তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ১১
ঐশী আফরিন
ডাকাতের কথা শুনে মাহফুজ চৌধুরী প্রথমে মাধবীর বেলকনিতে তাকায়। ততক্ষনে মাধবী ঘরে চলে গেছে। ঘরে এসেই সে তীর আর ধনুক খুঁজতে লাগলো।নিজের রুমে না পেয়ে সোফার রুমে যায়।দেয়ালে টাঙানো ধনুক থেকে একটা ধনুক হাতে নেয়।ঝাঁকে ঝাঁকে রাখা তীর থেকে যতগুলো পারে ডালায় ভরে কাঁধে ঝুলিয়ে নেয়।আবার বেলকনিতে যায়।তবে বেলকনিতে না ঢুকে দরজার ভেতর থেকেই তীর তাঁক করে।
এত বড় লোহার ফটক ভাঙতে সময় লাগবে।মাধবী এক চোখ বন্ধ করে নিশানা বরাবর তাঁক করা তীরটা ছুড়ে মারে।তীরটা একজনের বুক চিরে বেরিয়ে যায়। শুরু হয় তীরের বর্ষা।সে একটার পর একটা তীর ছুরেই যাচ্ছে।আচমকা আক্রমণে ডাকাত দল কিছুটা বিচলিত হলেও পরক্ষণেই তারা পাল্টা আক্রমণ করে।মাধবী দরজার ভেতরে থাকায় একটা তীরও তাকে ছুতে পারছে না।তবে তার তীরের দ্বারা এক জনের পর একজন আহত হচ্ছে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
মাধবীর কাজে মাহফুজ চৌধুরী ভীত হয়।তিনি নিজের সৈন্যদের আক্রমণের আদেশ দেন।তীর ছোড়াছুড়ির এক পর্যায়ে ডাকাত দলের একটা তীর মাধবীর হাতে এসে লাগে।তার নরম চামড়া ভেদ করে তীরটা গেঁথে গেছে।সে গেঁথে যাওয়া তীরটার দিকে তাকিয়ে বেলকনির দরজা বন্ধ করে দেয়।একটা ওড়না হাতে নিয়ে তীরটা টেনে বের করে ওড়না দিয়ে জায়গাটা বেঁধে ফেলে।টুপটুপ করে কিছুটা রক্ত সাদা মার্বেল মেঝেতে পরে।সে দাঁতে দাঁত চেপে ব্যাথা সহ্য করে নেয়।মনকে শক্ত করে ধনুক ফেলে হাতে তুলে নেয় নীল হীড়া খঁচিত তার প্রিয় তলোয়ারটা।খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া এটা সে কাজে লাগায় না।তলোয়ারটা নিয়ে সে অন্দর থেকে বের হওয়ার জন্য পা বারায়।
ততক্ষণে ডাকাতরা ফটক ভেঙে অন্দরের দরজা পর্যন্ত এসে গেছে।আসন্ন বিপদের ভয়ে মাহফুজ চৌধুরীর গলা শুকিয়ে যায়।ওনার নিজেকে নিয়ে ভয় না,রাজবাড়ি নিয়েও ভয় না,ওনার ভয়টা শুধুমাত্র মাধবীকে নিয়ে।তিনি আহানকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আহান সব ফেলে আগে তলোয়ার হাতে মাধবীর অন্দরের দিকে দৌড়ে যায়।দরজার সামনে দাঁড়ায় তবে ভেতরে পা বারায় না।মাধবীকে এক নজর দেখার অদম্য ইচ্ছেকে নিজের মাঝে পুষে রেখে মাধবী বের হওয়ার আগেই সে বাহির থেকে অন্দরের দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়।
চাবিটা রুমার হাতে দিয়ে বলে “দরকার পরলে নিজের জান দিয়ে দিবি তবুও তোর রাণী মায়ের ক্ষতি হতে দিস না।চাবিটা কোমরে লুকিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে যা রাজবাড়ি থেকে।যা”
রুমা দিক বেদিক ভুলে ছুট লাগায়।মাধবী ভেতর থেকে চিৎকার করে উঠে “কে আছে বাইরে?দরজা খোল”
“মাধবী বাইরের অবস্থা খারাপ।চিৎকার করিস না।পরিবেশ ঠান্ডা হলে তোকে বের করা হবে”
ভেতর থেকে মাধবী আবারও চেঁচিয়ে উঠে “আল্লাহর ওয়াস্তে ভাইয়া আব্বাকে নিরাপদে রাখুন”
“তুই চিন্তা করিস না।কাক ভা…”
আর বলতে পারে না।মাধবী ভেতর থেকে শুনতে পায় গোলাগুলির শব্দ।সে স্বজোরে দরজা ধাক্কায়।কিন্ত কাজ হয় না।
“আহান ভাইয়া?এই আহান ভাইয়া?কী হয়েছে?”
