প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৫
সাইয়্যারা খান
খুব ধীরে সুস্থে বউ নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলো তৌসিফ। পেপারে ছাপা হয়েছিলো গু লি লাগার বিষয়টা কিন্তু ধামাচাপা দিয়েছে তৌসিফ নিজে। খুব গোপনীয়তা রক্ষা করে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ নিয়ে পেছনের গেট দিয়ে গাড়িতে ওঠে ওরা। ওদের গাড়িতে অতিরিক্ত আদিত্য উঠলো। রনি ড্রাইভ করছে আজ। পৌষ তৌসিফের পেছনে কুশন দিয়ে ঠেস দিয়ে বললো,
“মাথাটা কাত করে রাখবেন? খারাপ লাছে?”
তৌসিফ রনিকে গাড়ি স্টার্ট দিতে বললো অতঃপর তাকালো পৌষের দিকে। শুকিয়ে এটুকুন হয়ে আসছে তার মুখটা অথচ চিন্তা দেখো তার? বরের সুবিধা নিয়ে কতই না চিন্তিত। তৌসিফ মাথা নেড়ে বললো,
“ঠিক আছি। এদিকে এসো। আমার কাঁধে মাথা দাও।”
পৌষ সরাসরি না করলো। বললো,
“পা গল হয়েছেন আপনি? কাঁধে মাথা দিলে ব্যথা পাবেন।”
তৌসিফ হাত বাড়িয়ে টেনে কাছে নিলো। পৌষ চোরা চোখে সামনে তাকালো। আদিত্য চোখ বুজে সিটে মাথা এলিয়ে আছে আর রনি একমনে গাড়ি চালাচ্ছে। পৌষ খুব আস্তে করে তৌসিফের হাতের ভেতর দিয়ে বুকের কাছটায় এলো। চুপচাপ নিজের মাথাটা বুকের ঠিক মাঝে রেখে আলগা হয়ে রইলো। তৌসিফ হেসে ফেললো ওর কাজে। এভাবে তো কষ্ট পাবে মেয়েটা। ডান হাতে ওর মাথাটা একদম বুকে চেপে ধরতেই পৌষ সরতে নেয়। তৌসিফ তখন গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“এভাবেই থাকো। একদম নড়চড় করবে না।”
গাড়িটা মাঝে বোধহয় নয়াবাজারে জ্যামে পড়েছে একবার এরপর একটানে থেমেছে বাড়ীর ভেতর। তৌসিফ ভেবেছে বউকে কোলে তুলে নিয়ে উঠবে। মাথায় আঘাত পেয়েছে, যদি ঘুরে ওঠে? এদিকে গাড়ি থেকে নেমেই পৌষ হুরতার শুরু করেছে। তৌসিফ বেয়াক্কেল বনে গেলো। পৌষ নিজে নেমে সরকারি তৌসিফের ডোর খুলে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রত্যাখ্যান তৌসিফ করতে পারলো না। বাড়িয়ে দেওয়া শুকনো হাতটার মাঝে নিজের হাতটা দিয়ে দিলো। পৌষ মুঠ করে ধরে। বেরিয়ে আসে তৌসিফ। আদিত্য এগিয়ে এসে পাশ থেকে ধরে। তৌসিফ কপাল কুঁচকে তাকালো আদিত্যের দিকে। বিরক্ত হওয়া কণ্ঠে বললো,
“ছাড়ো। আমি যেতে পারব।”
আদিত্য কিছু বলার আগেই পৌষের ঝাঁঝলো কণ্ঠ কানে এলো,
“এ্যাঁহ্, আসছে। যেতে পারবে না কচু। আমার শক্তি থাকলে কোলে তুলে উঠতাম। আমার অসুস্থ জামাইটাকে হাঁটতে দিতাম নাকি? অ্যাঁই আদি, ভালো মতো ধরো।”
আদিত্য ঠোঁট চেপে হাসছে। তৌসিফ বউয়ের উপর কথা বললো না। সচরাচর বলেও না। ঐ যে হালের গরু সে, প্রেমের ডাকে সেই যে গোয়াল ছেড়েছে আর ফিরতে পারছে না। বউ যা বলে তাই করে চুপচাপ। নিজেদের ফ্ল্যাটের সামনে আসতেই তা খোলা পেলো তৌসিফ। ওদের পেছন পেছন হেমন্তও উঠেছে। হাতে বোন আর বোন জামাই এর ঔষধপত্র। ওরা ঢুকতেই পৌষ তৌসিফকে সোফায় বসালো। হেমন্ত ঔষধ গুলো মিনুর হাতে দিয়ে বললো,
“এগুলো ওদের বেড রুমে রেখো এসো।”
মিনু মাথা নাড়ে। বুয়ারা একে একে জিজ্ঞেস করে হালহকিকত। তৌসিফ তাদের সাথে ভালোই কথা বললো। হেমন্ত বুয়াদের কাছে গিয়ে খাবারের বিষয়ে জানালো। তৌসিফের কিছুদিনের খাবার দাবারে একটু পরিবর্তন আনতে হবে। ডাক্তার চার্ট করে দিয়েছেন। তুরাগ সহ মীরা আর অদিতিও ভেতরে আসে। পৌষ হেমন্তের কাছে এসো বললো,
“বাকি কেউ আসবে না হেমু ভাই?”
