Home তুমি আমার শেষবেলা তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২১

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২১

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২১
নীতি জাহিদ

মিনহাজ অফিস থেকে ফিরে আজো মেয়ের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। এই দুই বছর মেয়েটা নিজেকে গুঁটিয়ে নিয়েছে। দু বছর আগে সেদিন দরজা আটকালো,হাসপাতালে যেতে দিলোনা আর মোনা দরজা খুলতে চায় না। সেদিনের মোনার আর্তনাদ এখনো কানে স্পষ্ট বাঁজে,
‘বাবা আমাকে যেতে দাও,একটি বার দেখতে দাও আমার ইমরান সাহেবকে। আমি আর জেদ ধরবোনা।’
সেদিন মোনা বেরিয়ে যেতে চাইলে মিনহাজ এসে আটকায়। মায়া সবার সামনে কষে অনেক গুলো চ*ড় দেয়। আর চিৎকার দিয়ে বলে,

‘ তুই আসলে ন*ষ্ট, এত টুকু মেয়ে হয়ে কি করে ফাঁ/সা/লি আমার ইমরানকে। তোকে আমি কখনোই ইমরানের হতে দিবোনা। শরীর বি!কি!য়ে!ছি!স ইমরানের কাছে,নাহলে কি পেয়েছে কচির মেয়ের মধ্যে সে।’
মিনহাজ নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। সেদিন কেউ প্রতিবাদ করেনি একমাত্র সালমা ছাড়া। সালমা আগলে নিয়েছিলো মোনাকে। আজো আগলে রাখে। চেচিয়ে সালমা বলেছিলো,
‘একটাই মাত্র সন্তান এই বাড়ির, মাইশা ভাবী থাকলে কিছুতেই মেয়ের অপমান সহ্য করতো না।আজ মেয়েটার মা নেই বলে সবাই ওর চরিত্রে দাগ বসাচ্ছে। তোমার চরিত্র কি ধোয়া তুলশী ছিলো। তুমিও তো ওর বয়সে কত রঙ ঢং করেছো ইমরান ভাইয়ের জন্য। আসলে ভাই বুঝতে পারছিলো তোমার রূপ।তাই তোমাকে বিয়ে করেনি। ইমরান ভাই কত পটেনশিয়াল আমরা জানি। উনি যেমন মোনার যোগ্য, তেমনি মোনা ও উনার যোগ্য। মোনার মায়ের হয়ে আমি আগলে রাখবো আজকে থেকে। দেখি কার কি ক্ষমতা আমার মেয়েকে আঘাত করার। আমি ওর বিয়ে দিব ইমরান ভাইয়ের সাথে দাঁড়িয়ে থেকে , আমার চ্যালেঞ্জ। ‘
মায়া ঝাঁ/পি/য়ে পড়লো সালমার উপর।চুল টেনে ধরলো,

‘তার আগেই তোকে আমি মে/রেই ফেলবো,মোনার চামচামি করবি তো।’
বাড়ির সবাই মিলে সালমাকে ছাড়িয়ে নিলো।মিনহাজ মোনাকে ঘরে আটকিয়ে দিলো। সেই যে মেয়ে ঘরের দরজা দিলো। এখন প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেনা। বললে ও দাদী আর সালমা ছাড়া কারো সাথে কথা বলে না।
প্রতিদিন এসে কড়া নাড়ে মন চাইলে খুলে নাহয় খুলে না। সেদিনের ঘটনার পর সব স্বাভাবিক হলেও মোনা আজো স্বাভাবিক না। বিয়ের জন্য কম বেশি সবাই পাত্র এনেছে। বাসায় বিয়ের কথা উঠলেই মোনা গায়েব হয়ে যায়। সেই থেকে মিনহাজ কঠিন ভাবে সবাইকে বলেছে যেন বিয়ের কথা না উচ্চারণ করে। মিনহাজ দরজা থেকে চলে গিয়েছে।
মোনা ফিসফিস করে বললো,

‘ বলো ইশান শুনছি আমি,বাবা ছিলো দরজায়।’
‘পাপার শরীর টা ভালোনা আন্টি, খুব জ্বর।এখানে কেউ নেই এখন। তুমি তো জানো এনাস্থাসিয়া কাজ করে বিকেলে চলে গিয়েছে ওর বাসায়।’
‘ জলপট্টি দাও। জ্বর মেপে বলো কত?’
‘১০৩। পট্টি তো দিচ্ছি সন্ধ্যা থেকে।’
ল্যাপটপের অপর প্রান্তে ঘুমন্ত মানুষটাকে কি স্নিগ্ধ দেখাছে। দু বছরে কয়েকটা চুল সাদা হয়েছে। কিন্তু বুঝাই যাচ্ছেনা। আচ্ছা এখন বয়স কত হবে ইমরান এর। বেয়াল্লিশ! ইশান মেডিসিন আনতে গেলো। এর মধ্যে ইমরান চোখ টিম টিম করে খুললো। ল্যাপটপের ভিডিও কলে পরিচিত মুখ, ফোলা ফোলা গাল, পরিণত ভঙ্গি,সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত মুখ দেখে ভ্রু কুচকালো। সাথে সাথে ফোন কেটে গেলো। দুই বছর পর সেই মানুষ টা।

