দাহশয্যা পর্ব ৮২ (২)
Raiha Zubair Ripti
রাত বাজে আনুমানিক ২ টার কাছাকাছি। বাহিরে তখন ঘন কুয়াশায় আচ্ছাদিত রাজধানী। রাস্তার কুকুর গুলো মাঝেমধ্যে ডেকে উঠছে। হয়তো শীতে নয়তো অপরিচিত মানুষ জনের পায়ের শব্দ শুনে। প্রেমার ঘুম ভাঙলো আচমকা কুকুরের ডাকে। চোখ মেলে পাশ ফিরে তাকাতেই দেখলো শেখর নেই। কোথায় গেছে? নাকি রাতে আসে নি রুমে? আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিল প্রেমা। কিন্তু শেখর রুমে আসলে তো প্রেমা কে না ডেকে চুপ থাকে না। তাহলে নিশ্চিত আসে নি রুমে। লাইব্রেরির রুমে বসে মদ গিলছে? প্রেমা তপ্ত শ্বাস ফেললো। তেষ্টাও পেলো ভীষণ। টেবিল ল্যাম্প টা ডান বা হাত দিয়ে জ্বালিয়ে দেখলো বোতলে পানি রাখা হয় নি আজ। প্রেমা বিছানা ছেড়ে উঠে শরীরে চাদর জড়িয়ে রুম থেকে বের হলো হাতে বোতল নিয়ে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে এসে রান্নাঘর থেকে পানি নিয়ে রুমে যেতে নিবে এমন সময় লাইব্রেরির রুম থেকে শেখরের গলার আওয়াজ শুনতে পেলো। কার সাথে কথা বলছে এভাবে রূঢ়ভাবে?
প্রেমা এগিয়ে গেলো। রুমে কি শ্বশুর আর দেবর আছে নাকি? দরজা লাগানো ভেতর থেকে। প্রেমা দাঁড়িয়ে রইলো দরজার বাহিরে।
লাইব্রেরির মধ্য প্রান্তে এক চেয়ারে বসে আছে শেখর। রুমটাকে লাইব্রেরি বলে ডাকা হলেও আদতে এখানে একটা বইয়ের ছিটেফোঁটাও নেই। আছে কিছু চেয়ার,সোফা,ছোট ছোট ক’টা টিটেবিল। শেখরের ডান হাতে ম’দের গ্লাস। আর অন্য হাতে ফোন,যেটা কানের সাথে ধরা। শেখর জিজ্ঞেস করলো-
“ কাজটা হয়েছে? ”
ওপাশ থেকে জবাব আসলো-
“ হয় নি। সিকিউরিটি প্যানেল সিস্টেম টা আমার ভাবনার চাইতেও অনেক বেশি হার্ড। দু ভাই মিলে কড়া সিকিউরিটি প্যানেল বানিয়েছে। এক সেকেন্ডের জন্যও সরছে না এরা। আর কাউকে ঢুকতেও দিচ্ছে না সভার আগে। সেজন্য মঞ্চে বোমা টা ফিট করতে পারি নি। ”
কথাটা শুনে শেখরের রাগে মাথা ফেটে গেলো বোধহয়। শেখর উত্তেজিত হয়ে বলল-
“ এখন উপায় কি তাহলে? ওরা ম’রবে না! বেঁচে থাকবে! ”
“ না বেঁচে থাকবে না। সরাসরি সভায় উপস্থিত থেকে তারপর মারতে হবো। ”
“ কি করে? ”
“ ছদ্মবেশ ধারণ করে। কিছু লোক ভাড়া করে। আপনি আসবেন? ”
“ না। আমরা গেলে সমস্যা। লোক দিয়েই করাও। ওরা যেন না বাঁচে। একদম পিষে মে’রে ফেলা চাই। ওদের মারতে গিয়ে যদি সভার সবাইকে মার তেও হয় তাহলে মে’রে ফেলো সবাইকে। ”
প্রেমা এতক্ষণ কান পেতে শুনছিলো কথা গুলো। কাউকে মা’রার প্ল্যান করছে শুনে চমকে উঠলো। কাকে মা’রার প্ল্যান করছে শেখর? কার সভা? পায়ের আওয়াজ পেতেই প্রেমা চলে গেলো।
শেখর রুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমে আসলো। বিছানায় প্রেমা কে উল্টো ঘুরে শুয়ে থাকতে দেখে একবার তাকিয়ে পাশে এসে শুয়ে পড়লো।
প্রেমা চোখ মেলে তাকালো। মনের ভেতর কত-শত ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। কাকে মা’রার জন্য প্ল্যান করলো এই নরপশু টা। শেখর প্রেমার জামা ভেদ করে উন্মুক্ত কোমরে হাত রাখতেই প্রেমা শেখরের দিকে ঘুরে বলল-
“ কাকে মারার প্ল্যান করছেন আপনি? ”
শেখর চমকে উঠলো এ কথা শুনে।
“ লুকিয়ে লুকিয়ে কথা শুনছিলে আমার! ”
“ না,পানি আনতে গিয়েছিলাম। তখনই কানে এসেছে। কাকে মা’রতে যাচ্ছেন আপনি? ”
“ তোমাকে। ”
“ তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ বলতে হচ্ছে। ”
“ একদম। শুকরিয়া আদায় করো। ”
“ অবশ্যই। ”
শেখর তার মুখটা প্রেমার কানের কাছে এনে ফিসফিস করে বলল-
“ এত সহজে মারছি না তোমায় ডার্লিং। তবে হ্যাঁ যাকে মারবো তার ইফেক্ট অবশ্যই তোমার উপর এসে পড়বে। ”
প্রেমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো সে কথা শুনে। একটা নামই ভাবনায় আসলো- সোলেমান! সারা রাত ঘুম হলো না প্রেমার। ইচ্ছে ছিলো আজ বাসা থেকে বের হবে। কিন্তু প্রেমা কে বের হতে দেওয়া হলো না। দারোয়ান কে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হলো। প্রেমা যেন বাড়ির বাহিরে পা রাখতে না পারে। প্রেমা বাড়ি জুড়ে পায়চারি করতে লাগলো। শেখর বেরিয়েছে সেই ভোরে,কারো একটা ফোন পেয়ে। প্রেমার অস্থির লাগছে। বাহিরে আজ দুজন সিকিউরিটি গার্ড রেখেছে শেখর। প্রেমা বেলকনিতে এসে দাঁড়ালো। আজকে কি সোলেমান দের কোনো সভা আছে?
