তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২২
নওরিন মুনতাহা হিয়া
[ সময় রাত : ১০ঃ৩০ ]
মেঘ পড়ার টেবিলে বই খাতার মধ্যে মুখ গুঁজে বসে আছে। তার পূর্ণ মনোযোগ এখন বইয়ের উপর। অন্য সময় হলে হয়ত, ডিভোর্সের কথা শুনে সে সারারাত কান্না করত। কিন্তু আজ তার চোখ – জুড়ে অশ্রু বিন্দু দেখা যায় না। মেঘের অন্তরে শত কষ্ট আর দুঃখ চোখ অশ্রু কোণা হয়ে গড়িয়ে পড়ে না। হয়ত চোখের কান্না এখন ক্লান্তি হয়ে তার সঙ্গ পরিত্যাগ করেছে।
কান্না করা বা কষ্ট পাওয়া সব এখন আপেক্ষিক শব্দ মেঘ এখন এইসব নিয়ে আর ভাবে না। মেঘ এখন শুধু তার পড়াশোনা আর তার মৃত বাবার সপ্ন পূরণ করতে চাই। জীবিত থাকার পর ও এখন কিছু মানুষ তার কাছে মৃত। আর মৃত ব্যক্তির জন্য সারাজীবন কষ্ট পাওয়া বা তাকে ভালোবেসে যাওয়া বোকামি। জীবন প্রবাহমান নদীর ন্যায় গতিশীল তাই জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সকলকে চলতে হয়। নদীর গতিবিধি রুদ্ধ করা গেলেও তার খোরস্রোতা পানির স্রোতকে বেঁধে রাখা অসম্ভব। ঠিক তেমন জীবনে ফেলা আসা অপ্রয়োজনীয় অতীতের সৃতি নিয়ে বেঁচে না থাকে। ভবিষ্যতে আসা রঙিন দিনের অপেক্ষা করা আর না হয় বর্তমানের বাস্তবতায় বাঁচা উচিত।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
অন্ধকারে বন্ধ এক রুমে কৃত্রিম বাতি জ্বলছে যার নিভু নিভু আলোয় সারা কক্ষ রঙিন হয়ে উঠেছে। রঙিন আলোর মৃদু আভা দিয়ে পড়ছে ঘুমন্ত এক যুবকের মুখে। যার সারা শরীর এখন সাদা চাদর দিয়ে আবৃত। বাহির থেকে আসা হীম শীতল বাতাসে ঘরের মধ্যে শীতের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা যুবকের শরীরে ঠান্ডা বাতাসের ছুঁয়া লাগে তার শরীর থরথর করে কেঁপে উঠে। চাদর জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকা পুরুষের গায়ে এখন ভীষণ জ্বর। জ্বর আর শীতের তীব্রতায় তার সারা শরীরে শিহরণ বয়ে যাচ্ছে।
সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে জ্বরের তীব্র বৃদ্ধি পায় সারা শরীর ক্ষণে ক্ষণে কাঁপুনি দিয়ে উঠছে। বিছানার পাশে টেবিলের ড্রয়ারে রাখা বাক্স ভর্তি ঔষধ অবহেলায় পড়ে থাকল। কিন্তু ঔষধের এক দানা ও রোগীর পেটে পড়ল না কারণ রোগীর আজ ঔষধের উপর অভিমান হয়েছে। অথবা সে চাই তার রোগ দীর্ঘ সময় স্থাথী হোক। এতোখন যে রোগীর রোগ বা জ্বরের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তার নাম আদ্রিয়ান রোদায়ান। যার শরীরে এখন তীব্র জ্বরের আগমন হয়েছে।
বৃষ্টির পানির ফোঁটা তার শরীরে পড়ার পর থেকে ধীরে ধীরে শরীর জ্বর নামক এক অসুখের ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে। যা এখন তার শরীরে হাঁটা চলা করার শক্তিকে প্রায় রুদ্ধ করে রেখেছে। আদ্রিয়ান ডক্টর হওয়ার পর ও শরীরে জ্বরের তীব্রতা লোপ করার জন্য কোন ঔষধ খায়নি। ঔষধের উপর এখন তার এক প্রকার বিরক্তি বা রাগ কাজ করছে যা তার অসুস্থতাকে ও হার মানায়। আদ্রিয়ান আজ বড্ড শখ হচ্ছে অসুস্থ শরীরে বিছানায় শুয়ে থাকার জ্বরকে এখন তার ভীষণ আপন মনে হচ্ছে। হয়ত তার এই শখ বা ইচ্ছা জীবনের প্রতি তার কোন ক্ষোভ বা বিদেষকে প্রকাশ করছে। যেখানে প্রতিটা জীব তার শরীরকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করে সেখানে আজ আদ্রিয়ান অসুস্থতা চাইছে। ভীষণ অসুস্থ হয়ে মৃত্যু বরণ করা এখন তার কামনা কিন্তু সামান্য জ্বরে কি কোন প্রাণীর মৃত্যু হয়। আদ্রিয়ানের সব চাওয়ার মতো হয় এই চাওয়া অপূর্ণ থেকে যাবে। জ্বরে তার মৃত্যু হবে না হয়ত জীবন এখন তাকে আরো কিছু দুঃখ, কষ্ট, আঘাত, যন্ত্রণা, হতাশা, বিষণ্ণতা উপহার দিতে চাই। তাই মৃত্যু দিয়ে জীবন তার সমাপ্তি চাই না।
সময় দ্রুত গতিতে অতিবাহিত হয়। ঘড়ির কাঁটায় যখন সময় যখন বারোটা তখন টেবিলে থাকা এলার্ম ঘড়ি টিকটিক শব্দ করে বেজে উঠে। ঘড়ির টিকটিক শব্দ মেঘকে যানান দেয় এখন তার পড়াশোনা শেষ করে ঘুমিয়ে পড়া উচিত। কারণ কাল থেকে তার ডক্টরি পড়াশোনা শুরু হবে, সকালে ভোরে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে মেডিক্যালে যেতে হবে। বইখাতা বন্ধ করে মেঘ টেবিল থেকে উঠে পড়ে এরপর ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসে। বিছানায় শুয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করে।
নিউইয়র্ক শহরে শীতের আগমন ঘটেছে। ঘরের বাহিরে থাকা নগরবাসী শীতের তীব্রতাকে রুদ্ধ করতে উষ্ণ কাপড় পরিধান করেছে। কিন্তু অজানা এক কারণে মেঘের শরীরে আজ গরম অনুভব হচ্ছে, এই অনুভূতি কি গরমের না তার মনের অস্থিরতার তা হয়ত মেঘ যানে না। মেঘ তার রুমে রুম হিটার ব্যবহার করেনি বরং সে এসি আর ফ্যান দুইটা একসাথে ছেড়ে রেখেছে। তবুও মেঘের শরীরে উষ্ণ অনুভূতি হারিয়ে যাচ্ছে না বরং তা তীব্র হয়ে মেঘের চোখ থেকে ঘুম কেঁড়ে নিয়েছে। মেঘ তার চোখ জুড়া বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ার ভীষণ চেষ্টা করে কিন্তু চোখে ঘুমের কোন আবির্ভাব হয়নি। কিছুক্ষণ পর মেঘ তার বন্ধ চোখ খুলে দেয়, তার নির্ঘুম দৃষ্টি নিয়ে রাখে উপরে ঝুলন্ত ফ্যানের দিকে।
ভন ভন শব্দ করে মাথার উপর মেঘ ঘুরছে। আমেরিকায় শীতকালে যেমন শীতের তীব্রতা হঠাৎ করে বৃদ্ধি পায়, ঠিক তেমন গরম কালে গরম পরিমাণ কখন অতিরিক্ত হয়ে যায়। যার কারণে গেস্ট রুমে এসি আর মেঘ দুইটা লাগানো হয়েছে। মেঘ ঘুরন্ত ফ্যানের দিকে তাকায়, তার চোখে ঘুম আসছে না। কিন্তু সে যদি আজ সারারাত নির্ঘুম রাএি পার করে তবে কাল মেডিক্যালে যেতে পারবে না। ভার্সিটির প্রথম দিন সে ক্লাস মিস বা দেরি করে যেতে চাই না। অতএব মেঘের মনকে এখন শান্ত করা প্রয়োজন। মেঘ বালিশের নিচে রাখা ফোন বের করে এরপর কানে হেডফোন লাগিয়ে তার পছন্দের একটা গান শুনতে থাকে।
সকল গানের মধ্যে মেঘের এক প্রিয় গান রয়েছে তার নাম “বোঝেনা সে বোঝেনা। এই গানের প্রতিটা সুর, কণ্ঠ, কথা মেঘের মন ছুঁয়ে যায়, মেঘ অন্তর দিয়ে তা অনুভব করে। আর গানের কিছু কথা মেঘের জীবনের সাথে অদ্ভুত ভাবে মিলে যায়। যার জন্য এই গান হয়ত মেঘের পছন্দের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে। মেঘের কানে থাকা হেডফোনে গান বেজে উঠে, মেঘ চোখ বন্ধ করে অনুভব করে। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাএি এক নির্জন রুমে গান বেজে উঠে ___
“- যদি একটিবার ও পারত —-.
