প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৯
সাইয়্যারা খান
নিরিবিলি রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে গাড়িটা থামে একটু নীরব রাস্তায়। আশেপাশে বাড়ীঘর কম। এদিকটায় অবশ্য মানুষের আনাগোনা কমই থাকে। পুরো এলাকা জুড়ে শুধু কারখানা৷ এখানকার বাতাসে কেমন লোহার মরিচা পড়া গন্ধ। শুদ্ধতার বালাই নেই এখানে। আশেপাশে থাকা দোকানগুলোর সাটার বন্ধ। এদিক ওদিক লোহার আর জাহাজের ভাঙা ভাঙা টুকরো পড়ে আছে। মাটির অবস্থাও খুব ভালো না৷ মাটি কম ম্যাটালই যেন বেশি। পাশেই বুড়িগঙ্গা। কালো পানি চাঁদের আলোয় টলটলে দেখাচ্ছে। তৌসিফ গায়ে চাদর নিলো। পৌষ জোর করে দিয়েছে। ফেব্রুয়ারী মাস, ঠান্ডা তেমন নেই কিন্তু নদীর পাড় বলে শীত ভালোই গায়ে লাগছে। তৌসিফ গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে, পাশাপাশি রনি এসে দাঁড়ায়। ঘাড় কাত করে তৌসিফ জিজ্ঞেস করে,
“সাটার খুলো।”
দু’জন এগিয়ে যায় সামনের দিকে। এই দিকের দোকান গুলো তৌসিফের কেনা। ঢাকার এই ডগে ওর কয়েকটা দোকান আছে। জাহাজের কাজ আগে এখান থেকেই বেশি হতো, এখন চট্টগ্রাম বন্দরে বেশি হয়। সরু গলির ভেতরে এসে রনি তিন নাম্বার সাটারটার নিচ থেকে তালা খুলে উপরে তুলতেই বিরক্তকর শব্দ এলো কানে। তৌসিফ সোজা পায়ে হেঁটে ভেতরে ঢুকে৷ পেছনে রনি।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে হলুদ একটা বাতি জ্বলছে তাতেই আবছা দেখা যাচ্ছে সবকিছু। চারপাশে জাহাজের বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন পার্টস। তৌসিফের পায়ের শব্দে অন্ধকার ঘরে থাকা কেউ একজন নড়েচড়ে বসলো। তাকালো উপর দিকে। একটা বে’তের চৌকির উপর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে ছিলো রাফিদ শিকদার। তাকে গত দুইদিন আগে এখানে আনা হয়েছে। কানাডার ভিসা হয় নি হঠাৎ করে। উমায়ের তাকে ঢাকার বাইরে পাঠিয়েছিলো। সেখান থেকেই সরাসরি তুলে আনা হয় ওকে। এনেছে থেকে তৌসিফের দেখা নেই। খাওয়া দাওয়ায় কোন কমতি নেই কিন্তু বিরক্ত লাগছে শুধু এই ক্যাটক্যাটে শব্দ আর নোংরা পরিবেশ। সামনের মানুষটা তৌসিফ বুঝতে পেরেই রাফিদ উঠে দাঁড়ায়। গত দুই দিন ধরে ওকে খাবার দিতে আসলেই বারবার তৌসিফের কথা জিজ্ঞেস করতো ও। রাফিদ অতো বোকা না যে বুঝবে না তৌসিফ আটক করেছে তাকে। এদিক থেকে উমায়ের কিছুটা বোকা ধরণের। সে ভেবেছে তৌসিফ তার ভাইকে ছেড়ে দিবে। নিতান্তই বোকামি তার। রাফিদ সটান হয়ে দাঁড়াতেই তৌসিফ ইশারায় বসতে বললো। নিজে বসলো একটা লোহার চেয়ারে। আশেপাশে আর কেউ নেই৷ রনি দাঁড়িয়ে এতটু দূরে। তৌসিফ সরাসরি প্রশ্ন করলো,
“শ্যুট করেছিলে কেন?”
