Home তোমার নামে নীলচে তারা তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫২

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫২

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫২
নওরিন মুনতাহা হিয়া

ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বাহির হয় মেঘ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড় করতে থাকে। কাল গোসল করা হয়নি তার ‚ শীতের মধ্যে প্রায়ই বিকালে গোসল করে! কিন্তু কাল কলেজ থেকে বাড়ি ফিরতে বেশ দেরি হয়ে যায়‚ আর রাতে গোসল করলে সর্দি লাগার ধাঁচ রয়েছে তার। তাই সকালে উঠে মাথায় ঠান্ডা পানি দিয়েছে! আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভিজা চুল টাওয়াল দিয়ে মুছে নেয় মেঘ! বিছানায় শুয়ে বালিশে মাথা দিয়ে আরাম করে শুয়ে আছে আদ্রিয়ান। তার চোখ _ জুড়া বন্ধ হয়ত এতোখনে ঘুমিয়ে পড়েছে! আয়নার এক পাশে আদ্রিয়ানের ঘুমিয়ে থাকা মুখশ্রী স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মেঘ তা দেখে মিটমিট করে হাসে। এরপর পুনরায় তার টাওয়াল দিয়ে তার চুলের পানি জড়ায়নর চেষ্টা করতে থাকে।

আয়না থেকে বিছানার দূরত্ব খুব বেশি নয়। মেঘের ভেঁজা চুলের পানির বিন্দু বিন্দু কণা ছিঁটে যায়! আদ্রিয়ানের ঘুমন্ত মুখের উপর। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে চোখের উপর পানি পড়ায় বেশ বিরক্ত নিয়ে চোখ _ মুখ কুচঁকে তাকায় আদ্রিয়ান! সারা মুখে পানির ছোট ছোট ফোঁটা‚ যার উৎস খুঁজে বের করার উদ্দেশ্য আদ্রিয়ান চোখ খুলে তাকায়! তার ঘাড় ঘুরিয়ে সামনের দিকে তাকায়‚ তার দৃষ্টি যেন থমকে যায়! মুখ দিয়ে অস্পষ্ট স্বরে ভেসে উঠে
“অপরূপ সুন্দরী”

পুরুষালি কোন কণ্ঠ শুনে আঁতকে উঠে মেঘ। পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে। মাথা উঁচু করে হাতের উপর ভর দিয়ে মুগ্ধ হয়ে আদ্রিয়ান তার দিকে তাকিয়ে আছে! ওই আঁখি পল্লবের নেশাময় চাহনি বিমোহিত নয়ত সবই এখন বোঝার সক্ষমতা তার হয়েছে। দুই চোখ দিয়ে আদ্রিয়ান সারা শরীর পর্যবেক্ষণ করল মেঘের, ঠোঁট কামড়ে ধরে তীক্ষ দৃষ্টি রাখে! নিজ শরীরে আদ্রিয়ানের চোখের গভীরতা অনুভব করে দূর থেকেই মৃদু কেঁপে উঠে মেঘ! তার সমগ্র অস্তিত্বে জুড়ে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যায়। লজ্জায় তার গালে রক্তিম আভা ফুটে উঠল!
বিছানায় বসে আদ্রিয়ান সব দেখছে‚ তার মিটমিট করে হাসছে! মেঘের দ্বারা আর সম্ভব হল না ওই নেশাভরা দুই প্রজ্বলিত চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা। অস্বস্তি আর লজ্জায় সে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়‚ এরপর সামনের দিকে পুনরায় ঘুরে যায়! আদ্রিয়ান তার বউয়ের এমন লজ্জামিশ্রিত মুখ দেখে মৃদু হাসে। এরপর ঠোঁটে সয়তানি হাসি বজায় রেখে বেড ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়‚ বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে যায় আয়নার কাছে! আয়নার প্রতিবিম্বে আদ্রিয়ানের এগিয়ে আসা মেঘ স্পষ্ট দেখছিল। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে আদ্রিয়ান‚ এরপর মেঘের পিঠের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে আয়নায় ভেসে উঠা দুইজনের প্রতিবিম্বের দিকে তাকায়। উভয়র চোখ মিলিত হয়!

