Home ডেসটেনি ডেসটেনি পর্ব ৩০

ডেসটেনি পর্ব ৩০

ডেসটেনি পর্ব ৩০
সুহাসিনি মিমি

ঝর্ণার নিচে কতক্ষন যাবৎ রমণী দাঁড়িয়ে আছে তার ইয়াত্তা নেই। ঝপঝপ করে অবিরাম ঝড়েই যাচ্ছে পানির প্রবাহ। রুমে আসা মাত্রই যে শরীরটাকে টেনে টুনে এসে ওয়াশরুমে ঢুকেছে, আর বেরোয়নি মেয়েটা। সময় পেরিয়েছে অনেক্ষন। ফাঁকা, ভঙ্গুর হৃদয়টা এখনো টালমাটাল। হিসেব মিলাতে ব্যস্ত ঠিক কি থেকে কি হয়ে গেল। চারপাশটা কেমন ঘুরছে। মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করছে অবিরত।ঝরঝর করে পানি পরে যাচ্ছে শরীর বেয়ে। সেই পানির নিচেই চোখ বন্ধ করে একধ্যানে দাঁড়িয়ে রইল প্রিয়ন্তী। কিন্তু ভেতরের আগুনটুকু কিছুতেই নিভছে না।

অগত্যাই ঠাস করে দেয়াল ঘেঁষে নিচে বসে পড়ল।
তারপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।আজ সকালেও সবকিছু কতটা স্বাভাবিক ছিল!নিত্যদিনের মতোই তো শ্রেয়ার সঙ্গে বের হয়েছিল সে। দিনের শেষে বাড়ি ফিরে স্বাভাবিক একটা সন্ধ্যা কাটানোর কথা ছিল না কি? কিন্তু
মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পুরো জীবনটাই উল্টেপাল্টে গেছে। এমন কেন হলো ওর সঙ্গে?মনের ভেতর প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে লাগল বারবার, হাজারবার। উত্তর এলোনা কোনো।
আচ্ছা ও কি কখনো কল্পনা করেছিল ওর বিয়ে এভাবে হবে? না। একদম না। প্রতিটা মেয়ের মতো তারও তো কিছু স্বপ্ন ছিল। পরিবার, আত্মীয়স্বজন থাকবে, ঘরভর্তি মানুষ নিয়ে তুমুল আনন্দে আয়োজন করে অনুষ্ঠিত হবে সেই বিশেষ দিনটি। কিন্তু তার ভাগ্যে কী জুটল?
আচ্ছা যদি তখন লোকটা রাজি না হতো?যদি সত্যিই ওই শাওন নামের ছেলেটার সঙ্গে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিত? যদি ভিডিও করে চারদিকে ছড়িয়ে দিত?

যদি সবাই জেনে যেত?যদি…যদি…যদি…।শত শত ভয় এসে একসঙ্গে চেপে ধরল ওকে।কাঁদতে কাঁদতেই দেয়ালে মাথা ঠেকাল প্রিয়ন্তী। সে জানে না ভবিষ্যতে কী তীব্র তাণ্ডব অপেক্ষা করছে। জানে না এই সম্পর্কের পরিণতি ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। শুধু এটুকু জানে, আজকের দিনটা ওর জীবনকে ধারালো চা কুর মতো দুটো ভাগে ভাগ করে দিয়েছে।
ওয়াশরুমের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে মিতালী। প্রিয়ন্তী কে বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে দেখেছে সে। ইতিমধ্যে বারকয়েক এসে দেখে গেছে মেয়েটা ওয়াশরুম হতে বের হয়েছে কিনা। তবে প্রতিবারই আশানরূপ ফল না পেয়ে ফিরে গিয়েছে। বাইরে থেকে ফিরেছে, গোসল করতে সময় লাগতেই পারে। এই ভেবে প্রথমে বিষয়টা গুরুত্ব না দিলেও এখন তাকে ভাবাচ্ছে। সময় যত গড়াতে লাগল, ততই কেমন অস্বস্তি হতে শুরু করল মিতালীর।
ঘড়ির দিকে তাকাল ও। চল্লিশ মিনিট পেরিয়ে পঞ্চাস মিনিটের কাটায় এগিয়েছে।এতক্ষণ ধরে গোসল করছে না নিশ্চই? এছাড়া প্রিয়ন্তীকে শাওয়ার নিতে আগেও দেখেছে সে। এতটা সময় কখনই লাগায়না মেয়েটা। তাহলে কি কিছু হয়েছে? ভেবেই দরজার কাছে গিয়ে নক করল এবার,

“প্রিয়?”
ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে আবার ডাকল,
“প্রিয় শুনতে পাচ্ছো?”
“হুম।”
উত্তরটা এলো অনেকক্ষন সময় নিয়ে। মেয়েটার চাপা ভাঙা ভাঙা স্বর শুনেই কেমন খটকা লাগল মিতালীর।জিজ্ঞেস করল,
“এতক্ষণ ধরে কী করছো?”
“কিছুনা ভাবি!”
“কিছু না মানে? প্রায় এক ঘন্টা হয়ে গেল। শরীর খারাপ লাগছে নাকি?”
“না।”
“তাহলে?
এবার আর কোনো উত্তর এলোনা ভিতর থেকে। মিতালী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল উত্তরের আশায়।
প্রিয়ন্তী সাধারণত এমন নয়। মেয়েটা যদি ভালো মুডে থাকে, তাহলে একটা প্রশ্নের জবাবে দশটা কথা বলে। আর এখন প্রতিটা শব্দও যেন খুব কষ্ট করে বের হচ্ছে মুখ থেকে। কিছু তো একটা হয়েছে।নিশ্চয়ই হয়েছে।কিন্তু আর চাপ দিল না মিতালী।শুধু বলল,

“আচ্ছা, তাড়াতাড়ি বের হও। তোমার ভাই এসেছে। ডাকছে তোমায়।”
“আসছি।”
আরও কিছুক্ষণ পর বাথরুমের দরজা খুলে বের হলো প্রিয়ন্তী।মিতালী ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। প্রিয়ন্তী বের হতেই চোখাচখি হলো দুজনের। প্রিয়ন্তী থতমত খেয়ে চোখ সরিয়ে নিলো তাৎক্ষণিক। তবে মিতালী স্পষ্টতই লক্ষ্য করল মেয়েটার ফ্যাকাশে মুখ আর ফোলা ফোলা চোখ দুটো।প্রিয়ন্তী মাথা নিচু করে বারান্দার দিকে যেতে নিলেই ডাকল মিতালী,
“প্রিয়?”
থামাল মেয়েটা।উল্টো না ঘুরেই বলল,
“হুম?”
মিতালী এগিয়ে এলো। এসে দাঁড়াল ওর মুখোমুখী হয়ে। তারপর স্থির চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কাঁদছিলে তুমি?”
“কই? না তো।”
” তাকাও আমার দিকে!”
প্রিয়ন্তী ইতস্তত করে তাকাতেই মিতালী আবারো বলল,
“তোমার চোখের অবস্থা দেখেছো?”
“শাওয়ারের পানি পড়েছে।”

