Home তুই আমার ৭ মিনিট তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৭

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৭

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৭
ঐশী আফরিন

অপু মাধবীকে সবটা খুলে বলে। সব শুনে মাধবী কতক্ষণ হেসে গড়াগড়ি খায়।
” হাসার কী হলো এখানে ? পাগলের মত হাসছিস ”
” আরে ঐ লোকটা আস্ত ঝগরুটে। জানিস আমা….” মাধবী থেমে যায়। তারপর কিছু একটা ভেবে খুকখুক করে কেশে উঠে।
” কী হলো যক্ষা রোগে ধরেছে না কি ”
মাধবী ঠোঁট টিপে হাসে ” প্রেম প্রেম গন্ধ পাচ্ছি ”

” হ্যা ? ”
” অদৃশ্য প্রেম প্রেম ভাব,
সরাসরি প্রেমের অভাব ”
অপু বুঝে যায় মাধবী এখন তাকে এটা নিয়ে জ্বালিয়ে রাখবে না ।
” দেখ বোন প্রেমটা করে ফেলতো চট করে আর আমাদেরও ফ্রিতে ডাক্তার দেখানোর সুযোগ করে দে ”
” তোর মাথা পাগল? আমার মত মেয়ের সাথে ওনার মত সাহেব প্রেম করবে না ”
” আরে করবে করবে তুই ব্যাপারটা আমার উপর ছেরে দে । আরিয়ান ভাই আসলে তাকে দিয়ে ব্যবস্থা করিয়ে দেব আমি । ব্যাটা দেখবি তোর জন্য দেওয়ানা হয়ে যাবে ”
” কোথায় আমি আর কোথায় উনি । শ্যাম বর্ণের মেয়েদের কেউ ভালোবাসে না। ”
” তুই জানিস অপু আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর মানুষগুলোর মধ্যে তুই দ্বিতীয় ”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

অপু চরম অবাক হয়। সে সুন্দর এই কথাটা সে এই প্রথম শুনলো তাও আবার ভুবন মহিনী রুপসীর মুখ থেকে। অপু আয়নার সামনে দাড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। তার গায়ের রঙ শ্যামলা কিছুক্ষন রোদে থাকলে কৃষ্ণবর্ণ ধারন করে। থুতনিতে একটা কালো তিল কছে। কাজল কালো বড় বড় চোখ আর আর কোমর পর্যন্ত ঘন কালো রেশমী চুল। এটাকে বড়জোর মায়াবি বলা যায় কিন্ত সুন্দর কথাটা এটার সাথে বেমানান লাগে।
” শ্যামবর্ণের মায়াবি চেহারা বাস্তবতার কাছে হাড় মানেরে মাধবী ”

কিছুটা থেমে অপু আবার বললো ” শ্যামাদের কেউ ভালোবাসবে সেটা কল্পনায় চিরস্থায়ী হলেও বাস্তবে ক্ষনস্থায়ি । যা সময়ের সাথে সাথে অন্যের প্রতি আকর্ষণিয়তায় রুপ নেয় তাই ওসব প্রেম ভালোবাসা আমাদের জন্য না ”
মাধবী হাসে ” শ্যামাদের চাইলেই ভালোবাসা যায় না । তাদের ভালোবাসতে গেলে একটা শুভ্র মনের দরকার যা মনের দরকার যা সবার থাকেনা । আর যা সবার থাকেনা তা মূল্যবান জিনিস। তাই শ্যামারা অত্যন্ত দামী মূল্যবান কোহিনূর । যা নিজের কাছে রাখার যোগ্যতাও সবার থাকেনা । তুই আমার কাছে সেই কোহিনূর হিরার চেয়ে দামি। ”
অপুর চোখ ছলছল করে। মাধবী অপুকে জরিয়ে ধরে চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে, ” এখন এসব কথা বাদ। আমার দুলাভাই হচ্ছে মানে হচ্ছে আর ওই অপূর্ব ভাই ই হবে আমার দুলাভাই। কথা ফাইনাল ”
অপুও হেসে দেয়। আবার বিরবির করে ‘অপু তোর ভাগ্য ভালো। না হলে এরকম বান্ধবী পেতি না ‘

