দাহশয্যা পর্ব ৯২ (২)
Raiha Zubair Ripti
রুমাইসার মৃত্যুর পর সবাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারলেও তেহরানের পক্ষে সম্ভব হয় নি। কেমন একটা অসুস্থ হয়ে গেছে। রুম ছেড়ে বের হয় না। কারো সাথে কথা বলে না। তবে এক একা কথা বলে। হাসে আবার কাঁদে। তানজিলা বেগম ছেলের এই দশা সহ্য করতে পারছেন না। সেজন্য সোলেমানের বলা অনুযায়ী ছেলেকে জাপান পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। তেহরান কে একা পাঠাবে না। সাথে বাবা আলমগীর ও যাবে। ভালো ডক্টর দেখাবে ওখানে গিয়ে। এই দেশে আর ফেরার দরকার নেই বছর কয়েকের মধ্যে আর।
আজ সন্ধ্যায় ফ্লাইট। তেহরান যাবে না দেশ ছেড়ে কিন্তু মায়ের কথা বাবার কথা তাকে এক প্রকার বাধ্য করলো দেশ ছেড়ে তার রুমাইসা কে ছেড়ে চলে অন্য দেশে চলে যাওয়ার জন্য। এয়ারপোর্টে যাওয়ার আগে সে শেষবার সুলতান নিবাসে আসে। সুলতান নিবাস টা আজকে ফাঁকা। কবরের উপর আশেপাশে পাতা জমেছে। তেহরান সেই পাতা গুলো পরিষ্কার করলো। তারপর বসলো কবর ঘেঁষে। কিছুক্ষণ আলতো করে হাত বুলালো। তারপর জড়িয়ে ধরে মাথা রাখলো। ফিসফিস করে বলল-
“ এ্যই মেয়ে শুনছো? কেমন আছো? আমি কিন্তু ভালো নেই। শুনো না। আমি না চলে যাচ্ছি। বাবা মা পাঠিয়ে দিচ্ছে আমাকে তোমার থেকে অনেক দূরে। আমার কষ্ট হচ্ছে খুব। তুমিও চলো সাথে। যাবে? আমরা ওখানে সংসার পাতবো। আর আসবো না দেশে। যাবে? চলো না যাই একসাথে। কি হলো জবাব দাও? যাবে না তাহলে? আচ্ছা যেতে হবে না। আমি একাই চলে যাব তাহলে। তুমি তো আমাকে ভালোইবাসো না। সহ্যও করতে পারো না। তূর্ণ কে ভালোবাসো। আমাকে এই তেহরান কে ভালোবাসলে কি হতো? পঁচা মেয়ে একটা। কথা তো বললে না। শুনো আমি আবার আসবো হু? সুস্থ হয়েই চলে আসবো। তারপর তোমার সাথে থাকবো। তোমার ভাইদের বলবো আমাকে এই বাড়ির এক কোনায় থাকতে দেওয়ার জন্য। রোজ পাহারা দিব তোমাকে। কথাও বলবো। তুমি কথা বলবে তো? ”
নিবাসের গেটের বাহির থেকে আলমগীর হোসেনের গলার স্বর ভেসে আসলো। ছেলেকে ডাকছে। ফ্লাইটের সময় হয়ে আসছে যে। বাবার ডাক শুনে তেহরান উঠে দাঁড়ালো। শরীরের জামাকাপড় মাটি দিয়ে ভরে গেছে। তেহরান শেষবার কবরের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ এ্যই আসছি। ভালো থেকো হু? আবার দেখা হবে আমাদের। খোদা হাফেজ। ”
তেহরান চলে যেতে যেতে বিরবির করে ঠোঁটের কোণে আওড়ালো…
~কেন পিরিতি বাড়াইলা রে, বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি?
কেমনে রাখিবো তোর মন
আমার আপন ঘরে বাঁধি রে, বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি?
মরম-জ্বালা সইতে না’রি
দিবানিশি কাঁদি রে, বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি….
নিবাসের বাহিরে আসতেই আলমগীর হোসেন দেখলেন ছেলের সারা শরীর মাটি দিয়ে ভরা। হাত দিয়ে পরিষ্কার করে দিলেন ছেলের শরীরের মাটি। হুট করে তেহরান বাবার পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ে কান্না করতে করতে বলল-
“ আমি না যাই আব্বু? থাকি না? থাকি না এখানে। আমি থাকতে পারবো না। বিশ্বাস করো একটুও থাকতে পারবো না। মরে যাব। কষ্ট দিয়ে না মেরে একেবারে মেরে ফেলো। তারপরও নিয়ে যেও না।”
দু চোখ ভরে আসলো ছেলের আহাজারি তে। কিন্তু ছেলের কথা শুনলে তো চলবে না। ছেলেকে ধরে গাড়িতে উঠিয়ে চলে গেলো এয়ারপোর্টের দিকে।
রাতের দিকে মহাদেবপুর, মেহরিন দের বাড়িতে এসেছে ইয়াসিন। মেহরিন তখন রাতের খাবার খেয়ে একটু শুয়েছিল। গতকাল থেকে সোলেমান একবারের জন্যও ফোন দেয় নি মেহরিন কে। মেহরিনের দিনকাল কেমন যেন বিবর্ণ রঙচটা হিসেবে যাচ্ছে।
ইয়াসিন কে সদর দরজায় দেখে সানজিদা বেগম ভেতরে আসতে বললো। হাল ছেড়ে বাতাসি কে ডেকে জানালো ইয়াসিন এসেছে।
বাতাসি খেয়ে কেবলই রুমে এসেছে। আকস্মিক সানজিদা বেগমের গলায় এমন কথা শুনে ভারী চমকালো। দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখলো। বাজে সাড়ে ১১ টা। হুট করে এই লোক এখানে এসেছে কেনো? কি দরকার?
বাতাসি চুপচাপ রুম ছেড়ে বের হলো। বসার ঘরে আসতেই দেখলো ইয়াসিন সোফায় বসে আছে। রান্না ঘরে ফ্রিজে তুলে রাখা খাবার গুলো গরম করছে সানজিদা বেগম। ইয়াসিন বাতাসির উপস্থিতি টের পেয়ে মাথা তুলে তাকালো। কিছু বলবে এমন সময় সানজিদা বেগম বোনের ফোন পেয়ে বাতাসি কে গরম করা খাবার গুলো নিয়ে ইয়াসিন কে খেতে দিতে বলে রুমে গেলো।
বাতাসি টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসে রইলো। ইয়াসিন কে ডাকলো না। ইয়াসিন নিজেই চেয়ার টেনে বসে বলল-
“ তুমি খাইছো?”
