তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩+৪
ঐশী আফরিন
পুরো রুম জুড়ে নিস্তব্ধতা। বিকাল চারটের দিকেও সূর্য একদম মাথার উপর থেকে তেজ ছড়াচ্ছে। যেন মাধবীর সাথে সেও রাগ প্রকাশ করছে। আরশি কুক্ষনেও চিন্তা করেনি মাধবী এতটা রেগে যাবে। সে জানে মাধবী তার বাবার ব্যাপারে খুবই সেনসিটিভ। হবেই বা না কেন। মাধবীর একটা বড় ভাই ছিলো তৃশান চৌধুরী। মাধবী পাগলের মত ভালোবাসতো তার ভাইকে। তৃশান বিয়ে করেছিল ইরিশা নামের.একটা মেয়েকে। ইরিশা ভালো এবং উচ্চ পরিবারের। বিয়ের দু বছরের মাঝে ওদের একটা ছেলে হয় ‘তেহবীন’।
সবমিলিয়ে ওদের দিন ভালোই যাচ্ছিল। কিন্ত হঠাৎই একদিন জরুরী কাজে তৃশানের ঢাকা যাওয়া লাগে। সেই যে সে গিয়েছিল আজও ফেরেনি। যাওয়ার আগে একটা চিঠি লিখে যায় সে নাকি অন্য কাউকে ভালোবাসে। ইরিশার বয়স অল্প হওয়ায় তখন ভেঙে পরেছিল। তবে তেহবীনের কথা চিন্তা করে সে এখনও এ বাড়িতে থাকে। তাকে তার পরিবার থেকে অনেক বার বিয়ের কথা বললেও সে বিয়ে করেনি। তেহবীনের বয়স এখন পাঁচ কী ছয়। সবাই সব ভুলে কাটিয়ে উঠতে পারলেও মাধবী আর ইরিশা আজও পারেনি। মাধবীর সবকিছুকে ঘিরে ছিল তার বাবা আর ভাই। তার শত আবদারের সাথি ছিল। ভাই কে হাড়ানোর পর সে তার বাবাকে নিয়ে অনেক সেনসিটিভ হয়ে উঠে। মাধবী আগে চঞ্চল ছিল কিন্ত অল্প। এখন সে আগের চেয়ে কিছুটা চঞ্চল হয়েছে ঌ হয়তো নিজেকে ভালো রাখতে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
মাধবী মাথার চুল গুলো শক্ত করে ধরে আছে। এতে যদি রাগটা কমে। চুলগুলো অনেক আগেই বাধন হারা হয়ে গেছে। তার লম্বা , ঘন , কালো চুলগুলো সোফায় বসে থাকায় ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সে যথেষ্ট শান্ত রাখার চেষ্টা করছে নিজেকে। একপর্যায়ে সে না পেরে সবাই কে বেরিয়ে যেতে বলে। সাথে সাথেই সবাই বেরিয়ে যায়। মাধবী ধপ করে বিছানায় শুয়ে পরে। চোখের পানিরা অবাধ্য হয়। সে সহজে কান্না করে না। তার পরিবারের সবাই যদি তাকে বাড়ি থেকেও বেড় করে দেয় তবুও সে নিয়তি মেনে সয়ে নিতে পারবে। সে কথায় কথায় কান্না করে একদমই পছন্দ নয় । তার কাছে এসব ন্যাকামি মনে হয়। তাই সে কাদেঁ না । কিন্ত ঐ যে তার বাবা আর ভাই। এই দুটো মানুষের ব্যাপারে তার চোখের পানিরা তার সাথেই বেঈমানি করে।
যেদিন তার ভাই পালিয়ে যায় তার কয়েকদিন আগে তৃশানের দেয়া মাধবীলতার গাছটা থেকে থেকে সব ফুল ঝরে পরেছিল। তাই তো সে তার বাবার দেয়া মাধবীলতা গাছটার থেকে একটা ফুলও ভুল করেও ছেরে না। সু ভীষন ভয় পায় । আর আজ গাছটা খালি। সবগুলো ফুল নিচে পরে আছে। যদি আবারও তার সাথে একই ঘটনা ঘটে।