” তোর পছন্দ হয়েছে অপূর্ব ভাইয়াকে ?”
অপু লাজুক হাসে। সে তো কখনই পিছলে পরেছে লোকটার উপর। এরকম সুদর্শন পুরুষ দেখে প্রেমে না পরে থাকা যায়। অপুর লাজুক হাসি দেখে মাধবীও যা বোঝার বুঝে ফেলে। তারপর দুজনে অনেকক্ষণ গল্প করে , চা খায়, আড্ডা দেয় । কিছুক্ষন পরপর এটা সেটা নিয়ে কথা কাটাকাটি হয় আবার ঝগড়ার মাঝেই দুজনে হেসে দেয় ।

বহমান সময়ের স্রোতে ভেসে গেল একটি দিন। আজ আরিয়ান আসবে। রাজবাড়িতে খুশির হাওয়া বইছে। হাওয়াটা বিশেষ করে ঝুমা চৌধুরীর গায়ে বেশি লাগছে। সকাল থেকে রান্নার আয়োজন চলছে। অপূর্ব স্টেশন থেকে আরিয়ান কে আনতে গেছে। অপূর্ব আধঘন্টা ধরে স্টেশনে বসে আছে আর মাধবীর কথা ভাবছে। সে মাধবীর নাম এখনও জানে না । শুধু জানে সেই মেয়ে জমিদার কন্যা আর রাজ্যের রাণী মা। তবে অপূর্ব তার একটা নাম দিয়েছে । অপূর্বর কাছে সত্যিই মনে হয়েছিল মেয়েটা নির্ঘাত কোন পরি। মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়েই অপূর্ব নিজের ধংস দেখেছে। মেয়েটার আগুন ঝরা রুপের বাহারে অপূর্ব তার নাম রেখেছে ‘অগ্নিপরি’। ট্রেনের তীব্র হুইসালের শব্দে অপূর্ব উঠে দাঁড়াল। এত লোকের ভীরেও তার আরিয়ান কে চিনতে বিন্দুমাত্র সময় লাগলো না। নিজের প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে দেখা মাত্রই সে দৌড়ে যায়। সে জরিয়ে ধরার আগেই আরিয়ান হাতের ব্যাগপত্র ফেলে তাকে জরিয়ে ধরে। এত দিন পর দুই বন্ধুর দেখা হওয়ার দুজনেই একটু সময় নেয়।

” ভাই এত বছর পর তোর দেশে আসার ইচ্ছে হলো ? আর কোন যাওয়া টাওয়া নেই। এবার থেকে তুই দেশেই থাকবি ”
” এমনিতেও আর যাব না। এখন ব্যাগ গুলোর ব্যবস্থা কর ”
অপূর্বর সাথে দুজন প্রহরী ছিল তারা ব্যাগ গুলো নিয়ে গাড়িতে তোলে। বিকেলের মধ্যভাগে আরিয়ান রাজবাড়িতে উপস্থিত হয়। মাধবী ঘরে বসে বই পরছিল বাইরে হুরুস্থুলের শব্দ শুনে সে বেলকনিতে যায়। এত উপর থেকেও মাধবীর আরিয়ান কে চিনতে বেগ পেতে হয় না। যদিও আরিয়ান আগের চেয়ে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মাধবী দৌড়ে ঘর থেকে দুরবিন নিয়ে আসে। এটা তৃশান তাকে কিনে দিয়েছিল। কখনো কাজে লাগানো হয়নি ।

