Home নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ২

নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ২

নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ২
সুরাইয়া জিয়াসমিন

নুবা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।আসলেই সে যা দেখলো তা কি সত্যি।নাকি শুধু বরাবরের মতো চোখের ধান্দা বা স্বপ্ন।
আরশির বাবু হয়েছে প্রায় ৩ সপ্তাহ।আজ আরশিকে শাশুড় বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।তবে সাথে পুরো পরিবারকে,ধরতে গেছে দাওয়া করা হয়েছে।বাড়ির সবাই এখন রিহানদের বাসায়। এদিকে আরশির মেয়ে হয়েছে একদম আরশির মতো।এই নিয়ে সেই কি ঝগড়া।রিহানের কথা “আমার মেয়ে তোর মতো হবে কেন, আশ্চর্য।”
আর আরশির কথা “এটা আমারো মেয়ে, আমার মতোই তো হবে।”
আরো কত কি নিয়ে তাদের কথা কাটাকাটি। এদিকে আরশিদের বাড়িতে আসার পরেই আচমকা আয়রাকে ভিন্ন পানি দিয়ে গোসল করানোই জ্বর এসেছে তার।এই নিয়েই বাড়িতে তান্ডব চলছে।
আয়রা সেই দুপুর থেকে ক্ষুত ক্ষুত করছে এখন প্রায় সন্ধ্যা।নুবা আয়ারকে বুকে টেনে নিয়ে বুকের দুধ দিলো তবে আয়রা একটু মুখে নিয়ে ছেঁড়ে দিলো পরপর কাঁদছে লাগলো সে।
নুবা আয়রাকে কোলে নিয়ে দোল দিলো‌।মুখ দিয়ে আল্লাহ আল্লাহ উচ্চারণ করে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করলো তবে না তাতেও কাজ হচ্ছে না।নুবা টের পেলো জ্বর আস্তে আস্তে বাড়ছে এভাবে রাখা যাবে না।

নুবা অস্থির কন্ঠে সুধালো,
_”তাড়াতাড়ি যাও,মেয়ে আমার নীল হয়ে যাচ্ছে।”
আমিনা বেগম কম্পিত হাতে আয়রার শরীরে,সাথে করে আনা কম্বল জরিয়ে দিলো।নুবা আয়রার সাথে তিরতির করে কাঁপতে লাগলো। হারুন মির্জা দুরন্ত গতিতে গাড়ি চালিয়ে কাছের কোনো হসপিটালে যেতে চাইলেন।
আয়রার জ্বর থেকে শরীর ঠান্ডা হয়ে এসেছে,সেই আগের বারের মতো।নুবা মেয়ের সাথে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছে।গাড়ির এসি অফ থাকায় ঘেমে একাকার হয়ে যাচ্ছে সে।
আমিনা বেগম নুবাকে ভরসা দিয়ে বললেন
_”শান্ত হ, কিচ্ছু হবে না।”
নুবা ফুঁপিয়ে উঠলো।মেয়েকে কোলে আগলে নিয়ে বললো
_”এই জন্য আমি বলেছিলাম আসবো না, আমার মন টানছিলো না।কেনো যে তোমরা জোর করলে। আয়রার যদি কিছু হয়ে যায় তবে!”

কথা শেষ করলো না নুবা,ভীতু চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে পরপর তার মুখে চুমু দিয়ে ভরিয়ে দিলো। ঘন্টা খানিকের ভিতরে তারা ভালো একটা হসপিটালে পৌঁছে গেলো।
এদিকে বাড়িতে সবাই চিন্তিত, হসপিটালে শুধু আমিনা,নুবা আর হারুন মির্জা গিয়েছেন,বাকি সবাই বাড়িতে।এতো মানুষ নিয়ে আসা ঠিক হবে না তাই।
নুবা তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে উল্টো দিকে ছুটতে লাগলো। হারুন মির্জা বিচলিত কন্ঠে বললেন
_”আরে কোথায় যাচ্ছিস, এদিকে আয়।”
নুবা শ্বশুরের কথায় টের পেলো,হুতসে সে উল্টা দিকে যাচ্ছে,নুবা ছোট্ট চঞ্চল আয়রাকে নিয়ে ছুটে আসলো যেকিনা এখন মায়ের বুকে নীথর হয়ে পড়ে আছে।

_ আমার খুব চিন্তা হচ্ছে , বাচ্চাটার হঠাৎ করে কি হলো।
আরশির কথায় রিহান দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সুধালো
_”চিন্তা করো না, ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে।”
আরশি চিন্তিত হয়ে উঠে বসলো।মেয়েকে কোলে নিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।নুবার কষ্ট অনুভব করছে সে কারণ সেও তো একটা মেয়ের মা হয়েছে,হোক না কম সময়, তবু হয়েছে তো।

নাবিল কঠিন চোখে পরির দিকে তাকালো,পরপর দাঁতে দাঁত চেপে বললো
_”তুই কিছু করছিস তাই না।”
পরি শুকনো ঢোক গিলে,মাথা নিচু করে , শান্ত কন্ঠে বিরবির করে সুধালো
_”আমি কিছু করিনি।”
নাবিল রাগে তেতে এসে পরির গাল চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে, হাঁসফাঁস করে বললো
_”মিথ্যা কম ক। নিশ্চয় তুই কিছু করছিস। না হলে পেট এরোম পাথরের মতো হইয়া আছিলো কেন। তুই কি করছোস ক,না হইলে ফাইরা ফালামু।”
পরি তেতে উঠলো,রাগি কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠে বললো
_”কি ফারবেন আপনি, সবসময় চিরে ফেলবো, ফেরে ফেলবো,আছার দিবো,পুতে রাখবো।এই সব কিরকম ভাষা?আর আপনি ভালো মুখে কথা বলতে পারেন না, এগুলো কেমন করে কথা বলেন।শুনলেই গা গুলিয়ে আসে। বাচ্চা হলে তাদের এই সব শিখাবেন আপনি?”
পরি খুব খিটখিটে মেজাজের হয়ে গেছে, এমনিতেই নাবিলকে সহ্য করতে পারে না,তাও আগে যা মুখ বুঝে সহ্য করতো তবে এখন নাবিলের মুখের ভাষা শুনলেই পরির শরীর কাটা দেয়, অসহ্য লাগে।
নাবিল বিরক্ত হয়ে বললো

