Home তোমার নামের রোদ্দুরে তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২১

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২১

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২১
আশফিয়া হিয়া

হলুদের পর্ব শেষ হতেই বাড়িতে বিয়ের আমেজ শুরু হয়েছে। সেই সাথে একটি কষ্টেরও সূচনা হচ্ছে। সুমিতা বেগম মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছে। পিহুও মাকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে ফেলল। বাড়ির সকলের চোখেই পানি মেয়েটা আজ তাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে চাইলেও আগের মতো করে আর কাছে পাওয়া হবে না। পিহু এবার ভাইকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। রোহান নিজেও কেঁদে ফেলল। মুহুর্তেই বিয়ে বাড়িতে দুঃখের ছায়া নেমে এল। মিতা বেগমও কাঁদছেন তারও তো দুটো মেয়ে। তার আদরের মেয়ে দুটোকে পরের বাড়িতে পাঠিয়ে সে কি করে থাকবে। আরু আহি গিয়ে দু পাশ থেকে মাকে জড়িয়ে ধরল। তিনিও মেয়েদের আগলে নিল নিজের সাথে। আরু বলল,

– ” আমি কিন্তু তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাবো না মা।”
তার কথা শুনে আহি বলল,
– ” আমিও।”
মিতা বেগম চোখের পানি মুছে মৃদ্যু হেসে বলল,
– ” এসব বলতে হয় না মা জীবনের একটা সময় মা- বাবা ছেড়ে স্বামীর বাড়ি মেয়েদের যেতেই হয়।”
আরু সেটে শুনে মনে মনে বলল,
– ” আমার স্বামীর বাড়ী এটাই হবে। এইদিক দিয়ে আমি বড্ড লাকী।”

আরু তৈরী হওয়ার জন্য ড্রেসসহ সব সাজের জিনিস একে একে বের করল। তৈরী হওয়ার আগে সে একবার রুদ্ধর রুমের দিকে উঁকি দিয়ে দেখে এল সে লেভেন্ডার কালারের পাঞ্জাবি পড়েছে কি না। তার পরনের পাঞ্জাবি দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেলল। এবার সে তৈরী হবে। আহি আরু রুহানি এক রুমে বসেই যে যার মতো সাজছে। আরু মুখে সানস্ক্রিন মেখে হালকা ফাউনডেশন দিয়ে ফেসপাউডার দিল। চোখ জোড়ায় মোটা করে আইলাইনার দিল। দু গালে ও নাকের ডগায় ব্লাশন দিল, ঠোঁটে হালকা পিংক কালারের লিপস্টিক পড়ল ব্যাস তার সাজ কোমপ্লিট। এবার কানে এক জোড়া দুল পড়ল। দু হাতে হোয়াইট স্টোনের চুরি পড়ল। চুলগুলো সামনে থেকে স্টাইল করে বেঁধে পেছনে ছেড়ে দিল।এরপর তিন বোন গিয়ে পিহুর রুমে বসে থাকল কিছুক্ষণ। আরু এবার নিচে চলে এল। বাড়িত উঠানের একদিকে খাবারের প্যান্ডেল সাজানো হয়েছে। অন্যদিকটাই বর পক্ষের লোকেদের বসানোর জন্য জায়গা রাখা হয়েছে। রুদ্ধ বাইরে চেয়ারে বসে ফোণ স্কোল করছিল আরু গিয়ে ধপ করে তার পাশে বসে পড়ল। রুদ্ধ বিরক্তি নিয়ে তাকাতেই তার চোখ জোড়ায় এক রাশ মুগ্ধতা এসে ভীর করল। আরুর চোখেও মুগ্ধতা খেলা করছে। সে এক ধ্যানে রুদ্ধর দিকে তাকিয়ে রইল রুদ্ধ তার চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। আরুকে বলল,

