নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ৮
সুরাইয়া জিয়াসমিন
ঘুমের ভিতরে আরহামের কথা শুনে নুবার বমি পেয়ে গেলো,এক হাত দিয়ে ঠেলে টিস্যু সরিয়ে দিলো, আরহাম মনে মনে ভাবলো “কি দিন চলে আসলো এখন বউয়ের সর্দি পরিষ্কার করতে হচ্ছে।”কি একটা জ্বালায় পড়ে গেলো সে। মনে হচ্ছে সবি তার দোষ।
নুবা টিপটিপ করে আরহামের দিকে তাকিয়ে কোনো মতে উঠে বসতে চাইলো। আরহাম নুবার বাহু আলতো করে চেপে ধরে বললো
_”কি হলো,কোথায় যাচ্ছো।”
নুবা ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানা উঠে বসতে চাইলো,
বাহাদুর নুবা আরহামকে ঠেলে নিজেই উঠে বসতে লাগলো,তবে একটু উঠে বসতেই, নুবা শরীর ভেঙ্গে আসলো, কেমন চক্কর মেরে উঠলো মাথা,বেশি সময় বসে থাকতে পারলো না,আবারো ধপ করে শুয়ে পড়লো সে ।মাথা ঘুরছে তার উঠে বসতেও পারছে না।
আরহাম অস্থির কন্ঠে বললো,
_”পাকামো করে উঠে বসতে কে বলেছে?”
নুবা মৃদু কেঁপে উঠলো।পেট চেপে ধরে বললো
_”আমাকে খোঁড়া বানিয়ে দিলেন যে, আমার হাঁটু কাঁপছে কেনো, হাঁটা তো দূরের কথা বসতেও পারছি না কেনো। পা কাঁপছে সাথে শরীর।”
_”আ,আমি কি জানি। তোমার শরীর তুমি জানো।”
নুবা হঠাৎ করেই আরহামের মুখে থাবা মেরে দিলো। চেঁচিয়ে উঠে বললো
_”আমি কি জানি মানে ?আপনিই তো সব সমস্যার মূল, আল্লাহ।”
আরহাম থতমত খেয়ে গেলো,বউয়ের হাতের থাবা খেয়ে মাথা ঠিকানায় আসলো।নুবা জ্বরের ঘোরে কেমন রেগে উঠলো।আরহামের নাক মুখ খামচে ধরলো। আরহাম হতভম্ব হয়ে গেলো।এ কোন পাগলের খেলা?
নুবার এতোও শান্তি হলো না, ক্লান্ত হাত দিয়ে ঠাস ঠাস করে দুটো থাপ্পর বসিয়ে দিলো আরহামের সাথে। আরহাম শুধু চেয়ে রইলো। নির্ঘাত অসুস্থ না হলে এখন তুলে একটা আছার মারতো সে।কত বড় সাহস স্বামীর গায়ে হাত তুলছে।তবে জ্বরের ঘোরে উল্টা পাল্টা বকতে লাগলো নুবা। আরহাম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে নুবাকে বুকে টেনে নিলো।বুঝতে পারলো এর ওষুধের আগে ঘুম দরকার।
আরহাম নুবাকে নিজের বুকের উপর ঠেসে ধরলো।পরপর পিঠে হাত বুলিয়ে বাচ্চাদের মতো ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করলো। এদিকে নুবা এক হাত দিয়ে আরহামের মুখ চটকে দিচ্ছে।এবার তো দাঁত দিয়েও শুরু করেছে।বুকের ভিতরে পিঁপড়ে মতো কামড়ে ধরছে।
আরহাম কোনো মতে নুবার হাত সরিয়ে দিয়ে একটু ধমকে বললো
_”উফ্ নুবা?”