_”কথা ঘুরান চুদা*** কেন? যা বলছি তার উত্তর দে।কি করছোস আমার বাচ্চার লোগে?”
তাদের কথার ভিতরে বিরক্ত হলো নাজমা বেগম।একটু কেশে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো
_”কেউ কিছু করেনি। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মাঝে মাঝে এরকম হয়। অন্ততপক্ষে doctor এর কথা তো বিশ্বাস করো।”
নাবিল মায়ের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলে উঠলো
_”না বিশ্বাস হয় না।”
নাজমা বেগম দাঁতে দাঁত চেপে বললেন
_”বিশ্বাস না হলে বউকে নিয়ে আবারো হসপিটালে যাও। তোমাদের নিয়ে আর পারি না,আর হ্যাঁ এই সময়টাতে বউ এর গায়ে হাত তুলো না।তাকে বোঝার চেষ্টা করো! কত রকম ইচ্ছে হয় এই সময়, মেজাজ পরিবর্তন হয়। অনেক কিছু খেতে ইচ্ছে করে। বাচ্চার কথা ভেবে হলেও ওর খেলায় রাখো ।”
পরপর নজমা বেগম থেমে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন
_”উফ্,আমি কাকে কি বলছি?ভুলেই গেছিলাম জন্ম দিলেও মা হতে পারিনি।যা গ্গে তোমাদের ব্যক্তিগত ব্যপার।আমি শুধু ভালোর জন্য বল্লাম।”
বলেই নাজমা বেগম ওখান থেকে সেরে গেলেন।নাবিল চেয়ে রইলো,তার মা কি তাকে নিন্দা করে গেলো নাকি অন্য কিছু,বুঝতে পারলো না নাবিল।
নাজমা বেগম যেতেই পরি নাবিলকে ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিলো, হাঁসফাঁস করে বললো
_”আপনার চেহারা দেখলেও আমার ঘৃনা লাগে, বিশ্বাসঘাতকতা, ঠকবাজ। আগে জানতাম না সব বদ গুনি আপনার ভিতরে আছে অবশ্য আপনার মতো খুনিকে আর কি বলবো।”
বলেই পরি উঠে গেলো ওখান থেকে।এই মাসে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিলো নাবিল পিছু পা হয়েছে তাই পরির এখন দু চক্ষে নাবিলকে দেখতে পারে না,যাও এই এক মাস নাবিলকে একটু আকটু সহ্য করতে শিখেছিলো তবে তার এরকম ঠকবাজ আচরণে পরির মনটাই ভেঙ্গে গেছে।

শিশুর ওয়ার্ডে আয়রাকে ভর্তি করানো হয়েছে। সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত এখানেই রাখতে হবে। ইদানিং নাকি এরকম ভাইরাস জ্বর এসেছে।ছেড়ে ছেড়ে জ্বর আসে।আয়রারো হঠাৎ করেই গড়ম ঠান্ডায় এই জ্বর ধরে ফেলেছে।
নুবা ক্লান্ত চোখে আয়রার দিকে তাকিয়ে হাঁসফাঁস করে কাঁদতে কাঁদতে বললো
_”আমারি দোষ,আমিই বাচ্চাটার খেলায় রাখতে পারিনি, নিশ্চয় আমার দেখা শোনায় কোনো ঘাটতি ছিলো। ”
হারুন মির্জা চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে নুবাকে শান্ত কন্ঠে বললেন
_”পাগলের মতো কথা কম বল, যা কপালে ছিলো তাই হয়েছে।এখানে তোর কোনো দোষ নেই।”
নুবা মাথা ঝুঁকিয়ে “না”উচ্চারণ করে বললো
_”সবাই ঠিকি বলে আমি অলক্ষ্মী।প্রথমে নিজের বাপকে খেলাম, তারপর নিজ স্বামীকে এখন আবার বাচ্চাটার পিছনে পড়েছি। নিশ্চয় আমার ভিতরে কোনো দোষ আছে।”
আমিনা বেগম নুবাকে কিছুটা ধমকে উঠে শুধালেন
_”একদম ফালতু কথা বলবি না নুবা,কোন বলদ তোকে এই সব বলেছে। তুই ঘড়ের লক্ষী ,আমার মেয়ে,তোর ভিতরে কোনো দোষ নেই।যে এই সব বলে তার ভিতরেই দোষ আছে।না হলে আমার লক্ষ্মীকে কেউ অলক্ষ্মী বলে, নিশ্চয় চোখে কম দেখে।এই নিয়ে একদল নিরাশ হবি না,কপালে যা ছিলো তা হবেই।”
নুবা হালকা কেঁপে উঠলো,আমিনা বেগমকে আলতো করে জরিয়ে ধরে বললো
_”আয়রার কিছু হবে না তো চাচি,ওর কিছু হয়ে গেছে আমি যে নিঃস হয়ে যাবো।ওকে তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে বলো না!”

আমিনা বেগম নুবার পিঠে হাত বুলিয়ে, আদুরে কন্ঠে বললেন
_”নিশ্চয় ঠিক হয়ে যাবে, একদম চিন্তা করবি না। আমাদের আয়রা খুবি Strong ।খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে।be strong,ভালো ভাব তবে ভালোই হবে। আল্লাহ ভরসা।”
সময় কিছুটা অতিক্রম হলো।বাসার সবাইকে কল দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হলো আয়রা ঠিক আছে।তখন রাত প্রায় ১১ টা নাগাত।নুবার চোখে ঘুম নেই মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে আছে।এখন একটু সুস্থ আছে। কান্ত শরীরে দুধ টানছে।আয়রাকে রেসপন্স করতে দেখে নুবা শান্তির নিশ্বাস ছাড়লো,আয়রার ছোট্ট আঙ্গুল গুলোতে চুমু খেএ বললো
_”তাড়াতাড়ি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাও আম্মু,সবাই যে তোমার জন্য অনেক চিন্তিত।”
অতঃপর বিরবির করে আয়রার সাথে কথা বলতে লাগলো,আমিনা বেগম সবটা খেলায় করে মুচকি হাসলেন ।যাক ছেলে যাওয়ার আগে যোগ্য একজন মানুষকে বেছে রেখে গিয়েছেন।তাই তো, আল্লাহ যা করে ভালোর জন্য করে।

