Home দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৬

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৬

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৬
আফরোজা আশা

চেয়ারের হেলান দিয়ে তীক্ষ্ণ একজোড়া চোখ সামনের তিন ব্যক্তির দিকে চেয়ে আছে। এক হাতের আঙুলের ডগায় তার কলম নড়ছে চড়ছে। সম্মুখের তিন ব্যক্তির চোখমুখে চিন্তাছাপ স্পষ্ট। তা দেখে যেন বেশ মজা পাচ্ছে দিগন্ত। এর মধ্যে সেখানে প্রবেশ ঘটল এক রমণীর। ক্ষুব্ধ নজরে সকলের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
‘ কি আশ্চর্য! বলছি না এবারের মিউজিক অ্যালবামের দায়িত্বে আমিও থাকব। তোমরা হ্যাঁ না কিছু বলছো না কেনো? ’

জয়নাল তালুকদার সরু চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন। কিঞ্চিৎ ঘাবড়াল দিশা। নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল,
‘ আমার রাইট আছে। বড় দু’ভাইকে তো কোনো কথা ছাড়াই এখানকার দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছো। তবে আমার বেলা এতো আপত্তি কেনো? আমি মেয়ে বলে দাম দিতে চাইছো না তাই তো। ’
জুনায়েদ তালুকদার হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে। গত কয়েকদিন থেকে দিগন্ত আর দিশা মিলে নাভিশ্বাস উঠিয়েছে তার। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গজগজিয়ে আওড়াল,
‘ এটা মিউজিক প্রোডাকশন চ্যানেল। তোমরা ছেলেখেলা পেয়েছ? শুধু চেয়ারে বসলেই হয় না অনেক পরিশ্রম দিতে হয়। একহাতে অনেককিছু সামলাতে হয়। ’

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

জুনায়েদের কথা শেষ হতেই হাতের কলমটা টেবিলে গাঁথল দিগন্ত। ঘাড় কিঞ্চিৎ বাঁকা করে রাশভারি গলায় বলল,
‘ কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী পাঁচটা গানের লিরিক্স আমি আর রায়হান দিয়ে দিয়েছি। এবার ভয়েসার আমি বাছাই করব। যদি আমার উপরে গিয়ে কিছু করার চেষ্টা করা হয় তবে তালুকদার প্রোডাকশনের সাথে করা লাস্ট কাজ এটাই। আমি আর রায়হান অন্য চ্যানেলের সাথে চুক্তিবদ্ধ হবো। ’
চোখ খিঁচিয়ে বন্ধ করল জুনায়েদ। দিগন্তকে সাধারণ ব্যবসার দায়িত্ব দিতে চেয়েছিল সে। কিন্তু ধূর্ত ছেলে সময়মতো এখানে গেড়ে বসল।

এখনি আধিপত্য হারাতে চায় না জুনায়েদ। দিগন্ত কাজ শুরু করলে মাটি চাপা দেওয়া অনেককিছু বেরিয়ে আসবে। আবার দিগন্ত কাজ করলে চ্যানেল যতটুকু ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সেটা কিছুদিনের মাঝে পূরণ করতে পারবে। ভাবতে ভাবতে শরীর ঘাম ছাড়ল জুনায়েদের। ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন আবারো।
এদিকে পূর্ণদৃষ্টিতে জুনায়েদকে দেখছে দিগন্ত। ওষ্ঠপুটে তার রহস্যময়ী হাসি। হাতের কলম নিয়ে খেলতে খেলতে জয়নালের দিকে তাকাল সে। গুরুগম্ভীর গলায় বলল,
‘ আপনি কিছু বলবেন? ’
দিশার থেকে নজর সরিয়ে দিগন্তের দিকে তাকাল জয়নাল। ঠান্ডা গলায় বলল,
‘ আমি শুরু থেকে চাইতাম তুমি তোমার কাজ বুঝে নেও। এখন যখন সিরিয়াস হয়েছ তখন আমার কিছু বলার নেই। তবে রুলস ইজ রুলস। ভয়েসার সিলেকশন এর ক্ষেত্রে সব ডিরেক্টর’স একসাথে ডিসিশন ফাইনাল করে। হুট করে ভোকাল আর্টিস্ট এনে দাঁড় করিয়ে দিলেই সেটা মানা যাবে না। ’
গমগমে আওয়াজে বলে উঠল দিগন্ত,