যেনো সে এই পাগলের পাল্লায় এসে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে।তবে কিছুতেই থামার নাম নিচ্ছে না নুবা।ধমক খেয়ে নুবা গুনগুন করে উঠলো বিরবির করে বললো
_”আ, আমাকে বকলেন, আমাকে,যা শালা কথাই বলবো না।কেউ ভালোবাসে না রে। আম্মুউউ।”
বলেই উঠতে নেয় নুবা।এখন নুবার কথা হচ্ছে সে যা করছে তাকে করতে দেওয়া হোক, ঠিক আয়রার মতো এখন তার মন-মতলবি চলবে। আরহাম চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে উত্তপ্ত নুবার গলায় চুমু খেলো। শক্ত করে বুকে জরিয়ে ধরে বললো।
_”মুখটা একদম বন্ধ রেখে,একটু ঘুমান তো দেখি।”
নুবা জ্বরের ঘড়ে কি উল্টা পাল্টা দেখলো কে জানে,বিরবির করে বলে উঠলো।
_”শুন পাশা, তুই আমার মন,দেহ কিছুই পাবি না,সব আমার স্বামীর,হাহাহা।”
আরহাম অতিষ্ঠ হয়ে নুবাকে বিছানায় শুইয়ে দিলো,দেখলো সে চোখ বন্ধ করেই এই সব কান্ড করছে।নুবা আবারো বিরবির করে উঠলো
_”রাজা সাহেব আমার কোনো দোষ নেই,সব দোষ নন্দ ঘোষ!”
আরহাম ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো,টের পেলো এই মেয়ের ঘুমের ভিতরে উল্টা পাল্টা বকার স্বভাব আছে। কিছু সময় কেটে গেলো এবার নুবা চুপ হলো, আরহাম ভাবলো হয়তোবা উল্টা পাল্টা বকা শেষ।
আরহাম চেপে রাখা নিঃশ্বাস ফেলে যেই না একটু শুতে যাবে তখনি নুবা গুনগুন করে কেঁদে উঠলো। আরহাম বুঝতে পারছে না এ কোন জ্বালায় পড়লো সে।এক বাসরের ঠেলায় তাকে নাকে মুখে চুবানি খেতে হচ্ছে,সাথে পাগলের জ্বালাও সহ্য করতে ইচ্ছে।
তবে এবার নুবা উল্টা পাল্টা বকলো না বরং ঠোঁট হেলিয়ে তার বাবাকে ডাকতে লাগলো।নুবার চোখের কার্নিশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো।নুবা ভিতরে ভিতরে ফুঁপিয়ে উঠলো।তার বাবা,তাকে ছেঁড়ে চলে গেলো।
গোলাটে স্বপ্নের ভিতরে ইয়াশ রহমান তার একমাত্র মেয়েকে রেখে চলে গেলো।নুবা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।তার বাবা আবারো তাকে রেখে চলে গেলো।নুবাকে হঠাৎ করেই ইমোশনাল হতে দেখে আরহাম ভুরু কুঁচকে নিলো।তখনি নুবা বিরবির করে বলে উঠলো
_”বাবা,যাবে না ,থেকে যাও,না না।”
তার হাসা খুশি বাবা,তার এক রাজ্যে আনন্দ এনে দেওয়া তার রাজা,সেই রাজার রাজকন্যা সে তবে হুট করেই সব শেষ হয়ে গেলো,নুবা কিছুটা চেঁচিয়ে উঠলো
_”বাবা।”
চোখের সামনে তার একটা দুনিয়া শেষ হয়ে গেলো।নুবাকে ফুঁপাতে দেখে আরহাম আবারো তাকে নুবাকে বুকে টেনে নিয়ে বললো