‘ইশান… ইশান।’
‘জ্বি পাপা, উঠবেনা আমি মেডিসিন দিচ্ছি’
‘ ভিডিও কলে কে ছিলো?’
ইশানের নত মাথায় যা বুঝার বুঝে গেলো।
‘আর কথা বলবে না, মনে থাকবে?’
‘জ্বি পাপা।’
‘টেবিলে রেখে যাও,আমি খেয়ে নিব।তোমার এক্সাম চলছেনা? শেষ কখন?
‘কালকের টা লাস্ট?’
‘যাও ঘুমাও।আমি ঠিক আছি।’
‘তোমার পাশে শুই?’
ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ইমরান। মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো।

ইশতিয়াক আর তুশির মেয়ে ইতু। আদো আদো কথা বলে। মেয়েটার আজ জন্মদিন। ইমরান ইতালি যাওয়ার পর পরই হয়। ইশতিয়াক অনেক বার জোর করার পর ও আসছে না দেশে। কারণটা সবার জানা। আজ বাড়িতে অনেক গেস্ট এসেছে। ইমরান,ইশান ভিডিও কলে আছে ইতুর কেক কাটার দৃশ্য দেখছে। সব ঠিক থাকলে হয়ত আজ ওরাও দেশে থাকতো। ইশান মন খারাপ করে বসে আছে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে। ইতুকে কোলে নিতে ইচ্ছে করছে।
‘ পাপা ইতুকে কি কখনো সামনে থেকে দেখবোনা?’
‘ তোমার চাচ্চুকে বলব নেক্সট ইয়ার এখানে নিয়ে আসতে।’
‘ বাংলাদেশ যাবো না?’
ইমরানের চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট ক্রোধ দেখতে পেলো ইশান,কথা না বাড়িয়ে আবার ল্যাপটপের দিকে তাকালো।
‘তুমি চাইলে যেতে পারো ইশান’
‘না পাপা তোমাকে ছাড়া নয়।’

অনেকক্ষন ধরে কাজে মনোযোগ দিতে চাচ্ছে কিন্তু হচ্ছে না। উশখুশ করছে। উঠে গিয়ে কফি বানিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রকৃতি দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে। রাতের নিস্তব্ধতা যেন ইমরানের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। কাল থেকে ভাবছে ইশানকে অফিসে বসাবে। কলেজ লাইফ তো প্রায় শেষ করলো ছেলে। মাঝে একটু একটু যুক্ত করতে হবে অফিসিয়াল কাজে। ছেলেটা ও বড় হয়ে গেলো। ছোট্ট ইশান আর কয়দিন পর ভার্সিটি যাবে। ইষৎ হাসে ইমরান। কাজে ব্যস্ত থাকলে বাংলাদেশের দিকে মনোযোগ কম যাবে।
‘যে দেশ ছেড়েছে বিষাদে, সে দেশে পা রাখার কোনো প্রয়াস নেই। ‘

এক পা দু পা করে হাঁটছে আর লেক পানিতে ভেসে উঠা শাপলা ফুল গুনছে। মনে হচ্ছে এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মিনিট ত্রিশেক এর মাঝে ক্যাম্পাসে পৌঁছে গিয়েছে চয়ন এর ফোন পেয়ে। আজ প্রেজেন্টেশন আছে সেটাই ভুলে গিয়েছে মোনা। কয়েকমাস ধরেই ডিপ্রেশনের ঔষধ আর খাচ্ছেনা। কিছুই ভালো লাগছে না। তাই ব্রেন কাজ করেনা। কিছু মনে রাখতে পারছেনা। সবাই যার যার মত ভালো আছে,সে কেনো পিছিয়ে থাকবে। দেখতে দেখতে সময় গেলো ক্যাম্পাস জীবনের আর এক বছর আছে।
ক্লাসে ম্যাম চলে এসেছে। শেকসপিয়ার এর হ্যামলেট পড়াচ্ছে। প্রতিটি চরিত্র সুন্দর ভাবে বুঝিয়েছে। দেরি হয়ে যাওয়াতে প্রেজেন্টেশন নেয়নি। ক্লাস থেকে বের হয়ে চয়নকে বলল,
‘ আমি ওপেলিয়া হলেও তো পারতাম অন্তত মরে গিয়ে এদের সবাইকে শান্তি করে দিতাম। জানিস কাল দেখলাম ইমরান সাহেবের অনেক জ্বর। লোকটা ইতালি গিয়ে আরো সুদর্শন হয়েছে। কিন্তু ভয়ে কল ডিসকানেকট করে দিয়েছি।’
‘ তোর অবিশ্বাসই উনাকে দূরে ঠেলার জন্য দায়ী। ‘
‘সেই শা/স্তি/ই তো ভোগ করছি এত বছর ধরে। জানিস চয়ন বুঝতেই পারিনি ঠান্ডা মেজাজের আড়ালে মানুষটা এত অভিমানী।’
‘ভাইয়া আর কখনো দেশে ফিরবে না?’
‘জানিনা।’
দুজন হাঁটতে হাঁটতে বাসার কাছে চলে এসেছে।

