নীতিহীন রাজ পর্ব ৬৪
আশিকা আক্তার সোহাগী
ফিউসিফর্ম নিউরন নামের একপ্রকার কোষ থাকে মস্তিষ্কে।যেটা সহানুভূতি অনুভবে সাহায্য করে। খুব কম সংখ্যক প্রাণীর থাকে এই কোষ।মানুষের পর হাতির মস্তিষ্কে এই কোষ সবচেয়ে বেশি সচল।এমন কি হাতি চলাচল এতটা সাবধানে করে থাকে,যেনো ছোট কোন প্রাণী তার দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত না হয়।জিয়ানার লাগে সেও হাতি গোত্রের কেউ।এত এত বাদ ভাঙ্গা সহানুভূতি আসে মাঝেমধ্যে যা তার নিজের কাছেই বিরক্তি লাগে।নিজের কাজের বাগড়া দিয়ে হলেও অন্যের উপকারে সে ঝাপিয়ে পড়ে।ক্লাস শেষে তাদের ডিপার্টমেন্টের নতুন গার্ডের চোখের অপারেশনের জন্য ফান্ড ঘটন করতে গিয়ে বেশ দেরি হয়ে গেছে।
বিকালটাও মরে এসেছে।ফোন বের করে দেখে নিবিড়ের কল এসেছে বেশ কয়েকটা।সিদ্ধান্ত নেয় একেবারে বাড়ি ফিরেই কথা বলিবে।ফেরার সময় শফিক আহমেদও ফোন দিয়ে বলে”আমার খুব শখ ছিলো শেহনাজকে কালো জামদানীতে দেখার। জোকের বসে শাড়িটা কিনেও ফেলেছি।আমি জানি শেহনাজ আমাকে আর সুযোগ দিবে না।তাই আজ লাষ্টবারের মতো এই শাড়ি পড়া ওকে শুধু একবার দেখতে চাই।”
জিয়ানা ঘাড় চুলকিয়ে বলে”দিলেন তো ফাঁসিয়ে?আচ্ছা আপনি তবে বাজারের গলিতে আসুন আমি নিয়ে যাচ্ছি সাথে।তবে কথা দিতে পারবো না! ”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“কথা দিতে হবেও না। আমি জানি তুমি পারবে।”
অন্যথা বাধ্য হয়েই তাকে বাজার হয়েই ঘুরে যেতে হলো।শফিক আহমেদ দাঁড়িয়েই ছিলো।ভদ্রলোকের চুপসানো গালে সবসময় একটা রমরমা হাঁসি লেগেই থাকে।কষ্ট লোকানোর জন্য নাকি নিজের করা একসময়ের কাপুরুষত্বের আড়াল করতে এই হাঁসি কে জানে? জিয়ানা ফিরতি হাঁসি দেয়।এগিয়ে গিয়ে সালাম দেয়।শফিক আহমেদ দুইটা শপিং ব্যাগ বাড়িয়ে দেয় জিয়ানার দিকে।
‘এখানে দুইটা শাড়ি কেন?’
‘একটা ঘুষ।’
‘আমার সাথে দুনম্বরি? ‘
অট্টহাসি দিয়ে শফিক আহমেদ বলে,’তবে দেখা হচ্ছে সন্ধ্যায়?’
‘সন্ধ্যা হতে দেরি নেই।আমার সাথেই চলুন?’
‘এভাবে খালি হাতে কিভাবে যাই?’
‘তবে আমার কাধ ব্যাগটা আপনি নিতে পারেন?’
আবার অট্টহাসি দেয় লোকটা।তারপর হেঁসে হেঁসেই জিজ্ঞেস করে ,’আমার দেখা অসংখ্য মেয়ের মাঝে তুমি একেবারেই আলাদা ইয়াং লেডি’
‘আমি আসলে আলাদা না।আমি আপনাদের মতোই।অন্য মেয়েদের মতো নাখরা নেই তাই আলাদা লাগে।তাই তো?’
মাথা নেড়ে শফিক আহমেদ প্রশ্ন করে ,’জীবন নিয়ে তোমার প্ল্যান জানতে ইচ্ছা হচ্ছে?’
