Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ৮

নিবৃতা পর্ব ৮

নিবৃতা পর্ব ৮
নেহার ছায়ালিপি

শান্ত, ঘুমন্ত মুখশ্রীর উপর উজ্জ্বল আলোর ছটা এসে পরতেই মুখের আকৃতির বিকৃতি ঘটলো। সহসা বন্ধ চোখের পাতা কুঁচকে আসে। মসৃণ কপালে পরে দৃঢ় কয়েকটি ভাজ৷ আধভাঙা ঘুমের ঘোরেই হাতরে হাতরে নাইটস্ট্যান্ড থেকে মোবাইলটি তুলে নেয় সে। কোনরকমে সেটি চোখের একদম কাছে টেনে দেখে সকাল এগারোটা পেরিয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। সহসা উঠে বসে সে। দু-হাত দু’দিকে ছড়িয়ে দিয়ে আড়মোড়া ভাঙে৷ নিদারুণ আলস্যে, মুখে হাত চেপে বড় করে হাই তোলে। সম্মুখের দৃশ্য সবটাই ঝাপসা। গায়ের টি শার্টটা টেনেটুনে ঠিক করে খাট থেকে নেমে পরলো ও। পাশে থাকা চশমাটি তুলে নিলো চোখে। গতকাল নাইট ডিউটি ছিল তাবিবের। মূলত সব কাজগুলো গুছিয়ে নিচ্ছিলো। তার সময় প্রায় হয়ে এসেছে। আজ বাদে কাল, সুদুর অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে পারি জমাতে হবে। সহকর্মী, সিনিয়র, জুনিয়র সকলের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করেছে।

তার কাছে থাকা কিছু রোগীকে বিশ্বস্ত হাতে তুলে দিয়ে এসেছে। এইসব দায়িত্ব কর্তব্য পালন করতে করতেই ফজরের ওয়াক্ত হয়ে গিয়েছিল। কোনমতে বাসায় ফিরে, ক্লান্তিতে মুখ থুবড়ে পরেছে বিছানায়। ঘুমের তোড়ে কোন কিছুই টের পায় নি আর। তানহাকে স্কুলে পৌছে দেওয়ার দায়িত্ব আজ ড্রাইভারকে দিয়েই এসেছিলো ও। আর সাথে তো ওর আম্মু আছেই। খেয়ালটা মাথায় আসতেই মনে পরলো, এই মুহুর্তে পুরো বাসায় তাবিব ও নিবৃতা ছাড়া আর কেউই নেই। দ্বিতীয় আরেক অস্তিত্ব থাকা সত্বেও পরিবেশটা কেমম বিরান, শূন্য মনে হচ্ছে। একটুও শব্দ নেই কোথাও। কৌতুহল ঘিরে ধরে তাবিবকে। মাথার উসকোখুসকো, অগোছালো চুলগুলোতে হাত গলিয়ে দিয়ে নিজেকে একটু পরিপাটি করার চেষ্টা করলো। অতঃপর এক শ্বাস টেনে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। চারপাশে নজর বুলিয়ে বুঝলো সেই নীরব মানবীটি এখানে নেই, হয়তো সে তার ঘরেই অবস্থানরত। বিয়ের দশ, দশটা দিন পেরিয়ে গিয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে এই সময়ে নব দম্পতির মাঝে থাকা সকল দ্বিধা, জড়তা, একে অপরের সান্নিধ্যে অনেকটাই কেটে যাওয়ার কথা। কিন্তু তাবিব নিবৃতার অবস্থান এখনও কেমন প্রথম দিনের মতোই। তাবিবের প্রতি নিবৃতার কোন আগ্রহই কাজ করে না। তার চোখের আড়ালে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যে বোধ করে। আর তাবিব?