– ” মুখের হা বন্ধ কর। মাছি ডুকে যাবে।”
– ” আপনি এত সুন্দর কেনো রুদ্ধ ভাই?”
– ” কি বললি?”
– ” কি..কিছু না।”
আরু হঠাৎ অবাক হওয়ার ভান ধরে বলল,
– ” এমা আপনার আর আমার ড্রেসের রঙ তো একেবারে মিলে গেছে।”
রুদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
– ” কেউ যদি নিজে থেকে মেলাতে চাই তাহলে না মিলে উপায় আছে?”
আরু থতমত খেয়ে বলল,
– ” মানে?”
রুদ্ধ জবাব দিল না আর। আরুও পা দুলাতে দুলাতে বলল,
– ” আমাকে কেমন লাগছে?”
– ” পেতনির মতো লাগছে। যখন তখন আমার মাথায় ভর করতে পারিস।”
আরুও জবাব দিল,
– ” সেটাতে কোনো সন্দেহ নেই আপনার মাথাতে তো শুধুমাএ আমিই ভোর করবো।”
বলেই গাল দুটো ফুলিয়ে বসে রইল। রুদ্ধ তার গালে এক আঙুল ডুবিয়ে বলল,
– ” মুখটা এমন ফুলিয়ে কি প্রমাণ করতে চাইছিস?”
– ” এটাই যে আপনি প্রচন্ড পরিমানের নিরামিষ একটা লোক।”
– ” আমাকে বোঝার মতো তোর এখনো বয়স হয়নি পিচ্চি। যখন বুঝতে পারবি তখন আমার থেকে পালিয়েও কুল পাবি না।”
এত প্যাচানো কথা আরুর মাথায় ডুকল না। সে রুদ্ধকে ভেংচি কেটে চলে গেল।

আহি অনেকক্ষণ ধরে মাকে খুজচ্ছিল কিন্তু খুজেই পাচ্ছে না। তার ভীষণ ক্ষিদে পেয়ে গেছে। বাড়িতে থাকলে এতক্ষণে তার দু – তিনবার খাওয়া হয়ে যেত এখানে এসেই সব উল্টা পাল্টা হয়ে গেছে। ইয়াজকে চুল ঠিক করতে করতে এগিয়ে আসতে দেখেই আহি তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ইয়াজ ভাব নিয়ে বলল,
– ” কি চাই?”
– ” বড়ো মা ছোট মা বা আমার মাকে কোথাও দেখেছো?”
– ” না।”
– ” ধুর কোথায় গিয়েছে আমার ক্ষিদে পেয়েছে তো?”
– ” তুই না সকালে এতগুলো খাবার খেলি এর মধ্যে খিদেও পেয়ে গেল?”
আহি কাদোঁকাদোঁ স্বরে বলল,
– ” কোথায় এতগুলো খাবার খেয়েছি এইটুকু খেয়েছি আমি খিদে সয্য করতে পারি না জানো না তুমি?”
ইয়াজ তার মাথায় আলতো করে গাট্টা মেরে হাত ধরে বলল,
– ” চল দেখছি।”
আহিও ভদ্র মেয়ের মতো তার সাথে যেতে লাগল।
ইয়াজ তাকে নিয়ে খাবারের রুমে এল ফ্লিজ খুলতেই অনেকগুলো মিষ্টির প্যাকেট ও কালকের বেচেঁ যাওয়া কিছু খাবার চোখে পড়ল। ইয়াজ তার দিকে তাকিয়ে দাতেঁ দাতঁ চেপে বলল,