মাধবীর ভাবনার মাঝেই দরজায় কেউ কড়া নারে। মালতী বাহির থেকেই বললো মামারা মাধবীর সাথে দেখা করতে চাইছে। মাধবীর এমনিতেই মন মেজাজ ভালো নেই। পরে দেখা যাবে তার মামাদেরই কি থেকে কি বলে ফেলবে। রাগের সময় তার মুখ ঠিক থাকে না। এমনিতেও তার মুখ বুলেটের আগে চলে। তাই সে না করে দিলো। এটা ওটা ভাবতে ভাবতে তার চোখের পাতায় ঘুম ভর করল। ঘুমের মাঝেই নিচ থেকে হট্টগোল শোনা গেল। মাধবী ঘুমের ঘোরেই শুনতে পেল মায়ের গলা ” আমার আরিয়ানটা আসবে কত বছর পর বাবাটা আমার দেশে আসবে ” মাধবী অতিরিক্ত ঘুমের ঘোরে সেসব পাত্তা না দিয়ে আবারও ঘুমিয়ে গেল।
মাধবী ব্যতীত রাজবাড়ির সব সদস্যরা বসে আছে বৈঠক খানায় । মাধবীর মামার বাড়ির লোকজন বিকেলের দিকে চলে গেছে। সবাই আলোচনা করছে মূলত আরিয়ান আসবে তা নিয়ে। ঝুমা চৌধুরী তো রীতিমত কান্নাই করে দিয়েছে এত বছর পর ছেলেটা দেশে আসবে শুনে। আরিয়ান ছোট থেকেই এখানে থেকে বড় হয়েছে। আরিয়ানের বাবা মানে ঝুমা চৌধুরীর বড় ভাই নেওয়াজ ইশান মারা যান যখন আরিয়ানের ১৪ বছর বয়স ছিল। আরিয়ানের বয়স যখন ২ তখনই শত্রুরা ইশানদের সমস্ত সম্পত্তি অবৈধ ভাবে বাজেয়াপ্ত করে। যখন তাদের কোন কূল কিনারা ছিল না তখন মাহফুজ চৌধুরী তাদের রাজবাড়িতে জায়গা দেন।সেই দু বছর বয়স থেকেই আরিয়ান ঝুমা চৌধুরীর কাছে বড় হন। তাই আরিয়ান মায়ের চেয়েও ফুফুকে বেশি ভালোবাসে। আরিয়ানের বয়স যখন ১৭ কি ১৮ তখন আরিয়ান জানায় সে বিদেশ যাবে এবং নিজে প্রতিষ্ঠিত হবে আর পরিবারের হারানো সম্পদ ফিরিয়ে দেবে। বিদেশ যাওয়ার দু বছরের মধ্যেই সে সফল হয়েছে। সেই কিশোর বয়সে দেশ ছেড়ে সফলতা নিয়ে ১১ বছর পর তাগড়া যুবক বেশে ছেলেটা বাড়ি ফিরছে। ঝুমা চৌধুরী খুব ভালো করেই জানে তার আরিয়ান আগে ঢাকা না গিয়ে গ্রামেই আসবে।
কিছুক্ষন আগে টেলিফোন করে জানিয়েছে কাল নাকি তার এক বন্ধু গ্রামে আসছে কিছু কাজে। এসে এ বাড়িতেই উঠবে। সেই ছেলেকে না হয় অতিথিমহলে দেয়া যায় কিন্ত আরিয়ান? বিদেশ যাওয়ার আগে আরিয়ান অন্দরেই থাকতো। উপরের তলায় মাধবীর অন্দরের সাথের রুমে। আগে মাধবী ছোট ছিল আর আগে মাধবীর আলাদা অন্দরও ছিল না। কিন্ত এখন মাধবী বড় হয়েছে । তাহলে এখন আরিয়ান কোথায় থাকবে তা ঠিক করার জন্যই সবাই বৈঠক খানায় বসেছে।
মাহফুজ চৌধুরীই প্রথমে মুখ খুললেন ” আরিয়ান আগে যেখানে থাকতো এখনও সেখানে থাকবে। মাধবী মা এমনিতেও ঘর থেকে বের হয় না ”