‘বিশেষ কোন প্ল্যান নেই বেটার লেট।তবে আমি ইদানীং ক্ষমতার স্বপ্ন দেখি।এমন একটা ক্ষমতা যেটা দিয়ে এই দেশ থেকে সকল পলিটিক্স ব্যান করা যাবে।প্রহসনের ডেমোক্র্যাসিকে হাটিয়ে দিতাম।’
‘ডেমোক্র্যাসি নিয়ে তোমার বিরুপ ধারণার কারণ? ‘
সামনে আগাতে আগাতে প্রশ্ন করে শফিক আহমেদ।
‘এদেশের যত অপরাধ সব হয় প্রতিটা পলিটিকাল পার্টির ছত্রছায়ায়। লিডার নিজেরাই হয় গড ফাদার।’
‘তা ঠিক।তবে ইম্প্রুভ যদি কিছু হয় সেটা হবে ডেমোক্র্যাসিকে পুজি করেই।সংকর জাতি তো আমরা। তাই ইউনিটি নেই।এক একজন এক এক দিকে গ্রুপিংয়ে ব্যাস্ত।তুমি এখানে দাঁড়াও ,গাড়িটা নিয়ে আসি।’
বলে ভদ্রলোক নিজের লম্বা পা ছুটালে রাস্তার অপজিটের দিকে।
জিয়ানা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার সাইডের সাইকেলের শোরুম।আজ একসপ্তাহ থেকে নিবিড় জিয়ানার সাইকেল আটকিয়ে দিয়েছে।কেমন ন্যাড়া ন্যাড়া লাগে তার সাইকেল ছাড়া।পথ আগাতেই চায় না।শোরুমের দরজা অল্প খুলে মাথা ভেতরে ঢুকিয়ে জিজ্ঞেস করে ,
‘কার্ড এলাও?’
ক্যাশে বসা লোকটা আড়চোখে তাকিয়ে মাথা দিয়ে না করে।জিয়ানা দরজা ছেড়ে বাহিরে এসে ভাবে ‘গরিব’।পরক্ষণেই তার মনে হলো
যাচ্চলে যাহ।একটা কার্ড পেয়েই যদি নিজের মাঝে জমিদারি ভাব চলে আসে।তবে বড়লোকদের ভাব দেখানো ঠিকই আছে।গায়ে দামী পোশাক ,পায়ে ব্র্যান্ডের জুতা থাকলে ভেতরের শয়তানের উঁকিঝুঁকি মারা অতি স্বাভাবিক। নাহ এই কার্ড ফেরত দিতে হবে।
এরমাঝেই শফিক আহমেদ কালো মার্সিডিজ এএমজি সিরিজের গাড়ি নিয়ে হাজির হয়।জিয়ানা হা করে তাকিয়ে ভাবছে ,দূর চারপাশে এত বড়লোক কেন?গাড়িতে উঠে জিয়ানা ভেতরে তাকিতুকি করে বলে,’এই গাড়িটার দাম কতো আংকেল?’
‘কারেন্ট প্রাইজ জানি না। বিডিতে হইতো ১কোটি বিশ লাখ হবে।’
জিয়ানার বড় করে তাকানো দেখে শফিক আহমেদ আবার বলে,
‘এটা কিন্তু আমার গাড়ি না।এটা আমার ছোট ভাইয়ের গাড়ি। আমি যতদিন বিডিতে থাকি ওর এই গাড়িটা আমি ইউজড করি।’
জিয়ানা চুপ হয়ে যায়।এদের সাথে কথা বলে লাভ নাই।এদের চোদ্দগুষ্টি বড়লোক। তাদের মতো একটা বাইসাইকেল দিয়ে জীবন পাড় করা পাবলিক না।শফিক আহমেদ গলা খাকড়ি দিয়ে বলে,
‘তুমি কিন্তু আংকেলে নেমে এসেছো বেটা?’
‘ওহ তাই নাকি?মনের ভুলে।আগেও এসেছেন কখনো নূর ম্যানসনে?’
‘সামনে দিয়ে বহুবার যাওয়া হয়েছে’
‘আজ ফাইনালি যাচ্ছেন। হয় দেশ নয় শ্যাষ’
দুইজনই হাঁসে একসাথে।
একটা বড় পিকাপ ভ্যানে সব পিসি গুলা উঠিয়ে দিয়ে তালহাকে নিজের ফ্ল্যাটের চাবি দিলো নিবিড়।আপাতত সেখানেই সব সেটাপ করবে।
নিবিড় ক্লাব থেকে বের হয়ে দাঁড়িয়ে আরেকবার ক্লাবটাকে দেখে।অনেক অনেক বছরের সম্পর্ক এই টিনের ঘরটার সাথে।ন্যায়ের চেয়ে অন্যায়ই বেশি হয়েছে এখানে।আজ নিবিড় বেরিয়ে যাচ্ছে ঘরটার কি আনন্দ হচ্ছে?হতে পারে।নিবিড়ের মনে হয় সে কারো জীবনে বিশেষ আনন্দের কিছু না।থাকার জন্যই থাকা টাইপ কেউ।আজ নাই কাল রিপ্লেসমেন্ট চলে আসবে।মক্কু হইতো বুঝলো নিবিড়ের মনোভাব। এগিয়ে এসে বলে,
‘ভাই!কেমন জানি মনে হইতাছে কেউ শরীর থেকে কাপড় টেনে খুলে নিতাছে।ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার পরেও এই ক্লাবের জন্য নিজেকে কানেক্টেড লাগতো ক্যাম্পাসের সাথে। আজ সব সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলো।’
‘থাক তাহলে তুই।নতুন কমিটিতে চাইলেই ফাষ্টাক্লাস পদ পাবি।’
‘যেইখানে আপনে নাই সেখানে আমিও নাই।দেখেন না শ্বশুরবাড়িটাও এক আমাদের।’বলে চমৎকার হাঁসে মক্কু।নিবিড় মক্কুর কাধে হাত দিয়ে বলে’আকাশ কই? ‘মক্কু আঙুলের ইশারায় মাঠের সাইডে আকাশকে দেখায়।মিমের রাস্তা আটকিয়ে কি জানি বলছে।
‘জা*নোয়ারটা কখনোই সিরিয়াস হবে না তাই না?’নিবিড় বলে উঠে।
‘ভাই মামলা কিছু অন্য। এই মাইয়ারে রাতে গোপনে পাহারা দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেয় আকাশ।পরশু নাকি কোন পোলারে পেদানি দিছে রাস্তায় অসভ্যতামী করার জন্য।আপনার কাছে শিখছে।’
বলে মাথা চুলকায় মক্কু।নিবিড় মুচকি হেঁসে বলে, ‘আমার হিসেবের সাথে ওর হিসেব মিলবে নাকি?এই মেয়েটা বেশ শান্তশিষ্ট গোবেচারা।একে একটা ধমক দিলে কেঁদে কবুল বলে দিবে।ব্যাপারটা দেখিস তো? ভন্ডটা যদি একটু সিরিয়াস হয় এতে।’
‘আচ্ছা কথা বলে দেখমুনি।কিন্তু ভাই প্ল্যান বি তো আমি বুঝতাছি না।’
‘আজকে ব্রিফলি বুঝাবো তোদের সকল প্ল্যান।টিমকে রেডি থাকতে বলিস।আর নকশাটা রেডি করেছে কিনা খোঁজ নিস।জিয়ানা বেশ তৎপর হয়ে গেছে।ওকে আর আটকিয়ে রাখা যাবে না।’
‘ইদুর গুলা দিয়ে কোন কাজে আসলো না কেন ভাই?’
‘কারন ওইদিক দিয়ে যাওয়া আসার কোন রাস্তা নাই। মেইন পয়েন্ট টাই হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ অফিস।’
‘নির্বাচনের পর হাত দিলে হইতো না?জিয়ানাকে বুঝানো যায় যদি?’
‘ওর মাইন্ড ডায়বার্ড করা যায় না।যেটা উচিত মনে করে সেটা করবেই।আমাকে স্বামী হিসেবে বিশ্বাস করলেও পলিটিশিয়ান হিসেবে একবিন্দু ভরসা করে না।’
‘এতকিছু কিভাবে বুঝলেন ভাই?আমাকে তো কথায় প্রকাশ করলেও বুঝি না কিছু।’
‘জিয়ানার এপিয়ারেন্সটাই এমন আমার কাছে লাগে সব চোখে মুখে ভাসে।ওকে আমি পড়তে পারি।আর এটাও বুঝতে পারছি গত তিনদিন পরিবারকে সময় দিয়ে ওও ভাবছে লক্ষ্য থেকে সরে গেছে।এখন আগামী তিনদিন যা ঘটাবে সেটা আনপ্রেডিক্টেবল। হয় একাই ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে ঢুকে যাবে। নাহয় আমাকে ব্ল্যাকমেইল করবে।তবে কিছু একটা করবে শিওর’
মক্কু হা হয়ে নিবিড়ের কথা শুনে।এদিকে জেনি সেদিন বলল,’জিয়ানা নাকি নিবিড়ের হাবভাবে সব ধরতে পারে।ওকে যখন আটকে রাখে তখন নিশ্চিত কোন বড় কাজ গোপনে হয়ে যায়।’
নিজের অবাক ভাব নিজের কাছে রেখে বলে,’ভাই আপনাদের মতো দুইজন বুদ্ধিমান মানুষের বাচ্চাকাচ্চা নিশ্চিত আইন্সটাইন টাইপ কেউ হবে।’
‘এই জন্য হবেই না।কারণ বাঙালি যদি আইন্সটাইন টাইপ কেউ হয় ,সবার আগে আবিস্কার করবে কিভাবে ঘরে বসে দেশের বলাৎকার করা যায়।চল আগে হাতের কাজ গুলা শেষ করি।’
জিয়ানা গাড়ি করে আসার সময় সব সাজিয়েছে কিভাবে কি বলবে স্বপ্নাকে।গাড়িতে বসেই উম্মে কুলসুম কে সব জানিয়েছে।এটাও বলেছে গভর্নেন্স আর ভেতরের অন্যান্য গার্ডদের ছুটি দিয়ে দিতে।যেনো বাহিরের কেউ না থাকে।
ডয়িংরুমে শফিক আহমেদকে বসিয়ে জিয়ানা শাড়ি দুইটা নিয়ে উপরে যায়।দরজায় নক করার পর স্বপ্না ভেতরে যেতে বলে।জিয়ানা ভেতরে গিয়ে একটা শাড়ি স্বপার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,’মা আমি দুইটা সেইম শাড়ি এনেছি।তোমার সাথে মেচিং করে পড়ে ফটোসেশান করার জন্য।প্লিজ না করো না?’
স্বপ্না সরল মনে মুচকি হেঁসে শাড়িটা হাতে নেয়।জিয়ানা বায়না ধরে তাকেও পড়িয়ে দিতে হবে।তবে আগে একটু ফ্রেশ হয়ে আসছে বলে চলে আসে নিচে।সিঁড়িতে পা দেয়ার পর মনে পড়ে ফারহানার কথা।আবার উপরে উঠে তাদের রুমে উঁকি দেয়।মেহেদী কথা বলছে ফিজানের সাথে।তারমানে ফারহানাও রুমে।ফটাফট নিজের ফোন বের করে ছোট ছোট রসালো মেসেজ টাইপ করে ফারহানার নাম্বারে।বাহির থেকে টুংটাং শব্দ শুনে হেঁসে কুটোকুটি হয়।মেসেজ দেয়ার পর কল দেয়।ফারহানা কেটে দিলো।তারমানে মেহেদী নোটিশ করেছে।
জিয়ানা ফ্রেশ হয়ে স্বপার রুমে আবার গিয়ে দেখে উনি রেডি হয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছেন।ঘাড়ের উপর মোটা একটা খোপায় টকটকে লাল কিছু গোলাপের দরকার ছিলো।যেহেতু নেই সো নেই।আহা উহু করে লাভ নেই ভেবে জিয়ানা এগিয়ে গিয়ে ব্যাক হাগ করে বলে,
‘তোমার মতোই সুন্দর হয়েছে তোমার পুত্র মা।দাঁড়ি গোফের কারণে বুঝা যায় না তার চেহারা।’
‘দাঁড়ি আর একটা কারণে কাটে না।গলায় দাগের জন্য।আমি নাকি আমার ছেলের গলায় দা ধরেছিলাম? ‘
‘তুমি জানো না?’
জিয়ানা পেছন থেকে সামনে এসে প্রশ্ন করে। স্বপ্না অন্য শাড়িটা খুলতে খুলতে বলে ,
‘নাহ। আমার কিচ্ছু মনে নেই।শুধু সেদিনের ঘটনা না ,তখনকার অসংখ্য দিনের কথা আমার কিচ্ছু মনে নেই।তবে প্রচন্ড মাথা ব্যাথা আর শরীরের জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যাথা থাকতো টানা।ক্ষুধা পেতো না একেবারেই।আচ্ছা ব্লাউজ পেটিকোট কোথায়?কি দিয়ে পড়বে?’
‘পরশুর গুলা আছে শুধু ওগুলা চলবে?’
‘মেরুন কালার দিয়ে কালো শাড়ি?’
‘হলেই তো হলো। কে এত নোটিশ করবে?’
‘আমার ছেলে? ‘
‘ওহ হো আর লোক পেলে না তুমি?সুখ তো কালার ব্লাইন্ড সাদা আর কালো ছাড়া আমি তাকে অন্য কালারে দেখিনি।’
‘আমার কাছে কিছু ফ্রি সাইজ ব্লাউজ আছে পড়বে?’
‘হোয়াই নট?মা একটা কথা বলি?’
‘হোয়াই নট?’
জিয়ানা খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠে বলে,
‘যদি জীবন প্রথমবার ওয়েস্ট হয়ে যাওয়ার পর আবার দ্বিতীয় বার সুযোগ আসে সেটা ঠিক করার ,তবে কি করা উচিত? ‘
‘অবশ্যই দ্বিতীয় সুযোগ লুফে নেয়া উচিত।’
জিয়ানা স্বপ্নার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘তুমি হলে করতে?’
‘হইতো বা ‘
জিয়ানা মুচকি হেঁসে শাড়ি পড়া দেখে।
জিয়ানা স্বপ্নাকে রুমে বসিয়ে আগে নিচে নেমে দেখে সব ঠিক আছে কিনা।স্বপ্নাকে বুঝিয়েছে একটা সারপ্রাইজ আছে।তাই আপাতত রুম থেকে বের হওয়া নিষেধ। অপরদিকে স্বপ্না ভাবছে আজ কোন বিশেষ দিন তাই এমন পাগলামি করছে জিয়ানা।কাছেকুলেও কোন দিন তারিখ স্মরণে এলো না তার।
জিয়ানা ড্রয়িং রুমে নেমে দেখে রাফিন আর মাইমুনা ছাড়া সবাই উপস্থিত। মেহেদী শফিক আহমেদের সাথে গবেষণা নিয়ে কি সব প্রফেশনাল আলাপ জুড়েছে।কুলসুম আর রেবেকা ডাইনিংয়ে দাঁড়িয়ে লতাকে নির্দেশ দিচ্ছে ডিশ ডেকোরেশনের জন্য।জিয়ানার পেছন পেছন ফারহানা আর ফিজান নামে।জিয়ানা হাতের ফোনে কায়দা করে ফারহানার নাম্বারে কল করে।বড় ডয়িংরুমে ফারহানার ফোন আর্তনাদ করে উঠলে সবার দৃষ্টি পড়ে তার উপর।বিশেষ করে মেহেদী।ফারহানা ফোনটা কানে ধরার বাহানা করে একসাইডে চলে যায়।মেহেদী আড়চোখে একবার দেখে আবার শফিক আহমেদের সাথে কথা শুরু করে।
মিনিশ দশের পর স্বপ্না নিচে নামে।আর এসে শফিককে দেখেই জিয়ানার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে নিক্ষেপ করে।জিয়ানা এগিয়ে এসে স্বপ্নার কাছে দাঁড়াতেই আচম্বিতে ঘর কাপিয়ে কষিয়ে থা*প্পর মা*রেন জিয়ানার গালে।থা*প্পরের শব্দে ডয়িংরুমের দেয়ালে টাস করে ইকো খেলে গেলো যেনো।ঠিক সেই মুহূর্তে সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করে নিবিড়।কালো শাড়ি পড়া অসম্ভব রূপবতী তার স্ত্রীকে এত গুলা মানুষের সামনে চ*ড় খাওয়া দেখে নিবিড়ের মাথায় র*ক্ত ছলকে উঠে।
‘হাউ ডিয়ার ইউ?’ বলে গর্জে উঠে পাশে রাখা বড় সিরামিকের ভাসে একলাত্থি দেয়।ভাসটা ছিটকে পড়ে ফ্লোরে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।সেই ভাঙা টুকরার উপর দিয়েই কটমট করে হেঁটে গিয়ে বিশাল ডাইনিং টেবিলের নিচে ধরে খাবার সহ উল্টিয়ে দেয়।উম্মে কুলসুম ,রেবেকা আর লতা লাফ দিয়ে সরে আসে।ঝনঝন শব্দে খানখান হয়ে ভেঙে যায় টেবিল টা।
জিয়ানা গালে হাত দিয়েই তাকিয়ে দেখে নিবিড়কে।কেমন একটা হিম্মত হিম্মত চেহারা লোকটার।এতকাল শুধু আং সাং দেখেছে আজ লাইভ টেলিকাস্ট দেখলো।
মেহেদী ফারহানা শফিক আহমেদ সবাই বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়।ফিজান এক দৌঁড়ে উপরে উঠে গেলো।
নিবিড় স্বাভাবিকের চেয়ে গলার জোর প্রচন্ড পরিমানে বাড়িয়ে চিল্লিয়ে স্বপ্নার দিকে তাকিয়ে বলে,
‘বিন্দুমাত্র আত্মসম্মানবোধ কিংবা ব্যাক্তিত্ব থাকলে এই বাড়িতে আপনার একমিনিট থাকার কথা নয়।অথচ সম্পর্কহীন পরগাছার মতো পড়েই আছেন। আমি শালার কাকে কি বলছি? নিজেও তো আগাছা ছাড়া কিচ্ছু না।তবে সেটাও আপনার জন্যই।কারণ মা ভালো হলে সন্তান অটোমেটিক ভালো হয়।আমার তো রক্ত থেকে প্রতিটা ডিএনএ নোংরা আর বোনলেস দুইটা মানুষের মাধ্যমে তৈরি। আমার নিজেরও এত বড় বড় কথা সাজে না।তবে আপনার আমার স্ত্রীর গায়ে হাত দেয়ার বিন্দুমাত্র অধিকার নেই।কারো নেই। কারণ সে নীলুফা ইয়াসমিনের মেয়ে আর আমার স্ত্রী।
বুঝেছেন? ধর্ম মতে আইন অনুযায়ী বিয়ে করেছি।আমার অর্ধাঙ্গিনী। আপনার তো সেই পরিচয় নেই।কেনো পড়ে আছেন এমন বিবেকহীন হয়ে এই ম্যানসনে?লজ্জা করে না আপনার?এখানে একটা মানুষও কি আপনার আত্মীয়? কেউ কি কিচ্ছু হয়?এদের কাউকে কখনো মন থেকে মেনে নিয়েছেন? তবে? কেনো এত নাটক করছেন? কেনো চলে যাচ্ছেন না? আপনি বুঝেন না আপনাকে আমার অসহ্য লাগে? আপনাকে দেখলে আমার প্রতিনিয়ত নিজেকে শত বছরের বিষ্ঠা মনে হয়। দুনিয়াতে কি অন্য কোন প্রাণী ছিলো না যার জঠোরে আমার জন্ম হতে পারতো না?আপনিই কেনো আমাত জন্মদাত্রী হলেন?এই পরিবার কেনো আমার হয়েই হলো না? এইসব দ্বায় কার?’
শব্দহীন কান্নায় স্বপ্নার চোখে হড়কাবান বয়।নিবিড় কয়েক কদম এগিয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আবার বলে,
‘ছেলের প্রতি দরদ দেখাচ্ছেন?এতদিনে?এখন তো মায়ের দরকার নেই আমার।তবে করুণা দেখাচ্ছেন? নিজের বাকি জীবন ছেলেকে দেখেই কাটিয়ে দিয়ে নিজেকে মহৎ প্রমাণ করতে চাচ্ছেন?
স্বনা ডুকরে কেঁদে উঠে।জিয়ানা নিবিড়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।হাতের বাহু ধরে বলে,’চুপ করুন সুখ?এসব কেমন কথা?’
নিবিড় হাত ছাড়িয়ে বলে,’হয় এই মহিলা থাকবে এখানে না হয় আমি।’
তারপর যেমন এসেছিলো তেমনই বের হয়ে চলে যায়।স্বপ্না হো হো করে কেঁদে ফ্লোরে বসে পড়ে।শফিক আহমেদ এগিয়ে এসে স্বপ্নার সামনে বসে পড়ে।সে কি বলবে?কেমন একটা ড্রামা সিনের মতো তান্ডব হয়ে গেলো ব্যাপারটা। স্বপ্না নিজেকে সামলিয়ে ভেজা চোখ মুখেই বলে,
‘শফিক ভাই আপনার কাছে সময় আধাঘন্টা। যদি স্বীকৃতি দিয়ে আমাকে নিয়ে যেতে পারেন তবে এই আধাঘন্টার মাঝেই সব করতে হবে।তানাহলে আজকের পর আমার সাথে আপনার আর ইহ জীবনে দেখা হবে না।’
শফিক ফ্লোর থেকে দ্রুত উঠে বসে পকেটের ফোন বের করে কাকে কাকে যেনো কল দেয়।মেহেদী নিবিড়কে গালি দিতে দিতে ভ্যাকিউম দিয়ে ক্লিন করতে থাকে চারপাশ। ফারহানা আর লতা তাকে সাহায্য করে।
অপরদিকে কোনায় দাঁড়িয়ে জিয়ানা ভাবে ‘একটা চ*ড়ে যদি দারুন কিছু হয় তবে এমন দশটা চ*ড়েও আপত্তি নেই। নিবিড়ের প্রতি সাময়িক রাগ হলেও এখন মনে হচ্ছে এইসব কথা আর কান্ড করেছে ইন্টেনশনালি। লোকটার আইকিউ মেরিলিন ভস সাভান্তরের চেয়ে বেশি হবে।জিয়ানার কাজ সহজ করে দেয়ার জন্য একটা টাইট হাগ দিতে হবে ভন্ড নেতাকে।’
জিয়ানাকে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেহেদী হাক ছেড়ে বলে,’একটা থা*প্পরে কি স্তব্ধ হয়ে গেছো? তোমার অসভ্য ব্রুটাল বরের শিল্পকর্ম তোমার কিছুটা সামলানো উচিত না?’
জিয়ানা মেহেদীর কথা পাত্তা দেয় না।স্বপ্নাকে সোফায় বসিয়ে শফিক আহমেদ জিয়ানার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে ,
‘ঠিক আছো?’
‘বিলকুল।আমার কথা ছাড়ুন।হাজার রকমের শাস্তি খাওয়া পাবলিক আমি।এইসব চ*ড় টড় ফুঁ লাগার মতো মনে হয়।আসল কথা শুনোন বেটার লেট!ওপেনার হয়েও অনেকেই সেঞ্চুরি করতে পারে না।সেকেন্ড ডাইনে নেমেও ডাবল সেঞ্চুরি করা যায়। রাইট?’
‘থ্যাংক্স আ লট বাচ্চা।’
‘আপনার ধন্যবাদের কোন বাসনা আমার নেই জনাব।পারলে উপকার করে ঋণ শোধবোধ করে দিন।’
‘হ্যাঁ তোমার সেই বিষয়ে কথা হয়েছে।কাল পরশুর মাঝেই পেয়ে যাবে।’
‘আর ধন্যবাদ কিন্তু সুখের প্রাপ্য। শটকার্ট রাস্তা বের করে দিলো।’
এরপরের ঘটনা ঘটলো একেবারেই দ্রুত ,আলোর গতিতে।শফিক আহমেদের ছোট ভাই সহ আরও তিনজন আধাপাকা ভদ্রলোক আর একজন কাজি সহ উপস্থিত হয় নূর ম্যানসনে।ঝড়ের গতিতে বিয়ে পড়ানো হয়।স্বপ্না একটা শব্দও করেনি পুরোটা সময়।
বিয়ের পর পরই রুপক মন্ডল প্রবেশ করে ম্যানসনে।কিন্তু উনি এমন একটা ভাব করেন যেনো ড্রয়িংরুমে কোন মানুষের অস্তিত্ব নেই।শুধু জিয়ানার দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে উপরে উঠে গেছে।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে স্বপ্না শফিক আহমেদের সাথে বের হয়ে যায়। কারো সাথে একটা কথা পর্যন্ত বলেনি।এক কাপড়েই যেমন ছিলো তেমনই।গলায় যে মোটা সোনার চেইন ছিলো সেটাও খুলে কুলসুমের হাতে দিয়ে যায়।জিয়ানা আর কুলসুম এগিয়ে কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করলেও মাথা উপরেই উঠায়নি।
উম্মে কুলসুম চোখের পানি ফেলতে ফেলতে নিজের রুমে ঢুকে।অন্যদিকে ফারহানার এবার সত্যি ফোনে কল এলে সে একসাইডে দাঁড়িয়ে কথা বলা শুরু করে। মেহেদী বেশ বিরক্ত নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে।জিয়ানা মেহেদীর ভাবমূর্তি আর একটু বুঝার জন্য বলে,’কেউ ফেলনা না।প্রিসিয়াস এই জীবনটা অহেতুক খরচা করার কোন মানে নেই।সবাইকে নিজের জীবন গুছিয়ে চলা উচিত। ‘
বলেই বের হয়ে যায় নূর ম্যানসন থেকে। রাস্তায় নেমে মক্কুকে কল করে জানে নিবিড় সহ তারা সবাই ফ্ল্যাটে আছে।
নিবিড়ের ফ্ল্যাটে জিয়ানা যখন পৌঁছায় তখন রাত আটটা বাজে।তালহা ,আকাশ,মক্কু ,সজল বসে আছে সোফায়।জিয়ানা বুঝলো নিবিড় লাইব্রেরি রুমে।কারণ সেখান থেকে গিটারের টুংটাং সুর গলে বের হচ্ছে রুমের বাহির পর্যন্ত। হঠাৎ সবাই স্তব্ধ হয়ে যায় নিবিড়ের গানে,
“একটা চাঁদ ছাড়া রাত আধাঁর কালো
মায়ের মমতা ছাড়া কে থাকে ভালো।
মাগো মা ওগো মা….
