Home দগ্ধ প্রেমানল দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ৭+৮

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ৭+৮

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ৭+৮
আনায়া আফরিন

নিজেকে গুছিয়ে স্বাভাবিক করে ভাইদের কাছে আসলো আফরিন।এরিককে স্বাভাবিকই লাগছে তবে এরিদের মুখটা কিছুটা গম্ভীর!আফরিন আসতেই এরিক বলে উঠলো-
“সন্ধ্যা তো হয়ে গেলো শপিংয়ে কি যাবেন আমার গুনধরী বোন?”
আফরিন এবার বুঝলো কেন তাকে ডাকা হয়েছে।পরক্ষণেই নিজের সকল ভয় ভীতি মুছে হেসে বললো-
“আমার ভাইদের কাছে যদি সময় থাকে তাহলে যাওয়াই যায়!”
এরিক-“তোর জন্য তোর ভাইদের কাছে আজীবন অফুরন্ত সময় থাকবে!”
আফরিন এবার মুখ ফুলিয়ে বললো-

“সকালে তো দেখলাম কারো কাছেই সময় নেই!”
এরিদ-“কীভাবে?তোকে নিজের ঘুম বাদ দিয়ে না কলেজ দিয়ে আসলাম”
আফরিন-“জানি কেন গিয়েছো তুমি।তুমি আর আমাকে বলতে এসো না।আর এরিক ভাইয়াও তো কোথায় যেনো চলে গিয়েছিলো!”
এরিক-“তোদের সাথে আজীবন থাকবো এখানে সেটারই প্রস্তুতি নিয়ে আসলাম”
আফরিন এবার কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বললো-
“বলো কি?সত্যি?”
এরিক-“হ্যাঁ রে বোকা তোর সাথে আমি মিথ্যে বলতে যাবো কেন?যাবো না আর তোদের ছেড়ে আমি”
এরিদ-“আলহামদুলিল্লাহ”
এরিক-“খুশিতে বললি নাকি?”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

এরিক-“অবশ্যই।অবশেষে এই আহ্লাদীর সকল দায়ভার নাও তুমি।আর কিছু হোক না হোক সকালে একটু ঘুমাতে তো পারবো ভাই!”
আফরিন-“এ্যাই প্রতিদিন যাই নাকি আমি হ্যাঁ?আর আজ যা করলে তুমি ইশ বলবো ভাইয়াকে?”
এরিদ চোখ রাঙালো আফরিনকে।এরিক ভ্রু কুচকে জিজ্ঞাসা করলো-
“কি হয়েছে আজ?”
এরিদ-“কিছুই হয়নি তেমন।ওর মাথার স্ক্রু ঢিলা তাই এমন কথা বলে!”
আফরিন-“ওহ তাই?”

এরিক এবার দুটোকেই চুপ হতে বললো।বেচারা বাসায় আসলেই এই অবস্থা দেখে এদের।এরা একা বাসায় কি করে থাকে কে জানে!এরিক আর এরিদ আগে থেকেই রেডি হওয়া।আফরিন রেডি হতে গেলো শপিংয়ে যাওয়ার জন্য।তবে তার আগে রুদ্ভিকাকেও আসতে বললো!রুদ্ভিকা তো আগের থেকে কথা দিয়ে রেখেছিলো তাই মেহেরের সাথে সেও গেলো!তাদের সকলের দেখা হলো কাঙ্ক্ষিত শপিং মলটির সামনে।তিন ভাই-বোন আগেই উপস্থিত ছিলো। মেহের আর রুদ্ভিকা পরে আসলো!

