Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৪৭

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪৭

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪৭
আশিকা আক্তার সোহাগী

“রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অনীহার অন্যতম শাস্তি হচ্ছে ,নিজের তুলনায় নিকৃষ্টদের দ্বারা শাসিত হওয়া-প্লেটো”
ক্ষমতা লোভী ছাড়া রাজনীতিতে মানুষ সহজেই জড়াতে চায় না।এইজন্য নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ রাজনীতিতে নেই।বহু প্যাচ বিশিষ্ট ব্যাক্তিরা নেতাখেতা হয়ে দেশ চালাই।আর সাধারণ অসাধারণ সব জনগণই শাসিত হয় তাদের তারা।
পুরা সাভার লণ্ডভণ্ড করে ফেলেছে নিবিড়ের সিক্রেট গুন্ডা টিম।এরমাঝে বাতাসে খবর ছেপে গেছে যে কোটি কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে সারাদিনে।জিয়ানা রাব্বির ঘরের খাটে বসে আছে অনেক্ষণ। তার মাথা ভোতা হয়ে গেছে।
মক্কুর সাথে কথা হয়েছে ,স্বরাষ্টমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সাথে সফর সঙ্গী হয়ে ব্রিটেন গেছেন।তাকে পাওয়া যায়নি।মক্কু চিন্তা করতে না করেছে।তারা সবাই থানার সামনেই আছে।নিবিড়কে বের করলে তারাও সাথে সাথে যাবে।
জিয়ানা চিন্তামুক্ত হতে পারছে না।জেনিকে ফোন দিয়ে বিভিন্ন জনের নাম্বার কালেক্ট করলো। তালহা ,সজল ,মিম,জিয়াউল,ওসি হাবিব সবার সাথে কথা বলেও কোন সুরাহা পেলো না সে।হঠাৎ ফোনের শব্দে ধ্যান ভাঙে। অচেনা নাম্বার। রিসিভ করে কানে দিতেই শুনতে পেলো,

-আম্মা! আমি আকাশ।
জিয়ানা ফোন কেটে দেয়ার সাথে সাথেই আবার কল এলো।
-আমি আকাশ। নিবিড় ভাইয়ের লোক।
-আমি আপনার কোন জন্মের আম্মা হই?
-একবার আপনি ভাবি ডাকার পর আম্মা ডাকতে বলেছিলেন।
-ফাজলামির মুডে নেই।যা বলবেন ফটাফট বলে ফুটুন।
-আপনার লোকেশন অনুযায়ী একটা গাড়ি দাঁড় করানো আছে।আমরা কোন সিগনাল দিলেই উঠে পড়বেন সেটাতে।আর ভাই থানার ভেতরেই আছে।আমরা বাহিরে। সব সেটাপ। অল ওকে। টেনশন নট।উই আর অল ফাইন।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

-আপনি আমার এক বছরের সিনিয়র না হলে ,রাজনীতির মাঠ থেকে কান ধরে এনে চাবকিয়ে পড়তে বসাতাম।
-তাহলে আপনি আর ভাই আমাকে দত্তক নেন।
-খাবার দিতে দিয়েছে?
-না কথায় বলে না হ্লারা। এমন ভাব আর খাবার দিতে দিবে?
বলে জিহ্বায় কামড় দিয়ে বলে,
-সরি ভাবি।
-গাড়ি রাখার জন্য শুকরিয়া।
বলে কেটে দিলো জিয়ানা।সাইকেল ছাড়া জিয়ানার নিজেকে ইনভেলিড লাগে। গাড়িটা রাখার জন্য এখন একটু সত্যি ভালো লাগছে।যদিও ছেলেটা কথা বেশি বলে তবুও উপকারী। কিছু মানুষকে বাহির থেকে সরাসরি ভেতর পড়া যায়।এই আকাশ নামের ছেলেটা তেমন।কোন চতুরতা কিংবা ধূর্ততা ছাপ চেহারায় নেই।

