প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৭
সাইয়্যারা খান
যত্ন করে পিঠের কাছটার ব্যান্ডেজে হাত বুলাচ্ছে পৌষ। যতবার দেখে ততবারই ভেতরটা কেমন কেঁপে ওঠে। চোখ ঝাপসা লাগে তখন। তৌসিফের পিঠ ব্যথা হচ্ছিলো সামান্য, পৌষ তাই আলতো হাতে কোমড় থেকে যতটুকু পারছে চেপে দিচ্ছে। তৌসিফ ফোনে কথা বলছে কারো সাথে। কথার মাঝেই খেয়াল করলো চিকনচাকন দুটো হাত পেছন থেকে ওর উন্মুক্ত বুকে আসছে। কাঁধে ভেজা ওষ্ঠের ছোঁয়া পেলো সহসা। পরেরই মুখ ডুবিয়ে দিলো সেখানে। তৌসিফের পুরুষকায়া সামান্য কাঁপলো তখন। বউটা তার মরণঘাতী। একদম হুটহাট মে রে দেয় তৌসিফকে। পেঁচিয়ে ধরা হাতটার উপর নিজের হাত রাখলো তৌসিফ। কথাবার্তা শেষ করে ফোনটা রেখে বেশ নরম কণ্ঠে ডেকে উঠলো,
“হানি?”
“হুঁম।”
“আর ইউ লস্ট?”
“উঁহু।”
“মনে হচ্ছে।”
“ভুল মনে হচ্ছে।”
“তুমি আমার মুখস্থ, ঠোঁটস্থ, কণ্ঠস্থ করা এক বই পৌষরাত যাকে আমি তিমিরে পড়তে পারি। ঘুমের ঘোরে আওড়াতে পারি।”
পৌষ ক্ষুদ্র শ্বাস ফেললো। উষ্ণ বাতাস ধাক্কা খেলো তৌসিফের উদাম বুকে। নরম স্বরে পৌষ বললো,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“আপনাকে এভাবে দেখে আমার ভালো লাগছে না।”
“আমি তোমার কাছাকাছি থাকছি বলে এত কষ্ট পাচ্ছো?”
“ধ্যাত, ফাইজলামি করছি না।”
“আমিও না।”
“আপনি তো সুস্থ ছিলেন, কত সুন্দর ছিলো সবকিছু। হঠাৎ করে কি হয়ে গেলো। আমার জন্য.. ”
ওকে বাক্য সম্পূর্ণ করতে দিলো না তৌসিফ। হাত পেছনে দিয়ে পিঠ ধরে নিজের কাছে টানতে লাগলো। বাধ্য হয়ে পৌষই সামনে এলো। মুখোমুখি বিছানায় বসা তখন দু’জন। তৌসিফ পৌষের থুতনি ছুঁয়ে দিলো। বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে ঠোঁট ছুঁয়ে বললো,
“সেদিনটা আমার খুব কাঙ্খিত বুঝলে পৌষরাত। সেদিনের চিহ্ন আমি আজীবন আমার দেহে বয়ে বেড়াব। সেদিন তুমি আমাকে ভালোবাসার কথা জানিয়েছো। আমি ভিখারি হয়ে হাত বাড়িয়ে ছিলাম। তুমি সেদিন দান করেছে। এই দানের ক্ষুধা ছিলো আমার পৌষরাত, তুমি তা মিটিয়ে দিয়েছো। আমি কৃতজ্ঞ তোমার নিকট।”
দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলো পৌষ। তৌসিফ আঙুল দিয়ে ছাড়িয়ে ইশারায় নিষেধ করলো। হাত বাড়িয়ে কপালের কাটা দাগ ছুঁয়ে দিলো। পৌষ তৌসিফের সুবিধা করতে নিজেই এগিয়ে এলো কিছুটা। তৌসিফ সুযোগ পেলো। কাটা স্থানে চুমু খেলো পরপরই চিরায়ত ভাবে থুতনিতে চুমু খেয়ে বললো,
“বুকে আসবে?”