রাফিদ থতমত খেলো না মোটেও৷ সরাসরি নিজে বললো,
“আমি কিন্তু মাথায় শ্যুটি করি নি৷ পিঠে করেছিলাম৷ আপনাকে মরার ইচ্ছে ছিলো না কিন্তু। শুধু পৌষকে পছন্দ করি তাই। আমি সরাসরি বলি আপনাকে, ভালোবাসি পৌষকে।”
তৌসিফ দেখলো ঐ চোখে শুধু পছন্দ না বরং ভিন্ন কিছু। সত্যিই হয়তো পছন্দ করে কিন্তু তাতে তার কি? রত্ন সবাই পছন্দ করে, কাছে চায় তাই বলে কি সবাই তা পায়? পৌষরাতটা তার। একান্তই তার। তৌসিফ মুখের ভঙ্গি পরিবর্তন করলো না৷ বললো,
“জেনেশুনে বলছো রাফিদ। আমার বউ পৌষরাত।”
“জানি। বউ তাতে কি? ছেড়ে দিন। তালাক দিয়ে দিন ওকে। আপনার সাথে মানায় না ওকে। আমার পাশে মানাবে।”
তৌসিফ সরল চোখে তাকিয়ে রইলো। বললো,
“না ছাড়লে?”
“আবার আপনাকে শ্যুট করব। হয় তালাক তকমা ওর গায়ে নিয়ে ওকে বিয়ে করব নাহয় বিধবা তকমা৷”
“ছোট তুমি। এই বয়সে র ক্ত গরম থাকে।”
“ছোট না আমি৷ র ক্ত গরম পুরুষই মেয়েরা চায়। আপনি ছেড়ে দিন পৌষকে।”
“কথা বুঝো রাফিদ।”
“বুঝব শুধু পৌষকে দিন।”
“স্বামীর কাছে তার স্ত্রী চাইছো। কতটা বোকা তুমি বুঝতে পারছো?”
“চাইছি ভালো মুখে। দিলে দিন নাহয় ছিনিয়ে নিব।”
“কি করবে?”
“পৌষকে বিয়ে করব। সংসার করব। আমার করব ওকে। ওর সাথে আমার বাচ্চা…. ”
লোহার চেয়ারটা উল্টে পড়লো। তৌসিফ হুট করেই ঠেলে উঠে রাফিদের গলা চেপে ধরেছে। এতটাই শক্ত হাতে যে রাফিদের মতো জোয়ানের চোখ উল্টে আসছে। হাত দিয়ে প্রতিহত করতে চাইছে কিন্তু পারছে না। রনি দুই পা এগিয়ে এলো কিন্তু সাহস করে কাছে গেলো না। আজ রাফিদ এখানে মারা গেলেও রনি খুব একটা অবাক হবে না। ছেলেটার সাহস কত? একেতো দোষ করেছে। খু ন করতে চেয়েছে এখন উল্টো ঠেলা ঠেলছে। তৌসিফ হুট করে ছেড়ে দিলো ওকে। ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বললো,
“ওর নাম মুখে নেবে না। ঐ মুখ তাহলে ভেঙে দিব৷ বউ আমার, চোখ তুলে তাকালো চোখ তুলে নিব।”
কথাটা বলেই তৌসিফ উল্টো ঘুরে হাঁটা দিলো। মাথা রাগে ঝিমঝিম করছে। পা হঠাৎ থেমে গেলো রাফিদের কণ্ঠে,
“পৌষ আমাকেই বিয়ে করবে৷ ওকে নিয়ে কানাডা মামার কাছে চলে যাব।”
পায়ের কাছে থাকা ভাঙা একটা ইস্পাতের চওড়া টুকরো তুলে নিলো তৌসিফ। পেছনে ফিরে হিংস্রতা নিয়ে রাফিদের মুখের একদম কাছে এনেও থেমে গেলো৷ চোখের পর্দায় উপস্থিত পৌষ। তৌসিফের পৌষরাত, যে আসার আগেও বেশ চিন্তিত মুখে ছিলো। তৌসিফকে বলেছিলো যাতে তৌসিফ কোন ঝামেলায় না জড়ায়। শুধু মাত্র পৌষের মুখ কল্পনা করে তৌসিফ থেমে গেলো৷ টুকরোটা রাফিদের গলায় রেখে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“জানে ছেড়ে দিলাম রাফিদ। সাদকা দিলাম তোমাকে এটা। একই ভুল দ্বিতীয়বার যদি করেছো তাহলে আমার থেকে খারাপ রূপ ইহকালে কারো দেখবে না।”
হাতের টুকরো ছুঁড়ে ফেললো পাশে। রাফিদ কিছু বলতে চাইলো। গলা জ্বলে উঠছে ওর। কেটেছে বোধহয়। তৌসিফ পরপরই বললো,
“কানাডা তোমার মামার কাছেই পাঠিয়ে দিচ্ছি তোমাকে। ফিরে আসার সাহস দেখিও না৷ আমি তৌসিফ তালুকদার ততটাও ভালো কেউ নই।”
এক মূহুর্ত দেড়ী না করে তৌসিফ বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। আগামী সাতদিন রাফিদ এখানে থাকবে। গত দুই দিন ভালো খাওয়া দাওয়া পেয়েছে যা আজ থেকে বন্ধ থাকবে। চরম শাস্তি ওকে দিবে তৌসিফ। তাকে আঘাতের জন্য না তার পৌষের দিকে চোখ তুলার অপরাধে। জেলের চাইতে কয়েকগুণ ভয়ংকর অভিজ্ঞতা করাবে ওকে তৌসিফ। নিজ হাতে সাটার টেনে তালাবদ্ধ করলো তৌসিফ। চাবিটা পকেটে রেখে গাড়ির দিকে গেলো৷ চারপাশে এখনও অন্ধকার। মানুষজন নেই এখানে। তৌসিফ গিয়ে দাঁড়ালো নদীর পাড়ে। এদিকের পানিটা কুচকুচে কালো। একদমই নোংরা। পাঁচ মিনিট সেখানে দাঁড়িয়ে রইলো তৌসিফ। ভাবলো কি করতে এসে কি করলো। এসেছিলো রাফিদকে জীবিত দশায় মৃত্যুস্বাদ অনুভব করাতে কিন্তু পৌষের জন্য পারলো না৷ মেয়েটার মুখ ভেবেই তৌসিফ কিছু করে নি ওকে। রনি আসতেই তৌসিফ গিয়ে গাড়িতে বসলো৷ মূহুর্তেই গাড়িটি হারিয়ে গেলো অন্ধকারে।
পিহার কান্না থেমেছে সেই কখন। ওখান থেকে ভিডিও কলে পৌষের সাথে কথাও হয়েছে। শ্রেয়াকে দেখেই হাসিমুখে পৌষ জানতে চেয়েছে,
“সোনামণি মনে আসছে?”
“এই মাসেই আসবে,ডাক্তার বললো।”
“তুমি কিছু খাবে? আমি বানিয়ে পাঠাব।”
“কি খাব তা তো জানি না৷ তোমার পাকবাহিনী তো যত্নে কমতি রাখছে না।”
“আমি থাকলে তোমাকে বিছানা থেকে নামতেই দিতাম না। ইশ, টাইমিং খারাপ কতো, দেখলে?”
