম্যাডাম জ্বরে কথা বলতে পারছে না, কবির। অথচ তুমি বলেছিলে তার মাথার উকুনের খবর পর্যন্ত আমায় এনে দেবে।”
“কিন্তু স্যার, আমি তো শুনেছি ম্যাডামের মাথায় উকুন নেই।”
তালহার এবার রাগে ফেটে পড়ল।
“আমি ঢাকায় এসে সবার আগে তোমার হাত পা ভাঙব অথর্ব কোথাকার! আমার সামনে আসবে না একদম।”

তালহার রাগে ভাঙা একটা কাঠের চেয়ারে লাথি মেরে দ্রুত গোডাউন থেকে বেরিয়ে আসল। তার মাথা এলোমেলো লাগছে। ইদানিং সে কেন এত অমনোযোগী হয়ে পড়ছে কাজেকর্মে? কেন ভেতরকার এই অস্থিরতা? তবে কী সে ভয় পাচ্ছে? সেটাও আবার কাউকে হারিয়ে ফেলার?
দূর্বলতা যেন একটু একটু করে তালহারকে গ্রাস করছে। ললাটে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম অনাদরে মুছে নিলো তালহার। চোখের সামনে ভাসছে ডাক্তারের দেয়া রিপোর্ট আর তার বলা কথাগুলো। যেগুলো সে মনে করতে চায় না। অথচ সেগুলো তার পুরো মস্তিষ্ক এলোমেলো করে দিচ্ছে।
সে নিজের সবচেয়ে গোপন নাম্বারটি দিয়ে আবার কাউকে কল লাগালো। ঠিক তিনবারের বার কলটা রিসিভ হলো। এবং ভেসে আসা কণ্ঠটি এক মুহুর্তের জন্য তার চারিপাশ নিস্তব্ধ করে দিল।
“হ্যালো, কে?”
তালহারের পা থামে। কর্ণকুহর আরো সচকিত হয়। যেন ভেসে আসা প্রতিটা শব্দ ডিকোড করে সে কোনো গভীর রহস্য উন্মোচনে মত্ত।
বিন্দু জড়ানো কণ্ঠে বিরক্তি নিয়ে বলল,

“কথা না বললে ফোন দিয়েছেন কেন? আশ্চর্য!”
তালহার পলক ফেলে গলা খাঁকারি দিল। সহসা অপরপ্রান্তে নিস্তব্ধতা নেমে আসল। বিন্দুর চোখ সবেগে খুলে গেল। কণ্ঠে সরব নেমে আসা মেঘমেদুর শীতলতা নিয়ে তালহার মুখ খুলল।
“মিসেস মুজাহিদ, এড্রেস দিয়ে যাওনি যে। ডিভোর্স পেপার কী করে পাঠাবো?”
পাথরের ন্যায় শক্ত হয়ে যাওয়া বদনে বিন্দু শুকনো ঢোক গিলল। চোয়াল শক্ত করে বলল,
“আমি নিশ্চিত যেভাবে নাম্বার পেয়েছেন সেভাবে এড্রেস ও পাওয়া যাবে।”
“তা অবশ্যই যাবে। কিন্তু আপনার মুখ থেকে শোনাটা বেশি শ্রুতিমধুর হবে আমার জন্য।”
শারীরিক অসুস্থতার সাথে সদ্য যুক্ত হওয়া মানসিক অসুস্থতা বিন্দুকে নিস্তেজ করে দিল।
“কী চাই আপনার?”
তালহার নিঃশব্দে হেসে উঠল। ফিসফিসিয়ে বলল,

“মিসেস মুজাহিদকে।”
সহসা অপরপ্রান্ত থেকে মৃদু হুঁশিয়ারি ভেসে আসল।
“খবরদার তালহার! আমার জীবন কঠিন করে তুলবেন না। আমি চিনিনা কোনো তালহার মুজাহিদকে। আমি ঘৃণা করি এই নিকৃষ্ট নামটিকে। দ্রুত ডিভোর্স পেপার পাঠাবেন”
বলেই বিন্দু খট করে ফোনটা কেটে দিল আর নাম্বারটা ব্লক করে দিল। তালহার নিঃশব্দে হাসল দ্বিতীয়বার ফোনটা না ঢুকতেই।
মেহমেদ তখুনি তার পিছে এসে দাঁড়াল। বিনম্র কণ্ঠে বলল,
“স্যার, কোথায় যাচ্ছেন এত তাড়াহুড়া করে?”
“ঢাকায় যাচ্ছি মেহমেদ।”
তালহার ইমার্জেন্সি ফ্লাইটের টিকিট বুক করতে করতে বলল।
মেহমেদ উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
“কিন্তু স্যার আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি।”
“আমার একটু জরুরী কাজ আছে মেহমেদ। এদিকে আর আমাদের তেমন কাজ নেই। বাকি কাজ মাহির চৌধুরী আসলেই হবে।”

