Home জোড়া পাতার দিনলিপি জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১
তোনিমা খান

অজানা কারণেই অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের প্রতি বিন্দুর অজস্র কৌতুহল। আচ্ছা, একজন অজানা অচেনা মানুষের সাথে বিয়ে হলে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক কেমন হয়? তারা অচেনা থেকে একে অপরের সুখ দুঃখের ভাগীদার হয়ে ওঠে কী করে?
মনে মনে ঠিক করে জীবনে যখন বৈবাহিক সম্পর্কে জড়াবে তখন অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ-ই হবে তার একমাত্র উত্তম পথ। এবং তার সাথে সেই পথের পথিক হবে কোনো এক চমৎকার অজানা অচেনা মানুষ!
যার সাথে দেখা হবে। একে অপরকে জানতে, বুঝতে একটু আধটু প্রেম হবে। সংসারের হাল ধরতে একে অপরের সহযোগি হবে এবং কোনো এক নিঝুম রাতে একে অপরকে বুঝতে বুঝতে তারা ভীষণ গভীরে চলে যাবে, যেই গভীরতা থেকে ফিরে আসার কোনো উপায় থাকবে না।
অচেনা মানুষটার সাথেই তাকে পাড়ি দিতে হবে মৃত্যু পর্যন্ত একটা দীর্ঘ পথ। যেই দীর্ঘ পথে লিপিবদ্ধ থাকবে যৌবন, পৌঢ়াবস্থা এবং বার্ধ্যক্য।

এমন চমৎকার ইতিবাচক ভাবনা নিয়েই বিন্দু অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ নিয়ে একটা ফ্যান্টাসির রাজ্য গড়ে তোলে। যেই ফ্যান্টাসি রাজ্য একদিন সত্যি সত্যি বাস্তবায়িত হয়।
আর সেই ফ্যান্টাসি রাজ্যের রাজা হয়ে আসে ‘তালহার মুজাহিদ’ নামক এক অচেনা অজ্ঞাত পুরুষ। পেশায় যিনি ছিলেন গোয়েন্দা সংস্থার গেজেটেড পদের অধিকারী সিনিয়র অফিসার।
তাদের প্রথম দেখা হলো সামাজিক আনুষ্ঠিকতার সাথে। বরিশাল ইউনিভার্সিটিতে কেমিস্ট্রি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের মেধাবী ছাত্রী ছিল বিন্দু। নিজের স্বপ্নের সেই রাজকুমারের বাস্তবিক রূপে সে সেদিন মুগ্ধ হয়েছিল।
গম্ভীর, সংযত, স্বল্পভাষী একজন মানুষ।
এরপর দুই পরিবারের সম্মতিতে একসাথে দীর্ঘ পথচলার জন্য একে অপরের সাথে বিবাহ নামক পবিত্র সম্পর্কে আবদ্ধ হয় তারা।

তবে বিয়ে হতেই বিন্দুর সকল ফ্যান্টাসি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। বিয়ের পরই তার কল্পনার রাজ্যে প্রথম ফাটল ধরল। তালহার সেদিন ই চাকরির কারণে ঢাকায় চলে গেল।
একদিন। দুইদিন। এক সপ্তাহ। তারপর এক মাস। এক মাসেও আর ফিরল না, দেখা হলো না, কথা হলো না, অনুভূতির লেনদেন হলো না। একটা সময় মনে হতে লাগল অন্তঃস্থলে গড়ে তোলা সেই স্বপ্নের রাজ্য সবটা ভ্রম হয়েই থেকে যাবে। বিন্দুর নতুন বৈবাহিক জীবন শাশুড়ির সাথেই কেটে যায়।
তবে দীর্ঘ এক মাস পর একদিন রাতে হঠাৎ একটা আননোন নাম্বার থেকে কল আসল। রিসিভ করতেই ভেসে আসে গুরুগম্ভীর কণ্ঠ।
“আসসালামুয়ালাইকুম।”
বিন্দু ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
“ওয়ালাইকুমুস সালাম, কে বলছেন?”
“আমি তালহার!”