এজওয়ান সারা রাত সভার ওখানে ছিলো। নিবাসে ফিরেছে ভোরের দিকে। ক্লান্ত দেহ নিয়ে রুমে প্রবেশ করতেই দেখলো মাহি জাগন্ত। সচারাচর মাহি এত সকালে তেমন একটা উঠে না। আজ জাগন্ত দেখে এজওয়ান বাঁকা চোখে তাকালো। মাহি এজওয়ান কে রুমে ঢুকতে দেখে ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালো। হাতের কাজ শেষ করতে করতে বলল-
“ আপনি এসেছেন..”
এজওয়ান এগিয়ে আসতে আসতে বলল-
“ অপেক্ষায় ছিলে নাকি আমার ফেরার? ”
“ হুম। ”
এজওয়ান অবাক হওয়ার ভান করে বলল-
“ ও মাই গুডনেস টাইপের ব্যপার ঘটলো দেখি এজওয়ানের জীবনে। তার তরিকুলের বেটি তার জন্য অপেক্ষা করছিলো! হাউ ইজ দ্যিস পসিবল! সূর্য কি আজ পশ্চিমে দিক থেকে উঠলো নাকি? ”
এজওয়ান জানালার পর্দা সরিয়ে চেক করে দেখলো।
“ ধূর শালা আজ তো সূর্যই উঠে নি। ”
মাহি বিরক্ত হয়ে বলল-
“ উফ ফাজলামো করবেন না তো। আপনি সভায় যাচ্ছেন কখন? ”
“ দুপুরে। কেনো? ”
“ ওহ্। আমি একটু আপুর বাসায় যাব আজ। ”
“ কি দরকার? ”
“ মায়া কে দেখতে। ”
“ আজ না। কাল যাবে। ”
“ না আজই যাব। ”
“ না বলেছি তো। কথা শোনো আমার। ”
“ আপনি আমার কথা কেনো শোনেন না? আমি ভোর বেলায় চেষ্টা করেছি। আপনাদের গার্ড বের হতে দেয় নি। ”
“ দিবেও না বের হতে। তাই অযথা চেষ্টা করো না। ভাইজান শুনলে রাগ করবে। ”
“ আপনি আপনার ভাইজান কে ভয় পান? ”
“ ভয় আমি কাউকেই পাই না। তবে ভাইজান কষ্ট পাবে এমন কাজ এজওয়ান কখনো করে না। আর কাউকে করতেও দেয় না। তাই তুমি আমার কথা শোনো। কাল যেও যেখানে খুশি সেখানে। বাঁধা নেই। ”
মাহি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল-
“ আচ্ছা। আপনার থেকে পারমিশন প্রত্যাশা করাটাও ভুল ছিলো আমার। আমি ভুলেই গেছিলাম আপনি সব সময় আমার সব মতামতের বিপরীতে চলতে থাকা স্রোত। ”
“ তুমিই ভুল সময়ে চেয়ে বসেছো। অন্য সময় চাইলে এজওয়ান না করতো না। যাই হোক কফি নিয়ে আসো। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। বের হতে হবে। ”
মাহি নিচে চলে গেলো। এজওয়ান ওয়াশরুমে চলে গেলো ফ্রেশ হতে।
মেহরিন ফজরের নামাজ পড়ে কুরআন শরীফ তেলওয়াত করতে বসেছিলো। এমন সময় সোলেমানের গলার স্বর ভেসে আসে। গতকাল অনেক রাত করে বাড়ি ফিরেছিল সোলেমান। মেহরিন জেগেই ছিলো। সোলেমান অবশ্য ফোন করে বলেছিল ফিরতে দেরি হবে। মেহরিন যেন খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। মেহরিন খেয়েছিল তবে ঘুমায় নি। অপেক্ষায় ছিলো। সোলেমান ফেরার পথে সাদা গোলাপ নিয়ে এসেছিল। মেহরিনের লাল গোলাপ তেমন পছন্দ না। পছন্দ সাদা গোলাপ। সোলেমান রুমে ঢুকে দেখলো বউ তার তখন পড়ার টেবিলে বসে পড়ছে। পড়াশোনা নিয়ে ভীষণ সিরিয়াস তার বউ। সোলেমান শিওর বউ তার দেশের মধ্যে সেরাদের প্রথম তালিকায় থাকবে। সোলেমান এগিয়ে এসে মেহরিনের পেছনে দাঁড়ালো। বউ তার ইংলিশ পড়ছে। সোলেমান রুমে প্রবেশ করতেই মেহরিন চিরচেনা সেই পারফিউমের ঘ্রাণ নাকে পেতেই বুঝেছিল সোলেমান এসেছে। পেছন ফিরে তাকায় নি। সোলেমান গলা ঝেড়ে বলল-
“ রাত জাগতে নিষেধ করেছিলাম তো। ”
মেহরিন আগের ন্যায় থেকেই বলল-
“ পড়া কমপ্লিট ছিলো না। সেটাই করছি। ”
“ এখন ওঠো। বই বন্ধ করো। ”
মেহরিন বই বন্ধ করে বলল-
“ খাবার গরম করে নিয়ে আসবো? ”
“ উঁহু খাবো না। ”
কথাটা বলেই সোলেমান মেহরিন কে টনে বিছানায় বসে তার কোলে বসালো। তারপর পকেট থেকে সাদা গোলাপ ফুল টা বের করে মেহরিনের কানের পাশে গুঁজে দিলো। মেহরিন সামনে থাকা মেরোরে দেখলো তা।