_”কিচ্ছু হয়নি,আমি আছি তো। শান্ত হও।”
নুবা বিরবির করতে করতে শান্ত হয়ে গেলো।পুরটা রাত আরহাম চোখের পাতা এক করতে পারলো না।এই নুবা কেঁদে উঠছে,আবার হাসছে,আবার বিরবির করছে, ঘুমের ভিতরে আরহামকে কেলানি দিচ্ছে।এর ভিতরে আবার আয়রা কিছু সময় পর পর উঠে একটু কান্না কাটি করছে। আরহাম আয়রাকে কোনো মতে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে,আবার নুবা কেঁদে উঠছে।সব সহ্য করে নিলো আরহাম,বুঝতে পারলো অসুস্থতার কারণে এমন করছে।সকাল দিকে যেয়ে একটু ঘুমালো নুবা,সাথে আরহাম।
সকাল ৮ টার দিকে আরহাম বউ বাচ্চাকে রেখে উঠে বসলো।নুবার জ্বর ক্রমাগত বাড়ছে, কিছু পাক আর না পাক,দুটো বউ, বাচ্চা পেয়েছে,কিছু হলেই নেতিয়ে পড়ে।
আরহাম হাম তুলে কিছু সময় বসে রইলো।আগে নুবাকে খাওয়াতে হবে তার পর doctor ডাকতে হবে। আরহাম এক পলক নুবা আর আয়রার দিকে তাকিয়ে রুম থেকে বেড় হয়ে গেলো।
অনেকটা সময় পর আরহাম খাবার নিয়ে রুমে আসলো তবে রুমে আসতেই সে হতভম্ব হয়ে গেলো।তার লেতুর বউটা ফ্লোরে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। আরহাম খাবারের প্লেট রেখে তাড়াতাড়ি নুবার কাছে এগিয়ে গেলো।নুবা তখন জ্ঞান হারা।
আরহাম উঠে যাওয়ার পরপরই নুবার ঘুম ভেঙ্গে যায়,সে উঠেছিলো ওয়াশ রুমে যাওয়ার জন্য তবে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াতেই তার তলপেট মুচরে উঠলো। শরীর ঝিমঝিম করতে লাগলো। জ্বরের তারনায় মাথা ঘুরে উঠলো নুবার।সাথে সাথে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উষ্ণ তরল পদার্থ পা গড়িয়ে পড়লো।পেটে চিলিক মেরে উঠতেই নুবা মুখ থুবরে ফ্লোরে পড়ে গেলো।মনে হলো কেউ তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো। হঠাৎ করে কোনো সহযোগিতা ব্যতিত উঠে দাঁড়ানোতে চক্কর মেরে উঠেছিলো তার মাথা ফল স্বরুপ সে এখন ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
তখনি নজরে পড়লো উল্টে পড়ায় নুবার নাক দিয়ে রক্তপাত হচ্ছে,আসলে হঠাৎ উষ্টা খাওয়ায় একদম নাকে যেয়ে আঘাত লেগেছে। হঠাৎ করেই অসুস্থতা তার উপর এভাবে পড়ে যাওয়ার ফলে নুবা নাকে আঘাত লাগায় নুবার মস্তিষ্ক চলাচল বন্ধ করে দিলো নুবা ওখানেই পড়ে রইলো।
নুবার অবস্থা দেখে আরহামের হাই পেশার বেড়ে গেলো,ঘামতে শুরু করলো সে। কোনো মতে নুবাকে টেনে তুলে গালে আলতো করে থাপ্পর মেরে বললো
_”নুবা,নুবা?”
