Home তুই আমার ৭ মিনিট তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৫+৬

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৫+৬

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৫+৬
ঐশী আফরিন

মাহফুজ চৌধুরী মেয়ের কথায় না হেসে পারলেন না। ঝুমা চৌধুরী বোকা বনে গেলেন। কী বিচ্ছু। কী বিচ্ছু ভাবা যায়? শেষ পর্যন্ত নিজের মা কে বিয়ে দেওয়ার কথা বলছে তাও বাবার কাছে। ঝুমা চৌধুরী ভাবলেন এটা ওনার মেয়ে হতেই পারে না। এমনিতেই তিনি এই মেয়ের চোখ ঝলসানো রুপ দেখে সন্দেহ করে আসলেই এটা ওনাদের মেয়ে তো ?? তিনি তো মাঝে মাঝে মাহফুজ চৌধুরী কে বলেই ফেলেন যেই ধাত্রি মাধবীর জন্মের সময় পাশে ছিল সেই ধাত্রিকে খুজে বের করে জিজ্ঞেস করতে যে তিনি ঐ রাতে মাধবীর আশে পাশে কোন সন্দেহ জনক কিছু আঁচ করেছেন কিনা। মানে জীন বা পরি টাইপ কিছু। যেহেতু আগিলা যুগের ধাত্রি জীন পরি সম্বন্ধে ধারনা থাকতেই পারে। তখন মাহফুজ চৌধুরী স্ত্রীর কথায় নিজেকেই নিজে বোকা মনে হয়।
ঝুমা চৌধুরী মনে মনে আওরালেন , “এ কোন সাধারণ মেয়ে নয় লা…এ হলো রুপ নগর থেকে হাড়িয়ে যাওয়া বিচ্ছু পরি ”

তখনই মালতী আসে । তার বাবা-মা ,বোনকে একসাথে গল্প করতে দেখে মিছামিছি দুঃখি হয়ে বলে, ” কী দিনকাল আসলো রে একটা কিউট ছোট মেয়েকে রেখে মানুষ আগুন সুন্দরী বড় মেয়েকে কী আদর টাই না করে । চ্যাহ । এসব মানা যায় না। ”
তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বলে ” আব্বা আমি আসলেই আপনাদের মেয়ে তো ? না কি কোথাও থেকে কুরিয়ে পেয়েছেন। কুরিয়ে পেলেও আমি আর আপি বোন, এটা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে আপনারা আমাদের আব্বা-আম্মা কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ। ”
তারপর কিছুটা হতাশ হয়ে বলে ” না জানি কেন রাজা বাদশাহ এর মেয়ে ছিলাম ”
ফোর এ পড়ে মেয়েটার কথা শুনে সকলেই হেসে উঠে। আর তাদের সৃতির পাতায় যোগ হয় আরেকটি সুন্দর দিন। কত সুন্দরই না বাবা-মা, বোনের সাথে কাটানো মুহুর্ত গুলো। যা সৃতির খাতায় অমূল্য রত্ন হিসেবে গচ্ছিত থাকবে আজীবন।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

সূর্য কিছুটা পশ্চিমে হেলে পরেছে। দুপুরের দিকে বৃষ্টি হওয়ায় এখন আকাশ পরিষ্কার। পরন্ত বিকেলের সূর্যটাকে কুসুমের মত স্নিগ্ধ লাগছে। তেজহীন সূর্যের হালকা আভা মাধবীর মুখশ্রী জুড়ে খেলা করছে। মাধবীর দুধে আলতা গায়ের রঙ আরো উজ্জ্বল দেখাচ্ছে কলা পাতা কলার গাউন পরাতে। মাধবী বাড়িতে সেলোয়ার-কামিজের চেয়ে গাউনই বেশি পরে। মাধবী তার রুমের পাশের ছোট বেলকনিতে বসে গল্পের বই পড়ছে। বই পড়া তার একপ্রকার নেশা বলা চলে। তবে এখন তার ভালো লাগছে না। একা একা আর কত ভালো লাগে। সে বিরক্ত হয়ে বই রেখে দেয় তখনই অন্দরে ঢোকে বিচ্ছু বাহিনী। বিচ্ছু বাহিনীর সদস্যরা হচ্ছে মালতী, তেহবীন, ইয়ানা,সায়মন আর মাধবী। মাধবী এই বাহিনী তৈরী করেছে এবং নাম দিয়েছে বিচ্ছু বাহিনী । তারা এসেই একেকজন মাধবীর চারপাশে গোল হয়ে বসে।