“আসবে। পিহা আর ইনি,মিনি জানে না।”
“ওদের বলো না। তুমি এমনিই নিয়ে এসো। আমি ছোট আলু দিয়ে বিরিয়ানি রাঁধব নে।”
“থাপ্রে গালটা ফাটিয়ে দিব বুঝলি। ফাইজলামি করিস তুই আমার সাথে? শরীর ভালো না কিছু না অথচ সে নাকি রাঁধবে। টেংগরি ভেঙে বসিয়ে রাখব।”
“আমাকে মারবে তাও কি না তুমি।”
বলতে বলতে পৌষ হাসতে লাগলো। হেমন্ত তাকিয়ে রইলো বোনের দিকে। অসুস্থ অথচ অশান্ত মেয়েটা। হেমন্ত ওর মাথায় হাত বুলালো। কপালে হাতের উল্টো পিঠ ছুঁয়ে তাপমাত্রা পরখ করলো একবার। পৌষ হেসে বললো,
“আমি ঠিক আছি।”
“তুই সবসময় এভাবেই ঠিক থাকিস পৌষ।”
পৌষ একটু তাকালো। তার মন চাইলো আজ হেমু ভাইকে জড়িয়ে ধরতে কিন্তু কিছুটা অতীত বাঁধা দিলো। পৌষ হেমন্তের দিকে তাকিয়ে বললো,
“তোমার ছেলে আমি খুব জ্বালাব ওকে। একদম জল্লাদ ফুপি হব।”
“তাই নাকি?”
“একদম।”
হেমন্ত হেসে ফেললো। ড্রয়িং রুমে এসে তৌসিফকে বললো,
“আজ তাহলে যাচ্ছি ভাই।”
“যাচ্ছি মানে? খেয়ে যাবে। তুমি শ্রেয়াকে আনাও। চৈত্র বা জৈষ্ঠ্যকে কল দাও। থাকবে কিছুদিন এখানে।”
হেমন্ত একটু লজ্জা পেলো। পৌষ চকচকে চোখে তাকিয়ে আছে। তৌসিফ পুণরায় বললো,
“তোমারই বোনের বাসা হেমন্ত।”
“জি ভাই কিন্তু আসলে.. ”
“এসো না হেমু ভাই।”
হেমন্তের একটু খারাপ লাগলেও তা আড়াল করে বললো,
“কাল আবার আসছি তো। শ্রেয়াকে নিয়ে আসব। আসলে ভাই এইসময়ে একটু কমফোর্ট জোন লাগে তো।”
“এখানে কমফোর্ট পাবে হেমন্ত। পর ভেবো না।”
“ছিঃ ছিঃ ভাই। এমন কিছু না। আগামী কাল আসব।”
“সাবধানে যাও।”
“জি।”
বিদায় জানিয়ে হেমন্ত বেরিয়ে গেলো। পৌষ দরজা ধরে দেখলো ভাইকে পরপরই ছুটে ভেতরে এলো। তৌসিফের বাহু ধরে বললো,
“রুমে চলুন। ফ্রেশ হবেন।”
তৌসিফ উঠে দাঁড়ালো। তুরাগও পরিবার নিয়ে উঠলো। জানালো আবার আসবে।
পৌষ তৌসিফকে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে। গরম পানি তৈরী করা। পৌষ তৌসিফকে উঁচু স্থানটায় বসালো। শার্টের বোতাম গুলো একে একে খুলতে খুলতে বললো,
“পিঠের দিকে কাপড় দিয়ে ঢেকে নিব তাহলে ভিজবে না। গা মুছিয়ে দেই নাহয়?”
