প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১
সাইদা মুন
মেহরীন বিয়ের জোড়া গায়ে দিয়ে দৌড়াচ্ছে। পেছনে ফেলে এসেছে গা ঘিনঘিনে লোকজন। সে পালাচ্ছে তার বিয়ের আসর থেকে। তবে কোনো প্রেমের খোঁজে না, নিজেকে বাঁচানোর জন্য। সবে মাত্র এসএসসি দিয়েছে বয়স ও তার ১৬ হয়েছে। আর এখনই তাকে ধরে বেঁধে ৪০ বছরের এক লোকের সাথে বিয়ে ঠিক করেছে। তার একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ আছে, সে এভাবে নিজের সব স্বপ্ন বিসর্জন দিতে পারে না। গ্রামের অন্ধকার মাঠ ধরে চাঁদের আলোয় পথ দেখে দৌড়াচ্ছে সে। সরু রাস্তা পেরিয়ে বড় রাস্তায় চলে আসে।
আশেপাশে তাকায় তবে কিছুই নেই, একদম ফাঁকা রাস্তা। সেই রাস্তা ধরেই আবার দৌড়াতে লাগে, গন্তব্য তার এদের হাত থেকে বাঁচার। তবে একা গিয়ে কোথায় কি করবে সেসব চিন্তা তার মাথায় আধো আসেনি। সামনে এগোতেই দেখতে পায় একটি মালবোঝাই ট্রাক রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো ড্রাইভার বিরতি নিয়েছে। চারিদিকে তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। সেই সুযোগে মেহরীন ট্রাকের পেছনের খালি জায়গায় উঠে পড়ে। মেহরীন জানে না এই ট্রাক কোথায় যাবে, তবে এইটুকু জানে – এই ট্রাক ফিরে আসবে না তার বিয়েবাড়ির সামনে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রাক চলতে থাকে তার আপন গতিতে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
হঠাৎ ধাক্কায় ঘুম ভাঙে মেহরীনের। ট্রাকটা থেমে গেছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখে কড়া রোদ হয়তো দুপুর এখন। দ্রুত ট্রাক থেকে নেমে যায় ড্রাইভার দেখার আগেই। নেমে চারিদিকে তাকাতেই সে কেবল গাছ আর ঘন ঝোপঝাড় দেখতে পায়, বুঝতে পারছে না সে কোথায় আছে । পায়ের জুতায় কাদা লেগে নোংরা, মুখে ধুলো। আশেপাশে কোনো জনবসতি নেই। সামনে একটি সরু রাস্তা গেছে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। সেই রাস্তা ধরেই হাঁটা ধরে। ক্ষুধা লেগেছে, ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ একটু পানির দরকার।
হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যায় একটি পুরোনো কাঠের ঘরের সামনে। বাইরে থেকে দেখতে লাগে কোনো ফেলনা ঘর। ভেতর থেকে টুকিটাকি আওয়াজ আসছে, মেহরীন ভাবে হয়তো মানুষ আছে তাই সে ডেকে উঠে,
-“বাড়িতে কেউ আছেন? শোনছেন কেউ কি আছেন বাড়িতে?”