“আমাকে বাচ্চা মনে হয় তোমার প্রিয়?মিথ্যা কেন বলছো? কি হয়েছে বলোতো? আসার পর থেকেই দেখছি তোমাকে অন্যরকম লাগছে। ভাবি কে খুলে বলো সব। কিছু কি হয়েছে?”
প্রচন্ড উদ্বিগ্ন হয়ে কথাগুলো বলে উত্তরের অপেক্ষায় একনিষ্ঠ চোখে চেয়ে রইলো মিতালী।এ কেমন ভাগ্যর পরিহাস! যে মানুষটা কিনা ওকে ভালোবাসা তো দূর, সামান্য পছন্দ অব্দি করে না তার সঙ্গেই কি তবে সারাজীবন কাটাতে হবে? তাজধীরের রুক্ষ, গম্ভীর চাবুকের মতো কথাগুলো তিরের ফলার মতো বুকে বিঁধছে তখনো। অবাধ্য মন বারবার আওড়াল, উনি তো পরিস্থিতির শিকারে পড়ে দায়বদ্ধতা থেকে হাত বাড়িয়েছেন। সেখানে মায়া থাকতে পারে, মন কই? এক তীব্র, দমবন্ধ করা অনিশ্চয়তা এসে গ্রাস করল ওর চারপাশ।​কিছুক্ষনের জন্য প্রিয়ন্তীর ভীষণ ইচ্ছে হলো মানুষটাকে জড়িয়ে ধরে গড়গড় করে সবটা বলে দিতে।আজকের প্রতিটা ঘটনা বিস্তারিত খুলে বলতে।কিভাবে ওকে অপছন্দ করা লোকটার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে সেটাও খুলে বলতে। কিন্ত কীভাবে বলবে?কোথা থেকে শুরু করবে? সে নিজেই তো এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। অন্য কাউকে কীভাবে বিশ্বাস করাবে?তাই মুখ ঘুরিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“মাথাটা একটু ধরেছে।তাই এমন লাগছে হয়তো। তুমি যাও আমি আসছি এখুনি।”
মিতালী আর কথা বাড়াল না। শুধু আলতো করে মেয়েটার মাথায় হাত রেখে বলল,
“যখন বলতে ইচ্ছে করবে, তখন বলো। জোর করব না।”
এইটুকু বলল শুধু। পরপরই বেরিয়ে এলো রুম ছেড়ে। ভাবি যেতেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ফ্যাকাশে মুখশ্রীর দিকে তাকাল প্রিয়ন্তী।তখুনি নিচতলা থেকে ভেসে এলো পাভেলের ডাক।
​”প্রিয় নিচে আয়!”
​মুহূর্তে সম্বিৎ ফিরল প্রিয়ন্তীর। চোখের কোণের অবাধ্য জলটুকু হাতের উল্টো পিঠে মুছে নিলো দ্রুত। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে পা বাড়াল নিচের দিকে। ডিনারের টেবিলে বসেছে মিতালী আর পাভেল। প্রিয়ন্তী এসে নিঃশব্দে নিজের চেয়ার টেনে বসল। মিতালী আড়চোখে একবার দেখে নিয়ে পরম যত্নে খাবার তুলে দিল ওর প্লেটে। প্রিয়ন্তী বাধা দিল। হাত বাড়িয়ে ইশারায় বলল আর কিছু না দিতে। ভেতরটা যার মরুভূমি, তার আবার কিসের ক্ষুধা!​পাভেল এক লোকমা মুখে পুরে হঠাৎ শান্ত গলায় কথা তুলল,

​”পরীক্ষার প্রিপারেশন কেমন তোর?”
​প্রিয়ন্তী চোখ না তুলেই সংক্ষিপ্ত জবাব দিল,
“ভালো, ভাইয়া। চলছে।”
​পাভেল কিছুক্ষণ নীরব রইল। পানির গ্লাসে হাত রেখে আচানক ফের শুধাল,
“শুনলাম আজ নাকি কোথায় গিয়েছিলি তোরা?”
​মুহূর্তের জন্য থমকে গেল প্রিয়ন্তীর হৃদপিণ্ডের রক্তক্ষরণ! খাবারের লোকমাটা গলায় আটকে গেল আচানক। ভাইয়ের এহেন প্রশ্নে সারা শরীর বরফের মতো জমে গেল নিমিষে। তবে কি পাভেল সব জেনে গেছে? ধরা পড়ে গেল সব? হাত-পা কাঁপতে শুরু করল তীব্র আতঙ্কে। ​থতমত খেয়ে ঢোক গিলে কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
​”হ্যাঁ ভাইয়া। ওই শ্রেয়ার সঙ্গে একটু বাইরে গিয়েছিলাম।”
​পাভেল আর কিছু জানতে চাইল না এ বিষয়ে। দৃষ্টি তার প্লেটেই নিবদ্ধ। খাবার শেষ করে চিবুক মুছে গম্ভীর গলায় আদেশ ছুঁড়ল এবার,
​”শোন, আগামীকাল সন্ধ্যায় তোরা দুজনেই রেডি থাকবি। আমরা একটা দাওয়াতে যাবো।”
জবাবে প্রিয়ন্তী মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকলেও ফট করেই প্রশ্ন করল মিতালী,
​”কোথায় যাবো আমরা?”
​পাভেলের মুখাবয়ব আরও গম্ভীর দেখাল এবার। চোখের মণি জোড়া স্থির রেখে কাটকাট গলায় বলল,
​”অভিরাজ ভাইদের বাড়িতে। উনার বাবা-মা বিদেশ থেকে এসেছেন। থাকবেন অল্প কিছুদিন শুনলাম। উনারা তো আমাদের বাড়িতে আসেননি কখনো। এমনকি আমাদের বিয়েতেও আসতে পারেননি। তাই অভিরাজ ভাই নিজে থেকে দাওয়াত দিলেন। তোমরা দুজনেই রেডি থেকো।”

​কুয়াশায় মোড়ানো স্নিগ্ধ সকাল।নিত্যদিনের ​রুটিন মোতাবেক আজও খুব ভোর বেলায় ঘুম ভেঙে যায় শেহরোজের। ​ঘুম থেকে উঠেই নিজের রুমের এককোণে থাকা মিনি জিমের ইনস্ট্রুমেন্টগুলোর দিকে এগোল সে। টানা এক ঘণ্টা চলল পুশ-আপ, ডাম্বেল আর ট্রেডমিলের তীব্র কসরত। উন্মুক্ত চওড়া পিঠ আর পেশিবহুল বুক বেয়ে ঝরে পড়ছে ঘামের বিন্দু। এক্সারসাইজ শেষ করে কিছুক্ষণ চোখ বুজে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলো বেড বরাবর থাকা কালো রঙা লম্বা কাউচটায়।
​ফ্রেশ হয়ে নিচে নামল এরপর। নামতেই চোখে পড়ল ডাইনিং টেবিলটায়। কাক ডাকা ভোরেই ঝুমুর উঠে তার জন্য সকালের ব্রেকফাস্ট তৈরী করে সাজিয়ে রেখেছে সেথায়। ঐতো দুটো সেদ্ধ ডিম, আর কিছু ফলমূল রাখা।