বাতাসি হা না কিছুই বললো না। ইয়াসিন আস্তেধীরে খেলো খাবার। খাওয়া শেষ হতেই সানজিদা বেগম এসে ইয়াসিন আর বাতাসিকে বলল নিচ তলার রুম পরিষ্কার করে রেখেছে। ওখানে শুয়ে পড়তে। ইয়াসিন নিচ তলার রুমে এসে বাতাসির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। কিন্তু বাতাসি গেলো না। সে মেহরিনের রুমে এসে দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়ে।
বেচারা ইয়াসিন অনেক রাত অব্দি অপেক্ষা করেছে। দোতলায় এসে দেখেছে, দোতলা ফাঁকা, কেউ নেই। মেয়েটা তারমানে মেহরিনের রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ছে। ইয়াসিন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লো।
ভোরে উঠে মেহরিন ফজরের নামাজটা পড়ে আবার শুয়ে পড়েছে। বাতাসি সানজিদা বেগমের হাতে হাতে সকালের নাস্তা বানাচ্ছে। পাশের বাড়িতে কাঁচা আম,তেঁতুল বিক্রি করছে দেখে সানজিদা বেগম একটু সেদিক পানে গেলো। মেহরিনের জন্য আচার বানাবে। তাদের গাছে এবার তেমব আম ধরে নি। যা ধরেছে ওগুলো ইষ্টি বাড়িতে দিলেই শেষ হয়ে যাবে।
মোতালেব ভুঁইয়া বসার ঘরে এসে পকেট থেকে ফোনটা বের করে টেবিলের উপর রেখে সোফায় বসে টিভিটা ছাড়লেন। আজকাল খবর দেখা হচ্ছে না তার। দেশের কি যে পরিস্থিতি! জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়া শুরু করছে। খবরের চ্যানেল অন করলেন। কিছুক্ষণ বাংলাদেশী খবর শুনলেন। এখন আন্তজার্তিক খবর আসতেই বাহির থেকে সানজিদা বেগম ডেকে কিছু টাকা নিয়ে আসতে বললেন। মোতালেব ভুঁইয়া রুম থেকে টাকা নিয়ে পাশের বাড়িতে গেলেন।
ইয়াসিন ঘুম থেকে উঠে বসার ঘরে এসে রান্না ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো বাতাসি একা কাজ করছে। গলা ঝেড়ে এক মগ কফি চাইলো। বাতাসি চুপচাপ বানিয়ে সামনে টেবিলের উপর রেখে গেলো। ইয়াসিনের ভ্রু কুঁচকে আসলো। কফির মগ হাতে নিয়ে তাতে চুমুক দিয়ে ফের বাতাসি কে ডাকলো। বাতসি আসলো না। ইয়াসিনের রাগ যেন তরতর করে বেড়েই চলছে। কফির মগ শব্দ করে টেবিলে রেখে রান্মা ঘরে চলে গেলো। বাতাসির বাহু শক্ত করে চেপে ধরে বলল-
“ এই মেয়ে এই সমস্যা কি তোমার? ইগনের করছো? আমাকে? এই ইয়াসিন কে ইগনোর করছো তুমি?”
বাতাসি হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল-
“ ছাড়ুন আমাকে। রান্না চুলায়। ”
“ না ছাড়বো না। কাকে এই অ্যাটিটিউড দেখাচ্ছ তুমি? কিসের জন্য দেখাচ্ছ? তোমার এই অ্যাটিটিউড দেখার জন্য কি আমি বসে আছি?”
“ অ্যাটিটিউড দেখাবো! তাও আবার আমার মতো কালো মেয়ে! হাস্যকর কথাবার্তা বলছেন। ”
“ তাহলে এই ভাব কাকে দেখাচ্ছ তুমি? একটু ভালো ভাবে এখন কথা বলছি দেখে কি বেড়ে গেছে? ভাব দেখানো শুরু করছো? এই নিজেকে আয়নায় দেখেছো? না আছে রূপ না আছে যোগ্যতা। সেই তুমি আমাকে ভাব দেখাও? ফোন দিলে ফোন ধরো না। সুইচঅফ বলে। কাল এসে থেকে দেখছি কথাবার্তা বলছো না। সমস্যা কি? তোমার সাথে কি খেজুরে আলাপ করার জন্য এসছি আমি?”
“ কেনো এসেছেন আপনি?”
“ উকিলের কাছে গিয়েছিলাম। ডিভোর্স পেপার বানাতে তোমার বাপ মা তোমার সকল তথ্য লাগবে। আমি কি জেনে বসে আছি সেগুলো? সেগুলোর জন্যই ফোন দিচ্ছিলাম। তোমাকে আমার জীবন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারলে বাঁচি। উটকো ঝামেলা কাঁধে নিয়ে বেড়াচ্ছি। শ্বাস আঁটকে আসে বুঝছো? কি হলো বুজছো? ”
বাতাসির শরীর ঝাঁকিয়ে কথা গুলো বললো। বাতাসি ঝাড়া দিয়ে হাত সরিয়ে দিয়ে বলল-
“ ঘৃণা লাগে আমাকে আপনার তাই না?”
ইয়াসিন হকচকিয়ে গেলো। কিন্তু রাগ কন্ট্রোল করতে পারছে বা। মুখে যা আসছে বলে দিচ্ছে।
“ ঘৃণা লাগলেই বা কি? কি করতে পারবে তুমি? ”
“ কিছু করার ক্ষমতা তো আল্লাহ আমাকে দেয় নি। দিলে অবশ্যই আপনার জীবন থেকে আমার সব স্মৃতি মুছে দিতাম। আপনার কাউকে পছন্দ হয়েছে?”