দীর্ঘরাত শেষে সকাল হয়ে দুপুরও প্রায় শেষ। নিবিড়ের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।মক্কু আর আকাশের সাথেও কথা হয়নি মধ্যরাতের পর। তাদের ফোন সুইচড অফ।জিয়ানা জেনির ফ্ল্যাটে এসে গোসল করে থমথমে মুখ করে বসে আছে অনেকক্ষণ। কাল থেকে পেটেও তেমন কিছু পড়েনি।রাব্বি রাতে একটা বাটার বান দিয়েছিলো। সারাদিন অভুক্ত থাকার পর অল্প খেয়ে উল্টা বমি হয়েছে জিয়ানার।সকালেও পানি খেয়েছে শুধু। গভীর চিন্তায় সে মগ্ন।জেনি পাশে বসে ভাতের সাথে ডাল আর আলুভাজি মাখতে মাখতে বলে,
-আমি চিন্তাও করতে পারিনি তুই এইভাবে নাকে মুখে কারো প্রেমে পড়বি।কাল পর্যন্ত তোর লজিক্যাল প্রেম আমার কাছে অদ্ভুত লাগলেও ,আজ আমি সেন্ট পার্সেন্ট শিওর তুই ইমোশনালি এটাচ হয়ে গেছিস।নে খা। মুখ চোখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না।
প্রচন্ড অনিচ্ছা সত্ত্বেও হা করে অল্প ভাত মুখে নেয় জিয়ানা।চিবানোর সময় দাঁত আর চোয়াল যেনো লেগে আসছিলো।জেনিকে ইশারায় ডালের বাটি দেখায়।মানে আরও ডাল নাও।

-বেশি ডাল নিলে লোকমা উঠাবো কিভাবে?
-পিউ খাবো। নাও।
জেনি হাঁসে জিয়ানার নিজস্ব কিছু শব্দ মনে করে। পিউ , ফুটুন,কিচাইন ,খিস্তি,ভেটকি লোচন ,চ্যাং মাছ ,ফটকা ,মাইরি আরও অসংখ্য শব্দ আছে। আব্বু শুনলেই পানিশমেন্ট খেতো তবুও অভ্যাস ছাড়তে পারতো না।
জেনি এটা সেটা বলে জিয়ানা উত্তর করে না।যখনই নিবিড় সম্পর্কিত কথা বলে ,তখন মনোযোগ দিয়ে শুনে এবং উত্তর দেয়।জেনি হাঁসে মনে মনে।তার বোন নিজের অজান্তেই ভালোবাসায় জড়িয়ে গেছে এক রাজনৈতিক লোকের সাথে।
মানুষ সবসময় তার বিপরীত বৈশিষ্ট্যের মানুষের প্রেমেই পড়ে এবং সেটা গভীরভাবেই। এটাকে বলে অপজিট এট্রাকশন।কোন ফিলোসোফি দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায় না এই এট্রাকশনকে।জেনি এক লোকমা মুখে পুরে জিজ্ঞেস করে ,

-কাল তোকে ওইভাবে মেরেছিলো কেনো আমি জানি।
জিয়ানা আড়চোখে তাকায় জেনির দিকে।কিন্তু কিছু বলে না। মুখের ভাত দ্রুত চিবুচ্ছে। জেনি আবার বলে,
-কিছু কি জেনেছিস? আসলেই কি নিবিড় পি টি এস ডি(পাষ্ট ট্রমাটিক ডিসঅর্ডার)ভোগছেন?
-নট শিওর। মেইন পার্টই জানতে পারি নাই।অনেক ধোয়াশায় মোড়ানো লোকটা।
-কি করবি তাহলে?
-ভেবেছি কাল পরশুর মাঝে নূর ম্যানসনে যাবো।কিছুদিন থাকবো সেখানে।ওই বাড়ির প্রতিটা ইতিহাস আমার জানতে হবে।