​নাস্তা শেষ করে এক মগ কফি বানাল নিজ হাতে। উইথ আউট সুগার। ধোঁয়া উঠা কফির মগটা নিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে এলো নিজের রুমের উত্তরমুখী বারান্দাটায়। এই বারান্দাটা অদ্ভুত। বাড়ির মুখোমুখিও না, আবার ঠিক পেছনের সাইডেও না। ঠিক উত্তর কোণ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই বারান্দার নিচেই রাজত্ব করছে মস্ত বড় এক ফুলের বাগান।
​বাগানটা সেহরোজের নিজের হাতে গড়া। বড্ড আদরের। যদিও এখন দেখভালের জন্য দুজন মালি বরাদ্দ আছে। উপর থেকে নিচ পর্যন্ত বড় বড় লতানো ডাল আর রাজকীয় সব ফুলের ছোঁয়ায় বারান্দাটা প্রায় ঢেকে থাকে। বাগানের এক কোণে ফুটে আছে বিরল প্রজাতির ব্ল্যাক ব্যাকারা রোজ। নীল মণি লতা, অর্কিড। মাঝখানে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একঝাঁক সগর্ব সূর্যমুখী।

​মগে চুমুক দিয়ে সূক্ষ্ম নজরে বাগানটাকে পরখ করছিল সেহরোজ। হঠাৎ করেই দু-ভ্রুয়ের মাঝে গভীর ভাঁজ পড়ল তার। কুঁচকে গেল চোখের মণিযুগল। ​বাগানের একটা অংশ কেমন অস্বাভাবিকভাবে নড়ছে! ধুপধাপ শব্দে দুটো তাজা সূর্যমুখী গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল নিমেষেই।সেহরোজের সতর্ক দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হলো।অবলোকন করল ভালো করে।​কেউ একজন… কেউ একজন অতি স্পর্ধায় ওর সাধের সূর্যমুখী গাছগুলো কে টে ফেলছে!
​একটু ভালো করে তাকাতেই চোখে পড়ল শরীরটা। একটা থ্রি-পিস পরা মেয়ে। ওড়নাটা মাথার ওপর শক্ত করে পেঁচানো। মুখচ্ছবি বোঝার উপায় নেই। শুধু দুটো চোখ উন্মুক্ত রমণীর। হাতে একটা ধারালো চা কু নিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে একের পর এক ফুল কেটে চলেছে সে।​আদরের বাগানের এই নাজেহাল দশা দেখে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল মানবের। আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না সেখানে। হাতের কফির মগটা সশব্দে টেবিলে নামিয়ে রেখে ঝড়ের বেগে নেমে এলো নিচে।​বাগানের ঘাস মাড়িয়ে ঠিক মেয়েটার পেছনে এসে দাঁড়াল হিমালয়ের মতো শক্ত শরীরটা। বজ্রকণ্ঠে খেঁকিয়ে উঠল পেছন থেকে,
​”হেই! হেই স্টুপিড! কী করছ এসব?”

আচমকা আসা সেই তীক্ষ্ণ ​বজ্রকণ্ঠের ধমকে তড়িৎবেগে ঘুরে তাকাল মেহেরিন। ওড়নায় মুখ ঢাকা রমণীর চোখজোড়া স্থির হলো পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুশালী অবয়বটির পানে । ​মুহূর্তে থমকে গেল চারপাশ। প্রচন্ড রাগে, ক্ষোভে ফেটে পড়া এক শক্তপোক্ত, দীর্ঘকায় পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে ঠিক সামনে। তার ধূসর চোখের মণি থেকে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ঝরছে। মেহেরিন এতটাই স্তব্ধ হয়ে গেল যে অবশ আঙুলের ফাঁক গলে হাতের ধারালো চা কুটা ধপ করে আছড়ে পড়ল ঘাসের বুকে। অক্ষিপুট রসগোল্লার মতো বড় বড় হয়ে উঠল তার।​পুরুষটা বড্ড বেশি সুদর্শন! আকর্ষণীয় আর হ্যান্ডসাম দেখতে! এতোটা বলিষ্ঠ আর নিখুঁত গড়নের পুরুষ গ্রামে বড় হওয়া মেহেরিন এর আগে কখনো স্বচক্ষে দেখেনি। ঘোরলাগা চোখে সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরখ করতে লাগল লোকটাকে। লম্বা, চওড়া, রাজকীয় এক রাজপুত্র যেন। গায়ের রঙ ফর্সা।ধারালো চোয়াল ঘেঁষে থাকা হালকা ট্রিম করা কালো চাপদাড়ি পুরুষালি তেজ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।
মেহেরিনের দৃষ্টি আরও নিচে নামল। লোকটার পরনে কালো ট্রাউজার আর কুচকুচে কালো টি-শার্ট। টাইট-ফিটিং সেই টি-শার্ট ভেদ করে হাতের বাইসেপ আর বুকের সুগঠিত মাসেলগুলো স্পষ্ট ফুটে আছে। লোকটার চোখের ভয়ংকর রক্তচক্ষুর দিকে ওর কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। সে শুধু চেয়ে আছে একধ্যানে।
​তবে সেহরোজ থামল না। নিজের সাধের বাগানের এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখে রীতিমতো হম্বিতম্বী করে উঠল। দাঁতে দাঁত পিষে,চোয়াল দুটো খিঁচিয়ে আবারো গর্জন তুলল সে,
​”আর ইউ ডেফ? কানে শুনতে পাও না? স্টুপিড!কাটছিলে কেন এসব? কে তুমি? বেরিয়ে এসো এখান থেকে!”

​মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরুলো না মেহেরিনের। মেয়েটার এই মৌনতাই বেচারা শেহরোজ কে চড়িয়ে দিলো আরো। স্বভাবজাতভাবে সে মেয়েদের থেকে এক হাত দূরত্ব বজায় রেখে চলে। কিন্তু এই মুহূর্তে ক্রোধের পারদ এতটাই চড়া যে, সেই নিয়মের তোয়াক্কা করল না সে।​এক ঝটকায় মেহেরিনের নরম হাতটা শক্ত মুঠোয় পুরে নিল সেহরোজ।
আকস্মিক পুরুষালি সেই স্পর্শে সপ্তদর্শী মেহেরিনের সমস্ত অবয়ব থরথর করে কেঁপে উঠল। শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল এক অচেনা শিহরণ। ততোক্ষণে লোকটা ওকে টেনে-হিঁচড়ে তার অতি প্রিয় বাগানের সীমানা থেকে বের করে নিয়ে এসেছে। মেয়েটার চোখের অবাধ্য মণি জোড়া তখনো স্থির হয়ে আছে সেহরোজের কঠোর, রূঢ় মুখশ্রীর ওপর।
​লোকটা যে ওর ওপর রাগে ফেটে পড়ছে, চাবুকের মতো ধমক ছুড়ছে, তার একটি শব্দও মেহেরিনের মাথায় ঢুকল না। ও শুধু চাতক পাখির মতো চেয়ে রইল। এতো সুদর্শন ছেলে এই বাড়িতে? কে এটা? আগে কেন দেখেনি এনাকে? সে কি এ বাড়িতেই থাকে?