অত্যাধিক ভারী কণ্ঠে বিন্দু ধড়ফড়িয়ে লাফিয়ে উঠল। গুছিয়ে কথা বলা ভুলে গেল মেয়েটি। নিশ্চল মস্তিষ্কে তোতলাতে তোতলাতে কিছু বলতে চাইলে অপরপ্রান্তের দড় আওয়াজ তাকে থামিয়ে দিল।
“আগামী সপ্তাহে আমি বাড়িতে আসব। ফিরে আসার সময় তোমায় ঢাকায় নিয়ে আসব। মানসিক এবং শারীরিক উভয় দিক থেকে প্রস্তুত থাকবে।”
বাক্যগুলো ছিল সোজাসাপ্টা। যেই কথায় একসাথে একটা সুন্দর সংসার গড়ার প্রারাম্ভের কথা বলা হয়েছিল, না-কি ঝড়ের পূর্বাভাস ছিল? ফোনটা কেটে গেল। সে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। যে মানুষটাকে ঘিরে এত স্বপ্ন, এত কল্পনা। তার সঙ্গে কি আদৌ কখনো বন্ধুত্ব হবে? ভালোবাসা হবে? নাকি সম্পর্কটা শুধু সামাজিক দায়িত্বের মাঝেই আটকে থাকবে?
মনের অন্তরালে প্রেমময় উর্বর জমি তখন আশাভঙ্গের যন্ত্রণায় তপ্ত মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছিল।
সপ্তাহ বাদ স্বামীর কথামতো বিন্দুর ঠাঁই হয় ব্যস্ত শহরের চার দেয়ালের মাঝে। কিন্তু সে অনুভব করল এই চার দেয়ালের মধ্যকার পরিবেশ যতটা না ছমছমে, গম্ভীর—তার চেয়েও স্বামী নামক মানুষটা ছমছমে, গম্ভীর।
তালহার খুব কম কথা বলত। সকালে অফিস। রাতে ফেরা। প্রয়োজনের বাইরে কোনো আলাপ নেই, কোনো গল্প নেই।
প্রথম প্রথম বিন্দুর ভীষণ কষ্ট হতো। কখনো কখনো মনে হতো, এই নীরবতা তাকে ধীরে ধীরে গিলে খাবে। তবু সে হাল ছাড়েনি।

ব্যাচেলর ছেলে মানুষের ঘর যেমনটা ভেবেছিল তার চেয়েও করুণ অবস্থা ছিল ঘরটির। স্বামী নামক মানুষটা থেকে কোনরূপ আশা না থাকলেও, বিন্দু নিজের হাতে গড়া একটা সুন্দর সংসারের আশা তখনো ছিল। সে নিজ মনে গুছিয়ে নিয়েছিল শূন্য, দূষণযুক্ত অযত্নে মোড়া ফ্লাটটিকে। সেটি ইট সিমেন্টের ঘর থেকে একটি যত্নে মোড়া সংসার হয়ে উঠল।
তবে তার মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে একদিন একটু আশার আলো ছুঁয়ে দিলো তালহার। একদিন তালহার বলল,
“সংসারের জন্য তোমার কী কী প্রয়োজন একটা লিস্ট বনিয়ে দাও।”
সাধারণ একটা বাক্য। কিন্তু দায়িত্ববান স্বামীর ন্যায় অতটুকু প্রশ্নে, স্বল্পচাহিদার বিন্দু মানুষটার সাথে গোটা এক সংসার জীবন মানিয়ে নেয়ার বুকভরা কারণ খুঁজে পায়। বিন্দুর মুখে হাসি ফুটে উঠল। লোকটা তার সংসার সাজানোর স্বপ্নে সঙ্গ দেবে।