মাধবী হেসে সায়মন কে জিজ্ঞেস করে ” কিরে কখন এলি নানুর বাড়ি থেকে। চাচ-চাচি এসেছে ? ”
সায়মন জানায় সে আর তার মা এসেছে । বাবা ঢাকায় রয়ে গেছে আরিয়ান ভাইয়াকে নিয়ে একেবারে ফিরবে।
সবাই টুকটাক গল্প করে মাগরিবের আযান পরতেই চলে যায় । শুধু মালতী থাকে। সে তার বোনকে বাহিরের খবর জানাতে রয়ে গেছে। বলতে গেলে সে মাধবী গুপ্তচর । মাধবী স্বশরীরে বাহিরে উপস্থিত হতে না পারলেও ভেতরে বসে সে সব খবর রাখে মালতীর কাছ থেকে।

দুবোন এক সাথে মাগরিবের নামাজ পড়ে নেয়। নামাজ শেষে মালতী একে একে সব খবর দিতে থাকে। সকাল ১০ টায় আরিয়ানের বন্ধু অপূর্ব হায়দার। অপূর্ব শহরের বড় ডাক্তার। তার সাথে আরো দুজন ডাক্তার এসেছে নাম অভি আমীন নমস্কার আর জান্নাতুল ইচ্ছে । তাদের শহর থেকে পাঠানো হয়েছে গ্রামের ডাক্তারদের কোর্স করানোর জন্য। এখন তারা অতিথিমহলে থাকবে। আরিয়ান পরশু গ্রামে আসবে।
এতটুকু বলে মালতী কিছুটা উৎফুল্ল হয়ে বলে ” জানো আপি ওরা না খুব ভালো। আমার সাথে গল্প করেছে। আমি তোমার কথা ওদের বললে ওরা তো তোমাকে দেখার জন্য পাগলই হয়ে গেছে । আমি বলেছি ইচ্ছে আমাকে তোমার সাথে দেখা করাবো। ”

একটু থেমে আবার বলে ” ঐ অপূর্ব ভাইয়াটা কী যে হাস্যকর তুমি তার কথা শুনলে হাসতে হাসতে পেট ব্যাথা হয়ে যাবে । তবে সে বিশ্বাস করেনি তুমি যে এত সুন্দরী। কেউ নাকি এত সুন্দর হতেই পারে না। সে তোমার কে দেখার আগ্রহও দেখায় নি। ”
” না দেখানোটাই ভালো……
” নয়তো একবার দেখে ফেললে হার্ট এটাক করবে।”
মাধবীর কথা না শেষ হতেই মালতী বলে দেয়। দুবোন আর কিছুক্ষন এটা ওটা নিয়ে গল্প করে মালতী চলে যায়। মাধবী পড়া শেষ করে খাওয়া দাওয়া শেষে পাশের রুমে আসে। আজ আর মাধবী নিচে যায়নি তার মাথায় অন্য প্ল্যান চলছে। সে ভাবুক হয়ে সেই বড় গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকে। বিলাস বহুল রাজবাড়ির ঝলমলে আলোয় চারদিক আলোকিত। উচুঁ উঁচু বাউন্ডারির দেয়ালের উপর সিরিয়ালে হাজার হাজার মশাল জ্বলে রাত হলেই। সেই আলোয় গাছের উপরের মোটা মোটা ডালগুলো দেখা যাচ্ছে। গাছটা রাজবাড়ির এরিয়ায় পরলেও বাউন্ডারির বাইরে । জঙ্গলও রাজবাড়ির বাইরে পরে। মাধবী চিন্তা করলো সে আজ যাবেই ঐ গাছের কাছে। এমনিতেও তার ডরভয় নেই বললেই চলে।

