তোমাতেই আসক্ত সিজন ২ পর্ব ৪৩
তানিশা সুলতানা
বালুর মধ্যে হার্ট সেপ এঁকে তাতে “Adrita+Abrar”
লিখে সিয়াম কে একখানা পিকচার তুলে দিতে বলে আদ্রিতা। সবগুলো দাঁত বের করে হাত দিয়ে লাভ বানিয়ে পোজ দেয়।
আর সিয়াম ফটাফট করে পিকচার তুলতে থাকে। ইচ্ছে ছিলো আবরার কে বলার “আমার পাশে এসে দাঁড়ান। একটা কাপল পিক তুলি”
কিন্তু লোকটার যে চোখ মুখের অবস্থা তাতে আর সাহস উঠলো না।
এরই মধ্যে আমানকে সকলে বালি দিয়ে ঢেকে ফেলেছে। শুধু মুখটুকু বেরিয়ে আছে।
এটা নিয়েও ওদের হাসি তামাশার শেষ নেই। হু হু করে হেসে চলেছে।
হঠাৎ করে আসমান থেকে চাঁদ বিলিন হয়ে গেলো। এক ফালি মেঘ এসে চাঁদকে ঢেকে দিলো। অন্ধকারে হারিয়ে গেলো ধরণী। এতক্ষণ সমুদ্রের পানি নীল দেখা গেলেও এখন কালো দেখাচ্ছে।
ঘুটঘুটে অন্ধকারে সমুদ্রের গর্জন ভয়ংকর লাগছে।
আদ্রিতা হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে আবরার কে খুঁজে নিলো। তার ডান হাত খানা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রাখলো।
বড়ই আদুরে স্বরে বলল
“মামার সঙ্গে কথা বলেছি আমি
আপনি এমন বেপরোয়া হয়ে চলেন না?
বাড়িতে আসেন না, কারো সাথে কথা বলেন না, সেজন্য রেগে আছে।
আমাকে দিতে চাচ্ছে না।
আপনি কিছুদিন বাড়িতে থাকলে, মামার সব রাগ চলে যাবে।
আবরার শুনলো কি না বোঝা গেলো না। তবে কোনো প্রতিক্রিয়া করলো না।
আদ্রিতা থেমে নেই
সে পুনরায় বলতে শুরু করল
“আমি ভেবে নিয়েছি
মামাকে গিয়ে বলবো
তোমার ছেলের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। উনি প্রমিজ করেছে আমাদের সঙ্গে ঢাকা থেকে যাবে। আর কখনো সুইজারল্যান্ড যাবে না।
তুমি বরং তোমার কোম্পানিটা ওনার নামে লিখে দিও। তারপর উনি তোমার মত অফিস করবে, তুমি বাড়িতে রেস্ট নিবে।
আমি ওনার জন্য রান্না করে রাখবো, বাসায় ফিরলে খাবার বেড়ে দেবো ঠিক মামনির মতো।
খুব সুন্দর ভাবে সংসার করবো আমরা।
তুমি দেখে নিও মামা
এবার আবরারের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেলো।
সে গম্ভীর স্বরে বলল
“মিথ্যা কথা বলিও না পাখি
টিপিক্যাল সংসার আমার কে দিয়ে হবে না।
আর উনার কোম্পানিতে আমি বসবো?
ইম্পসিবল
কালকে সকালে আমি সুইজারল্যান্ড ব্যাক করবো।
আবরারের হাত ছেড়ে দিলো আদ্রিতা। অন্ধকারে মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তবুও মাথা উঁচু করে তাকালো মুখপানে।
বললো
“আর আমি?
“এখানেই থাকবে
“আমাকে ছাড়া আপনি থাকতে পারবেন?
এবার আর জবাব দিলো না আবরার। আদ্রিতাও আর কিছু বলল না। কিছু মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো তারপর সিয়াম কে গিয়ে বললো
“ভাইয়া আমায় দিয়ে আসুন। অনেক রাত হয়েছে।
সে আমার প্রশ্ন কোনো করলো না। চুপচাপ সম্মতি জানিয়ে আদ্রিতাকে হোটেলে ফিরিয়ে দিতে গেলো।
এবার আবরার চোখ বন্ধ করে নিলো।
মনে পরলো কিছু মুহূর্ত আগে ক্লাব থেকে বের হওয়ার পরের ঘটনা।
ক্লাবেই ছিলেন আব্দুর রহমান। তিনি স্পষ্ট দেখেছেন তার ছেলে একজনকে খু/ন করেছে।
এটা নিয়ে তার কোনো অভিযোগ বা বক্তব্য নেই।
বহু বছর আগেই ছেলে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শিখেছে। তাকে কন্ট্রোল করার ক্ষমতা উনার নেই।
তবে আদ্রিতা এখনো হাতের মুঠোয় রয়েছে।
একজন সাইলেন্ট কিলারের সঙ্গে কিভাবে একটা ফুটফুটে ফুল কে দিবেন উনি?
কিভাবে বা নিজের হাতে মেয়ের মতো একজনের জীবন নষ্ট করবে?