সবাই সম্মতি জানালেও আহানের বিষয়টা ভালো লাগল না। যেখানে তাদের মাধবীর অন্দর তো দূরে থাক দোতলার সিড়িতে পর্যন্ত পা রাখতে দেয়া হয় না। তারা এ বাড়ির ছেলে হয়েও, যেখানে এটা আরিয়ানের ফুফুর বাড়ি হওয়া সত্তেও সে এতো সুবিধা পাবে। এমনিতেও সে ঐ আরিয়ানকে সহ্য করতে পারেনা। আর তাছাড়া আরিয়ানকে তার মোটেও সুবিধার মনে হয়না। এতবছর সে ধরে মাধবীকে আগলে রেখে এখন কিনা হাতছাড়া হয়ে যাবে। নাহ কিছুতেই না। সে নাকচ করে বললো “‘চাচা মাধবী আগে ছোট ছিল এখন সে বড় হয়েছে এখন আরিয়ানকে নিচে দেওয়াটাই ভালো হয় না ”
সুলতান চৌধুরীর ছেলের দিকে কড়া চোখে তাকালেন। যেখানে তিনি ভাইয়ের মুখের উপর কথা বলেন না সেখানে এই ছেলে বাঁ হাত ঢোকাচ্ছে। সুলতান চৌধুরী আহানের থেকে চোখ সরিয়ে মাহফুজ চৌধুরীকে বললেন ” ভাইজান তুমি কিছু মনে করোনা। তুমি যা বলেছ তাই হবে”
এবার আলেয়া চৌধুরী মুখ খুললেন ” আমার ছেলেতো ঠিক কথাই বলেছে ”
সুলতান চৌধুরী এবার স্ত্রীর দিকে তাকালেন এদের নিয়ে তিনি আর পারেন না। সুলতান চৌধুরীর কড়া দৃষ্টিতে আলেয়া চৌধুরী আর কথা বাড়ালেন না। তিনি আবার মাহফুজ চৌধুরীকে বললেন ” ভাইজান যা বলেছ তাই হবে।” বলে তিনি আলেয়া চৌধুরীকে বললেন আরিয়ানের ঘর পরিষ্কার করার জন্য।
আহানের এবার বড্ড রাগ হলো। মাধবীর সৌন্দর্যো এড়ানোর মতো শক্তিশালী পুরুষ এখনও জন্মায়নি পৃথিবীতে সে আরিয়ান হোক আর যেই হোক। যদিও তারা দুজনেই সেই ছোট্ট মাধবীকে দেখেছিল। এখন মেয়েটা দেখতে কেমন তা না জানালেও মেয়েটার যে চোখ ধাঁধাঁনো সৌন্দর্য তা সবাই জানে। এখন যদি আহানের আগে আরিয়ান মাধবীকে দেখে নেয় । নাহ এখানে আর থাকা যাবে না প্রচুর রাগ উঠছে তার। আহান তার ছোট বোন ইয়ানাকে চা দিতে বলে নিজের রুমে চলে যায় ।
বাকিরা আরো কিছুক্ষণ টুকটাক কথা বলে নিজেদের মত কাজে চলে যায়। সবাই বেড়িয়ে যাওয়ার সময় সুলতান চৌধুরী আহানকে ডেকে নিয়ে যায় । বাড়ির পুরুষদের রাত বারোটার আগে আর বাড়িতে পাওয়া যাবে না। মাধবী ছাড়া বাড়িতে কেউ বারোটার আগে রাতের খাবার খায় না। এ বাড়িতে তিন বেলাতেই সবাই একসাথে খাওয়ার নিয়ম। চাচাতো ভাইয়েরা থাকায় মাধবী সবার সাথে খেতে পারে না।
আপাতত বৈঠকখানা নিস্তব্ধ। এই সময়টাতেই মাধবী নিচে আসতে পারে। মাধবী সোফায় গিয়ে বসে। সে তার জীবন নিয়ে খুবই হতাশাগ্রস্ত। এমন বন্দি জীবন কার ভালো লাগে। সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তখনি খেয়াল করে তার পাশে কেউ বসেছে। সে দেখল ইরিশা তার ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে আছে।