“ এই ফুলের মতোই শুভ্র তুমি বিবিজান। আর কত অভিমান করে থাকবে? কষ্ট হচ্ছে তোমার স্বামী জানের। তোমার লাজরাঙা মুখটা দেখে অভ্যস্ত হওয়া স্বামীর জন্য এই শক্ত গম্ভীর মুখ দেখাটা ভীষণ পীড়াদায়ক। বুঝো একটু। সুযোগ দাও। ভালোবাসি। আমাদের ভেতর কোনো থার্ড পারসন কে আসতে দিব না আমি কথা দিলাম। ”
মেহরিন কোল থেকে উঠে গিয়ে কানের পাশে গুঁজে থাকা ফুলটায় গায়ে হাত জড়িয়ে বলল-
“ লাইট নিভিয়ে দিবেন। ঘুম পাচ্ছে ভীষণ। ফজরে উঠতে হবে আবার। ”
মেহরিন গিয়ে শুয়ে পড়লো। সোলেমান আহত চোখে তাকালো। সে তার আগের মেহরিন কে ফিরে পেতে চায়। এমন মেহরিন বড্ড কঠিন। কিছুক্ষণ সেভাবেই বসে থেকে তারপর উঠে লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ে।
সোলেমান ফের ডাকলো মেহরিন কে। মেহরিন আয়াত টা শেষ করে কুরআন শরীফ টা উঠিয়ে রেখে রুমে আসলো। সোলেমান তখন সদ্য গোসল করে বের হয়েছে। পড়নে শুধু সাদা একটা টাওয়াল জড়ানো। চুল দিয়ে এখনও টপটপ করে পানি পড়ছে। এই বেশে সোলেমান কে মেহরিনের মারাত্মক লাগে। দেখলেই কেমন হার্টবিট ফাস্ট হয়ে যায়। মেহরিন চোখ সরিয়ে নিলো। সোলেমান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলল-
“ পাঞ্জাবি টা বের করে দাও। ”
মেহরিন এগিয়ে গেলো আলমারির কাছে। আলমারির পাল্লা খুললো। আলমারির অর্ধেকের বেশি অংশ জুড়ে সোলেমানের জামাকাপড়। লোকটা হয়তো এক পোশাক দ্বিতীয় বার খুব কমই পড়ে। মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-
“ কোন কালার বের করবো? ”
“ সাদা বের করো। ”
মেহরিন সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি বের করে দিলো। সোলেমান সেটা নিয়ে পড়লো। পড়া শেষে হাতে ঘড়ি পড়তে লাগলো সোলেমান। মেহরিন খেয়াল করলো চুল দিয়ে এখনও পানি পড়ছে। মেহরিন তপ্ত শ্বাস ফেললো। ইচ্ছে করে পানি মুছছে না এই লোক। মেহরিন টেনে বসালো খাটে। তারপর টাওয়াল দিয়ে মাথা মুছে দিতে দিতে বলল-
“ আমি সামনে থাকলেই এমন আলসে হয়ে যান কেনো? গোসল শেষে চুল আমাকেই মুছে দিতে হবে? ”
সোলেমান ছোট্ট করে জবাব দিলো-
“ হু। ”
মেহরিন চুল গুলো সেট করে দিলো। এতদিনে জেনে শিখে গেছে সোলেমানের সব। সোলেমান আয়নায় দেখলো নিজেকে। পাক্কা রাজনীতিবিদ লুক। এই লুকেও সোলেমান কে দারুন লাগে। ব্যাডা দেখছি অলরাউন্ডার। পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে যেই লুক নেয় সেই লুকই পারফেক্টলি মিলে যায়। মেহরিন পাঞ্জাবির গলা ঠিক করে দিতে দিতে বলল-
“ ফিরবেন কখন? আজও রাত হবে? ”
“ হুমম। জানোই তো অনেক বড় সভা। অনেক রাজনৈতিক লোকজন আসবে। আসতে দেরি হবে। তুমি একদমই জেগে থাকবে না। খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। দরকার হলে আমি ফিরে ডেকে উঠাবো। মনে থাকবে? ”
“ মনে থাকবে না হয়তো। শুনুন জনকল্যাণের জন্য কাজ করছেন। সেই জনগণের জন্য কখনও হুমকি স্বরূপ হয়ে উঠবেন না। তারা আপনার দিকেই তাকিয়ে থাকে। এত গুলো মুখ এত গুলো আশা,নিরাশ করবেন না কখনও। ”
“ নিশ্চিন্তে থাকতে পারো। আমার এলাকার জনগণের জন্য সোলেমান কখনও হুমকিস্বরূপ হয় না। তার এলাকার জনগণের ভালোমন্দ তার কাছে সবার আগে। আর জনগণ সেটা জানে। সেজন্য তারা আমাকে নির্বাচন করে। সোলেমানের সাথে টক্কর দিয়ে কেউ এই ঢাকা ৮ আসনে এসে দাঁড়ালে কখনও জয়ী হতে পারবে না। তার সময় শ্রম নির্বাচন সবই বৃথা যাবে। ”
