তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩১
নীতি জাহি
কার সাথে কি বোঝাপড়া করবে ইমরান। কার উপর রাগ দেখাবে। মায়াকে কষ্ট দিয়েছিলো বলেই কি কাঁকন ঠকালো! কিন্তু মোনা! সে তো নির্দোষ। কেনো মোমের মত পুতুলটাকে কষ্ট দিচ্ছে ইমরান? আজ পনেরো দিন মিটিং এর জন্য কক্সবাজার এসেছে। নতুন দুটো রিসোর্ট করছে এখানে। একেবারে সমুদ্রের নিকটে। উদ্ভোধন বিশেষ কাউকে দিয়ে করাবে । মাত্র কাজ শুরু হয়েছে। শেষ হতে বছর দুয়েক লাগবে। রিসোর্টের নাম ও ঠিক করা আছে বিশেষ কারো নামে। আজ যে করেই হোক ঢাকা ফিরতে হবে,নাহয় অনেক অসম্পূর্ণ কাজ থেকে যাবে। তা তো হতে দেয়া যায় না। এখানের কাজ গুছিয়ে নেয়া শেষ হয়েছে। বাসায় ফোন দিয়ে সবার খোঁজ নিয়েছে,ইশান বেশ কয়েকবার বলেছে মায়ের সাথে কথা বলতে কিন্তু প্রতিবারই যে দূরত্ব বজায় রেখে নাকোচ করে দিয়েছে ইমরান, তা মোনার কোমল মন সহজেই উপলব্ধি করেছে।
সেই রাতের পর আর ক্রোধে মোনার ঘরে যাওয়া হয় নি। আ/ত্ম/হ/ত্যা করার চেষ্টার মত অপরাধ করেছে এই কথাটা ইমরান মেনে নিতে পারেনি। যদি কিছু হয়ে যেত!! ভালোবাসলেই প্রকাশ করতে হবে কেনো? যদি বুঝেই নিতে না পারে অন্তরাত্মার ছটফটানি তাহলে সেখানে ভালোবাসা না থাকাই ভালো। কেনো তার যত্ন কি কখনো বুঝাতে সক্ষম হয়নি, সে কতটা আগলে রাখতে চায় ছোট্ট মোনালিসাকে!! কেনো বুঝতে পারে না এই মধ্যবয়সী রোদে পোড়া শ্যাম বর্ণের পুরুষ হয়তো ভয় পায়,বড্ড বেশি ভয় পায়,ঠকে যাওয়ার ভয়,চরম ভাবে ঠকে যাওয়ার ভয়! কষ্ট দেয়ার ভয় পায়। মোনালিসা এখনো ছোট্ট।সে চাইতো না তার এই জীবনে হাসি খুশি মেয়েটার জীবন জড়াতে। আড়াল থেকে ভালোবেসে যেত। ভালোবাসি বলা ঠিক যতটা সহজ,প্রকাশ করা তার চেয়েও কঠিন। কই এই পনেরো দিনে মেয়েটা একবারো তো খবর নিলোনা ইমরানের। ইমরান উদ্ধিগ্ন, ভীষণভাবে উদ্ধিগ্ন। মোনা কি তাকে স্বামী হিসেবে গ্রহন করতে পেরেছে আদৌ! এই মেয়ে আসলেই বুঝে সংসারের মানে?? মুখে মুখে ভালোবাসি আওড়ালেই কি ভালোবাসা হয়।
তার চেয়ে গুণে গুণে একুশ বছরের বড় মধ্য বয়সী পুরুষকে বিয়ে করেছে। এই ফ্যান্টাসি যদি কেটে যায়। আর কয়দিন নিজের এই শক্ত পোক্ত শরীরটা ধরে রাখতে পারবে ইমরান? এরপর যদি মোনার আর ভালো না লাগে? মোনা জানে না ইমরানের স্পর্শ কেমন? ইমরান জানেনা মোনা কি চায়? কাছাকাছি কখনো আসা হয়নি দুজনের। ইমরান নিজেকে আশ্বস্ত করলো,কাছাকাছি আসা ছাড়াও সংসার হয়। থাকুক না মোনা নিজের মত স্বাধীন। হলো না নাহয় কোনো শারীরিক সম্পর্ক যতোদিন মোনা না চায়। কিন্তু মানসিক একটা শান্তি তো আছে। ইশান মা পেয়েছে।
কাঁকন জেনে গিয়েছে মোনা এবং ইমরানের বিয়ের কথা সেই থেকে মেয়েটাকে জ্বালাচ্ছে।ইশতিয়াক কয়েকবার স্টেপ নিতে চেয়েছে কিন্তু ইমরান কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ওর সাথে দেখা করতে হবে।
পরিচিত নাম্বারে ফোন করলো,
‘হ্যালো, ঢাকার টিকিট কাটো। আমি আজই ব্যাক করবো।’
‘স্যার আপনি তো আরো এক সপ্তাহ পরে আসার কথা?’