তখনি খেয়াল করলো নাক দিয়ে তো রক্ত পড়ছে সাথে ফ্লোরে রক্তের ছড়াছড়ি,বেচারা আরহাম প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলো।
আরহাম নুবার এক হাত শক্ত করে দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে তাতে ঠোঁট ছুঁইয়ে ভাঙ্গা কন্ঠে বললো
_”আমার সব দোষ, আমার কারনে সব হয়েছে, I am so sorry sweet honey.আমি বুঝতে পারিনি এমন কিছু হবে।”
নুবা টিপটিপ করে আরহামের দিকে তাকালো। আরহাম নুবার হাতের আঙ্গুল গুলো ছুঁয়ে উত্তেজিত কন্ঠে বললো
_”আর কক্ষনো এরকম করবো না, trust me,কথা বলো।”
আরহামে এভাবে আকুতি মিনতি করতে দেখে নুবার ভালোই লাগলো।তাই নুবা চোখ বুঝেই সব শুনতে লাগলো। আরহাম নুবাকে রেসপন্স করতে না দেখে আরো অস্থির হয়ে পড়লো।
_”sorry না জান,আমি বুঝতে পারিনি এভাবে blooding হবে।তার উপর জ্বর ঠান্ডা লেগে যাবে,আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি।”
নুবা মনে মনে মুচকি হাসলো। আরহাম চাঁপা নিঃশ্বাস ফেললো,নীরবে নুবার দিকে তাকিয়ে রইলো।বিরবির করে বললো
_”sorry, I am so sorry.”
নুবা আরহামকে শান্ত করতে চোখ বুঝেই শান্ত কন্ঠে বললো
_”আপনি এতো হাইপার হচ্ছেন কেনো? আমার পিরিয়ডের ডেট আজ কালকের ভিতরে ছিলো। হয়তোবা অসময়ে হয়ে গেছে। এই কারনেই ঢালা রক্ত যাচ্ছে।আপনার এখানে কোনো দোষ নেই, doctor ও বলে গেছে এটা স্বাভাবিক,তবে জ্বর ঠান্ডা আপনার জন্যই বেঁধে গেছে।এটার জন্য আপনি শাস্তি প্রাপ্য।”
আরহাম কথাটা শুনে প্রথমে চমকে উঠলেও পরে শান্ত হলো।যাক অস্বাভাবিক ভাবে রক্তপাত তবে এই জন্য হচ্ছে।আর সে কি না কি ভেবেছিলো। হয়তোবা তাঁর কারনে হচ্ছে। আরহাম চেপে রাখা নিঃশ্বাস ফেললো।পরপর মৃদু কন্ঠে বললো
_”যা শাস্তি দিবে মাথা পেতে নিবো।”
নুবা চোখ খুলে তাকালো পরপর আস্তে করে বিছানায় উঠে বসে বললো
_”আমার খেয়াল রাখবেন , ৩ বেলা খাওইয়ে দিবেন,যা বলবো তাই করবেন,আর হ্যাঁ আমি হাঁটতে পারবো না কোলে নিয়ে ঘুরবেন।আমি সুস্থ হওয়া পর্যন্ত,আমি যেখানেই যাই না কেনো আপনার কোলে করেই যাবো ok।”
নুবার শাস্তি স্বরুপ আবদার শুনে আরহাম ফিক করে হেসে উঠলো বিরবির করে বললো
_”কোনো আপত্তি নেই ম্যাডাম,আমি এক পায়ে রাজি আছি।”
পরি কম্পিত দৃষ্টিতে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে কাতর কন্ঠে বললো
_”এই সব কি বলছো মা?”
জায়মা বেগম কাঠ কাঠ কন্ঠে ফিসফিস করে বললেন
_”ওই জানোয়ার থেকে মুক্তি পেতে চাস তো,তাই যা বলছি তাই কর।”
পরি মাথা ঝুঁকিয়ে “না”উচ্চারণ করলো, হাঁসফাঁস করে বললো
_”আমি পারবো না,সে অমানুষ দেখে কি আমরাও অমানুষ হয়ে যাবো?”