-রাজনৈতিক জটিলতা ,জীবনের জটিলতা এসবের চেয়ে সংসারী জটিলতা অনেক কঠিন।সেখানে স্বামীর সহযোগিতা ছাড়া টিকে থাকা মুশকিল। তুই একাই কোন সাপোর্ট ছাড়া সেখানে টিকতে পারবি না।
-সুখের এই ভেজালটা শেষ হলে যাবো।সুখ অবশ্যই প্রটেস্ট করবে আমাকে।
জেনির হাত জিয়ানার মুখের কাছে গিয়ে থেমে যায়।অবাক নেত্রে জিজ্ঞেস করে ,
-তুই নিবিড়ের উপর ডিপেন্ডেবল হয়ে গেছিস জিয়ু? লোকটা তোকে কি করেছে বইন? দুইদিনে নিজের ঘোল পাল্টিয়ে ফেলেছিস। এমন না যে তোকে খুব ভালোবাসে বিনিময়ে তোকেও বাসতে হচ্ছে।
-সাপ দুধ খেয়েও বিষ দেয়। গরু ঘাস খেয়েও দুধ দেয়।কিন্তু মানুষ ভালোবাসা না পেয়েও ভালোবাসা দেয়।সবকিছু বিনিময়েই হতে হবে কেনো? আমি নাহয় বিনিয়োগ করলাম। হয় দ্বিগুণ ফেরত পাবো।নই অশ্বডিম্ব।
এমন সময় জিয়ানার ফোন বাজে। কানে নিয়েই উঠে দাঁড়ালো। জেনির ওড়নায় মুখ মুছে বলে,
-সুখকে অন্য থানায় নিয়ে যাচ্ছে। আমি বের হলাম বাই।

নিস্তব্ধ রাস্তার চারপাশে ঘন বনজঙ্গল। বড় বড় শাল গাছ দাঁড়িয়ে আছে বড্ড গর্বের সহিত। সাভারের ছোট কালিয়াকৈরে এই অংশ পরিকল্পিত বনায়ন করা হয়েছে।তবে এলাকাবাসীর অবৈধভাবে গাছ কাটার জন্য বন অনেকটা হালকা হয়ে গেছে।জিয়ানা ছোট সিএনজি করে ছুটছে সেই রাস্তা ধরে।কাউকেই পেলো না ফোনে।লাষ্ট যে নাম্বার থেকে ফোন এসেছে রনি নাম ,সেই ছেলেটাকে জিয়ানা চিনে।তার মারফতে জানতে পারে নিবিড়কে সাভার থানা থেকে কালিয়াকৈর থানায় নেয়া হচ্ছে।
জিয়না সেই ফাঁকা নিরিবিলি রাস্তা ধরে ছুটে চলেছে।মাঝামাঝি এসে ড্রাইভারকে জিয়ানা থামতে বলে। কারণ রাস্তায় একপাশে রক্তে ভেজা। জিয়ানা তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে পায়ে পা লেগে মুখ উপুড় করে পড়ে যায়।সেই পড়াকে আমলে না নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। ফাঁকা সুনসান রাস্তায় এমন রক্তে ভেজা দেখে তার প্রাণ হু হু করে উঠে।পেছন পেছন আর একটা গাড়ি এসে থামে।সেখান থেকে রনি সহ আরও কয়েকটা ছেলে নেমে আসে।জিয়ানা রনিকে দেখে রাস্তায় ইশারা করে। রনি চোখ নামিয়ে নেয়।

জিয়ানা হাটু গেড়ে বসে পড়ে সেখানেই। চোখের পর্দা ঘোলা হয়ে আসে জমে থাকা জলে।মাটি থেকে মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকায়। কিসের শত্রুতা তার সাথে প্রকৃতির? কার কি ক্ষতি করেছে সে?কেনো কাউকে আকড়ে ধরলেই তাকে হারিয়ে যেতে হবে? কেনো কেউই জিয়ানার নিজের বলে থাকে না।এত কেনো অভাগা হয়ে জন্মাতে হলো তাকে? বুকে প্রচন্ড চাপ অনুভূত হলো। গলার কাছে সেই চাপ কুন্ডলী পাকিয়ে আটকে যায়।হা করে নিশ্বাস নিতে। কিন্তু ব্যার্থ হয়। ডান হাত মুষ্টি করে বুকে কিল দেয় পরপর। তবুও ছাড়া যাচ্ছে না নিশ্বাস।কি বেইমান হৃদয় তার ,সবসময় নিজেকে ভালোবাসবে বলে বলে শেষমেশ ভালোবাসলো এক ভন্ডনেতাকে। সে তো প্রথম থেকেই তাকে ফাঁকি দিয়ে আসছে। আজীবনই দিবে।