“ এই জিনিস টাই ধরে রাখবেন নিজের মধ্যে। অনেক রাজনীতি করা লোকজন শুনেছি অবৈধ পথ অনুসরণ করে টিকে থাকে। খু’ন খারাপি করে। গরিব দুস্থ লোকদের টাকা পয়সা ধন-দৌলত নিয়ে নেয় কেড়ে। আমি চাই আমার স্বামী একজন আদর্শবান নেতা হোক। নিষ্ঠাবান হোক। সে জনগণের হোক। তার জনগণ যেন সব সময় তাকে মনে রাখে। ”
“ সৎ লোক বেশি দিন রাজনীতি তে টিকে না বিবিজান। সরকারের সব কথায় হ্যাঁ তে হ্যাঁ আর না তে না মেলালে এদের গুম খু’ন করে দেওয়া হয়। ”
“ অন্যায়ের সাথে আপোষ করে বেঁচে থাকার চেয়ে ইনসাফের পথে থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে অল্প দিন বেঁচে থাকাটাও একটা প্রাপ্তি সুলতান সাহেব। যাই হোক,আপনি অসৎ পথে রাজনৈতিক করেন না। আমি জানি। জনগণের মুখে আপনার প্রসংশা শুনেছি আমি। আমি এই প্রশংসা টাই শুনে যেতে চাই। ”
“ জানি না কতদিন থাকতে পারবো এভাবে টিকে রাজনীতি তে। তবে আশ্বস্ত করছি। আমার জনগণের কল্যাণ, তাদের ভালোমন্দ আগেও আমার কাছে সব কিছু আগে ছিলো। এখনও আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। ”
মেহরিন জড়িয়ে ধরলো সোলেমান কে। সোলেমান আলতো করে মাথায় চুমু খেলো।
এজওয়ান ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখলো মাহি কফি নিয়ে এসেছে। এজওয়ান টাওয়াল দিয়ে মাথা মুছে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। পড়নে কালো প্যান্ট,কালো গেঞ্জি আর কালো লেদার জ্যাকেট। মাহি বিরক্ত হলো। এসব পড়ে যাবে সভায়?
“ এসব পড়ে যাবেন সভায়? ”
“ কেনো খারাপ লাগছে? জা’ইঙ্গা পিনছি তো আজ। খারাপ লাগার তো কথা না। ”
মাহির চোখ মুখ কুঁচকে আসলো।
“ আপনার ভাইজান কে গিয়ে দেখে আসুন। কি সুন্দর করে পরিপাটি হয়েছে। ”
“ কি পড়েছে ভাইজান? ”
“ পাঞ্জাবি। শুভ্র কালারের। কি সুন্দর লাগছে। আপনি পড়তে পারেন না পাঞ্জাবি? আজকে অন্তত পড়েন। ”
“ কি ব্যাপার বলোতো তরিকুলের বেটি? আজ এতো বউ বউ বিহেভিয়ার করছো। ডাল মে কুছ কালা হ্যে? ”
“ ভালো কথাটাকেও আপনি কিভাবে খারাপ দিকে নিয়ে যান। আমি ভালোর জন্যই তো বললাম। পরিবেশের সাথে ড্রেসআপের একটা ব্যাপার আছে না? ”
“ দুঃখিত,পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলা ছেলে এজওয়ান না। আর ওসব সুশীল পোষাক পড়তে পারবো না। বিকজ অ্যাম নট অ্যা সুশীল লোক। ভাইজান সুশীল সেজন্য পাঞ্জাবি পড়ে। ”
“ আপনি সুশীল হতে পারেন না? ”
“ না,সুশীল গিরী এজওয়ানেরর সাথে যায় না। যাই হোক প্যান প্যান করিও না। তোমার এমন বিহেভিয়ারে আমি অভ্যস্ত না। মনে হয় কিছু ফন্দি এঁটেছ। ”
“ আপনার সাথে কথাই নেই আমার। ”
“ কফির মগ দাও। সুশীল গিরীর কথা শুনিয়ে শুনিয়ে আমার কফি ঠান্ডা করে দিচ্ছো। ”
মাহি এগিয়ে দিলো। এজওয়ান কফি খেতে খেতে বলল-
“ মাহি আমি কিন্তু ওয়ার্ন করে দিচ্ছি। বাড়ির বাহিরে বের হবে না। দুনিয়া উল্টে যাক। কেয়ামত হয়ে যাক। বাহিরে যাবে না। আমি ফেরা না অব্দি। মাথায় যেন থাকে কথাটা। ”
“ জ্বি স্বামী আপনি যাহা বলিবেন। তাহাই মানিয়া চলিবো আমি। ”
এজওয়ান চোখ মুখ কুঁচকে বিরবির করে বলল-
“ শা’লি মাদারবোর্ড একটা। ”
“ কিছু বললেন? ”
“ না তরিকুলের বেটি। কিচ্ছু বলি নি। রেডি হও। ”
মাহি অবাক হলো।
“ রেডি হবো মানে? ”
“ তোমাকে শাকিলের বাড়িতে রেখে আমি রমনায় যাব। ”
মাহি অবাক হয়ে বলল-
“ আপনি না আমায় যেতে নিষেধ করলেন? ”