“ না। ”
“ মিথ্যা বলবেন না খবরদার। ”
“ হু আর ইউ? কে তুমি? যে তোমাকে আমি মিথ্যা বলবো? আর গলার স্বর এত বড় হচ্ছে কেনো? থাপ্পড় খাবে আমার হাতে? ”
“ আমি আপনাকে ভালো ভেবেছিলাম। ”
“ সেটা তোমার ব্যক্তিগত বিষয়। আমি যা তাই দেখিয়েছি তোমায়। ”
“ কিন্তু আপনি তো একজন দুশ্চরিত্র পুরুষ। ”
“ মুখ সামলে কথা বলো বাতাসি। গায়ে হাত তুলতে বাধ্য করো না বলে রাখছি। আমাকে দুশ্চরিত্র পুরুষ বলো কোন সাহসে? তুমি নিজে কি? ”
“ আমি নিজে কি? কালো,অসহায়,এতিম,অভাগী যার দিন দুনিয়ায় কেউ নেই। আমার চরিত্রে কোনো কলঙ্ক নেই আপনার মতো। ”
“ রাগীও না আমাকে বাতাসি। ঠাণ্ডা মাথায় কথা বলছি। হয়েছি কি তোমার? ডিভোর্স চাও না? ”
“ চাই, চাই। আমি ডিভোর্স চাই। মুক্তি চাই আপনার থেকে। আপনার মতো জঘন্য এক কাপুরষ লোকের বউ হয়ে আর থাকতে চাই না কাগজে কলমে। দম বন্ধ হয়ে আসছে আমারও। পাপের বোঝার থেকেও ভারী লাগছে এই সম্পর্ক। ”
আবারও জঘন্য সাথে কাপুরুষ বলছে! ইয়াসিন চেপে ধরলো মুখটা।
“ খুব বুলি ফুটেছে দেখছি মুখে! নতুন কাউকে জুটিয়েছো নাকি? নতুন ঠিকানা পেয়েছো থাকার জন্য? সেজন্য এখন দম বন্ধ লাগছে? কোথায় পেলে শুনি? কে করলো তোমার মতো কালো মেয়েকে পছন্দ? কিসের লোভে? কি আছে তোমার? কিছুই তো নেই,তাহলে? তাহলে বলো কিভাবে কি হলো? বশ করেছো কাউকে? সে আমার থেকেও রিচ? আমার থেকেও সুন্দর? সেজন্য এখন তোমারও আমার থেকে ডিভোর্স চাই? কি হলো বলো? উত্তর দাও। ”
“ যে যেমন, সে সবাইকে তেমনটাই ভাবে। যেমনটা আপনি এখন ভাবছেন। আপনার সাথে তো কথা বলতেও আমার ঘৃণা লাগে। আপনার কালো রং পছন্দ, কালো রঙের পোশাক পছন্দ,কালো মেঘ পছন্দ, ঘোর অমাবস্যার রাত পছন্দ,রাস্তার কালো রঙের কুকুর টাকেও অব্দি আপনার পছন্দ,শুধু পছন্দ হলো না এই কালো বর্ণের বাতাসি কে! সেজন্য ডিভোর্স অব্দিও অপেক্ষা করতে পারলেন না! আমার স্কুলের ম্যামের সাথে পরকীয়া করা শুরু করে দিলেন! আপনি আমাকে কি ডিভোর্স দিবেন। আমি বাতাসিই আপনাকে ডিভোর্স দিয়ে দিলাম যান। সেই সাথে আমি বাতাসি আপনাকে আজ দোয়াও দিলাম। আপনার ঘরেও যেন একটা কালো বর্ণের বাতাসির জন্ম হয়। কোনো এক পুরুষ যেন তাকেও আপনার মতো করে অবহেলা করে। উঠতে বসতে গায়ের রং নিয়ে কথা শোনায় পরকীয়ার মতো নোংরা কাজও করে। তখন আপনি নিশ্চয়ই বাবা হয়ে টের পাবেন কালো বাতাসির আজকের করা এই আর্তনাদ গুলো। তখন আপনার মনে পড়বে আপনি স্বামী হিসেবে আমাকে ঠিক কতটা অবহেলা অপমান করেছেন। আল্লাহ ছাড় দেয়, কিন্তু ছেড়ে দেয় না। আজ সময় আপনার। আর সেদিন সময় হবে আমার। আমিও দেখতে চাই বাবা হিসেবে সেদিন ইয়াসিন আহমেদ কিভাবে তার মেয়ের সেই আহাজারি গুলো সহ্য করে। টিট ফর ট্যাট বলে একটা কথা আছে জানেন নিশ্চয়ই? ”
ইয়াসিন ছেড়ে দিলো রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে। সে বাতাসির ম্যামের সাথে পরকীয়া করছে! আর সেটা ইয়াসিন নিজেই জানে না!