মাধবী জিজ্ঞেসা করলো ‘ ভাবি তেহবীন খেয়েছে ‘ ‘একটু পর খাওয়াবো ‘
মাধবী খেয়াল করলো ইরিশার মন খারাপ সে বুঝলো মন খারাপের কারণ। তারও মন খারাপ হলো। বাড়িতে কেবল এই দুটো মানুষই তৃশানের শূন্যতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বাকি সবাই যে যার মতো স্বাভাবিক হয়ে পড়েছে। মাধবীর শত আবদার ইচ্ছা পূরনের স্থান ছিল তার বাপ আর ভাই। তাইতো সে ভাইকে হারানোর পর তার বাবাকে নিয়ে ভীষন ভয় পায়। আর ইরিশা তার তো স্বামী, সে কীভাবে ভুলবে ? মেয়েটা পরিবার ছেড়ে এখনও এখানে পড়ে আছে এক টুকরো আলোর আশায়। অকালে এভাবে স্বামী হারিয়ে কীভাবে আছে ইরিশা ভাবতেই মাধবীর মনটা বিষিয়ে উঠে।
তার ভাবনার মাঝেই ভেসে আসে ইরিশার ভেজা কিন্ঠ ” তোর ভাই আমাদের এভাবে না ঠকালেও পারতো মাধবী ”
মাধবীর চোখও ভিজে উঠে ” ভাবি তুমি ভূল বুঝোনা দেখবে একদিন ঠিক ভাইয়া ফিরে আসবে।”
” চারটে বছর ধরে সেই তো আসতেই আছে ”
মাধবী কিছু বলতে পারে না । সত্যিই তো ! আর কত ? চার চারটে বছর কেটে গেছে ।
ইরিশা ভাবলো , আচ্ছা এত বছরে কী লোকটার বাচ্চা-কাচ্চা হয়নি ? হবেই হয়তো। তৃশান হয়তো তার ভালোবাসার মানুষটির সাথে সুখি পরিবার তৈরী করেছে। ইরিশা মনে মনে দোয়া করে তৃশান যেখানেই আছে ভালো থাক তার পরিবার নিয়ে । ইরিশা না হয় তেহবীন কে নিয়েই বাকি জীবন লোকটার জন্য অপেক্ষা করতে করতে কাটিয়ে দেবে। ভেবেই সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বুজে ফেলে। তাকায় মাধবীর দিকে। মেয়েটা এখনও চোখের পানি ফেলছে।
সে মাধবীর চোখের পানি মুছে জরিয়ে ধরে বলে ” কাঁদিস না । সে যেখানে আছে তার পরিবার নিয়ে ভালো আছে।”
তখনই মালতী দৌড়ে আসে সদর দরজা দিয়ে । এসে মাধবীর পাশে বসে হাঁপাতে থাকে। এত সিরিয়াস মুহুর্তেও সে মাধবীর দিকে তাকিয়ে আর চোখ সরাতে পারলো না। উফফ তার বোনটা এত সুন্দর কেন।
মালতী কে এভাবে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাধবী ভ্রু কুচকায় ” এভাবে হাবার মত তাকিয়ে আছিস কেন আর কোথা থেকে এভাবে বাদরের মত লাফিয়ে আসছিস কী হয়েছে ? ”
মালতী মাধবীর থেকে চোখ না সরিয়েই বলে “খুন”
“কীহহ”
মাধবী, ইরিশা দুজনেই আতঁকে উঠে ।
মালতীর কথায় মাধবী ,ইরিশা দুজনেই অবাক হয়। এই গ্রামে চুরি,ডাকাতি,খুন-খারাবি হয় না বললেই চলে। হঠাৎ কার এত বড় সাহস হলো মাহফুজ জমিদারের গ্রামে খুন করার? ইরিশা ভাবনা রেখে জিজ্ঞেস করল ,
” কী বলছিস কার খুন হয়েছে আর কেই বা করেছে ?”