সে পরেছে মুসিবতে। না চাইতেও, কিভাবে যেন, একটু একটু করে, সেই অদ্ভুত মেয়ের, অদ্ভুত সব কাজ এবং তার সরলতার মায়ায় জড়িয়ে গিয়েছে। মায়া? ঠিক জানা নেই অবশ্য। কথায় আছে, সর্বদা চোখের সামনে থাকলে কোন বোবা প্রাণীর উপরও মায়া জন্মে যায়। তাহলে যে দৃষ্টির সম্মুখে না থেকে নজর চুরি করে লুকিয়ে থাকে, তার উপর কি ধরনের টান সৃষ্টি হয়? নিজের অনুভূতি সম্পর্কে এখনও স্পষ্ট নয় তাবিব। তবে নিবৃতার জন্য মনে যেই বিতৃষ্ণা জমেছিলো, সেগুলো বহু আগেই ছুটে পালিয়েছে। সেই তেঁতো অনুভূতির জায়গা কেঁড়ে নিয়ে একগুচ্ছ উষ্ণ, কোমল ছায়া তাদের আপন স্থান বুঝে নিয়েছে। তার কারণগুলো কি কি? এই যেমন বলতে গেলে, তানহার প্রতি থাকা নিবৃতার নিখাদ, কোমল ভালোবাসা। কঠোর দায়িত্ববোধ, তানহাকে সর্বদা নিজের আগে রাখার মতোন নিঃস্বার্থতা। তবে এগুলো বাদে যা আছে তা নিতান্তই তাবিবের একার অনুভব। এই যে তার নিচু স্বরে কথা বলা, যার বেশিরভাগই তাবিবের শুনতে বেশ বেগ পেতে হয়, নিবৃতার সবসময় আঁটসাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, যেন তাবিব কোন ভয়ংকর এক দানব। ওর ভীতু চাহনি, ওর বোকা বোকা কথাবার্তা। কথার মারপ্যাচ ধরতে না পারার মতো সহজ, সরল মস্তিষ্ক। দুনিয়াবি সকল জটিলতার উর্ধ্বে থাকা এক খুঁত বিহীন মন। তুলনা করতে গেলে খুবই তুচ্ছ। অথচ অনুভবে সে অতুলনীয়। অতীত নিয়ে মাথা ঘামায় না তাবিব। সে ভবিষ্যৎ গড়ার চিন্তায় এখন। তার নিজের ছোট্ট, ভালোবাসা পূর্ণ পরিবার হওয়ার স্বপ্ন খুব বেশি দূরে নয়। শুধুমাত্র কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। ফেলোশিপ থেকে ফিরেই তাবিব তার ও নিবৃতার সম্পর্ককে মজবুত করার কাজে নেমে পরবে। ততদিন না হয় থাকুক একটু অপেক্ষা, আর অনেকটা পরিমানে ব্যকুলতা।

পর্দার আড়াল থেকে দেখা যাচ্ছে, খোলা বারান্দার দোরের কাছে, নিচে মেঝেতে বসে আছে সে। দু হাঁটু গুটিয়ে রেখে তাতে মাথা রেখেছে। চোখের দৃষ্টি অদূর আকাশে। কালো রঙের জামা তার পরনে। মাথার ঘোমটা খসে পরেছে। সুদীর্ঘ কেশরাশি পীঠময় ছড়িয়ে আছে। আর তার বর্ধিতাংশ মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে। হলদে রঙা রোদের প্রতিফলনে তাদের বেশ লালচে দেখাচ্ছে। দৃশ্যটি, সবেমাত্র কিঞ্চিৎ প্রেমের কুড়ি জন্মানো তাবিবের মনে বেশ আন্দোলন তুললো। ইচ্ছে করলো সেগুলো একটু ছুঁয়ে দিতে। কিন্তু নিজেকে দ্রুত সংযত করে নিলো ও। আত্ম নিয়ন্ত্রণে সে অত্যন্ত পারদর্শী। নিবৃতাকে সে সময় নিয়ে উপলব্ধি করতে চায়। কোন তাড়া নেই। তবে যেই সুযোগ হাতছাড়া না করলেই নয়। হাতের মোবাইলটি তুলে, সংগোপনে, বেশ সন্তর্পনে কয়েকটি স্থির চিত্র ধারণ করে নিলো সে। স্মৃতি হিসেবে। পরে তার চোখের তৃষ্ণা মিটাতে কাজে দেবে।
হঠাৎ কর্ণকুহরে মৃদু গলা খাঁকারির শব্দ পেয়ে ধ্যান ছুটলো নিবৃতার। কিছু সময়ের জন্য শরীরটা জমে এলো। বাসায় তো সেই মানুষটা ছাড়া এখন আর কেউ নেই। মনের মাঝে কেমন অজানা এক ভয় দানা বাঁধতে শুরু করলো। বুকের ভেতর কম্পন অনুভূত হলো। কিসব চিন্তারা যেন আলোড়ন তুললো মস্তিস্ক জুড়ে। কিন্তু তাদের থামিয়ে দিতে মায়ের একটি কথাই শুধু কানে বাজলো।

