Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৬

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৬

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৬
সাইয়্যারা খান

হেমন্ত বাসায় এসেছে মাত্র। এসে আজ সরাসরি গেলো নিজের রুমে। উঁচু হওয়া পেটটা নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে শ্রেয়া। হেমন্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পা ফেলে এগিয়ে এলো। বেশ ক্লান্ত সে। শ্রেয়া অবশ্য এই সময়ে একা থাকে না। তাকে কেউ একা রাখে না। পিহা একটু দূরত্বে বসে ঝিমাচ্ছে। কেন ঝিমাচ্ছে কে জানে। ওদের কোন কারণ লাগে না, ওরা এমনিতেই থাকে। কতটুকু বুঝে হেমন্ত জানে না কিন্তু ওর মন জানে, ওদের পৌষ শিখিয়ে দেয় যাতে শ্রেয়ার আশেপাশে থাকে। একা না ছাড়ে। হেমন্ত এসে বোনের কপালে হাত রাখলো। ফট করে চোখ খুলে পিহা। সামনে দণ্ডায়মান ভাইকে দেখে চমকে গেলেও সহসা স্বাভাবিক হলো ও। হাই তুলে বললো,

“আপার বাসা থেকে এলে হেমু ভাই? দুলাভাই ভালো আছে এখন? আপাকে দেখতে যাব না আমরা?”
“কাল যাবি। এখন কিছুটা ঠিক আছে। খেয়েছিস সবাই?”
“জৈষ্ঠ্য ভাই আর চৈত্র ভাই খেলো না। আমরা খেয়েছি।”
কপাল কুঁচকে তাকালো হেমন্ত। বললো,
“না খাওয়ার কারণ কি?”
“সেঝ চাচার সাথে জৈষ্ঠ্য ভাই তর্ক করলো। চাচাও রেগে চড় মেরে দিলো একটা। ভাই আর খেলো না।”
বলতে গিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে পিহা। হেমন্ত বোনের মাথায় হাত রাখলো। গাল দুটো মুছে দিয়ে বললো,
“আমি দেখে নিব। রুমে যা, ঘুমা সুন্দর করে। এখানে বসে ঝুমছিলি কেন?”
“কই, কই ঝুমছিলাম? আমি তো বসে ছিলাম।”
“হ্যাঁ, দেখলাম নমুনা। আপার চামচা।”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

ধরা পড়ে পিহা মাথা চুলকালো। উঠে কুঁচকানো চাদরটা টানটান করে দিয়ে বেরিয়ে গেলো। দরজা লাগিয়ে এগিয়ে এলো হেমন্ত। ঘুমন্ত শ্রেয়ার পাশে বসে আস্তে করে হাত রাখলো বাড়ন্ত অস্তিত্বে। শরীরটা ঝাঁকি দিয়ে উঠলো ওর। ঝুঁকে পরপর কয়েকটা চুমু খেলো পেটে। ফিসফিস করে বললো,
“বাবা ফ্রেশ হয়ে আসছি সোনা। মায়ের কাছে থাকো।”

হেমন্ত বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই শ্রেয়া নড়েচড়ে উঠলো। পেটে হাত রাখতেই একটু সজাগ হয়েছে সে। আস্তে করে পেটে হাত রেখে উঠে বসে শ্রেয়া। এলেমেলো হওয়া চুলগুলো খোঁপা করে উঠে ওরনা পেঁচিয়ে বাইরে আসে। হেমন্ত খায় নি ও জানে। খাবার গরম দিতে গেলেই বড় চাচির ধমক শোনা গেলো। খুব দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে শ্রেয়াকে রান্নাঘর থেকে বের করলো। সোফায় বসিয়ে আগে এক গ্লাস দুধ গরম করে এনে দিলো। শ্রেয়া হাতে নিলো। খেতে একটু গড়িমসি করলেও লাভ হলো না। বড় চাচি সামনে দাঁড়িয়ে পুরোটা শেষ করালেন। আঁচলে মুখ মুছিয়ে দিলেন। শ্রেয়া একটু হাসলো। এই আদরের সিকিভাগও যদি পৌষকে দিতো তাহলে হয়তো শ্রেয়া তাকে মনের ভেতরে আরেকটু স্থান দিতো। এমন না শ্রেয়া শাশুড়ীকে পছন্দ করে না। সে যথেষ্ট সম্মান করে কিন্তু দিনশেষে গিয়ে স্বামী আগে। তার স্বামী তার শাশুড়ী দ্বারা যতটা কষ্ট পেয়েছে, পৌষের প্রতি তার এতটা অবিচার শ্রেয়া যেন কিছুতেই ভুলতে পারে না। যদি সেদিন তৌসিফ না থেকে অন্য কেউ থাকতো? যদি তৌসিফ এমন না হতো? যদি তৌসিফ পৌষকে আগলে না নিতো তাহলে কি হতো? পৌষ মরার আগে হেমন্ত মরে যেতো। এখনই তো নুন থেকে চুন খসলে হেমন্ত পাগল হয়ে যায়। বোন হারিয়ে যাওয়ার পর হেমন্তের কান্না দেখেছে শ্রেয়া। ভাবলেই তো বুকটা কাঁপে তার।