“- সব চিন্তা ভুলে আসতে —.
“- আমি সব হারাতাম তাকে —.
“- তাকে পেতে হায় —–.
“- কবে পায়ের শেকল খুলবে —.
“- আর পায়ের শিকল খুলবে —.
“- আর প্রেমের পর্দা উড়বে —.
“- আমি চেয়ে থাকি সেই দিনের সীমানায় —.
“- বোঝেনা সে বোঝেনা —.
“- বোঝেনা সে বোঝেনা —-.
গানের সুর মেঘের মন ছুঁয়ে যায় আর মেঘ অনুভব করতে থাকে। গান শুনতে শুনতে কখন যে মেঘ ঘুমের অতুল গহীনে হারিয়ে যায় মেঘ বুঝতে পারে না। মেঘের কানে এখন গান বেজে চলছে কিন্তু মেঘ শুনে না কারণ এখন সে বিভোর ঘুমে হারিয়ে গেছে।
সকালে সূর্যর আলো জানালার সুক্ষ কাচঁ ভেদ করে রুমে প্রবেশ করে। ঝলমলে আলোয় আলোকিত হয়ে উঠে সারা ভুবন। সদ্য গোসল শেষ করে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসে আদ্রিয়ান, তার শরীরে থাকা পানি বিন্দু মুক্তর মতো চিকচিক করছে। আদ্রিয়ান ধীর পায়ে হেঁটে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। কাল শেষ রাতে যখন জ্বরে মাএা অতিরিক্ত হারে বেড়ে যায় তখন ড্রয়ার থেকে খুব সাধাারণ আর কম পাওয়ারের একটা ঔষধ খায়। যার ফলে তার শরীরে এখন জ্বর নেই এখন সে সুস্থ তবে কতখন থাকবে তার কোন ঠিক নাই। জ্বর যেকোন সময় হঠাৎ করে উঠতে পারে, তাই সে চাই তাড়াতাড়ি মেডিক্যালের ক্লাস শেষ করিয়ে বাসায় চলে আসতে।
আদ্রিয়ান আলমারি থেকে তার প্রয়োজনীয় জামা কাপড় বের করে। গাঢ় রঙের সাদা শার্ট আর তার উপরে ডক্টরির এফরন। জ্বরের কারণে কাল সারারাত আদ্রিয়ানের ঘুম হয়নি, চোখ জুড়া অসম্ভব লাল হয়ে রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। আদ্রিয়ান এক সাদা ফ্রেমের স্বচ্ছ কাঁচের চশমা পড়ে নেয় এরপর সম্পূর্ণ রেডি হয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে মেঘ, এরপর ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে কিছু সময় বই নিয়ে বসে থাকে। পড়াশোনা শেষ করে আলমারি থেকে জামাকাপড় বের করে পড়ে নেয়। মেঘ কালো রঙের বড়ো একটা ফ্রক পড়ে,গলায় সুতির উড়না জড়ায়। তার এলোকেশী চুল কৃত্রিম জিনিস দিয়ে আটকে রাখে। এরপর হাতে স্বল্প মূল্যর ঘড়ির পরিধান করে নিজেকে মানানসই সাজায়। পরিপাটি হয়ে রেডি হয়ে রুম থেকে বের হয়।
আদ্রিয়ান সিঁড়ি দিয়ে বড় বড় পা ফেলে গটগট করে নিচে নেমে আসে মেঘ এখন তার রুম থেকে বের হয়নি। বাড়ির কাজের মহিলা সকালের খাবার রান্না করে টেবিলে নাস্তা সাজিয়ে রাখে। আদ্রিয়ান টেবিল থেকে চেয়ার টেনে সরিয়ে বসে পড়ে। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে মেঘ তার চোখ যায় টেবিলে বসে থাকা আদ্রিয়ানের দিকে। মেঘ কিছু না বলে টেবিলের কাছে এগিয়ে যায়। আদ্রিয়ান মেঘকে দেখে বলে —
“- মেঘ খাবার খেতে বসুন। দ্রুত খাবার খাওয়া শুরু করেন না হলে কলেজে যেতে লেইট হয়ে যাবে .