“আসব।”
খোলা বুকটায় ঠাই পেলো পৌষ। লোমশ বুকটায় নিজের বুক গুঁজে দিলো দ্রুত। কাঁপলো সামান্য। বুকে ভেজা অনুভব হতেই তৌসিফ জড়িয়ে ধরলো আরো কিছুটা। পৌষ ফিসফিস করে বারবার বলতে লাগলো,
“আমি স্যরি, খুব স্যরি।”
ঘড়ির কাটা তখন নয়টার দিকে আটকে। সেকেন্ডে পেড়িয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত। পৌষের শরীর কিছুটা ম্যাচম্যাচ করছে আজ। উঠতে মন টানছিলো না। ক্লান্ত লাগছে হঠাৎই। খালি বিছানায় একা থাকায় কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করে পড়ে রইলো। মন চাইলো না কিন্তু পৌষ তবুও উঠলো। বিছানার চাদর টানটান করে ঝেড়ে উঁকি দিলো বারান্দায়। সরল কপালে ভাঁজ পরলো তখনই। জিম আপাতত নিষিদ্ধ বলে তৌসিফ ম্যাট বিছিয়ে ইয়োগো করছে। চোখ দুটো ছোট ছোট করে পৌষ বিরবির করলো। এসব পছন্দ হলো না ওর। কি হবে রে ভাই দুই দিন ত্যাড়াব্যাড়া না হলে? হুদাই এমন শুরু করেছে। এদিকে আর না এসে পৌষ সরাসরি গেলো বাথরুমে, সেখান থেকে এসেছে রান্নাঘরে। এসেই দেখলো বুয়ারা পুরোদস্তুর কাজে লেগেছে। পৌষ চায়ের পানি বসালো আগে। বুয়াকে এত সামগ্রী বের করতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“এতকিছু আজ একসাথে?”
“মামা বললো কে আসবে।”
“কই, আমি তো জানি না।”
পেছন থেকে মিনু উঁকি দিয়ে বললো,
“উপজেলা চেয়ারম্যান আসবে ছোট মামি৷ কাল রনি ভাই বললো যে।”
পৌষের মনে পরলো। মনে পরতেই রাগ উঠলো। রাফিদ এমন কাজ করার পর তার বড় ভাই কিভাবে এখানে আসে? আর তার চাইতে বড় প্রশ্ন হলো রাফিদ কোথায়? ও কি জেলে নাকি লুকিয়ে? তৌসিফ কেন কিছু করছে না? প্রশ্নগুলো করা হয় নি। পৌষ চাইলেও করছে না৷ অপরাধবোধে জর্জরিত পৌষ কোনভাবেই প্রশ্নগুলো করতে পারছে না৷ নাস্তাপানি তৈরী করে ও তৌসিফের ঔষধ বের করে খায়িয়ে দিলো। তখনই একবার বললো,
“উমায়ের শিকদার নাকি আসছেন?”
“হ্যাঁ।”
ব্যাস অতটুকুই। পৌষ আর ঘাটে নি বিষয়টা। নাস্তা শেষ করে উঠতে উঠতে হাজির হয়েছে উমায়ের। তৌসিফ তখন একদম ফিটফাট হয়ে আছে। পৌষকে শুধু বলেছে,
“রুমে যাও।”
“নাস্তা পাঠিয়ে দিয়ে যাই।”
“না, তুমি যাও।”
পৌষ চলে গেলো সেখান থেকে। উমায়েরকে নিয়ে তুরাগ, আদিত্য উপরে এলো। উমায়ের অবশ্য একা আসেননি। সাথে ভালো লোকজন এসেছে। চারজন উপরে এসেছে। ফলমূল কোনটাই যেন বাকি রাখেনি উমায়ের। তাদের বসানো হলো ড্রয়িং রুমে। তৌসিফের মুখভঙ্গি আর কথাবার্তা কোনটাতেই প্রকাশ পেলো না সদ্য গুলি খাওয়া আহত সে। উমায়ের বেশ অবাক হলো তাতে। তৌসিফের দিকে তাকিয়ে উমায়ের এবারে জিজ্ঞেস করলো,
“এখন সুস্থ আছো?”
“মানুষ চাইলেই কি আর মানুষকে অসুস্থ করতে পারে?”
উমায়ের থতমত খেলো কিছুটা। মুখে হাসি টেনে বললো,
“তোমাকে সুস্থ দেখে ভালো লাগলো তৌসিফ।”
“পল্লবের খবর কি? জুনায়েদের সাথে কথা হচ্ছে না অনেকদিন।”
উমায়ের কিছুটা হতাশার শ্বাস ফেলে জানালো,
“কোর্টে উঠেছে না কেস, এত সহজে কি আর ছাড়া পাবে?”
অতঃপর তাদের বাক্যালাপ মোড় ঘুরালো সাফিন হত্যা মামলায়। বেমালুম ভুলে গেলো উমায়ের সে এসেছিলো রাফিদের হয়ে কিছু বলবে। তৌসিফ তো সেই সুযোগই রাখলো না। ঘন্টাখানিক আলাপ হলো অথচ এক গ্লাস পানি পর্যন্ত তৌসিফ উপস্থিত করে নি এখানে। আড়ালে উমায়েরের আনা সকল উপহার গাড়িতে তুলে দিয়েছে। উমায়ের বিদায় হতেই পৌষ ফুঁসে ওঠে। তৌসিফ রুমে আসতেই চিল্লাপাল্লা শুরু করে,
“মেহমানদারী করবেন না তাহলে এত রান্না করাচ্ছেন কেন? আপনি খাবেন এসব? সকাল থেকে খালারা রান্না করছে।”
“শাওয়ারে যাব হানি।”
“তো যান। আমি ধরে রেখেছি।”
“আমি আহত না? একা পারব?”
