তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ১৪
ঐশী আফরিন
আরিয়ান ডাইনিং টেবিলে বসতে বসতে আড়চোখে একবার মাধবীকে দেখে নেয়।মেয়েটা গাটঁ হয়ে বসে গল্পের বই পড়ছে।কোনদিকেই তার ধ্যান নেই। এত বড় বড় উপন্যাস পড়ার মত ধৈর্য এই মেয়ে কোথায় পায় কে জানে!
আরিয়ান ভেংচি কেটে গলা উচিয়ে মাহমুদা ইশানকে ডাকে “আম্মা?কই ভাতটাত দিবা কিছু না চলে যাবো?”
“আসছি বোস”
মাধবী বিরবির করে “বরাক বাঁশের তৈরী গলা”
“একজন এমপি হিসেবে আমার গলা বরাক বাঁশ,খাড়া বাঁশ,আইক্কাওয়ালা বাঁশ ইত্যাদি ইত্যাদিই হওয়া উচিত।নিজে তো মেয়ে হয়েও ভাঙা রেডিও ছাড়িস”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
মাধবী চোখ মুখ কুঁচকে নেয় “কথার কই ছিড়ি”।মনে মনে বিরবির করে মাধবী।কিন্ত মুখে কিছু বলে না।
আরিয়ান কে বসতে দেখে আরশি মাধবীর কাছ থেকে উঠে টেবিলের কাছে যায়।গ্লাসে পানি ঢেলে বাটিটা আরিয়ানের সামনে রাখে।মাধবী আড়চোখে একবার তাকিয়ে বাঁকা হাসে।আরশি যেই না আরিয়ানের হাতটা ধরতে যাবে তার আগেই আরিয়ানের রাঁম ধমকে হাত থেকে কাঁচের গ্লাসটা পরে যায়।পায়ের উপর পরায় কাঁচের টুকরো ঢুকে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় পা।উপস্থিত সকলে আতঁকে উঠে।মাহমুদা ইশান শব্দ পেয়ে হকচকিয়ে রান্নাঘর থেকে বের হয়।রুহি আরশিকে আগলে মেঝেতে পরা কাচের টুকরো থেকে দূরে নিয়ে যায়।মাধবী আরিয়ান দুজনেই নির্বিকার। আয়াজ এসে আরশির পা থেকে কাঁচ বের করতে চাইলে আরশি চিৎকার করে উঠে।আরশির মা নমিতা ইশান চেষ্টা করতে নিলে তাকেও বাধা দেয়।গুনগুনিয়ে কান্নায় ভেঙে পরে সে।এদের তুলুতুলু দেখে মাধবী বিরক্ত হয়ে হাতের বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়ায়। তারপর কোন আগাম বার্তা ছাড়াই আরশির ডান পা চেপে ধরে কাচের টুকরোগুলো টান দিয়ে বের করে আনে।আরশি স্বজোরে চিৎকার করে কান্না করে দেয়।
নমিতা ইশানও সাথে চিৎকার করে উঠে “মাধবী মা ছেড়ে দেও মেয়েটাকে। ডাক্তার এসে বের করবে ।ছেড়ে দেও”
মাধবী নমিতা ইশানের কথায় পাত্তা না দিয়ে নিজের কাজ শেষে উঠে দাঁড়ায়। কাজের মেয়ে নীলাকে বলে “কাচগুলো উঠিয়ে ফেলে দে”
তারপর নমিতা ইশান কে বলে “নিন এতটুকু একটা কাজে এত নাটকের কই আছে বুঝলাম না”
বলে সে খেতে বসে পরে।মাহমুদা ইশান খাবার বেরে দিলে আরিয়ান খেয়ে বেরিয়ে পরে।সবাই এখনও আরশিকে ঘিরে দাড়িয়ে আছে দেখে
মাধবী আবারও বলে “দাড়িয়ে দাড়িয়ে রক্ত পরা দেখ সবাই। কোথায় ডাক্তার আসতে আসতে একটা কাপড় দিয়ে পা টা বেধে দিয়ে রক্ত পরাটা বন্ধ করবে তা না ”
মাধবীর কথায় সকলে আরশির কাছ থেকে সরে দাঁড়ায়। আয়াজ আরশিকে পাজঁকোলা করে সোফায় বসায়।রুহির বাবা আনোয়ার ইশান ডাক্তার কল করে।আরশির বাবা ফখরুল ইশান সকালে কাজে বেরিয়ে গেছে।কিছুক্ষনের মধ্যে ডাক্তার এসে ব্যান্ডেজ করে ঔষধ লিখে দিয়ে যায়।এতকিছু হয় গেল কিন্ত কেউ আরিয়ান কে কিছুই বললো না।নমিতা ইশান সমানে আরশিকে বকে যাচ্ছে। কেন সে মাতব্বরী করতে গিয়েছিল ।আর আযশি তো সেই থেকে গুনগুনিয়ে কান্না করেই যাচ্ছে।থামার নামই নেই। সে তো পায়ের ব্যাথায় কাঁদছে না।