মালতী এবার মাধবীর থেকে চোখ সরিয়ে উত্তর দিলো
” সেনাপতি আসাদ খুন হয়েছে তবে কে করেছে জানি না ”
ইরিশা,মাধবী আবারও অবাক হয়। লোকটা ভালো ছিলো।ছোট থেকেই এ বাড়িতে থাকছে। মাহফুজ চৌধুরীর ডান হাত বলা চলে।এই ভাল লোকটাকে কে খুন করলো।তাও আবার রাজবাড়িতে। কার এত বড় বুকের পাটা ??
মালতী বললো ” কাল সকালেও লোকটা ভালো ছিল । অথচ এর মধ্যেই মারা গেল। আব্বা ভীষণ কষ্ট পেয়েছেন । ”
মাধবীর কাল সকালের কথা মনে পরলো। সকাল সকাল মালতী মন খারাপ করে বসে ছিল।মন খারাপের কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলে কিছু হয়নি।তার পর অনেক জোড়াজোড়ির পর মালতী বলে সেনাপতি আসাদ নাকি তাকে অতিথিমহলে ডেকে নিয়ে গিয়ে গায়ে হাত দেয়ার চেষ্টা করেছিল। আর কী সব হাবিজাবি খারাপ কথা বলেছিল। মালতীর ছোট মাথায় কথাগুলো না ঢুকলেও এতটুকু বুঝলো কথাগুলো যে একদম ভাল কথা না। সেনাপতি আসাদ যা যা বলেছিল তা মাধবীকে বলতেই মাধবীর চেহারা কঠোর হয়ে যায়। বলতে বলতেই মেয়েটা কান্না করে দেয়।
মাধবী শক্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে ” তুই কিছু বলিস নি”
মালতী মিনমিন করে বলে, ” না। আমি কী তোমার মত নাকি ”
কথাটা শোনার সাথে সাথে মাধবী পাশে থাকা কাঁচের গ্লাসটা দেয়ালে ছুরে মারে। মালতী কেঁপে উঠে। সে জানতো মাধবী এটা শুনলে রেগে যাবে তাই সে বলতে চায়নি।
মাধবী বলে আব্বাকে বলে আজই আসাদ কে বহিষ্কার করাবে। মালতী নিষেধ করে সে চায়না এই লজ্জাজনক বিষয়টা কেউ জানুক। মাধবীকে অনেকবার কাউকে জানানোর জন্য নিষেধ করলে মাধবী বলে সে আব্বাকে বলবে ঘটনাটা তার সাথে ঘটেছে। মালতী পরে চুপ হয়ে যায়। কিন্ত পরে তো মাধবী মাহফুজ চৌধুরীকে কিছুই বলে নি। তাহলে ?? আর যদি বলতোও মাহফুজ চৌধুরী খুনের মত জঘন্য কাজ করতো না বড়জোর আসাদ কে কয়েক ঘাঁ লাগিয়ে বহিষ্কার করে দিত। তাহলে কে করলো এই কাজ । ঘুরে ফিরে এই প্রশ্নটাই বেশি আসছে ‘এত বড় সাহস কার রাজবাড়িতে খুন করে?’
মাধবী আর এসব ভাবলো না । এসব খুনিদের কথা ভাবতে গিয়ে শেষে তার ব্রেন স্টোক হয়ে মারা গেলে অকালে তার জামাইটা বিধবা হয়ে যাবে। মাধবী নিজের ভাবনায় নিজেই জিভে কাঁমোর দিল ভুল ভাল বলে ফেলেছে বিধবা না বিপত্নিক হবে।
ইরিশা মালতীকে জিজ্ঞেস করলো “জানাযা কখন?”