পরি শুয়ে শুয়ে হাঁসফাঁস করছে,ঘুম আসছে না তার,শুয়ে শান্তি পাচ্ছে না।পেটের ভিতরে কেমন জেনো আনচান করছে।বুকটাও অস্থির হয়ে আছে।নিজ অজান্তেই পরি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।সে কোনো মতেই মানিয়ে নিতে পারছে না। সন্ধায় বারতি কথা বলায় নাবিল ইচ্ছা মতো মেরেছে ।তবে ভালোই পাইল করে দিয়েছে। শুধু গালে আর বাহুতে।যতোই হোক বাচ্চাটা আছে তাই ছাড় দিয়েছে।
তবে এটাকে ছাড় বলে না স্বার্থপরতা বলে।পেটের ভিতরে থাকা নিজ সন্তান কে আঘাত করার সাহস পায়নি তবে ছেড়েও দেয়নি।পরির দম বন্ধ হয়ে আসছে এই জায়গায়।আর এটুও মন টিকছে না অসহ্য ধরে গেছে।
পরিকে এরকম বিছানায় উঠে বসে হাঁসফাঁস করতে দেখে নাবিল মুখ দিয়ে গালি বেড় করে বললো
_”এমন নড়াচড়া শুরু করছোস কেন।ঘুমাইতে দিবি না নাকি।”
পরি কম্পিত শরীর টেনে বারান্দায় চলে গেলো। অসহ্য লাগছে নাবিলকে তার মুখের শব্দোও বিষের মতো লাগছে।
পরি বারান্দা এসে খোলা আকাশের দিকে তাকালো বিরবির করে সুধালো
_”এই জীবন থেকে তিক্ত হয়ে যাচ্ছি আমি।পালাতে তো পারবো না তবে দোয়া তো করতে পারবো।তবে তাই হোক।তার সন্তান পৃথিবীতে সুস্থ সবল আসুক তবে সেই সন্তানের বদলে আমার প্রান টুকু নিয়ে নেওয়া হোক।এর থেকে ভালো দোয়া হতেই পারে না।আশা রাখছি আমাকে আপনি নিরাশ করবেন না খোদা। অনেক হয়েছে আর সহ্য করা যায় না।”

টানা দুই দিন হসপিটালে থাকার পরপরোই আয়রা আল্লাহর রহমতে সুস্থ হয়ে উঠেছে।এতো তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবেন কেউ ধারনা করেনি।আজ বিকালে আয়রাকে ডিসচার্জ দেওয়া হবে সেই অপেক্ষায় বসে আছে।
আয়রা শুয়ে আছে,নুবার এখানে কেমন দম বন্ধ হয়ে আসছে,, মেডিসিনের গন্ধে তার গা পাকিয়ে আসছে তা খেয়াল করে আমিনা বেগম মৃদু কন্ঠে বললেন
_”একটু বাইরে থেকে যেএ ঘুরে আয়,ভালো লাগবে ‌।আমি আয়রার কাছে থাকছি।”
নুবাও রাজি হয়ে গেলো কারন তার এখানে অসহ্য লাগছে। নুবা ওখান থেকে বেড় হয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।মন চাইলো খোলা হওয়া খেতে তাই সিদ্ধান্ত নিলো হসপিটালের ছাদে যাবে। একটু মন ভরে নিঃশ্বাস নিবে।যেই ভাবা সেই কাজ নুবা মন মতো সিরি বেয়ে উঠতে লাগলো। হাঁটার দরকার তার,টানা বসে থাকায় মাজা ধরে গেছে।
নুবা সিরি বেয়ে উঠতে উঠতে আনমনেই সব পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো।আবার এক এক করিডোর ঘুরে দেখতে লাগলো যে এটা কোনো ওয়ার্ড।
নুবা ২ তলা শিশু ওয়ার্ড থেকে ৪ তলায় উঠে একটু থমকে গেলো। অনেক কান্নাকাটি আর চিল্লাচিল্লির শব্দ শোনা যাচ্ছে।এক জায়গায় মানুষ গোল করে দাঁড়িয়ে আছে।নুবার আগ্রহ জাগলো এখানে এতো শোরগোল কেনো? নিশ্চয় বড় বিপদ হয়েছে।
নুবা ধীরো পায়ে এগিয়ে গেলো,দেখা মিললো একজন প্রায় তার বয়সি মেয়ে ফ্রোরে হামাগুড়ি দিয়ে কাঁদছে। নার্স তারা দিচ্ছে এখানে চিল্লাচিল্লি না করতে ।নুবা কিছু সময় মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থেকে পাশের একজন কে মৃদু কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো

_”এখানে কি হয়েছে আপু,বলতে পারবেন।”
পাশের মহিলা আফসোস করে বললো
_”মেয়েটার নতুন বিয়ে হয়েছে,হাতের মেহেদিও এখনো উঠেনি। হঠাৎ এক্সিডেন্টে নাকি স্বামী হারা হয়েছে।এই নিয়েই আহাজারি করছে,আহারে।”
কথাটা শুনে নুবা কিছুটা চম্কে উঠলো, কষ্ট হলো তার। বুঝতে পারলো সে শুধু একা অভাগী না, দুনিয়ায় এরকম অভাগীর অভাব নেই।
নুবা দাঁড়িয়ে থেকে মেয়েটার আর্তনাদে নিজেও ব্যথিত হলো পরপর মেয়েকে হয়তোবা তার আত্মীয় স্বজন বুঝিয়ে,কোনো মতে নিয়ে গেলো।নুবা শুধু চেয়ে রইলো।তারা যেতেই স্থানটা শান্ত হয়ে উঠলো।নুবা কেমন করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো,বিরবিল করে অভিযোগের সুরে শুধালো
_”যা ভাগ্যে বেশিদিন টিকে না,তা না দিলেও পারতেন। শুধু শুধু লোভ দেখিয়ে মন ভেঙ্গে দেওয়া কি উচিত।”
পরপর গভীর নিঃশ্বাস ফেললো সে,মাথা নিচু করে সামনের দিকে এগিয়ে যেএ বললো
_”তবু আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী।”
নুবা কথা টুকু ভবে হাসলো, যাক নিজেকে বুঝিয়েছে সে।নুবা এগিয়ে আসতে আসতে সব গুলো কেবিনে একবার করে চোখ বুলিয়ে নিতে লাগলো। হয়তোবা পর্যবেক্ষণ করতে চাইলো,এই সময় এখানে কে কে জীবন মৃত্যুর সাথে লড়ছে।
নুবা চিন্তায় মগ্ন হতে হতে এগিয়ে যেতে লাগলো তখনি নজরে কিছু একটা পড়তেই সে থমকে গেলো ,পা দুটো আপনা আপনি থেমে গেলো,বুকটা ছ্যাত করে উঠলো।দুই কদম পিছিয়ে এসে নিজেকে স্থির করলো সে।বিরবির করে কিছু একটা বলে ডান পাশে তাকালো।