জায়মা বেগম মেয়ের দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন
_”ওরকম জানোয়ারকে মারলে পূর্ন হবে, পাপ হবে না।”
_”না মা, তুমি ভুল ভাবছো, এরকম কিছু হলে আমরা মুক্তি পাবো না বরং আমাদের সপরিবার সহ মরতে হবে।উনাকে না হয় বিষ দিয়ে মারলে তার পর উনার পরিবার, আমাদের ছেড়ে দিবে।কখনোই না,এর থেকে ভালো যা যেভাবে চলছে চলতে দেও।আমি সব মাথা পেতে নিয়েছি।”
জায়মা বেগম মেয়ের একটা কথাও শুনলেন না, বরং তার হাতে জোর করে ভাতরে প্লেট ধরিয়ে দিয়ে বললেন
_”যা,যা বলছি তাই কর।”
পরি অসহায় দৃষ্টিতে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।পরপর পেটের উপর এক হাত রেখে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রুমের দিকে এগিয়ে গেলো।শরীর কেমন ভেঙ্গে আসছে তার।পরশ হাওলাদার বাড়িতে নেই।বাজারে গিয়েছেন। এদিক দিয়ে জায়মা বেগম খাবারে বিষ মাখিয়ে নাবিলকে খাওয়াতে বলছে।পরির মন মানছে না।যতোই হোক সে মানুষ,কোনো জল্লাদ না,তার উপর নাবিল তার স্বামী,তার সন্তান সে পেটে ধরেছে।এখন কি করবে পরি ভেবে পেলো না।
পরি নিজেকে স্বাভাবিক করে রুমে প্রবেশ করলো।তবু ভিতরে ভিতরে কাঁপছে সে।পরি রুমে প্রবেশ করে দেখলো নাবিল কপালে হাত দিয়ে শুয়ে আছে। শত্রুদের বাড়িতে এসে সে রিল্যাক্স করছে।
পরি বুকে পাথর চেপে এগিয়ে আসলো।কোনো মতে এগিয়ে যেয়ে বিছানায় খাবার রাখলো।গরুর মাংস ভোনা সাথে গড়ম গড়ম বাসমতি চালের ভাত।পরি আসতেই নাবিল কপাল থেকে হাত সরিয়ে পরির দিকে তাকালো।
পরি মনে মনে ভয় পেলো নাবিলের চাহনি দেখে।পরপর নিজেকে স্বাভাবিক করে নিলো।নাবিল পরির শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে কাঠকাঠ কন্ঠে বললো
_”কি হইছে, এমন কাকের মতো সুরোত করে আছোস কেন?”
পরি শুকনো ঢোক গিললো,ভারি নিঃশ্বাস ফেলে কম্পিত কন্ঠে বললো
_”বা,বাবা বাজারে গিয়েছে,আপাতত ঘ,ঘড়ে যা ছিলো তা,তাই রান্না করা হয়েছে।আপনি একটু কষ্ট খেয়ে নিন,রা,রাতে আপনার মন মতো রান্না হবে।”
বলতে বলতে পরির কন্ঠ ভেঙ্গে আসলো।নাবিল উঠে বসে এক পলক ভাতের প্লেটের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো,পরির এরকম মিষ্টি কথায় ফেসে যাওয়ার মানুষ নাবিল না।নাবিল উঠে বসে শান্ত কন্ঠে বললো
_”তা ভালাই তো,,,গরু,একটা কাম কর,পানি আর লবন নিয়া আয় যা।লোগে একটা বোল ,হাত ধুমু।”
পরি কেমন কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ালো,কপালে ঘাম জমলো তার,ধীরো পায়ে রুম থেকে বেড় হয়ে গেলো।
রান্না ঘড়ে আসতেই জায়মা বেগম চোখের ইশারায় কিছু জিগ্গেস করলেন।পরি মাথা ঝুঁকিয়ে “না”করে লবন আর পানি সাথে একটা বাটি নিয়ে রুমে গেলো
আমিনা বেগম ভাত নিয়ে নুবার সামনে বসতেই নুবা মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বললো
_”তোমার ছেলের হাতে খাবো। তুমি এখন যেতে পারো।”
নুবার কথায় আমিনা বেগম মনে মনে খুশি হলেও বিরবির করে বললেন
_”নে খা,ভাব হয়েছে খুব তাই তো।”
নুবা মিটমিট করে হেসে বললো
_”খুব ভাব হয়েছে,যা শেষ হবার নয়।”