মেহরিনের শরীরটা সেই সকাল থেকেই কেমন যেন অস্বস্তিতে ভরা ছিল। বুকের ভেতরটা অকারণে ধুকপুক করছিল, মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। উপরে নিজের ঘরে শুয়ে ছিল সে, কিন্তু নিচতলা থেকে বাতাসি আর ইয়াসিনের তর্কের আওয়াজ বারবার কানে এসে লাগছিল।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানা ছেড়ে উঠলো সে। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো। বসার ঘরে এসে দেখলো, আশেপাশে কেউ নেই। অথচ টিভি চলছে। বিরক্তি নিয়ে রিমোটটা হাতে নিতে গিয়েই হঠাৎ চোখ পড়লো টেবিলের উপর রাখা ফোনে।
ফোনটা বেজে উঠলো ঠিক তখনই। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো নাম,বাশার সুলতান।
মেহরিন থমকে গেলো। চাচা হঠাৎ ফোন করলেন কেন? চারদিকে তাকালো সে। বাবা কোথায়?দেখা যাচ্ছে না তো। ফোন কেটে যাবে এমন সময় মেহরিন ফোনটা রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে অস্থির ভাঙা গলায় কেঁদে কেদে বাশার সুলতান বলে উঠলেন-
“ মোতালেব ভাই, আমার ছেলেটা আর নেই। আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। ডেনমার্কের ভয়াবহ এক বিস্ফোরণে আমার ছেলেটা মা-রা গেছে। …”
শব্দগুলো যেন সরাসরি মেহরিনের বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করলো। তার শরীর কেঁপে উঠলো।
শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত নেমে গেলো।
চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছে। কে…? কার কথা বলছেন তিনি…? উনার ছেলে মানে! এজওয়ান? মেহরিনের নিঃশ্বাস আটকে গেলো।
বাশার সুলতান আবার বলে উঠলো-
“ মেহরিন আর ভাবির কানে যেন এই কথাটা না যায়। ওরা সামলাতে পারবে না। রুমুকে হারানোর একমাসও হয় নি আমাদের। তার মধ্যে আমাদের সোলেমান টাও এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে গেলো। আমাদের বাড়ির উপর কার নজর পড়লো! ও খোদা এই শোক আমরা কিভাবে সামলাবো! ”
সোলেমান! নামটা কানে যেতেই সময় থেমে গেলো। মেহরিনের মস্তিষ্ক যেন এক মুহূর্তে কাজ করা বন্ধ করে দিলো। কি বললো চাচা এটা! না…
না… এটা সত্যি না। তার আঙুল থেকে ফোনটা সরে গিয়ে মেঝেতে পড়ে গেলো শব্দ করে।ধীরে ধীরে চোখ উঠলো টিভির দিকে। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে খবর। ডেনমার্কের একটি কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ… নিহত ১৪ জন…
শব্দগুলো আর পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল না।মেহরিনের কানে শুধু একটাই নাম বাজছে সোলেমান…উনি কথা দিয়েছিল উনি ফিরবেন। এটা হবার কথা নয়।
হঠাৎ বুকের মাঝখানে প্রচণ্ড একটা চাপ অনুভব করলো সে। যেন কেউ ভেতর থেকে হৃদপিণ্ডটাকে মুঠো করে চেপে ধরেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে…
বুক জ্বালা করছে,বাম হাতটা অবশ হয়ে আসছে…
চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো, ঠোঁট কাপছে অবিরত। কিন্তু সে চিৎকার করে কাঁদতেও পারছে না ঠিকমতো।
একটা ভাঙা, অসহায় ডাক বের হলো তার ঠোঁট থেকে- “ সুলতান সাহেব।”
তারপরই,একটা তীব্র চিৎকার। পুরো শরীরটা কেঁপে উঠে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো সে।
ইয়াসিন বাতাসি তখন তর্কাতর্কি করছিলো। মেহরিনের চিৎকার শুনে তারা রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো। মোতালেব ভুঁইয়া আর সানজিদা বেগম ও বেরিয়ে আসলেন। সাথে রুম থেকে আফিয়া সুলতান ও। সবার চোখ একসাথে গিয়ে আটকে গেলো মেঝেতে পড়ে থাকা মেহরিনের দিকে। পা পিছলে পড়ে টড়ে গেলো কি না এই ভয়ে অবস্থা খারাপ।
মোতালেব ভুঁইয়া পাগলের মতো দৌড়ে এসে মেয়ের মাথা কোলে তুলে নিলেন।
“কি হয়েছে মা? এই… এই চোখ খোল…”
কাঁপা হাতে মেয়ের গালে চাপড় দিলেন, মাথায় হাত বুলালেন। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। পাশেই পড়ে আছে বাটন ফোনটা ভেঙে আলাদা হয়ে গেছে।
সানজিদা বেগম হঠাৎ থমকে গেলেন। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মেয়ের নাকের কাছে হাত রাখলেন। সাথে সাথে আৎকে উঠলেন-
“ ও মেহরিনের বাপ। মেহরিন নিঃশ্বাস ফেলছে না কেনো। কি হলো কি আমার মেয়েটার? ”
মোতালেব ভুঁইয়া নিজের হাতটা রাখলেন মেয়ের নাকের কাছে। খুবই ক্ষীণ ভাবে শ্বাস পড়ছে। পাল্স চেক করলো। সেটাও ধরা যাচ্ছে না। ঠোঁট নীলচে হয়ে আসছে। শরীর টাও ঠান্ডা হয়ে আসছে। আর ঘাম বের হচ্ছে। মোতালেব ভুঁইয়ার বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠলো।
“ ইয়াসিন! বাপ আমার তোমার গাড়িটা বের করো তাড়াতাড়ি!”
ঘরের ভেতর মুহূর্তেই হুড়োহুড়ি পড়ে গেলো। ইয়াসিন দৌড়ে বাইরে চলে গেলো, বাতাসি কাঁপা হাতে মেহরিনের পা মালিশ করতে লাগলো। আফিয়া সুলতান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিছুই যেন বুঝতে পারছে না, শুধু ঠোঁট কাঁপছে তার।
মোতালেব ভুঁইয়া মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন।
মেহরিনের মাথাটা ঢলে পড়েছে তার কাঁধে— সম্পূর্ণ নিস্তেজ।
“মা… ও মা চোখ খোলো,আম্মা…”
মেয়েকে ডাকতে ডাকতে তার গলা ভেঙে যাচ্ছিলো।
গাড়িটা ছুটছে শহরের রাস্তায়। হর্ন, ব্রেক, মানুষের ভিড় কিছুই যেন ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছে না কেউ।
পিছনের সিটে মেহরিন শুয়ে। সানজিদা বেগম তার মাথাটা কোলে নিয়ে বারবার ডাকছেন-
“মেহরিন… মা… একটু চোখ খোল… কথা বল…”
কিন্তু কোনো সাড়া নেই। শুধু খুব ক্ষীণ, ভাঙা শ্বাস…মাঝে মাঝে সেটাও থেমে যাচ্ছে।
হাসপাতালের সামনে গাড়ি থামতেই সবাই প্রায় দৌড়ে ভেতরে ঢুকলো।
ইয়াসিন ডক্টর কে ডেকে আনলো। স্ট্রেচার করে দ্রুত মেহরিনকে নিয়ে যাওয়া হলো ইমার্জেন্সিতে।
মিনিটগুলো যেন ঘণ্টা হয়ে যাচ্ছে। মোতালেব ভুঁইয়া দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে। দুই হাত কাঁপছে তার। বিপদ তার মেয়েটার পিছু ছাড়ে না।
কিছুক্ষণ পর ইমার্জেন্সির দরজা খুলে একজন ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।
“পেশেন্টের গার্ডিয়ান কে?”