জঙ্গলটা কয়েকদিনের না অনেক অনেক বছর আগের। কমপক্ষে তো ৩০০ বছর পুরোনো হবেই। মাধবীর দাদা আগে এ দেশের রাজা ছিল। রাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী। তিনি হিন্দু ছিলেন। মাহফুজ চৌধুরীর আগে নাম ছিল বজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী। পরে সবাই মুসলিম ধর্ম গ্রহন করে। তবে রাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করতে পারেনি। তার আগেই তিনি মারা যান। তারা মূলত রায় চৌধুরী বংশের। আচার্য রাজা সূর্যকান্তের উপাধি ছিল। তারা সবাই মুসলিম হলে রায় কেটে শুধু চৌধুরী রাখেন। রাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী ১৯ শতকে এই বিশাল রাজবাড়ি তৈরি করেন। এটি ময়মনসিংহ জেলার ১৮ কিলোমিটার পশ্চিমে ১০০ একর জমির উপর অবস্থিত।

চৌধুরীরা ময়মনসিংহ জেলার অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী জমিদার পরিবার। এদের জমিদারি ময়মনসিংহ , টাঙ্গাইল , জামালপুর সহ বহু অঞ্চলে বিস্তৃত। এই রাজা বংশের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ময়মনসিংহ জেলা স্কুল ও আনন্দ মোহন কলেজ। এই রাজবাড়ির প্রধান মহলের নাম ছিল শশীলজ যা বর্তমানে অন্দর মহল নামে পরিচিত। এটি ১৮৭০ সালে তৈরী হয়। এ রাজ বাড়িতে রয়েছে ইউরোপিয়স্থাপত্য ,বিশালহলরুম ,নাচঘর ,ঝাড়বাতি ,সজ্জিত কক্ষ। বাড়ির চারপাশে বাগান ও বিশাল বিশাল সিংহদার রয়েছে। মুক্তাগাছার বিখ্যাত মন্ডা মিষ্টি রাজবাড়ির অতথি আপ্যায়নের জন্য তৈরী। বর্তমান জমিদার বজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী যিনি বর্তমানে মাহফুজ চৌধুরী তিনি তার দানশীলতার জন্য দানবীর উপাধি লাভ করে। রাজবাড়ির সমস্ত পূর্ব পুরুষরা ছিল রাজা ও জমিদার। সকল জমিদার ও রাজারা কলকাতা পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার এবং ব্রিটিশ সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিল। মাহফুজ চৌধুরী ১৯৫৮ সালে রাজ সিংহাসনে বসেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনিই হন যোগ্য রাজা। তিনি রাজা থাকা কালেই তৃশান আর মাধবীর জন্ম হয়। রাজ্যের সকল প্রজারা তৃশানকে সম্রাট এবং মাধবীকে রানি মা বলে ডাকত। পরবর্তীতে রাজ প্রথা বিলুপ্ত হয়ে গেলেও মাহফুজ চৌধুরী জমিদারিতে বসে। তবে প্রজারা এখনও মাধবীকে রানি মা এবং তৃশানকে সম্রাট বলে সম্মান করে আজ পনেরো বছর ধরে তিনি জমিদারিতে আছে। প্রজারা তাকে অত্যন্ত বিশ্বাস , শ্রদ্ধা এবং সম্মান করে।