ওপাশ থেকে আসে শুধু গোঙানোর শব্দ।এবার তার নিজেকে অসহায় লাগে।সে আবারও ছুটে যায় বেলকনিতে।বাড়ির আশপাশ পুরোটা ঘেরাও দেয়া।তার খটকা লাগে।ডাকাতের এত সাহস হওয়ার কথা না।কী হচ্ছে গ্রামে?কে দিচ্ছে তাদেরকে এত সাহস?যে কেউ যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে অন্দরমহলে ঢুকছে কিভাবে?প্রশ্নগুলো তার মাথায় ঘুরপাক খায়।হাত থেকে এখনও চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পরছে।সে গায়ের ওড়নাটা দিয়ে রক্ত মুছে আবারও ধনুক হাতে নেয়।কয়েকটা তীর নিক্ষেপের পর হাতে আর জোর পায় না।সে ধপ করে মাটিতে বসে পরে।
না জানি কি হচ্ছে বাহিরে।নিজেকে পাগল পাগল লাগে তার।কোথায় তার আব্বা কোথায় তার সৈন্য?কেন কেউ কিছু করছে না।সামান্য ডাকাতের সাথে তারা পারছে না?মালতী আর ইয়ানার কথা মনে পরে তার।দুটো মেয়ের যদি ক্ষতি করে দেয় ওরা?ভাবতেই মাধবীর এবার রাগ লাগে।চোয়াল শক্ত হয়।সে সব সহ্য করতে পারে কিন্ত নারীর অসম্মান সহ্য করতে পারে না।বাহির থেকে ভেসে আসছে তীব্র গোলাগুলির শব্দ।সে আবারও যায় দরজার কাছে কিন্ত কাউকে পায় না।এবার সে গোলাগুলির সাথে শুনতে পায় চিৎকার চেঁচামেচি।আত্নরত্না কেঁপে উঠে মাধবীর।সে যেভাবে পারে দরজা ধাক্কায়।গায়ের জোরে দরজায় চর থাপ্পড় মারে।নরম হাত দুটো রক্ত লাল হয়ে যায়।
হঠাৎই কানে বারি খায় মাহফুজ চৌধুরীর তীব্র বেদনা ভরা চিৎকার “মাধবী?মা আমার সাবধান”
এতটুকুই বলতে পারে তিনি।মাধবীও চিৎকার করে ডাকে “আব্বা?আব্বা দরজাটা খোলেন।আব্বা আমারে একটা সুযোগ দেন।আমি নিজের জান দিয়ে হলেও রক্ষা করবো আপনাকে।আব্বা?”
আরো কিছুক্ষণ চিৎকার চেঁচামেচি করে সে ক্লান্ত হয়ে সেখানেই বসে পরে।আরেকবার অস্ফুট স্বরে অওরায় “খোলেন না দরজাটা আব্বা”
আর কোন আওয়াজ আসে না বাহির থেকে।হঠাৎই সমস্ত কোলাহল থেমে যায়।থেমে যায় গোলাগুলির তীব্র আওয়াজ।সমস্ত বেদনাদায়ক চিৎকার।পুরো রাজবাড়ির নিস্তব্ধতা ভেদ করে কেট কেট শব্দে খুলে যায় পুষ্পালয়ের দরজা।মাধবীর সামনে হাঁটু গেরে বসে পরে রুমা।
মাধবী ঢোক গেলে।তার কন্ঠ ভেঙে আসছে ” ক কী হয়েছে রুমা?”