আদ্রিয়ানের কথা শেষ করার পূর্বে মেঘ চেয়ার সরিয়ে টেবিলে বসে যায়। থালা থেকে প্রয়োজনীয় খাবার তার প্লেটে নেয় এরপর খাওয়া শুরু করে দেয়। আদ্রিয়ানের সাথে মেঘ কোন কথা বলল না কাল রাতের ঘটনার জন্য হয়ত। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে মেঘের আজ আদ্রিয়ানের সাথে কথা বলতে বা তাকে দেখার আগ্রহ জন্মায় নি। মেঘের কাছে আদ্রিয়ানকে এখন অপরিচিত ব্যক্তি আর তার শিক্ষক। মেঘ চুপচাপ শান্ত হয়ে খাওয়া শুরু করে আদ্রিয়ান ও তাই করল। মেঘের যখন খাবার খাওয়া প্রায় শেষ, হাত ধুয়ে টেবিল থেকে উঠে পড়বে। তখন আদ্রিয়ান বলে ——
“- মেঘ তুমি খাওয়া শেষ করে বাহিরে আমার গাড়ির মধ্যে বসে অপেক্ষা কর। মেডিক্যাল কলেজে আজ আমার প্রথম ক্লাস রয়েছে। আমাদের দুইজনের গন্তব্য যেহেতু একই জায়গায় তাই একসাথে যাওয়ায় উত্তম.
আদ্রিয়ানের কথা মেঘ শুনে। কিন্তু মেঘ চাই না আদ্রিয়ানের সাথে কোথাও যেতে তাদের দুইজনের গন্তব্য এক হলেও রাস্তা আলাদা। তাই একে অপরের থেকে দূরে থাকায় শ্রেয়। মেঘ না _ বোধক উত্তর দেয় –
“- আদ্রিয়ান স্যার আমি আপনার গাড়ি করে যেতে চাই না, আমি একাই যেতে পারব। তাছাড়া লাইব্রেরি থেকে আমার প্রয়োজনীয় কিছু বই কিনতে হবে। আমার একটু দেরি হতে পারে.
মেঘের একসাথে না যাওয়ার কথা শুনে আদ্রিয়ান বলে —
“- মামা – মামি লন্ডনে যাওয়ার আগে তোমার দায়িত্ব আমার উপর দিয়ে গেছে। আমেরিকার রাস্তা – ঘাট তোমার পরিচিত নয় মেঘ যদি কোথাও হারিয়ে যাও বা বিপদে পড়ো। তখন সব দোষ আমার কাঁধে এসে পড়বে.
মেঘ আদ্রিয়ানের কথা বুঝে ফারহানা বেগম আবিহা সহ বাড়ির প্রতৈকে। বিদেশে যাওয়ার আগে আদ্রিয়ানকে বলে দিয়েছে মেঘকে গাড়ি করে কলেজে পৌঁছে দিতে। আদ্রিয়ান হয়ত তার দায়িত্ব পালন করতে চাই। কিন্তু মেঘ চাই একা একা চলাফেরা করতে, কতদিন আর অন্যর ভরসায় সে চলবে। মেঘ বলে —
“- হুম স্যার আপনার কথা ঠিক। কিন্তু আমি চাই একা চলার অভ্যাস করতে। আর আপনি নিশ্চয়ই সারাজীবন আমাকে গাড়ি করে কলেজে পৌঁছে দিবেন না? বাকি জীবন চলার পথে আমাকে একাই হাঁটতে হবে.