​মূলত মেহেরিনকে সেহরোজের মা সুমি বেগম গতকাল সকালেই গ্রাম থেকে নিজ বাড়িতে নিয়ে এসেছেন। লম্বা জার্নির ক্লান্তিতে মেহেরিন গতকাল সকালে কোনো রকমে অল্প স্বল্প খেয়ে খুয়ে দুপুরের দিকে ঘুমিয়েছিল। আর ওঠেনি। যার কারণে এই মস্ত বড় বাড়িটা ঘুরে দেখাও হয়নি তার। মফস্বলের বাইরে এই প্রথম শহরে আসা মেহেরিনের। এবারও তো আসতে চায়নি সে। সুমি আন্টি কত অনুরোধ করে ওর মায়ের কাছ থেকে একপ্রকার জোর করেই নিয়ে এলেন ওকে। আসার সময় স্পষ্ট বলেছিলেন—এ বিশাল বাড়িতে সে আর ঝুমুর ছাড়া আর কেউ থাকে না। মেহেরিনও ভেবেছিল, যাক গে পড়াশোনার হাত থেকে কিছুদিন তো অন্তত নিস্তার পাওয়া যাবে! এটা ভেবেই সুমি আন্টির সঙ্গে চলে আসা। কিন্তু তাহলে এই রুদ্রমূর্তিধারী পুরুষটা কে?

​গ্রামের মেয়ে হওয়ায় স্বভাবতই খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায় মেহেরিনের। ঘুম থেকে উঠেই নিস্তব্ধ বাড়িটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে বের হয়েছিল সে। সামনের দিকে তেমন আকর্ষণীয় কিছু না পেলেও, হঠাৎ করেই চোখ পড়েছিল উত্তর দিকের এই বাগানটার ওপর। আর সেখানে একঝাঁক উজ্জ্বল সূর্যমুখী ফুল দেখে রীতিমতো চকচক করে উঠেছিল ওর চোখ দুটো। সুমি আন্টিকে আসার পর থেকেই দেখেছে হাঁটুতে সূর্যমুখী তেলের মালিশ করতে। এত টাকা খরচ করে বাজার থেকে তেল কেনার দরকারটা কী? ও নিজেই তো এই তাজা ফুলগুলো কেটে বেটে তেল বানিয়ে দিতে পারে! মূলত সুমি আন্টিকে সারপ্রাইজ দেওয়ার মহৎ উদ্দেশ্য নিয়েই বাগানে হানা দেওয়া। আর যেহেতু বাগানে নানারকম লতাপাতা আর পোকামাকড় থাকে, সেই ভয়েই নিজের ওড়নাটা দিয়ে মুখমণ্ডল ভালো করে পেঁচিয়ে শুধু চোখ দুটো বের করে রেখেছিল।
​অথচ সেই মহৎ কাজের ফল যে এমন ভয়ংকর হবে, তা মেহেরিনের কল্পনাতেও ছিল কি? ​মেহেরিনের হাতটা ঝটকা মেরে ছেড়ে দিয়ে সেহরোজ দাঁতে দাঁত পিষল,
“কী হলো? মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না কেন? চোরের মতো মুখ ঢেকে আমার বাগানের এই দশা করার স্পর্ধা কে দিল তোমাকে? হু?”

​সেহরোজের এই ক্রমাগত ‘চোর’ আর ‘স্টুপিড’ সম্বোধনে মেহেরিনের ভেতরের জেদটা চাড়া দিয়ে উঠল এবার। ভয় আর ঘোর কেটে গিয়ে চোখের মণি দুটো রাগে জ্বলজ্বল করে উঠল। ওড়নার আড়াল থেকেই মুখ বরাবর ত্যাড়াত্যাড়ি করে চেঁচিয়ে উত্তর দিল,
​”চোর বলছেন কাকে হ্যাঁ? ভালো করে কথা বলুন! মুখ সামলান নিজের। আমি চোর নই। আমি সুমি আন্টির জন্য তেল বানাতে এসেছি। তেল কেনার এত টাকা-পয়সা খরচ করার কী দরকার যখন বাগানেই এত ফুল ফুটে আছে? আপনি নিজে তো একটা আস্ত জংলি! আর মেয়েদের গায়ে এভাবে হাত তোলেন কোন সাহসে? ইশ! আমার নরম তুলতুলে কোমল হাতটা!”
বলতে বলতে নিজের হাতের উপর দৃষ্টিপাত করল মেহরিণ। সত্যি সত্যিই লোকটার ধরা স্থানটা লাল হয়ে গেছে।ওদিকে নিজের মুখ বরাবর এমন ত্যাড়া, যুক্তিহীন জবাবে হতভম্ব সেহরোজ নিজেও।কখনো কোনো মেয়ে কোনোদিন তার সামনে এভাবে গলা উঁচিয়ে কিছু বলেছে কিনা সন্দেহ! তাও আবার নিজেরই সাধের বাগান ধ্বংস করার পর! রাগে সেহরোজের কপালের রগগুলো ফুলে উঠল।

​ চোয়াল শক্ত করে, মেহেরিনের দিকে আরও এক কদম এগিয়ে এসে হিসহিসিয়ে উঠল,
​”হোয়াট ডিড ইউ জাস্ট সে? জংলি? এত বড় স্পর্ধা তোমার! আমার নিজের প্রপার্টিতে দাঁড়িয়ে, আমারই সাধের গাছ কেটে ফেলে এখন আমার ওপরই গলা উঁচাচ্ছ? হাউ ডেয়ার ইউ!”
​”প্রপার্টি তো কী হইছে? গাছ কী আপনার একার? গাছ তো প্রকৃতির! আর আপনার এই সূর্যমুখীগুলো তো আন্টির ভালোর লাইগাই কাটতেছিলাম। উনি যে প্রতিদিন হাঁটুতে তেলের মালিশ করেন, তা এই শহরের ভেজাল তেল দিয়া মালিশ করার চেয়ে নিজের গাছের তাজা ফুল দিয়া তেল বানিয়ে দিলে আন্টির কত উপকার হইতো সেই বুঝ তো আপনার নেই। আর আপনি কে হ্যা? কোন বাড়ির লাটসাহেব?”
​সেহরোজের রাগ এবার সপ্তম আকাশে চড়ল। এই মেয়ের আজব যুক্তির মাথামুণ্ডু কিছুই তার মাথায় ঢুকল না। উল্টো তার বুদ্ধিমত্তা নিয়েই মেয়েটা প্রশ্ন তুলে দিল! দাঁতে দাঁত পিষে সেহরোজ বলল,
​”শাট আপ! জাস্ট শাট আপ ইডিয়েট! ফুল কেটে তেল বানাবে? এটা কোনো জঙ্গল নয় যে যা ইচ্ছা তাই করবে! কমন সেন্স বলতে কিছু আছে তোমার ভেতরে? নাকি পুরোটাই ফাঁকা? মুখটা এভাবে চোরের মতো ঢেকে রেখেছ কেন? সামনে তাকাও!”