মেহরীনের ডাক শোনতেই, ঘরের ভেতর থেকে এক যুবক বেড়িয়ে আসে। মেহরীনকে দেখে উপর থেকে নিচ অব্দি স্ক্যান করে নেয়। মেহরীনের কেন জানি ছেলেটির চাহনি সুবিধার লাগেনি, দেখতেও বখাটে টাইপের। তবুও পানির জন্য জান বের হয়ে যাচ্ছে। সে তাকে করুণার সুরে বলে,
-“ভাইয়া দয়া করে একটু পানি দিবেন।”
ছেলেটি কিছু একটা ভেবে বলে,
-“ভেতরে আসো পানি দিচ্ছি”
মেহরীন কিছু না ভেবেই ঘরের ভেতরে ঢুকে, চারিদিকে ভাঙাচোরা আসবাবপত্র ছড়িয়ে আছে। একটি চেয়ার এগিয়ে দিতেই মেহরীন সেটাতে বসে , একগ্লাস পানি দিয়ে ছেলেটি দরজার বাইরে যায়। সে পানি টুকু খেয়ে গ্লাসটি রেখে বের হতে নেয় তখনই ছেলেটির কিছু কথা কানে আসে,
-“ভাই একটা মাল পাইছি, দেইখা মনে হইতাছে বিয়ের আসরতে পালাই আইছে। একদম কচি মাল, আপনার লাইগা আটকাইছি।”
ওদিক থেকে লোকটি কিছু বলতেই ছেলেটি আবার বলে উঠে,
-“আইচ্ছা ভাই যাওয়ার কথা বললে বাইন্ধা রাখমু, কিন্তু টাকা বেশি দেওন লাগবো ভাই, আমি ছুঁই ও নাই।”
ছেলেটির কথা কানে আসতেই মেহরীনের দুনিয়া থমকে যায়৷ নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে আরও বড় বিপদে পড়ে গেলো না তো। শরীরে কাপুনি উঠে যায় তার ভয়ে। এ কোন বিপদে পড়লো। পরমুহূর্তেই মাথায় আসে, না এভাবে হেরে গেলে হবে না নিজেকে বাঁচাতে হবে। তখনই ছেলেটির পায়ের শব্দে নিজেকে স্বাভাবিক করে আগের জায়গায় বসে। কিভাবে বের হবে সেই বুদ্ধি আঁটছে মাথায়। ছেলেটি এসে মেহরীনের সামনে দাঁড়ায় একদম চুপচাপ কিছুই বলছে না শুধু বডিগার্ড এর মতো দাঁড়িয়ে।
মেহরীন হালকা হেসে বলে,
-“ভাইয়া অনেক ধন্যবাদ পানি খাওয়ানোর জন্য। যদি একটু কষ্ট করে আরেক গ্লাস পানি দিতেন, আসলে অনেক বেশিই পিপাসা পেয়েছে।”
তবে ছেলেটি একচুল ও নড়েনি সে উল্টো বলে,
-“ওই সামনের দরজা দিয়ে ঢুকলেই রান্নাঘর ওখানে পানি পেয়ে যাবে।”
মেহুর মুখটা চুপসে যায়, ছেলেটা কি তবে তার প্লান বুঝে গেছে। সে উঠে রান্নাঘরে যায়, কি করবে কি করবে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ চোখ যায় মরিচের প্যাকেটের দিকে। সাথে সাথে তার মুখে একটু আশার আলো ফুটে উঠে। সে এক গ্লাস পানি নিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। পানি খেতে খেতে ছেলেটিকে এটা ওটা প্রশ্ন করতেই থাকে, ছেলেটিও উত্তর দিচ্ছে। কথার একপর্যায়ে ছেলেটিকে অন্যমনস্ক হতে দেখে মেহরীন তার বাম হাতের মুঠো করা মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে মারে ছেলেটির চোখে। সাথে সাথে ছেলেটি চোখে হাত দিয়ে বসে পড়ে। আর মেহরীন যেন এই সুযোগের অপেক্ষাই করছিলো। সে সেই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায়। এদিকে ছেলেটি চিল্লিয়ে বলছে,
-“এই মেয়ে দাঁড়া! পালানোর দুঃসাহস দেখাস না এই জঙ্গলের যেই কোনায়ই থাকিস না কেন তোকে খুঁজে বের করতে সময় লাগবে না। দাঁড়া বলছি, একবার ধরতে পারলে একদম মেরে পুতে ফেলবো।”
এর মধ্যে কয়েকজন লোক আসে সেখানে। ছেলেটি তাদের উদ্দেশ্যে বলে “ভাই মেয়েটা পালাচ্ছে ধরেন।”