তৃশান চলে যাওয়ার পর এখন মাধবী আর তেহবীন এসব সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী। মাধবীর যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা ও সুকৌশলের জন্য মাহফুজ চৌধুরীর পরবর্তিতে জমিদারি পাবে জমিদার কন্যা মাধবীলতা চৌধুরী ইরাবতী। সবার ধারনা পর্দার আড়ালে থেকেও মাধবী নিপুণ হাতে রাজ্য শাসন ও পরিচালনা করতে পারবে। তবে মাধবীর এসবে মনোযোগ নেই। সে সম্পূর্ণ নিজের ভূবনে বসবাস করে। তার যা ইচ্ছা সে করে । একমাত্র বাবা ছাড়া কারো কথায় ধার ধারে না। সে এসব জমিদারিও চায় না। সে কখনোই বসবে না জমিদারিতে। তার ইচ্ছা সে পড়াশোনা করবে,তবে কোন কিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখে না। পড়াশোনার শেষে বিয়ে করবে।বরের সাথে ঘোরাঘুরি করবে। নিজের সমস্ত ইচ্ছা পুরন করবে। একটা সুন্দর সংসার হবে। আর মাঝে মাঝে অন্যায় দেখলে তার গোপন কাজগুলো করবে।
মাধবী এসব ভাবনা রেখে তার পরিকল্পনা সাজায়। কীভাবে রাজবাড়ির এতো কড়া পাহারা থেকে বের হবে। ঝটপট সে তার পরিকল্পনা করে নেয়। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজও শুরু করে। মাধবীর অন্দরের সামনে সবসময়ই অল্প বয়সী একজন মহিলা বসে থাকে। নাম রুমা ।মাধবীর কখন কী প্রয়োজন হয় দেখার জন্য। মাধবী রুমা কে নিজের একসেট জামা দিতে বলে। রুমা কারন জিজ্ঞেস করলে মাধবী তার নিন্জা ট্যাকনিক কাজে লাগিয়ে তার কথায় ১০০ ভোল্টের পাওয়ার দিয়ে বকবক বকবক করতেই থাকলে রুমা বাধ্য হয়ে আর কথা না বারিয়ে জামা দিয়ে দেয়। মাধবী ঠোঁট বাকিয়ে হাসে। সে একবার হাই পাওয়ারের বকবক শুরু করলে মানুষের মাথা ব্যথা তিলে ফেলে তবুও তার কথা কমে না । সে রুমাকে বলে তার আর কোন প্রয়োজন নেই সে এখন ঘুমিয়ে পরবে রুমা যেন চলে যায়। রুমা চলে গেলে মাধবী কাপরগুলো পরে নেয়। মুখটা ভালোভাবে বেধে নেয়। সে এটা প্রায়ই করে রাত-বিরাতে অপুর সাথে ঘোড়াঘুড়ি করে আড্ডা দিয়ে আবার বাড়ি ফিরে আসে। প্রহরীরা তার টিকিটাও ধরতে পারে না।

মাধবী প্রধান ফটক থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের পথে হাটে। রাত প্রায় দেরটার কাছাকাছি। মাধবীর হাতে টর্চ। চারদিকে সুনশান নিরবতা। ঘুটঘুটে অন্ধকারের পর্দা ভেদ করে মাধবীর টর্চের আলো ছরিয়ে পরছে। থেকে থেকে শিয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে। চারপাশের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে নিরবতা কিছুটা ফিকে হচ্ছে। মাধবী আয়াতুল কুরসী পরে বুকে ফুঁ দিয়ে নেয়। প্রায় বিশ মিনিটের মত হাঁটার পর মাধবী বাড়ির পেছনে পৌঁছায়। আরেকটু এগিয়ে যেতেই গাছের শিকঁর চোখে পরে। তার মানে গাছ পর্যন্ত পৌঁছাতে আরো পনেরো মিনিটের মত সময় লাগবে। মাধবী হাপিয়ে গিয়ে শিকঁরের কাছে বসে পরে। লাইট দিয়ে আশে পাশে একবার চোখ বুলায়। কেউ নেই। থাকার কথাও না। বড় বড় গাছগুলো অশ্বরীরির মত ঠেকছে। মাধবী লাইট অফ করে দিয়ে মুখ খুলে ফেলে। এখানে কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে তারপর আবার হাটবে। মাধবী বিরক্ত হলো। কী দরকার ছিল এরকম দানবের মত বিশাল বাড়ি করার । বাড়ির পেছন পর্যন্ত যেতে যেতেই পা ব্যাথা হয়ে যায়। অসহ্য । অন্ধকারে কিছুই চোখে পরছে না। মাধবী দু হাঁটুর ভাজে মুখ ঠেকিয়ে বসে।