চুল থেকে ভেসে আসা এক মিষ্টি সুঘ্রাণে নাকে আসে আর্দ্রর। সে যেন এক ঘোরের মধ্যে চলে যায়! তার মনের মধ্যে থাকা সুপ্ত ভাসনার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়‚ বাহুদ্বয় ধরে শক্ত করে চেপে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে দেয় মেঘের শরীর! নরম মসৃণ মেঘের শরীর তার বুকের সাথে মিশে যাওয়ার সাথে সাথেই ‚ তার মধ্যে এক অদ্ভুত উন্মাদনার সৃষ্টি হয়। নিজ ইচ্ছা বা বাসনার উপর নিয়ন্ত্রণ হারায় আদ্রিয়ান! মেঘের পড়নে সাদা রঙের কামিজ ছিল‚ গলা বেশ ছোট কিন্তু পিঠের অংশে হাল্কা ফাঁকা। সুতির ফিতে দিয়ে নকশা করা। যার উপর দৃষ্টি যায় আদ্রিয়ানের!

উন্মুক্ত পিঠের উপর জমে থাকা বিন্দু বিন্দু পানির ফোঁটার দিকে তাকিয়ে শুকন ঢুক গিলে আদ্রিয়ান! এমন অবস্থায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা বড্ড দায় হয়ে যাচ্ছে তার। মেঘের এমন মোহনীয় রূপের মায়ার অতল গহীনে হারিয়ে যাচ্ছে সে! ভীষণ লোভ হচ্ছে একবার ছুঁয়ে দিতে মেঘকে! কিন্তু? কোন কিন্তু নয়। মেঘ তার স্ত্রী ‚ সম্পূর্ণ বৈধ তার জন্য! নিজ বিবাহিত স্ত্রীকে স্পর্শ করা অন্যায় বা পাপ নয়! তবুও একবার আদ্রিয়ান তাকায় আয়নার দিকে‚ মেঘের অবস্থা পরখ করার জন্য। ভয়‚ লজ্জায় আড়ষ্টে হয়ে চোখ _ মুখ খিঁচে বন্ধ করে রেখেছে মেঘ। আদ্রিয়ানের ঠোঁটের কোণে ম হাসি ফুটে উঠে! মনের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে খুব সাহস দেখিয়ে তার বাম হাত এগিয়ে ছুঁয়ে দেয় মেঘের বাহুদ্বয়।
জামার কাপড় শক্ত করে চেপে ধরে মেঘ। তার শরীর থরথর করে কেঁপে উঠে! জামার পিছনের ফাঁকা অংশে খোলা পিঠে জমে থাকা পানির বিন্দু ফোঁটার উপর বৃদ্ধ আঙ্গুল ছোঁয়ায় আদ্রিয়ান! এরপর মেঘের কোমড় পেঁচিয়ে ধরে শক্ত তাকে নিজ শরীরের বাঁধনে আবদ্ধ করে নেয়। কাঁধে কুঁকড়ো হয়ে থাকা মেঘের ভেজা চুল সরিয়ে দেয় এক হাতে‚ ফর্সা ধবধবে মসৃণ ত্বক ভেসে উঠে! সেখানে আঙুল ছোঁয়ায় আদ্রিয়ান‚ কিছুক্ষণ তার হাত কাঁধ থেকে পিঠ বারবার বিচরণ করায়। এরপর মাথা নিচুঁ করে মেঘের পিঠে ঠোঁট ছুঁয়িয়ে দিবে‚ তখন হঠাৎ সরে যায় মেঘ। হঠাৎ এমন কাণ্ডে আদ্রিয়ান থমকে যায়! মেঘ জড়তা ভরা কণ্ঠে কেঁপে কেঁপে বলে উঠে