​”ফাঁকা কার মাথা তা তো দেখাই যাইতেছে! ধমকাইবেন না একদম কইলাম। ধমকাইলে আমি আরও বেশি চিল্লাই। আর মুখ ঢাকছি আমার প্রয়োজনে। বাগানে কত পোকা-মাকড় থাকে জানেন না?”
​মেহেরিনের এই একের পর এক মুখের ওপর টাস টাস করে দেওয়া উত্তর সেহরোজের ধৈর্যের শেষ বাঁধটুকুও চূর্ণবিচূর্ণ হলো এবার। ওদিকে মেহরিণ ও কথা বলতে বলতেই মুখের উপর পেঁচানো ওড়নাটা হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলল। ​আর তাতেই থমকাল সেহরোজের ভেতরের সেই রুদ্রমূর্তি!
​ওড়নাটা সরতেই মেহেরিনের কোমর ছাপানো কুচকুচে কালো, সিল্কি চুলগুলো ঝরঝর করে ছড়িয়ে পড়ল পিঠময়। দৃষ্টিগোচর হলো এক অতি ফর্সা, টুকটুকে মায়াবী রমণীর মুখচ্ছবি। টানা টানা বড় বড় হরিণীর মতো চঞ্চলা চোখ দুটো ভাসমান হলো। কুচকুচে ঘন, নিখুঁত চিকন ভ্রুযুগল। মেয়েটার চোখের মণিদুটোও কালো নয়। হালকা ব্রাউন টাইপের। গাল দুটো ফোলা ফোলা, টকটকে লাল। এতক্ষণ নাকের আর মুখের ওপর ওড়না বাঁধা থাকার কারণে খাড়া নাকের ডগায় ছোট ছোট ঘামের ফোঁটা জমে আছে। মুক্তোর মতো চিকচিক করছে সেগুলো।

​সেহরোজ স্তব্ধ। বাকরুদ্ধ মানব শুধু একধ্যানে চেয়ে থাকল সেই অনিন্দ্যসুন্দর, তেজস্বী মুখের দিকে।
​অথচ মেহেরিন থামার পাত্রী নয়। ওড়না ফেলে দিয়েও সে সমান তালে লোকটার সাথে গা উঁচিয়ে চেঁচিয়ে যাচ্ছিল। ওদিকে সকালের এই সুনসান নীরবতা ভেঙে বাগানে দুজনের এই তুমুল চেঁচামেচি আর হট্টগোলের শব্দ পেয়ে বাড়ি থেকে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এলো ঝুমুর। ​বাগানের সীমানায় পা রাখতেই ঝুমুরের চোখ পড়ল মাটিতে পড়ে থাকা সেই ছিন্নভিন্ন সূর্যমুখী ফুলগুলোর ওপর। দূরে দাঁড়িয়েই ভয়ে শুষ্ক ঢোক গিলল বেচারি। বুকটা ধড়ফড় করে উঠল আতঙ্কে। মনে মনে আওড়াল,

​’খাইছে! আজকে গেছে এই মাইয়া! কামডা করছে কী? সোজা বাঘের খাঁচায় হাত ঢুকাইয়া বইসা রইছে!’
​পরিস্থিতি আরও বেগতিক রূপ নেওয়ার আগেই ঝুমুর একরকম দৌড়ে এলো মেহেরিনের কাছে। মেহেরিনের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে সেখান থেকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যেতে চাইলেও পা জোড়া মাটিতে শক্ত করে চেপে রাখল মেহরিণ। সে এখান থেকে কিছুতেই যাবেনা। প্রয়োজনে ওড়না কেচে জগড়া করবে এই ব্যাটার সঙ্গে। তবুও জগড়ায় তাকে জিততেই হবে।বেচারি ঝুমুর পড়ল মোহা ফাঁসাদে। একপর্যায়ে জোর করে টানতে টানতে বাড়ির দিকে নিয়ে গেল।​মেহেরিন হাত ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে চেঁচাল,
“আমাকে ছাড়ো ঝুমুর আপা! এই লোকটাকে আজ আমি একটা উচিত শিক্ষা দিয়ে ছাড়ব। মেয়েদের সাথে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, আইজ ওনারে আমি শিখাইয়া ছাড়ব!”
​ঝুমুর ফিসফিসিয়ে ত্রস্ত গলায় বলল,

“আস্তে! আস্তে কও! যদি নিজের জীবনটা বাঁচাইতে চাও, তবে এখুনি চুপ করো মেয়ে। সোজা আমার সাথে আসো। ভিতরে গিয়া সোজা সুমি আন্টির ঘরের ভেতর ঢুকবা। ভুলেও আর বাইরে পা বাড়াইবা না!”
​মেহেরিন মুখ বাঁকাল,
“আরে! তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন? এই জংলি লোকটারে এত ভয় পাওয়ার কী আছে?”
​ঝুমুর চোখ বড় বড় করে তাকাল,
“মাবুদ! তুমি চিনো না ওনারে?”
​”নাতো! কে উনি?”
​”এমা! যার বাড়িতে আইছো তার পোলারেই চেনো না? উনিই তো সেহরোজ ভাই! নেভির কমান্ডার। গতকাল বিকেলেই বাড়ি আইছে।”
​মেহেরিনের চোখজোড়া এবার কিঞ্চিৎ থমকাল,
“এহ?”
​”হু! আর এই বাগান সেহরোজ ভাইয়ের জানের জান, কলিজার টুকরা, পরানের আধখান। উনি এই বাগানরে নিজের থেকেও বেশি আদর-যত্ন করেন। আর তুমি কিনা সেইখানে আইসা হাত বাড়াইছো? এখন মনে মনে আল্লাহ আল্লাহ করো। একমাত্র আল্লাহই পারবে এখন তোমারে এই বাঘের হাত থেইকা বাঁচাইতে!”

অবশেষে চট্টগ্রামে নেভাল বেইজের অফিসার্স কোয়ার্টারে এসে পৌঁছাল তাজধীর। তার এই আকস্মিক প্রত্যাবর্তনের খবরটা মুহূর্তের মধ্যেই ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়ল চারধারে। কোয়ার্টারের সুনসান নীরবতা ভেঙে গুঞ্জন উঠল অফিসারদের মাঝে।
​রুমে প্রবেশ করেই শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে ওয়াশরুমে নিয়ে গেল তাজধীর। ঝপঝপ করে অবিরাম আছড়ে পড়া ঠান্ডা পানির ধারার নিচে সঁপে দিল নিজেকে। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ওয়াশরুমের দরজা মেলে বেরিয়ে এলো। ভেজা চুলগুলো থেকে চুইয়ে চুইয়ে পানি পড়ছে চওড়া কাঁধ বেয়ে। পরনে কেবল একটা কালো ট্রাউজার। উন্মুক্ত, বলিষ্ঠ বুক আর সুগঠিত অ্যাবসের খাঁজে খাঁজে জমে আছে পানির অবাধ্য কণা। তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুলগুলো মুছতে মুছতে পাশে চোখ পড়তেই দু-ভ্রুয়ের মাঝে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল।

​সোফার ওপর আয়েশ করে এক পায়ের ওপর অন্য পা তুলে বসে আছে অর্ণব। হাতে একটা মোটা ইংলিশ ক্লাসিক্যাল নভেল। তাজধীরের এ কোয়ার্টারে ফেরার খবর পাওয়া মাত্রই ছুটে এসেছে সে। প্রায় ঘণ্টাখানেক হতে চলল। বন্ধু শাওয়ারে গেছে বুঝতে পেরে বাধ্য হয়েই সময় কাটানোর জন্য তাজধীরের বুকশেলফ থেকে বই টেনে নিয়েছে। তাজধীরের কালেকশনে থাকা মনস্তাত্ত্বিক আর সাহিত্যিক ইংলিশ নভেলগুলো পড়তে পড়তে অর্ণবের নাক-মুখ কুঁচকে একাকার। এসব ধৈর্য ধরে পড়ার মতো বান্দা সে নয়। ​তাজধীরের পায়ের শব্দ পেতেই ফট করে বইটা বন্ধ করে সোফায় সোজা হয়ে বসল অর্ণব। বইটা সেন্টার টেবিলে সশব্দে ছুড়ে ফেলে, অধৈর্য চোখে বন্ধুর দিকে চেয়ে সরাসরি প্রশ্ন ছাড়ল,
​”এখন আমাকে বলতো, কাহিনীটা কী?”
​অর্ণবের প্রশ্নের পিঠে তাজধীর তোয়ালেটা পাশে ছুঁড়ে দিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দায়সারা কণ্ঠে আওড়াল,