সে সানন্দে সংসারের প্রয়োজনে লম্বা এক লিস্ট বানিয়ে দিয়েছিল। আর তালহার নীরবে সেই লিস্টের সবকিছু এনে তার সামনে হাজির করে। তবে চমৎকার ঘটনাটা সেখানেই ঘটল। যেখানে বিন্দুর আর কোনো সংশয় থাকল না যে—এই মানুষটার সাথে নির্দ্বিধায় গোটা এক সংসার জীবন কাটিয়ে দেয়া যাবে।
তালহার লিস্টের সবকিছু যখন এনে দিল তখন বিন্দু খানিক থমকালো।
জিনিসপত্রের সাথে এক ঝাঁক শাড়ি, চুড়ি, ঘরের জুতা, বাইরের জুতা থেকে শুরু করে একটা মেয়ের প্রয়োজনীয় সবকিছু, এমনকি অতি প্রয়োজনীয় স্যানিটারি ন্যাপকিন ও সেখানে ছিল।
এগুলো একটাও সে লিস্টে লিখে দেয়নি। মানুষটা নিজে বুঝে বুঝে এনেছিল। বিন্দু ফ্যালফ্যাল করে বোকার মতো তাকিয়ে ছিল অচেনা অজ্ঞাত মানুষটার দিকে।
ব্যস্ততার সাথে ঘর থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নেয়া তালহার সেই বোকা দৃষ্টি দেখে থমথমে মুখে বলেছিল,
“সংসারের জাঁতাকলে নিজের চাহিদাকে হারিয়ে ফেলা বোকামি। সংসারজীবনে নিজেকে নিয়ে কখনো কম্প্রোমাইজ করবে না। আগে নিজের সুখ, স্বস্তি নিশ্চিত করবে তারপর সংসার!”
ব্যাস্! বাক্যটা অদ্ভুতভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল বিন্দুকে। সেদিন প্রথমবার তার মনে হয়েছিল, মানুষটা হয়তো ভালোবাসার কথা বলতে জানে না; কিন্তু ভালোবাসার দায়িত্ব নিতে জানে।
আর সেই বিশ্বাস নিয়েই ধীরে ধীরে সংসারটাকে নিজের পৃথিবী বানিয়ে ফেলেছিল। যেই সংসার আগলে ধরে আজ তিন বছর অনায়াসে কাটিয়ে দিল বিন্দু।

তবে অন্তভাগে সত্যি হলো লোকমুখে বলা তীক্ত, অবান্তর কথাগুলোই।
পুরুষ মানুষ কখনোই নারীর মন বোঝে না। তারা শুধু তাদের ব্যবহার করতে জানে।
কাপড় গোছাতে থাকা বিন্দু স্মিত হাসল পুরোনো কথা স্মৃতিচারণ করে। তালহার মুজাহিদ সেদিন বোধহয় সবচেয়ে চমকপ্রদ বাস্তব কথাই বলেছিল।
“সংসার জীবনে আগে নিজের সুখ নিশ্চিত করতে হবে, তারপর সংসার।”
সে এই কথাটি মনে রেখেছিল। তাই তো আজ তালহার তার এই সুন্দর গোছানো সংসারটা ফেলে নিজের সুখ নিশ্চিত করেছে অন্যত্র।

কাপড়গুলো কাবার্ডে গুছিয়ে রাখতে রাখতে বিন্দু ম্লান হাসল।
এবার তার পালা—এই সংসার ছেড়ে আগে নিজের সুখ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রেশার কুকারের ছয়টা সিটি বাজতেই বিন্দু ছুটে গিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলো। আর এক পদের রান্না করলেই তার দায়িত্বের ভার খানিক কমবে। সে চুলা থেকে গরুর মাংসা নামিয়ে বাটিতে ঢেলে রাখলো, পরপরই চুলায় শিং মাছের ঝোল বসিয়ে দিল। তালহার দেশি খাবার খুব পছন্দ করে।
একে একে পুরো টেবিল ভরে গেল বাহারি রকমের খাবারে। সে ব্যস্ত গতিতে সব গুছিয়ে গুছিয়ে বাটিতে ভরে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রেখে ছুটলো গোসলে। চটজলদি গোসল করে ফ্যান আর এসি ছেড়ে তার নিচে চুল শুকালো আর একটা কেক ডেকরেশন করল।
এবং খুব যত্নে করে লিখল “শুভ জন্মদিন”
অতঃপর সেটিও ফ্রিজে রেখে নিজের পুরো ঘরময় গোছালো। তালহারের সব ওষুধগুলো এক জায়গায় গুছিয়ে রাখল যেগুলো সে রেগুলার খায়। সংসারের গুরুত্বপূর্ণ হাতের কাজগুলো গুছিয়ে উঠতে উঠতে তিনটা বেজে গেল।