‘আজই আসবো এবং এখনই বের হচ্ছি।আর কোনো প্রশ্ন নয়।’
‘ ওকে স্যার।’
টেবিলে একপাশে গাজর এর হালুয়া, কাচা সন্দেশ, ছানা বালুশাই,অন্য পাশে পেপে,লাউ,আলু,পটল এর তরকারি। ইশানকে বকে বকে ভাত খাওয়াচ্ছে মোনা। ওর তামাশা দেখছে তুশি আর আইরিন। তুশির মেয়েটা ঘুমাচ্ছে। তুশিও ভয় পেয়ে যাচ্ছে মোনার ধমকে। গত পরশুদিন প্রেশার লো হয়েছে ইশার এর। ডাক্তার বলেছে বেশি খেতে, না খেলে পড়ার চাপ নিতে পারবে না। বাংলাদেশে এসে কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন পড়া নিয়ে ভালোই বেগ পেতে হচ্ছে। এক বছর ড্রপ দিতে হবে। অনেক বার করে মোনা খেতে বলায় সকালে না খেয়ে কলেজে গিয়েছে। এরপর থেকে মোনার বকাবকি শুরু,
আইরিন ভীত কন্ঠে বললো,
‘মোনা রে বাদ দে আর দিস না। ও মনে হয় বমি করে দিবে।’
‘চুপ করো আপা, ও খাবে পারলে ওর বাপ ও খাবে। খাবারের বেলায় আদর কি। সবজি না খেয়ে কি শরীর বানিয়েছে। মাংস তো খেয়েছে। ওর বাবা ওরে সব শিখালেও খাবার খাওয়া শেখায়নি। হা করো ইশান।’
‘তুই নিজেও তো খাস না,তোরেই তো তোর বাপ বকে ধমকে খাওয়াতো।
‘চুপ থাকো আপা, শাক দিয়ে মাছ ঢাকবে না। আমার কথা বাদ। আমার প্রেশার লো হলে তখন এমন করে ধমকে খাইয়ে দিও।’
‘ মা গিলতে পারছিনা আর, প্লিজ। এসব ঘাস লতা পাতা কে খায়।আমি কি গরু?’