মেঘের কথায় আদ্রিয়ান সম্মতি দেয় আর বলে —-
“- মেঘ প্রতিটা মানুষকে তার জীবনের চলার পথ একাই খুঁজতে হয়। ক্ষণিক সময়ের জন্য হয়ত কেউ তোমার সঙ্গ দিবে, কিন্তু সঙ্গী হয়ে সারাজীবন থাকবে না। কিন্তু আমি চাই তুমি যতদিন মেডিক্যালে যাওয়ার রাস্তা খুব ভালো করে চিনে না যাও, ততদিন আমার সাথে গাড়ি করে যাবে।
“- কিন্তু আদ্রিয়ান স্যার.
“- মেঘ আর কোন অযুহাত নয় হাত ধুয়ে গাড়িতে গিয়ে বসো। খাবার শেষ কর আমি আসছি.
মেঘ আর কথা বাড়ায় না বাধ্য মেয়ের মতো টেবিল থেকে উঠে গাড়িতে গিয়ে বসে যায়। খাবার শেষ করে আদ্রিয়ান ও গাড়ির দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে। আজ ড্রাইভার গাড়ি ড্রাইভ করে, জ্বরের কারণে আদ্রিয়ানের শরীর বেশ দুবর্ল। তাছাড়া সে খুব সামান্য পাওয়ারের ঔষধ সেবন করেছে হয়ত রাস্তার মধ্যে তার শরীরে আবার জ্বর চলে আসতে পারে। অসুস্থ থাকা অবস্থায় গাড়ি ড্রাইভ করা নিরাপদ হবে না। আর বাড়িতে যখন ড্রাইভার আছে তখন তার কষ্ট করে ড্রাইভ করার কি দরকার?
ডিভোর্সের ঘটনা পর মেঘ আদ্রিয়ানের সাথে কোন খারাপ ব্যবহার বা উগ্র আচরণ করে না। নম্র, ভদ্র, আর শান্ত স্বরে কথা বলে যার কারণ আদ্রিয়ান তার শিক্ষক হয়। ব্যক্তিগত ঘৃণা বা রাগের জন্য একজন শিক্ষকে সে অপমান করতে পারে না তাকে মেঘ অবশ্যই সম্মান করবে। কিন্তু শুধু সম্মান প্রেম, ভালোবাসা, মোহ নয় কারণ মেঘ তার আত্মাসম্মান বির্সজন দিবে না। আদ্রিয়ানের প্রতি তার অনুভূতি বা আবেগ মেঘ তার হৃদয়ে রাখবে, তার কখন বহিঃপ্রকাশ করবে না। হয়ত ধীরে ধীরে হৃদয়ে সমাধিতে তার ভালোবাসা দাফন করবে। কিন্তু ভিখারি বা বেহায়ার মতো অন্য কারোর ভালোবাসার কাঙাল সে হবে না। মেঘকে কারো ভালোবাসার প্রয়োজন নাই মেঘ একাই তার একার জন্য যথেষ্ট।
গাড়ি ছুটে চলছে আপন গতিতে। ব্যাক সিটে পাশাপাশি বসে আছে আদ্রিয়ান আর মেঘ। গাড়ির স্বচ্ছ কাচেঁর জানালা দিয়ে নিউইয়র্ক শহরের মানুষের জনজীবন দেখা যাচ্ছে। বড় বড় অট্রলিকা, আর ইমারত যা উচ্চতা প্রায় আকাশচুম্বী। শহরের রাস্তা ঘাটে কর্মব্যস্ত মানুষের উপচে পড়া ভীড় সকলের জামাকাপড়ে আধুনিকতার ছোঁয়া রয়েছে। নিউইয়র্ক সিটির বিলাবহুল জীবন আর অভিজাত্য প্রেমে পড়ে যাবে যেকোন মানুষ। মেঘ মুগ্ধ হয়ে নগরবাসী সহ শহরের বিভিন্ন অলিগলি দেখে যাচ্ছে।
__ মেঘের তাকিয়ে থাকার মধ্যে হঠাৎ করে গাড়ি রাস্তার মোড়ে থেমে যায়। মেঘ গাঢ় ঘুরিয়ে আদ্রিয়ানের দিকে তাকায় ড্রাইভার কোনো হঠাৎ করে গাড়ি বন্ধ করেছে তা জিজ্ঞেস করার জন্য। আদ্রিয়ান হয়ত মেঘের চোখের ভাষা বুঝে সে বলে —
“- মেঘ তুমি না লাইব্রেরি থেকে বই কিনবে? যাও কিনে নিয়ে আসো —-.