নুবা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।আসলেই সে যা দেখলো তা কি সত্যি।নাকি শুধু বরাবরের মতো চোখের ধান্দা বা স্বপ্ন। এই মাত্র তার মনে হলো এই ডান পাশের কেবিনে সে আরহামকে দেখলো।তার চোখে কি ছানি পড়েছে সে উল্টোপাল্টা দেখবে।তাই sure হতে নুবা কম্পিত পায়ে এগিয়ে গেলো।
এক টুকরো আশার আলো চোখে জ্বলে উঠলো,সে জানে মরা মানুষ ফিরে আসে না তবু মনকে শান্তনা দিতে এগিয়ে গেলো তবে তেমন কিছু নজরে পড়লো না।নুবা মনে মনে হেসে উঠলো, ইদানিং আরহামের কথা একটু বেশিই ভাবে তাই দিনের বেলাও স্বপ্ন দেখছে।
ভাবতে ভাবতে নুবা সামনে দিকে এগিয়ে গেলো। শুধু শুধু কার না কার কেবিনে উঁকি দিয়ে চোর পিটানি খাবে পরে।
নুবা ৪ তলা পার করে ৫ তলায় পৌঁছে গেলো তবে তার মনটা খচখচ করে উঠলো।আরহামকে দেখলো হয়তোবা, মনে হচ্ছে সে দেখছে। বিছানায় সাদা চাদরে জরিয়ে ছিলো সে।এক ঝলক দেখেছে।নুবা নিজেকে বুঝাতে চাইলো এগুলো শুধুই মনের ভাবনা তবু সে শান্ত হতে পারলো। একবার সে যেএ দেখেই আসবে।
যেই ভাবনা সেই কাজ, অশান্ত মন নিয়ে ছুটৈ চললো ৪ তলায়।তার মনের ভুলটা প্রমাণ করতে যাচ্ছে নুবা।নুবা অনেক খুঁজে সেই কেবিনের সামনে এসে দাঁড়ালো।বুকে হাত দিয়ে গভীর নিঃশ্বাস ফেললো সে, অনুভূতি গুলো নিংড়ে ফেললো মন থেকে পরপর চাঁপা নিঃশ্বাস ‌ফেললো ।বুকটা কাঁপছে সাথে শরীর , কেমন অদ্ভুত লাগছে।ভয় হচ্ছে নাকি অন্য কিছু বোঝার উপায় নেই।

অনেক ভাবনা চিন্তার পর আবারো চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে দরজার পর্দা সরিয়ে তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো ভিতরে উঁকি ঝুঁকি মারলো,তবে না কেউ নেই, শুধু বেডে একজন শুয়ে আছে হয়তোবা পেশেন্ট।তখন নুবা এই বেডেই আরহামকে দেখেছিলো নিশ্চয় চোখের ভুল তবু সে এগিয়ে যেএ দেখতে চাইলো আসলেই কি চোখের ভুল।
লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে না,মুখের পতলা বেডসিট দেওয়া।নুবা দূর থেকেই চেয়ে রইলো। আল্লাহই জানে কে না কে,এখন এগিয়ে যেয়ে মার না খায়।নুবা শুকনো ঢোক গিলে, ঠোঁট দুটো গোল করে নিঃশ্বাস ফেললো।নুবা নিজের অবস্থা দেখে নিজেই হাসলো।তার স্বামী মারা গেছে এটা সে জানে তবু কেনো এখনো আশা নিয়ে বসে আছে,এই কোনো চমৎকার হবে আর তার স্বামী চলে আসবে,এটা কি আদেও সম্ভব?
নুবা অনেক কিছু ভাবলো তবে তাও এগিয়ে গেলো।সামনে যেতেই চুল গুলোতে নজর পড়লো তার,বুকটা টিপটিপ করে উঠলো।চুল গুলো চেনা তো মনে হচ্ছে তবে বেশ ময়লা হয়েছে।চুল দেখে নুবার নিঃশ্বাসের গতি বেড়ে গেলো।সে যা ভাবছে তাই কি হবে।না না এরকম কি করে হবে, আশ্চর্য।মরা মানুষ ফিরে আসে নাকি?
নুবা ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে এবার তাড়াতাড়ি এগিয়ে যেএ মুখ থেকে কাপড় সরাতে চাইলো তখনি পিছন থেকে কোনো এক নারী গম্ভীর কন্ঠে ইংরেজিতে বলে উঠলো

_”তুমি কে?‌এখানে কি করছো?”
হঠাৎ কারো প্রশ্নে নুবা চম্কে উঠলো। ভীতু হয়ে পিছনে তাকাতেই নজরে পড়লো একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে তবে বিদেশি মনে হচ্ছে।এদেশি না!
নুবা শুকনো ঢোক গিলে যতটুকু ইংরেজি পারতো তা দিয়ে কোনো মতে বললো
_”আ,,আমি,আমি ভুল করে এখানে এসে পড়েছি।”
সুন্দরী মেয়েটা এগিয়ে এসে একটু হেসে ইংরেজিতে বললো
_”ও, ভুল করে এসেছো নাকি‌ চোর তুমি।”
নুবা বিচলিত হয়ে বললো
_”না না,আমি চোর না,আমি তো আমার মেয়েকে নিয়ে হসপিটালে এসেছি, অনেক বড় হসপিটাল তো তাই রাস্তা হারিয়ে এখানে চলে এসেছি, দুঃখিত ।”
বলেই নুবা বেড় হয়ে আসতে নিলো তখনি ঠাস করে কারো সাথে ধাক্কা খেলো। ধাক্কা খেএ মাথা উঁচু করে তাকাতেই কিছুটা ভয় পেলো সে এই উগান্ডার লোক এখানে কি আরে আসলো।আসলে সামনে দাঁড়ানো মানুষ টাও বিদেশি,তবে কালো আফ্রিকান মনে হচ্ছে।নুবা পুরা sure এটা উগান্ডা থেকে এসেছে।
ছেলেটা নুবার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকালো।নুবা অনেক ভয় পেয়ে গেলো মাথা দুলিয়ে sorry বলে তাড়াতাড়ি বেড় হয়ে গেলো।লোকটা মুখ বাঁকিয়ে সামনে দাঁড়ানো মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতে বললো
_”কে ছিলো।”
সুন্দরী রমণী চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে সুধালো
_”আমি জানি না।”