‘ এই পাঁচ অ্যালবামের প্রোডিউসিং এন্ড রিলিজ দায়িত্ব আমি আর দিশা নিবো। আর কোনো ডিরেক্টর থাকবে না। নট ইভেন ইউ, জুনায়েদ তালুকদার, দিহান তালুকদার। নো ওয়ান। ’
এতোক্ষণ নিরবে থাকা দিহান এবার মুখ খুলল,
‘ দিশাকে টানছো কেনো? ও এসবের কি বুঝবে। ’
সহসা দিগন্তের হাতের কলমটা তেড়েফুঁড়ে ছুটে এসে লাগল দিহানের বাহুতে। হতচকিত দিহান ভাইয়ের পানে তাকাল। চোয়াল শক্ত করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে দিগন্ত। দিহানের নজর ওর দিকে যাওয়া মাত্রই হুংকার ছুঁড়ল,
‘ তুই গবেট যা বুঝবি না ও সেটা বুঝবে। গান বাংলা প্রোডাকশনের সাথে যে গান রিলিজ দিয়েছিলি সেটাতে তালুকদার প্রোডাকশন টুয়েন্টি টু পার্সেন্ট প্রফিট পাওনা ছিল। কাগজে টুয়েন্টি পার্সেন্ট উল্লেখ থাকলেও একাউন্টে টুয়েলভ পার্সেন্ট পাঠিয়ে বাকিগুলো ওরা মেরে দিয়েছে। যে কারণে গত দুমাসে আমাদের চ্যানেলের কোনো উন্নতি নেই। গাধা কোথাকার! ’

বাহুতে হাত ঘঁষে প্রশ্নাত্মক গলায় বলল দিহান,
‘ টুয়েন্টি টু পার্সেন্ট কিভাবে হয়? আর কাগজে টুয়েন্টি ছিল সেটা তুমি কিভাবে জানলে? ডিল তো আমি করেছি। ’
দিশার দিকে নজর রাখল দিগন্ত। তার নজর দেখে নিজেকে প্রস্তুত করল দিশা। অধরজোড়া ভিজিয়ে হাতের ফোন ঘেঁটে কিছু একটা বের করল। সেটা সবার সামনে ধরে চড়া গলায় বলল,
‘ সোশ্যাল মিডিয়ার সব প্ল্যাটফর্মের টোটাল ভিউজ অনেক। ম্যানেজমেন্ট এর পার্সেন্টেজ বাদ দিয়ে দুই প্রোডাকশন মিলিয়ে লাভ চল্লিশ এরও বেশি হয়। সেখানে আমাদের চ্যানেল অনায়াসে বিশ এর বেশি পার্সেন্টেজ পায়। ’

দুইজোড়া জ্বলন্ত চোখ দিহানের দিকে চেয়ে আছে। তা দেখে শির নত করে ফেলল দিহান। ধীর গলায় বলল,
‘ কাজ চলাকালীন তোমরা দু’জনও ছিলে। এখন আমার একার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে পাড় পেতে চাইবে না। ’
জয়নাল রাগী স্বরে বলল,
‘ এটার দায়িত্ব তোমার ছিল। আমরা তো সোলো মিউজিক নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তুমি… ’
দিগন্ত মাঝখানে ফোঁড়ন কাটল,
‘ একাউন্টসের দায়িত্ব দিহানের না। ও যা চুক্তি করেছে সে অনুযায়ী কাজ করেছে শুধু। টুয়েন্টি পার্সেন্ট এর জায়গায় যে টুয়েলভ পার্সেন্ট দিয়েছে এটা কি জুনায়েদ তালুকদার দেখেনি? ’
ব্যস, মুহূর্তেই ঘাড় কপাল বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরল জুনায়েদের। তার নিজ সন্তান তাকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার জন্য একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে। না পারছে মুখ খুলতে, না পারছে দিগন্তকে এখান থেকে সরাতে। কেবল দাঁতে দাঁত পিষে চুপ করে রইল। আপাতত সকলের দৃষ্টি তার দিকে।

