Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৮

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৮

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৮
সাইয়্যারা খান

“আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”
“একটু কাজ আছে।”
“কিসের কাজ? আপনি এই অবস্থায় যাবেন? আমি যেতে দিব না।”
তৌসিফ গায়ে কোর্ট জড়ালো। এগিয়ে এসে বসলো পৌষের পাশে। কপালের কাটা স্থানে চুমু খেয়ে বললো,
“চলে আসব। তুমি ঘুমাও। উঠে দেখবে আমি চলে এসেছি।”
“ঘুমাব না৷ আমিও চলি তাহলে সাথে।”

বলতে বলতে উঠে পৌষ। তৌসিফ ওর চোখে তাকালো। একরাশ ভয় আর চিন্তা সেখানে। এমন চোখ তৌসিফ চিনে। খুব ভালো মতো চিনে। এককালে মায়ের চোখে এমন চিন্তা দেখতো ও। তাদের ভাইদের নিয়ে আম্মু খুব চিন্তা করতো। রাজনীতিতে পা রাখার পর থেকে সেই চিন্তা শুধু বাড়তেই লাগলো৷ কোনদিন আর কমার নাম নেয় নি। তৌসিফ পৌষের দুই গাল আগলে নিলো। বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে বুলাতে বুলাতে বললো,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“এমন করে না হানি।”
“আমি করি।”
“বুঝার চেষ্টা করো। খুব জরুরি কাজ।”
“আগে নিজের স্বাস্থ্য।”
“আ’ম ফিট! লুক এট মি।”
“আপনি আমার কথা শুনবেন না?”
তৌসিফ চাইলো ওর কথা শুনতে কিন্তু অপারগতা তাকে জেঁকে ধরেছে। চাইলেও মানতে পারলো না ও। পৌষের হাত ধরে বিছানায় শুয়িয়ে দিয়ে বললো,
“চোখ বন্ধ করো। আমি আছি।”

পৌষ চোখ বন্ধ করে না। এই লোক এক নাম্বারের ধান্দাবাজ। দেখা যাবে বউকে ঘুম পাড়িয়ে সে পালিয়েছে। পৌষ এটা হতে দিবে না৷ গু লি খেয়ে ব্যাটার স্ট্যামিনা কমার বদলে বেড়ে গিয়েছে। তৌসিফ আদুরে হাত বুলাচ্ছে ওর মাথায়। খুব ভালো করেই জানা আছে পৌষ যে এখন ঘুমাবে না তবুও চেষ্টা করে গেলো৷ এমনিতে কাছে পাওয়া দুষ্কর অথচ আজ একদম এক হাতে তৌসিফের কোমড় জড়িয়ে শুয়েছে। বউয়ের চালাকি দেখে তৌসিফ মৃদু হাসলো। তার চিকন ঠোঁট দুটো কাঁপলো সামান্য। অল্প ঝুঁকে পৌষের কপালে চুমু দিয়ে আস্তে করে হাত ছাড়ালো। রুমের বাতি বন্ধ করে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। তৌসিফ নামতে নামতে ফোন লাগালো টনিকে। ওপাশে রিসিভ হতেই তৌসিফ বললো,

“আমি রনিকে নিয়ে বের হচ্ছি। এদিকটা সামলাবে৷ বাড়ীতে অনুমতি ব্যতীত কেউ যাতে ঢুকতে না পারে। মনে থাকবে?”
“জি, বস।”
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তুরাগের সাথে দেখা হলো ওর। তুরাগ দাঁড়িয়ে ছিলো ওর জন্যই। তৌসিফকে দেখেই বললো,
“কয়দিন পরেই তো…”
ওকে শেষ করতে দিলো না তৌসিফ। বলে উঠলো,

“আমি পারলে সেদিন ওর জানাজা পড়াতাম বড় ভাই। কয়েকদিন পর বলে কোন কথা নেই।”
তুরাগ এতটুকু জানে কথা বাড়িতে লাভ নেই। তবুও সাবধানে থাকতে বললো। তৌসিফকে দিতে নিচ পর্যন্ত এলো। গাড়ি গ্যারেজ থেকে বের করে গেটের সামনে রেখেছে রনি৷ টনি সাথেই দাঁড়িয়ে। তুরাগ আলতো হাতে একবার জড়িয়ে ধরে ওকে। ভাই গুলো তার আদরের অথচ আজ সবাই কতটা দূরে। তুরাগ আর দাঁড়ালো না। গটগট পায়ে সেখান থেকে চলে গেলো। গাড়ির ডোর লাগাতে নিলেই আচমকা ঝড়ের বেগে সেখানে ঢুকে বসে পৌষ৷ তৌসিফ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে৷ কি হলো, কোথা থেকে এলো তার বউ? পৌষ এসেই ধুপ করে শব্দ করে ডোর লক করলো। তৌসিফের গায়ের সাথে সেটে বসে বললো,

“চলুন। আমিও যাব।”
রনি সামনের সিটে বসতে নিচ্ছিলো তখন ড্রাইভারের সাথে কিন্তু পারলো না। ড্রাইভারকেও বসতে দিলো না আপাতত। তাদের বসের প্রাইভেসি দরকার এখন নিশ্চিত। তৌসিফকে অবাক করে দিয়ে পৌষ হাতে থাকা ব্যাগটা পেছনের দিকে রেখে বললো,
“বাসার খাবার নিয়ে নিয়েছি সাথে। বাইরের খেতে হবে না। বলুন, ভালো করি নি?”
নিজেকে ধাতস্থ করলো তৌসিফ। এই মেয়েটা কেমন কেন? এত দায়িত্বশীল কেন হতে হলো তাকে? এমন ভাবে যত্ন নিতে নেই। একদম না। তৌসিফকে এভাবে তার আম্মু বাদে কেউ আদর করে নি৷ এখন কি করবে তৌসিফ? বউয়ের আঁচল ধরে কাঁদবে? চাইলেও তো তা করা যাচ্ছে না। পৌষের পরণে থাকা ওরনাটা একটু টেনে নিলো তৌসিফ। নিজের মুখে লাগিয়ে শুঁকে নিলো কিছুটা ঘ্রাণ। কোন প্রেমিকার ঘ্রাণ নেই এখানে, আছে শুধু নারী নারী এক ঘ্রাণ। বউ বউ ঘ্রাণ এই আঁচলে। মাঝেমধ্যে তেল মসলার ঘ্রাণ পায় তৌসিফ। অবলীলায় সেই ওরনা শুঁকে নেয়। ভালো লাগে, মনে হয় আম্মুর আঁচল।

“আপনি কাঁদছেন?”
তৌসিফের বড় বড় আঙুলের ফাঁকে নিজের চিকন আঙুল গুলো ঢুকিয়ে প্রশ্নটা করলো পৌষ। তৌসিফ মুখ থেকে ওরনা সরালো। নরম দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। পৌষ হাসলো। এই মেয়ে এভাবেই হাসে, একদম মরণঘাতী হাসি৷ তৌসিফ মরতেও চায় অবশ্য, তার ভালো লাগে বউয়ের হাসিতে মরে যেতে। পৌষ আরেকটু কাছাকাছি এলো। হাসিমুখেই বললো,
“চিন্তা নেই। আমি আছি না।”
বলেই মাথাটা বের করে রনিকে ডেকে বললো,
“ড্রাইভার কোথায় ভাইয়া?”
রনি উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিলো। পৌষের কণ্ঠে তাকালো। তৌসিফ ইতিমধ্যে বউকে টেনে কাছে নিয়েছে। কপালে অবহেলায় পড়ে থাকা নতুন বেবি হেয়ার গুলো গুছিয়ে ঠিক করতে করতে বললো,

“ঘুমে না রেখে এলাম?”
“আমি ঘুমাই নি।”
“কেন তোতা? কেন ঘুমাও নি? মাথা ব্যথা না?”
“নেই।”
“চোখে দেখতে পাচ্ছি।”
“মাথা ব্যথা চোখে দেখা যায়?”
“যায়।”
“আমি যাব সাথে। ঝামেলা করব না। গাড়িতেই থাকব৷ একা যদি কিছু হয়?”
তৌসিফ বুক ফুলিয়ে শ্বাস টানলো। হাতঘড়িতে সময় দেখলো। পৌষকে আচমকা টেনে বুকে জড়িয়ে ধরলো শক্তকরে। পৌষ সতর্ক করলো,