শ্রেয়া হাসে ওর কথায়। বলে,
“তোমার ভাই কিন্তু পা গল হয়ে গিয়েছে পৌষ। এখনও একা একা কথা বলছে বাবুর সাথে।”
“হোক পা গল। তুমি পা গলের কথায় কান দিও না। বলো, আচার বানিয়ে পাঠাব? এদিকে ছাদে অনেক রোদ উঠে।”
“তুমি সেমাই বানিয়ে দিও তো পৌষ। আমার মিষ্টি খেতে মন চাইছে।”
“তুমি আগে বলবে না আমাকে? কাল সকালের নাস্তায় খাবে তুমি সেমাই।”
এবারে ওপাশ থেকে হেমন্তের কণ্ঠ শোনা গেলো। রীতিমতো শাসানি দিলোও,
“চটকানা খাবি তুই? চুপচাপ ঘুমা৷ ধীরেসুস্থে পরে বানিয়ে দিস।”
হেমন্ত জানে বলে লাভ নেই তবুও বললো। ফোন রেখেছে থেকে সেমাই বানাচ্ছে। মোটা করে বানিয়ে ঘিয়ে ভাঁজছে। সারা বাড়ী বোধহয় ঘ্রাণে ম-ম করছে। এসব করে কাগজে মুড়িয়ে রেখেছে পৌষ। তৌসিফ আসে নি এখনও। রাত সাড়ে তিনটা বাজে। সকালে ও বাড়ী পাঠাবে সেমাই। ধীরে ধীরে বিছানায় এগিয়ে যায় পৌষ। নিজের পাশে শুতে যেতেই মাথাটা চক্কর কাটে। ব্যাথার স্থানে চেপে ধরে পৌষ শুয়ে পড়লো৷ ক্ষুধা লাগলেও খেলো না। চোখ বন্ধ রাখলো কিছুক্ষণ। কেমন ছটফট লাগছে। তৌসিফটাও আসছে না। আজ পলকের সাথে দেখা হয়েছিলো। দেখে কি ফুরফুরে লাগছিলো। এসব ভাবতে ভাবতে চোখ দুটোয় ঘুম নামলো। ঘুমের ঘোরেও পৌষ তৌসিফকে নিয়েই ভাবলো আজ।
তৌসিফ বাসায় ঢুকেছে চারটার কিছুক্ষণ আগে। শরীরে লোহালক্কড়ের গন্ধ। গরম পানিতে শাওয়ার নিয়ে আগে ফ্রেশ হলো। এসেছে থেকে বাসায় ঘিয়ের ঘ্রাণ পাচ্ছে। তার বউ নিশ্চিত মজাদার কিছু রান্না করেছিলো। রান্নাঘর খুঁজে অবশ্য হতাশই সে। এখন খাওয়ারও তেমন ইচ্ছে নেই। চুপচাপ এগিয়ে গেলো বউয়ের নিকট। কপালে থাকা পৌষের হাত সরিয়ে নিয়ে সেখানে হাত বুলালো। কাটা দাগটা যাচ্ছে না। বিষয়টা খুব চিন্তায় ফেলছে তৌসিফকে। তার মন চাইছিলো রাফিদকে জীবিত পুঁতে দিতে। পৌষকে নিজের কাছে নিতেই মেয়েটার ঘুম ভাঙলো। দুই হাতে তৌসিফের পিঠ জড়িয়ে ধরেই বললো,
“খাবেন না?”
“তুমি খেয়েছো?”
“না।”
“আমার কথার খুব অবাধ্যতা করো তুমি।”
“মাথা চক্কর দিচ্ছিলো খুব। গলা শুকিয়ে আসছিলো।”
“এতো ঘ্রাণ কেন বাসায়?”
“সেমাই বানিয়েছি। কাল ভাবীকে পাঠাব। শুনুন না, খাটি দুধ এনে দিবেন সকালে। ও বাড়ী পাঠাব। এ মাসেই বাবু আসবে।”
“আনব।”
তৌসিফ নিদারুণ ভাবে খেয়াল করলো পৌষ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে ওকে। আচ্ছা, বউ গুলো কি পৌষের মতোই হয়? কিভাবে বুঝলো তৌসিফ মারামারি করতে গিয়েছিলো? কি সুন্দর আড়ালে আড়ালে দেখছে। হাত উল্টেপাল্টে দেখছে। এই পৌষটা চমৎকার। সত্যিই চমৎকার। তৌসিফ ওর কপালে আঙুল বুলাতে বুলাতে বললো,
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৮
“আমরা আপার কাছে যাচ্ছি।”
“কেন?”
“হানিমুন করতে।”
“আপাকে আসতে বলুন। আমি যাব না।”
“কেন হানি?”
“ভালো লাগে না৷ আর…”
বলতে গিয়ে থেমে গেলো পৌষ। তৌসিফ তাকিয়ে রইলো ওর চোখের পানে। জ্বলজ্বল করছে সেখানে।