এদিকে জয়নাল তালুকদার অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে আছে তার ভাইয়ের দিকে। টানা কতগুলো দিন থেকে সবকিছু সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে তারা। চ্যানেলের অবস্থা দিনকে দিন অবনতির পথে হাঁটছে। সেখানে জুনায়েদ তালুকদার এমাউন্ট এর গড়মিল করছে তার অগোচরে! ইতোঃমধ্যে দুই-এক কথায় জুনায়েদ আর জয়নালের বাক-বিতর্ক শুরু হয়ে গিয়েছে।
চেয়ারে হেলান দিয়ে নিরবে শো দেখছে দিগন্ত। মেজাজ তার ভীষণ ফুরফুরা। যেন বিনা খরচে মুভি উপভোগ করছে।

হতবিহ্বল বেলা একবার রাস্তার পানে চাইছে তো একবার দিগন্তের মুখপানে। দিগন্তের জীপ চলছে তার অচেনা কোনো রাস্তায়।বিস্মিত কণ্ঠে শুধাল,
‘ যাচ্ছেন কোথায়? ’
ভাবলেশহীনভাবে জবাব দিল দিগন্ত, ‘ জানি না। ’
‘ আপনার অফিস নেই? ’
‘ সকালে গিয়ে তোর শ্বশুড় আর চাচাশ্বশুড়ের ভীত নাড়িয়ে দিয়ে এসেছি। আপাতত আজ আর কাজ নেই। ’
‘ কি করেছেন? ’
বেলার দিকে একপলক চেয়ে পুনরায় নিজ কাজে মনোনিবেশ করল দিগন্ত। তা পোষালো না বেলার। ওর বাহু ঝাঁকিয়ে ফের শুধাল,

‘ বলেন। ’
‘ ওসব তোকে জানতে হবে না। ’
‘ ভালো। কলেজে একটা বিরাট ঘটনা ঘটেছে। আমিও কাউকে জানাবো না। ’
ভ্রুঁ কুঁকচে বেলার দিকে তাকাল দিগন্ত। রাশভারি গলায় বলল,
‘ কি ঘটনা? ’
‘ ওসব আপনাকে জানতে হবে না। ’
মুখ থেকে চ বর্গীয় শব্দ তুলল দিগন্ত। ললাটে অগণিত ভাজ ফেলে বিরক্তিমাখা গলায় বলল,
‘ মিউজিক অ্যালবামের একাউন্ট ডিটেইলস নিয়ে দুই তালুকদারের বিতর্ক চলছে। ’
উপরিনীচ মাথা নাড়ালো বেলা। ব্যাগ থেকে একটা সাদা কাগজের চিরকুট বের করে দিগন্তের দিকে বাড়িয়ে দিল। একহাত স্টিয়ারিং এ রেখে আরেকহাতে সেটা নিল দিগন্ত। কাগজের ভাজ খুলতেই শান্ত মেজাজ তার অচিরেই হারাল। হিসহিসিয়ে বলল,