গাড়ি হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ মেঘ বুঝে। রাস্তার অন্য পাশে বিশাল বড়ো এক লাইব্রেরি অবস্থান করছে। মেঘ সিটে থাকা ব্যাগ হাতে নিয়ে দরজা খুলে গাড়ি থেকে নেমে যায়। আদ্রিয়ান গাড়িতে বসে থাকে। মেঘ রাস্তায় দাঁড়ায় ট্রাফিক লাইনে এখন লাল বাতি জ্বলছে।
বিশাল বড় বড় দুই রাস্তায় শতখানিক গাড়ি চলাচল করছে। মেঘ গাড়ি থেকে ভয়ে থমকে যায়। ছোটবেলা থেকে মেঘ রাস্তা আর গাড়ি দুইটা বিষয়ে ভীষণ ভয় পায়। মেঘের বয়স যখন বারো বছর তখন স্কুলে যাওয়ার পথে তার চোখে সামনে একজন মহিলার এক্সিডেন্ট হয়েছিল। যার পর থেকে মেঘ রাস্তা পার হতে ভয় পায়। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল পড়ার সময় তার বাড়ি থেকে কলেজের যাওয়ার রাস্তা খুব সংকীর্ণ ছিল। আর ময়মনসিংহ আর আমেরিকার রাস্তার মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে।
মেঘ কিছুক্ষণ সময় পর নিজের মনকে ধাতস্থ করে এরপর পা বাড়ায় রাস্তার দিকে। মেঘ যখন রাস্তায় বা দিবে তখন হঠাৎ ট্রাফিকে লাল বাতি জ্বলে উঠে, থেমে থাকা গাড়ি চলতে শুরু করে। মেঘ ভয় পেয়ে পা সরিয়ে দূরে নেয় এরপর গাড়ি থামা অবধি দাঁড়িয়ে থাকে।
আদ্রিয়ান গাড়ির জানালা দিয়ে এতোসময় ধরে মেঘের কাণ্ড দেখছিল। না এই মেয়েকে নিয়ে যে সে কি করবে? আদ্রিয়ান কিছুসময় পর গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায় এরপর এগিয়ে যায় রাস্তার কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা মেঘের কাছে। মেঘ যখন ট্রাফিক লাইটের দিকে তাকিয়ে ছিল, তখন আদ্রিয়ান তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। হঠাৎ করে আদ্রিয়ানকে দেখে মেঘ বলে ——
“- আদ্রিয়ান স্যার আপনি এখানে?
আদ্রিয়ান যানে এখন যদি মেঘকে বলে যে, সে মেঘকে সাহায্য করতে এসেছে। তবে নিশ্চয়ই জেদ দেখিয়ে তাকে মানা করবে দিবে, ভীতু হলে ও মেঘ যে ভীষণ জেদি তা সে যানে। আদ্রিয়ান মিথ্যা অযুহাত দিয়ে বলে
“- লাইব্রেরি থেকে আমার ও প্রয়োজনীয় কিছু বই কিনতে হবে।
“- ওহ আচ্ছা —-.