তারা গাড়ি থেকে নেমে আসলো মলটার নিচতলায়।আফরিনকে কল করার পর আফরিন ভাইদের নিয়ে তাদের কাছে পৌছালো!এরিক আর এরিদের যেনো পা দুটো যেনো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে।আফরিন যতটা উৎসাহ নিয়ে তাদের দিকে এগোচ্ছে এরিদ আর এরিক যেনো তাদের নারীদের দেখেই থমকে গিয়েছে।তারা এতো আস্তে হাটছে মনে হচ্ছে তাদের সময় ধীর গতিতে চলছে।এরিকের নীল চোখের দিকে তাকালে বুঝা যাবে তার এই নীল সমুদ্রে বসবাস করা একমাত্র সুন্দরী প্রাণীটি হলো মেহের।এরিদ যেনো রুদ্ভিকার এই রুপে স্তব্ধ।লম্বা চুলগুলো খুলে রেখেছে রুদ্ভিকা।চোখে গাঢ় কাজল লাগিয়েছে।ঠোঁটে হালকা রঙের লিপিস্টিক দিয়েছে।শ্যামবর্ণ বলতে সুন্দর শ্যামবর্ণ রঙ তার।মেহের আর রুদ্ভিকা উভয়েই এক ডিজাইনের জামা পড়ছে তবে রঙ ভিন্ন।

মেহের ফর্সা হওয়ায় তার শরীরে গাঢ় সবুজ রংটা ফুটে আছে একবারে বসন্তের নতুন পাতার মতো!অন্যদিকে শ্যামবর্ণ রুদ্ভিকার শরীরে হালকা টিয়া কালারের জামা যেনো ঝিলঝিল করছে।মেহের রুদ্ভিকার হাত ধরে হাটছে।মেয়েটা বড্ড লাজুক।মেহেরেরও বড্ড অসস্তি হচ্ছে কিন্তু সে সেটা নিজের মধ্যেই দমিয়ে রাখলো!আফরিন উৎফুল্ল মনে তাদের কাছে আসতেই মেহেরকে জড়িয়ে ধরলো!মেহের প্রথম হকচকিয়ে গেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে সেও আফরিনকে জড়িয়ে ধরলো!ভালো মন্দ জিজ্ঞাসা করলো উভয়েই।রুদ্ভিকাও এরিককে জিজ্ঞাসা করলো।বাকি দুইজনের সঙ্গে বিকেলের দিকে দেখা হওয়ায় সে কিছু বললো না।এমনিও এরিদের সামনে আসতেই তার কেনো জানি বড্ড লজ্জা লাগে।এরিদের সামনে আসলেও সে চোখ তুলে তাকালো না।কেবল আফরিনের দিকেই তাকালো।অন্যদিকে এরিকের যেনো হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি হয়েছে।সে একটু সময় নিয়ে ভাবলো মনে মনেই যে এই নারীকেও কেউ কীভাবে প্রত্যাখ্যান করলো!সে সেই পুরুষকে অসংখ্য বার ধন্যবাদও জানালো মনে মনে।সেই পুরুষ এই নারীকে প্রত্যাখ্যান না করলে এতো অমায়িক নারী কে সে কীভাবে পেতো!

এরিক আসলো মেহেরের কাছাকাছি।মেহের যেনো এবার চোখ তুলে তাকানোর সাহসটুকুও পেলো না।তার ইচ্ছেও করছে না!এরিক মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করলো-
“কেমন আছেন?”
মেহের অত্যন্ত ধীর কণ্ঠে বলে উঠলো-
“আলহামদুলিল্লাহ!আপনি কেমন আছেন?”
এরিক-“আপাতত বেশ আছি!”
মেহের এবার আমতা আমতা করে বলে উঠলো-
“চলুন যাওয়া যাক শপিংয়ে!”
এরিক-“হ্যাঁ অবশ্যই চলুন!”
তারা সবাই একটা দোকানে গেলো।যেখানে মুলত নানা ধরনের লেহেঙ্গার কালেকশন আছে।মেহেরের পুরো শরীর তিক্ততায় ভরে যাচ্ছিলো।একমাত্র মায়ের জোরাজোরিতে সে এখানে এসেছে।না হয় সে কখনোই আসতো না!মেহেরের সব বিরক্ত লাগছিলো তাই সে চুপচাপ একটা লেহেঙ্গার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো।এরিক বিষয়টা লক্ষ্য করলো।সে একটা লেহেঙ্গা দেখলো।গাঢ় লাল রঙের, নিচে গোল্ডেন কালার।মেহেরকের কাছে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-

“মেহের দেখুন তো এটা আপনার পছন্দের নাকি?”
মেহের লেহেঙ্গা টাতে চোখ বুলালো।লোকটার চয়েস মারাত্মক।পুরো গর্জিয়াস একটা লেহেঙ্গা। মেহের এবার যথাসম্ভব শান্ত থেকে বলার চেষ্টা করলো-
“এটা বেশ সুন্দর তবে আমি এটা সামলাতে পারবো না কি সেটা বড় কথা!”
এরিক এবার হেসে দিয়ে বলে উঠলো-
“আপনি এটা শুধু পড়বেন।আপনাকে সামলানোর দায়িত্ব আমার!”
মেহেরের যেনো এবার বিরক্ত সরে গিয়ে লজ্জা পেলো।রুদ্ভিকা পাশাপাশি থাকায় সেও শুনে মুচকি হাসলো!এরিক মেহেরের লজ্জা দেখে বললো-
“আচ্ছা আপনি যদি অন্য কোনোটা পছন্দ করেন তাহলে সেটাও নিতে পারেন।সমস্যা নেই!”
মেহের-“না না আমার এটাও পছন্দ হয়েছে!”
এরিক-“আপনি আরো কিছু দেখুন।তারপর যেটা আপনার ভালো লাগে সেটাই নিন!”
মেহের ছোট্ট করে বললো-“আচ্ছা”

এবার মেহের মানবতার খাতিরে ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকলো।তার এদিক মনই বসছে না।বোনের মনের খবর বুঝতে পেরে রুদ্ভিকা এসে মেহেরকে একটা একটা করে লেহেঙ্গা দেখাচ্ছে।মেহের সর্বশেষ দুইটা পছন্দ হলো।সে কোনটা নিবে বুঝতে পারছে না।তাই রুদ্ভিকাকে বললো-
“তোর যেটা ইচ্ছে সেটা নে”
আফরিনও মেহেরের পাশাপাশিই ছিলো।মেহেরকে এমন কনফিউজড হয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখে এরিক এগিয়ে আসলো।সে জিজ্ঞাসা করলো –
“কি হয়েছে?”
আফরিন চট করে বলে ফেললো-

“ভাবির এই দুটো লেহেঙ্গা পছন্দ হয়েছে আর তার টাও পছন্দ হয়েছে তাই সে ভেবে পাচ্ছে না যে কোনটা নিবে?”
এরিক-“তাহলে এতে সমস্যা কোথায়?তিনটাই নিবে!”
রুদ্ভিকা আর মেহের যেনো আকাশ থেকে টপকালো!লেহেঙ্গা গুলো যথেষ্ট দামী।তিনটার দাম মিলে সর্বোমোট ৩ লক্ষ ২৩ হাজার হবে।মেহের অহেতুক খরচ কখনোই পছন্দ করে না!আর রুদ্ভিকাও অপ্রয়োজনে খরচ করে না!তাই মেহের বললো-

“দরকার নেই যেকোনো একটা নিলেই হবে!”
এরিক কেবল মুচকি হাসলো আর কিছুই বললো না।তারা সব শপিং শেষ করলো!এরিদের বেহাল অবস্থা!আফরিন আজ তাকে বেশ নাকানিচুবানি খাইয়েছে।সবথেকে বেশি শপিং করেছে আফরিন!এরিদের শপিংয়ের পরিমাণ নিয়ে কোন সমস্যা নেই,সমস্যা হলো সে এক দোকান থেকে অন্য দোকান ঘুরেছে অনেক।বেচারা অবস্থা খারাপ তাই।আফরিনকে অনেক বার কিছু বলতে চেয়েও বলেনি।বললেই মুখ ফুলিয়ে বসে থাকবে!পরে এরিককে বলে তাকে কথা শুনাবে!তারা বের হলো বাহিরে।তখনই আফরিন বলে উঠলো-

“আর দু’জোড়া জুতা কিনলে কি হতো ভাইয়া?”
এরিদ-“তুই আর কিছুর কথা বললে তোকে আমি মলে রেখেই চলে যাবো।এ্যাই বিয়ে যার,দেখ তো তার জন্য এতো কিছু আছে নাকি?কিনেছিস তো নিজে,এগুলো বইয়ে বেড়াতে হচ্ছে আমাকে!”
আফরিনও এবার বলে উঠলো-
“তোমার বিয়েতে এর থেকে বেশি করবো দেখে নিও।আর তোমার রাগের কারণ বুঝেছি।সারা রাস্তা আছে চোখ ভরে দেখে দিও!”
এরিক এদের আচরণ দেখে বলে উঠলো-
“বাহিরে এসেও এগুলো কি শুরু করছিস!আর এরিদ ও তোর ছোট বোন।ওর সব শখ পুরণ করবি।তুই না পারলে আমাকে বল!”

এরিদ এবার রাগ দেখিয়ে বললো-
“এ্যাহ আমি ওর শখ পুরণ করবো কেন?আমাকে বড় ভাই বলে দাম দেয় নাকি কখনো?”
আফরিন-“দিবোনা তোমাকে দাম।আসছে আমার দামওয়ালা টা!”
এরিদ-“দেখেছো কি ব্যবহার?”
তাদের এমন কান্ড দেখে মেহের মুচকি হাসলো।এরিকের চোখ পড়লো সেখানে।এই হাসি সে প্রথম দেখছে।তার হৃদয়ে যেনো প্রেমের হাওয়া আবারও আলিঙ্গন করলো!

মাত্রই রিকশা থেকে নামলো আদিল।মলের সামনে চোখ পড়তেই সকল কিছু উপেক্ষা করে তার চোখ পড়লো মেহের মুচকি হাসির দিকে।তারা মাত্রই মলের বাহিরে এসেছে।একজন আরেকজনের দিকে ব্যস্ত হওয়ার কেউই আর আদিলকে দেখলো না সামনে।এরিক ফোন করে জোর করে বলেছিলো আদিলকে আসতে।মেহের-রুদ্ভিকাও যে আসবে আদিলের তা জানা ছিলো না।বহুদিন পর বোধহয় মেহেরকে মুচকি হাসতে দেখলো আদিল।আজও বছর খানেক আগের মতোই এই হাসি তার হৃদয় হরণ করছে।হঠাৎ করেই লক্ষ করলো এই হাসিতে সে ব্যতীত আরো এক পুরুষও মেহেরের পাশে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখছে!আদিলের ইচ্ছে হলো না আর এগোতে।সে এগুলোই মেহেরের হাসি মিলিয়ে যাবে।বন্ধুর মোহিত দৃষ্টিতে বাধা পড়বে আর তার বুকের জ্বালাও বাড়বে।অযথা দরকার কি নিজের জন্য বাকি দুজনের মুহুর্ত নষ্ট করার।সে ঠিক যেই রিকশা দিয়ে আসছিলো সেটা দিয়েই বাড়ির পথে আবার রওনা দিলো।যাওয়ার পানে আড়াল হতে মেহেরকেই দেখে গেলো।শপিং মলের সামনের একটা দোকানেই গান বাজছে উচ্চ আওয়াজে-
“কাপা কাপা গলাতে,
ডাকবো যে তোমাকে!
কেনো চোখ মেলে তুমি,
দেখলে না আমাকে?”

রিকশা যত দূরে যেতো লাগলো,গানের সুরও ততো মিলিয়ে যেতে লাগলো।আর পাশাপাশি আদিলের বিরহও বাড়ছে।
অন্যদিকে এরিদ,রুদ্ভিকা আর আফরিন সামনে এগিয়ে গিয়েছে কিছুটা!আফরিন অতি যত্নে রুদ্ভিকার হাত ধরে রেখেছে।এরিদ রুদ্ভিকাকে দেখছে আবার আফরিনের সাথে ঝগড়াও করছে!রুদ্ভিকা কেবল মুচকি হাসার ভুমিকা পালন করছে!মেহের আস্তে আস্তে হাটছে।তাই সে তাদের থেকে কিছুটা পিছিয়ে।তার বড্ড বিরক্ত লাগছে কারণ তার জুতোর ফিতা খুলে গিয়েছে।আশেপাশে মানুষ চলাচল করছে মোটামুটি।তার কাছে এখন কুজো হয়ে জুতা ঠিক করাটা বড্ড লজ্জাকর ব্যাপার আবার হাটতেও পারছে না ঠিকমতো।সবার উপর বড্ড রাগ হলো এবার তার।তাকে কেমন পিছিয়ে রেখে সব এগিয়ে গিয়েছে।সে এবার দাড়িয়ে পড়লো।চোখ বন্ধ করে একবার নিঃশ্বাস নিলো।হঠাৎ করে অনুভব করলো তার জুতোর ফিতা কেউ বেধে দিচ্ছে।চোখ খুলে দেখলো এরিক কিছুটা ঝুকে তার জুতোর ফিতা বেধে ফেলেছে।লজ্জা আর অবাক দু’টোর সংমিশ্রণে সে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লো।এরিক দাঁড়িয়ে বললো-

“এখন ঠিক আছে আপনি হাটতে পারবেন!”
মেহের এবার লজ্জায় মাথা নিচু করে বললো-
“দরকার ছিলো না আমি হাটতে পারতাম।”
এরিক এবার গম্ভীর গলায় বললো-
“দেখলাম অনেকক্ষণ লক্ষ করে।বেশ ভালোই হাটছিলেন!”
কথাটা এরিক রসিকতা করে বলেছে তা নিতান্তই বোঝা গেলো!
মেহের এবার একটু অভিমান করেই বলে উঠলো-
“ভেবেছি আপনারা সবাই সামনে এগিয়ে গিয়েছেন!”
এরিক-“হয়তো খেয়াল করেননি আপনি তবে পাশেই ছিলাম আপনার আমি।জরুরি কল আসায় একটু পিছিয়ে গিয়েছি তবে নজর এদিকেই ছিলো!”
মেহের এবার একটু শান্ত গলায় বললো-

“আপনি যে জুতোর ফিতা এতোগুলা মানুষের সামনে লাগালেন লোকে কি বলবে এখন?”
এরিক এবার মেহেরের দিকে তাকিয়ে বললো-
“লোকে কি বললো তাতে আমার কিছু যায় আসে না।আপনি আমার হবু স্ত্রী।আপনি এখানে আমার দায়িত্ব।আপনার স্বস্তি-অসস্তি টাই দেখবো আমি।লোকে তো কতো কথাই বলবে তাই বলে কি তা শুনতে হবে নাকি?”
মেহের যেনো এরিকের কথায় কিছুটা মুগ্ধ হলো তবে এরিকের কথায় চোখ তুলে তার দিকে তাকালো না।কারণ তার ইচ্ছে অথবা সাহস কোনটাই নেই আপাতত অন্য পুরুষের দিকে তাকানোর অথচ এরিক ঠিকই অজস্রবার তার দিকে তাকালো।তার চাহনিতে ছিলো কেবল অসীম ভালোবাসা,পাওয়ার আনন্দ!

মেহের,রুদ্ভিকা চেয়েছিলো বাড়ি ফিরে যেতে তবে এরিক বলেছে রাত যেহুতু ৯:৩০ এর উপরে তো বাসায় যেতে যেতে ১০ টা বেজে যাবে।তাই সে সবাইকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে গেলো।মেহের,রুদ্ভিকা,আফরিন বসলো একপাশে আর এরিদ,এরিদ বসলো একপাশে।এরিদ এবার জিজ্ঞাসা করলো কে কি খাবে।সবাই-ই বললো নিজেদের টা তবে রুদ্ভিকা চুপ রইলো কারণ সে বড্ড লজ্জা পাচ্ছে।রুদ্ভিকা তার বোনকে খোচাখোচি করছে তার তা বলে দিতে।মেহের বললো ওর জন্য একটা চিকেন শর্মা।ও এটা পছন্দ করে।এরিদ এবার তাই অর্ডার করলো।আফরিন ৪ টা আইটেম অর্ডার করেছে।অথচ সে একটা আইটেমই ঠিকমতো খেতে পারেনি।এই নিয়ে আবার এরিদ আর তার মাঝে লাগলো কিছুক্ষণের ঝগড়া।খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই বেরিয়ে গেলো।এরিদ কিছুক্ষণ পর হাতে একটা পার্সেল নিয়ে বের হলো।রাত বেশি হওয়ায় এরিক মেহের-রুদ্ভিকাকে নিজেদের গাড়িতে করেই একবারে বাড়ি পর্যন্ত পৌছে দিলো।বাড়ির সামনে এসে মেহেররা তাদের জিনিসপত্র নিয়ে চলে যাবে ভিতরে এমন সময় এরিদ ডাকলো।মেহেরের হাতে জিনিসপত্র থাকায় সে রুদ্ভিকা এগিয়ে গেলো।এরিদ একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বললো-

“এটা আপনার আর ভাবির জন্য।আপনার শর্মা আর ভাবির কাচ্চি।”
মেহের এবার দূর থেকেই বললো-
“এগুলোর কোনই দরকার ছিলো না।তুমি শুধু শুধুই আনলে কারণ আমরা তো খেয়েই এসেছি বোকা ছেলে।”
এরিদ-“মাঝ রাতে খোদা লাগে অনেক।তখন খেতে পারেন!”
মেহের এবার মুচকি হেসে বললো-
“ধন্যবাদ!”
রুদ্ভিকা মাথা নিচু করেই প্যাকেটটা নিয়ে ধন্যবাদ বলে ভিতরে চলে গেলো।পিছনে রেখে গেলো দু’টি পুরুষের চাহনি।তার বাড়ির ভিতর যাওয়া পর্যন্ত এরিক আর এরিদ তাকিয়েই রইলো।আফরিনের ক্লান্ত লাগছে বড্ড।তাই সে এবার গাড়ির মধ্যে কিছুটা উচ্চস্বরেই বললো-

“আমার প্রিয় ভাইগণ,আমার ভাবিদের দেখা শেষ হলে দয়া করে আমাকে বাড়ি নিয়ে চলুন।পিছনের সিটে আপনাদের বোন আছে তাকে একটু লক্ষ করুন।”
এরিক আর এরিদ উভয়ের ভ্রু কুচকে পিছনে তাকালো।এরিক ফিক করে হেসে দিলো।সে গাড়ি স্টার্ট করলো।আফরিনকে জিজ্ঞাসা করলো-
“ভাবিদের” কি আফরিন?
এরিদ এবার পিছন ফিরে আফরিনকে চোখ রাঙালো।বড় ভাইয়ের সামনে অসাবধানতায় আফরিনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে।আফরিন এবার কথা পেচিয়ে বললো-
” ভাবিদের বলিনি ভাবিকে বলেছি!”

এরিক কিছু বললো না আর।তারা তিনজনই রাস্তায় চুপ রইলো।বড্ড ক্লান্ত থাকায় আফরিন গাড়িতেই ঘুম।
বাসায় ফেরার পর এরিক আর এরিদ দেখলো আফরিন গাড়িতেই ঘুম।আফরিনের ঘুম অনেক ভারি।তাকে কয়েকবার ডেকেও তোলা গেলো না।তাই।একপ্রকার বাধ্য হয়েই এরিদকে কোলে নিয়ে যেতো হলো।এরিক বাড়ির ভিতরে ইমতিয়াজ চাচাকে ফোন দিয়ে সকল ব্যাগপত্র নিয়ে যেতে বললো।যাওয়ার পানে এরিদ বিরবির করে বললো-
“সারাটাক্ষণ ওর ব্যাগপত্র নিয়ে ঘুরতে হয়েছে আর বাসায় এসে স্বয়ং মহারানিকেই নিতে হচ্ছে!কী জ্বালা রে বাবা!”
এরিক মুচকি হাসলো।তারপর তারা বাড়ির ভিতরে গিয়ে আফরিনকে শুইয়ে দিয়ে নিজেদের রুমে চলে গেলো।ফ্রেশ হয়ে দু’জনই শুয়ে পড়লো।প্রেয়সীদের দেখা পাওয়াতে তাদের মন আজ বেশ ফুরফুরে!

রাত প্রায় দুইটার কাছাকাছি।বাহিরে মেঘ ডাকছে গর্জন করে।বেশ জোরেই বৃষ্টি আসবে বোঝা যাছে।চারদিকে প্রচুর বাতাস।নিস্তব্ধ রাত।রহমান ভিলার সবাই-ই ঘুম।সবাই?না সবাই না,একজন বাদে।নিজের রুমে বারান্দায় একটু টুলে বসে আছে এক রমণী।লম্বা কেশ গুলো ছড়িয়ে আছে।শরীরে ওড়না একপাশে সামান্য ঝুলে আছে আর আরেকপাশে এসে রয়েছে বাকি অংশটুকু।ওড়নাটা ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে।বাতাসের জোরে ওড়না এবং চুল দু’টোই উড়ছে।বাহিরে ভয়ানক পরিবেশ।এই পরিবেশে দু’ধরনের মানুষ বাহিরে থাকতে পারবে।এক হলো যারা বড্ড প্রকৃতিপ্রেমি তারা আর দুই হলো যারা মুলত অনুভুতিহীন হয়ে যায় তারা।আনায়া আপাতত দ্বিতীয় তালিকায় আছে।চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে তা তার গাল দেখেই বুঝেই যাচ্ছে।বর্ষার রাতের এই নিস্তব্ধ পরিবেশ তার হৃদয়কে ছুটে পারছে না মোটেও।তার ঘর থেকে মৃদু আওয়াজে “মন কেমনের জন্মদিন” গানটার সুর বেরিয়ে আসছে।টিভিতে চলছে।

বুকের মধ্যে আনায়া নিজের মোবাইলটা চেপে ধরে রেখেছে।কান্নারা আবার হানা দিয়েছে তার চোখজুড়ে।এতোক্ষণ কেবল পানি পড়ছিলো চোখ দিয়ে।মোবাইলটা উঠিয়ে যখন এরিকের মুখখানা চোখের সামনে দেখল এবার ফুপানো শুরু হলো মেয়েটার!কি বিষণ্ণ সেই সুর।চোখের নিচে এই কয়েকদিনে বেশ কালি জমেছে।ফরসা মুখটায় চোখের নিচের কালিটা যেনো বোঝা যাচ্ছে!এই আনায়া আর আগের আনায়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিলো।এই আনায়াকে কেউ চিনে না,কেউ না!জীবনের ছক মিলাতে আপাতত ব্যস্ত সে!ফুপাচ্ছে আর ভাবছে এরিককে কেন সে পেলো না!লোক সমাগমে তাকে আর মেহেরকে কেউ একসাথে দেখলে ভাবতো এরা দুইজন আপন বোন।এদের উচ্চতা,গায়ের রঙ,সৌন্দর্য,ব্যক্তিত্ব সব একরকমই।কেবল চুলগুলোতে ভিন্নতা।মেহেরের চুল কোমরের একটু উপরে আর একটু কোকড়া অন্যদিকে আনায়ার চুল কোমড় ছাড়িয়ে এবং পুরো সোজা।ব্যস এতোটুকু পার্থক্য।

তবে এরিক কেন তার হলো না?ভালোবাসার দিক দিয়েও সে এরিককে অনেক আগে থেকেই ভালোবাসে।প্রায় ৯ বছরেরও বেশি।কিশোরী বয়সে কেবল ভালোলাগা ভেবেছিলো অথচ পরিনত হলো ভালো বাসায় তাও আবার যে সে নয় সবচেয়ে বেদনাদায়ক একতরফা ভালোবাসায়।১৫ বছর বয়সী রমণী এরিককে দেখেছিলো আদিলের জন্মদিনে তাদের বাসায়।সেই থেকেই ভালো লেগে গিয়েছিলো ছেলেটাকে।এরিকের বয়স তখন ছিলো ১৯।বাচ্চাকাল থেকেই এরিক,এরিদ,আফরিন তিনজনই ছিলো মারাত্নক ধরনের সুন্দর।এরিদের গায়ের রঙ পুরো ফর্সা না হলেও দেখতে কোন অংশেই এরিকের থেকে কম না!সেদিন আদিলের আরো বন্ধু এসেছিলো তবে আনায়ার চোখ গিয়েছিলো এই এরিকেই।তারপর আনায়া আর দ্বিতীয় কোন পুরুষকে ভালোবাসা তো দূরে থাক ভালো লাগার নজরেও দেখতে চায়নি!এরিকের ছবিটার উপর আনায়ার চোখের পানি পড়ছে অনবরত।বিড়বিড় করে সে বলে উঠলো-

“আমাকে একটু ভালোবাসলে কি ক্ষতি হতো ডাক্তার সাহেব।আমার এতো বছরের ভালোবাসাও কি আপনার চোখে পড়েনি?আমি কতোটা ভালোবেসেছি আপনাকে তা কি আপনি বুঝেননি নাকি বুঝেও এড়িয়ে চলেছেন?একটিবার আমার দিকে চোখ তুলে তাকাতেন।কেন দেখলেন না আমাকে কখনো?আপনাকে না পাওয়ার এই ব্যাথা কি করে আজীবন সইবো আমি?”

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ৫+৬

ব্যস আর কিছু বলতে পারলো না।কান্নার আওয়াজ বাড়লো তার কিছুটা।পরিবেশের অবস্থা আরো খারাপ হলো।বাতাসের আওয়াজে মিলিয়ে গেলো আনায়ার কান্নার আওয়াজ।কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি শুরু হলো।আনায়া রুমে আসলো।টিভি বন্ধ করে বারান্দার গ্লাস লাগালো।নিস্তব্ধ ঘরে হঠাৎ করেই মিনমিনে গানের আওয়াজ শোনা গেলো।বিরহিনী আনায়া আওয়াজ শুনলো।তবে ভাবান্তর দেখা গেলো না তার মাঝে।অন্য কোন স্বাভাবিক মানুষ এখানে থাকলে বোধহয় বেশ ভয় পেতো।আনায়ার মোটেও এমন লাগছে না।কারণ সে জানে গানের আওয়াজ কোথা থেকে আসছে।নিজের রুমের দরজা খুললো।বাড়ির ভিতরে সব অন্ধকার।কেবল সোফার রুমে হালকা আলোর একটা লাইট জ্বলছে।সেই আলোয় যতোটুকু দেখলো ততোটুকুতে এগিয়ে গেলো রান্নাঘরের দিকে!

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ৯+১০