‘ মুখ তো ঢেকে যাস। প্রেমে পড়ে কিভাবে? ’
নিকাবের আড়ালে থাকা চোখ দুটোর পলক ঝাপটে আওড়াল বেলা,
‘ চোখ দেখে নাকি প্রেমে পড়েছে। ’
প্রচণ্ড তিক্ততার সাথে বেলার চোখের দিকে তাকাল দিগন্ত। বেলা গোল গোল চোখে চেয়ে বলল,
‘ আপনি তবে কি দেখে আমার প্রেমে পড়েছিলেন? ’
‘ আমি তোর প্রেমে পড়েছি? ’
‘ পড়েননি বলছেন। ’
‘ হুম। ’
‘ তাহলে যে আমার প্রেমে পড়েছে তার প্রোপোজাল এক্সেপ্ট করি? ’
‘ তোর কলেজে আসা বন্ধ করে দেই? ‘
সহসা মুখে হাসিটুকু মিলিয়ে নিল বেলা। গজগজিয়ে বলল,
‘ নিজেও ভালোবাসেন না, অন্যকেও সুযোগ দেন না। ’

শুনেও চুপ করে থাকল দিগন্ত। অনেকটা পথ পেরিয়ে অবশেষে জীপ থামল এক জায়গায়। গার্ডের হাতে জীপ পার্কিং এ দিয়ে বেলাকে নিয়ে ভেতরে আসলো দিগন্ত। বেলার মুখ চুলকাচ্ছে কিছু বলার জন্য। কিন্তু দিগন্তের চোখমুখে রাগের রেশ দেখে নিজেকে দমিয়ে রেখেছে।
বেলাকে একপাশে রেখে টিকেট কাউন্টারে গেল। চোখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জায়গা পর্যবেক্ষণ করল বেলা। একটা বিলাসবহুল পার্ক এন্ড রিসোর্ট। আশপাশের মনোমুগ্ধকর সবুজেঘেরা পরিবেশ দেখে খুশিতে নেচে উঠল বেলার মন। এন্ট্রি এরিয়াটুকুই এতো সুন্দর! না জানি ভেতরটা আরো কত সুন্দর হবে।
মিনিট খানেকের মধ্যে দুটো টিকেট হাতে ফিরল দিগন্ত। বেলার হাতে একটা কোয়েন ধরিয়ে দিয়ে গমগমে গলায় বলল,

‘ চলেন। ’
হাতের কোয়েনটার দিকে তাকিয়ে অবাক গলায় বলল বেলা,
‘ কোয়েন টাকা দিচ্ছেন কেনো? ’
‘ এট্রি ফ্যান্টাসি। ওটা টাকার কোয়েন না। ম্যাথেও তোর এতো বাজে অবস্থা? ’
মুখ বাঁকাল বেলা। সুযোগে ওর পড়াশোনা নিয়ে টান মারল লোকটা। ভালোভাবে না দেখে খেলনা কোয়েনকে নাহয় বলেছেই টাকার কোয়েন। ওকে পঁচানোর কোনো সুযোগ হাতছাড়া করে না।
দিগন্ত ওর হাত ধরে এন্ট্রি করল পার্কের ভেতরে। তবে যাওয়ার আগে কোয়েনটা মিনি গেইটের ফাঁকে ফেলে তবেই ঢুকল। ভেতরে পা রাখতেই চোখজোড়া চকচক করে উঠল বেলার। দিগন্ত আড়চোখে দেখল বেলাকে। অতঃপর হাতে হাত রেখে দুই মানব-মানবী নিজ মতো হাঁটলো পুরো পার্ক জুড়ে।
ওয়াটার ভ্যালির কাছে এসে হাঁটা থামে বেলার। ঘাড় কাত করে জিজ্ঞেস করে দিগন্ত, ‘ কি? ’
বেলা চারপাশের সুন্দর পরিবেশ দেখতে দেখতে বলল,
‘ জায়গাটা এতো সুন্দর। এখানে বেলা ছবি তুলবে না? ’
পকেট হাতড়িয়ে ফোন বের করতে দিগন্ত ভার গলায় আওড়াল,
‘ একা তুলবে? ’
সহসা দিগন্তের বাহু পেঁচিয়ে ধরে বিগলিত হেসে বেলা বলল,
‘ নাহ। কাপল, কাপল। ’