আমিনা বেগম হেসে রুম থেকে বেড় হতে নিলেই আরামের সাথে দেখা হলো তার, বউয়ের আবদার পূর্ণ করতে ভর দুপুরে মার্কেটে ছুটেছিলো সে।যেতে না যেতেই মেয়ের জন্য এ তা পছন্দ হয়েছে তাই সেগুলোও নিয়ে এসেছে।
আমিনা বেগম এক পলক আরহামের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বললো
_”next time থেকে নিজেকে একটু নিয়ন্ত্রণে রাখিস বাপ আমার। আমার ১০টা না একটা মাত্র বড় ছেলর বউ,নাতনির মা। অসুস্থ হয়ে গেলে কে ঘড় সামাল দিবে।আমি আর কত দিন। So be careful.আশা রাখছি খুব তাড়াতাড়িই নতুন কেউ চলে আসবে।”
বলেই ছেলের কাঁধে আলতো করে দুটো থাপ্পর মেরে বাহবা দিয়ে চলে যেতে লাগলো,আরহাম হতভম্ব হয়ে গেলো পিছন ফিরে বললো
_”Mom, what happened, আমার ভূত তোমার উপর চড়েছে। Why are you taking like this?”
আমিনা বেগম যেতে যেতে পিছন ফিরে মিটমিট করে হেসে বললেন
_”সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে, you know that বেটা?”
আরহাম মায়ের সাথে তাল মিলিয়ে বিরবির করে বললো
_”ঠিক আছে,খুব তাড়াতাড়িই সু সংবাদ পাবে, pray for me,ok.”
আমিনা বেগম মিষ্টি হেসে চলে গেলেন। আরহাম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে নুবার কাছে এগিয়ে আসলো,ব্যাগ থেকে সব বেড় করতে করতে বললো
_”দেখো তো সব এনেছি কিনা।একটু দেরি হয়ে গেলো,মেয়ের জন্য কিছু কিনা কাটা করেছি।”
নুবা আরহামকে মিটমিট করে হাসতে দেখে ভুরু কুঁচকে বললো
_”হাসছেন কেনো।”
_”nothing, তুমি চেক করে নেও,সব ঠিক আছে কিনা।”
নুবা চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে, আরামের দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে বলে উঠলো
_”ক্ষুধা লেগেছে,চাচি মা খাবার দিয়ে গেছে, এখন ঝটপট করে খাওইয়ে দেন তো।”
আরহাম ভুরু কুঁচকে নুবার দিকে তাকিয়ে সুধালো
_”আমি?”
_”তা নয়তো কে?”
আরহাম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো
_”আমি নিজেই তো হাত দিয়ে খেতে পারি না, তোমাকে কি করে খাওইয়ে দিবো?”
নুবা গাল ফুলিয়ে একটু রাগ দেখিয়ে বললো
_”আপনি বলেছিলেন,আমি যা বলবো তাই করবেন!”
আরহাম চোখের পলক ফেলে, লম্বা শ্বাস টেনে বললো
_”ok, fine, দিচ্ছি।”
**
পরির হাত পা আপনা-আপনিই কেঁপে চলেছে।নাবিল ভাত মেখে মুখের কাছে নিচ্ছে।যতো তার হাত মুখের কাছে যাচ্ছে ততই কেঁপে কেঁপে উঠছে পরি।নাবিল আর চোখে পরির দিকে তাকালো পরপর খাবার মুখে দেওয়ার বদলে নাক দিয়ে শুঁকতে লাগলো।যেনো ঘ্রাণ নিয়েই বুঝে যাবে এর ভিতরে কি ভেজাল আছে।পরির কলিজা কেমন চুপসে আসলো সাথে কপাল ঘড়ির ঘাম পড়তে লাগলো।
নাবিল ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো,পরপর আস্তে করে পরির মুখের কাছে খাবারের লোকমা এগিয়ে দিয়ে হেসে বলল
_”আগে তুই খা,দেখে তোকে বেশি ক্ষুধার্ত মনে হইতাছে।”
পরি পিলে চম্কে উঠলো, হাঁসফাঁস করে উঠলো সে,নাবিল জীবনের প্রথমবার মনে হয় পরিকে নিজ হাতে খাওইয়ে দিতে চাইছে।পরি টের পেলো,নাবিল ভারি চালাক।
পরি তার দিকে পলক বিহীন তাকিয়ে আছে দেখে ভুরু কুঁচকে বললো
_”কি হইলো,খাইতাছোস না কেন?”