মোতালেব ভুঁইয়া তড়িঘড়ি এগিয়ে গেলেন-
“আমি… আমি বাবা…”
ডাক্তার গম্ভীর মুখে বললেন-
“ওনার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। খুবই সিভিয়ার অ্যাটাক। আমরা প্রাথমিক ট্রিটমেন্ট শুরু করেছি, কিন্তু কন্ডিশন এখনো ক্রিটিক্যাল।”
কথাটা শুনে যেন মাটিটা সরে গেলো মোতালেব ভুঁইয়ার পায়ের নিচ থেকে।
“ হা… হার্ট অ্যাটাক…?”
তার গলা শুকিয়ে গেলো। ডাক্তার আবার বললেন-
“ হুম এই অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাক করাটা….
মনে হচ্ছে হঠাৎ করে কোনো বড় শক পেয়েছেন। সেই কারণেই এই অবস্থা।”
সানজিদা বেগম হঠাৎ মুখ চেপে কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করলেন। হার্ট অ্যাটাক করেছে তার ঐ টুকু মেয়ে! কি হয়েছিল? ফোন ওমন ভাঙা ছিলো কেনো?
ইমার্জেন্সির ভেতরে মেহরিন নিথর হয়ে শুয়ে আছে। মেশিনে তার হৃদস্পন্দনের অনিয়মিত শব্দ বিপ… বিপ… বিপ। ডাক্তাররা ব্যস্ত কেউ ইনজেকশন দিচ্ছে, কেউ মনিটর দেখছে।
অথচ কেউ কিছুই জানে না। মেহরিনের ভেতরের পুরো দুনিয়া যে থেমে গেছে সেই এক মুহূর্তে। যখন সে শুনেছিল-
“সোলেমান আর নেই…”
আর সেই একটাই বাক্য তার হৃদয়টাকে ভেঙে দিয়েছে চিরতরে।
এজওয়ান চোখ খুলে নিজেকে আবিষ্কার করলো আধুনিক এক হসপিটাল রুমে। মুখে মাস্ক লাগনো। মাথায় ব্যান্ডেজ। শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা। হাত থেকে স্যালাইন টা খুলে,মুখ থেকে মাস্কটাও খুলে ফেললো। তারপর উঠে বসতে গিয়ে অনুভব করলো টনটনে ব্যথা। তবে তোয়াক্কা করলো না। ওভাবেই বেড থেকে উঠে পাশ থেকে রক্তে মাখা শার্ট টা গায়ে জড়িয়ে কেবিন থেকে বের হবে এমন সময় কেবিনের ভেতর ডক্টরের সাথে প্রবেশ করলেন এক পুলিশ অফিসার।
“ এ কি আপনি উঠেছেন কেনো? কোথায় যাচ্ছেন অসুস্থ শরীর নিয়ে! ”
এজওয়ান কে ধরতে আসলে এজওয়ান ধরতে মানা করে। বলে-
“ আমাকে যেতে হবে ইন্সপেক্টর। আমাকে যেতে হবে। আমার বউ,আমার জান কে ওরা তুলে নিয়ে গেছে আমারই চোখের সামনে। অথচ আমি কিছুই করতে পারলাম না। এর মানে কি জানেন? ”
“ আচ্ছা আপনি শান্ত হোন। আপনার সুস্থ হওয়াটা জরুরি। আমরা খুঁজবো আপনার ওয়াইফ কে। ”
“ আমি ভরসা করতে পারবো না কাউকে। আর আমি সুস্থ। শ্বাস নিতে পারছি, কথা বলতে পারছি, বেঁচে আছি। মানে আমি ফাইন। এখন সামনে থেকে সরুন অফিসার। আমাকে যেতে হবে। ”
অফিসার ধরতে আসলে এজওয়ান ঝাড়া মেরে ফেলে দেয়। দরজা অব্দি হেঁটে যেতেই শরীর দূর্বল থাকায় তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে নিলে অফিসার ধরে ফেলে। এজওয়ান কে বেডে বসিয়ে বলে-
“ দেখছেন তো আপনি ঠিক মতো হাঁটতে পারছেন না। তাহলে স্ত্রী কে খুঁজবেন কি করে? সুস্থ হতে হবে তো। আমাদের উপর ভরসা রাখুন। আমরা খুঁজবো। কোনো ত্রুটি রাখবো না। আপনার স্ত্রীর নাম কি? ”
এজওয়ান মাথা চেপে ধরে বলল-
“ তরিকুলের বেটি। ”
অফিসারের চোখ বড় হয়ে আসলো-
“ হোয়াট! ”
“ কি হোয়াট? এই নাম জীবনে শুনেন নি? ”
“ অনেক নামই শুনেছি,তবে এমন নাম জীবনে শুনি নি । ভীষণ আনকমন। ”
“ ইয়েস তার নামের মতো সেও আনকমন। সুন্দর না? ”
“ হ্যাঁ, দারুন নাম। এমন নাম পৃথিবীতে গুনে এক পিসই পাওয়া যায়। ”
“ কিসব ননসেন্স কথাবার্তা। এজওয়ান যেহেতু পৃথিবীতে এক পিস,সেহেতু তার তরিকুলের বেটিও তো এক পিসই হবে। ”
“ ঠিক আছে। আপনার তরিকুলের বেটিকে আমরা খোঁজ শুরু করে দিচ্ছি। ভাগ্যিস ওখানকার লোকজন ফোন দিয়ে আমাদের জানিয়েছিল রাস্তায় বিস্ফোরণ হয়েছে। তারা আপনাকে ঠিক সনয় গাড়ি থেকে বের না করলে এতক্ষণে উপরে চলে যেতেন। ”
“ হইছে জ্ঞান দেওয়া? এখন প্রতিটি রুট চেক করুন। প্রতিটি সিসিটিভি ফুটেজ। গাড়ির নম্বর মনে আছে আমার। লিখুন…..। ২৪ ঘন্টার মধ্যে আমার বউকে আমার চোখের সামনে চাই। এখন আসুন রেস্ট নিব আমি। ”
অফিসার ডক্টর চলে যেতেই তার কিছুক্ষণ পর এজওয়ানও লুকিয়ে বেরিয়ে গেলো। সর্বপ্রথম গেলো নিজের ল্যাবে। তার বানানো অ্যাপ্সটায় ঢুকলো। কোনো দূর্ঘটনা ঘটলে তার এপ্সে সংকেত দেওয়া হয়। যদি ঐ ব্যক্তি এই এপ্স টা ব্যবহার করে তাহলে। এজওয়ান চেক করে দেখলো দেওয়া হয়েছিল সতর্ক বার্তা। মাহি তার মানে ঐ এপ্স টা ফোনে ডাউনলোড করেছিল! আর সচল রেখেছিল! আশার আলো ফুটে উঠলো। মনিটরে মাহির ইউজার আইডি টা বের করলো। তারপর লোকেশন ট্র্যাক করলো। লোকেশন শহর থেকে অনেক দূরে।