– ” গাঁধা বাড়িতে যে ফ্রিজ রয়েছে সেটা জানিস না?”
আহির নিজেকে আসলেই গাঁধা মনে হচ্ছে এটা তার মাথায় একদমই ছিল না।
সে ইয়াজকে সরিয়ে ফ্রিজের সামনে গিয়ে মিষ্টি দেখে নাক – মুখ কুঁচকে নিল এখন মিষ্টি খায় কে? সে বিরিয়ানির বাটিটা বের করে কিছুটা গরম করে নিল। এরপর কিচেন কাউন্টারের ওপরে বসেই খাবার খাওয়া শুরু করল। ইয়াজ তার দিকে তাকিয়ে ছিল। আহি কাছে আসতে বলল। এক লোকমা খাবার তুলে তার মুখে ঠেসে দিল। ইয়াজ কিছু বলার সুযোগ পেল না।
– ” নাও তুমিও খাও এভাবে তাকিয়ে নজর দিও না।”
ইয়াক দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– ” আমি তোর মতো খাদক নই বুঝেছিস?”
আহি তার মুখে আরেক লোকমা ঠেসে দিয়ে বলল,
– ” বুঝেছি।” বলেই হেসে ফেলল।
ইয়াজ রাগতে গিয়েও রাগল না। আহির খাওয়া শেষ হওয়া অব্দি তার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল।

বরের গাড়ি প্রায় চলে এসেছে খবর পেতেই সকলে ছুটল গেট ধরার উদ্দেশ্য। রুহা নুহা দুজনে আহি ও আরুকে টেনে নিয়ে এল তারা কেউ গেটে যেতে চাইছিল না।রুহানি এমনিতেই আসেনি ফারিশের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ভীরের মধ্যে আরু কিছুটা পিছিয়ে গেল। হঠাৎ কারোর হ্যাচকা টানে সে থেমে গেল। আরু ভেবেছিল রুদ্ধ কিন্তু রুদ্ধর জায়গায় রোহানকে দেখে সে চমকে উঠল। তড়িঘড়ি করে হাত ছাড়িয়ে নিল। ভীত চোখে আশে – পাশে চোখ বুলাল।

– ” রোহান ভাইয়া আপনি? কিছু বলবেন?”
– ” অন্য কাউকে আশা করেছিলে বুঝি।”
– ” তেমনটা নয় তবে আপনাকে একদমই আশা করিনি।”
তার স্পষ্ট জবাব শুনে রোহানের কিছুটা মনক্ষুন্ন হলো। তবুও মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
– ” আমার তোমাকে কিছু বলার আছে আরু।”
– ” বলুন।”
– ” এখানে নয় একটু ওইদিকটায় চলো।”
– ” এখানেই বলুন আমি শুনচ্ছি।”
– ” এত ভীড়ের মধ্যে কিভাবে বলবো ওদিকটা কিছুটা ফাঁকা আছে তাই বলছি।”
আরু অনেক ভেবেচিন্তে যেতে রাজি হয়ে গেল।

শেখ বাড়ির হবু জামাই হিসেবে বিয়েরদিন ফারিশকে দাওয়াত করা হয়েছে। রুদ্ধ ফারিশকে এগিয়ে আনতে গিয়েছিল। ফারিশকে একটা চেয়ারে বসতে বলে সে একটু ভেতরের দিকে গেল। আশে পাশে তাকিয়ে আরুকে খুঁজল। অনেক্ষণ ধরে মেয়েটাকে দেখেনি কোথায় গেল সে?
নিধি সেজেগুজে মাএই নিচে নামল রুদ্ধকে দেখে তার সামনে এসে দাঁড়াল। রুদ্ধ কিছু বলল না।
– ” আমাকে কেমন লাগছে রুদ্ধ ভাই।”
রুদ্ধ তার দিকে না তাকিয়েই বলল,
– ” ভালো।”
নিধি তাতেই খুশি হয়ে গেল। হঠাৎ একটু দূরে চোখ যেতেই সে বলল,

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২০

– ” তুমি কি আরুকে খুঁজছিলে?”
রুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে বলল,
– ” তুমি দেখেছো ওকে?”
– ” ওইতো।”
রুদ্ধ সেদিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। কাছাকাছি যেতেই তার চোখ দুটো লাল হয়ে এল। হাত জোড়া মুঠো করে ফেলল।

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here