পরি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে মুখ সরিয়ে নিলো,মনে হলো খেয়ে মরে যেতে তবে কেমন মৃত্যুর ভয় হলো পরির,এখন তো যেমন তেমন জীবন চলছে তবে মারার পর কি হবে?সে তো ভালো কর্ম করেনি যে ওখানে ভালো থাকবে।নিজে তো মরবে সাথে পেটের অনাগত বাচ্চাটাকে নিয়েই মরবে,পরি মৃত্যুকে ভয় পেয়ে কিছুটা কম্পিত কন্ঠে বললো
_”আ,,আপনি খান,আমি,আমি খেয়েছি।”
নাবিল ঠোঁট হেলিয়ে হেসে কাঠ কাঠ কন্ঠে সুধালো
_”আরে খা”লো মাগি,তোর আগে আমি কেমনে খাই।খা, তুই খাইলেই তো আমার খাওয়া।”
নাবিলকে হাসতে দেখে পরি ভিতরে ভিতরে ভয়ে চুপসে গেলো। পরপর নাক ছিটকে কোনো মতে বললো
_”আ, আমার এগুলো খেলে বমি আসে, এগুলোর ঘ্রাণো আমার সহ্য হয় না।আপনি খান।”
_”কিচ্ছু হইবো না,খাইতে তো লাগবোই,তোর লাইগা তো পদে পদে খাওন করোন যাইবো না।সময় কম নষ্ট কর। জামাই আদর কইরা দিতাছে এক গাল খাইয়া হালা।”
_”আমি খাবো না বল্লাম তো, please জোর করবেন না।আপনি ভালো করেই জানেন,ও পেটে আসার পর থেকে মাছ, মাংস খেতে পারি না।তাই জোর করবেন না।”
নাবিল সরু চোখে পরির দিকে তাকালো,পরিকে ঘামতে দেখে নাবিল হাসলো ,পরির চোখ দুটো কেমন ছলছল করে উঠলো,পরি জোরপূর্বক হাসি দিয়ে বললো
_”আমি খাবো না।”
নাবিল সাথে সাথে বলে উঠলো
_”বিষ দিছোস নাকি যে খাইতে পারবি না।”
পরি কথাটা শুনেই চোখের পলক ফেললো,সাথে সাথে জমে থাকা চোখের পানি গড়িয়ে পড়লো।পরির মুখশ্রী দেখে নাবিলের আর কিছু বুঝতে বাকি থাকলো না।পরি নাবিলের মুখের ভাব দেখে যেনো ভিতর থেকে ভয়ে মরে গেলো।এরপর কি হবে ভাবতে পারলো না সে।এই অবস্থায় নাবিলের হাতের শক্ত পোক্ত মার না খেয়ে মরে যাওয়াও উত্তম।
নাবিল হাত সরিয়ে নিয়ে আসতে চাইলো তবে আসার আগেই পরি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে,নাবিলের খাবার ভর্তি হাত মুখে পুরে নিলো।নাবিল এক ঝাটকায় হাত সরিয়ে নিলো। পরিকে খাবার মুখে নিতে দেখে শরীরের রক্ত টকবক করে উঠলো তার।সাথে সাথে এঁটো হাত দিয়ে ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো।
হঠাৎ চড় মারায় পরির মুখের ভাত যেয়ে বিছানায় ছিটে পড়লো।নাবিল হাঁটুর সাহায্যে অর্ধ উঠে দাঁড়িয়ে পরির ঘাড় চেপে ধরলো।পাশ থেকে পানির মগ নিয়ে পরির মুখে চেপে ধরে হুংকার ছেড়ে বললো
_”নটি** ঘড়ে নটি,কুলি কর।একটা দানাও গলা দিয়ে নামালে তোরে আইজকা হেনেই পুইতা রাইখা যামু,লোগে তোর পুরো ১৪ গুষ্টিরে।”