“আদ্রিয়ান‚ আপনি ফ্রেশ হয়ে আসেন। আমি রান্নাঘরে গেলাম।”
মেঘ তার কথা বলা শেষ করার আগেই একপ্রকার দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়। হঠাৎ এমন কাণ্ডে আদ্রিয়ান থমকে যায়! কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ তার হুঁশ হয়। কিন্তু আদ্রিয়ান রাগ করে না মেঘের উপর। বরং সে শব্দ করে হেঁসে উঠে আর আনমনে বলে উঠে
“লাজুক মেঘবালিকা”
রান্নাঘরে কোমড়ে উড়না গুঁজে হাতে খুন্তি নিয়ে গৃহিণীর মতো রান্না করছে মেঘ। তার সম্পূর্ণ মনোযোগ এখন চুলায় বসান গরম বানিতে থাকা আধ _ সিদ্ধ ডিমের উপর! সকালের নাস্তায় পাউরুটি ‚ ডিম আর সাধারণ ফলমূল থাকবে! আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন কলেজ বন্ধ। দ্রুত রান্না শেষ করে ঘরের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে মেঘের! প্রায় পাঁচ মিনিট পর ডিম সিদ্ধ হয়ে যায়। চুলা থেকে কড়াই নামায় এরপর পাএে ঠান্ডা পানি দিয়ে সিদ্ধ ডিমের খোসা ছাড়ান শুরু করে মেঘ।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হয় আদ্রিয়ান। খুব জো খুদা লাগছে তার! রাতে খুব সাধারণ খাবার খেয়েছিল। গায়ে নীল রঙের গেঞ্জি আর তার সাথে পাতলা চাদর জড়িয়ে নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্য রুম থেকে বের হয় আদ্রিয়ান। সিঁড়ি দিয়ে বড় বড় পা ফেলে ড্রয়িং রুমের কাছে এগিয়ে যায় ! টেবিলের মাঝে ফলমূল সাজিয়ে রাখা হয়েছে। যা দেখে আদ্রিয়ান মুচকি হাসে এরপর রান্নাঘরে যায়। পিছন থেকে কোমড় পেঁচিয়ে ধরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মেঘকে‚ এরপর তার খোপা চুলে মুখ গুঁজে দেয়। হঠাৎ এমন জড়িয়ে ধরায় মেঘ এইবার ভয় হয় না বরং সে মৃদু হাসে! হাতে থাকা ডিমের খোসা ছাড়ান অবস্থায় সাধারণ কণ্ঠে বলে
“আদ্রিয়ান! আপনার কি খুদা লাগছে? টেবিলে গিয়ে বসুন আমি ডিম সিদ্ধ আর পাউরুটি নিয়ে আসছি।“
মেঘের কথা শুনে আদ্রিয়ান সরে যায়নি বরং শক্ত বাঁধনে জড়িয়ে ধরল! এরপর কানের কাছে ঠোঁট ঠেকিয়ে বাচ্চাসুলভ কণ্ঠে বলে উঠে
“বউ‚ খুব খুদা লাগছে। কিন্তু আমি এখুনি টেবিলে যেতে চাই না। আর একটু সময় তোমায় জড়িয়ে ধরে রাখতে চাই।”

____ বাচ্চাসুলভ কণ্ঠে আদ্রিয়ানের এমন আবদার শুনে ফিক করে হেঁসে উঠে মেঘ। ডিমের খোসা ছাড়ান শেষ দুই খণ্ড করে মাঝ বরাবর করে কেটে কাঁচের প্লেটে সাজিয়ে রাখে। এরপর ওভেনে পাউরুটি গরম করে।আদ্রিয়ান হাতের বাঁধন সামান্য আগলা করে! পাশের টেবিলে বসে পাউরুটি এক খণ্ড মুখে নিয়ে খেতে থাকে। হঠাৎ তার মাথায় এক দুষ্ট বুদ্ধির উদয় হয়। মুখে চিবন অধের্ক পাউরুটি মেঘের দিকে ইশারা করে বলে

“বউ‚ পাউরুটি খাও।”
মেঘ উপরে তাকিয়ে যখন হাত বাড়িয়ে আদ্রিয়ানের ঠোঁট থেকে পাউরুটি নিতে যাবে। তখন বাড়ন্ত হাত সরিয়ে বাধা দেয় আদ্রিয়ান‚ এরপর ঠোঁট দিয়ে ইশারা করে বলে
“ঠোঁট দিয়ে নাও”