মাধবী দুরবিনটাকে বেলকনিতে দাঁড় করিয়ে ঘরের ভেতর থেকে চোখ রাখে। আরিয়ান কে পুরোটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। লোকটার বলিষ্ঠ শরীরে শুভ্র কাবলি সেট টা দাড়ুন মানিয়েছে। পান্জাবির হাতা কঁনুই পর্যন্ত গোটানো যার ফলে যার ফলে লোকটার বলিষ্ঠ হাতের পেশি দৃশ্যমান। লাল কুর্তাটা ভাজ করে হাতের উপর রাখা। চওরা কাঁধ এবং প্রশস্ত বুকের সাথে পান্জাবিটা মনে হচ্ছে তার জন্যই তৈরি। পায়ে নাগড়া জুতো। কমপক্ষে ৬ ফুট ২,৩ ইঞ্চি তো হবেই। উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রঙের সাথে গালে হালকা ছাপ দাড়িতে ভীষন সুন্দর লাগলো মাধবীর চোখে। মাথা ভরতি বাবরি চুলগুলোতে কথা বলতে বলতে হাত বুলাচ্ছে। বাম দিকে বাদামী চোখজোরার নিচে ছোট্ট কাটা দাগটায় মাধবীর চোখ আটকে যায়। কতক্ষণ যে সে ঐ বাদামী চোখজোরায় তাকিয়ে থাকে তার ইয়াত্তা নেই। লোকটাকে খাঁটি শ্যাম সুদর্শন বলা চলে। কী সুন্দর মুচকি হেসে কথা বলছে সবার সাথে। মাহফুজ চৌধুরী আর অপু ছাড়া এই প্রথম মাধবীর চোখে কোনো পুরুষ কে সুন্দর লাগল।
মাধবী দুরবিনে চোখ রেখেই গেয়ে উঠে,

” বাবরী কাটা তার চুলের বাহার ”
” মুচকি হাসি হাসি মুখটা যে তার ”
” বাবরী চুলওয়ালা ঐ লাল কুর্তাওয়ালা ”
” দিলি বড় জ্বালা রে পান্জাবিওয়ালা ”
“দিলি বড় জ্বালা রে পান্জাবিওয়ালা ”
নিজের কাজে মাধবী নিজেই হতভম্ব। তাড়াতাড়ি দুরবিনটা সে রেখে দেয়। কোন পুরুষ কে সে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিল ভাবতেই মাধবীর হাশফাশ লাগে। তবে মাধবীর মনে হলো গানটা বুঝি শিল্পীরা আরিয়ান ভাই কে দেখেই বানিয়েছে। একদম খাঁপে খাঁপ।

এদিকে আরিয়ান মাধবীর বেলকনির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। তারপর সবার সাথে কুশল বিনিময় শেষে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত রুমে পা বারায়। রুমে ঢোকার আগে মাধবীর অন্দরের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে চলে যায়। গোসল করে আরেকটা কালো কাবলী সেট পরে নিচে আসে। আরিয়ান আসতেই সবাই খেতে বসে।
খাওয়ার মাঝেই আরিয়ান মাধবীর অন্দরের দিকে তাকায়। তারপর আহানের দিকে তাকায়। আহান এতক্ষন মাধবীর অন্দরের দিকে তাকিয়ে ছিল সেও এবার আরিয়ানের দিকে তাকায়। তারপর দুজনেই আবার মাধবীর অন্দরের দিকে তাকায়। আরিয়ান মাথা নিচু করে বাঁকা হাসে।
এদিকে অপূর্ব বেচারা কখন থেকে মাধবীর ঘর খুঁজে যাচ্ছে পাচ্ছেই না। আজ আরিয়ান এসেছে বিধায় তাকেও অন্দরমহলে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে। তার পাশে ইচ্ছে বসেছে তাকেও অন্দরে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে কিন্ত অভিকে দেওয়া হয়নি। কারন সে হিন্দু। অপূর্ব ইচ্ছের দিকে তাকিয়ে দেখে ইচ্ছে আরিয়ান কে চোখ দিয়েই গিলে খাচ্ছে।

” কী রে ইচ্ছুক ”
ইচ্ছে বিরক্ত হয়ে বললো ” কী ”
” অগ্নিপরি থুক্কু রাণী মায়ের ঘর কোনটা রে ”
” কেন ?”
” আরে বল না ”
” পারবো না ”
” তাহলে আমিও আরিয়ান কে বলছি কেউ তাকে চোখ দিয়েই গিলে খাচ্ছে। ”
ইচ্ছে আতঙ্কিত হয়ে বলে ” এই না না ”
” এখানে তোর নানা নেই ”