আবরার ক্লাব থেকে বের হতেই আব্দুর রহমান তাকে জানায় “তোমার সঙ্গে কথা আছে। এসো আমার সাথে”
আবরার আপত্তি না করে বাবার পেছন পেছন যায়। ১০ তালা এই বিল্ডিং এর ছাঁদে চলে আসে দুজন। এখান থেকে সমুদ্রের ঢেউ গুলো স্পষ্ট দেখা যায়। শুধু গর্জন শোনা যায় না।
আব্দুর রহমান দূর আসমানে অবস্থিত থালার মতো বিশাল চাঁদের পানে তাকিয়ে বলে ওঠে
“তুমি কতক্ষণ বাঁচবে তার কোনো গ্যারান্টি আছে?
বলতে পারবে যে তোমার লাইফ রিক্সে নেই?
জবাব দিলো না আবরার। সে পকেটে হাত গুঁজে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
আব্দুর রহমান পুনরায় বলল
“আমার লাইফের গ্যারান্টি আছে।
আমি স্পষ্ট ভাবে বলতে পারবো গার্ড বা সিকিউরিটি ছাড়া গোটা পৃথিবী ঘুরে বেড়াবো আমার কোনো ক্ষতি হবে না।
আমি আমার ওয়াইফ কে ভালবাসি, আমার মেয়েকে ভালবাসি।
আমি এতোটুকু শিওরিটি দিতে পারবো আমার জন্য আমার ওয়াইফ বা মেয়ের কোনো ক্ষতি হবে না।
তুমি এমন শিওরিটি দিতে পারবে?
আমাকে বলতে পারবে
আদ্রিতা সঙ্গে তোমার বিয়ে দিয়ে দিলে ওর লাইফে কোনো প্রবলেম হবে না?
এবারেও আবরার জবাব দেয় না।
“আবরার তাসনিন
তোমার যখন চার বছর বয়স আমি প্রশ্ন করেছিলাম “বড় হয়ে কি হতে চাও”
তুমি ড্রয়ার থেকে আমার বন্দুকটা হাতে তুলে নিয়ে জবাব দিয়েছিলে “মাফিয়া”
আমি গোটা দুনিয়াকে আমার পায়ের নিচে রাখতে চাই।
কথাটা সে দিন সিরিয়াসলি নেই নি। ভেবেছিলাম বাচ্চা মানুষ কার্টুন বা মুভি দেখে এসব শিখেছে।
তারপর বাড়ি থেকে টিভি ফোন সব সরিয়ে ফেললাম। ছেলেকে মানুষের মত মানুষ করবো বলে সে আমার কতো প্রচেষ্টা।
দশ বছর বয়সে এসে স্কুলের একটা টিচারের চোখে কলম ঢুকিয়ে দিলে।
তার অপরাধ ছিলো “একটা টেন্স ভুল পড়িয়েছে”
সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম
আমার ছেলে টিভি বা ফোন দেখে মাফিয়া হওয়া সিদ্ধান্ত নেয়নি।
সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম আমার স্বপ্ন কোনদিন পূরণ হবে না।
আমার ছেলে একজন সঠিক মানুষ কখনোই হবে না।
দীর্ঘশ্বাস ফেললো আব্দুর রহমান।
“সংসার তোমাকে দিয়ে হবে না তাসিন।
তুমি জানো শেষবার কবে দুঃখ পেয়েছিলাম?
যেদিন জানতে পেরেছিলাম আমার আদর করে দেওয়া আবরার তাসনিন নামটা পাল্টে এটি তাসিন হয়ে গিয়েছো।
বাবা হিসেবে ব্যর্থ মনে হয়েছে।
এতটাই ঘৃণা করো আমাদের?
আমরা তোমার কাছে এতটাই বোঝা।
তারপর খানিকক্ষণ চুপ করে থাকেন উনি।
“শোনো তাসিন
তোমাকে আমি সময় দিচ্ছি
এক বছর
এক বছরের মধ্যে যদি মাফিয়া তাসিন থেকে আবরার তাসনিন হয়ে উঠতে পারো
তবে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তোমার সঙ্গে আদ্রিতার বিয়ে দেবো।
আর যদি না পারো
তাহলে ভুলে যেও আদ্রিতা নামের কেউ পৃথিবীতে আছে।
চলে গেলো আব্দুর রহমান। তখনই কোথা থেকে একটা গুলি এসে লাগলো ছাঁদের দেয়ালে। একটুখানির জন্য আবরারের শরীরে লাগে নি।
হাত মুষ্ঠি বন্ধ করে নিলো আবরার।
সুইজারল্যান্ডে বারো মাসই ঠান্ডা থাকে। তুষারপাতও হয় মাঝেমাঝে।
তবে আজকে ঠান্ডার পরিমাণ কম। গরম কাপড় গায়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না।
আবরার তাসনিন জিম করছে। হাতা কাটা টি শার্ট, কানে হেডফোন, ঘামে ভেজা শরীর, ঢিলে ঢালা টাওজার। কালো চুল গুলো এখন হালকা ব্রাউন কালার করেছে।
দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। যে কোনো রমণীর হৃদয় কাঁড়তে বাধ্য।
জিম টিম সিয়াম কে দিয়ে হয় না। এতো খাটনি করার কোনো প্রয়োজন আছে?