পৌষ কথা বললো না তবে সাহায্য করলো গোসলে।তৌসিফ যা যতটুকু নিজে পারে তাও এখন করছে না। বউ সামান্য অসুস্থ কিন্তু তৌসিফ লোভী। সে নিজের আদরযত্ন বুঝে নেয় বরাবর।
দুপুর নাগাদ তালুকদার বাড়ীর তিন তলায় গমগমে পরিবেশ তৈরি হলো। পৌষের পাক বাহিনী হাজির হয়েছে এখানে। সামান্য কাটা দাগ দেখে বেশ হইচই লেগেছিলো অতঃপর পৌষ যখন আড়ালে নিয়ে জানালো তাদের দুলাভাই অসুস্থ সেই থেকে ইনি, মিনি দৌড়ে এসেছে তৌসিফের কাছে। পিহা এসেছে পিছু পিছু। তৌসিফ তখন হেমন্তের সাথে কথা বলছিলো। শ্রেয়ার ডেলিভারি ডেট সামনেই৷ এই বিষয়েই কথা হচ্ছিলো মূলত। তখনই কোথা থেকে ইনি, মিনি ছুটে আসে। এসেই হামলে পড়ে তৌসিফের উপর। তৌসিফ বরাবর কোলে তুলে ওদের। হাঁটু পর্যন্ত ফ্রক পরিহিত দুই বোন। কোলে বসাতেই দুইজন তৌসিফের গাল ধরে। চুল সরিয়ে কপাল দেখে। ব্যথার চিহ্ন না পেয়ে জিজ্ঞেস করে,
“দুতাভাই, তোমাল ব্যাতা কই?”
আদুরে স্বরে তৌসিফ গলে গেলো। খুব আদর মিশিয়ে নিজেও বললো,
“ব্যাথা দিয়ে কি হবে?”
“আপা বলেতে তুমি বেতা পেয়েতো।”
“ব্যথা তো পিঠে পেয়েছি।”
“দেথাও?”
“দুলাভাই বেশি ব্যথা পেয়েছেন?”
পিহার প্রশ্নে তৌসিফ বেয়াক্কেল বনে গেলো। গুলি খেয়েছে সে আর এই বেসাইজ শালী জিজ্ঞেস করছে বেশি ব্যথা কি না। নাহ্, এসব মানা যাচ্ছে না। ইনি, মিনি উঠে গিয়ে ঘাড়ের দিক থেকে টেনে ধরে তৌসিফের টিশার্ট। সামান্য ঢোলা থাকায় তারা মুখ ঢুকিয়ে উঁকি দেয় ভেতরে। সাদা কাপড়ের ব্যান্ডেজ দেখেই দুইবোন ভয় পেয়ে গেলো৷ সেখানে দাঁড়িয়েই তৌসিফের গলা জড়িয়ে কেঁদে উঠলো সমস্বরে। তৌসিফ থতমত খেলো। টেনে দুটোকে কোলে তুললো। দুই বোন বারবার কাঁদতে বলতে লাগলো,
“দুতাভাই বেতা পেয়েতে। অনেক বেতা।”
তৌসিফের কি যে হলো, ও দুইজনকে বুকে জড়িয়ে রাখলো। হেমন্ত একটু হেসে বললো,
“আমাকে দিন ভাই। কষ্ট হবে আপনার।”
“এত সুন্দর পাখি কোলে নিতে কষ্ট হবে?”
হেমন্ত হেসে ফেললো। পিহা পিটপিট করে তাকিয়ে বললো,
“দুলাভাই, ব্যাথা আছে এখনও?”
“আছে তো।”
“টিপে দিব?”
“গুলি খেয়েছি শালী সাহেবা।”
“জানি তো।”
“দুলাভাই, হাত-পা টিপে দেই তাহলে?”
“মাথাটায় ম্যাসাজ দেই একটা দুলাভাই?”
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৬
প্রশ্ন দুটো করলো চৈত্র আর জৈষ্ঠ্য। বুক থেকে মুখ তুলে ইনি, মিনি চোখ মুছে নিজেরাও বললো,
“আমলা চুল টেনে দিব দুতাভাই।”
তৌসিফ এদের দিকে তাকিয়ে রইলো। ইহজগৎ এ এরা এক দুলাভাই পেয়েছে আর কিছু যেন নেই। হেমন্তের দিকে তাকিয়ে তৌসিফ হাসতে হাসতে বললো,
“কি হেমন্ত, তুমি কি সেবা করবে?”