হঠাৎ তীব্র আলোয় মাধবীর চোখ মুখ কুচকে যায়। তাড়াতাড়ি সে দাড়িয়ে পরে। সে মুখ ঢাকতেও ভুলে গেছে। সামনে দাড়িয়ে থাকা লোকটার হাত থেকে টর্চ পরে যায়। সাথে সাথেই দুটো প্রচন্ড চিৎকারে পুরো জঙ্গল কেঁপে উঠে। মাধবী জলদি মুখ ঢেকে ফেলে। লোকটা এখনও চিৎকার করে যাচ্ছে ভুত ভুত বলে।
মাধবী বিরক্ত হয়। একেতো তার পর্দা নষ্ট হয়েছে আরেকে তার বাবার কথার খেলাফ হয়েছে। দুটো মিলে মেজাজ খারাপ হয়।

মাধবী ধমকে উঠে লোকটাকে ” আমাকে দেখে কী আপনার ভুত মনে হয় ? আশ্চর্য ”
লোকটা আবারও চিৎকার করে ” তুই আমার মা লাগিস বোন । আমাকে কিছু করিস না। ”
মাধবীর ইচ্ছা হলো লোকটাকে কান ধরে ৩০০বার উঠবোস করাতে।
” আর একটা কথা মুখ থেকে বের হবে তো এখানেই মেরে ফেলে যাব। একটা ঠজ্বলজ্যান্ত মানুষ কে ভুত বানিয়ে দিচ্ছে । যত্তসব। ”
এবার লোকটা ঠিক হয়ে দাড়ালো। ” তাহলে মনে হয় আপনি পরির বংশধর। ঠিক বললাম তো ?”
” বালের বংশধর তুই। তোর নানা-নানী তোর চৌদ্দগষ্ঠী শালা জোচ্চোর” । কথাগুলো মাধবী মনে মনে আওরিয়ে মুখে বলে , ” কচুঁ বললেন । মনেতো হচ্ছে আপনি জ্বিনের বংশধর । না হলে এত রাতে এখানে কেন আসলেন। কে আপনি ?”

” আমি আরিয়ানের বন্ধু ”
“ওও আপনি তার মানে সেই অশুভ হায়দার না পায়দার কী যেন ”
“চ্যাহ এত সুন্দর একটা নাটকে কী বানিয়ে দিলেন । আমার নাম অশুভ না অপূর্ব হায়দার । তা আপনি কে ?”
আমি কে সেটা না জানলেও চলবে। এত রাতে এখানে কেন এসেছেন? চলে যান ”
অপূর্ব এতক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে কথা বলছিল এবার সে মাধবীর দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই অন্য সবার মতো তারও কথা বন্ধ হয়ে যায়। মাধবীর চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে অপুর্বের দুনিয়া থমকে যায়। মালতীর কথাগুলো মনে পরে। সে মালতীর কথাগুলো অবিশ্বাস করেছিল। করারি কথা। মালতী যেভাবে বলেছিল এরকম কোন মানুষের অস্তিত্ব হতেই পারে না। কিন্তু এখন সে বিশ্বাস করতে বাধ্য। হঠাৎ টর্চের আলোয় মাধবীর অপ্সরা রুপ দেখে সে সত্যিই ভয় পেয়েছিল। ভেবেছিল এই ঘন জঙ্গলে কোন পরি বসে আছে আজ বুঝি তার রক্ষে নেই। ভয়ের চোটে তো সে প্রেমে পরাও ভুলে গেয়েছিল। এখন এই মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে তার নিজেকে পাগল পাগল লাগছে। অপূর্ব বহু কষ্টে টেনে হিচঁরে চোখ নামিয়ে আনে। চোখগুলো বড্ড বেঈমানী করছে আজ।
অপূর্ব কিছু বলতে যাবে তার আগেই মাধবী বলে, “এই মুহূর্তের কথা যেন এখানেই সীমাবদ্ধ থাকে। আপনি আমাকে দেখেছেন এটা যদি কোন ভাবে কারো কানে যায় তাহলে আপনার লাশটা খুঁজে পাওয়াও দুষ্কর হবে। ”