মেঘ আবার ও ট্রাফিক লাইটের দিকে তাকায়। আদ্রিয়ান তার পড়নের সাদা শার্টের কনুইয়ের কাছের দুইটা বোতাম খুলে দেয়, শার্টটা একটু এলেমেলো করে ছড়িয়ে দেয়। ট্রাফিক লাইটের রং যখন পরিবর্তন হয় তখন শব্দ করে উঠে সকল গাড়ি আবার পুনরায় থমকে যায়। মেঘ মনে সাহস নিয়ে রাস্তায় পা বাড়ায় তার সাথে আদ্রিয়ান ও ছিল তার পাশে। মেঘ আর আদ্রিয়ান যখন মাঝ রাস্তায় তখন একটা গাড়ি হর্ন দেয়। মেঘ মনে করে গাড়ি চলা শুরু করে দিয়েছে যার জন্য সে ভয় পেয়ে পাশে থাকা আদ্রিয়ানের শার্ট আঁকড়ে ধরে।
মেঘের শার্ট স্পর্শ করায় আদ্রিয়ানের মুখে মুচকি হাসি ফুটে উঠে তবে তা সে ঠোঁটে প্রকাশ করে না। মেঘ দ্রুত পায়ে হেঁটে আদ্রিয়ানের সাথে রাস্তা পার হয়। রাস্তার অপর প্রান্ত গিয়ে মেঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে কিন্তু যখনই অনুভব করে সে আদ্রিয়ানের শার্ট ধরে রেখেছে। তখন দ্রুত তার হাত সরিয়ে নেয়। আদ্রিয়ান মেঘের সব কাণ্ড উপলব্ধি করে তবে মুখে কোন শব্দ উচ্চারণ করে না। এরপর তারা দুইজনে লাইব্রেরির ভিতরে চলে যায় মেঘ তার প্রয়োজনীয় বই কিনে, আদ্রিয়ান তাকে কিছু পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করে। রাস্তা পার হওয়ার সময় ভীতু মেঘ পুনরায় আদ্রিয়ানের কনুইয়ে থাকা শার্ট শক্ত করে ধরে রাখে।
প্রায় তিরিশ মিনিট পর মেঘ আর আদ্রিয়ান মেডিক্যাল কলেজে এসে পৌঁছায়। মেঘ আর আদ্রিয়ান দুইজনে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায় এরপর কলেজের গেইট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। মেঘ তার ক্লাস রুমে চলে যায়, আর আদ্রিয়ান তার কেবিনে।
মেঘ ক্লাস রুমে প্রবেশ করার পর রুমের প্রায় শেষের সিটে নূহাকে বসে থাকতে দেখে। মেঘ এগিয়ে যায় নূহার দিকে নূহা হয়ত মেঘকে খেয়াল করে। নূহা বলে —-
“- মেঘ তুমি এসেছ? এখানে বসো —-.
মেঘ হাসি মুখে নূহার পাশের সিটে বসে যায়। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর নূহার সাথে প্রথম ক্লাসে তার দেখা হয়েছে। কিন্তু এরপর আবিহার বিয়ের জন্য নূহার সাথে যোগাযোগ করা হয়নি। আজ নূহাকে দেখে মেঘের বেশ আনন্দ অনুভব হচ্ছে তাছাড়া কলেজে বাঙালি বলতে নূহা ছাড়া হয়ত অন্য কেউ নয়। মেঘ আর নূহা একসাথে আড্ডা গল্প করতে থাকে।
প্রায় তিরিশ মিনিট পর মেঘ আর আদ্রিয়ান মেডিক্যাল কলেজে এসে পৌঁছায়। মেঘ আর আদ্রিয়ান দুইজনে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায় এরপর কলেজের গেইট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। মেঘ তার ক্লাস রুমে চলে যায়, আর আদ্রিয়ান তার কেবিনে।
মেঘ ক্লাস রুমে প্রবেশ করার পর রুমের প্রায় শেষের সিটে নূহাকে বসে থাকতে দেখে। মেঘ এগিয়ে যায় নূহার দিকে নূহা হয়ত মেঘকে খেয়াল করে। নূহা বলে —-
“- মেঘ তুমি এসেছ? এখানে বসো —-.
মেঘ হাসি মুখে নূহার পাশের সিটে বসে যায়। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর নূহার সাথে প্রথম ক্লাসে তার দেখা হয়েছে। কিন্তু এরপর আবিহার বিয়ের জন্য নূহার সাথে যোগাযোগ করা হয়নি। আজ নূহাকে দেখে মেঘের বেশ আনন্দ অনুভব হচ্ছে তাছাড়া কলেজে বাঙালি বলতে নূহা ছাড়া হয়ত অন্য কেউ নয়। মেঘ আর নূহা একসাথে আড্ডা গল্প করতে থাকে।
__ প্রায় তিরিশ মিনিট পর ক্লাস রুমে প্রবেশ করে আদ্রিয়ান রুমের সকল ছাএ ছাএী তাকে দেখে উঠে দাঁড়ায়। এরপর সকলে একসাথে বলে উঠে —
“- গুড মনিং স্যার —.