জিয়ানা যখন চুপচাপ রাস্তায় বসে আছে।পেছন থেকে রনি এগিয়ে আসে একটা রুমাল নিয়ে। কিন্তু জিয়ানার কাছাকাছি যেতেই কেউ তাকে সজোরে কিক মেরে ফেলে দেয় রাস্তার সাইডের মাটিতে।
কক করে একটা শব্দ বের হলো রনির মুখ দিয়ে।জিয়ানার চোখের জল গাল বেয়ে গলার কাছে ট্রি-শার্টে জমা হচ্ছিলো।সেই শব্দে পেছনে ফিরে দেখে মেহেদী ইসলাম রি*ভালবার তাক করে রেখেছে রনির দিকে।জিয়ানা উঠে দাঁড়িয়ে নিস্পৃহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে সব।মেহেদী এগিয়ে গিয়ে ফাঁকা একটা গুলি করে বলে,
-নিজে নিজে সব বল নাহলে নেক্সট গুলি তোর মগজে করবো।
রনির সাথের দুই ছেলে দিক বিদিক ভুলে পালিয়ে যায় বনের ভেতরে। আর রনি ভয়ে কাপতে কাপতে বলে,
-ভাই ভাই!!বলতাছি বলতাছি।নিবিড় ভাই যেমন ছোট ম্যাডামকে ব্যবহার করছে থানা থেকে বের হইছে ,হুইপ স্যারও তেমনি নিবিড় ভাইয়ের বউকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।তাই আমরা উনার নির্দেশ মতোই নাটক সাজাইছি।

-তুই না নিবিড়ের চামচা?বেইমানি করা শুরু করেছিস কবে থেকে?
-ভাই আমার তো জানের ভয় আছে। হুইপ স্যার নিজে ডেকে ‘টাকা না জান ‘অফার দেয়।এইখানে আমার আর কি কিছু করার থাকে?
-নিবিড় জানে তুই যে দুমুখো সাপ?
রনি মাথা দিয়ে না করে।তারপর মেহেদী বি*ভালবার দিয়েই ইশারা করে চলে যাওয়ার জন্য।জিয়ানা এতক্ষণ এদের কথার কিচ্ছুই বুঝেনি।সিএনজির ড্রাইভার গন্ডগোলের আভাস পেয়েই গাড়ি রেখেই পালিয়েছে।মেহেদী জিয়ানার কাছে এসে ফিচেল হেঁসে বলে,
-জামাই ওইখানে গুলশান ক্লাবে হুইপের মেয়ের সাথে পার্টি করে আর বউ তার জন্য রাস্তায় বসে কান্নাকাটি করছে।আহা কি সিন হ্যায়!

জিয়ানা মেহেদীকে পাত্তা দিলো না।এই লোক মুখ খুললেই বাজে কথা বের হয়।একে এড়িয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।তবে রনি আর মেহেদীর কথায় তার বুকের ভার কমে এসেছে।নিবিড়ের কিছু হয়নি এটা নিশ্চিত।সিএনজিতে উকি মেরে দেখে ড্রাইভার গায়েব।পেছনের আরও দুইটা গাড়ি। কালো গাড়িটা মেহেদীর আগেও দেখেছে।জিয়ানাকে চুপ থাকতে দেখে মেহেদী রি*ভালবারটা কোমড়ে গুজতে গুজতে বলে,
-কিচ্ছু জানো না মনে হচ্ছে? তুমি এখনো নিবিড়কে চিনো নাই।স্বার্থ ছাড়া এক পা না চলা পাবলিক সে।মামলা হয়নি ওর নামে। সন্দেহের খাতিরে ধরা হয়। আর মামলা দিতেও পারতো না এমন সিস্টেম করে রেখেছিলো সে।
জিয়ানা হন হন করে উল্টা ঘুরে হাটা শুরু করে।বাকুয়াজ শুনতে চায় না সে।সব হবে নিবিড়ের নামে উল্টাপাল্টা কথা।এরমাঝে জিয়ানার ফোনে কল আসে।মক্কুর কল,হাটা থামিয়ে ফোন রিসিভ করে।
-জিয়ানা কোথায় তুমি? ভাইকে ঘন্টাখানেক আগে ছেড়ে দিছে।উনি গুলশান ক্লাবে একটা কাজে গেছে।সব ঠিকঠাক আছে আপাতত। আমাদের কারো ফোনে চার্জ ছিলো না।কাল সারাদিন সারারাত থানার সামনে থাকায় ফোন ডেথ হয়ে ছিলো বুঝি নাই।