বিয়ে তো করতে হবে ওই একটা মেয়েকেই।
যদি ১০-১২ টা বিয়ে করার অপশন থাকতো তবে অবশ্যই জিম করতো।
একটা মেয়ের জন্য এত খাটনি করার কোনো মানেই হয় না।
সুইজারল্যান্ডে খুবই নামকরা একটা জিম সেন্টারে প্রতিনিয়তই আসা-যাওয়া করে ওরা।
আজকে আসার সময় কিছু সংখ্যক মানুষ দেখে ফেলেছে। এখনো তারা বাইরেই রয়েছে।
পুনরায় আবরার যখন বের হবে তার সঙ্গে কথা বলবে অটোগ্রাফ নিবে।
এটা নিয়ে সিয়ামের বেশ মাথাব্যথা রয়েছে। অটোগ্রাফ নিয়ে এরা কি করবে? না তো খেতে পারবে, আর না বিক্রি করতে পারবে।
তারপর ছবি তুলেই বা কি করবে?
মানুষের কত রকমের বাড়াবাড়ি।
অবশ্য সিয়ামের সঙ্গে এমন বাড়াবাড়ি করলে ব্যাপারটা খারাপ হতো না।
“হাইরে মানুষ ভন্ড
চোখ থাকিতেও অন্ধ
সৌন্দর্য বোঝে না তারা
হুদাই করে বাড়াবাড়ি
সিয়ামের থেকে সুন্দর মানুষ আছে না কি ধরনীতে?
যদিও কবিতাটা মিলে নি। তারপরও ঠিক আছে।
এমন অমিলানো কবিতাই বা কয়জন মানুষ লিখতে পারে?
আবরার পারবে লিখতে?
কোনদিনও না।
মানুষ আসলে ট্যালেন্টের মূল্য দিতে জানে না।
ক্রাশ খাওয়া উচিত কার উপর আর মানুষ খায় কার উপর।
ভাবনার মাঝেই খেয়াল করে আবরার বেরিয়ে যাচ্ছে। মুখে মাক্স পড়ে নিয়েছে ইতিমধ্যেই।
সিয়ামও ওর পেছন পেছন দৌড় দিলো। সেন্টারের বাইরে গাড়ি রাখা ছিলো। লেটেস্ট মডেলের নতুন কার লন্স হয়েছে। তিন কোটি টাকা মূল্য।
গোটা পৃথিবীতে দুই পিচ রয়েছে।
এক পিস আবরার কিনে নিয়েছে।
তাছাড়া সামনে মাসে iphone ১৮ লন্স হবে।
সেটাও আবরার তাসনিনের হাতে।
আবরার জিম সেন্টার থেকে বের হতেই সকলে চিল্লিয়ে উঠলো। তাসিন তাসিন বলে ডাকতে থাকলো অনবরত। ওদের দিকে ফিরেও তাকালো না আবরার। নিজের গাড়িতে বসলো। সিয়াম সবাইকে হাত নারিয়ে বাই জানালো। তারপর আবরারের পাশে গিয়ে বসলো।
এক হাতে ড্রাইভ করছে এবং অপর হাতে সিগারেট টানছে আবরার। গাড়ি জানালা বন্ধ করে এসি চালিয়ে দিয়েছে। গরম কাপড় আনতে ভুলে গিয়েছিলো সিয়াম। এখন ঠক ঠক করে শীতে কাঁপছে।
কিছু বলারও সহজ পাচ্ছে না।
তবে মনে মনে ভেবে নিয়েছে
“আর জীবনেও আবরারের সঙ্গে কোথাও আসবে না। কখনো না
কোনোদিনও না
জুরিখ নদীর ঝুলন্ত ব্রিজের সামনে গাড়ি থামায় আবরার। বিয়ারের বোতল হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নামে। এবং বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে যায় ব্রিজের মাঝখানে।
তারপর পা ঝুলিয়ে বসে পড়ে।
আইফেন ১৭ প্রো দিয়ে বোতলের মুখা খুলে ফেলে। ঠোঁটের ভাজে বোতল রেখে মাথা উঁচু করে ঢকঢক করে গিলতে থাকে।
তোমাতেই আসক্ত সিজন ২ পর্ব ৪২
গলার এডামস এ্যাপেল ওঠানামা করতে থাকে। হাতের পেশি গুলে ফুলে উঠেছে।
কিছু সংখ্যক মেয়েরা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলো। তারা ফোন বের করে ভিডিও করতে থাকে।
একদম ফিদা হয়ে গিয়েছে।
সিয়াম শুকনো ঢোক গিলে।
বিড়বিড় করে বলে
“আমিই তো প্রেমে পড়ে যাচ্ছি
আর মেয়েরা তো পাগল হবেই।