​”কোনো কাহিনী নেই। জাস্ট কিছু পার্সোনাল কাজ ছিল।”
​অর্ণব কুটিল হাসল। সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তাজধীরের মুখোমুখি এসে থামল সে। চোখের মণি জোড়া সরু করে ব্যক্ত করল পরপর,
​”একদম আমার কাছে কথা লুকানোর চেষ্টা করবি না। তোকে আমি আজ নতুন চিনি না। তুই এমনি এমনি এত রাতে আমায় কল দিয়ে সমস্ত ইনফরমেশন চাইবি আর আমি সেটা বিশ্বাস করব? কিছু একটা কারণ তো অবশ্যই আছে। যে মিশনটা হেডকোয়ার্টার থেকে অনেকদিন আগে স্থগিত করা হয়েছিল, হঠাৎ এই মাঝরাতে সেটা নিয়ে তোর এত কীসের মাথাব্যথা? এক্সাক্টলি কারণটা কী? আবারও এটা স্টার্ট করার পেছনের রহস্যটা কী, বলবি এবার?”
​তাজধীর আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে ড্রয়ার থেকে একটা নেভি ব্লু শার্ট বের করতে করতে স্বভাবজাত ঠান্ডা কণ্ঠে প্রত্তুত্তর করল,
​”আমার জীবনে কোনো কিছু আনসলভড রাখা আমি পছন্দ করি না, অর্ণব। কোনো ইকুয়েশন অর্ধেক রেখে খাতা বন্ধ করা তাজধীরের ডিকশনারিতে নেই। কেসটা স্থগিত হয়েছে, ক্লোজড হয়নি।”
​অর্ণব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাত জোড়া বুকের কাছে বাঁধল,

“কিন্তু ওটা এখন লোকাল পুলিশের এক্তিয়ারে, আমাদের না।
“নদীপথে যে অস্ত্রের অবৈধ চালানটা আসছে, তার রুট চেনা আমার দরকার। আর ‘আল-বারাকা’ কার্গোর পেছনে যে মূল মাথাটা আছে, তাকে না টেনে হিঁচড়ে বের করা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। তুই শুধু আমাকে লোকাল সোর্সের ব্যাকআপটা দে।”
অর্ণব শুনল। সে জানে এই মানবের ধৈর্যের বাঁধ একবার ভাঙলে তাকে আটকানোর ক্ষমতা কারও নেই।
​”আচ্ছা, মিশনের ফাইলটার কথা না হয় মানলাম। কিন্তু তুই যে মাঝরাতে একটা আননোন নাম্বার পাঠিয়ে ওই নাম্বারের ইনকামিং, আউটগোয়িং অল কল ডিটেইলস চাইলি। এক ঘণ্টার মধ্যে সমস্ত ইনফরমেশন কালেক্ট করতে বললি—ওইটার সাথে এই অ স্ত্রের চালানের কী সংযোগ?”
​তাজধীরের শার্টের বোতাম আটকানো হাত দুটো থেমে গেল মাঝপথে। অর্ণব থামল না। বলল আগের ন্যায়,
​”মাঝরাতে ফোন দিয়ে তুই একটা মেয়ের সম্পর্কে ইনফরমেশন খুঁজছিস! তোর তো কখনো এভাবে মেয়েদের পেছনে লাগার বা হ্যারাস করার নেশা ছিল না। তবে মাঝরাতে কোন মেয়ের পাল্লায় পড়লি তুই? কে এই মেয়ে?কে এই প্রিয়ন্তী?”

​”তোদের ভাবি।”
​শব্দ দুটো বোমার মতো আছড়ে পড়ল অর্ণবের মগজে। ঠিক তখুনি ঘরের আধখোলা দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল ফাহিম। তাজধীরের মুখ থেকে বের হওয়া শেষ শব্দ দুটো ফাহিমের কানেও স্পষ্ট পৌঁছাল।​পুরো ঘরে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো কীয়তক্ষণের জন্য। ফাহিম দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়েই বাকরুদ্ধ, হা হয়ে গেছে যেন। কিছু বলার ভাষা হারিয়ে তোতলানো কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
​”ভাবি মানে? কার ভাবি? কোন ভাবি? কিসের ভাবি?”
​তাজধীর নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করতে করতে সোজা সাপটা জবাব দিল,
​”তোদের ভাবি মানে আমার বউ। বিয়ে করেছি আমি।”
​কথাটা যতটা না সহজভাবে তাজধীর বলল, উপস্থিত দুই বন্ধুর কাছে তা ততটাই অবিশ্বাস্য শোনাল। অর্ণব আর ফাহিম বিস্ময়ে একে অপরের মুখের দিকে চাওয়াচাওয়ি করল। তারা নিজেদের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। বিয়ে করেছে তাজধীর! এইজন্যই কি এত রাতে সে একটা মেয়ের নাম্বার নিয়ে ওমন পাগলের মতো ইনফরমেশন কালেক্ট করছিল? অথচ একটাবার ওদের জানাল না পর্যন্ত! এত বড় একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলল একা একা! ​অর্ণব চরম বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল,

“তুই আমাদের সাথে ইয়ার্কি করছিস, তাই না? তোর এতটাও অধঃপতন হয়নি যে হুট্ করে বিয়ের মতো কান্ড ঘটিয়ে ফেলবি। ফাজলামো করিস না তাজধীর!”
​তাজধীর দু-ভ্রু কুঁচকে ত্যাড়া নজরে তাকাল বন্ধুদের দিকে। বিরক্তি প্রকাশ করে কাটকাট গলায় বলল,
​”বিয়ে করার সাথে অধঃপতনের কি সংযোগ? আমি কি বিয়ে করতে পারি না? আশ্চর্য! এভাবে ওভার-রিঅ্যাক্ট করছিস কেন তোরা? যা, বের হ এখন রুম থেকে।”
​ফাহিম এবার তেড়ে এলো সামনে,
“এইজন্যই তো বলি, দুইদিন পরপর কাউকে কিছু না বলে তুই ওমন ঝড়ের বেগে বাড়িতে চলে যাস কেন! কেসটা তাহলে এই? শালা, বিয়ে করে আস্ত একটা বউ ঘরে রেখে এসেছিস অথচ আমাদের একটা বার জানালি না পর্যন্ত?”
​অর্ণবও সুর মেলাল ফাহিমের সাথে। আক্ষেপ নিয়ে বলল,
​”আমরা না হয় দুইটা প্লেট বিরিয়ানি বেশিই খেতাম! এই ভয়ে তুই আমাদেরকে জানালি না, কৃপণ কোথাকার!”