শিকদার বাড়ির বসার ঘরে বসে আছে দিশা, রায়হান আর ফাহাদ। রাজিয়া শিকদার ট্রেতে চায়ের কাপ সহ এসে বসলেন ওদের সামনে। রায়হান বিরস মুখে বসে ছিল। মাকে দেখে নড়েচড়ে বসল। পুনরায় দিশার দিকে অসহায়ন দৃষ্টি ফেলে কিছু বোঝানোর চেষ্টা চালালো। কিন্তু দিশা যেন মহা আনন্দে তা অগ্রাহ্য করল।
গরম গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিয়ে রাজিয়া শিকদারের উদ্দেশ্যে বলল,
‘ তোমরা দেরী করছো আন্টি। ভার্সিটিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস চলছে। কিছুদিনের মধ্যে আবার মিড হবে। মাইশার পড়াশোনায় ব্যপক ক্ষতি হচ্ছে। সামনের ক্লাসগুলো মিস গেলে এবার নির্ঘাত ফেল মারবে মেয়েটা। ’
রাজিয়া বেগম বেশ চিন্তিত হয়ে বললেন,

‘ রেহানা আপা যে আরো কিছুদিন দেরী করতে বলল। ‘
‘ আরেহহ দূর! গ্রামের মানুষগুলা কবেই ওদের মিয়া-বিবির কাম সারে রাখছে। তোমরা শুধু যাবা আর বিদায় আনবা, ওটার জন্য আবার এতো চড়াই উতড়াই করে কেউ। ’
দিশার কথা বলার ভঙ্গিমা দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসল ফাহাদ। অতঃপর গলা খাকড়ি দিয়ে বলল,
‘ কয়েকদিন আগে একটা মিউজিক কম্পিটিশন এ মাইশা সিলেক্ট হয়েছিল। আগামী সপ্তাহে ও আমাদের সাথে একটা অ্যালবাম এ কাজ করবে। এ মুহূর্তে ওকে এখানে প্রয়োজন। ’
রাজিয়া বেগম প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি ফেললেন রায়হানের পানে। বললেন,

‘ তুই জানিস সব? ’
অসহায় রায়হান গাঁইগুঁই করে বলল,
‘ হুম। আমি আর দিগন্ত লিরিক্স দিয়েছি। ’
খুশিতে বাকহারা হলেন রাজিয়া বেগম।
‘ তোরা আবার এসব কাজ শুরু করেছিস। তবে এখন থেকে আর গুন্ডাপান্ডা হয়ে ঘুরবি না? সত্যি যদি কাজে মন দিস তবেই আমি ছেলের বউ বাড়িতে তুলব। ’
জবাব দিল না রায়হান। চোখমুখ আঁধার করে বসে রইল। রাজিয়া বেগম ফের বললেন,
‘ দিগন্ত এলো না কেন? ’
বিড়বিড়িয়ে আওড়াল ফাহাদ,

‘ আমি এসেছি আবার ওই হারামজাদা আসবে নাকি। ’
ফাহাদের কথা শুনতে পেল দিশা। মেকি হেসে ফাহাদকে শুনিয়ে রাজিয়া বেগমের উদ্দেশ্যে বলল,
‘ বেলাকে নিয়ে ঘুরাঘুরি করছে একটু। ’
রাজিয়া বেগম হাসলেন। এদিকে চায়ের কাপখানা শক্ত হাতে ধরে রেখেছে ফাহাদ। দিশা কথাটা শুনে নিরবে কাটল তার কিছুপল। অতঃপর মিনিট পাঁচেকের মধ্যে রাজিয়া বেগমের কাছে বিদায় নিয়ে বাইরে চলে গেল।
মাইশাকে দ্রুত আনার ব্যবস্থা সেরে দিশাও বেরিয়ে আসল। মুখ ভর্তি হাসি যেন উপচে পড়ছে তার। আহা! বেচারা মেয়েবাজের দিলে লেগেছে একদম।

সন্ধ্যার প্রথম প্রহর চলমান। খোলা আকাশের নিচে সবুজে ঘেরা বিস্তৃত মাঠের উপর বসে আছে এক রমণী। তার নরম হাতের বিচরণ চলছে কোলের ওপর থাকা পুরুষটির ঘন কালো চুলের ভাজে।
চোখ বন্ধ করে আরামে শুয়ে থাকা পুরুষটার চোখমুখে পূর্ণদৃষ্টি মেলে রেখেছে বেলা। পলকহীন চেয়ে থাকার এক ফাঁকে ঘোর লাগা কণ্ঠে ডাকল,
‘ শুনেন? ’
দিগন্তের সদ্য হওয়া তন্দ্রাভাব কাটল সে ডাকে। চোখ বন্ধ রেখে জবাব দিল, ‘ হুম। ’
‘ আমরা প্রেম করছি? ‘
‘ এভাবে প্রেম করে? ’
‘ রাইমা তো তাই বলে। ‘
‘ কি বলে? ’
‘ এই যে আমরা যা যা করছি। ’
‘ কি করছি? ’
বিরক্ত হলো বেলা। নাক কুঁচকে দিগন্তের চুলে টান লাগল। ঝট করে চোখ মেলে তাকাল দিগন্ত। বেলার কুঁচকে রাখা নাকে আঙুল চেপে বলল,

‘ ভালোভাবে স্বামী সেবা কর বেয়াদব। ’
গজগজিয়ে উঠল বেলা,
‘ থাকব না আমি আপনার সাথে। বাড়িতে দিয়ে আসেন। ’
‘ বাড়ির রাস্তা চিনি না। ’
পাশে রাখা দিগন্তের মোবাইল হাতে নিল বেলা। উদ্দেশ্য রহমান পাটোয়ারীকে ফোন দিবে। কিন্তু ক্যামেরা অন থাকায় নিজের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠতেই ক্ষণিকে রাগ ভুলে বসল বেলা। হাত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দিগন্তসহ আবারো ছবি তোলা শুরু করল।
জায়গাটা বেশ নির্জন। মানুষজনের আনাগোনা নেই। নিকাব পাশে রেখে দাঁত কপাটি মেলে হাসছে আর নানান অঙ্গভঙ্গিতে ছবি তুলছে বেলা। দিগন্ত সরু চোখে ওর দিকে চেয়ে থাকল৷ অতঃপর রাশভারি গলায় বলল,

‘ একা একা হেসেখেলে ছবি তুলছিস কেন? অভদ্র মেয়ে। পাশে তো আমাকেও নিচ্ছিস। হাসতে বলবি না।’
তড়িৎ গতিতে দুপাশে না বোধক মাথা নাড়াল বেলা৷ গুরুতর ভঙ্গিতে বলল,
‘ খবরদার, আপনি হাসবেন না। আপনার হাসি মারাত্মক সুন্দর। আমার মাথা ঘুরে। ’
ত্যাদড় দিগন্ত বেলার কথার উল্টো পথে গেল,
‘ তাহলে হাসতেই হবে। ’
তাতক্ষণাৎ একহাত দিয়ে দিগন্তের মুখ চেপে ধরল বেলা। চড়া কণ্ঠে আওড়াল,

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৫ (২)

‘ বাংলার দূর্বল যে তাই অ বলতে ভুলে গিয়েছি। আপনার হাসি মারাত্মক অসুন্দর। আমার একদম ভালো লাগে না। ’
এবার না চাইতেই শব্দ করে হাসল দিগন্ত। মুখের ওপর থেকে বেলার হাত সরাতে চাইলে বাঁধ সাজল বেলা। চোখ বৃহদাকৃতির করে হা হুতাশ সুরে বলে উঠল,
‘ কেমন ভেজালের লোক! অকারণে হাসছে। ’

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৫৭