নুবা চার তলা থেকে ছুটে ২ তলায় চলে আসলো, নিঃশ্বাসে গতি বেড়েছে তার।ওই লোকটার চুল দেখে প্রথমে ভাবুক হলেও উগান্ডার ছেলেটাকে দেখে নুবা sure সবি তার চোখের ভুল।আবারো পাগল হয়ে গেছে সে doctor দেখাতে হবে।
নুবা ছুটে আয়রার কাছে আসলো,কি একটা অবস্থা,দিন দিন আরহামের অভাবে অধঃপতন হচ্ছে নুবার, দিন কানা হয়ে যাচ্ছে সে।
বিকাল দিকে আয়ারকে ডিসচার্জ দেওয়া হলেই মেয়েকে নিয়ে খুশি মনে বাড়ি ফিরতে চাইলো নুবা।আমিনাও রাজি হলো কারণ এখন বাড়িতে যাওয়াই ঠিক হবে। তবে আরশিকে এই অবস্থায় রেখে বাড়িতে ফিরলে আরশি নিশ্চয় খুব রাগ করবে,এই সময়টা মা পাশে থাকলে কথটা সাহায্য হয় আমিনা তো জানে ।
নুবা আমিনা বেগমের আনচান দেখে নিজেই বললো তার সাথে শুধু হাজেরাকে পাঠালেই হবে,আর তানিয়া তো বাড়িতেই আছে।
নুবাও চায় না এই সময়টাতে আরশির থেকে তার মা বাবাকে আলাদা করতে তবে আমিনা আবার চিন্তায় পড়ে গেলো আয়রাকে ছাড়া কি করে থাকবে তা দেখে নুবা মুচকি হেসে বললো

_”ওর চিন্তা কম করো, নতুন জনকে আদর পুষিয়ে তবেই বাড়ি ফিরো। কারণ নাতনি কিন্তু কারো থেকে কেউ কম না। আমি আর আম্মু আয়রার খেলায় রাখবো,ভরসা আছে তো।”
_”ভরসা কেন থাকবে না, তুই তো ওর মা,তোর কাছেই ভালো থাকবে।তাহলে আমি তোরমাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করি।”
নুবা মুচকি হেসে বললো
_”আচ্ছা, তাড়াতাড়ি ফিরবে, তোমাদের ছাড়া আবার ইনি পাগল হয়ে যাবে।”(আয়রার দিকে ইশরা করে কথা টুকু বললো নুবা)
আমিনা বেগম নাতনির কপালে চুমু খেয়ে হেসে বললেন
_”আদরে ভাগ বসেছে আয়রা, আমার হিংসুটে নাতনির আদরে ভাগ বসেছে।”
আয়রা খিলখিল করে হেসে আমিনা আর নুবার প্রান জুড়িয়ে দিলো

প্রায় রাত হয়ে গেছে নুবা আর হাজেরা বাড়ি ফিরেছে।নুবা এসেই আয়ারকে নিয়ে তার মায়ের রুমে ঢুকলো।আজ মায়ের সাথেই থাকবে।তানিয়া তাদের দেখে একটু আফসোস করে বললো
_”আপা রাতে তো কিছু রান্না করিনি,বলে আসলে কিছু রেঁধে রাখতাম।আপনারা বললে ভাত চড়িয়ে দি।”
নুবা ক্লান্ত কন্ঠে শুধালো
_”না, তুমি বরং ঘড়ে কিছু হালকা পাতলা থাকলে দিয়ে যাও।”
_”আচ্ছা।”

অনেকটাই রাত হয়েছে।আয়রা এখনো ঘুমায়নি। এদিকে নুবার মাথায় হাজেরা হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। নুবা মাঝে মাঝে আয়রার সাথে কথা বলছে।
আয়রা কোলেত ভিতরে শুয়ে শুয়ে হাত পা নাড়ছে।নুবা এক হাত আয়রার বুকের উপর দিয়ে রেখছে,ঘুমে চোখ ভেঙ্গে আসছে তার তবু ঘুমাতে পারছে না কারণ আয়রা একটু চোখ বন্ধ করলেই নড়েচড়ে তাকে জাগানোর signal নিচ্ছে যে
“কথা বলো আমার সাথে, তুমি ঘুমাচ্ছো কেনো?”
নুবা ঘুম ঘুম চোখে আয়রার দিকে তাকিয়ে বুকে হাত বুলিয়ে বললো
_”অনেক রাত হয়েছে,এবার একটু ঘুমান।আর কত হুম।”
আয়রা মায়ের মুখের কথা শুনে মিষ্টি করে হাসলো তা দেখে নুবার ঘুম কিছুটা উড়ে গেলোই।মেয়েকে বুকে জরিয়ে নিয়ে বিরবির করে সুধালো

_”আদরে ভাগ বসে গেছে আরুর,এখন থেকে আরুর দাদ দাদির অর্ধেক আদর তার ছোটো বোন খাবে তাই না।”
আয়রা ড্যাবড্যাব করে নুবার দিকে তাকালো।নুবা ঠোঁট হেলিয়ে হেসে আয়রার কপালে চুমু খেয়ে বললো
_”ভাগাভাগি করে শিখে নেন,এতো হিংসুটে হলে চলে না বুঝলেন।”
আয়রা মুখ দিয়ে শব্দ বেড় করলো।নুবা আয়রাকে বুকে টেনে নিলো,কাত করে বুকের দুধ দিয়ে নরম কন্ঠে বললো
_”এবার ঘুমান, অনেক গল্প হয়েছে।”
আয়রার পিঠে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করলো তবে আয়রাকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে নুবা নিজেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো।