“শ্রেয়ু?”
“এই যে আমি এখানে। ড্রয়িং রুমে।”
হেমন্ত এদিকে আসে। কাঁধে আধ ভেজা টাওয়াল। শ্রেয়াকে এখানে দেখে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“এখানে কি করছো?”
“খাবার গরম করতে এসেছিলাম। মা দিলেন না করতে উল্টো দুধ খাওয়ালেন।”
হেমন্ত শুনতে চাইলো না। শ্রেয়াকে বললো,
“আমি ছাগল দুটোকে নিয়ে আসি। খায় নি শুনলাম।”
“হ্যাঁ।”
হেমন্ত ওদের রুমের দিকে যেতে নিলেই শ্রেয়া জানালো,
“ছাদে বোধহয়।”

পা ঘুরিয়ে ছাদে গেলো হেমন্ত। রেলিঙের পাশ ঘেষে ঘুটঘুটে অন্ধকারে বসে আছে দুই ভাই। চুপচাপই আছে তবে মাঝেমধ্যে টুকটাক কথা বলছে। হেমন্ত সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলো। অন্ধকারের মাঝেই ধমক দিলো,
“লাইট নেই এখানে? এমন অন্ধকার বানিয়ে শোক পালন করতে হবে কেন?”
বলে নিজেই বাতি জ্বালালো৷ চৈত্র ভাইকে দেখে একটু সাহস পেলো। ডেকে জানালো,
“আমি অনেকক্ষণ ধরে বলছি নিচে নামতে। ও শুনলো না।”
জৈষ্ঠ্য মাথাটা নিচু করে রেখেছে। হেমন্ত এসে দুই ভাইয়ের মাঝখানে বসলো। কিছুটা নিরবতায় কাটলো তাদের সময়। হেমন্ত মুখ খুললো। জিজ্ঞেস করলো,
“তর্ক করেছিস কোন বিষয়ে?”

জৈষ্ঠ্যের মাথা নিচু হলো আরেকটু। মিনমিন করতে নিলেই হেমন্তের ধমক এলো কানে,
“অ্যাঁই বিড়ালের মতো ম্যাউ ম্যাউ করবি না। ঠিকঠাক কথা বল।”
“কলেজ থেকে ফিরে আপার কাছে যেতে চাইলাম। মা সরাসরি না করলো। বাবা পাশেই ছিলো। মায়ের সাথে প্রথমে কথা কাটাকাটি হয়, পরে বাবার সাথে লেগেছে।”
হেমন্ত গালটা দেখলো। অন্ধকারে বুঝার চেষ্টা করলো। বোঝা গেলো না কিছুই। উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“খেতে আয়।”