আদ্রিয়ান সকলকে হাতের ইশারায় বসতে বলে এরপর বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসে টেবিলের কাছে। হাতে থাকা বই ডেস্কের উপর রেখে সকল ছাএ ছাএীকে উদ্দেশ্য করে বলে ——
“- গুম মনিং স্টুডেন্ট। সকলে কেমন আছে তোমরা?
“- খুব ভালো স্যার —.
প্রথম সিটে বসা কিছু মেয়ে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে আহ্লাদি কণ্ঠে বলে উঠে —–
“- স্যার আপনি কেমন আছেন? আজ আপনাকে অনেক বেশি সুর্দশন লাগছে —-.
আদ্রিয়ান বলে উঠে —-
ধন্যবাদ তোমাদের প্রশংসার জন্য —-.
__ মেঘ আদ্রিয়ান আর প্রথম সারির মেয়েদের কথা শুনে, তবে সে কোনো প্রতিক্রয়া করল না, তার মুখের আদলে রাগ বা হিংসা কোন কিছুই প্রকাশ পেল না নিবির্কার ভঙ্গিতে বসে থাকল। কিন্তু নূহার মেয়েদের ন্যাকামি সয্য হলো না সে হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলে —
“- দেখ মেঘ, আদ্রিয়ান স্যার আসার পর থেকে ক্লাসের মেয়েরা তার সাথে ফ্লাট করা শুরু করে দিয়েছে। এই প্রথম সারির সব নির্লজ্জ। তবে আদ্রিয়ান স্যার কিন্তু ভীষণ সুদর্শন —-.
মেঘ হয়ত নূহার কথা শুনল কিন্তু কানে নিল না, পাশে থাকা ব্যাগ থেকে বই বের করে পড়ায় মনোযোগ দিয়ে। শান্ত কণ্ঠে বলল —-
“- দূর থেকে দেখলে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডকে ও সুন্দর লাগে, কিন্তু কাছে গেলে তার আগুনের উত্তাপে জ্বলে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। তাই দূর থেকে কোন মানুষকে দেখে বিচার করা উচিত নয় । রূপই সব নয়, রূপের মধ্যে ও খুঁত থাকে —–.
মেঘের বলা কঠিন কথার মানে হয়ত নূহার ছোট মাথায় ঢুকে না, হঠাৎ করে মেঘ এমন কবি সাহিত্যের মতো কথা কেনো বলছে? রুমে উপস্থিত সকলে বই বের করে,। আদ্রিয়ানের চোখ যায় মেঘের দিকে রুমে ঢুকার পর সে সর্বপ্রথম মেঘকে দেখেছে। চুপচাপ শান্ত হয়ে ক্লাসের শেষের সারিতে বসে আছে। আদ্রিয়ান মেঘের দিকে তাকায় কিন্তু মেঘ বইয়ে মুখ গুঁজে বসে আছে। যার ফলে আদ্রিয়ানের তাকিয়ে থাকা মেঘ দেখল না।
ক্লাস শুরু হয় আদ্রিয়ান বোর্ডে পড়া বোঝাতে শুরু করে। এরপর সকলে বলে বোর্ডে লেখা কথা খাতায় লিখতে। মেঘ খাতা বের করে বোর্ড থেকে পড়া তুলছে। সকল ছাএ ছাএী পড়া লিখছে কি না, তা চেক করতে আদ্রিয়ান শুরু থেকে শেষ সারি অবধি যায়। আদ্রিয়ান যখন মেঘের কাছে যায়, তখন মেঘের খাতায় লেখা শেষ।
তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২১
টেবিলের কোণায় কল রেখে মেঘ খাতায় লেখা তার লেখা দেখতে শুরু করে। কিন্তু হঠাৎ খাতার ধাক্কা লেগে তার কলম নিচে পড়ে যায়। মেঘ নিচুঁ হয়ে টেবিলের নিচ থেকে কলম উঠতে যায়, তখন আদ্রিয়ানের চোখ যায় টেবিলের কোণার দিকে। মেঘ যদি মাথা তুলে উঠতে যায় তখন সে বারি খেয়ে ব্যাথা পাবে। আদ্রিয়ান টেবিলের কোণায় হাত রাখে, মেঘ যখন মাথা উঁচু করে কলম তুলে তখন তার কোণায় আর বারি লাগে না। কারণ টেবিলের কোণায় আদ্রিয়ান হাত ধরে রেখেছিল।