আজব এক ধোঁয়াশা ভেসে আছে চারপাশে। নুবা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে হাসপাতালের সেই কক্ষের ,যেন অদৃশ্য কোনো টান তাকে আবারও এখানে ফিরিয়ে এনেছে। হয়তো সে আবারও এসেছে ওই মানুষটা কে,সেটা দেখতে। যদিও জানে সবকিছু আগের মতো নেই,সব মিথ্যা তবু সে এসেছে। নুবার বুকজুড়ে জমে থাকা অসংখ্য প্রশ্নের ভার,আশা আর এক ভরসা। ভুল ভেঙ্গে যাবে সেই আকাঙ্ক্ষা।সময় যেন থেমে গেছে, শুধু তার দৃষ্টি একমনে সেই মানুষটার দিকেই স্থির হয়ে আছে।
নুবা যেনো এগিয়ে যেতে চেয়েও যেতে পারছে না।পা দুটো ফ্লরে থমকে গেছে।নুবা হাঁসফাঁস করে উঠলো শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে নিজের ক্লান্ত দেহকে টেনে সামনে নিয়ে গেলো।ধীরো এক আত্মবিশ্বাস সাথে কেমন কঠিন মন নিয়ে লোকটার উপর থেকে নীর রাঙ্গা কাপড়টা টেনে সরিয়ে দিলো।পরপর মানুষটির চেহারা দেখে স্তব হয়ে গেলো সে।
নুবা চম্কে উঠে ফ্লোরে পরে গেলো।মুখ দিয়ে শব্দ বের করতে ভুলে গেলো সে। হঠাৎ করেই মানুষটি বেড থেকে উঠে তার দিকে এগিয়ে আসলো।নুবা হু হু করে কেঁদে ফেললো, ছটফট করে উঠলো সে। কোনো মতে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করলো।

_”আয়রার পাপা।”
আরহাম এগিয়ে আসলো।সেই আগের মতো করে নুবাকে দেখে হাসলো পরপর মিষ্টি কন্ঠে বললো
_”নুবু, তুমি এখানে?”
প্রশ্ন টা শুনে নুবা সব বলতে চাইলো তবে কোনো অবাধ্য শক্তি তাকে চুপ করিয়ে দিলো,যেনো মনে হচ্ছে সে কিছু বলতে যেয়েও বলতে পারছে না । আরহাম এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে মিষ্টি কন্ঠে বললো
_”পড়ে গেলে কি করে,উঠো।”
নুবার খুশিতে চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠলো,সে কম্পিত হাত আরহামের দিকে বাড়িয়ে দিলো। আরহাম মুচকি হেসে নুবার হাত ধরলো তবে হঠাৎ করেই সুস্থ সবল আরহাম কেমন জ্বলতে শুরু করলো। শরীরে‌ আগুন ধরে গেলো তার।নুবা পিলে চম্কে উঠলো ভয়ে নিজের হাত সরিয়ে নিলো।আরহামের পেশিবহুল শরীর দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো।তবে আর্তনাদ করলো না সে, বরং নুবার দিকে এগিয়ে এসে বললো

_”কি হলো,হাতটা ধরো, ছেড়ে দিলে কেন?”
নুবা ছটফট করে উঠলো, অস্থির কন্ঠে বললো
_”আপনি জ্বলছেন আরহাম,কি হচ্ছে এই সব?”
নুবার চোখের সামনে আরহামের ভালো শরীরটা জ্বলে সেই পুরা লাশের মতো হয়ে গেলো।কোনো থেকে লাশের খাটিয়া এসে সেই একি দৃশ্য নুবার সামনে ভেসে উঠলো। চোখের সামনে সবকিছু দেখে নুবা গলা কাটা মুরগীর মতো ছটফট করে উঠলো।পরপর সেই দিনের মতো আহাজারি করতে লাগলো। চিৎকার করে বলতে চাইলো
“কি হচ্ছে এই সব, চোখের সমানে সব হলো। বাঁচাতে পারলাম না কেনো?”
নুবা আরহামের লাশ স্পর্শ করার চেষ্টা করলো,তবে হঠাৎ করেই সে গভীর অতলে সে হারিয়ে।মনে হলো কেউ তাকে কোথা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে।নুবা মৃত্যুর ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,কপাল বেয়ে ঘাম ছুটলো তার।ঠাস করে কোথাও পড়ে গেলো সে তবে একটুও ব্যথা পেলো না। ঘামার্ত নুবা ভীতু দৃষ্টিতে সামনে তাকাতেই নজরে পড়লো। হসপিটালের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে সে,সামনে আরহাম, এদিকেই এগিয়ে আসছে।আরহামকে সুস্থ সবল দেখে নুবা চেপে রাখা নিঃশ্বাস ফেলে ছুটে গেলো।যেয়েই জরিয়ে ধরলো তাকে ভাঙ্গা কন্ঠে বললো
_”আর যেতে দিবো না। আপনি থেকে যান, যাবেন না।”
আরহাম সতর্কতা ব্যতিত ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিলো,নুবা চম্কে উঠে আরহামের দিকে তাকিয়ে বললো

_”কি হয়েছে।”
আরহাম ভুরু কুঁচকে বললো
_”Who are you? ”
প্রশ্নটা শুনে নুবার দুনিয়া উল্টা পাল্টা হয়ে গেলো,নুবা হতভম্ব হয়ে গেলো। অস্থির কন্ঠে বললো
_”আমি নুবা, আপনার বউ,আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না।”
আরহাম কেমন রাগি কন্ঠে বললো
_”না তো,কে তুমি।”
নুবা এগিয়ে যেতে নিলো। আরহাম ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো নুবাকে নুবা বিচলিত হলো মাথা ঘুরতে লাগলো তার, হঠাৎ করেই কোথা থেকে আয়রা চলে আসলো।তবে ৩/৪ বছরের আয়রা, অনেক বড় হয়েছে গেছে।নুবা ছুটে যেয়ে আয়রাকে কোলে তুলে নিলো, হাঁসফাঁস করে বললো
_”আপনার কলিজার টুকরা, আপনার মেয়ে।”
বলেই নুবা আয়রাকে নিয়ে এগিয়ে গেলো তবে হঠাৎ করেই আরহাম মেয়েকে নিয়ে ছুরে মারলো,সাথে সাথে স্থানটা রক্তাক্ত হয়ে গেলো,নুবা হতভম্ব হয়ে গেলো,আরহামের আচরণে সে চেঁচিয়ে উঠে বললো

_”আমার মেয়ে।”
নুবা কোনো মতে ছুটে গেলো ,আয়ারকে কোলে তুলে নিলো তবে আয়রাকে পেলো না, হঠাৎ করেই আয়রা কোথাও চলে গেলো,নুবার,হাতে শুধু রক্তের দাগ রয়ে গেলো যা আবার মুছেও গেলো।নুবা হুহু করে কেঁদে উঠলো।এই সব কি হচ্ছে।
নুবা আরহামের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতেই যাবে তখনি ওই বিদেশি মেয়েটা ছুটে এসে নুবাকে জরিয়ে ধরলো,নুবা চম্কে উঠলো।আরহামো জরিয়ে ধরলো তাকে।নুবার মাথা ঘুরে উঠলো। আরহাম নুবার দিকে তাকিয়ে বললো
_”কে তুমি,চিনি না তো তোমাকে।”