সংসারে তার একাকিত্বের সঙ্গী হিসেবে তালহার একটা ফ্লাফি পার্সিয়ান বিড়াল এনে দিয়েছিল তাকে। তালহারের থেকে পাওয়া সবচেয়ে সুন্দর উপহার বোধহয় এটি ছিল। সে নিজের বিড়ালকে খাবার দেয়। তখুনি কলিং বেল বেজে উঠল স্বশব্দে।
বিন্দুর মুখে হাসি ফুটে উঠল সংসারের মূল খুঁটি এসে যেতেই। সে ত্রস্ত পায়ে দরজা খুলতেই তালহারের স্বভাবসুলভ শান্ত গম্ভীর মুখটি ভেসে উঠল। সে স্বভাবসুলভ হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করল,
“আসসালামুয়ালাইকুম, এত দেরি হলো কেন আজ?”
তালহারের থেকেও স্বভাবসুলভ সেই একই শান্ত স্বরের জবাব পেল,
“ওয়ালাইকুমুস সালাম, গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল।”
স্বামীর এক কথা মেনে নিয়ে বিন্দু বলল,
“ফ্রেশ হয়ে খেতে আসুন।”
বিন্দু পুনশ্চঃ মগ্ন হয় তার বাকি কাজ গুলো সম্পন্ন করতে। রান্নাঘরটা পরিষ্কার করলেই কাজ শেষ হয়ে যাবে। তালহারের নিজের ঘরে ঢুকতেই দেখল বিছানায় সব পোশাক ভাঁজ করা যেগুলো সে এখন পড়বে। তবে এগুলো তার এখন প্রয়োজন নেই। সে বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে গলা উঁচিয়ে ডাকলো,

“বিন্দু! বিন্দু!”
বিন্দু ছুটে এসে দাঁড়ায় বাথরুমের সামনে। ব্যস্ত কণ্ঠে শুধায়,
“জি, কিছু লাগবে?”
তালহার শার্ট খুলতে খুলতে বলল,
“তোয়ালে!”
“তোয়ালে তো গুছিয়েই রেখেছিলাম বিছানায়।”
বলতে বলতে বিছানার দিকে তাকায় বিন্দু। ঐ তো তোয়ালে! সে তোয়ালে এনে তালহারের হাতে দেয়।
“আর কিছু লাগবে?”
বিন্দুর প্রশ্নে তালহার শান্ত দৃষ্টি ফেলে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
বিন্দু স্থির দৃষ্টি ফেলল সেই বাড়িয়ে দেয়া হাতের দিকে। মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। নিভে যাওয়া আনত আদলে বলল,

“আমি গোসল করেছি।”
তালহারের ভ্রুযুগলে ভাঁজ পড়ল। রুক্ষ স্বরে বলল,
“তোমায় বারণ করেছিলাম, আমি আসার আগে কখনো গোসল করবে না।”
এই অভ্যাস আজকের নয়, আড়াই বছরের। তবে আজ প্রথম বিন্দু তার কথার অমান্য করেছে। বিন্দু কৈফিয়ত দেয়ার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হলো। তালহার ততক্ষণে তাকে টেনে বাথরুমে ঢুকিয়ে নিয়েছে। বদ্ধ পরিবেশে বিন্দুর দৃষ্টি ম্লান হয়, বুকভরা এক চাপা ব্যথাতুর নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। কিন্তু ভেতরের যন্ত্রণাগুলো একটুও প্রকাশ পেল না মুখে। সব ভুলে বরাবরের মতো মুখে স্মিত হাসি ফুটিয়ে তুলল আর স্বামীর আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে।
দুইবার গোসল শেষে বিন্দু কাবার্ড থেকে একটা সিগ্রিন কালারের জামদানী শাড়ি পড়ে নেয়। ব্যস্ত গতিতে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকিয়ে নিলো।
তালহার তখনো গোসলে। তন্মধ্যেই তালহারের দ্বিতীয় ফোনটা বেজে উঠল স্বশব্দে। বিন্দু কিছুক্ষণ উদাসীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এগিয়ে গিয়ে ফোনটা হাতে তুলতেই দেখল স্ক্রিনে ‘মেঘ’ নামটি ভাসছে।
সে অসম্পূর্ণ বেনুনী হাতে বাথরুমের দরজা ধাক্কালো। মৃদু স্বরে বলল,