মাধবীর শান্ত অথচ কঠোর ঠান্ডা কন্ঠের হুমকিটা অপূর্বের মনে ভয়ের আগে মুগ্ধতা আনে। বসন্তের কোকিলের মন মাতানো গানের সুরের চেয়েও মাধূ্র্য মেশানো মেয়েটার কন্ঠে। আবারও অপূর্বর কন্ঠ রোধ হয়ে আসে। ধপ করে হাঁটু গেরে মাটিতে বসে পরে সে। শরীরের সব শক্তি যেন কেউ শুষে নিয়েছে। অপূর্ব আবারও তাকায় ততক্ষণে মাধবী বাড়ির পথে হাটা ধরেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে মাধবীর অবয়বটা মিলিয়ে যায়। অপূর্ব আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়। অতিথিমহলে পৌঁছেই চোখে মুখে পানি দেয়।এই প্রথম কোন মেয়ে তার মন প্রভাব ফেলেছে ভাবতেভাবতেই অপূর্বর দিশেহারা লাগে। সে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থেকে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। এ আবার কোন ধরনের জ্বালা রে যেই এই মেয়েকে দেখে বা কন্ঠ শোনে সে নিজেই বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। অপূর্ব নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করে টেলিফোন নিয়ে আরিয়ানকে ফোন করে।

” হ্যালো ”
” আরিয়ান ”
” হুম ”
” একটা দূর্ঘটনা ঘটে গেছেরে ”
” কী কারনে ”
” ওমা এটা আবার কোন ধরনের প্রশ্ন? ”
” তোর কাছে যেই ধরনের প্রশ্ন মনে হবে এটা ঐ ধরনের প্রশ্ন। আর এরকম হাঁপাচ্ছিস কেন। রাত বিরাতে ইভটিজিং করে দৌড়ানি খেয়েছিস নাকি? ”
” ইভটিজিং কেন করতে যাব বাপ আমার। কখনো দেখেছিদেখেছিস এসব তার ছেড়া গিরি কাজ আমাকে করতে? আমি ইভটিজিং করি নাই একটা মেয়ে আমাকে ইভটিজিং করেছে। কী ভয়ংকর রকমের মেয়ে আবার আমাকে হুমকিও দেয় ”
ওপাশ থেকে আরিয়ানের হাসির শব্দ ভেসে আসে ” এটাই শোনার বাকি ছিলো শেষ পর্যন্ত? দেখবি কবে যানি তোকে সব মেয়েরা মিলে গ্যাং রেপ করে গুম করে ফেলে ”