– তাবিব এখন থেকে তোর স্বামী হয়।
নির্মম সত্য, যার সম্মুখে নিবৃতা অপারগ। কাঁপতে শুরু করা ডান হাতটা দিয়ে সহসা নিজের বাম পাতটা পাকড়াও করলো সে।
– ভেতরে আসতে পারি?
ভদ্রলোকের মতোন সে অনুমতি চাইছে। কোন তাড়া নেই সেই শান্ত কন্ঠস্বরের মাঝে, যেন নিবৃতাকে স্থির হতে সময় দিতে চায় সে। নিবৃতা উঠে দাঁড়ালো। মাথার ঘোমটা নেমে গিয়েছে বুঝতে পেরে সেটি তুলে নিলো আবারও। তাবিবের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ। যেন নীরবতাই তার অনুমতি প্রদান। আড়ালে মুচকি হাসলো তাবিব। নিঃসংকোচে ঘরে ঢুকে পরলো। গিয়ে সোজা বসলো বিছানার প্রান্তে। নিবৃতা তখনও মুক বনে আছে। অস্বস্তি, ভয়ে গাট হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তাবিব ওর দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে থেকেই বললো,
– বাসায় তানহা বাদে যে আরও একজনের অস্তিত্ব রয়েছে, সেটা তো বোঝাই যায় না।
অভিযোগ যেন সেটি। ঠোঁট গুটিয়ে নিলো নিবৃতা।

– অবশ্য কেউ ইচ্ছে করে চোখের আড়ালে থাকলে, তাকে কি আর পাওয়া যায়?
নিবৃতার বুঝি শ্বাস আটকে এলো। লোকটা বোধহয় তাদের প্রথম দিন হওয়া সব কথা ও শর্ত ভুলে বসেছে। নাহলে এভাবে কেন বলবে? নিবৃতা কি একবার মনে করিয়ে দিবে সে ব্যাপারে? কি করবে, কি বলবে, বুঝতে না পেরে শুধু এলোমেলো দৃষ্টি ফেলতে লাগলো। তাবিবের মুচকি হাসি প্রশস্ত হয়। মেয়েটাকে এভাবে দেখতে ভালোই লাগে।
– আমি একবার চাইলে তখন কিন্তু আর এড়িয়ে যেতে পারবেন না।
নিবৃতার খুব করে অসহায়বোধ হলো। পেলব ওষ্ঠ জোড়া কেঁপে উঠতেই তাবিব আপাতত ওকে নিস্তার দিতে চাইলো। পরে নাহয় কথা হবে আবারও, ভীষন নিভৃতে। ও দাঁড়িয়ে গিয়ে বললো,
– তৈরি হওয়ার সময় তানহার জন্য এক সেট কাপড় নিয়ে নিবেন। ওকে স্কুল থেকে নিয়ে আজ আমরা সরাসরি ঘুরতে বের হবো।