​”জানাইনি। এখন তো জেনেছিস। এবার বের হ আমার রুম থেকে।”
​তাজধীরের কাটকাট কণ্ঠতেও অর্ণব আর ফাহিম এক ইঞ্চিও নড়ল না। ফাহিম সোফার হাতলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে হাত দুটো বুকের কাছে বাঁধল। চোখের মণি জোড়া সরু করে জেদি গলায় বলল,
​”বের হব মানে? কোথাও যাচ্ছি না আমরা। যতক্ষণ না আমাদের প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছি, ততক্ষণ এখান থেকে এক পা-ও নড়ছি না।”
​তাজধীর কোনো উত্তর দিল না।ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পরম শান্তিতে নিজের চুলগুলো আঁচড়াতে লাগল সে।​অর্ণব এগিয়ে এসে তাজধীরের মুখোমুখি দাঁড়াল। তীক্ষ্ণ নজরে বন্ধুর মুখের প্রতিটি অভিব্যক্তি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরখ করে ক্রমান্বয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
​”আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না, তাজধীর। তুই জাস্ট ডটগুলো কানেক্ট কর। একদিকে তুই মাঝরাতে হুট্ করেই পুরোনো মিশেনের ফাইল ওপেন করলি। অন্যদিকে ঠিক একই সময়ে একটা মেয়ের নাম্বার দিয়ে তার যাবতীয় কল ডিটেইলস এক ঘণ্টার মধ্যে চাইলি। আর এখন বলছিস সে আমাদের ভাবি! এই দুইটার মধ্যে কানেকশনটা কী? পরপর দুটো সেনসিটিভ ইনফরমেশন একসাথে নেওয়ার মানে তো অনেক কিছু। তুই, যে কিনা মেয়েদের ছায়াও মাড়াস না, যাকে আমরা এই বেইজের সবাই একটা আস্ত আইসবার্গ মনে করি সে হুট করে এসে বলছিস তুই ম্যারেড? লাইক সিরিয়াসলি? কোনো এঙ্গেজমেন্ট নেই, কোনো দাওয়াত নেই, আন্টির কোনো ফোন পর্যন্ত এলো না আমাদের কাছে। এটা কি কোনো রসিকতা?”

​”তোদের কি মনে হয় আমি রসিকতা করার মুডে আছি?”
​”তাহলে সত্যিটা বল!তুই ওই মেয়ের নাম্বার ট্র‍্যাক কেন করালি? বিয়ে যদি করেই থাকিস, তবে নিজের বউয়ের ব্যাকগ্রাউন্ড হিস্ট্রি, কল লিস্ট বের করার জন্য বেইজের গোয়েন্দা সোর্স ব্যবহার করার কী দরকার পড়ল? তুই কি ওকে সন্দেহ করিস? নাকি এই বিয়ের পেছনে অন্য কোনো গল্প লুকিয়ে আছে যা তুই আমাদের বলতে চাচ্ছিস না?”
​তাজধীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেটে হাত গুঁজে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। রাতের অন্ধকার সমুদ্রের কালো পানি বহুদূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। সে ওদিকে তাকিয়েই নিস্পৃহ গলায় বলল,
“সেসব সময় হলেই জানতে পারবি। আর তোরা আমার বন্ধু, ইনভেস্টিগেটিং অফিসার নোস।”
​”বন্ধু হিসেবেই তো জানতে চাচ্ছি, সালা। বিয়েটা কি স্বেচ্ছায় হয়েছে, নাকি অন্য কিছু? মেয়েটার ওপর কোনো বিপদ আছে? নাকি তুই নিজেই কোনো বিপদে পড়ে এই ডিসিশন নিলি?”
​তাজধীর ফিরে তাকাল না। ওদিকে ফাহিম উঠে এসে অর্ণবের কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল,
“আচ্ছা বাদ দে। বিয়েটা হয়তো ওর পারিবারিকভাবে হয়েছে, তাই না রে? আন্টি হয়তো জোর করে কোনো মেয়ের দায়িত্ব ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন। ও তো মাকে বড্ড সমীহ করে চলে। সেই কারণে হয়তো কাউকে কিছু না জানিয়ে…”

​”তুই এখনো বড্ড বোকা রয়ে গেলি, ফাহিম!
তুই তো এই ওকে চিনিস না। চিনি আমি। ও কোন লেভেলের প্লেয়ার তোর কোনো ধারণাই নেই। তাজধীর হলো এমন এক জাতের মাছ—যে কাদাপানির ব্যাগের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গড়াগড়ি খেলেও নিজের গায়ে এক ফোঁটা কাদা লাগতে দিবেনা। বাইরে থেকে দেখে মনে হবে একদম সাধু, কিচ্ছু জানে না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ও আস্ত একটা ঠান্ডা মাথার ক্রিমিনাল!”
​ফাহিম ভ্রু কুঁচকে তাকাল। অর্ণব তাজধীরের দিকে চোখ রেখেই ক্রমাগত বলে গেল,
​”নিশ্চয়ই ও কোনো বড় অঘটন ঘটিয়ে আসছে। এই যে তুই দেখছিস ও একদম নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে, আমাদের এতগুলো প্রশ্নের একটাও উত্তর দিচ্ছে না—এটাই ওর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ও যখন বড্ড বেশি শান্ত থাকে, তখনই বুঝবি ওর প্রখর ও তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কের ভেতরে ভেতরে কোনো বড় চাল চালছে। ও চাবুকের মতো ধমক দিতে জানে, আবার ভরা মজলিশে নিজের পিঠ বাঁচিয়ে কীভাবে পুরো গেমটা উল্টে দিতে হয়, তাও খুব ভালো করে জানে। এই ঠান্ডা মাথার নিখুঁত ঘাতক এমনি এমনি নিজের গলায় বিয়ের ফাঁসি পরে আসেনি। এর পেছনে গভীর কোনো চাল আছে। যা ও আমাদের মাথাতেও ঢুকতে দিচ্ছে না। হয়তো ওই মেয়েটা কোনো বড় ক্রাইসিসের মুখোমুখি ছিল, আর আমাদের এই লাটসাহেব সেখানে হিরো সেজে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজেই ফেঁসে গেছে। অথবা… মেয়েটাই ওকে এমন কোনো ফাঁদে ফেলেছে যেখান থেকে বের হওয়ার আর কোনো রুট ছিল না।”

অর্ণবের এতো এতো কথার পরিপেক্ষিতেও হেলদুল হলোনা লোকটার কোনো। উল্টো বিরক্তি চেপে কপালে হাত বুলাল। তারপর হঠাৎ করেই গম্ভীর গলায় অর্ণবের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
​”সেহ্রোজের খবর কী? ও বেইজে ফেরেনি কেন এখনো?”
​অর্ণব খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পা নামাল।বলল,
“আন্টি নাকি ভীষণ অসুস্থ। গ্রাম থেকে হুট করে মেহমান আসার পর নাকি ওনার প্রেশার শুট করেছে। ও ইমার্জেন্সি ছুটিতে বাড়িতে গেছে।”
​”ওহ!এখন তোদের ক্যারেক্টার অ্যানালাইসিস করা শেষ হলে এবার লাইটটা নিভিয়ে বাইরে যা। কাল সকালে বেইজে ডিউটি আছে আমার।”
“বললাম না কোথাও যাচ্ছিনা আমরা। যে পর্যন্ত তোর মুখ থেকে সত্যটা না শুনছি ততক্ষন নাহ!”
তাজধীর মানলে তো সেসব? দুজন কে একপ্রকার টেনে ছুড়ে ফেলার মতো করেই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে সোজা মুখের উপর ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। ​দরজার ওপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ফাহিম আর অর্ণব স্তব্ধ হয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। ফাহিম দরজায় একটা লাথি মেরে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল,
​”কেসটা কী হলো বলতো? ওর হাবভাব কিন্তু আমার মোটেও সুবিধার মনে হচ্ছে না। শালা নিশ্চয়ই মাথার মধ্যে বড় কোনো প্ল্যান ভাঁজছে।”