বড় ভাইকে না বলার সাধ্য ওদের নেই তাই চুপচাপ নেমে গেলো।
টেবিলে তখন খাবার সাজানো। মাকে দেখেও ততটা কথা বাড়ালো না হেমন্ত। যতটুকু তার দায়িত্ব ততটুকু সে যথাযথ পালন করে। আগের ঐ মায়ায় খুব সূক্ষ্ম চির ধরেছে। চাইলেও হেমন্ত তা ঠিক করতে পারবে না। দুই ভাইকে নিয়ে বসলো হেমন্ত। শ্রেয়া প্লেটে ভাত তরকারি বেড়ে দিলো। হেমন্ত ভাত মেখে আগে শ্রেয়ার মুখে ধরলো। অভ্যস্ত এখন শ্রেয়া তাই লজ্জা পেলো খুব সামান্য। ভাতটুকু মুখে তুললো। হেমন্ত আরেক লোকমা মুখে দিয়ে বললো,
“কিছু বলতে চাইছো?”
শ্রেয়া মাথা নাড়লো। হেমন্ত এবার নিজের মুখে খাবার দিলো। শ্রেয়া পানি পান করে বললো,
“পৌষ আর দুলাভাই কেমন আছে?”
“পৌষ? ও আবার খারাপ থাকে? গিয়ে দেখো লাফাচ্ছে হয়তো।”
“কাল যাব আমরা।”
“তুমি যাবে না। অসুস্থ তুমি।”
“দুই মিনিটের রাস্তা আর আমি মোটেও অসুস্থ না।”
হেমন্ত ওর মুখে আরেক লোকমা ঢুকিয়ে দিলো। এই মেয়েটাকে সে খুব ভালোবেসে ফেলেছে।

রাতের জন্য খুব যত্ন করে রেঁধেছে পৌষ। তৌসিফ একটু ঘুমিয়েছিলো সেই ফাঁকে পৌষ কষিয়ে খাসি রেঁধেছে। ঘন ডালটা একেবারে মাখিয়ে চুলায় দিতেই মাথাটা সামান্য ঘুরলো। এই ব্যথাটা কিভাবে পেয়েছে নিজেরই মনে পরছে না। চিনচিন ব্যথাও হচ্ছে। ডালের চুলার গ্যাস কমিয়ে বুয়াকে বললো,
“খালা একটু রুটি বানাতে পারবেন? ওনার যদি ভাত খেতে মন না চায়।”
“এখনই বানাচ্ছি মামি।”
পৌষ গিয়ে সোফায় বসলো। মাথাটা এলিয়ে দিলো। মনে হচ্ছিলো পড়েই যাবে। দুই মিনিট বাদই অবশ্য মাথা ঘুরানো কমলো। মিনু এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিতেই পৌষ নিলো। পুরোটা শেষ করে একটু দম নিলো। মিনু মিনমিন করে জিজ্ঞেস করলো,

“শরীর খারাপ লাগছে ছোট মামি?”
“ঠিক আছি।”
কলিং বেল বাজলো তখন। রাত হয়েছে। পৌষ ভাবলো হয়তো তুরাগদের ওখান থেকে কেউ এসেছে। মিনু দরজা খুলতেই দেখলো পলক দাঁড়িয়ে। ওখান থেকেই বললো,
“ছোট মামি, মামি এসেছে।”
পৌষ মিনুর অদ্ভুদ ছোট মামি, বড় মামি ডাকে বিরক্ত হলো। উঠে এসে পলককে দেখে বেশ অবাক হলো৷ মুখে হাসি ফুটিয়ে পলকের হাত ধরে ভেতরে আনলো পৌষ। কতদিন পর দেখলো পলককে। একটু জড়তা কাজ করলো পলকের মাঝে তবে পৌষ যখন ঝাপ্টে জড়িয়ে নিলো তখন তা নিমিষেই কেটে গেলো। বেশ উচ্ছাসিত হয়ে পৌষ বললো,