– আপনি যাবেন?
মুখ ফস্কে কথাটি বেরিয়ে গেলো নিবৃতার। তাবিব হতাশায় মাথা নাড়ালো। কাছে এসে দাঁড়ালো অকস্মাৎ। আগাম বার্তা ছাড়াই ছোট, মসৃন, শুভ্র কপালে আলতো করে দু আঙুল দ্বারা টোকা দিয়ে বলে,
– আমি না গেলে আপনাদের ঘুরতে নিয়ে যাবে টাকে, শুনি? হুম?
ভড়কে গিয়েছে নিবৃতা। কপাল চেপে বিস্ময় নিয়ে এই প্রথম সরাসরি চোখ তুলে চাইলো তাবিবের পানে। তাবিব তখন, নিবৃতার প্রতিক্রিয়া হাসছে। কিছুটা শব্দ করেই হাসছে বলতে গেলে। কি জানি কি হলো আচমকা! নিবৃতার দৃষ্টি সেখানেই আটকে গেলো। তানহা তার বাবার উপরেই গিয়েছে। তাদের হাসিতে শতভাগ মিল রয়েছে। সেজন্যই বুঝি নিবৃতার ঘোর লেগে গেলো। নিবৃতাকে এভাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে, গোল গোল চোখে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে থেমে গেলো তাবিব। লজ্জায় কানের পিছু চুলকিয়ে বললো,
– সময়মতো তৈরি থাকবেন। তানহাকে নিতে যাবো।
কথাটি বলে আর থামে নি ও। সোজা ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। এদিকে নিজের শোধবোধ ফিরতেই চোখদুটো শক্ত করে বুজে ফেললো নিবৃতা। কি হলো এটা?

হাতমুখ ধুয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হতেই নাইটস্ট্যান্ডের উপর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ নজরে পরে। তাবিব কিছুটা অবাক হলো। এরূপ কিছু সে সত্যিই আশা করে নি। নিবৃতা তাকে চা দিয়ে গিয়েছে? তাও নিজে হাতে বানিয়ে? যদিও রেনু আপার থেকে নিবৃতার খোঁজ খবর রাখে তাবিব। মেয়েটা যেমন সরল, যদি কোন অসুবিধা হয়? আপা বলেছিলেন, নিবৃতা নিজ উদ্যোগে অনেক কিছুই শেখার চেষ্টা করছে আপার কাছ থেকে। চা বানানোও বোধহয় সেটারই এক ফল। তাবিবের মনটা ভালো লাগায় ছেয়ে যায়। ও সবসময়ই স্বল্প আকাঙ্ক্ষার, অল্পতে খুশি হওয়া ধরনের মানুষ। যদিও অতীতে এই কমটুকুও কপালে জুটে নি। তবুও ও মানিয়ে নিয়েছিলো। ক্ষীণ হাসে ও। চায়ের কাপটা তুলে নেয় হাতে। এক চুমুক বসাতেই বুঝে, স্বাদটা বেশ চমৎকার! নিবৃতা বরাবরই ভালো এক ছাত্রী। সেদিনও বিনুনি পাকানো শিখিয়ে দেওয়ার পর তানহাকে ওর চুল আঁচড়ে দিতে হয় নি আর। সেই দায়িত্ব টুকুও ভালো করে বুঝে নিয়েছে নিবৃতা। প্রতিদিন বাসায় ফিরলে ঠান্ডা এক গ্লাস শরবত মিলে। মেয়েটা যত্ন করতে চাচ্ছে। শুনেছিল নতুন বৌ প্রথম রান্না করলে তাকে কিছু দিতে হয়। নিবৃতা তো শরবত, চা করে খাওয়ালো। এখন উপহার তো তার একটা অবশ্যই প্রাপ্য!

কালো গ্যাবাডিন প্যান্ট, আকাশ রঙা শার্ট গায়ে জড়িয়ে একদম পরিপাটি তাবিব। জেল দিয়ে চুলগুলো সুন্দর মতন সাজিয়ে, সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে ঘর থেকে বের হতেই দেখে সোফায় অপেক্ষারত এক অবগুণ্ঠিত মানবী। বসার ধরনে মনে হচ্ছে বেশ খানিক্ষন যাবতই তৈরি হয়ে বসে সে। অথচ একটাবার তাবিবকে তাড়া দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে নি। এখন আর তাবিব অবাক হয় না। শুধু ছোট্ট করে গার উদ্দেশ্যে বলে,
– আসুন!
তাবিব দরজা আটকে অগ্রসর হতেই তার পিছু পিছু চলে যায় নিবৃতা। নিচে এসে অভ্যাস মতন গাড়ির পেছনের দরজায় হাত দিতেই পুরুষালী কন্ঠটা একটু গমগমে শোনায়।
– সামনে গিয়ে আমার পাশে বসুন নিবেদিতা।
এই মানুষটার আদেশ অমান্য করার সাহস নিবৃতার নেই। তাই ও চুপচাপ গিয়ে বসে পরলো প্যাসেঞ্জার সিটে। তার এই বাধ্যতা অনেক পছন্দের তাবিবের। ও আর কথা না বাড়িয়ে চললো তানহার স্কুলের উদ্দেশ্যে।