মেহরীন বুঝে গেছে যার কাছে তাকে বিক্রি করতে চেয়েছে। সেই লোকটিই চলে এসেছে সে প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে। আরও গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়ে, দু চোখ যেদিকে যাচ্ছে সেদিকেই দৌড়াচ্ছে। তার পেছনে সেই ছেলেগুলোও আসছে। মেহরীন দৌড়ে সামনে একটি ঝোপঝাড় দেখে সেখানে ঢুকে চুপটি করে বসে পড়ে নিজেকে আড়াল করতে। তার ভীষণ কান্না আসছে, মুখ চেপে ধরে নিজেকে চুপ করিয়ে রেখেছে। এদিকে ছেলেগুলো খুঁজতে খুঁজতে সেখানে এসে আশেপাশে তাকে না পেয়ে অন্যদিকে ছোটে। ছেলেগুলো চোখের আড়াল হতেই তারা যেই পথে গেছে তার উল্টো পথে দৌড়ায়। মেহরীন কোনো রাস্তা খুঁজে পায় কিনা সেই আশায় দৌড়াতে থাকে। এভাবে প্রায় ২/৩ ঘন্টা জঙ্গলের মধ্যেই দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত সে, সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ভয়ে আছে কখন জানি এদের হাতে পড়ে যায়। কোনোমতেই পা থামাচ্ছে না। আরও কিছুটা সামনে যেতেই তার চোখে মুখে খুশির ঝলক ফুটে উঠে। সামনেই একটা হাইওয়ে রোড দেখতে পায়।
এদিকে, জঙ্গলের পাশ দিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের হাইওয়ে হয়ে ছুটে চলছে একটি কালো রঙের জীপ। ড্রাইভ করছে তালহা, চোখ মুখ দেখে কোনো অনুভুতিই বোঝা যাচ্ছেনা। পেছনে বসে আছে তার তিন বন্ধু রিশাদ, তুর্য, সামি। ভয় আর প্রশ্নাত্মক চোখে তাকিয়ে তালহার কাজকর্ম দেখছে তুর্য একপর্যায়ে বলে,
-“ভাই পাশেই জঙ্গল আর কত দূর যাবি?”
পাশ থেকে সামি বলে উঠে,
-“আরে এটাই তো অ্যাডভেঞ্চার, একটু কৌতুহল একটু ভয় নিয়ে সামনে যাওয়া, আমার তো সেই মজা লাগছে।”
রিশাদ কিছুটা চিন্তিত হয়ে বলে
-“তবে এটা জঙ্গলের রাস্তা, কোনো ওয়াইল্ড এনিমেল যদি অ্যাটাক করে।”
তাদের কথার মাঝেই হঠাৎ হেডলাইটের আলোয় তালহা সামনের অনেকটা দূরেই রাস্তার পাশে একটি মেয়েকে দেখতে পায়, অনবরত হাত নাড়াচ্ছে তাদের দিকে। তা দেখে তালহা গম্ভীর সুরে বলে,
-“হেই ইডিয়েটস লুক এহেড, ওইটা একটা মেয়ে না?”
তালহার কথায় সবাই সামনে তাকাতেই দেখতে পায়, একটি মেয়ে লাল বিয়ের লেহেঙ্গা পরে আছে। মাথার ওড়না হাতে নিয়ে তাদের দিকেই ইশারা করছে। তা দেখে তুর্য সাথে সাথে “লা হাওলা কুয়াতা” পড়তে শুরু করে। তড়িৎ গতিতে তালহা কে সাবধান করে,
-“বন্ধু ভুলেও গাড়ি থামাবি না। আমি জানি এসব রাস্তা ঘাটে ভুত পেত্নি থাকে। বউ এর বেশ ধরে মানুষ আটকিয়ে মেরে ফেলে, এ..এটা ভুতত”
অন্যদিকে মেহরীন হাইওয়ে তে আসতেই এদিক সেদিক তাকিয়ে, কোনো গাড়ি যায় কিনা সেই আশায়। তখনই দূরে একটা গাড়ির হেডলাইটের আলো দেখতে পেয়েই সে তার দুপাট্টা টা হাতে নিয়ে বারবার হাত নাড়াচ্ছে গাড়ি থামানোর জন্য। আর আল্লাহ আল্লাহ করছে গাড়িটা যেন থেমে যায়। তবে গাড়িটা যতটা কাছে আসছে মনে হচ্ছে থামবে না তাই সে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে যায়।
এদিকে তালহা মেয়েটির কাছাকাছি আসতেই গাড়ি থামানোর আগেই মেয়েটি তাদের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে যেতে দেখে দ্রুত ব্রেক চেপে গাড়ি থামায়। মেহরীন চোখমুখ কেঁচে বন্ধ করে নেয়।
তুর্য বাদে বাকিরা নেমে আসে। তালহা কিছুটা কর্কশ গলায় বলে উঠে,
-“হেই স্টুপিড গার্ল, এভাবে কেউ গাড়ির সামনে আসে।”
কারো ধমকে মেহরীন দ্রুত চোখ খুলে সামনে তাকায় দেখে তিনজন ছেলে তার দিকে প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে। মেহরীন তাদের বলে উঠে,
-“প্লিজ হেল্প করুন আমায় ওরা চলে আসবে।”
তালহা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,”কারা?”