“আমার বমি পাচ্ছে পৌষরাত৷ দুই দিনের উপর গোসল হচ্ছে না।”
পৌষের খারাপ লাগলো। আসলেই তো লোকটা দিনে দুইবার প্রায়ই গোসল করে। এমনিতেই তো খুঁতখুঁত করে কেমন৷ তৌসিফ তাকিয়ে দেখলো পৌষকে। নিজে একাই পারবে সে কিন্তু যেহেতু পৌষ সাহায্য করছে তাই আর মানা করলো না। তৌসিফকে একটু সাইড করে বসিয়ে পৌষ বললো,
“মাথাটা বেসিনে দিন। শ্যাম্পু করে দিচ্ছি।”
তৌসিফ মাথা দিয়ে চোখ বুজে নিলো। চুলের ভাজে ভাজে চিকন আঙুল গুলো চলছে তখন। বেশ যত্ন করে মাথা ধুয়ে দিলো পৌষ, এতটা যত্ন সে নিজেরও করে না। হাত-পা সুন্দর করে বডি ওয়াশ দিয়ে ফ্যানা তুলে গরম পানি দিয়ে ধুয়ে দিলো। বুকের দিকটায় হাত দিয়ে ডলে পানি ঢালতে গিয়ে সামান্য ভিজলো পৌষ। শুধু পিঠে পানি দিলো না। নরম কাপড় দিয়ে পিঠ মুছে দিলো আলতো হাতে। তৌসিফের মুখটা যখন ধুয়ে দিলো তখনই তৌসিফ বললো,
“ঐ স্ক্রাবটা দাও তো হানি। ডার্ট জমেছে।”
“ঝামা চিনেন ঝামা? একদম ঘষে দিব ওটা দিয়ে। ব্যাটা বাঁচে না আমার, তার নাকি আবার ডার্ট জমেছে।”
তৌসিফ চুপ করে গেলো একদম। একটু পর চোরা মুখে বললো,
“ঐ মাড মাস্কটা দাও তাহলে। লাগিয়ে শুয়ে থাকব।”
পৌষ শুনেই নি ঠিক ওমন ভান ধরলো। তৌসিফ ক্ষুদ্র শ্বাস ফেললো। তার সত্যিই একটু রূপচর্চা প্রয়োজন।
তৌসিফকে একদম বাবুসাহেব বানিয়ে বসিয়ে গিয়েছে পৌষ। মুখে মাস্কটাও নিজ হাতে লাগিয়ে দিয়েছে। ইচ্ছে করে দাঁড়ি চুলকে দিয়েছে। তৌসিফ আড়ালে হাসে এসব ভেবে। কার সাহস ছিলো তার দাড়িতে হাত দেওয়ার? কারোই না। এই অধিকার বোধহয় কেউ পায় নি অথচ পৌষের ভীষণ প্রিয় তার দাড়ি। মন চাইলে আদর করে, চুলকে দেয়। মাঝেমধ্যে নিজের গাল ঘষে।
চোখ বুজে তৌসিফ ভীষণ কল্পনা করলো পৌষকে। মেয়েটা একটা জাদু। তৌসিফকে জাদু করে ফেলেছে সে।
গালে আঙুলের স্পর্শ পেতেই কে এসেছে তৌসিফ বুঝে নিলো। গোসল সেরে এসে পৌষ দেখলো তৌসিফের মাড মাস্ক শুকিয়েছে। স্পঞ্জ ভিজিয়ে এনে মুছতে মুছতে বললো,
“এসব ছাই মাটি কেউ টাকা দিয়ে কিনে? বাড়ীর পেছন থেকে তুলে এনে এই কৌটায় ভরে রাখব। টাকা বেঁচে যাবে।”
তৌসিফ ফট করে চোখ খুললো। পৌষের মুখভঙ্গি কঠিন। সত্যিই না আবার মাটি ভরে রাখে, তৌসিফ ভয়ই পেলো। তার বউ দ্বারা সবই সম্ভব।
“ইশ! চিকচিক করছে যে। মন চাইছে… ”
“কি? কি মন চাইছে?”
“চকাস করে চুমু দিতে।”
“নিষেধ নেই তো।”
পৌষ এগিয়ে এলো। তৌসিফের গালে গাল লাগিয়ে বললো,
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৫৪
“আল্লাহ, আমার বরটাকে এমনই রেখো। এভার গ্রীন।”
তৌসিফ ভীষণ ভড়কে গেলো। এটা কেমন দোয়া? তৌসিফ কি বুড়ো নাকি? তার বউ তাকে কি ভাবছে? তৌসিফ বুড়ো হয়ে যাচ্ছে? তার কি রিংকেল পড়েছে? উফ, ট্রিটমেন্ট নিতে হবে।