” আস্তাগফিরুল্লাহ। আরিয়ান তোকে কি আমার ভুতে ধরলো নাকি? নাহলে তুমি চান্দুতো এভাবে কথা বলার লোক না। নাকি ভাবিরে দেখার শোকে পাগল হয়ে গেলি?”
” বাড়িতে ফিরে প্রথমেই তোকে একটা আর মধুকে একটা দু’জন কে দুটো দুটো চারটা চটকানা গিফ্ট করবো। থাক আর ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করা লাগবে না ”
” না না আমি এরকম এটটা গিফ্টের বদলি ধন্যবাদের মত ছোটখাট জিনিস দিয়ে তোকে ছোট করবো না। জুতার মত দামি জিনিস দিয়েই তেকে ছোট করবো চিন্তা করিস না ”
” এখন হয়েছেটা কী বলবি? কেন ফোন করেছিস? ”
” নাহ এখন বলবো না আগে তুই আয়। শেরওয়ানীটা না হয় দু বন্ধু একসাথেই পরবো ”
” প্রেম টেমের কেস নাকি ”
” তুই আগে আয়। রাখছি। ”

মাধবী উদাস বদনে ঘরময় পায়চারি করছে। কাল রাতে কিছুতেই দু চোখের পাতা এক করতে পারেনি। এভাবে প্রায়ই সে রাতে অঘুমা থাকে। তবে তার চোখের নিচের মসৃণ ত্বক ভেদ করে কখনও কালি পরতে পারেনি। মাধবী লোক পাঠিয়েছে অপুকে ডেকে আনতে। এখন অপুর আসার অপেক্ষা করছে। সকালে ইচ্ছে এসে দেখা করে গেছে তার সাথে। মেয়েটাকে মাধবীর ভালোই লেগেছে। অসম্ভব সুন্দরী মেয়েটা। সাদা এপ্রন গায়ে আরো অভাবনীয় সুন্দর লেগেছে মাধবীর কাছে। ভাবনার মাঝেই একটা শ্যাম বর্ণের মেয়ে তার অন্দরে প্রবেশ করে। পরনের চেকের কালো খয়েরি শাড়িটা টাখনুর উপর পর্যন্ত । সোজা সিথি করা মাথার চুলগুলো কোমরে দোল খাচ্ছে। মুখে কিছুটা রাগ আর বিরক্তির ছাপ।
মাধবী দৌড়ে গিয়ে জরিয়ে ধরে , ” অপুর বাচ্চা তোকে কখন আনতে পাঠিয়েছি কোথায় থাকিস তুই?”

” সরবি তুই এমনিতেই মেজাজ খারাপ ”
” ওমা তোর আবার মেজাজ খারাপও হয় ? আমিতো জানতামই না । তা কি নিয়ে ম্যাডামের মেজাজ খারাপ ?”
অপু না চাইতেও হেসে দেয়। এই মেয়েটার কাছে আসলেই তার সকল সুখ-দুঃখ , রাগ অভিমান, সব বরফের মত গলে যায় । ভাগ্য করে সে মাধবীর মত বান্ধবী পেয়েছে এটা সে প্রায়ই বলে।
মাধবী অপুকে ছেড়ে দিয়ে সোফায় বসে আবারও জিজ্ঞেস করে, ” আরে হয়েছেটা কী যদি না বলিস বুঝবো কী করে !”

অপুর কিছুক্ষন আগের কথা মনে পরে। সে তার মাকে ভুলিয়েভালিয়ে বাসা থেকে বের হয়। রাজবাড়ির লোকগুলোকে সে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছে। এসব ছাইপাশ সাথে থাকলে তার এলার্জি হয়। রাস্তায় বেশি মানুষজন না থাকায় সে লাফিয়ে লাফিয়ে আসতে আসতে পা মোঁচকে পরে যায়। সে ব্যাথা পেয়ে বসে পরে। আবার কেউ দেখার আগেই উঠার চেষ্টা করে। তখনই তার মুখের সামনে কেউ একজন লাঠি বারিয়ে দেয়। অপু তাকিয়ে দেখে অপরিচিত একটা ছেলে দাড়িয়ে আছে। পরনে কালো টাউজার আর গিয়া কলার সার্টের সাথে সাদা এপ্রন। চুলগুলোও পরিপাটি করা। ফর্সা গায়ের রঙ। এক দেখাতেই যাকে বলে সুদর্শন যুবক। অপুর হিংসে হলো ছেলেদের এত সুন্দর হতেই হবে কেন? তুই ছেলে তুই ছেলের মত থাকবি তোকে কে বলেছে এত ফর্সা হতে। তবে অপু বুঝলো এটা তাদের গ্রামের ছেলে নয়।