রোজকার ন্যায় ছুটির পর যখন বাহিরে ছুটে এলো তানহা, তখন গাড়ির সম্মুখে বাবাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হলো সে। বিস্ময় পুরো চোখেমুখে ছড়িয়ে পরলো। পায়ের গতি বাড়িয়ে দিলো তৎক্ষনাৎ। মেয়েকে এমন দৌড়ে আসতে থেকে বিস্তর হাসলো তাবিব। নিজেও এগিয়ে গেলো।
– বাবা! তুমি এসেছ?
হাঁপাচ্ছে সে, তবুও কৌতুহল মেটাতে হবে। তাবিব ওর পীঠের ওপর থেকে ব্যাগটা নিয়ে বলে,
– জ্বি আমার মা!
– কোন দরকার?
– সারপ্রাইজ!
তানহা চোখ বড় বড় করে তাকালো! মৃদু চেঁচিয়ে বললো,
– কি সেটা?
– এতো অধৈর্য হলে হয়? একটু পরেই তো জানতে পারবে।
পেছনের দরজা মেলে মেয়েকে ভেতরে ঢোকার ইঙ্গিত দিলো তাবিব। তানহা ঝটপট গিয়েই দেখলো সামনের সিটে বসা ওর আম্মুকে। লাফিয়ে উঠে বললো,
– আম্মু! তুমিও এসেছ?
নিবৃতা মাথা নাড়ালো। পার্স থেকে রুমাল বের করে ক্লান্ত, ঘামে ভেজা মুখটা মুছিয়ে দিতে লাগলো। তাবিব মুচকি হাসি নিয়ে দৃশ্যটুকুন দেখলো চুপচাপ। অতঃপর গাড়ির ইঞ্জিন চালু করতে করতে বললো,

– এখান থেকে আগে মলে যাবো। তুমি চা চাইবে তাই কিনে দিবো আজ। এরপর লাঞ্চ করে আমরা যাবো ফ্যান্টাসি কিংডমে!
ফ্যান্টাসি কিংডমের নাম শুনেই তানহা বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পরলো। ওর মুখ দিয়ে কথা আসছে না। এরপর যখন সবটা বুঝে আসলো, সহসা গিয়ে পিছন থেকেই তাবিবের হাত আঁকড়ে ধরলো।
– থ্যাঙ্ক ইউ বাবা! থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ!
– ওনারেবল হাইনেস, ইটস্ মাই প্লেজার!