​অর্ণব নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করতে করতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
“ও কোনো প্ল্যান করছে না ফাহিম, ও অলরেডি গেম খেলে ফেলেছে। তুই বুঝিসনি? ও সেহ্রোজের কথা তুলে আমাদের মাইন্ড ডাইভার্ট করল, আর আমরাও বোকার মতো ফেঁসে গেলাম।”
​ফাহিম মাথা চুলকে বলল,
“তা তো বুঝলাম। কিন্তু মেয়েটার জন্য আমার মায়া হচ্ছে রে। তাজধীরের মতো একটা খিটখিটে, ইগোইস্টিক পাথরের সাথে যে মেয়ে সংসার করবে, তার লাইফ তো এমনিতেই তেজপাতা হয়ে যাবে। চল, এখন গিয়ে ঘুমাই। সকালে আবার বেইজে ড্রিল আছে।
বাধ্য হয়েই চলে এলো দুজন। ওরা যেতেই রুমের লাইটটা নিভিয়ে দিল তাজধীর। মনে মনে বিড়বিড় করে আওড়াল,
সমুদ্রের গভীরতা ঠিক যেমন অন্য কোনো নদীর সাথে তুলনা করা যায় না, ঠিক তেমনি আমার অস্তিত্বও অনন্য, তুলনাহীন। আমি কে, আমার ক্ষমতা কতটুকু সেটা প্রমাণ করার জন্য আমার অন্য কারো সাথে প্রতিযোগিতায় নামার প্রয়োজন নেই। কারণ “তাজধীর সিদ্দিক আযান” নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় পরিচয়।”

তাজধিরের ভাবনার সুতোয় টান পড়ল আকস্মিক ফোনের টুংটাং শব্দে। হোয়াটসঅ্যাপের একটা নোটিফিকেশন এসেছে। ​তাজধীর ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে ফোনটা হাতে নিল। একটা ভিডিও এসেছে। ওটাতে ক্লিক করতেই দেখা গেল, ৪৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফাইল লোড হচ্ছে। ধুপ করে সোফায় গা এলিয়ে বসে পড়ল মানব। সময় নিয়ে প্লে করল ৪৩ সেকেন্ডের ভিডিওটা। সঙ্গে সঙ্গেই ভেসে উঠল একটা ভীতু মেয়ের চেহারা। ঐতো সামনে কয়েকজন লোক বসে আছে।দেখা যাচ্ছে কাজি সাহেবকেও।পাশেই বসা তাজধীর।আর তার সঙ্গে আঠার মতো লেগে আছে প্রিয়ন্তী। মেয়েটার মাথাটা নিচু, পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। তাজধীর তীক্ষ্ণ নজরে লক্ষ্য করল—কাজি সাহেব যখন প্রিয়ন্তীকে ‘কবুল’ বলার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন, তখন ভয়ে আর কান্নায় ভেঙে পড়া প্রিয়ন্তী নিজের অজান্তেই পাশে বসা তাজধীরের পেছনের শার্টের অংশটা শক্ত করে খামচে ধরে রেখেছিল! ঠোঁট দুটো প্রসারিত হয়ে উঠল মানবের। ​​ঠিক তখুনি ভিডিও প্রেরণকৃত আইডিটা থেকে পর পর কয়েকটা মেসেজ টুংটাং শব্দে ভেসে উঠল,
​”শালা ছুঁপা রোস্তম! প্ল্যান সাকসেসফুল হতে না হতেই আমাকে ভুলে গেলি? এক কেজি মিষ্টিও বিতরণ করলি না। আল্লাহ তোর বিয়াতে বরকত দিবো না দেখিস। শালা কিপটা!”
​তাজধীর অন্ধকার ঘরেই শব্দ করে হাসল। কাউচে গা এলিয়ে ব্যস্ত হাতে লিখল,

​”মিষ্টি খেলে ডায়াবেটিস বাড়ে। তোর স্বাস্থ্যের কথা ভেবেই খাওয়াইনি।”
​ওপাশ থেকে উত্তরটা এলো সঙ্গে সঙ্গেই,
​”আমার স্বাস্থ্যের চিন্তা তোকে করতে হবে না, নিজের বাঘিনী বউয়ের চিন্তা কর! ভিডিওটা দেখলি? মেয়েটা তো ভয়ে তোর শার্টের পেছনের অংশ এক্কেবারে খামচে ধরেছিল। তুই তো শালা আস্ত একটা ঠান্ডা মাথার ক্রিমিনাল!কিভাবে নিজের খাঁচায় আটকে ফেললি বেচারিকে!”
​”খাঁচা নয়, ওটা ওর সেফ জোন।”
​”তা তো বলবিই! লেফট্যানেন্ট কমান্ডারের চাল বলে কথা! কিন্তু ভাবি যেদিন জানবে এই পুরো নাটকটার পেছনে তোর হাত ছিল, সেদিন কিন্তু তোকে জ্যান্ত চিবিয়ে খাবে। যাই হোক, গেমটা কিন্তু ওয়ান পিস হয়েছেরে দোস্ত। আমাদের গ্র্যান্ড ট্রিট কবে দিচ্ছিস সেটা বল?”
​তাজধীর একটু গম্ভীর হয়ে লিখল,
​”সময় হলে সব পাবি। বেশি কথা না বাড়িয়ে এখন ঘুমা।”

​চ্যাটলিস্ট থেকে বের হয়ে হলো তাজধীর। হোয়াটস্যাপ থেকে সরাসরি মেসেঞ্জারে ঢুকল। সার্চ বারে ঢুকে প্রিয়ন্তীর আইডিতে প্রবেশ করতেই দেখল, মেয়েটা এখনো তাকে ব্লক করেই রেখেছে।​তাজধীরের চোয়ালটা আবার শক্ত হলো। মেসেঞ্জার থেকে বের হয়ে ফোনের মেইন কল লিস্টে ঢুকল সে। কল হিস্ট্রির একদম ওপরে একটা আনসেভড নম্বর শো করছে। লাস্টে ‘৬৮’ একটি এয়ারটেল নম্বর।
​তাজধীর নম্বরটির ওপর ট্যাপ করে ‘Save Contact’-এ গেল। নাম লেখার জায়গায় সে লিখল, ব্লুহাফমুন!

ডেসটেনি পর্ব ২৯

​নম্বরটি সেভ করে সে আবার হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকল। সার্চ বারে গিয়ে ওই একই নাম লিখে সার্চ করল এবার।পরক্ষণেই স্ক্রিনের ওপর জ্বলজ্বল করে উঠল প্রিয়ন্তীর হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইল পিকচারটি।
​তাজধীর ছবিটার ওপর ক্লিক করে ফুল স্ক্রিন করল। ছবিটা মূলত সিলেটে তোলা। প্রিয়ন্তীর একপাশ দেখা যাচ্ছে ছবিতে। ​এক ধ্যানে, অপলক চোখে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল তাজধীর। পরোক্ষনেই আবারও শব্দ করে হেসে উঠল সে। ফোনটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে জানালার বাইরের অন্ধকার সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
​”আমার বোকা ব্লু হাফ মুন!”

ডেসটেনি পর্ব ৩১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here