“আরে আগে পুরো খবর শুনে তো নেও পরে জানাযার কথা ভেবো। আসল কথাটাই তো শুনলে না ”
মাধবী ভ্রু কুচকে যায় “কী আসল কথা ”
” সেনাপতি আসাদের নাকি মেইন পয়েন্ট কেঁটে ফেলা হয়েছে। কুপিয়ে জঘন্য ভাবে মুখ থেতলে দেয়া হয়েছে। হাত পা কেটে ফেলেছে। পুরো শরীর ব্লেড দিয়ে আচঁর কাটা । ভাবা যায় কী ভয়ংকর খুনি ”
মাধবীর কথায় দুজনে আবারও শোকড খায়। কে এভাবে কাউকে মারতে পারে।
” কাল ফজরে জানাযা হবে। আজ ময়না তদন্তের জন্য নিয়ে গেছে। আপি কিছুক্ষনের মধ্যে চাচারা অন্দরে আসবে। ”
মাধবী উপরে চলে যায় । এমনিতেও তার পড়া আছে। সে পড়তে বসে কিছু সময় পর মালতী খাবার নিয়ে আসলে খেয়ে আবার পড়তে বসে। সারে বারোটা পর্যন্ত পড়ে শুয়ে পরে। কিছুক্ষন সময় শুয়ে থাকার পর কিছু মনে হতেই মাধবী ঠোঁট বাকিয়ে খুব সুক্ষ হাসে। তার পর ঘুমে তলিয়ে যায়।
চারদিক থেকে ফজরের আযানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ধরনির বুকে সূর্য উঠার সুসংবাদ জানান দিচ্ছে। মাধবীর প্রথম আযানের সময় ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস। মাধবী ঘুম থেকে উঠে ওযূ করে নামাজ পরে নেয়। তারপর উঠে গিয়ে ঘরের জানলা গুলো খোলে। মাধবী জানালার পাশের কালকের ক্ষতবিক্ষত গাছটাকেই পানি দিয়ে মাটি ভালোভাবে দিয়ে দেয়। যদি গাছটা আবার ঠিক হয় সেই আশায়। তৃশানের কথা মনে হতেই খারাপ লাগে। সেই মাধবীলতার ফুলগুলো কীভাবে সবগুলো ঝরে পরেছিল। মাধবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার বাইরের জঙ্গলে চোখ রাখে। চারদিক আবছা পরিষ্কার হয়েছে।
মাধবীর কিছু একটা মনে হতেই সে তার পাশের ঘরটায় চলে যায়। সেখানে জানালা খুলতেই চোখে পরে বড় নদীটা। জঙ্গলের মাঝ বড়াবর গিয়েছে নদীটা। নদীটা বড় হওয়ায় ঘন জঙ্গল ভেদ করে দেখা যাচ্ছে তার সচ্ছ জল। পুরো জঙ্গলের মাঝারি সাইজের গাছগুলো মধ্যে একটা বড় বিশাল আকারের বট গাছ মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে। গাছের গোড়ার দিকটা না কি অনেক বড়। তাদের রাজবাড়ির এরিয়াতেই পরে গাছটা। এই গাছের আশেপাশে কেউ যায় না। এই গাছের না কি এ গ্রামের সকল মাথাওয়ালা পূর্বপুরুষদের আত্মা ঘোরে। কেউ কেউ নাকি নিজের চোখে দেখেছে। একবার এই গাছের কাছে গেলে নাকি মানুষকে জ্বিনে ধরে যার ফলে মানুষ পাগল হয়ে যায়। এরকম আরো অনেক কথা রটানো গ্রামে এ গাছ নিয়ে। তাই কেউ দিনের বেলাতেও এ গাছের চারপাশও মারায় না। অনেকে নাকি মানুষের মাথার খুলি , হাড় এসব গাছের গোড়ায় পরে থাকতে দেখেছে। আবার নদীতেও জেলেদের জালে মানুষের কাটা হাত পা উঠে আসে। কিন্ত গ্রামের কাউকে হাড়িয়ে যেতে দেখা যায় না । সবাই অক্ষতই থাকে। তাহলে এসব আসে কোথা থেকে ?