“একদম ভালো সময়ে এসেছেন আপু। একসাথে খাব ঠিক আছে? আমরা এখনও খাই নি।”
“মেঝ ভাইয়া কোথায়?”
“ঘুমাচ্ছেন। উঠবেন। খেয়ে ঔষধ খাবেন তো।”
দু’জন বসে বেশ গল্প করলো। সময় গড়ালো কিছুক্ষণ। কথার মাঝে অবশ্য পৌষ দুইবার দৌড়ে গিয়ে ঘুমন্ত তৌসিফকে দেখে এসেছে। মেয়েটার পাগলামো দেখে পলক মনে মনে হাসলো। এত সুখী পৌষ? এতই ভালোবাসে সে তৌসিফকে? পলক কেমন চোখে দেখলো ওকে। পৌষ আবারও যাবে তার আগেই ডাক এলো। তৌসিফ ডাকছে। তার আদুরে ডাকটাও পলকের কানে বিঁধলো। পৌষ হাসিমুখে এগিয়ে এলো। বিছানায় শুয়েই ডাকছে তৌসিফ। পৌষ আসতে আসতে বলতে লাগলো,
“উঠেছেন? শরীর ভালো লাগছে এখন একটু? আসুন, আমাকে ধরে উঠুন। আপনাকে দেখতে মানুষ এসেছে। আপনার জন্য মজা করে রেঁধেছি।”
তৌসিফ পৌষের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরলো তবে উঠলো নিজ শক্তিতে। পৌষ শক্ত করে ধরে রাখলো ওকে। ধরে ধরে বাথরুমে নিলো। ক্রিম রঙের শালটা এগিয়ে এনে তৌসিফের গায়ে দিয়ে বললো,

“আপু এসেছে।”
“পলক?”
“হ্যাঁ।”
তৌসিফ আগ বাড়িয়ে কিছু বললো না। পৌষের হাত ধরে বেরিয়ে এলো। টেবিলে খেতে বসতেই পৌষ দৌড়ে গেলো ভেতরে। তৌসিফ পেছন থেকে ধমক দিলো,
“তুমি এভাবে দৌড়াদৌড়ি করছো কেন পৌষরাত?”
“তোমাকে খুব ভালোবাসে মেঝ ভাইয়া।”
তৌসিফ তাকালো। পলকের থেকে চোখ সরিয়ে বললো,
“একটু বেশিই ভালোবাসে।”
“তুমি ভালো আছো?”
“হ্যাঁ, আলহামদুলিল্লাহ।”
পৌষ এরমাঝেই এলো। হাতের মুঠোয় থাকা ঔষধ দুটো তৌসিফের মুখে ঢুকিয়ে পানিটাও ঠোঁটে ধরলো। তৌসিফ ঔষধ খেয়ে বললো,

“তুমি রান্না কেন করেছো পৌষরাত? এত এদিক ওদিক কি তোমার?”
পৌষ একটু হাসার চেষ্টা করলো। বললো,
“একটু রেঁধেছি।”
বুয়া টেবিলে খাবার সার্ভ করেছে। পৌষ পলককে প্লেট সাজিয়ে দিলো। তৌসিফকে রুটি দিয়ে বললো,
“আপনাকে লাইট খাবার দিতে বলেছে তাই রুটি।”
“খাসি খায়িয়ে এই কথা বলছো?”
“ধুরু মিয়া, ডাক্তারের সব কথা শুনলে হবে? কিছুটাতো বউয়ের কথাও শুনতে হয়।”
“তাই তো শুনছি।”

পলক খেতে খেতে দু’জনের সুন্দর একটা সংসার দেখে ফেললো। বুকের ভেতর ছ্যাঁত করে উঠলো ওর। কেউ যেন যত্ন করে সেঁকে দিচ্ছে বুকের মাঝখানে। কিছুটা তারাহুরো করে খেয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেলো ও। পৌষ মুখটা বেজার করে নিলো। তৌসিফ তা দেখে বললো,
“কি হলো হঠাৎ?”
“আপুর জন্য খারাপ লাগে। ভাইয়া কবে আসবেন?”
তৌসিফ উত্তর দিলো না। পৌষ রুটিতে গোস্ত পুরে তৌসিফের মুখে দিলো। বেশ যত্ন করে খাওয়াচ্ছে সে।
বুয়া এগিয়ে এসে বললো,

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৫

“মামা রনি ভাই এসেছেন।”
“ভেতরে আসতে বলো।”
পৌষ আলগোছে উঠে রান্নাঘরে চলে গেলো। বাসার কাপড়ে কারো সামনে ততটা আসে না ও। রনি অবশ্য বসলো না। শুধু জানালো,
“কাল উমায়ের শিকদার আসবেন বস। আপনাকে দেখতে আসবেন।”
তৌসিফ থুতনি চুলকালো। আসবে? আসুক। তার তো আসাই উচিত।

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৭