“রাণী মা?রাণী মা…”
আর কিছু বলতে পারছে না রুমা।মাধবী অন্দর থেকে বেরিয়ে আসে।তার পায়ে কিছু একটা বাজে। সে নিচে তাকিয়ে দেখতে পায় একটা ক্ষতবিক্ষত লাশ।সে ভয় পেল না।চিৎকারও করলো না।লাশ দেখে সে অভ্যস্ত।মুখটা থেতলে দেওয়ায় তার চিনতে অসুবিধা হচ্ছে তবুও সে চিনতে পারে আহান কে।কিন্ত তার মাথা ছিড়ে যাচ্ছে তার বাবার চিন্তায়।সে আর দেড়ি না করে দ্রুত তার অসাঢ় হয়ে আসা পা দুটোতে ভর দিয়ে নিচে নামতে চায়।
তখনই কর্ণকুহোরে পৌছে রুমার কান্না মিশ্রিত কন্ঠ “রাণী মা বড় সাহেব আর নাই”
কথাটা বজ্রাঘাতের মত শোনা গেল মাধবীর কাছে।সে দৌড়ে নিচে নামতে গিয়ে কয়েকটা সিরি নামতেই পরে থাকা রক্তে পা পিছলে যায়। নিজেকে সামলাতে না পেরে উপর থেকেই নিচে গড়িয়ে পরে।হাত থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়।বেশ উপর থেকে পরায় বাঁ কানের দিকে বেশ খানিকটা কেটে যায়।তবুও সে কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে ছুটে যায়।
সে এসেই মাহফুজ চৌধুরীর লাশের সামনে ধপ করে বসে পরে।করে বসে পরে।এতক্ষনে পুরো গ্রামের মানুষের ঢল নেমেছে রাজবাড়ি জুড়ে।গ্রামের মহিলারা বিলাপ করে কান্না করছিল।তবে মাধবীর আগমনে মুহুর্তেই সব থেকে যায়।মাধবীর আশেপাশে কিছুতেই খেয়াল নেই।চিরাচরিত রুপ থেকে আজ সে বেরিয়ে এসেছে।কোন পুরুষের সাথে কথা না বলা মেয়েটার মাথায় আজ কাপড়টাও নেই।এভাবেই তাকে দেখছে রাজ্যের মানুষ।আর সম্ভব হলো না তার পক্ষে কঠোর থাকা।অনবরত কাঁপতে থাকা হাতটা দিয়ে মাহফুজ চৌধুরীর হাতটা ধরেই সে ফুপিয়ে উঠে।কোন ধ্যান জ্ঞান ছাড়াই সে অনবরত বলতে থাকে,
” আব্বা আপনি আমাকে রেখে কোথায় যাচ্ছেন?আব্বা আপনি ওয়াদা ভাঙছেন।আপনি তো বলেছিলেন সবসময় আমার পাশে থাকবেন।তাহলে এত তাড়াতাড়িই কেন মুক্তি চাইছেন?আমার কথা কেন একবার ভাবলেন না আব্বা?আমি,আমি কাকে আব্বা বলে ডাকবো এখন?আপনি আমার সাথে বেঈমানী করছেন আব্বা।আমাকে এখন কে শাসন করবে?হ্যা?বলুন।কথা বলুন আব্বা।বলছেন না কেন?কে শাসন করবে আমাকে?কাকে আব্বা ডাকবো আমি?আমাকে একা রেখে সবাই চলে যাচ্ছেন কেন?সবাই স্বার্থপর আপনারা।সবাই আমাকে একা ফেলে চলে যাচ্ছে।চোখ খুলুন। আব্বা আপনি আমাকে সব শেখালেন কিন্ত আপনাকে ছাড়া থাকাটা কেন শেখালেন না?আব্বা গ্রামের মানুষ আপনাকে ছাড়া অসহায়।আমিও অসহায়।কে এখন দাঁড়াবে তলোয়ার হাতে?কে আমাকে রক্ষা করবে?আপনিই তো আমার অনুপ্রেরণা।কেন আজ শুয়ে আছেন?সিংহের মত গর্জন দিয়ে কেন উঠে দাঁড়াচ্ছেন না?আমার শক্ত বাপটাকে আমি এভাবে দেখতে পারছি নাতো।আমার কষ্ট হচ্ছে আব্বা।আমার কিন্ত দম বন্ধ লাগছে ”