মাধবী নদীটাতে প্রায়ই লুকিয়ে ঘুড়তে যায় তার প্রান প্রীয় বান্ধবী অপরাজিতার সাথে। তবে গাছটাকে কখনও দেখা হয়নি। মাধবীর ইচ্ছে হলো গাছটাকে একবার কাছ থেকে দেখার। সেই ইচ্ছা অনুযায়ী মনে মনে ফন্দিও এটেঁ ফেলে যাওয়ার।
মাধবী নিজের রুমে আসে। কয়েক পাতা কোরআন পড়ে বই খাতা নিয়ে পরতে বসে। মাধবী এ বছরই কলেজে উঠেছে। কলেজ টার নাম ‘আনন্দ মোহন কলেজ’ । এটা তাদেরই কলেজ।
মাধবীর পড়ার মাঝেই মাহফুজ চৌধুরী দরজায় করা নারে, ” মা আসবো ”
” আব্বা আপনাকে না কতবার বলেছি আমার রুমে আসলে আপনার অনুমতি নিতে হবে না ”
মাহফুজ চৌধুরী হেসে মাধবীর টেবিলের পাশের চেয়ারটায় বসলেন। টেবিলের উপর দুই কাপ চা আর কিছু নাস্তা রাখলেন। মাধবী হাসলো। এই সময়টা তাদের বাপ-মেয়ে খুনশুটির সময়। মাহফুজ চৌধুরী প্রতিদিন নিজের হাতে চা বানিয়ে আনে মাধবীর জন্য। তারপর দুজন মিলে চায়ের সাথে আড্ডা দেয়। মাধবীর এই সময়টা ভীষন পছন্দের। মাহফুজ চৌধুরীও এই সময়টা শত কাজ ফেলে মেয়েকে দেয়।
মাধবী জিজ্ঞেসা করল, “সেনাপতি আসাদের জানাযা হয়েছে ”
মাহফুজ চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন ” নারে মা পুলিশ তদন্তের জন্য আরো সময় চেয়েছেন। খুনি খুব চালাক। কোন প্রমাণ রেখে যায়নি। আসাদের জন্য খারাপ লাগছে। ছেলেটি বিশ্বাসী ছিল অনেক।এরকম বিশ্বাসী লোক পাওয়ার জন্য বেগ পোহাতে হবে আমার ”
মাধবীরও খারাপ লাগল তবে লোকটার জন্য না তার বাবার জন্য। ” চিন্তা করবেন না আব্বা আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে ধৈর্য ধরুন আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দেবে ”
মাহফুজ চৌধুরীর আসলেই খারাপ লাগছে এরকম বিশ্বস্ত লোক কী সবসময় পাওয়া যায়, আর সবথেকে বড় কথা উনার গ্রামে এত বড় কলিজা কার হতে পারে যে রাজবাড়িতে এসে রাজ্যের সেনাপতিকে মেরে যায়।
মাহফুজ চৌধুরী প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন ” মা আরিয়ানকে তোমার পাশের রুমে থাকার জন্য দিয়েছি তোমার কোনো সমস্যা হবে ”
তিনি চান না মাধবী এসব উল্টোপাল্টা বিষয় নিয়ে ভাবুক তাই তিনি প্রসঙ্গ পাল্টে ফেললেন। মাধবীর মনে পড়ল আরিয়ানের দেশে আসার কথা। লোকটার এত বছর পর হঠাৎ দেশে আসতে চাওয়ার কারণটা মাধবী বুঝল না। সে কিছুটা অবাকও হলো তার পাশের রুমে কোনো ছেলেকে তার বাবা থাকতে দিচ্ছে তা ভেবে।
তবে সে বলল “আব্বা আপনি যা ভালো মনে করেন তই করুন আমার কোনো সমস্যা নেই ”