নুবা পুরো দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসলো, হঠাৎ করেই আশে পাশে সব জিনিস পত্র ধুলোয় মিশে গেলো।নুবা গভীর সমুদ্রে ডুবে গেলো, সবকিছু অদ্ভুত লাগলো নুবার কাছে,হঠাৎই মনে হলো বুকের ভেতর থেকে যেন নিঃশ্বাসটা কেউ জোর করে কেড়ে নিচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে আসতেই নুবা ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে বসলো। হাঁপাতে হাঁপাতে চারদিকে তাকালো, বুকটা এত জোরে ধুকপুক করছে যেন পাঁজর ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসবে। কপাল, ঘাড় আর হাতের তালু ঘামে ভিজে গেছে। কয়েক মুহূর্ত আগের সেই দুঃস্বপ্নটা এখনো চোখের সামনে স্পষ্ট—ভয়, অসহায়ত্ব আর হারিয়ে ফেলার আতঙ্ক তাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। সে কাঁপা হাতে নিজের মুখে হাত চেপে গভীর শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু বুকের ভার যেন কিছুতেই কমছে না। ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, সবকিছুই স্বপ্ন ছিল। তবুও সেই স্বপ্নের বিভীষিকা বাস্তবের মতোই তার মনকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে গেলো। ঘরজুড়ে নেমে থাকা নিস্তব্ধতা আরও বেশি ভয়ংকর লাগছিল তার কাছে, নুবা নিঃশব্দে বসে রইলো, যেন আবার চোখ বন্ধ করলেই সেই দুঃস্বপ্ন তাকে গ্রাস করবে।
হঠাৎ নুবাকে এরকম ধরপড়িয়ে উঠতে দেখে,আয়রাকে নিয়ে রূমের ভিতরে পায়েচারি করতে থাকা হাজেরা এগিয়ে এসে চিন্তিত কন্ঠে বললো

_”কি হয়েছে? অনেক খন ধরে দেখছি ঘুমের ভিতরে ছটফট করছিস তবু ঘুমাচ্ছিলে দেখে ডাক দেইনি।”
নুবা শুকনো ঢোক গিলে আশে পাশে তাকিয়ে দেখলো সকাল হয়ে গেছে।নুবা জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেললো,হাজেরা এগিয়ে আসলো,মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললো।
_”কি হয়েছে, এমন দেখাচ্ছে কেন? খারাপ স্বপ্ন দেখেছিস।”
নুবা মাথা ঝুঁকিয়ে,দুই হাত দিয়ে চুল পিছনে ঠেলে বললো
_”খুব বাজে স্বপ্ন ছিলো মা।এর আগে কখনো এরকম স্বপ্ন দেখিনি।”
_”দুশ্চিন্তায় থাকলে এরকম হয়।”
নুবা হঠাৎ করেই ফুঁপিয়ে উঠলো,দুই হাত মুখে চেপে ধরে বললো
_”উনাকে নিয়ে সবসময় স্বপ্ন দেখি আম্মু,আসে যায়,মেয়ের কাছে আসে,অতীতের ঘটে যাওয়া কাহিনি তবে কখনো এরকম জঘন্য স্বপ্ন দেখিনি।”
হাজেরা চিন্তিত কন্ঠে বললো

_”কি দেখেছিস?”
নুবা হাঁসফাঁস করে বললো
_”উনি এসেছিলো মা।তবে আমাকে চিনতে পারেনি।আয়রাকে ছুরে ফলেছে,একটা মেয়েও ছিলো নুবার সাথে। আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।”
হাজেরা মেয়েকে বুকে জরিয়ে নিলো, শান্ত কন্ঠে বললো
_”এগুলো শয়তান দেখায়, শান্ত হ।”
নুবা কিছুতেই শান্ত হতে পারলো না তবে বুঝতে পারলো, হসপিটালের বিষয়টা নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করায় এমন হয়েছে।তাই নুবা মাথা থেকে সব ঝেড়ে ফেললো।

এভাবেই দুটো দিন পার হলো।কাল পরশু সবাই বাড়ি ফিরবে। এদিকে আয়রা দাদা,দাদির সাথে ভিডিও কলে কথা বলে তাদের কাছে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছে। ওদিক দিয়ে আরশি তো আছেই আয়ারকে খেপানোর জন্য বলছে
” তোমার দাদা দাদি আর আসবে না।ওরা শুধু আমার মেয়েকেই আদর করবে। তুমি চলে গেছো না? তুমি ওখানেই থাকো।”
দাদা দাদি কাছে নেই দেখে আয়রা আরো তুরতুর শুরু করেছে।মানে কিছুই তার ভালো লাগছে না, সারাদিন হাজেরাকে জ্বালিয়ে খাচ্ছে।
প্রায় দুপুর,নুবা আয়ারকে গোসল করিয়ে লিভিং রুমে ছেড়ে দিয়েছে। কারণ আজকে তার চোখে ঘুম নেই।টইটই করে একবার হাজেরার কাছে যাচ্ছে , একবার তানিয়ার কাছে,আবার ফিরে আসছে নুবার কাছে।তার তো কাজ নেই তাই এখানে ওখানে ছুটছে।
নুবা কমড়ে ওরনা পেচি হাজেরা আর তানিয়ার সাথে হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দিচ্ছে। হাজেরা এবার ক্লান্ত নুবার দিকে তাকিয়ে বললো

_”যা,যেএ গোসল সেরে নে।২ টা বেজে যাচ্ছে।এতো খনে রান্না হয়ে যাবে।”
নুবা ওরনায় ভেজা হাত মুছে বললো
_”আচ্ছা,তাহলে আমি যাই,আয়ারকে চোখে চোখে রেখো আবার কখন কোথায় অকাজ করে বসবে।”
তানিয়া হাসতে হাসতে শুধালো
_”ওকে কি দেখবো আমরা,ও উল্টো আমাদের নজরে রাখে যে আমার কোথায়, অতঃপর উল্টা দিকে হাটা দেয়।”
নুবা তানিয়ার কথায় হেসে ফেললো,বিরবির করে বললো
_”দেখো,আসছি। এসে ওকে খাওয়াবো।সেই সকাল থেকে না খেএ টই টই করে বেড়াচ্ছে।”
বলতে বলতে নুবা ওখান থেকে বেড় হয়ে আসলো,নুবা ডাইনিং আর লিভিং রুম পার করে বড় এক ফাঁকা স্থান পার করে এগিয়ে যেতে লাগলো।তখনি সদর দরজা খোলার শব্দ হলো।সেই শব্দে নুবা পাশ ফিরে তাকালো।সদর দরজা কে খুলে রেখেছে, নিশ্চয় তানিয়া,এই মেয়েকে কতবার বলা হয়েছে সদর দরজা আঁটকে রাখতে তবে এই মেয়ের কানে কথাই ডুকে না ,তার উপর এই সময়ে আবার কে আসলো। ভেবেই নুবার ভুরু কুঁচকে আসলো।
নুবা জানার আগ্রহে এগিয়ে যেতে যেতে বললো