রুমের সব কিছু এলোমেলো দেখে মোনা কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে দাদীকে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে। দাদী নিজে ও রুমে এসে দেখে অবাক হয়ে গেলো। বাইরে থেকে এসে রুমের এই বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে ভাবতে পারছেনা কে করলো? কিছুক্ষন পর মায়া এসে রুমে ঢুকে বললো,
‘আমি করেছি।’
সালমা কোলাহল দেখে রুমে ঢুকলো। তিনজন অবাক হয়ে গেলো।দাদী কিছুটা ধমক দিয়ে বললো,
‘ কেনো করেছিস এই অবস্থা।মেয়েটা মাত্র ফিরলো।’
‘ এত দরদ কেনো মা ওর প্রতি, আমার ইমরানকে ছিনিয়ে নিয়েছে ও আমার কাছ থেকে।ওর জন্যই বিয়ে করেনি আমাকে।’

মোনা দাদীর পেছনে লুকালো।গত দু বছর ফুফির এমন ভয়ংকর রূপ অনেকবারই দেখেছে।একবার তো তেড়ে এসে হাতের ফোন ছুড়ে মেরেছিলো। রাতে গলা চেপে ধরেছে। সেই থেকে দাদী আর সালমা চাচী ওকে আগলে রাখে। এসব করে নিজের সংসারটাও টেকে নি মায়ার। সালমা মোনাকে আগলে রাখে এখন।
‘ মুখ সামলে কথা বলো মায়া,ইমরান ভাইয়ের কোনো কালেই তোমার প্রতি আগ্রহ ছিলোনা। থাকলে মোনা জন্মের আগেই বিয়ে করতো তোমাকে।পাগলামি করছো কেনো আবার?’
‘ আসছে মোনার আরেক চেলা। এই বাড়িটা তো মোনারই আমার কোনো জায়গা নেই এই বাড়িতে। মোনা আমার জীবন তছনছ করেছে।ওকে আমি ভালো থাকতে দিব না।’
হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। মোনার দাদী নাতনীকে আদর করে মেয়ের পিছু নিলো।সালমাকে বললো মোনাকে দেখতে। মোনা ফোস করে শ্বাস ফেলে খাটে বসে চাচীর কোলে মাথা রাখে।
‘ আচ্ছা চাচী,আমার কি দোষ। মানুষটাকে তো আমিও ভালোবাসি,আমাকেও বাসে এরপর ও কিভাবে ফেলে গেলো।’

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২০

‘ইমরান ভাই সম্পর্কে তুই কিছু না জেনেই ভালোবেসেছিস মা, ইমরান ভাই এর অন্য পরিচয় যদি তুই জানতি তাহলে বুঝতে পারতি কাঁকন কেনো উনাকে বিয়ে করেছিলো, আর মায়াই বা কেনো পাগল হলো? পাহাড়ের মতো অটল, কখনো গাম্ভীর্য আবার কখনো সহাস্য মানুষটা সকল নারীর প্রেমিক পুরুষ ছিলো। ‘
মোনা কি যেন ভাবছে, সালমা পুনরায় প্রশ্ন করলো,
‘তুই প্রেমে পড়লি কি করে তোর চেয়ে এত বয়সের একজন মানুষের। সাধারণত তোর বয়সের মেয়েরা তো সমবয়সী পছন্দ করে বা অল্প গ্যাপ।’
‘ভালোবেসে আগলে রাখার মানুষের বড্ড অভাব ছিলো চাচী। যে মানুষটা প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে মোনালিসা ডেকেছিলো তার প্রেমে না পড়ি কি করে বলোতো?
সালমা হেসে মাথা নাড়ায়। কারণ সে জানে মোনা-ইমরান দুজনই ভালোবাসায় ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে যাওয়া কপোত-কপোতী।

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here