“তবে স্যার, আমিও আসি আপনার সাথে?”
মেহমেদ মিনমিন করে বলল। তালহার মাথা নাড়লো।
“আসুন।”
ইমার্জেন্সি টিকিট পেতে আর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে তালহারের অনেকটা সময় লেগে গেল। এগারোটা বাজে তালহার ঢাকায় পৌঁছাল। ঢাকায় তখন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। এতটাই বৃষ্টি যে রাস্তার এপার ওপার দেখা যাচ্ছে না। পথঘাট শান্ত হতে শুরু করছে, দোকানপাট বন্ধ হতে শুরু করেছে। তালহার চিন্তিত কণ্ঠে বলল,
“কোনো খোলা রেস্তোরাঁ দেখলে থামাবেন মেহমেদ।”
মেহমেদ ড্রাইভ করতে করতে পাশে বসা মানুষটির অস্থিরতা অবলোকন করল। অদূরে যেতেই একটা রেস্তোরাঁ খোলা পেল। তালহার ভেতরে ঢুকতেই দেখল রেস্তোরাঁ বন্ধ হওয়ার পথে। সে বলল,

“হানি চিকেন হবে?”
ওয়েটার বিনম্র কণ্ঠে বলল,
“স্যার, কিছুক্ষণ আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে।”
তালহারের চোখেমুখে দুশ্চিন্তা ফুটে উঠল।
“ইমার্জেন্সি বানিয়ে দেয়া যাবে? এক্সট্রা পে করব।”
ওয়েটার মালিকের দিকে তাকালো। মালিক নীরবে মাথা নাড়লো। ওয়েটার বলল,
“এখুনি দিচ্ছি স্যার।”
তালহার বলল,
“আর দু’টো কফি দেবেন।”
তালহার টাকা পে করে কফি নিয়ে এসে গাড়িতে বসল। মেহমেদকে একটা কফি বাড়িতে দিয়ে বলল,
“মেহমেদ আশেপাশে কোনো ফার্মেসি পাই কি-না দেখি চলুন।”
মেহমেদ মাথা নেড়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। চিন্তিত বসকে দেখে সতর্ক কণ্ঠে বলল,
“কোনো সমস্যা হয়েছে স্যার? মিস মেঘের কিছু হয়েছে?”
তালহার চমকে তার পানে তাকালো।

“মেঘের কী হবে?”
“আপনাকে অনেক চিন্তিত দেখাচ্ছে। আর ফার্মেসি খুঁজছেন।”
তালহার বাহিরে দেখতে দেখতে বলল,
“আমার ব্যক্তিগত জীবন মেঘের সাথে জড়িয়ে নেই যে প্রতিটা ঘটনা সে জুড়ে হবে, মেহমেদ।”
মেহমেদ হতবুদ্ধি হয়ে তাকালো।
“বুঝলাম না স্যার।”
তালহার জবাব দিল না কিংবা জবাব দেয়ার ইচ্ছা হলো না। সে বলল,
“ঐযে ফার্মেসি। থামান।”
সে আবার নেমেগেল ছাতা হাতে। ফিরে আসল অনেকিছু নিয়ে। মেহমেদ আড়চোখে সেগুলো দেখল। সেখানে দু’টো সতেজ লিলিফুল ও ছিল। তালহার তাড়া দিয়ে বলল,
“ওই রেস্তোরাঁয় চলুন।”
মেহমেদ আবার রেস্তোরাঁর সামনে গাড়ি থামালো। হানি চিকেন নিয়ে বাইরেই ওয়েটার অপেক্ষায় ছিল তাদের। তালহার প্যাকেটটা নিয়ে সৌজন্য হেসে বলল,
“আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এই মুহুর্তে সাহায্য করার জন্য।”
ওয়েটার হাসিমুখে বলল,
“ইউ ওয়েলকাম স্যার। আবার আসবেন।”