“এই যে শুনছেন, মেঘ ফোন দিচ্ছে অনেকক্ষণ যাবৎ। তাড়াতাড়ি নিন, ধরে কথা বলুন।”
বাথরুমের দরজাটি সবেগে খুলে গেল। ভেসে উঠল তামাটে বরণের পেটানো সিক্ত একটি বদন। ফ্রেঞ্চ কাট সিক্ত চুলগুলো বেয়ে বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। তালহার কোমড়ে তোয়ালে পেঁচিয়ে নিতে নিতে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কে ফোন দিয়েছে?”
অতি শান্ত মুখশ্রীতে স্পষ্ট সুপ্ত বিচলন দেখেও উপেক্ষা করল বিন্দু। হাতের ফোনটি এগিয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“মেঘ! কেটে গিয়েছে বোধহয়।”
“মেঘকে চেনো, তুমি?”
তালহার বিন্দুর অতি স্বাভাবিক মুখটি পর্যবেক্ষণ করতে করতে জিজ্ঞেস করল। বিন্দু ডানে বামে মাথা নেড়ে বলল,

“আমার স্বামীর ফোনে আর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা রয়েছে মেঘ নামের কোনো মেয়ের। এতটুকুই জানি তার ব্যপারে!”
তালহার মৃদু থমকালো। বিন্দু পা ঘুরিয়ে ব্যস্ত কদমে চলে যায় আরশির সামনে। বিন্দুর মুখশ্রী থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তালহার দৃষ্টি রাখে ফোনটির স্ক্রিনে। অজশ্র মেসেজ, কলের ছোট্ট একটা রিপ্লাই করল,
“পরে কথা বলছি।”
সে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে। বিন্দু তাকে বের হতে দেখেই অসম্পূর্ণ বেনী আঁকড়ে ধরে টিশার্ট ট্রাউজার এগিয়ে দিয়ে বলল,
“এই নিন তাড়াতাড়ি পড়ে নিন। ঠান্ডা লেগে যাবে।”
তালহার সেটি নিয়ে পড়তে লাগল। সরু তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আরশীর সামনে দাঁড়িয়ে বেনুনী করতে থাকা স্ত্রীর পানে। কোমড় ছাপিয়ে লম্বা চুল দুলছে সমানতালে।
সে ভ্রু কুঁচকে শুধালো,
“চুল শুকিয়ে গিয়েছে এর মধ্যে?”
“হ্যাঁ, হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে‌ শুকিয়ে ফেলেছি।”
“কিসের এত তাড়া ছিল? কতবার বলেছি হেয়ার ড্রয়ার ব্যবহার করবে না, চুল নষ্ট হয়ে যায়। তখন এত লম্বা চুল কেঁদেও পাবে না।”
“আজ একটু তাড়া আছে তাই শুকিয়েছি। আর কখনো এভাবে শুকাবো না।”
বিন্দুর ব্যস্ত কণ্ঠে টিশার্ট ট্রাউজার পরা তালহার এবার সোজাসুজি তাকায় তার পানে। চোখেমুখে অজস্র প্রশ্ন! পড়নে ভালো শাড়ি আর সাজ সরঞ্জাম দেখে সতর্ক কণ্ঠে শুধায়,

“তাড়া কেন? এভাবে ভরদুপুরে তৈরি হচ্ছো কেন? যাচ্ছো কোথায়?”
“যেখানে আল্লাহ তায়ালা ঠাঁই দেবে, সেখানে।”
বিন্দু মৃদু হেসে বলল।
কপাল কুঁচকে যায় তালহারের। বিন্দু সাধারণত তাকে ছাড়া কখনো ঘর থেকে বের হয় না। সে অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,
“মানে?”
স্বামীর কৌতুহলী কণ্ডে বিন্দু ফিরে তাকায়। বেনুনী করতে করতে বড্ডো স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
“সেদিন দেখলাম মেঘ আপনাকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। আমি থাকলে তো আর আপনি ওকে বিয়ে করতে পারবেন না। আসলে আমি বিগত পনেরো দিন যাবৎ চেষ্টা করছি একটা ব্যবস্থা করার, কিন্তু সেটা আজ করে উঠতে পারলাম। আশাকরি এখন আর ঝামেলা হবে না। আপনি আর মেঘ এখন একটা সুখী সংসার জীবন শুরু করতে পারবেন। আমি এখুনি চলে যাচ্ছি এই বাড়ি ছেড়ে।”