নুবা মিটমিট করে হাসছে। আরহাম তাকে নিজের সাধ্য অনুযায়ী মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে।নিজের best টা দেওয়ার চেষ্টা করছে তার বউকে। এদিকে নুবা ঠিক আরহামের মতো করেই তাকে বিরক্ত করছে।যেমটা আরহাম আগে তার হাতে খাবার খাওয়ার সময় করতো।তবে আরহাম টু শব্দ টুকু করছে না।যেনো সে সবটা সহ্য করার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
নুবা এভার বেশ জোরেই আরহামের আঙ্গুল দাঁত দিয়ে চেপে ধরলো। আরহামের মুখের রং পরিবর্তন হলো,ভুরু কুঁচকে নুবার দিকে তাকিয়ে বললো
_”ব্যথা লাগছে তো?”
নুবা মুখ বাঁকিয়ে খাবার চিবোতে চিবোতে বললো
_”আমারো লেগেছিলো এই দেখুন _”
বলেই নুবা তার গলা,বুক,পেট সব আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে লাগলো।যেই যেই স্থানে আরহাম তার সুচালো দাঁত বসিয়েছে। আরহাম ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বললো
_”এগুলো love b** * , আপনি যে শুধু আমার সেটার প্রতিক।”
নুবা ঠোঁট বাঁকিয়ে সুধালো
_”সিলমোহর নাকি, তবে আফসোস আপনার নামের অক্ষরের মতো এগুলোও মুছে যাবে। (পরপর আরহাম যেখানে তার নামের প্রথম অক্ষর লিখেছিলো সেদিকে ইশারা করে বলল) । দেখুন আপনার নামের প্রথম অক্ষরটা মুছে গিয়েছে, ঠিক এভাবেই মুছে যাবে।”
আরহাম কিছুটা ঝুকে নুবার দিকে এগিয়ে আসলো, ফিসফিস করে আদুরে গলায় বললো
_”চিন্তা করবেন না,আমি এই চিহ্ন গুলো মরার আগ পর্যন্ত বহমান রাখবো।মুছে যাওয়ার আগেই আবার বসিয়ে দিবো ,i promise আয়রার মাম্মা।”
নুবা লজ্জায় কিছুটা ঝুকে গেলো, মিটমিট করে হেসে উঠলো সে,বিরবির করে বলে উঠলো
_”আর আমি বারবার মলম দিয়ে মুছে দিবো।”
_”আমি আবারো গেঁথে দিবো।”
নুবা চোখ বড় বড় করে বললো
_”what?”
আরহাম শব্দ করে হেসে নুবার মাথায় আলতো করে থাপ্পর মেরে বললো
নীরব উন্মাদনা দ্বিতীয় খন্ড পর্ব ৭
_”দাঁত বসিয়ে দিবো, একদম পেকে গেছে বেয়াদব!”
নুবা একটু হেসে,ভাব নিয়ে বললো
_”অবশ্যই, কারণ আমি কারো মা,কারো বউ, এবং বাসরো হয়ে গেছে,এখনো কি কাঁচা থাকবো,বলার আগে বুঝে নেওয়াই উত্তম।”
_”হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝে নিও সবসময়,আমি বলার আগেই।”
আরহাম ভুরু নাচিয়ে কথা টুকু বললো,নুবাও তালে তাল মিলিয়ে ভুরু নাচালো।
পরি