নাম ভেসে উঠলো ব্লু মাউন্টেইনস অঞ্চল। সিডনির আগাগোড়া তার জানা। শহরের কোলাহল থেকে অনেকটা দূরে, প্রায় পরিত্যক্ত একটা এলাকা। পুরোনো গুদামঘর, ফাঁকা রাস্তা, আর ঘন কুয়াশা যেন সবসময় সেখানে লেগে থাকে।
এজওয়ান তার গাড়িটা আনিয়েছে বাহাদুর কে দিয়ে। গাড়ির ভেতরই ডেস্কে তার ফোনটা ছিলো। এজওয়ান অন করে দেখলো মাহি আর তার বাপের অনেকগুলো ফোনকল। একবার চোখ বুলিয়ে আর সময় নষ্ট করলো না। রাত নামতে শুরু করেছে। এজওয়ান দ্রুত গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই গর্জে উঠলো গাড়ি। শহরের আলো পেছনে ফেলে সে এগিয়ে যেতে লাগলো অন্ধকারের দিকে। শহরের ব্যস্ত রাস্তা ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে লাগলো। উঁচু বিল্ডিংয়ের জায়গা নিলো লম্বা গাছ, নির্জন রাস্তা আর ঠাণ্ডা বাতাস। গাড়ির হেডলাইট বৃষ্টির ফোঁটা ফোঁটা জল কেটে সামনে এগোচ্ছে। লোকেশন যতই কাছে আসছে, এজওয়ানের বুকের ধুকপুকানি ততই বাড়ছে।
অবশেষে গাড়িটা এসে থামলো। সামনে একটা পরিত্যক্ত জায়গা। ভাঙাচোরা একটা গুদামঘর, চারপাশে আগাছা আর শুকনো ঘাসে ভর্তি। এজওয়ান বৃষ্টি মাথায় করেই ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামলো।
চারদিকে তাকালো। কেউ নেই। কোনো শব্দ নেই।
শুধু দূরে কোথাও বাতাসের আর বৃষ্টির শব্দ…
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল গুদামঘরের দিকে। দরজাটা আধখোলা। হালকা ঠেলতেই কড়কড় শব্দ করে খুলে গেল। ভেতরে অন্ধকার। ফাঁকা।একদম শুনশান। ফ্লোরে ধুলো জমে আছে, কোথাও কোথাও পুরোনো দাগ, কিন্তু মানুষ থাকার কোনো চিহ্ন নেই। এজওয়ানের বুকটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠলো।
“ আমি দেরি করে ফেলিনি তো! ”
সিডনি থেকে দূরে আরেক শহরের এক পরিত্যক্ত বাড়িতে হাত পা বেঁধে রাখা হয়েছে মাহি কে। পুরো কক্ষ জুড়ে অন্ধকার। কোথাও কোনো আলো নেই। মাহির গলা শুঁকে কাট হয়ে গেছে। তেষ্টায় বুক জ্বলছে। জল জল করে চেঁচিয়ে উঠলো। একজন লোক জলের বোতল নিয়ে আসলো। মুখের উপর ধরলো মুখা খুলে। মাহি জল খেলো। খাওয়া শেষ হতেই মাহি বলল-
“ আপনারা কারা? কেনো ধরে নিয়ে এসেছেন? কি শত্রুতা আমার সাথে আপনাদের? ”
“ আপনাকে মেরে ফেলার জন্য আদেশ দেওয়া হয়েছে।”
চমকে উঠলো মাহি। অজানা কারনে বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। মেরে ফেলার আদেশ দিয়েছে মানে! তার পরিচয় কি তার শত্রু পক্ষের কেউ জেনে গেছে যে মাহি একজন….. না না না সেটা কি করে হতে পারে! তার বিষয়ে জানার কথা না করো। তাহলে? তাহলে এরা কেনো মারতে চাইছে?
“ কে আদেশ দিয়েছে আপনাদের? ”
“ নাম জানি না। শেষ কোনো ইচ্ছে আছে তোর?”
“ পূরণ করবি বললে?”
“ অবশ্যই। ”
“ ওয়াশরুমে যাব আমি। ”
দুজন মাহিকে ধরে উঠালো। পায়ের বাঁধন খুলে নিয়ে ওয়াশরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মাহি হাত দেখিয়ে বলল-
“ হাত না খুললে কিভাবে হবে?
লোক দুটো একে ওপরের দিকে তাকালো। হাত খুললে তো এই মেয়ে পালানোর চেষ্টা করবে।
“ হাত খোলা যাবে না। ”
“ তাহলে এখানে নিয়ে আসার কি মানে? আমি কি ছেলে মানুষ যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেরে ফেললাম। ”
একজন বিরক্ত হয়ে বলল-
“ আরে দে খুলে। খুলে দিলেই কি? পালাতে পারবে নাকি? পাহারাদার আছে পুরো বাড়ির চারিপাশে ”
লোকটা শেষ পর্যন্ত বিরক্ত মুখে মাহির হাতের বাঁধন খুলে দিলো।
“দ্রুত কর, বেশি সময় নাই।”
মাহি মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকলো ওয়াশরুমে। দরজাটা বন্ধ হলো একটা কট করে শব্দে। বাইরে দু’জনের একজন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইলো, আরেকজন একটু দূরে টর্চ হাতে ঘোরাঘুরি করছে।
ওয়াশরুমটা ছোট, ভাঙাচোরা টাইলস, আয়নাটা ফাটা। কিন্তু মাহির চোখ এখন আর দুর্বল না। ওর মাথা কাজ করছে খুব দ্রুত। নিঃশ্বাস ধীরে টেনে নিলো। এটাই সুযোগ।
হঠাৎ সে পানির ট্যাপ ছেড়ে দিলো। জোরে পানির শব্দ পুরো ঘরটা ভরিয়ে তুললো। বাইরে দাঁড়ানো লোকটা বিরক্ত হয়ে বলল-
“ এই তোর হলো?”
কোনো উত্তর নেই। আরও পানি চলতে থাকলো। লোকটা ধীরে ধীরে দরজার কাছে এলো। দরজায় ধাক্কা দিলো-
“ এই দরজা খুল!”
ঠিক সেই মুহূর্তে মাহি দরজার পাশে লুকিয়ে থাকা ছোট ধাতব পাইপটা হাতে নিলো। ভাঙা ওয়াশরুমের নিচ থেকে আগেই চোখে পড়েছিল তার। দরজাটা খুলতেই লোকটা ভেতরে মাথা ঢোকালো। এক সেকেন্ডও দেরি না করে মাহি পাইপটা দিয়ে তার মাথায় জোরে আঘাত করলো।
আহ্ শব্দ করে লোকটার হাত থেকে টর্চ পড়ে গেলো। আলো ঘুরে পুরো ঘর অন্ধকার-আলোর মধ্যে কাঁপতে লাগলো। দ্বিতীয় লোকটা শব্দ শুনে ছুটে এলো।
“কি হলো?!”
সে ভেতরে ঢুকতেই দরজার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মাহি তাকে পা দিয়ে ধাক্কা দিলো। লোকটা ভারসাম্য হারিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো। এবার শুরু হলো ধস্তাধস্তি। মাহি ছোট, কিন্তু তার শরীরের ভেতর অ্যাড্রেনালিন আগুনের মতো কাজ করছে। সে এক লোকের হাত থেকে বন্দুকটা সরানোর চেষ্টা করলো, কনুই দিয়ে আঘাত করলো বুকের দিকে। লোকটা একটু পিছিয়ে গেলো। অন্যজন উঠে আসার চেষ্টা করতেই মাহি টেবিলের পাশে রাখা ধাতব ফ্লাশ ট্যাংকের ঢাকনা তুলে তার কাঁধে আঘাত করলো। দু’জনই কয়েক সেকেন্ডের জন্য এলোমেলো হয়ে গেলো। এই সুযোগটাই সে চেয়েছিল। মাহি দ্রুত তাদের একজনকে দেওয়ালে ঠেলে ধরলো, তারপর গলা বরাবর একটা শক্ত চাপ দিয়ে অচেতন করে ফেললো। অন্যজন যখন উঠে আসছিল, সে তার হাত ঘুরিয়ে মাটিতে ফেলে দিলো পায়ের নিচে আটকে রেখে জোরে আঘাত করলো ঘাড়ে। ঠিক সেই সময় তার প্যান্টের পকেট থেকে এজওয়ানের মায়ের ছবিটা বের হয়ে ছিটকে উড়ে গেলো কিছুটা দূরে। যেখানে মাহির নজর একবারও যায় নি।
দু’জনই ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে গেলো। শ্বাস ভারী হয়ে আসছে মাহির, কিন্তু থামলো না। এখন সময় নেই। সে দ্রুত একজনের জ্যাকেট খুলে নিলো, কালো জ্যাকেট, ভেতরে হেডসেট। তারপর টুপি আর গ্লাভসও নিলো। দ্বিতীয় জনের প্যান্ট আর বুটও বদলে নিলো। যাতে বাইরে গেলে সন্দেহ না হয়। আয়নার সামনে এক মুহূর্ত দাঁড়ালো সে।
বাইরে দরজার ওপাশে পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে দূর থেকে। আরও কেউ আসছে। মাহি নিঃশব্দে দরজা খুলে বের হলো। হেডসেটটা কানে লাগিয়ে নিচু গলায় হাঁটতে শুরু করলো। চারদিকে অন্ধকার, কুয়াশা, আর পুরোনো গুদামের ভাঙা কাঠামো। সে মাথা নিচু করে হাঁটছে। হাতে পিস্তল। দেখে মনে হচ্ছে সে ওদেরই একজন। মাহি বেরিয়ে যেতে নিলে একজন জিজ্ঞেস করলো-
“ কোথায় যাচ্ছিস?”
মাহি হাতের আঙুল দেখিয়ে বুঝালো প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে। তাদের দৃষ্টি ঘুরে গেলো। সেই সুযোগে মাহি সেই পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে বের হয়ে দৌড় শুরু করলো। তারা জানা নেই সে কোথায়। এই জায়গার নাম কি। তবে তাকে এই মুহূর্তে জঙ্গল থেকে বের হতে হবে। দূরে লোকালয়ে যেতে হবে। এজওয়ান কে জানাতে হবে।
মাহি যখন অর্ধেক জঙ্গল পেরিয়ে এসেছে তখন পেছনে ফেলে আসা শত্রুরা টের পেয়ে গেছে মাহি পালিয়েছে। তারা আর সময় নষ্ট করে নি। ছুটলো তারাও। মাহিকে তাদের লাগবে। না মারতে পারলে তারা যে মরবে।
এজওয়ান সিডনির ব্লু মাউন্টেইনস অঞ্চল থেকে বের হলো। তার কি যে রাগ লাগছে। ফোনের গ্যালারিতে গিয়ে মাহির ছবি গুলো বের করলো। বেশির ভাগ ছবি এজওয়ান তুলেছিল মাহির অজান্তে। গাড়ি স্টার্ট দিলো সে। ফোনটা সামনের ডেস্কে রেখে ঠোঁটের কোনায় আঙুল ঠেকিয়ে বলল-
“ লুডু খেলার ৯৭ নম্বর সাপ টাই হচ্ছো তুমি তরিকুলের বেটি। কথা ছিলো আমি তোমাকে মে’রে ফেলবো। সময় পেলেই মে’রে ফেলবো। সেজন্যি তো বিয়ে টা করেছিলাম। কিন্তু দেখো কি হলো! শালার ভালোবাসা আমাকে মা’দারচো* বানিয়ে ফেললো। তোমার ব্যথায় নিজে ব্যথিত হই। মনে হয় আমার শরীরে কেউ আগুন ধরিয়ে দিছে। তোমার নিখোঁজে দেখো আমার কি অবস্থা হয়েছে। পাগল হয়ে যাচ্ছি। শালার শত্রুকে মারার ছক কষতে কষতে নিজের শত্রুকেই ভালোবেসে ফেললাম আমি! আর ভালোবেসেই ফেঁসে গেলাম। নিজের জন্য বাঁচিয়ে রাখা সবটুকু ভালোবাসা তোমাকে দিয়ে দিলাম নিজেকে আর ভালো না বেসে। নিজের প্রিয়জন দের থেকে তোমাকে লুকিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে আমাকে! এখন কোথায় গেলে তোমায় পাবো বলো? আমি যে তুমি ছাড়া নিঃশ্ব এখন। আমার তোমাকে লাগবে। পৃথিবী এফোড় ওফোড় করে হলেও আমার তোমাকেই লাগবে। যতদিন বাঁচবো তোমাকে সাথে রেখেই বাঁচবো। আর মরলে তোমাকে সাথে করে নিয়েই মরবো। ”
সাথে সাথে এজওয়ানের ফোনে কল আসলো। আননোন নম্বর। এজওয়ান রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মাহি বলল-
“ হ্যালো এজওয়ান শুনতে পারছেন?”
এজওয়ানের বুকের ভেতরটা যেন ঠান্ডা হলো।
“ তরিকুলের বেটি! এই তুমি কোথায় আছো জান? কোথায় আছো? আমি পাগলের মতো খুঁজে চলছি তোমায়। ”
“ জায়গাটার নাম আমার জানা নেই। ধরতে পারছি না কোথায় আছি। আপনি আসুন। ওরা বুঝে গেছে আমি পালিয়ে এসেছি। পিছু ধাওয়া করছে। আমি একটা টেলিফোন বুথ থেকে আপনাকে ফোন করেছি। ”
“ আমি আসছি। আসছি আমি। তুমি কোথাও সেইফলি লুকিয়ে থাকো। আমি লোকেশন ট্র্যাক করে আসছি। ”
মাহি ফোন কেটে দিলো। দূর থেকে গাড়ির হেডলাইটের আলো জ্বলতে দেখে আর এক মুহূর্তও থাকলো না। বুথ থেকে বেরিয়ে সোজা দৌড়ানো শুরু করলো।
এজওয়ান লোকেশন ট্র্যাক করে দেখলো এটা লিথগো শহর। এজওয়ান গাড়ি স্টার্ট দিলো। অর্ধেক পথ আসতেই আবার কল আসলো। বাবা ফোন করেছে! এজওয়ান রিসিভ করতেই বাশার সুলতান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল-
“ জানোয়ারের বাচ্চা তোর ফোন কই থাকে? কতগুলো ফোন দিছি? ”
এজওয়ান নিজের এক্সিডেন্টের বিষয়টা এড়িয়ে গিয়ে বলল-
“ কি হয়েছে বলো? ”
“ তুই কিছু শুনিস নি? জানোয়ার নিউজ দেখিস নি? ”
“ আহা কথা পেঁচিও না তো। কিসের নিউজ? আমি ব্যস্ত আছি। কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে নেই। কি হয়েছে তাড়াতাড়ি বলো। তা না হলে ফোন কাটলাম। ”
“ সোলেমান, তোর ভাইজান আর নেই…বিস্ফোরণে মা-রা গেছে। ”
এজওয়ানের হাত থেমে গেলো। গাড়ি জোরে ব্রেক কোষলো।
“ কিহ! এই কিসব উল্টাপাল্টা কথা বলছো? ভাইজান.. এই না না। মিথ্যা বলছো। ভাইজান কিভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যেতে পারে! মিথ্যা মিথ্যা সব মিথ্যা। ”
এজওয়ান ফোন কে’টে ইব্রাহিম কে কল লাগালো। বাশার সুলতান আর ইব্রাহিম ডেনমার্কের সেই গোডাউনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। লাশ শনাক্তকরণ করার জন্য হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ইব্রাহিম নিষ্প্রভ মলিন চোখে দেখছে পুড়ে যাওয়া গোডাউন টা। তার একমাত্র প্রিয় বন্ধু। তার সোলেমান আর নেই! এ যেন অবিশ্বাস্য বিষয়! ও তো এসেছিল নিজের বাবা মায়ের খুনি দের ধরতে তাহলে! তাহলে কেনো ওর সাথে এমন হলো! বাশার সুলতান হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে। এজওয়ান কে ফোন করে বকলো। ছেলেটাকে কাজের সময় পাওয়াই যায় না। পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠতেই ইব্রাহিম বের করে দেখলো এজওয়ান করেছে ফোন। রিসিভ করতেই এজওয়ান অস্থির গলায় বলল-
“ ভাই এসব আমি কি শুনছি? ভাইজানের কি হইছে? আব্বা ওসব বললো কেনো? ভাইজান কি সত্যি… ”
ইব্রাহিমের চোখ দিয়ে জল গড়ালো। ছোট্ট করে বলল-
“ আর নেই…”
“ না তুমিও মিথ্যা বলছো। নিজ চোখে দেখছো ভাইজানের লা’শ? দেখছো?”
“ না। সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শরীর বোঝা যাচ্ছে না। ডিএনএ টেস্ট করে লাশ শনাক্তকরণ করা হবে। ”
“ তাহলে কেনো তোমরা বলছো ভাইজান ম’রে গেছে? ”
“ সোলেমান এখানেই এসেছিল,ওর বাবা মায়ের খুনি কে ধরতে। ”
“ আমি বিশ্বাস করি না। আমার ভাইজান মরতে পারে না। আমি এখন কি করবো ভাই? একদিকে ভাইজান। আরেক দিকে মাহি। ”
দাহশয্যা পর্ব ৯২
“ আরেকদিকে মাহি মানে! ”
“ মাহি কে ক’জন মিলে তুলে নিয়ে গেছে এয়ারপোর্ট থেকে। ফোন দিয়েছিল কতক্ষণ আগে। ও কোনোমতে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ওর পিছু ধাওয়া করছে ঐ কুত্তার বাচ্চা রা। ”
“ মাহিকে বাঁচা তুই। আমি আর চাচা এদিকে আছি। ”
“ আমি মাহিকে বাঁচিয়েই আসছি ভাই। ততক্ষণ শুধু ততক্ষণ সামলাও। আমার বিশ্বাস আমার ভাইজানের কিছু হয় নি। আমার ভাইজান বেঁচে আছে…..

Porer part Kobe diben