তালহারের হাতে থাকা তোয়ালেটা অসতর্কতার সাথে পড়ে গেল। শান্ত মুখশ্রীতে যেন অদ্ভুত বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হলো! তবুও মুখশ্রী একদম নির্বাক। বিন্দু হাসল! স্বামীর এই সদা শান্ত রূপ তার বড্ডো প্রিয়! পৃথিবী উল্টে গেলেও এই গম্ভীর মুখে কখনো কোন অনুভূতি প্রকাশ পায় না।
অথচ এই গম্ভীর মুখে সে রাজ্যের ভালোবাসা খুঁজে পায়! নির্বোধ কি-না! বিন্দু ফের বলতে শুরু করল,
“আসলে সেদিন রাতে আপনি ফোনে লক না দিয়েই গোসলে চলে গিয়েছিলেন। মেঘ তখন মেসেজ দিচ্ছিল, আমি সৌভাগ্যবশত দেখে ফেলেছি। ইচ্ছে করে করিনি একদম। আপনি তো জানেন আমার কখনো কারোর প্রাইভেসিতে হস্তাক্ষেপ করার অভ্যাস নেই।”
ততক্ষণে বিন্দুর বেনুনী করা শেষ। লম্বা চুল কি-না ! বেনুনী করতে সময় লাগে।
স্বামীর অবুঝ আশ্চর্য দৃষ্টি উপেক্ষা করে সে নিজের ছোট্ট এক্সেসরিজ ব্যাগটিতে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস ঢুকাতে ঢুকাতে বলল,

“আমি অল্প কিছু জিনিস-ই নিয়ে যাচ্ছি— যেটা আপনি আমার অবর্তমানে ফেলে দিবেন। আপনার অপ্রয়োজনীয়!”
স্বামী-স্ত্রী সদ্য কাটিয়ে আসা সুন্দর মুহুর্ত গুলো যেন নিমিষেই বিদঘুটে স্মৃতির পাতায় উঠে যাচ্ছে। মেয়ে মানুষ এতটা অনুভূতি হীন হয়? মিনিট খানেক আগের মুহুর্তগুলো এত সহজে ভুলে গিয়ে এত কঠিন কথাগুলো বলছে কি করে?
তালহার জহুরি চোখে একধারে তাকিয়ে থাকে স্ত্রীর পানে। অবুঝ হয়ে পড়ে, স্বামীর পরোকিয়ার কথা কোন মেয়ে এতটা সাবলীল ভাবে বলতে পারে? মস্তিষ্কের এই প্রশ্ন উপেক্ষা করে সে এবার মুখ খুলল। ঠান্ডা কণ্ঠে শুধায়,
“তুমি কি বলতে চাইছ, বিন্দু?”
বিন্দু তার ঘন পল্লব ঝাপটে পাল্টা অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,
“কি বলতে চাইছি?”
“এগুলো কি বলছ? কোথায় যাবে তুমি?”, তালহারের সতর্ক কণ্ঠ।
বিন্দু হাসল তার কথার প্রেক্ষিতে। কাঁধের ব্যাগটি গোছাতে গোছাতে বলল,

“স্বামীর বুকে অন্য এক নারী মাথা ঠেকিয়ে আছে, এই দৃশ্যের মানে আমায় বলে বোঝাতে হবে না। আমি বুঝি! বুঝি বলেই আপনাকে বিপাকে ফেলতে চাইনা। না আগে ফেলেছি আর না এখন ফেলব। আমি এক সপ্তাহের রান্না করে রেখেছি। ফ্রিজে সব বাটিতে বাটিতে গুছিয়ে রাখা। আমি বাটির উপরে খাবারের নাম লিখে রেখেছি।
আপনি একটু দেখে গরম করে খেয়ে নিবেন। আপনার অফিসে যাওয়ার জন্য সব জামাকাপড় প্রেস করে রাখা কাবার্ডে।
আর আপনার এলার্জির ওষুধ, ঠান্ডার ওষুধ থেকে শুরু করে সব ওষুধ গুলো বেডসাইড মিনি কাবার্ডে গুছিয়ে রাখা।
প্রতিদিন সকালে রাইস কুকারে দেড় কাপ চাল‌ বসিয়ে দিলেই আপনার একার পুরো দিনের খাবার হয়ে যাবে। এক সপ্তাহ, এতটুকু কষ্ট করে নিবেন। এক সপ্তাহ পর তো মেঘ নিশ্চয়ই এ বাড়িতে চলে আসবে, তাই না?”
ব্যাগ গোছানো শেষ। পার্স কাঁধে তুলে বিন্দু হাতের ব্যাগটি নিয়ে এগিয়ে আসে। থমকানো চিত্তে দাঁড়িয়ে থাকা স্বামীর সামনে এসে দাঁড়ায়। চিন্তিত স্বরে শুধায়,
“এক সপ্তাহের মধ্যে মেঘ এসে যাবে তো? না-কি আমি আরো কয় ধরণের খাবার রান্না করে রাখব?”
তালহার বাঁকহারা কোনো জড়বস্তুর ন্যায় শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইল। স্বামীকে নিরুত্তর দেখে বিন্দু নিজেই উত্তর বুঝে নিল।