সত্যিই মাধবীর শ্বাস হাঁপরের মত উঠানামা করছে।এত বছরে জমানো চোখের পানিরা আজ অবাধ্য হয়েছে।গ্রামের মানুষ কান্নারত চোখে দেখছে একটা সদ্য বাবা হাড়ানো মেয়ের আহাজারি।মাধবী কতক্ষণ নিরবে চোখের পানি ফেলে মাহফুজ চৌধুরীর বুকে মাথা রাখে।মাহফুজ চৌধুরীর মুখও থেতলে দেওয়া হয়েছে।দেখে বোঝার উপায় নেই কে কোনটা।শুধু কাপড় গুলো দেখে বোঝা যাচ্ছে।মাধবী তার মায়ের লাশের সামনে দাঁড়ায়।পুরো বৈঠক খানায় একবার চোখ বুলায়।চারদিকে শুধু লাশের ছড়াছড়ি।প্রতিটা লাশের মুখ থেতলানো।কিছুক্ষন আগের হাসিখুশি মানুষগুলো কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে লাশ হয়ে পরে আছে।
সে তার মায়ের লাশের সামনে হাঁটু গেরে বসে “ক্ষমা করে দিয়ো আমাকে।আমি পারলাম না তোমাদের বাচাঁতে।মেয়ে হিসেবে আমি ব্যার্থ ”
কথাগুলো বলে তেহবীনের নিথর দেহটাকে কোলে তুলে নেয়।হাতে একটা চুমু এঁকে বলে “বাপের মত তুইও ফাকি দিলি আমাকে?”
তারপর ইরিশার লাশের দিকে তাকিয়ে বলে “গেলেন তো সবাই মুক্তি পেয়ে।এবার আপনার অপেক্ষা ফুরোলো ভাবি।আপনাকে আর ঐ পাষান পুরুষের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হবে না।সে ভালো আছে।এবার থেকে আপনি আর তেহবীনও ভালো থাকবেন।চিন্তা নেই”
গলা ভেঙে আসে মাধবীর।খুব কষ্টে উঠে দাঁড়াল সে।মালতীর লাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে এই মেয়েটাও কী সুন্দর তাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল।
সে ঢোক গিলে বলে “এই মেয়ে এই? বেশি স্বার্থপর হয়ে গেছিস না?কিভাবে পারলি আমাকে একা ফেলে যেতে?কথা বলবি না আমার সাথে?থাক বলা লাগবে না ”
মাধবীর ফর্সা গালে অবাধ্য চোখের পানি চিকচিক করছে।উঠে গিয়ে সুলতান চৌধুরীর সামনে দাঁড়িয়ে বলে “এটা আপনার প্রাপ্য ছিল চাচা।আপনি আমার আব্বার সাথে বেয়াদবি করেছেন।শাস্তি তো পেতেই হতো ”
একে একে মাধবী সবার লাশের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। এক নিমিষে হাড়িয়ে গেল তার পুরো পরিবার।পুরো বাড়িটি হয়ে উঠেছে শ্মশান।নিজের বলতে আর কেউ রইলো না মাধবীর।একটা মানুষকেউ বাচঁতে দেয়নি ওরা।যেন কেউ পুরো চৌধুরীদের বংশ কে নির্বংশ করে দিতে চাইলো।মাধবী আর তৃশান ছাড়া আর কেউ বেচেঁ নেই চৌধুরীদের রক্তের।কেউ না।
তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ১০
মাধবী আবারও মাহফুজ চৌধুরীর কাছে যায়।তাকাতে কষ্ট হচ্ছে মাধবীর। সে তার তেজস্বী বাবাকে নিথর অবস্থায় দেখতে পারছে না।তার বাবা নামক মানুষটা আর নেই।সে আর কখনও কাউকে আব্বা ডাকতে পারবে না ভাবতেই মাধবী আবারও ফুপিয়ে উঠে।
তখনই শোনা যায় বাহির থেকে কারো চিৎকার।গ্রামের সবাই এবার মাধবীর থেকে চোখ সরিয়ে পেছনে তাকায়।আগন্তুক কে দেখা মাত্রই সবাই দুভাগ হয়ে মাঝখান থেকে জায়গা করে দেয়।আগন্তুক দৌড়ে এসেই আগে ঝুমা চৌধুরীকে আগলে নেয়।