তানহা খিলখিলিয়ে হেসে উঠে। আর এখানে নীরব দর্শক হলো নিবৃতা। তানহা খুশি অর্থাৎ সেও খুশি। এরপর সুখের সময়গুলো দারুণ গতিতে চললো। শপিংমলে গিয়ে স্কুল ড্রেস পাল্টে নিলো তানহা। পরপর ঠান্ডা পানীয় হাতে চষে বেড়ালো পুরো শপিং মল। ও সত্যিই আজ যা যা চাইলো তার সবটাই হাসিমুখে কিনে দিলো তাবিব। যদিও কখনো মেয়েকে কোন বিষয়েই মানা করে না ও, তবুও আজকের মাঝে বিশেষ চঞ্চলতা আছে। শুধু মেয়ে নয়, মেয়ের আম্মুকেও কতগুলো জামা, চুরিদার কিনে দিলো তাবিব এবং সেটা অবশ্যই তার নিজের পছন্দেই। নিবৃতা এসব বিষয়ে নির্বিকার। এরপর রেস্টুরেন্ট থেকে খেয়ে দেয়ে ওদের সাভার পৌছতে পৌছতে প্রায় দুপুর গড়িয়ে গেলো। ফ্যান্টাসি কিংডমের অন্দরে প্রবেশ করতেই তানহার খুশি দেখে কে! ওর চেহারা রীতিমতো চকচক করছে। পুরো বদন জুরে প্রাঞ্জলতা, অস্থিরতা বিরাজমান। কোন রাইড ছেড়ে কোনটায় উঠবে, সেটাই ও ঠিক করতে পারছে না। ওর খুশি দেখে নিবৃতার মনটা কানায় কানায় ভরপুর। যদিও এই পরিবেশ, নিবৃতার জন্য প্রতিকূলই বটে। এসব বড় বড় রাইডস্ দেখে মাথা ঘুরছে। দুর্বার গতিতে চলছে সবকিছু! এমন দৃশ্য কেমন পেটের ভেতর সবকিছু জটলা পাকিয়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে সব বের হয়ে আসবে। মৃদুমন্দ কাপছে ভেতরটা। এক দীর্ঘশ্বাস বুক চিরে বের হয়। এতো অস্বাভাবিক ও! ওর পাশে দাঁড়ানো তাবিব ওকে নীরবে লক্ষ্য করলো পুরোটা সময়। বুঝলো নিবৃতা ঠিক নেই। এই ভয়টাই পাচ্ছিলো। ছোট করে বলে,

– আপনি ঠিক আছেন?
নিবৃতা এড়িয়ে গেলো প্রশ্নটা। ভালো লাগে না নিজের এতো এতো সমস্যার কথা তুলে ধরতে সবসময়। ও প্রসঙ্গ পালটে বললো,
– ঝিলমিল কতোটা খুশি হয়েছে! ওকে এর আগে নিয়ে আসেন নি কেন?
যেহেতু এড়িয়ে যেতে চাইছে তাই তাবিব আর ঘাটালো না ওকে। তবে, সে কি তাবিবের কাছে জবাবদিহিতা চাইছে? ওর হাসি পেলো অবশ্য। কিন্তু সেটা লুকিয়ে রেখে বললো,
– অন্যান্য পার্কে যাওয়া হয়েছে আগে। এটাই বাকি ছিল।
নিবৃতা কিছু বললো না আর। তবে বিপত্তি ঘটলো যখন তানহা ওকে জোড়াজুড়ি করতে শুরু করলো রাইডে ওঠার জন্য। এই একটা আবদার, যেটা নিবৃতার পক্ষে রাখা সম্ভব নয়। আশেপাশে চলতি রাইডগুলো এখনও বিভীষিকাময় লাগছে ওর কাছে। নিজেকে শুধুমাত্র তানহার জন্যই নিয়ন্ত্রণে রেখেছে ও। এখন সেগুলোতে চড়বে কি করে ও? আর এই অবস্থাই বা কিভাবে বোঝাবে? তাবিব অবশ্য আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলো, নিবৃতার মতো দুর্বল চিত্তের মানুষ পারবে না এসব রাইডে উঠতে। এদিকে তানহার জন্যও ও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে তানহাকে এক পাশে নিয়ে গিয়ে বললো,

– তোমার আম্মু কত নরম ধরনের মানুষ। তুমি জানো না?
– তাই বলে আমার সাথে উঠবে না?
– সে তোমার কোন আবদার রাখে নি, এমনটা কি কখনও হয়েছে? তুমি যেমন বদ্ধ জায়গা দেখে ভয় পাও, ক্লস্টোফোবিয়া আছে, সেরকমভাবে তোমার আম্মুর মনটাও খুব দুর্বল। উনি অসুস্থ হয়ে পরবে তো। তার কষ্টটা তুমি বুঝবে না?
তানহার মুখটা ছোট হয়ে গেলো।
– আমি বুঝতে পারি নি।
– মন খারাপ করে না। বাবা আছি না? আমি যাবো তোমার সাথে।
পরিস্থিতি বুঝে আর জেদ করে নি তানহা৷ সম্মতিতে মাথা ঝাকিয়ে, সোজা নিবৃতাকে আগলে ধরে বললো,
– সরি আম্মু।
– আমি সরি। তোমার ইচ্ছেটা পুরণ করতে পারছি না ঝিলমিল।