_”কে?”
নুবা কিছুটা এগিয়ে যেতেই বড় সদর দরজা ঠেলে কেউ ভেতরে প্রবেশ করল। সামনে থাকা মানুষটিকে দেখেই তার পা যেন মাটিতে গেঁথে গেল। বুকের ভেতর ধকধক শব্দ বেড়ে উঠল, চোখজোড়া বিস্ময় আর অবিশ্বাসে বড় হয়ে গেল। অকারণ এক ভয় শরীরের প্রতিটি শিরায় ছড়িয়ে পড়ল, যেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা বাস্তব নয়, কোনো সুখ স্বপ্নের ছায়া। হঠাৎ করেই নুবা তিরতির করে কেঁপে উঠলো,ভীতু নুবা চম্কে উঠে দুই কদম পিছিয়ে গেলো।ঠোঁট কাঁপলেও কোনো শব্দ বের হলো না, নিঃশ্বাসটাও যেন আটকে গেল বুকে। মুহূর্তটা এমন নিস্তব্ধ হয়ে উঠল, যেন সময় নিজেই থমকে দাঁড়িয়ে দেখছে নুবার আতঙ্ক আর অবিশ্বাসে ভরা মুখ।
নুবা কেমন স্তব হয়ে গেলো,এক হাত বুকে চেপে ধরে ভীতু নুবা চিৎকার করতে চাইলো তবে পারলো না। কারণ তার যে মস্তিষ্ক প্রায় অচল হয়ে গেছে। তার ভিতরে কেমন নিরবতা কাজ করছে।নুবার মাথা ঘুরে উঠলো, হাঁসফাঁস করে উঠলো সে,যেনো শাঁস কষ্টের রোগী সে।এখনি দম বন্ধ হয়ে মারা পড়বে।চোখ দুটো যেনো এখনি বেড় হয়ে এসে জমিনে পড়বে।

যেমন স্তব সে তখনি তার পা দুটো জমিনে আঁটকে গেছে।নড়তে পারছে না।পায়ের আঙ্গুল গুলো কুঁচকে নিলো নুবা। হঠাৎ করেই আরো চম্কে উঠলো সে,আরো দুটো চেনা চেহারা অগ্রসর হয়ে তার পিছনে প্রবেশ করলো। কেমন বুকটা চিনচিন করে উঠলো, শরীর ভেঙ্গে আসলো তার যেনো এখনি মাথা ঘুরে পড়ে যাবে সে।
অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষটা একদম নুইয়ে পড়ে তার কাছে এগিয়ে আসলো।যেনো কান্ত সে, হাঁটতে পারছে না ঘুমে চোখ ভেঙ্গে আসছে। মানুষটাকে তার সামনে আসতে দেখেই নুবা হতভম্ব হয়ে গেলো।

ভয়ে চমকে উঠে নুবা এক পা, দুই পা পিছিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু আতঙ্কে কাঁপতে থাকা শরীর আর ভারসাম্য ধরে রাখতে পারল না। ঠিক যখন মনে হলো সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়বে, তখনই দুটো শক্ত হাত এসে তাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরল। মুহূর্তেই সে থমকে গেল। সেই পরিচিত স্পর্শ, বুকের উষ্ণতা, আর বহুদিন ধরে হৃদয়ে গেঁথে থাকা সেই চেনা ঘ্রাণ,সবকিছু এক নিমিষে তাকে স্তব্ধ করে দিল। কাঁপতে থাকা চোখদুটো ধীরে ধীরে ওপরে উঠল, অথচ বিশ্বাস করতে পারছিল না অনুভূতিগুলো সত্যি নাকি আবারও কোনো নিষ্ঠুর স্বপ্ন তাকে নিয়ে খেলছে।

তার নিঃশ্বাস এলোমেলো হয়ে উঠল, বুকের ভেতর জমে থাকা হাজারো অনুভূতি একসঙ্গে ছটফট করতে লাগল।
লোকটি কোনো সতর্কতার সুযোগ না দিয়েই ক্লান্ত শরীরটা নুবার শরীরের সঙ্গে লেপ্টে নিল।দুটো বাহু দিয়ে তাকে এমন শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন এই আলিঙ্গনেই নিজের সমস্ত ভাঙাচোরা অস্তিত্বকে আশ্রয় দিতে চাইছে।মুখটা নুবার ঘাড়ের ভাঁজে গুঁজে দিতেই উষ্ণ নিঃশ্বাস ছুঁয়ে গেল তার ত্বক। পরিচিত উষ্ণতায় নুবার পুরো শরীর শিহরে উঠল।কাঁপতে থাকা হাতদুটো অসহায়ের মতো মাঝ আকাশে থেমে রইল, যেন সে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না এই মুহূর্তটা সত্যি।তার মনে হচ্ছিল, চোখ বন্ধ করলেই সবকিছু মিলিয়ে যাবে, আবারও নিষ্ঠুর এক দুঃস্বপ্নের ভেতর হারিয়ে যাবে সে।বুকের ভেতর জমে থাকা হাজারো না-বলা অনুভূতি একসঙ্গে হাহাকার তুলে উঠল, অথচ ঠোঁট দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না।

নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ১

শুধু দুজনের দ্রুত ওঠানামা করা নিঃশ্বাস আর নিস্তব্ধতার বুক চিরে ধুকপুক করা হৃদস্পন্দনই জানিয়ে দিচ্ছিল,এই মুহূর্তটা কতটা গভীর, কতটা অবিশ্বাস্য।
নুবা এতোটাই উত্তেজিত হলো যে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে চাইলো তবে তখনি,তাতেই মেতে থাকা _

নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here