-আমি ঠিক আছি। বলে কেটে দেয় জিয়ানা।আবার ঘুরে মেহেদীর কাছে গিয়ে বলে,
-গুলশান ক্লাবের মেম্বারশিপ কার্ড আছে আপনার? এন্ট্রি করা যাবে?তাহলে নিজ চোখে দেখতাম আপনার কথার গ্রহনযোগ্যতা ঠিক কতটুকু?
-দ্যাটস স্পেলনডিড। আলবৎ যাওয়া যাবে। কার্ড সঙ্গেই আছে লেডি।নিজের হাজবেন্ডের আসল গুন দেখে আসবে ,আমিও দর্শক।
-কম কথা বলবেন।এখন ঘটনার সারমর্ম বলুন।আর আপনি এখানে কিভাবে?
গাড়িতে উঠতে উঠতে বলে,

-নবীনগর রাস্তা ক্রসিংয়ের সময় তোমাকে দেখি সিএনজিতে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে বসে আছো। ভাবলাম নিবিড়ের খবরটা দেয়।তবে তোমার চিন্তাটা দূর হতে পারে।যদিও সেধে সেধে উপকার করা আমার বৈশিষ্ট্য না।
জিয়ানা বিনাশব্দে গাড়িতে উঠে বসে।গাড়ি ঘুরিয়ে মেহেদী যাত্রা পথে বলা শুরু করে ,

-আমি মালেশিয়াতে ছিলাম কিছুদিন।সেখানে এক হসপিটালে কসমেটিক সার্জারী করে রেজাউলের ছোট মেয়ে রুহানী সরকার। আমি দেখেই চিনে ফেলি আর সেখানেই পরিচয়। আমাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় নিবিড়ের ভাই বলে।তার কথায় বুঝতে পারি নিবিড়ের উপর দূর্বল।একসাথেই একই ফ্লাইটে আমরা গতকাল দেশে আসি। রুহানী আসে নিবিড়ের কথায়।নিবিড় আগে তাকে একদম পাত্তা দিতো না। কিন্তু মাসখানেক আগে নিবিড় ওর সাথে যোগাযোগ করে।তাদের মাঝে একটা সখ্যতা হয়।আজকে রুহানীর বার্থডে হিসেবে গুলশান ক্লাবে পার্টি থ্রো করেছে স্বয়ং নিবিড় । কিন্তু হঠাৎ দুইদিন থেকে নিবিড় যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় এবং জানায় তার বাবা জেনে গেলে নিবিড়ের রাজনীতি ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিবে। এমনকি হ*ত্যাও করতে পারে।ব্যাস নিবিড় আটক হওয়ার পরেই রুহানী তার বাপকে হুমকি ধামকি দেয়। লাইভে এসে বাপের সব ফাঁস করে দিবে যদি না নিবিড়কে ছেড়ে দেয়।বাকিটা তোমার জানা।
জিয়ানা চোখ বন্ধ করে সব শুনে।এটা নিবিড়ের সেকেন্ড চাল ছিলো তাহলে।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কাজে না আসলে রুহানী আর রুহানী কাজে না আসলে এলাকার গুন্ডা বাহিনী। লোকটার রক্তে রাজনীতি কিন্তু নোংরা রাজনীতি যেটাকে বলে। অবশ্য সাপের সাথে সাপের ভাষায় কথা বলতে হয়। যা করেছে হইতো তার জায়গাতে ঠিকই।এমনও হতে পারে এই লোক আরও মসলা মিশিয়ে বলছে যেনো জিয়ানা কষ্ট পায়।জিয়ানা আজ কষ্ট পাচ্ছে। নারী স্বত্ত্বা অদেখা রুহানীর চুল টেনে ছিড়ে দিতে চাচ্ছে।