এরপর আর কি? নিবৃতাকে রেখে তাবিব মেয়েকে নিয়ে নানান রাইডে উঠলো। সেসবই বড্ড ভয়ংকর ঠেকলো নিবৃতার কাছে। সইতে না পেরে উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ওগুলো উপরে উঠে কেমন করে পেঁচিয়ে যাচ্ছে, তো আবার সজোরে নিচে নেমে আসছে। ঘুর্নিঝড়ের মতো ঘুরছে! অথচ তানহার চেহারা খুশিতে ঝলমল করছে৷ সন্তোষে সে বাকবাকুম! সন্ধ্যা নেমে আসতেই চারপাশ উজ্জ্বল আলোয় রঙিন হয়ে উঠলো। যেন স্বপ্নীল এক জগৎ। সাথে ঘনিয়ে এলো তাদের ফিরে যাওয়ার সময়। এবং শেষে গিয়ে নিবৃতার আর রক্ষে হলো না। তাবিব তাকে এক প্রকার জোর করেই জুজু ট্রেইনে ওঠানোর পায়তারা করলো। তবুও যখন ওর ভয় কাটলো না, তখন তাবিব ওর হাতটা নিজের শক্ত হাতে ধরে নিয়ে বললো,

– ভয় পাবেন না৷ আমার উপর বিশ্বাস রাখতে শিখুন।
ট্রেন সাবলীলভাবে চলতে শুরু করতেই নিবৃতার ভয় কেটে গেলো। অন্যান্য রাইডের মতো এটা পাগলাটে নয়। ধীরে ধীরে ওর নিজেরও ভালো লাগতে শুরু করলো। ওকে শান্ত দেখে তাবিবও স্বস্তি পেলো। এরপর তিনজনের এই ছোট্ট পরিবার খুশিমনেই সেখান থেকে বেরিয়ে পরলো। একবারে খেয়েদেয়ে বাসায় পৌছাতে পৌছাতে তাদের রাত দশটা বেজে গেলো। সারাদিনের ক্লান্তিতে তানহার তখন ঘুমে ঢুলুঢুলু অবস্থা। ঘরে ঢুকেই ও থপ করে বিছানায় পরে মুহুর্তে গভীর নিদ্রায় ডুবে গেলো।

রাতের ইবাদত শেষ করে সবেমাত্র উঠেছিল নিবৃতা, তখনই দরজায় মৃদু করাঘাতের শব্দ হয়। ও জানে মানুষটা কে। ঘরে তানহা আছে, তাই আর কোন সংশয় কাজ করলো না। খানিকটা এগিয়ে গিয়ে বললো,
– জ্বি।
কয়েক পল পরেই তাবিব এলো ঘরে। সবার আগে চোখ গেলো খাটে। তানহা ঘুমিয়ে আছে৷ তাবিব মায়াময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সেখানে। মেয়েটাকে কাল থেকে আর সরাসরি দেখা হবে না। তার আবাদরে সায় জানাতে পারবে না তৎক্ষনাৎ! আহ্লাদ করা হবে না৷ বুকটা হাহাকার করে উঠলো। ওর পাশে বসে থেকে কিছুক্ষণ নীরবে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। নিবৃতা হয়তো তার মনের অবস্থা কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারলো। খারাপ লাগাটা স্বাভাবিক। ক্ষণকাল পরেই তাবিব উঠে দাঁড়ালো। নিবৃতার সামনে গিয়ে বললো,