“ নিষেধ করেছি। কিন্তু তুমি কি তা শোনার মানুষ? ”
“ নিষেধ কেনো করবেন? আমি সচারাচর আপনার কাছে কিছু চাই? ”
“ চেয়ে দেখো, জান কুরবান করে দিব তোমার জন্য। ”
“ দুঃখিত আপনার জানের দরকার নেই আপনার। ”
“ হুমম। অথচ এই জান নিতেই কতজন মরিয়া হয়ে থাকে। ”
“ কি বলছেন বিরবির করে? স্পষ্ট হয় না কেনো কথা? ”
“ কিছু বলি নি। রেডি হও তাড়াতাড়ি। ”
মাহি আলমারি থেকে ব্লাক লেডিস স্যুট বের করলো। সাথে ব্লাক শার্ট-প্যান্ট। এজওয়ান এসব দেখে জিজ্ঞেস করলো-
“ এসব পড়ে যাবা? ”
মাহি ওয়াশরুমে যেতে যেতে বলল-
“ হু। ”
এজওয়ান জানালার সামনে এসে দাঁড়ালো। পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠতেই এজওয়ান সেটা রিসিভ করে বলল-
“ আসছি আমি। ”
মাহি ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে পুরোপুরি রেডি হতে লাগলো। এজওয়ান সোফায় বসে বসে মাহির সেই সাজ দেখছে। সাজ শেষ হতেই এজওয়ান মাহি কে নিয়ে নিচে নামলো।
খাবার টেবিলে মেহরিন সোলেমান, বাশার সুলতান, ইব্রাহিম, ঊর্মি মিলে ব্রেকফাস্ট করছিলো। এজওয়ান আর মাহি কে দেখে বাশার সুলতান বলল-
“ কখন থেকে অপেক্ষা করছি? ঘরে ঢুকলে আর বের হতে ইচ্ছে করে না? ”
এজওয়ান টেবিলে বাপের পাশে বসে বলল-
“ জানোই তো বের হতে ইচ্ছে করে না। তারপরও জিজ্ঞেস করো কেনো অবলা সেজে? নিজের তো ঘরে কেউ নাই। সেজন্য ঘরে থাকতো পারো না। ”
“ অসভ্য ছেলে কোথাকার। যাব একটা কাজে। সেখানেও তার ঢিলেমি করতে হবে। মাহি কোথাও যাচ্ছ নাকি? ”
মাহি খেতে খেতে জবাব দিলো –
“ জি আঙ্কেল। ”
সোলেমান এবার মাথা তুলে এজওয়ানের দিকে তাকালো। সেটা দেখে এজওয়ান বলল-
” ওর বোনের বাসায় যাবে। আমি ওখানে সিকিউরিটির ব্যবস্থা করেছি। সমস্যা হবে না। ”
খাওয়া দাওয়া শেষে এজওয়ান মাহি চলে গেলো এক গাড়িতে। ২য় গাড়িতে সোলেমান আর বাশার সুলতান যাবে। ইব্রাহিম যাবে না। সোলেমানই যেতে নিষেধ করেছে। সভায় উল্টাপাল্টা কিছু হলে বেচারার উপর যেন কোনো আচ না আসে। বউ পোয়াতি। সব দিক বিবেচনা করেই সোলেমান এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সোলেমান বউয়ের থেকে বিদায় নিলো। আর বারবার করে বলে গেলো – রাত জাগবে না। ঊর্মি ইব্রাহিম কে বললো দেখে রাখতে।
মেহরিন সদর দরজা অব্দি আসলো। তারপর আর সোলেমান আসতে দিলো না। মেহরিন ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। স্বামী আজকের দিনটা যেন সুস্থ ভাবে সম্পূর্ণ হয়।
গাড়ি চলছে দ্রুত গতিতে। মাহি কাউকে একটা মেসেজ পাঠালো ফোন দিয়ে। তারপর ফোন টা ব্যাগে ভরে বলল-
“ আমি ক্যাব বুক করে কিন্তু চলে যেতে পারতাম। ”
” হ্যাঁ পারতে তবে আমি স্বস্তি তে থাকতে পারতাম না। ”
“ অস্বাভাবিক কথাবার্তা বলবেন না তো। ”
“ অস্বাভাবিক লাগছে? ”
“ তা নয় তো কি? ”
“ নিমকহারামের জাত যে তুমি। সেজন্য অস্বাভাবিক লাগছে। কৃতজ্ঞতা বলতে কিচ্ছু নেই। ”
“ থ্যাংকস স্যার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আপনার কাছে। আমার কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করে বাধিত করুন।”
” পা টা বাড়িয়ে দেই? ”
“ পা ধরে জানাতে হবে? ”
“ না। ”
“ তাহলে কি জন্য? ”
এজওয়ান বিরবির করে বলল-
“ লাত্থি দিয়ে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়ার জন্য। ”
“ আবার বিরবির করছেন! ”
“ না বিরবির করছি না। আমাদের বিয়ের বয়স কত জানো? ”