নিয়ানাকে চুপ থাকতে দেখে মেহেদী বলে,
-নিবিড়কে এনকোয়ারি করেই ছেড়ে দেয়নি আমি নিশ্চিত।রেজাউল সরকার প্রায় দুইঘন্টা থানায় ছিলো। নিবিড়কে কড়া কিছু ডোজ তো অবশ্যই দিয়েছে।
বলে হো হো করে হেঁসে উঠলো। জিয়ানা কানে আঙুল দিয়ে বলে,
-আপনার এই রাক্ষস মার্কা হাঁসি বন্ধ করুন।
মেহেদী বন্ধ করলো না।বরং আরও বেগ বাড়িয়ে হেঁসে বলে ,
-সৃষ্টিকর্তাকে শুকরিয়া জানাও।অন্তত আরও গভীরে পৌঁছানোর আগেই তোমাকে কৃপা করে নিবিড়ের আসল রুপ দেখালেন।

-আমি তো মাত্র কানে দেখলাম ,সেটাও এককান দিয়ে। দুইচোখ দিয়ে দেখবো ,মস্তিস্ক দিয়ে বুঝবো তারপর জাজমেন্ট আসবে।
-আমি যা বললাম যদি সত্যি হয়? তোমার তো একোল ওকোল দুইটাই শেষ। অবশ্য আমি আগে থেকেই কোন কোলই দেখি নাই তোমার। তোমার মতো পরিবারহীন মেয়েদের জন্য স্বামী অপরিহার্য।
-পৃথিবীতে শুধু মানুষ না কোন জিনিসই অপরিহার্য নয়।কারো জন্য কিচ্ছু থেমে থাকে না।
-কিন্তু বিজ্ঞান সব থামাতে পারে। একদিন সময়কেও আটকে দিবে বিজ্ঞান।বিজ্ঞান সব পারে। তাই বিজ্ঞান অপরিহার্য।
-আচ্ছা ধরলাম বিজ্ঞান সব পারে।একটা কোষ গঠন হয় নিউক্লিয়াস ,সেন্ট্রোসোম, সাইটোপ্লাজম,কোষ ঝিল্লি ইত্যাদি দিয়ে ,এটা আবিষ্কার করতে পেরেছে সাইন্স। কিন্তু একটা কোষও এলহ্ন পর্যন্ত বানাতে পারেনি কেনো?
মেহেদী থামে। প্রশ্নটা অত্যাধিক গভীর। উত্তর তার জানা নেই।জিয়ানা আরও বলে,

-সন্দেহ দুধারী তরবারির চেয়ে বেশি মারাত্মক হয়।সেন্ট পার্সেন্ট নিশ্চিত না হয়ে সন্দেহ বা অনুমান করা উচিত না।অন্তত পক্ষে স্বামী স্ত্রী সম্পর্কে।
-তুমি অদ্ভুত রকম স্মার্ট অথচ স্বামী স্ত্রী ব্যাপারটা নিয়ে গোড়াদের মত কথা বলছো।তুমি নিবিড়কে স্বামী হিসেবে কি কখনোই পাশে পেয়েছো? ছিলো কখনো তোমার পাশে কোন বিপদে?
-পাশে থাকা আর সঙ্গে থাকা দুইটা দুই জিনিস। সুখ সবসময় আমার সঙ্গেই থাকে।
-তোমাকে আমি ব্যাক্তিত্ববান নারী ভেবেছিলাম।
-আমার হাজবেন্ডের মঙ্গলই আমার ব্যাক্তিত্ব। দুনিয়াতে হাজবেন্ড ওয়াইফ এমন একটা সম্পর্ক যেটাতে ব্যাক্তিত্বের জায়গা নেই।ব্যাক্তিত্ব যত কম হবে ,এই সম্পর্ক তত সচ্ছ হবে।
-হেডস অফ টু ইউ।শ্লা নিবিড় বরাবরই ভাগ্যবান।
বলে মেহেদী গাড়ির গতি বাড়ায়।