ইচ্ছের এখনও সেই ভয়াবহ শাস্তির কথা মনে হলে আতঁকে উঠে। সে আরিয়ান কে বারবার ফোন করতো বলে আরিয়ান বিদেশে থেকেই লোকের সাহায্যে তার পেছনে কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিল। কী দৌড়ানিটাই না খেয়েছিল সেদিন। আজও ভাবলে হৃদপিন্ড জায়গা থেকে নড়ে উঠে। সেদিন যদি আয়াজ তাকে না বাচাঁতো তাহলে আজ সে চান্দের দেশে পটল তুলতো। এই ছেলের একটা বাজে স্বভাব তার দিকে কোন মেয়ে তাকালেই হলো। তার পিছনে কুকুর লেলিয়ে দেয়। এসব মনে হতেই সে অপূর্ব কে মাধবীর অন্দর দেখিয়ে দিয়ে আবার আরিয়ানের দিকে তাকায়।
খাওয়া শেষে ঝুমা চৌধুরী আরিয়ান কে বললেন ” বাবা কফি দেব ”

” না । এক কাপ কড়া চা করে খাওয়াও তোমার হাতে।”
বলেই আরিয়ান উপরে চলে যায় আবার কিছুক্ষনের মধ্যেই নেমে আসে। সবার জন্য আনা জিনিস গুলো যার যার হাতে দিয়ে দেয়
” মৌমাছি কী মধু রাখার জন্য চাঁক আনতে ভুলে গেছে”
অপূর্বর খোঁচামারা কথায় আরিয়ান পাত্তা না দিয়ে আরিয়ান কাজ শেষ করে। জিনিস নিয়ে সবাই সবার ঘরে চলে যায়। আরিয়ান অপূর্ব আর ইচ্ছেকে অতিথিমহলে চলে যেতে বলে।
ইচ্ছে গলা খাঁখারি দিয়ে বলে, ” আসলে আরিয়ান তোমার ভাই এর নাম্বারটা একটু আমাকে দেও তো ”

” কোন ভাই?”
” আরে আয়াজ ”
” নেই ”
” সেকি তোমার আপন চাচাতো ভাই সে আর তোমার কাছে তার নাম্বার নেই?”
” অপূর্ব? আমার মনে হচ্ছে দেশি কুকুরগুলো কোন কাজের না । শুধু শুধু কুকুরগুলো বেঁচে থেকে অক্সিজেন নষ্ট করছে। তার চেয়ে ভালো কয়েকটা বিদেশি কুকুর আনাল ব্যাবস্থা কর ”
আরিয়ানের কথার মানে বুঝতেই ইচ্ছেকে আর পায় কে। কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে যায়। সাথে সাথে দু বন্ধু হেসে উঠে। আরিয়ান প্রথমেই সন্দেহ করেছিল । আয়াজ কতদিন ধরে ইচ্ছের পেছনে পরে আছে তাকে পাত্তা না দিয়ে শুধু শুধু এই মেয়ে তার পেছনে ঘুরে সময় নষ্ট করছে। আরিয়ান উপরে চলে যায়। অপূর্ব যাওয়ার আগে আরেকবার মাধবীর অন্দরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে যায়।

সন্ধ্যার পর মাহফুজ চৌধুরী মেয়ের ঘরে আসেন। মাধবীকে কিছু কথা বলে তা আরিয়ান কে বলতে বলে। মাধবী অবাক হয় তাকে দিয়ে কেন বলাচ্ছে? তবে বাবার দিকে তাকিয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। সে রাজি হয়ে যায়। মাহফুজ চৌধুরী খুশি হয় আরিয়ান কে ডেকে আনতে পাঠায়। আরিয়ান কিছুক্ষন আগে ঘুম থেকে উঠেছে। চোখে মুখে পানি দিয়ে বের হতেই রুমা এসে বলে যায় রাণী মা তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। আরিয়ান চরম অবাক হয় তবে তা মুখে প্রকাশ করে না। মুখ মুছে কালো কাবলি সেট পরে বেরিয়ে যায়। বাইরে মাহফুজ চৌধুরীর সাথে দেখা হয়।
তিনি বললেন, ” মাধবী মা তোমাকে কিছু কথা বলবে তা শুনবে। আশা করি তাকে নিরাশ করবেন না। সে ভেতরে আছে যাও ”

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৫+৬

কথাগুলো বলে মাহফুজ চৌধুরী সেখান থেকে প্রস্থান করে। আরিয়ান ধীর পায়ে এগিয়ে যায়। এতদিন পর মাধবীর সাথে সামনা সামনি কথা হবে ভাবতেই হৃদস্পন্দন বেরে যায়।

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৮