“ দেড় বছর হলো বোধহয়? ”
“ এগজ্যাক্টলী জানো না কত? ”
” না। ”
“ বিয়ে করছি কয় তারিখে আমরা? ”
“ জুলাইয়ের কোনো একটা তারিখে। তারিখ মনে নেই। ”
” জুলাইয়ে ১৮ তারিখে আমরা বিয়ে করেছি। দুপুর ২ টা ১৫ মিনিট ২২ সেকেন্ডে। ”
“ ওহ্ আচ্ছা। ”
“ হু। এই দেড় বছর সংসারে তুমি আমার জন্য কখনও কিছু করেছো তরিকুলের বেটি? এই যেমন ভাবি ভাইজানের জন্য একজন বউ হিসেবে যা যা করে। ”
মাহি ভেবে দেখলো। আসলেই সে কিছু করে নি এজওয়ানের জন্য। না মেহরিনের মতো সে এজওয়ানের ফেরার অপেক্ষা করছে। না না খেয়ে এক সাথে খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছে। আর না কোনো বউয়ের দায়িত্ব পালন করেছে। এজওয়ান কে স্রেফ মাহির কাছে একটা টর্চার মনে হয়। কখনও এজওয়ানের দিকে এক মিনিট তাকিয়ে থাকে নি মাহি। কখনও ভালো করে কথা বলে নি। এজওয়ানের সকল কথা কাটার মতো বিঁধে মাহির কানে। তার চেয়েও বড় কথা এজওয়ান কে তার ঘৃণা লাগে। সেই ঘৃণার কারনেই হয়তো নজর দেয় না।
এজওয়ান মাহিকে চুপ থাকতে দেখে ঠোঁটের কোনে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো। স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে এজওয়ান বলল-
“ কিচ্ছু করো নি তুমি আমার জন্য। একটা সেকেন্ডের জন্যও না। আমি তোমার চোখে একজন ঘৃণিত ব্যক্তি। অবশ্য কাজটাই এমন করেছি যে ঘৃণা করা জায়েয। এখন আমারও সোহমের মতো বলতে ইচ্ছে করছে- এই দেড় বছর সংসারে তোমার আমার প্রেম, আমি আজও বুঝিনি। ঐ চোখের চাওয়াতে, প্রেম আজও দেখিনি। দুরে তবু দূরে,সরে থাকতে পারিনি কাছে এসে কেন,কাছে আসতে পারিনি। আমি আজও বুঝিনি,আমি আজও বুঝিনি। ”
এজওয়ানের দৃষ্টি সামনে রাস্তায়। মাহি নড়েচড়ে বসলো এবার।
“ অনেস্টলি বলতে আমার কাছে আপনি স্রেফ একটা টর্চারের মতো এজওয়ান। আর আমি টর্চার নিতে পারি না। টর্চার দেওয়া মানুষজনও না। এজন্য আমরা কোনো সুস্থ স্বাভাবিক দম্পত্তি না। ”
এজওয়ান সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে বলল-
“ আমি খুব ঝগড়া করি তোমার সাথে তাই না? মিস বিহেভ ও করি, টর্চার ও করি? ”
“ হু। প্রচুর ঝগরুটে আপনি। একটা কথাও মাটিতে ফেলতে দেন না। ”
“ অভ্যাস হয়ে যায় নি এতো দিনে? ”
“ ভেবে দেখি নি এটা। ”
এজওয়ান ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালো মাহির দিকে। কেমন একটা গলায় বলল-
“ মানুষ তো অভ্যাসের দাস। এতদিনে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কথা। আচ্ছা তরিকুলের বেটি। ”
“ হু। ”
“ আমি ম’রে গেলে তখন ঝগড়া করবে কার সাথে তুমি তরিকুলের বেটি? কে তোমায় আমার মতো করে এভাবে জ্বালাবে? কে তোমাকে এভাবে ভালোবাসার নামে টর্চার করবে? মিস করবে না আমায়?নাকি আমি ম’রার সাথে সাথে তুমি সাফওয়ান সাহেবের কাছে চলে যাবে? ”
মাহি চমকালো আকস্মিক এমন কথা শুনে। ভ্রু কুঁচকে বলল-
“ কি আশ্চর্য মরতে যাবেন কেনো? ”
“ পৃথিবীতে ভালো মানুষ বেশিদিন বাঁচে না তরিকুলের বেটি ।শা’লার আমি তো আবার একদম নিরীহ ভালো মানুষ, বুঝলা? আমার এই বেঁচে থাকা হয়তো পৃথিবীর পছন্দ হবে না। আমি চলে গেলে পৃথিবীর, তোমার দুজনেরই স্বস্তি হবে। তুমি কি আমারে মিস করবা না তখন তরিকুলের বেটি? কও সত্য কথা কও আজ। কাউরে বলমু না আমি। তুমি তো মন খুলে কিছুই কও না আমারে।
“ মন খুলে কথা বলার পরিস্থিতি আদোও আপনার আমার ভেতর কখনও ছিলো? আপনি হতে দিয়েছেন তেমন পরিস্থিতি?