মোনা চেয়ার টেয়ার বসলো।
‘ বাবা আমরা খাবার পাই তাই কদর করিনা। যারা পায়না তাদের কথা ভাবো।’
ইশান মোনার কথার ইঙ্গিত বুঝে ফেললো,
‘স্যরি মা, অল্প অল্প করে দিও।তাহলে তো অভ্যাস হবে’
মোনা কথা বলতে বলতে কবেই খাবার খাইয়ে শেষ করে ফেলেছে টেরই পেলোনা ইশান।
‘পাপা…’
মোনা পেছনে ফিরে দেখে ইমরান দাঁড়িয়ে আছে। কখন এসেছে? তুশি এগিয়ে গিয়ে প্লেট কিচেনে রেখে এলো। ইমরান ছেলেকে জড়িয়ে ধরলো। অল্প কিছু কথা বলল। মোনা একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। এতদিন পর মানুষ টাকে দেখে মন খুশি হয়ে গেলো। একবার ইমরানের দিকে তাকালো। ইমরান ওর দিকে না তাকিয়েই সিড়ি বেয়ে লম্বা পা ফেলে রুমে চলে গেলো। এভাবে অবজ্ঞা করাটা কোনো মানুষই মেনে নিতে পারবেনা কিন্তু সেখানে মোনা ভাগ্যের দোহাই দিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যতটা খুশি হয়ে অধর প্রসারিত হাসি ফুটে উঠেছিলো ইমরানকে দেখে,ততটা বিষাদে চোখের কার্ণিশে দু ফোটা অশ্রুজল গড়িয়ে পড়লো বাকি সবার অগোচরে।
তুশি মোনার কাছে এসে বললো,
‘ভাবী উপরে যাও, ভাইয়ার কি লাগবে দেখো।’
মোনা মাথায় ঘোমটা টেনে বেসিনে হাত ধুতে গেলো। ইমরান রুমে গিয়ে কোট টা খুলে চেয়ারের উপর রেখে, শার্ট এর বাটন গুলো খুলে চিৎ হয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দেয়। কতদিন নিজের বিছানা। এই রুমটা ছেড়ে কোথাও গিয়ে শান্তি পায় না। এই রুমের সাথে কত স্মৃতি। ইশানের বেড়ে উঠা, নিজের কাজের সফলতা, জীবনের সব অংক কষেছিলো এই কামরাতে। এসির বাতাসটা গায়ে লাগছে। শাওয়ার নেওয়া উচিত কিন্তু শরীরে এনার্জি নেই। একটু ঘুম প্রয়োজন। সহসা কেউ একজন দরজা নক করার শব্দে প্রতিউত্তর করলো,
‘আসো’
মোনা গুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে দেখে চোখ বন্ধ করে শার্ট এর বাটন খুলে শুয়ে আছে বিছানায়।পা দুটো ফ্লোরে। উন্মুক্ত লোমশ বক্ষ চোখ পড়তেই নজর সরালো মোনা। কেনো জানি এই মানুষটাকে দেখার তৃষ্ণা মিটবে না, ঠিক তেমনি মানুষটা মোনার হয়ে ও মোনার নয়। নিজেকে বুঝালো মোনা। চোখ ফেরাতে মন চাচ্ছে না। মন চায় পাশে বসে সারাদিন দেখুক মানুষটাকে। দু চোখ ভরে দেখুক। ইমরানকে মনে হচ্ছে অনেক ক্লান্ত।
‘আপনার শরবত,টেবিলে রেখে গেলাম। আর কিছু লাগলে জানাবেন।’
ইমরান মোনার দিকে তাকালো, একটা সাদা কামিজ গায়ে হাতে দুটো চূড়ি সিম্পল,নাকের মধ্যে কি যেন চিকচিক করছে। নাকফুল হবে। মাথায় ঘোমটা। পুরো বউ লাগছে। যে মোনা স্নিকার্স,টি শার্ট, প্যান্ট পরতো, সে আজ থ্রিপিছে। মাত্র পনেরো দিনে এত পরিবর্তন?
‘ বাসায় আজ সব কি সবজি রান্না হয়েছে?’
‘নাতো,মুরগীর মাংস আছে তো। আপনি আসবেন জানলে আরো কিছু রান্না হত। আপনি বলেন কি খাবেন ব্যবস্থা করছি?’