একটা হলঘরের মতো এরিয়া। লোকে থিক থিক করছে।জিয়ানা শুনেছে এই সুনামধন্য ক্লাবের মেম্বার হতে কমপক্ষে দশলাখ টাকা লাগে।যদিও মেম্বারশিপ আবার বিক্রি করা যায়। আসলেই বড়লোকদের বড় বড় ব্যাপার। নিবিড়ও বড়লোক তার যদি প্রেমিকা কেউ থেকেও থাকে জিয়ানার মতো মামুলি কেউ হবে না নিশ্চিত। পসদের পস পার্টনার।
মেহেদীকে ফলো করে জিয়ানা এগোয়।চারদিকে চকচকে ঝকঝকের মাঝে কালো হুডি পড়া জিয়ানাই শুধু মলিন।স্টেজের সামনে এসে থামে জিয়ানা।
ক্যাটকেটে এক সুন্দরীর সাথে হেঁসে কথা বলছে নিবিড়। সুস্থ স্বাভাবিক মাঞ্জা মারা স্যুট-কোট পড়া।এই প্রথম জিয়ানা নিবিড়কে স্যুটে দেখলো। আরও বেশি হ্যান্ডসাম লাগছে লোকটাকে। একবার নিজের দিকে তাকালো। নাহ ওর সাথে তাকে মানাবে না। কোথাও সে আর কোথায় মন্ত্রী কন্যা। ঝলমলে রুপের সাথে আলাদা এক অহমিকা যেনো সারা অঙ্গে মেয়েটার। অবশ্য অহংকার না থাকলে নাকি মেয়েদের অনেকেই সুন্দরী বলে না।
এরমাঝে নিবিড় নিজের গ্লাসের সাথে মেয়েটার গ্লাস চেয়ার্স করলো। জিয়ানার সব ধ্বংস করে দিতে ইচ্ছা হচ্ছে। সে আজ আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।চোখ বন্ধ করে জোরে শ্বাস টেনে নিলো। মনে করলো জিয়াউলের একটা কথা,

-মানুষের কনফিডেন্সই হচ্ছে আসল সৌন্দর্য।যার কনফিডেন্স যত বেশি তার নিজেকে প্রেজেন্ট করার দক্ষতা ততবেশি।পোশাক আশাক জাষ্ট নিজের একটা খোলশ।দামি পোশাকের ভেতরেও একই সেই তুমি যে ঘুমে লালা ঝরাও। বি কনফিডেন্ড মাই গার্ল। নিজেকে ভালোবাসো। নিজেকে খুশী রাখো। নিজের জন্য বাঁচো। পৃথিবীতে একমাত্র তুমি নিজেই নিজেকে সত্যিকারে ভালোবাসো। বাকি সবাই কম বেশি স্বার্থের খাতিরে।
চোখ খুলে জিয়ানা। হ্যাঁ এখন ভালো লাগছে।মন আর মস্তিস্কের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সে কিসের আশরাফুল মাখলুকাত। পাশ দিয়ে বেয়ারা ড্রিংক্স নিয়ে যাচ্ছে ,জিয়ানা জিজ্ঞেস করে ,

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪৬

-এলকোহল?
-নো ম্যাম। সফট ড্রিংক্স।
জিয়ানা পার্পেল কালারের একটা গ্লাস হাতে নেয়।আর জীবনেও এমন জায়গায় আসতে পারবে কিনা কে জানে? আজকে এনজয় করুক। মন খারাপ বাসায় গিয়েও করা যাবে। সামনে তাকিয়ে দেখে মেহেদী স্টেজে নিবিড়ের পাশে দাঁড়িয়ে জিয়ানাকে দেখাচ্ছে। নিবিড় জিয়ানার দিকে আগুন চোখে তাকিয়ে। জিয়ানা তাকে পাত্তা না দিয়ে আশেপাশে ঘুরা শুরু করলো।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪৮