নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২৮
নাজনীন নেছা নাবিলা
খুরাতে খুরাতে নিজের বাড়ি পৌঁছালো লিসা।গোটা একদিন সে ওই বন্ধ রুমে বন্দি ছিল। অবশ্য তাকে সময় মতন খাবার এবং পানিও দেওয়া হয়েছিল। একদম ভোরে তাকে কিছু লোক তুলে এনে তার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে অবশ্য তার হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে গিয়েছে।এতেই লিসা চোখের বাঁধন খুলে ফেলল। ততক্ষণে গাড়ি চলে গিয়েছিল।লিসা গাড়ির নাম্বার দেখতে চাইলেও পারলো না কারণ গাড়ির নাম্বার হাইড করা ছিল।লিসা বুঝতে পারলো এইটা প্রি প্লেনিক।তাই আর বাহিরে দাঁড়িয়ে না থেকে বাড়ির ভেতর চলে গেলো।
তার পাশে এক্সট্রা চাবি ছিল যেটা সব সময় থাকে।বাবা মার প্রশ্নের সম্মুখীন হবার ভয় বা চিন্তা কোনোটিই নেই তার মাঝে। কারণ প্রায় সে বন্ধু বান্ধব দের নিয়ে রাত বিরাত ঘুরেফিরে ভোরে বাড়ি ফিরে।এখন তাকে শাসন করাও ছেড়ে দিয়েছে তার মা বাবা। অবশ্য আজ তার ইচ্ছে করছে মা বাবার শাসন পেতে। কারণ এখন যদি তাকে শাসন করার জন্য মা অথবা বাবা জেগে থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই তাকে জিজ্ঞেস করতো কোথায় ছিল এতক্ষন এবং সে তার সাথে আজ যা ঘটেছে তা বলতে পারতো।আজ তার একা ঘুমাতেও ভয় করছে। তবুও খুরিয়ে খুরিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। রুমে এসেই বিছানায় গা এলিয়ে দিল।আজ তার সাথে যা ঘটেছে তা বোঝার চেষ্টা চালিয়ে গেল।কে করল এমনটা তার সাথে আর কেনই বা করল।তাকে তুলে নিয়ে অন্ধকার রুমে আটকে রেখে কারোর কি লাভ? আবার তাকে হুমকি দিয়ে কেবল একটি কথাই বলা হলো ____
সময় থাকতে শুধরে যাও।সীমা অতিক্রম করলে পা কেটে হাতে ধরিয়ে দিবে।
লিসা কোনোভাবেই হিসাব মেলাতে পারছে না তাকে এমন ভাবে তুলে নিয়ে গিয়ে হুমকি দেওয়ার মানে কি।আবার সসম্মানে বাড়িও পৌঁছে দিয়ে গেছে কোনো ক্ষতি করা ছাড়া।এইসব হিসাব করতে করতেই লিসা ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দিল।
ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় প্রকৃতি যেন এক নতুন রূপ ধারণ করে। কুয়াশার চাদর ভেদ করে সূর্যের সোনালী কিরণ গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুতে হিরের মতো দ্যুতি ছড়ায়। মৃদু বাতাস বয়ে নিয়ে আসে মাটির সোঁদা গন্ধ, আর পাখির কলকাকলিতে শান্ত ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে যায়, যা এক রোমান্টিক ও কাব্যিক পরিবেশ তৈরি করে। এলাম ঘড়ির শব্দে ঘুম ভাঙল মিহালের। আস্তে আস্তে উঠে বসলো পুরুটি।হাত বাড়িয়ে এলাম ঘড়ি বন্ধ করল। সময় দেখে নিল সকাল ৭ টা ৩০ বাজে।মিহাল আলসেমি ছেড়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। চোখ হতে এখনো ঘুমের রেশ কাটেনি। বেচারা ঢলতে ঢলতে ওয়াশ রুমে চলে গেল। কিছুদিন ঘুম হয়নি ট্রেনিং এর জন্য তারপর আবার নীলার প্রজেক্ট বানালো।আবার গত রাতে ভর্তা বানালো। ভাগ্যিস যে যখন হাত জ্বালাপোড়া শুরু করেছিল তখনই দুজন মিলে গ্লাভস পরে নিয়েছিল। মুনভি গত রাতেই তাকে বলে দিয়েছিল সেই সকাল বেলা হসপিটালে চলে যাবে কারণ তার ডিউটি আছে।
একেবারে গোসল করে বের হয়েছে মিহাল।টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বেডের উপর থেকে ফোন হাতে নিল। হোয়াটসঅ্যাপে গিয়ে নীলা কে পাঠানোর জন্য মেসেজ টাইপ করতে লাগলো। কিন্তু কিছু একটা ভেবে টাইপিং কেটে দিয়ে ডিরেক্ট কল লাগালো।সকাল সকাল তার নীলাঞ্জনার মধুর কন্ঠস্বর শোনতে মন চাইল।আর মিহাল খানের মন যা চায় মিহাল খান তাই করে।
নীলা আর ইকরা গত রাতে অনেক্ষণ যাবৎ হাসাহাসি করার কারণে তাদের ঘুমাতে ঘুমাতে রাত ২ টা বেজে গিয়েছিল।তাই এখনো পরে পরে ঘুমাচ্ছে। দুজনেই হল রুমের মেঝেতে শুয়ে আছে।গত রাতে যখন হাসতে হাসতে সোফা থেকে পরে গিয়েছিল তারপর দুজনের কেউই আর কষ্ট করে মেঝে থেকে উঠেনি বরং এখানেই শুয়ে শুয়ে আড্ডা দিয়েছিল। কিন্তু কখন যে আড্ডা দিতে দিতে ঘুমিয়ে পরেছিল কারোর খেয়ালই নেই। ফোনের রিংটোনের শব্দে নীলার ঘুম হালকা হলো।সে হাত বাড়িয়ে সোফার উপর থেকে ফোন হাতে নিল।ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল
হ্যাঁ হলো বলো।
আসলে এমন সময় নীলাকে সব সময় তার মা কিংবা বাবা ফোন করে।নীলা ভেবেছে আজকেও রোজকারের মতোন তার মা অথবা বাবাই ফোন করেছে তাই কে কল করেছে তা না দেখেই ফোন রিসিভ করে নিজের মতোন করে কথা বলা শুরু করেছে।
মিহাল খনিকের জন্য থমকে গেল তার নীলাঞ্জনার ঘুম জড়ানো কন্ঠ শুনে।মিহালের ভাষ্যমতে তার নীলাঞ্জনার ঘুমন্ত কণ্ঠস্বর হলো এক মায়াবী নীরবতা, যা স্বপ্ন ও বাস্তবতার সন্ধিক্ষণে দুলতে থাকে। তা যেন দূর পাহাড় থেকে ভেসে আসা মৃদু বাঁশির সুর—অস্ফুট, আধো-বোঝা এবং অদ্ভুত শান্ত। এই কণ্ঠ নিস্তব্ধ রাতে স্নিগ্ধ জোছনার মতো, যেখানে অবচেতন মনের কথাগুলো বকুল ফুলের মতো ঝরে পড়ে, নিঃশ্বাসের সাথে মিশে থাকে এক গভীর আচ্ছন্নতা
নীলা আবার বলে উঠলো ____
উফ্ মা কথা বলছো না কেন? আবার কি নতুন কোনো কাহিনী হয়েছে আর ইরফানের ব
বউ কথাটি বলবে তার আগেই মিহাল বলে উঠলো ___
আমি তোমার মা না নীলা মির্জা। ঘুম থেকে উঠে পড়ুন সকাল হয়ে গেছে ইউনিভার্সিটি যেতে হবে নাকি?
নীলা মিহালের কন্ঠ শুনে তৎক্ষণাৎ ফোন কান থেকে সরিয়ে মুখ বরাবর করল নাম্বার টি দেখার জন্য।সে ভাবছে হয়তো ঘুমের ঘোরে ভুল শুনেছে তাই শিউর হবার জন্য এমনটি করল। কিন্তু যখন দেখলো নাম্বারটি পেয়ারে লাল দিয়ে সেইভ করা সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ থেকে ঘুম উড়ে গেলো।হাত ফসকে মুখের উপর পরে গেল ফোনটি।নীলা তড়িঘড়ি করে উঠে ফোন ধরে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলতে লাগল_____
সরি প্রফেসর একচুয়ালি আমি খেয়াল করিনি।আমি ভেবেছিলাম মা অথবা বাবা কল করেছে তাই এভাবে বলছিলাম।
মিহাল কন্ঠে এক রাশ বিরক্তি এবং হিংসা নিয়ে বলল___
তাহলে ইরফানের কথা কেন বলছিলে? খুব আপন কেউ কি তোমার?
নীলার ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো। দিন, কাল, সময়, ব্যক্তি সব ভুলে গিয়ে অন্য মনস্ক হয়ে বলে ফেলল
“ছিল।”
মিহালের চোখ অবিশ্বাস্যে বড় হয়ে গেল।সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ‘___
মানে?
নীলা থতমত খেয়ে গেল।কি বলতে কি বলে ফেলেছিল তা বুঝতে পেরে জ্বিভে কামর বসালো। এখন নিজেকে নিজেরই থাপ্পড় দিতে ইচ্ছে করছে।কথা ঘোরানোর জন্য বলল___
বাদ দিন প্রফেসর।ফ্লো ফ্লো তে বলে ফেলেছি। যাক গে সেই সব, আপনি আগে বলুন আপনি হঠাৎ কল দিলেন যে?
মিহাল বুঝলো কিছু তো একটা ঘাপলা আছে। তার নীলাঞ্জনা নিশ্চিত কিছু লুকোচ্ছে। কিন্তু কি সেটা সে জানে না এবং তাকে যে করেই হোক জানতে হবে।
মিহাল নিজের চিন্তা ভাবনা দূরে সরিয়ে বলতে শুরু
করল ____
আসলে তোমার চিতই পিঠার জন্য ভর্তা বানানো শেষ। বিকালে না হয় আমি তোমার স্টলে এসে দিয়ে যাব।
নীলা বাঁকা হাসলো সে আগে থেকেই জানে মিহাল ভর্তা বানিয়েছে।নীলা বলল___
বাট ইউ আর মাই প্রফেসার রাইট?আপনি প্রফেসর হয়ে কেন একজন স্টুডেন্টদের জন্য আই মিন একজন সাধারণ স্টুডেন্ট যে কিনা সবেমাত্র বাংলাদেশ থেকে এখানে এসেছে তার জন্য ভর্তা বানাতে গেলেন? হোয়াই হোয়াই হোয়াই? আর অবাক করার বিষয় যে আপনি ভর্তা বানিয়েছেন!
নীলা এখন এমন ভাব নিয়ে বলল যে সে জানতই না যে মিহাল ভর্তা বানাবে।
মিহাল নীলার কথা শুনে কপাল চাপড়ালো। এবং বিড় বিড় করে বলল____
কেন যে সেইদিন ওই কথা গুলো বলতে গিয়েছিলাম আল্লাহ মাবুদ জানে।সব দোষ ইরফানের।শা*লা ইঁদুর কোথাকার।
মিহালের নিজে নিজে বিড়বিড়ানি থামলো নীলার কথা শুনে যখন নীলা বলল___
আর তাছাড়াও তো ভর্তা বানানোর কথা তো উনার ছিল।
মিহাল কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল ___
উনার বলতে কিনার?
নীলা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল ___
কেন আপনার ফ্রেন্ড আছে না ওইযে উনি, আমি উনার কথা বলছি।
মিহালের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।সে নিজের চুল খামচে ধরে নিজের রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করতে লাগলো। সকালেই একবার নীলার মুখ থেকে ইরফানের নাম শুনলো।এখন আবার মুনভি কে উনি বলছে এইটা তার হজম হলো।এখনি মনে হচ্ছে বদ হজম হয়ে যাবে। ফোন কানের কাছে থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিয়ে আবার একা একাই বিড়বিড় করল___
সব দোষ ইরফানের। এখন ইচ্ছে করছে ইঁদুর মারার বিষ দিয়ে চা বানিয়ে খাওয়াই। ভর্তা বেটে আগে পিছে লাগিয়ে দিতে।যখন জ্বালা হবে তখন বুঝতে পারবে আমার কলিজায় কি পরিমান জ্বালা হচ্ছে।
মিহাল কে কিছু বলতে না দেখে নীলা নিজের রুমে যেতে বলতে লাগলো ___
হলো? হলো?
মিহালের হুস ফিরল।সে মাথা নেড়ে উল্টো পাল্টা চিন্তা ভাবনা দূর করে বলতে লাগল ____
শোনো লীলা রানী এইসব উনি টুনি এপ্রুভাল না।মুনিভ কে ভাইয়া ডাকবে অনলি ভাইয়া। ওকে চাইলে নিজের আপন ভাই বানিয়ে ফেলতে পারো আমি সাহায্য করবো আই সয়ার। দরকার পরলে ভাই বোনের চুক্তিপত্র করব। তুমি কেবল সাইন করবে সেখানে সাক্ষী হিসেবে আমি থাকবো।কিন্তু তবুও তুমি তাকে উনি বলে সম্বোধন করবে না। প্রয়োজন পরলে কাকা, দাদা, নানা, চাচা, আঙ্কেল সব ডাকতে পারো বাট নো উনি।উনি সমন্ধন করে কেবল আমাকে ডাকতে পারো। একটু আগে না বললে আমি ওর প্রফেসর। তাহলে এভাবে সম্মান দিয়ে কেবল আমাকে ডাকবে। উনি ইস অনলি ফর মি। আন্ডারস্ট্যান্ড?
নীলার মুখ আপনা আপনি হা হয়ে গেল।সে এত বড় ব্যাখ্যা আশা করেনি। তার নিজেরও মনে পড়ছে না কবে সে সৃজনশীল প্রশ্নের জন্য গত কিংবা ঘ তে এত বড় উত্তর দিয়েছিল।তার কাছে তো মিহালের বলা কথা রচনার মতোন লাগছে।মনে হচ্ছে লোকটি নিজের সারাদিন এসব ভেবে কাটিয়ে ফেলে।
নীলা তবুও নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে নম্র স্বরে বলল ____
আমার ইউনিভার্সিটির জন্য দেড়ি হয়ে যাচ্ছে।
মিহালেরও যেন টনক নড়লো।নীলা সালাম দিয়ে ফোন কেটে দিল। মিহালের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। নীলার ঠোঁটেও তার অজান্তেই হাসির চিলিক দেখা গেলো।
নীলা আর ইকরা রোজকারের মতোন ক্যাব করে ইউনিভার্সিটিতে চলে এলো।যে যার যার মতোন যার যার ক্লাসে চলে গেলো।নীলা ক্লাসে গিয়ে বসতেই দেখলো আজকেও লিসা অনুপস্থিত। নীলার কাছে বিষয়টা সন্দেহ জনক লাগলো। কারণ সে আসার পর থেকে লিসা একদিনও ক্লাস কিংবা ইউনিভার্সিটি মিস দেয়নি অথচ দুদিন যাবৎ নেই।আর এই দুই দিনে তো সেও কিছু করেনি। কিন্তু নীলা আর এইসব ভেবে সময় নষ্ট না করে ব্যাগ থেকে বই বের করে পড়ায় মন দিল। ক্লাস শুরু হতে এখনো খানিকটা দেড়ি আছে।সে তার পড়ার এতক্ষণে ভালো করেই চোখ বুলিয়ে নিতে পারবে। গতকাল ফুফুর সন্ধান পাওয়ার খুশিতে আর পড়তে পারেনি মেয়েটি। তারউপর আজ সকালেও দেড়ি করে ঘুম থেকে উঠার কারণে পড়া তৈরি করে আসতে পারেনি।পড়া তো দূরের কথা খেতেই তো পারেনি।এখন ভীষণ খুদা লেগেছে তার। কিন্তু আপাতত ব্রেক টাইম নেই।আর ব্রেক টাইম যখন আছে তখন তাকে পরবর্তী ক্লাসের হোমওয়ার্ক করতে হবে।আর পরবর্তী ক্লাস আর কারোর না বরং পেয়ারে লাল এর।
একে একে সব গুলো ক্লাস শেষ করল নীলা।এখন আর দুইটা ক্লাস আছে।তার আগে ব্রেক টাইম আছে।পেটের ভেতর ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। কিন্তু এখন খেতে গেলে যে চলবে না তাকে তো হোমওয়ার্ক করে শেষ করতে হবে।তাই নীলা নিজের স্থান থেকে না নড়ে সেখানে বসেই খাতা কলম বের করল। এমন সময় মিহাল ক্লাস রুমে প্রবেশ করল।সবাই এই সময়ে প্রফেসর কে দেখে অবাক হলো। কেউ বেঞ্চের উপর বসে আড্ডা দিচ্ছিল তো কেউ সবে বাহিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।এমন সময়ে প্রফেসর কে দেখে সবাই থমকে গেল এবং নিয়ম মাফিক দাঁড়িয়ে সম্মান জানালো।নীলাও খানিকটা অবাক হলো কিন্তু তা প্রকাশ করল না।মিহাল ক্লাস রুমের ভেতর সম্পূর্ণ রূপে প্রবেশ করে হাসি মুখে ফরাসি ভাষায় বলতে লাগলো ___
চিন্তা করো না তোমরা,আমি টিফিন টাইমে ক্লাস করাতে আসি নি বরং আজ তোমাদের ট্রিট দিতে এসেছি। আজকের ল্যান্স আমার তরফ থেকে। হ্যাপি সবাই?
ক্লাসের সবাই খুশিতে উল্লাস হয়ে হুররে বলে চিৎকার করে উঠল।নীলা তো অবাক নয়নে দেখে যাচ্ছে মিহাল কে।মিহাল দুজন পিয়ন কে ইশারা করল যারা দরজার সামনে দাড়িয়ে ছিল।মিহালের ইশারা পেতেই দুজন পিয়ন বড় কার্টুন নিয়ে ক্লাসের ভেতর প্রবেশ করল।একে একে করে সবাই কে খাবার প্যাকেট দিতে লাগলো।সবার জন্যই বার্গার,স্যান্ডউইচ এন্ড কোল্ড ড্রিংক দিল।নীলা পালা আসতেই একজন পিয়ন বলল
স্যার প্যাকেট তো কম পরেছে।
তখনি মিহাল ইশারা করতে পিয়ন চলে গেল এবং মিহাল নিজের হাতে থাকা একটি প্যাকেট নীলার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল____
একচুয়ালি যেহেতু বাহিরের খাবার কম পরেছে তুমি না হয় এইটা নেও।
নীলা আমতা আমতা করে বলল___
সমস্যা নেই প্রফেসর আমি পরে কিছু খেয়ে নিব।
মিহাল গলার স্বর ভারী করে বলল_____
সকালেও খাও নি কিছু যাই চুপচাপ এইটা নিয়ে নাও।খালি পেটে ফাস্ট ফুড খেতে নেই।আমি সকালে রান্না করেছিলাম খিচুড়ি সাথে বেগুন ভাজি আর ফ্রিশ ফ্রাই।আমি তোমার প্রফেসর তাই আমার মুখে মুখে কথা না বলে যা বলছি তাই করো।
তখন নীলার সাথে কথা বলার পর মিহাল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল যতটুকু সময় আছে ততটুকু সময়ের মধ্যে নীলা রান্না করে খেতে পারবে না। তাই তার মনে হল হয়তো নীলা না খেয়ে চলে আসবে। এজন্যই ইউনিভার্সিটিতে এসে নিজের প্রথম ক্লাস করে আবার বাড়ি ফিরে যায়। তারপর নিজের এবং নীলার জন্য ভালো করে রান্না করে আবার ইউনিভার্সিটিতে সময় মত চলে আসে। কিন্তু কেবল নীলা কে সে খাবার দিতে পারবে না এবং দিলেও নীলা কখনো নিবেনা তাই সবাইকে দেওয়ার মাধ্যমে নীলাকে নিজের হাতের বানানো খাবার দিচ্ছে।
নীলা কিছু বলল না। এমনিতেও তার ভীষণ ক্ষুধা লেগেছিল।হাত বাড়িয়ে মিহালের কাছ থেকে প্যাকেটটি নিতে নিতে ফিসফিস করে বলল ___
আপনিও কুকিং করতে পারেন।
নীলা কথাটি নিচু স্বরে বললেও মিহাল কাছে থাকায় শুনতে পেলো।সে বাঁকা হেসে বলল ___
অবশ্যই।কেন পারবো না। ইটস্ কু কিং অর্থাৎ আমার মতোন কিং দের জন্য নট কু কুইন। তাহলে আমি পারবে নাতো কে পারবে?
নীলা ঠোঁটে কামড়ে হাসলো। কিন্তু মাস্ক পড়ে থাকার কারণে মিহাল তার হাসি দেখতে পেলো না। কিন্তু চোখ কুঁচকে যাওয়া দেখেই বুঝতে পারল তার নীলাঞ্জনা হাসছে।মিহাল নীলার কুঁচকে যাওয়া চোখ দেখে মনে মনে প্রতিজ্ঞা
করল ____
নীলাঞ্জনা কখনো তোমার ঠোঁট হতে হাসি হারিয়ে যেতে দিব না।ভালোবাসার মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছু হতে পারে না, যেন এক অলিখিত সংলাপে আমি তাকে বলে দিই—’তুমি হাসলে আমি বাঁচি। তোমাকে হাসি খুশি রাখার দায়িত্ব এই মিহাল খানের।
মিহাল চলে গেল ক্লাস রুম থেকে।নীলা পিছনের দিকে গিয়ে খাবার খেয়ে নিল। ততক্ষণে ব্রেক টাইম শেষ। নীলা পানি খেয়ে দৌড় দিয়ে আবার নিজের সিটে বসলো কারণ লাঞ্চ করার জন্য সে হোমওয়ার্ক করতে পারেনি। আর সবার কাছ থেকে শুনেছে মিহাল অনেক স্ট্রিক। যদি কেউ ক্লাসের পড়া করে না আসে অথবা হোম ওয়ার্ক না করে তাহলে কোন যুক্তিসংগত কারণ দেখাতে না পারলে তাকে এক সপ্তাহ ক্লাস করতে দেয় না নিজের। আর এই জায়গায় তো তার কাছে কোন যুক্তিসংগত কারণ নেই হোমওয়ার্ক না করার। কিন্তু এখনই তার প্রফেসর চলে আসবে এবং এর ভেতর সে নিজের হোমওয়ার্ক ও করতে পারবে না। তার মধ্যে ভয় কাজ করতে শুরু করল। ততক্ষণে মিহাল আবার ক্লাসরুমে ফেরত এলো নিজের ক্লাস করার জন্য। সবাই আবার তাকে দেখে দাঁড়ালো। নীলা দাড়িয়ে দাড়িয়ে হোমওয়ার্ক করছিল সে মিহালকে খেয়াল করেনি।মিহাল তার নীলাঞ্জনাকে প্রথম লক্ষ্য করল তারপর লক্ষ্য করল যে সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হোমওয়ার্ক করছে চোখে মুখে চিন্তা ছাপ। মিহাল ভাবলো হয়তো চিতই পিঠার বিজনেসের চিন্তায় তার নীলাঞ্জনা গতরাত্রে হোমওয়ার্ক করতে পারেনি। তার ভীষণ মায়া হল মেয়েটির জন্য। এত বছরের শিক্ষক জীবনে তার প্রথম কোন স্টুডেন্টের উপর মায়া হল। আর মায়া হবেই বানা কি করে এটা তো আর যে কোন স্টুডেন্ট নয় বরং তার নীলাঞ্জনা। সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল____
সব সময় তো পড়াশোনা করাই আজ আমরা সবাই মিলে ইনজয় করবো।
আজকেও প্রত্যেক স্টুডেন্ট বেশ অবাক হলো। কারণ এই প্রফেসরকে তাদের কাছে অচেনা লাগছে। কিন্তু সবাই খুশি হলো বটে কারণ তারাও সব সময় ক্লাস করতে করতে বোর হয়ে গিয়েছে।সবাই হ্যাঁ বলল।
নীলা এখনো নিজের কাছে টেনে ব্যস্ত।সে ভাবল হয়তো এই সুযোগে নিজের হোমওয়ার্ক কমপ্লিট করতে পারবে।মিহাল তা দেখে সবার উদ্দেশ্যে বলল____
আজ আমি কারোর হোমওয়ার্ক দেখব না।
কথাটি নীলার দিকে তাকিয়ে বলল। কথাটি শোনা মাত্রই নীলা মিহালের দিকে তাকালো। দুজনের চোখাচোখি হলো। কিছুক্ষণের জন্য সময় থমকে গেলো। কিন্তু পরক্ষণেই নীলা নিজেকে সংযত করে চোখ নামিয়ে ফেলল।বুক ধড়ফড় করতে লাগলো। কানে ভেসে এলো মুনভির বলা একটি কথা__
“তোমার ফুফাতো ভাই ওরফে তোমার প্রফেসর তো তোমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।
এ কথাটি শোনার পর থেকে সে তেমন পাত্তা দেয়নি বরং এড়িয়ে চলেছিল। কিন্তু এখন নীলার সত্যি মনে হচ্ছে মিহাল তার জন্য মন থেকে কেয়ার করে। সে প্রথম দিন থেকে তার জন্য কেয়ার করে এসেছে। সারারাত জেগে তার প্রজেক্ট করে দিয়েছিল।কত সুন্দর সে খায়নি বলে তার জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। এখন আবার এসে লক্ষ্য করল সে হোমওয়ার্ক করেনি তাই এর জন্য আজ হোমার দেখবে না বলে দিল। নীলার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সে এই অনুভূতির মাঝে আর হারিয়ে যেতে চাই না। এক ভুল সে বারবার করতে চায় না। নিজেকে আর বরবাদ করতে চায় না। ভালোবাসা নামক মিথ্যা মায়াজালে আবদ্ধ হতে চায় না নিজেকে কষ্ট দিতে চায় না এখন কেবল নিজেকে ভালবাসতে চায়।
মনে মনে যখন নীলা এইসব ভাবতে ব্যস্ত ছিল তখনই মিহাল বলে উঠলো ___
নীলা মির্জা আপনার পাশের জনের গান গাওয়া শেষ এখন আপনার গান গাওয়ার পালা।
নীলা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। এতক্ষণ যে তারা আসে পাশের মানুষগুলো গান গাচ্ছিলো এদিকে তার খেয়াল ছিল না। সে তো নিজের চিন্তায় মগ্ন ছিল। সে গান গাইবে না বলে যেই না কিছু বলতে নিল অমনি মিহালের চোখের দিকে তাকালো।মিহালের চোখ যেন তার কাছে অনুরোধ করছে গান গাওয়ার জন্য। সে নিজেও সেই অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে পারল না তাই দাঁড়িয়ে পড়লো গান গাওয়ার জন্য।
মিহাল নড়ে চড়ে উঠলো তার নীলাঞ্জনা কি গান গাই তা শোনার জন্য। চুপিসারে প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে ভিডিও অন করে তার শার্টের পকেটে রাখল এবং ক্যামেরা ওপেন করে রাখল। সে তার নীলাঞ্জনার গাওয়া গান রেকর্ড করে রাখতে চায়।
নীলা চোখ বন্ধ করে গাইতে লাগলো _____
Teri Inn Baarishon Mein
Behti Hi Jaaun Main
Jab Tu Hai Paas Mere
Khud Ko Rok Na Paaoon Main
Tu Jo Yeh Kar Raha Hai
Sehna Dushwaar Hai
Dil Ne Toh Haan Kiya Hai
Hothon Pe Inkaar Hai
Yeh Jo Mushkil Se Dil Ko Salaamat Rakha
Ismein Aane Doon Kya Tujhko
Toot Jaayega Dil Phir Na Jud Paayega
Issi Baat Ka Darr Hai Mujhko
Ke Ho Naa Jaaye Pyaar Tumse Mujhe
Kar Dega Barbaad Ishq Mujhe
Ho Naa Jaaye Pyaar Tumse Mujhe
Behadd Beshumaar Tumse
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২৭
আসলে এইটা কেবল গানের লাইন না বরং তার মনের কথা যা সে কখনোই মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারেনি। আজ গানের মাধ্যমে মিহালের কাছে প্রকাশ করে ফেলল।মিহাল কেবল গান শুনেছে তা না বরং সে প্রত্যেকটা লাইনকে অনুভব করেছে। সে আজ উপলব্ধি করতে পেরেছে তার নীলাঞ্জনা কতটা কষ্টে আছে। তার মস্তিষ্ক জানান দিচ্ছে তাকে খুব দ্রুত একটি সিদ্ধান্তে আসা লাগবে।

পরের পর্ব কবে দিবেন 🙂🙂🙂