– আমার ঘরে আসুন। আর প্লিজ, দ্রুতই আসবেন। আমি অপেক্ষায় আছি নিবেদিতা।
শীতল, গভীর স্বর। নিবৃতার বদনে হীম ধরে গেলো। এই রাত করে ওকে ঘরে ডাকছে কেন লোকটা? তাবিব চলে যেতেই নিবৃতার মুখে আঁধার নামলো। আজ সকালের ভয়টা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। কি করবে ও? ডান হাতটা শিরশির করতে শুরু করেছে। খারাপ কিছুর লক্ষ্যণ। কতশত ভাবনারা মেলা জমিয়েছে মস্তিষ্কে। ঘড়ির কাটার টিকটিক আওয়াজ কানে লাগছে। ও না চাইলেও যেতে বাধ্য! অসহায়ত্বে, নিশ্চল পা জোড়া টেনে নিয়ে গেলো ওয়াশরুমে। মুখে পানির ঝাপটা লাগালো বারংবার। মুখ তুলে নিজেকে আয়নায় দেখলো। এক ভগ্ন, রুগ্ন সত্তা ছাড়া কাওকে দেখলো না। ওর প্রতি কারও রুচি আসে কিভাবে? এই যে তানহা ওকে এতো ভালোবাসে, আর তানহার বাবা? ভালো না বাসলেও অপছন্দ যে করে না, সেটা নিবৃতা বোঝে। কেন করে না অপছন্দ? সে না নিবৃতা সম্পর্কে জানে। তাহলে কেন এতে ভ্রুক্ষেপহীন সে?

অতীত জীবনের খুব বেশি কিছু নিবৃতার মনে নেই। স্মৃতির পাতাগুলো সাদা, পুরোটাই খালি। অথচ যা ভোলা উচিত ছিল তার পুঙ্খানুপুঙ্খ সবটা মস্তিষ্কে গেঁথে আছে। একজন মহিলার বলা একটি কথা এখনও মনে পরে ওর। যদিও পরে জানতে পেরেছিলো সে সম্পর্কে নিবৃতার বড় চাচি হয়। আপন মানুষ, তবুও জবান এতো রুক্ষ!
– ও তো নষ্ট হয়ে গেছে। যে কেউ দেখলে নাক সিটকাবে! নীরব, তোমার মেয়ের ভবিষ্যৎ তো অন্ধকার!
ভবিষ্যত শুধু? ওর গোটা জীবন সত্যি সত্যিই অন্ধকার হয়ে গিয়েছিলো। তমসাতেই নিমজ্জিত ছিল সে। হঠাৎ কোথা থেকে এই একটা বাচ্চা মেয়ে এলো। তারপর সবটা ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয়ে গেলো। এই নষ্ট মেয়েটা এখন কারও স্ত্রী! ওর নিজের ভাবলেই গা গুলিয়ে ওঠে! অন্যের প্রতি বিতৃষ্ণা ও নিজের উপর থাকা ঘৃণা ওর অন্তরটা জ্বালিয়ে আঙ্গার করে দেয়। আগে এই অনুভূতিটা কাজ করতো না।

নিবৃতা পর্ব ৭

বাবা সবসময় নিবৃতাকে আগলে রেখেছে। কিন্তু যখন তিনি চলে গেলেন, তখন থেকেই নিবৃতা বুঝতে শুরু করলো, ওর জন্য ওর বাবাসহ পুরো পরিবার কি কি সহ্য করেছে এবং এখনও করছে। এজন্যই তো এতো ঘৃণা জন্মেছে নিজের উপর! ভাঙাচোরা অনুভূতির তোড়ে বেসিনে দু’হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে নিবৃতা! ধীরে ধীরে লম্বা লম্বা শ্বাস ছেড়ে নিজেকে ধাতস্থ করে। আর কিছু নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। এই বিয়ে, এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হবে। তার পরিবারের জন্য, ঝিলমিলের জন্য! তয়লা দিয়ে মুখ মুছে নেয় ও। ভালোমতো ওড়না গায়ে জড়িয়ে, মাথায় ঘোমটা তুলে, বেরিয়ে পরে ঘর ঘেকে। গুটি গুটি কদমে সেই ভয়াল কক্ষের সম্মুখে আসতেই গভীর কন্ঠস্বরটি কানে আসে। লোকটা বোধহয় তার কথামতন ওর অপেক্ষাতেই পথ চেয়ে ছিল বুঝি!
– নিবেদিতা।

নিবৃতা পর্ব ৯