“এসে যাবে, মেয়েটা যে পরিমাণে আনন্দিত হয়ে আছে। এক সপ্তাহ কেন, তিনদিনের মধ্যেই হয়তো এসে যাবে, তাই না? আমি তবে আসছি, নিজের খেয়াল রাখবেন। আর সময়করে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেবেন, আমি সাইন করে দেব।”
বলেই বিন্দু ছোট হাতের ব্যাগটি নিয়ে বেরিয়ে যায় রুম থেকে। তালহার পিছু ডেকে উঠল। শক্ত কণ্ঠে বলল,
“বিন্দু, আমার কথা শোনো। সবটা এতটা সহজ নয়! তুমি কোথাও যাচ্ছ না।”
বিন্দু সদর দরজা পর্যন্ত গিয়ে পা থামায়। বিধুর নয়নে ফিরে তাকায়। স্বামী নামক মানুষটা তখনো পরিস্থিতি বুঝে ওঠার প্রয়াসে মগ্ন। সে প্রিয় সেই শক্ত চোয়ালের মুখটি দেখতে দেখতে মৃদু হেসে বলল,
“সবটা অনেক কঠিন! তাই আমি সহজ উপায় খুঁজে মরছি। সবটা যত সহজ যন্ত্রনা ততটা কম! টানাহেঁচড়া, জোরপূর্বকের মিথ্যা সংসার জীবনের থেকে সংসার বিহীন বাঁচা সুখের! অন্তত দিনশেষে মাথার দুই পাশের রগদুটো ছিঁড়ে যাওয়ার মতো অসহনীয় প্রদাহ সহ্য করতে হবে না। আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তালহার। আপনিই তো একদিন বলেছিলেন আগে নিজের সুখ, তারপর সংসার। আমি সেটাই করছি।”
বিন্দু একটু থামল। পুনরায় বলল,

“আপনার উপর আমার কোনো অভিযোগ নেই, আর না আছে কোনো পাওনা! আর না আপনার কোনো পাওনা আছে আমার কাছে। অবশ্য আপনি তো কখনো আমার কাছে কিছুই চাননি। আপনি কিছু চাইলে আমি না দিয়ে থাকতে পারি না। তাই তো জীবনের এই মুহূর্তে এসে যখন বুঝতে পেরেছি আপনি আমার থেকে মুক্তি চান, তখনো পিছু পা হইনি। আপনি মুক্ত তালহার। আপনি অনেক সুখী হন।
টেবিলে খাবার গরম করে রাখা, তাড়াতাড়ি খেয়ে নিবেন। নয়তো ঠান্ডা হয়ে যাবে। আপনার তো ঠান্ডা খাবার খাওয়ার অভ্যাস নেই, আসছি! আমার কোনো ভুলত্রুটি থাকলে ক্ষমা করে দেবেন।”
বলেই বিন্দু ব্যস্ত কদমে একপ্রকার ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বড্ডো তাড়া তার! একটু শ্বাস নেয়ার তাড়া! নিজেকে যন্ত্রনা থেকে মুক্তি দেয়ার তাড়া।

তালহার তখনো বলহীন, বুদ্ধিহীন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে কাপুরুষ শব্দটি! এন.এস আই এর তথাকথিত আলোচিত সিনিয়র গোয়েন্দা অফিসার শেষ পর্যন্ত তার ঘরের স্ত্রীর কাছেই হেরে গেল? তার গোপন সম্পর্কের কথা জেনেও, কি করে এতটা নিখুঁত অভিনয় করে গেল ছেড়ে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত?
সে কি তবে বাইরের দুনিয়ায় মত্ত থাকতে থাকতে চার দেয়ালের মাঝে থাকা ঘরকুনো গৃহিণীর মন পড়তেই ভুলে গিয়েছে?

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here