“আস্তে, পিঠে টান লাগবে।”
“লাগুক।”
“এ্যাঁহ্। বললেই হলো। আমার জামাই ব্যথা পাবে না?”
“পৌষরাত?”
“হুঁ।”
“এত আদর কেন করো তোতাপাখি? কোথায় রাখব আমি এই আদর, আহ্লাদ? আমাকে কে করে এভাবে আহ্লাদ? তুমি আর কত ভালোবাসবে আমাকে? মরে যাব তো।”
“নিয়ে চলুন না।”
“আজ কথা শুনো। ফিরে আসি, আমরা আপার কাছে যাব। হানিমুন বাকি তো।”

“বাসি কাজে আমি নেই।”
“অনুভূতি নতুন পাবে।”
“লাগবে না।”
“ফিরিয়ে দিচ্ছো?”
বুক থেকে একটু সরে পৌষ। তৌসিফের দুই গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে,
“একদমই সাথে নেয়া সম্ভব না?”
তৌসিফ মাথা নাড়লো৷ পৌষ ওর হাত দুটো তৌসিফের বুকে রাখলো। খুব নরম হয়ে বললো,
“আমি জানি না কি এবং ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ আপনার কাজ কিন্তু আমার মন টানছে না যেতে দিতে। আমার জন্য হলেও সুস্থ ভাবে ফিরে আসুন। কোন ঝামেলায় জড়াবেন না। আপনার পৌষরাত অপেক্ষায় রইলো। ঘুম আসবে না আজ রাতে। সকালের নাস্তা একসাথে করব আমরা।”
হাত দুটো সরিয়ে নেমে গেলো পৌষ। দাঁড়িয়ে রইলো ঠাই। ড্রাইভার আর রনি উঠে বসতেই তৌসিফ হাত নেড়ে বিদায় জানালো। পৌষ হাসলো৷ নিজেও হাত নেড়ে বিদায় দিলো।

“ভাবী, আসব?”
চৈত্রর কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। গায়ে ওরনা নেই। শ্রেয়া এদিক ওদিক হাতড়েও পেলো না। পেট নিয়ে নড়াচড়াও জ্বালা। একটু পর আবার শোনা গেলো,
“ভাবী, একটু পরে আসব?”
“কে চৈত্র? আসছি আমি। দাঁড়াও একটু।”
শ্রেয়া উঠে দাঁড়ালো। আলমারি খুলে নতুন ওরনা গায়ে জড়িয়ে দরজা খুলতেই দেখলো চৈত্র দাঁড়িয়ে। হাতে বাটি। শ্রেয়াকে দেখেই আগেই সালাম দিলো। ভেতরে ঢুকে বাটিটা সাইড টেবিলে রেখে বললো,

“বরই ভর্তা এনেছি ভাবী। গাছ থেকে পাড়লাম একটু আগে।”
“আরেহ্, আমার তো খেতে মন চাইছিলো ভীষণ।”
“লাল মরিচের গুঁড়ো দিয়েছি ভাবী কিন্তু অল্প। আপা বললো কম দিতে।”
শ্রেয়া বিছানায় বসে বাটি হাতে তুললো। পেছনে জৈষ্ঠ্য বোল হাতে নিয়ে ঢুকছে। শ্রেয়া কপাল কুঁচকে তাকালো। বললো,

“ওমা, এটায় কি করবে? এত বরই?”
“না না ভাবী। পানি এনেছি। গরম পানি।”
বলেই বোলটা রাখলো মেঝেতে। হেমন্ত ঢুকলো পেছনে। শ্রেয়ার পা দুটো কেমন ফুলে উঠছে দুই দিন ধরে। একটু গরমপানিতে সেঁক দিতে বললো ডাক্তার। তখনই দৌড়ে ঢুকলো সেখানে পিহা৷ বোলের সাথে উস্টা খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লো। হতভম্ব হয়ে গেলো সকলে। পেছন থেকে ইনি, মিনি একসাথে বলে উঠলো,

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৭

“আপা বলই থেতে না কলেথে। বাবীর তান্ডা লাগবে।”
এদিকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে পিহা৷ ফোনের ওপাশে স্পষ্ট শুনলো পৌষ। বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো সহসা। বোনটার কি হলো?

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৯