‘ না ইশানকে ধমক দিতে শুনলাম ও না খেলে ওর বাপ ও খাবে,তাই জিজ্ঞেস করলাম।’
মোনা আমতা আমতা করছে। এটা কোনো কথা এই লোক চুপ করে কথা শুনছিলো।
‘ ও খেতে চাইছিলো না যে মুখ ফসকে বের হয়েছে। আর হবে না, আপনি শরবত টা খেয়ে নিচে চলে আসুন। খাবার দিচ্ছি।’
‘হুম’
মোনা রুম থেকে বের হয়ে দরজার সামনে দাড়ালো। দরজা খোলা থাকাতে কি মনে করে পেছন ফিরলো।চোখ বন্ধ করে আগের মতোই শুয়ে আছে ইমরান। মোনা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। মায়া বলেছিলো,ইমরান বাইরে থেকে এসে সযত্নে কাঁকনকে জড়িয়ে ধরতো। মোনার হয়তো সেই ভাগ্য নেই। আগের মোনা হলে এসব কখনোই ভাবতো না, দৌঁড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরতো। আজ কত সংকোচ। মোনা চলে যেতে পা বাড়ালো। ইমরান চোখ না খুলে বললো,
‘ সামনে এসে দেখলেই পারো,লুকিয়ে দেখার কি আছে।’
মোনার মধ্যে হঠাৎ লজ্জা এসে ভর করলো। সাত পাঁচ না ভেবে তাড়াতাড়ি ডাইনিং এ চলে গেলো। অদ্ভুত, কয়টা চোখ এই লোকের!! বুকটা এখনো ধুকধুক করছে। কিভাবে যেন কথা বলে। কি করে এই লোকের প্রেমে পড়লাম আল্লাহ জানে।
আইরিন মোনাকে খেতে বললো। মোনা বসলো না। বসলেই ওর কান্না পাবে। এই ইমরানই আগে ওকে কোলে তুলে যত্ন করে খাইয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখন কথাই বলে না,খাওয়ানো তো আকাশ কুসুম চিন্তা।
‘ দেখিস ইমরান তোকে খাইয়ে ছাড়বে। তখন বকা শুনে খাবি।’
মোনা তো তাই চায়। এর মধ্যে ইমরান এসে চেয়ার টেনে বসলো।আইরিন এবং মোনা খাবার বেড়ে দিলো। ঘড়িতে সাড়ে তিনটা বাজে। সকালে নাস্তা না করে ক্যাম্পাসে চলে গিয়েছে এক্সাম ছিলো তাই। এসে গোসল করে ইশানকে খাইয়ে দিলো। ইমরান খাবার আগে বোনকে জিগ্যেস করলো খাবে কিনা। বোন খেয়েছে জানালো। এমন সময় ফোন আসাতে আইরিন রিসিভ করতে চলে গেলো। মোনা আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে। ইমরান একবার ও ওকে জিগ্যেস করলোনা খেয়েছে কিনা। ইমরান খেয়ে উঠে গিয়ে বেসিনে হাত ধুতে গেলে রহিমা বললো,
‘ বড় আম্মা আপনে খাইবেন না?’
‘রহিমা আপা। আপনারা খেয়ে নেন।আমার ক্ষুধা নেই।’
‘আপনের কি মাথা ঠিক আছে। সকাল থেকে না খাইয়া বইসা আছেন। ইশান বাবারে খাওয়ানের সময় তো কইলেন আপনার ক্ষুধায় পেট জ্বলতাছে।’
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩০
মোনা আর কথা বাড়ালো না। রুমে চলে গেলো। রুমে দরজা লক করে এক গ্লাস পানি খেয়ে চোখ বন্ধ করতেই ঘুমের দেশের তলিয়ে গেলো। শরীর ক্লান্ত ছিলো। ক্ষুধা নিয়ে বসে থাকার কষ্ট টা মোনা কখনো সহ্য করেনি। ইমরান কি পারতোনা একবার জিজ্ঞেস করতে মোনালিসা খেয়েছো!