মেহরীন কিছু বলতে নেয় তখনই জঙ্গলের ভেতর থেকে লাইটের আলো আসছে কয়েকজনের হাঁটার শব্দও আসছে। তালহারাও সেদিকে ফিরে তাকায়। আর কিছু না বলেই ভয়ের চোটে মেহরীন তালহার হাত ধরে আকুতির সুরে বলে,
-“ভাইয়া প্লিজ আমাকে বাঁচান ওরা চলে এসেছে আমাকে হাতে পেলে মেরে ফেলবে।”
তালহা বুঝতে পারছে কোনো ডাকাত দলের কবলে পড়েছে হয়তো মেয়েটা। এখানে থাকা সেইফ না তারা নিজেরাও বিপদে পড়তে পারে। তাই তাড়াতাড়ি মেয়েটিসহ সবাই গাড়িতে উঠে পড়ে। গাড়ি স্টার্ট দিতেই, সেই লোকগুলোও জঙ্গল থেকে হাইওয়ে তে উঠে আসে মেহরীনকে গাড়িতে দেখেই একজন চিল্লিয়ে বলে উঠে,
-“ভাই মালটা ওই জীপ গাড়িতে ওগো লগে চলে গেলো”
সাথে সাথে সবগুলো হাক ছেড়ে ডাকে, গাড়ি থামাতে বলে। তবে তালহা ফুল স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে, দ্রুত এই পথ অতিক্রম করে। একটা লোকাল এরিয়াতে ঢুকে যায়। মেহরীনের এতক্ষণ জানে পানি ছিলোনা, যেই একটু মানুষের দেখা মিলে তার যেন নিশ্বাস ফিরে পায়। এদিকে তুর্যরা তাকে প্রশ্নের উপর প্রশ্ন করেই যাচ্ছে, সেও উত্তর দিতে দিতে হাঁপিয়ে গেছে। তালহা একসময় তাদের ধমকে থামিয়ে দেয়। একটি ছোট খাটো ভাতের হোটেলের সামনে এসে থামে। এলাকাটা তেমন উন্নত না, ভালো কোনো রেস্টুরেন্টের দেখা মেলেনি। মেহরীনকে সহ সেখানে যায় সবাই। মেয়েটিকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল সারাদিনে কিছু খায়নি, তাই এখানে আসা। খাবার আসতেই মেহরীন খিদের চোটে আর কিছু না বলেই চুপচাপ খেয়ে নেয়। হঠাৎ সামনের ব্যক্তির প্রশ্নে তার খাওয়া থামে। তাকিয়ে দেখে ড্রাইভিং সিটে বসা ছেলেটি…..
কালো হুডি পড়া, উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ে ফুটে উঠেছে যেনো । চুল ফ্ল্যাপি হালকা কোঁকড়ানো বাতাসে কিছুটা এলোমেলো হয়ে আছে। চোখের মনি গাঢ় খয়েরি। চোয়ালের গঠন স্পষ্ট, গালে হালকা দাড়ির রেখা। ঠোঁটে হালকা খয়েরি আভা, হয়তো নিকোটিনের ধোঁয়ার ফলে। হাবভাব যেন এক গম্ভীর স্ট্রং পুরুষ। দেখে ভদ্র ফ্যামিলির সন্তানই লাগছে।
আবারো তার কথায় হুশ ফিরে তার,
-“তা এখন যাবে কোথায়..?”
মেহরীনের টনক নড়ে, আসলেই তো এখন সে কোথায় যাবে। কিছু বলতে যাবে তখনই হুড়মুড় করে সেই হোটেল কয়েকজন মুরব্বি আর মহিলা প্রবেশ করে………