তুমি চোখের এত
কাছে থেকেও দূরে কেনো বলো না….
গান থামার সাথে সাথেই ভাংচুরের শব্দে সবাই হকচকিয়ে যায়।জিয়ানা এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে যায় সেই রুমে।নিবিড় ভাঙ্গা থেতলানো গিটার হাতে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে।একসাথে তিনটা শলাকা ধরিয়েছে বিধায় সারারুম ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে।দরজা খোলার শব্দে নিবিড় অন্যদিক হয়ে তাকিয়েই হাত বাড়িয়ে জিয়ানাকে ডাকে,
‘কাম টু মি চাঁদ।সব সময় দেরি করে আসো তুমি।’
জিয়ানা দ্রুত পায়ে গিয়ে হাত থেকে সিগারেট কেড়ে নিয়ে এসট্রেতে নিভিয়ে রাখে।তার খুকখুক কাশি শুরু হয়েছে।
নিবিড় জিয়ানাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। জিয়ানাও কালক্ষেপ না করে আলিঙ্গন করে নেয় নিবিড়কে।নিবিড় জিয়ানাকে এমন ভাবে ধরেছে জিয়ানা ফ্লোর থেকে কয়েক ইঞ্চি উপরে ঝুলছে।সেই অবস্থায় নিবিড় জিয়ানাকে নিয়ে হেঁটে থাইগ্লাসের কার্টেইনের কাছে গিয়ে বসে পড়ে ফ্লোরে।জিয়ানার নেকে মুখ গুজে লম্বা শ্বাস টেনে নেয়।জিয়ানা পায়ের আঙুল টিপে রাখে কিন্তু নড়াচড়া করে না।হাতের ভাজ থেকে একটা ছোট চিরকুট বের করে এগিয়ে দেয় নিবিড়ের দিকে।যেটা স্বপ্না বের হওয়ার সময় জিয়ানার হাতে দিয়েছিলো।নিবিড় একহাতে মেলে ধরে চিরকুটটা।
আব্বু,
হরিণের দুঃখ কাস্তুতি।ঝিনুকের দুঃখ মুক্তা। হাতিরও দুঃখ দাঁত। রেশম পোকার দুঃখ নিজের শরীর।আমার দুঃখ তুই।আমার এই জীবনের কোন প্রাপ্তি নেই। তবে একটা সময় বুঝেছি তোর চেয়ে বড় প্রাপ্তি এই দুনিয়ায় নেই। তাই আমার প্রাপ্তি তুই একাই।আমি সামনে তোকে তুমি বললেও মনে মনে অন্য মায়েদের মতো তুই সম্মোধন করি।অন্য মায়েদের মতো সব বিষয়ে খবরদারি করি। অন্য মায়দের মতো শাসন করি।আমি জানি না সন্তানের গায়ের গন্ধে আলাদা কোন বিশেষত আছে কিনা?আমি জানি না একজন মায়ের সন্তানের জন্মপরিচয় জন্য কোন যুদ্ধ করতে হয়েছে কিনা?
নীতিহীন রাজ পর্ব ৬৩
আমি শুধু চেয়েছি যেই সম্পর্ক অসম্মান আর ঘৃণা দিয়ে শুরু হয়েছে,সেটা শুধু মাত্র অর্থসম্পদ কিংবা সামাজিকতার দ্বায়ে স্বীকৃতি না পাক।আমি জানতাম না ভবিষ্যতে কি আছে তবে এটা চাইতাম সামাজিক স্বীকৃতি কিংবা সেই বংশের পরিচয়ে আমার সন্তান না পরিচিত হোক,যেই বংশকে আমি ঘৃণা করি।তবুও দূর্বল নারী স্বত্ত্বা বেঁচে থাকার লোভে রাস্তায় নেমে যেতে পারিনি।তোকেও কোন আলাদা শেল্টার দেয়ার ক্ষমতা ছিলো না।না ছিলো চাকরি কিংবা আলাদা ক্যারিয়ার বিল্ডাপের মতো কোন যোগ্যতা।না ছিলো মাথার উপর কারো হাত।আমার ছন্নছাড়া এলোমেলো জীবনে তুই একমাত্র সুখ।আমি আর কখনো তোর সামনে আসবো না।তবে একটা শেষ অনুরোধ আব্বু ‘আমার কবরে প্রথম মাটিটা তুই ফেলিস!
একজন খারাপ মা
শেহনাজ স্বপ্না