“ এখানেও আমার দোষ তরিকুলের বেটি? অবশ্য তোমার চোখে তো আমার দোষ ছাড়া কিছুই নজরে আসে না। তুমি তরিকুলের বেটি একদিনের জন্য হলেও কি আমারে ভালোবাসতে পারবা না? জাস্ট একদিনের জন্য বাসো। তোমার চোখ মুখে আমার জন্য ভালোবাসা না দেখে মরলে শা’লা আমি মরেও শান্তি পাবো না।
মাহির বিরক্ত ধরে আসলো এসব কথা শুনে।
“ এমন ভাবে কথা বলছেন। মনে হচ্ছে আপনার মৃ’ত্যু অতি সন্নিকটে। ”
“ মৃত্যুর কি আর কোনো গ্যারান্টি আছে? হতেই তো পারে আজই আমার শেষ দিন। আমাদের আর দেখা নাও হতে পারে। ”
“ আপুর বাসার সামনে চলে এসেছি। গাড়ি থামান। ”
এজওয়ান তাকিয়ে দেখলো শাকিলের বাসার সামনে তারা। ঠোঁটের কোনে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো। তরিকুলের বেটি এজওয়ান কে কখনই বুঝবে না। মাহি গাড়ি থেকে নেমে চলে গেলো ভেতরে। একটা বারও ফিরে তাকালো না পেছনরে দিকে। মাহি চলে যেতেই এজওয়ান দীর্ঘ একটি শ্বাস ফেলে পকেট থেকে ফোনটা বের করে কাউকে ফোন দিয়ে বলল-
“ মাহি যেন খবরদার বাসা থেকে বের হতে না পারে। বাড়ির চারদিকে কড়া নজরদারি থাকে যেন। আমার কানে যদি খবর আসে মাহি বাড়ির বাহিরে এসেছে তাহলে ভয়ংকর কিছু হবে বলে রাখলাম। ”
এজওয়ান ফোনটা কে’টে গাড়ির সিটে মাথা ঠেকিয়ে দিলো। বিরবির করে শুধালো-
“ তরিকুলের বেটি…❝ আমাকে মেরে ফেলার জন্য
তোমার কত শত আয়োজন, কত শত ছলনা…
অথচ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমার
নিজের সাথে নিজেরই আমরণ যুদ্ধ ঘোষণা …❞ যা তুমি কখনই জানবে না….. ”
রমনা আজ মানুষের সমাগমে ভরে উঠেছে। ৮ আসনের সবাই হয়তো চলে এসেছে। এজওয়ান এখনও আসে নি। সোলেমান বাশার সুলতান এসেছে। বড় বড় মন্ত্রীও আসা শুরু করেছে গাড়ি করে। সাফওয়ান এসেছে। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এজওয়ানের সুরক্ষার জন্য। এজওয়ানের গায়ে যেন একটা আঁচ ও না আসে। এদিকে সেই লোক কোথায় কে জানে।
ডিজিএফআই থেকেও সিক্রেট টিম পাঠানো হয়েছে। যারা সিভিল ড্রেসে। কিন্তু Aj অনুপস্থিত। সিক্রেট টিমের একজন ডিজিএফআইয়ের প্রধান কে ফোন করে বলল-
“ Aj কি এসেছে? আমাদের সাথে কন্টাক্ট করে নি। আসবে কি সে এভাবে সবার সামনে? ”
“ ফোনে জানালো তো সে আসছে। না আসলে তোমরা তার আশায় বসে থেকো না। সে আসলে তার মতো করে সে থাকবে। তোমাদের সাথে কন্টাক্ট করবে না। ”
“ ঠিক আছে। ”
কথাটা বলে রেখে দিলো। বিরক্ত ধরে গেছে। কে এই Aj? এতো ঢং কেনো সামনে আসতে? যত্তসব। তারা কি সামনে থেকে কাজ করছে না?
মাহি শাকিলদের বাড়িতে ঢুকেই দেখলো তার বোন একগাদা জামাকাপড় ভিজিয়েছে। সাথে রাতের জন্য রান্নার ব্যবস্থাও করছে। মায়াটা কোলে। মাহি সেটা দেখে মায়াকে কোলে নিয়ে বলল-
“ এ কি অবস্থা আপু? ম্যেড কোথায়? একা কাজ করছো মায়া কে রান্না ঘরে নিয়ে যে? ”
মোহনা চুলায় ডাউল বাগার দিতে দিতে বলল-
” আর বলিস না। আজ ম্যেড আসে নি। আসবে না তাহলে ফোন করে জানাবে না? আমি দু বালতি জামাকাপড় ভিজিয়েছি। সকালে কোনো রকমে হাল্কা পাতলা নাস্তা খাইয়ে পাঠিয়েছি তোর ভাইকে। তুই এসেছিস ভালোই হয়েছে। একটু মায়া কে সামলা। আমি তাড়াতাড়ি কাজকর্ম গুলো সেরে ফেলি। ”
“ তাড়াতাড়ি করো। আমি এক জায়গায় যাব। ”
“ কোথায় যাবি? ”
“ কাজ আছে একটু। তুমি তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করো। আমি মায়াকে দেখছি ততক্ষণ। দেরি করো না। আমাকে কিন্তু বের হতে হবে ৪ টার দিকে। ”
মোহনা ঘড়িতে সময় দেখলো। বাজে এখন সাড়ে ৩ টা। আধঘন্টায় তো তার কাজ শেষ হবে না। তারপরও বলল-
“ ঠিক আছে। এখন যা। ”
মাহি মায়াকে কোলে নিয়ে রুমে আসলো। কতক্ষণ রুমে থেলে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখলো বাড়ির সামনে কিছু অপরিচিত কালো স্যুট ব্যুট পড়া লোক দাঁড়িয়ে আছে। কারা এরা? এজওয়ানের লোক? লোকটা লোক রেখেছে বাড়ির সামনে যাতে মাহি এখান থেকেও বের হতে না পারে। পাগল লোক একটা। মাহি হাত ঘড়িতে সময় দেখলো। ৪ টা বেজে গেছে। মাহি নিচে আসলো। বোনের কাজ এখনও শেষ হয় নি। মাহি তাড়া দিয়ে বলল-
“ হয় নি আপু? ”
“ না রে। ”
“ আর কতক্ষণ? ৪ টার বেশি বেজে গেছে। ”
“ তোর খুব তাড়া থাকলে তুই চলে যেতে পারিস মাহি। মায়া কে ফ্লোরে বসিয়ে রেখে যা। ”
মাহির খারাপ লাগলো। তার বোন এক হাতে সামলাতে হিমশিম খেয়ে যাবে। মাহি সোফায় বসলো। পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে মেসেজ পাঠিয়ে দিয়ে বলল-
“ আমি আসতে পারবো না। আপনারা করুন কাজটা ঠিকমতো। দেখেশুনে পা ফেলবেন। ”
মাহি মায়া কে নিয়ে খেলতে লাগলো। মোহনা রান্নাবান্না শেষ করে ওয়াশিং মেশিনে ফটাফট করে জামাকাপড় গুলো ধুয়ে শুকাতে দেয়। তখন সন্ধ্যার আজান দিলো। মোহনা ছাঁদে জামাকাপড় গুলো শুকিয়ে দিয়ে বোনের পাশে এসে বসলো ক্লান্ত শরীর নিয়ে। মাহি তখনও মায়াতে মশগুল। মাহি কিসব বলছে আর মায়া হেঁসে উঠছে। সেই হাসি দেখে মাহিও হাসছে। মোহনা বলল-
“ এবার তোরও একটা বাচ্চা হোক। ”
মাহি কথা শুনতে পেতেই বলল-
“ না। ”
“ কি না? ”
“ বাচ্চা চাই না আমি। ”
“ কেনো? ”
“ এমনি। ”
মোহনা হাত বাড়িয়ে রিমোট টা নিয়ে টিভি অন করলো। কার্টুনের চ্যানেল দেওয়া ছিলো। মায়া কার্টুন দেখে। এখন মায়া তার খালা মনির সাথে খেলতে ব্যস্ত দেখে মোহনা চ্যানেল বদলিয়ে খবরের নিউজ দিলো। আজকাল দেশের কোনো খবরই রাখা হয় না। নিউজ দেখছিলো। আকস্মিক পর্দা জুড়ে ভেসে উঠল স্ক্রিনের নিচে লাল অক্ষরে ঝলসে উঠা ব্রেকিং নিউজ। রমনায় আওয়ামী লীগের সভায় গ্রেনেড, বোমা আর গুলিবর্ষণ। শতাধিক মানুষ হতাহত। নিহতের সংখ্যাও কম নয়।
খবরটা কানে যেতেই মাহি চমকে উঠলো। শরীরটা কেঁপে উঠল। সে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল টিভির দিকে। পর্দায় রমনার ছবি। ধোঁয়ায় ছেয়ে আছে পুরো এলাকা। কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। মানুষের আর্তচিৎকার, দিগ্বিদিক ছুটে চলা ছায়ামূর্তি। হঠাৎ দূরে একজন লোককে দেখা গেল হাতে বন্দুক। কাউকে লক্ষ্য করে তাক করে আছে।
ধোঁয়াটা একটু হালকা হতেই মাহির বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে গেল। ওই যে সাফওয়ান!স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বন্দুকের নলটা ঠিক তার দিকেই তাক করা। সাফওয়ান কে মারার জন্য ঐ লোক বন্দুক তাক করেছে! মুহূর্তের মধ্যে মাহির পৃথিবীটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। শ্বাস নিতে ভুলে গেল সে। আর পরের দৃশ্য দেখার সাহস হলো না। কাঁপা হাতে মায়াকে মোহনার কোলে তুলে দিয়েই কাউকে ফোন করতে করতে পাগলের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মোহনা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। বোনকে এমন উন্মাদের মতো ছুটে যেতে দেখে সে মায়াকে কোলে নিয়েই উঠে দাঁড়াল। ঠিক তখনই টিভির শব্দ কানে এসে আছড়ে পড়ল।
দাহশয্যা পর্ব ৮২
“সিআইডি অফিসার সাফওয়ান মির্জাকে বাঁচাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ঢাকা ৮ আসনের এমপি নওয়াজ সোলেমান সুলতানের ছোট ভাই এজওয়ান সুলতান। অবস্থা আশঙ্কাজনক। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। গুলিটি বুক বরাবর বিদ্ধ হয়েছে। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। বাঁচা-মরার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত। ”
মোহনা তাকিয়ে দেখলো। ঐ তো ভিডিও তে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে গুলিটা গিয়ে বিঁধলো এজওয়ানের বুকে। ঘটনাটা বিকেল ৫ টার দিকে ঘটেছে। এখন বাজে সাড়ে সাতটা!