‎ কড়া চোখে তাকায় মেঘ! ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠে আদ্রিয়ানের। বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে আদ্রিয়ান ‚ মেঘ মৃদু হেঁসে মাথা উঁচু করে এগিয়ে গিয়ে ঠোঁটে থাকা পাউরুটির উপর কামড় বসায়। উভয়ই দুই পাশ থেকে একটু একটু করে খেয়ে এগিয়ে আসে! পাউরুটির সামান্য অংশ যখন বাকি থাকে‚ তাদের দুইজনের ঠোঁট ছুঁয়ে যাওয়ার খুব কাছাকাছি সময় তখন হঠাৎ মেঘ দূরে সরে আসে আর বলে

“পাউরুটি খাওয়া শেষ।”
– দ্রুত আদ্রিয়ান মেঘের হাত ধরে তার কাছে নিয়ে আসে। এরপর কোন কথা উচ্চারণ করতে যাবে তার আগেই রান্নাঘরে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন নারী রাগী কটমট কণ্ঠে বলে উঠে
“আদ্রিয়ান‚ মেঘ? তোমরা কি করছ একসাথে?”
হঠাৎ কোন নারীর কর্কশ কণ্ঠ শুনে উভয়ই চমকে যায়। পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে রান্নাঘরে দরজায় দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে যায়! আদ্রিয়ানের চোখে _ মুখে ফুটে উঠে একরাশ বিরক্তি অস্পষ্টতা কণ্ঠে বলে উঠে
“জিয়া?”

রান্নাঘরের দরজায় হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁত কটমট করে দাঁড়িয়ে আছে জিয়া। রাগে শরীর তার তিরতির করে কাঁপছে! তীর্ক্ষ দৃষ্টি দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দুইজন ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণ করছে তার দুই চোখ। প্রথমে তার চোখ যায় ‚ তাদের একে অপরের হাতের দিকে। এরপর ঠোঁটে থাকা দুইজনের পাউরুটির গুঁড়ার উপর! হঠাৎ আকস্মিক জিয়াকে দেখে মেঘ নিজেও অবাক হয়ে যায়। জিয়ার সন্দেহ বোধক চাহনি নজর এড়ায় না আদ্রিয়ানের! তার চোখে মুখে ফুটে উঠা রাগ‚ ঘৃণা‚ আর খুন করে ফেলার মতো তীব্র স্পৃহা! দ্রুত আদ্রিয়ান তার হাতের বাঁধন থেকে মেঘের নরম হাত জোড়া মুক্ত করে দেয়! এরপর শান্ত হয়ে মুখে হাসি বজায় রেখে বলে
“জিয়া‚ তুমি এখানে? হঠাৎ এতো সকালে?”
মেঘের থেকে দুরত্ব বজায় রেখে সরে দাঁড়ায় আদ্রিয়ান। জিয়া রাগান্বিত শরীরে বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসে তাদের দুইজনের কাছে। এরপর সম্মুখে দাঁড়িয়ে সন্দিহান কণ্ঠে প্রশ্ন করে
“আদ্রিয়ান? তুমি আর মেঘ এতো কাছাকাছি কি করছ? মেঘের হাত কেন ধরেছ তুমি? উত্তর দাও?”

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫১

জিয়ার কণ্ঠ থাকা রাগ‚ বিদ্বেষ তার কণ্ঠে ফুটে উঠে! আদ্রিয়ান যথাসম্ভব শান্ত আর স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দেয়
“জিয়া‚ দেখ না মেঘে সকালের নাস্তায় পুড়ে যাওয়া পাউরুটি তৈরি করেছে। যা খেয়ে আমার মুখ প্রায় জ্বলে যাচ্ছে! এইজন্য আমি অন্য এক পাউরুটি নিয়ে মেঘের মুখে গুঁজে দিয়েছে। মেঘ নিষেধ করছিল তাই‚ জোর করে ওর হাত ধরে খায়িয়ে দিলাম।”

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৫৩