” প্রায় ৩০ সেকেন্ড হয়ে গেছে লাঠিটা নিয়ে দাড়িয়ে আছি। আমাকে পর্যবেক্ষণ করা শেষ হলে এবার উঠে পরুন ”
লোকটার কর্কশ আওয়াজে অপুর ধ্যান ভাঙে। সে শাঠিটা ধরতে যাবে ওমনি লোকটা লাঠিটা ফেলে দেয়।
” ৩৩ সেকেন্ডের বেশি সময় আমি কাউকে সাহায্য করতে পারি না । এমনিতেই আমার দয়ার শরীর। এখন যদি আরো দয়া দেখাই তাহলে দেখা যাবে শেষ মেষ আমার অবলা শরীরটা ব্লাস্ট হয়ে যাবে। ”
অপু দাঁতে দাঁত চেপে উঠে দাঁড়ায়। সে কি আর ছেড়ে দেয়ার পাত্রি। যতই সুদর্শন হোক না কেন তিনি অপু কী আর ছেরে দেবে ।

” তা অতি দয়ার শরীর নিয়ে সাহায্য করতে কেন এসেছেন জানতে পারি ”
” আপনাকে বলতে আবার বয়েই গেছে ”
অপু বুঝলো লোকটা ত্যাড়া টাইপের। তাই কথা না বারিয়ে আগে লোকটার পরিচয় জেনে নেওয়া যাক। এই সুদর্শন হাইব্রিট করলা কোথা থেকে এন্ট্রি নিয়েছে তা জেনে তারপর নাহয় ঝগড়া করা যাবে।
” মনে হচ্ছে এই গ্রামে নতুন এসেছেন তা কোন বাড়িতে উঠেছেন ”
” আপনাকে বলতে ইচ্ছুক নই ”
অপু মনে মনে লোকটার চৌদ্দগোষ্ঠি উদ্ধার করলো। এক নাম্বারের ফাজিল লোক। দেখে তো মনে হচ্ছে ডাক্তার টাক্তার হবে।

” আপনি কী ডাক্তার?”
” না আমি ডক্টর ”
লোকটার ত্যাড়া জবাবে অপুর মেজাজটা এবার চরে গেল। প্রথম দেখেই লোকটাকে কতই না ভালো লোগোছিল। ইশশ এই প্রথম কোন ছেলেকে ভালো লেগেছিল তাও আবার এক ভিনদেশী সুদর্শন হাইব্রিট করলাকেই ।
” আপনি জানেন আপনি কার সামনে দাড়িয়ে কথা বলছেন ? আমি এ রাজ্যের রানি মার একমাত্র প্রানপ্রিয় বান্ধবী । একবার যদি আপনার অভদ্রতামি কথাগুলো রানি মায়ের কানে তুলে দেই তাহলে কী হবে আপনার জানেন ?”
” কচুঁ হবে। আমিও আরিয়ানের বন্ধু । একবার যদি আপনার বেয়াদবির কথা আরিয়ানের কানে তুলে দেই তাহলে দেখবেন প্রতিদিন আপনার বাড়ির সামনে কুকুরের দল ঘোরাফেরা করছে আপনাকে আদর করার জন্য । এখন বিদেয় হোন এখান থেকে ”

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩+৪

অপু জিভে কাঁমোর দিলো, ‘এইরে ভুল জায়গায় ভুল ডায়লগ দিয়ে ফেলেছি।’
কথাগুলো মনে মনে আওরিয়ে সে দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করে। তবে যাওয়ার আগে আরও একবার পেছনে তাকায় । বিরবির করে ” মাশাল্লাহ সুদর্শন হাইব্রিট করলা ”

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৭