পায়ের ব্যাথার থেকে মনের ব্যাথাটা বড়।আরিয়ান এসেছে পর থেকে সে যখনই আরিয়ানের কাছে যায় তখনই আরিয়ান তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে।আরিয়ান বিদেশ থাকা কালীন সে কতশত স্বপ্ন বুনে রেখেছিল ।কত পাগলামই না করেছে।দিনের মাঝে কতবার আরিয়ানের কামরায় আসা যাওয়া করতো!প্রতিটা জিনিস পর আবেশে ছুঁয়ে দেখতো।গোছানো ঘড়টাকে বারংবার অগোছালো করে আবার গোছাতো। যদিও আরিয়ান এই বাড়িতে এই রুমে কখনো থাকেনি।আরিয়ানের রাজবাড়িতে ফেলে যাওয়া প্রতিটা পাঞ্জাবি মাহমুদা ইশান পরিষ্কার করে স্বযত্নে আলমারিতে গুছিয়ে রেখেছিল।সেই প্রতিটা কাপড়ের মনমাতানো ঘ্রাণ নাখস্রাব্দে প্রবেশ করিয়ে অকূল হৃদয়ের বাসনা পেটাতো।কার জন্য করতো এত পাগলামি?যার জন্য করতো সেই আজ দূর দূর করে!এতটা দুর্ব্যবহার!কখনও কল্পনাও করতে পারেনি সে।এমন কেন করে আরিয়ান তার সাথে!কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আরশির চোখ থেকে অঝোর ধারায় জল গরিয়ে পরে।
আরিয়ান মিটিং শেষ করে মাত্র সংসদ থেকে বের হয়।পরনের সাদা পাঞ্জাবিটা ঘামে ভিজে জুবুথুবু।গাড়িতে বসে এসি ছেড়ে সিটে গা এলিয়ে দেয়।ড্রাইভিই সিটে বসে অপূর্ব ঝিমাচ্ছে।কয়েকদিন তার দিন একদমই যাচ্ছে না।খেয়ে দেয়ে কোন কাজ নেই। কাজ নেই বললেই ভুল হবে কাজ আছে কিন্ত কাজ করার মত মন নেই। মনটা তার ইদানিং বড্ড উদাস যাচ্ছে।তার অগ্নিপরির কথাটা আরিয়ান কে বলতেও পারছে না।কারন এতদিন মাধবী আরিয়ানের ফুফাতো বোন ছিল।সুবিধা অনুযায়ী আরিয়ান কে দিয়ে মাহফুজ চৌধুরীকে রাজি করিয়ে নেয়া যেত।
কিন্ত এখন মাধবী আরিয়ানের দায়িত্বে।যতই দুজন জান প্রাণের বন্ধুত্ব হোক।আপন বনে হলে এত কাঠখোর পোহাতে হতো না।মাহমুদা ইশান প্রচন্ড আদরে রাখে মেয়েটাকে।নিশ্চিত তিনি কোন সুপাত্র ছাড়া মাধবীকে যার তার হাতে তুলে দেবেন না।এমনিতে অপূর্ব সুপাত্র ।তবে মাধবী জমিদার কন্যা।ময়মনসিংহ রাজ্যের রাণী মা সে।তার উপর অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারীনি। সেই মেয়ের বিয়ে তো কোন রাজপুত্রের সাথেই হওয়া দরকার। অপূর্ব এতসব ভেবে পায় না।এসব ভাবলেই তার শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা হয়।
অপূর্বকে অস্বাভাবিক দেখে আরিয়ান ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করে “কি সমস্যা?শরীর খারাপ লাগছে?”
অপূর্ব এসির নিচেও ইতিমধ্যেই ঘেমে একাকার। মাধবীর সেই মৃত্যুসম সৌন্দর্যের কথা মনে হলেই তার অবস্থা বেগতিক হয়।
” নিজের বোনকে না দিলে সমস্যা সমস্যা করলে সমস্যা আরও বাড়বে বই কমবে না ”
কথাগুলো অপূর্ব বিরবিরিয়ে বলে।
“কিছু বললি?”
” হ্যা?না ! না কিছু না ”
” কিছু না বললে গাড়ি চালা ”
“দোস্ত আমার ঠিক লাগছে না ।তুই চালা ”
” কি ঠিক লাগছে না ?”
” কিচ্ছু ঠিক লাগছে না ”
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে গাড়ি থেকে নেমে ড্রাইভিং সিটে বসে।অপূর্বকে আসলেই ঠিক লাগছে না আরিয়ানের কাছে।চিন্তা হচ্ছে প্রচুর। পৃথিবীতে বর্তমানে মাধবী আর অপূর্ব এই দুজন মানুষই শুধু আছে তার সবচেয়ে কাছের।সবচেয়ে আপন।এদের সে নিজের জীবনের চেয়েও হয়তো ভালোবাসে।আরিয়ান ডাক দেয়।
তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ১৩
” অপূর্ব?কি হয়েছে?”
অপূর্ব কিছু বলে না।অপূর্ব পেছনে মাথা এলিয়ে দেয়।সেই রুপ মনে হলেই অপূর্বের কাছে মনে হয় তার গায়ের সব শক্তি কেউ শুষে নিয়েছে ।
অথচ সে জানলোও না তার পাশে বসে থাকা তার বন্ধু এর চেয়ে অধিক যন্ত্রণায় ভুগছে।তার একবারের দর্শন আজও তার শ্বাসরুদ্ধ করে আর আরিয়ান প্রতিদিন সেই রূপ দর্শন করে নিজেকে কিভাবে ঠিক রাখে!