তালহার স্মিত হাসল। এরপর পুনরায় মেহমেদকে তাড়া দিল। স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী মেহমেদ রমনা পার্কের কাছে এসে গাড়ি থামালো। সেই বৃষ্টির মাঝে তালহার রেইনকোট আর ছাতা ছাড়া বের হতে নিলে মেহমেদ চিন্তিত কণ্ঠে হয়ে বলল,
“স্যার, রেইনকোট, ছাতা না নিয়ে বের হচ্ছেন কেন?”
তালহার ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
“এখান থেকে আমি যেতে পারব মেহমেদ। আপনি চলে যান। ছাতা, রেইনকোট লাগবে না।”
“কিন্তু স্যার, অনেক বৃষ্টি হচ্ছে। তার চেয়ে আপনি বলুন কোথায় যাবেন আমি সেখানে পৌঁছে দিয়ে আসছি।”
“প্রয়োজন নেই মেহমেদ। আপনি যেতে পারেন।”
তালহার গম্ভীর কণ্ঠে বলল এবার। মেহমেদ আর জোর করার সাহস পেল না। কিন্তু তার মাঝে অনেক কৌতুহল এসে হানা দিল। যেগুলো মেটানোর কোনো উপায় ও ছিল না। সে চলে গেল।
গতকাল বিকাল থেকে বিন্দু ঘরবন্দি। এমনকি ওঠার পর্যন্ত শক্তি পাচ্ছে না। মেঝেতে পাতা বিছানায় অর্ধমৃত দেহে পড়েছিল সে। ঘুমের ঘোরেও তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল শারীরিক আর মানসিক কষ্টে।
লাগাতার ফোনের রিংটোনের শব্দে সে বহুকষ্টে চোখ মেলে তাকালো। হাত বাড়িয়ে মাথার কাছের ফোনটা চোখের সামনে ধরতেই আননোন নাম্বার দেখল। সে রিসিভ করে কানে ঠেকালো। কোনো প্রকার ভূমিকা ছাড়াই ভেসে আসল গুরুগম্ভীর আদেশ।

“দরজা খোলো।”
বিন্দু পুরোপুরি চোখ মেলে নাম্বারটি আবার দেখল। অন্তঃস্থল থেকে একটা অবসাদগ্রস্ত ক্লান্ত নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসল।
“আপনি এখানে কী করছেন?”
“বাইরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে আমি ভিজে গিয়েছি পুরো। তাড়াতাড়ি করো।”
না চাইতেও বিন্দুকে উঠতে হয়। টালমাটাল পায়ে গিয়ে সদর দরজা খুলে শ্রান্ত দৃষ্টি ফেলল সম্মুখে। কাকভেজা হয়ে চিরচেনা সেই পরিপাটি অফিশিয়াল বেশভূষায় দাঁড়িয়ে আছে তালহার। অথচ লোকটার গায়ে বৃষ্টির পানি লাগলেই জ্বর এসে যায়। এলার্জির প্রকোপ বেড়ে যায়।
চোখেমুখে আঁছড়ে পড়া গাম্ভীর্যতা নিয়ে সে থমথমে মুখে বলল,
“কেন এসেছেন?”

তালহার দৃষ্টি সরায়। হাতের ব্যাগগুলো ঘরের ভেতর রেখে নিরুদ্বেগ বিন্দুর সামনে এসে দাঁড়ালো। হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে মেয়েটির কপাল ছুঁয়ে বলল,
“যখন কৈফিয়ত চাওয়ার কথা ছিল তখন চাওনি। তাই এই জীবনে আর কখনো কোনো কৈফিয়ত পাবে না। জ্বর তো প্রচুর। কতদিন ধরে জ্বর আছে?”

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৪

বিন্দু জবাব দিল না। শুধু একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল নির্লিপ্ত সেই মুখপানে। লোকটির চোখেমুখে সেই একই চিন্তা, একই দায়িত্ববোধ। যা আঁকড়ে ধরে সে তিনটা বছর কাটিয়ে দিয়েছে। তার চোখেমুখে প্রতারণার একটুও অনুশোচনা নেই।

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here