তখনি ঝুমা চৌধুরী এসে বললেন, ” কী বাপ মেয়ের মধ্যে কী নিয়ে এত গল্প হচ্ছে ”
” আব্বা আম্মা আপনাকে হিংসা করে ”
ঝুমা চৌধুরী বোকা বোনে গেল তিনি কী বলেলেন আর এই মেয়ে কি বললো। তিনিও বললেন, ” উমহ তোর বাপ কোথাকার জমিদাররে জমিদারের মেয়ের মতো বাপের হাতে চা বানিয়ে খাস ”
” আম্মাকে নিয়ে আজকেই শহর থেকে ভালো ডাক্তার দেখিয়ে আনবেন আম্মার সৃতি শক্তি লোপ পেয়েছে। আম্মা ভুলে গেছে ময়মনসিংহের জমিদার তার স্বামী আমার জন্ম ”
ঝুমা চৌধুরী কপাল চাপরালেন ! এ মেয়েকে কিছু বলা যাবে না।
মাহফুজ চৌধুরী বললেন ” আমি আসছি তোমরা কথা বলো ”
মাহফুজ চৌধুরী যাওয়ার জন্য পা বারাতেই ঝুমা চৌধুরী বললেন, ” তোর সাথে আমার কথা আছে ”
” তো কথাই তো বলছো । আবার নতুন করে বলতে হবে কেন। কী মতলব নিয়ে এসেছো ঝটপট বলে বলে ফেলো তো । ”
ঝুমা চৌধুরী মাধবীর এত কথা পাত্তা না দিয়ে বললেন, ” তোর আব্বাও ছেলেটাকে পছন্দ করেছে। তিনিই আমাকে বললেন তোকে যেন বোঝাই। দেখ মা গ্রামেদসূ মেয়েদের দেড়িতে বিয়ে হওয়াটা দৃষ্টিকটু দেখায় ”
” বিয়ে করলে হবেটা কী একটু আমাকে বলবে। না মানে এই মহৎ কাজের ফায়দাটা একটু জানতাম আর কি ”
” বিয়ে করলে তোর সুখের একটা সংসার হবে। ভালো থাকবি ”
মাধবী ভ্রু সরু করে । ঝুমা চৌধুরী আবার বলেন,
” ভালো থাকতে কে না চায় বল ”
তখনি মাধবী আকস্মিক চেঁচিয়ে তার বাবাকে ডাকে ।
মাহফুজ চৌধুরী বেশি দূর জাননি তাই মেয়ের আওয়াজ পেয়ে দৌড়ে আসে। এমনিতেও এই মেয়ের গলা যে খাড়া বাঁশ , অন্দর পেরিয়ে গেলেও শুনতে পেতেন।
মাহফুজ চৌধুরী আসতেই মাধবী বলে ” আব্বা আম্মা নাকি ভালো থাকতে চায়। সুখে থাকতে চায়। আম্মাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিন। আম্মা বিয়ের জন্য উতলা হয়ে আছে। না আম্মা ? ”
শেষ কথাটা মায়ের দিকে ফিরে বলে। ঝুমা চৌধুরী আহাম্মকের মতো তাকিয়ে আছে।
মাধবী আবার বললো, ” এমনিতেও রাজবাড়িতে অনেক দিন ধরে বিয়ে হয় না। বিয়ে না খেতে পেরে আমি শুকিয়ে যাচ্ছি। আম্মা যখন এতো করে চাইছে তাহলে ধুমধাম করে একটা বিয়ের আয়োজন করুন। আর আমাদের কবজি ডুবিয়ে খাওয়ার সুযোগ করে দিন ।”
তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ১+২
কিছুটা থেমে মাধবী আবার বলে, ” আম্মার লজ্জা বেশি তো তাই আপনাকে বলতে না পেরে আমার কানের কাছে একটু পর পর বিয়ের জন্য ঘ্যান ঘ্যান করছে। তাই আমি আপনাকে বলে দিলাম আমি আবার একটু বেশিই দয়ালু ” বলেই দাঁত বের করে হাসে।
